পিতার বার সন্তানের একজন আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এর হজ্জ করার ইচ্ছে হয়েছিল। দূরত্ব অনেক! মরক্কোর তাঞ্জিয়ার থেকে মক্কার দূরত্ব ষোল মাসের রাস্তা! নিজের দুই পা, পালকি, গাধা, ঘোড়া, উট, নৌকা, জাহাজ সবই যাত্রা পথে ব্যবহার করে মক্কায় পৌছা লাগবে। তাই এ ধরনের হজে যাওয়া মানে দ্বিতীয় বার আর নিজ জন্মভূমিতে ফিরে না আসা কিংবা সবার সাথে শেষ দেখা দিয়ে বিদায় নেওয়া। হজ্জের-সেকাল-একাল।
এক সন্তান কাছে না থাকলে বাকী সন্তান তো কাছে আছে, সেই প্রবোধে মা ছেলেকে হজের অনুমতি দিলেন। পথের সাথী কাউকে না পেয়ে, ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জুন, বাইশ বছর বয়সে একাকীই তিনি হজের উদ্দেশ্যে বের হন। কিন্তু হজ্জ করতে গিয়ে তাঁর তকদির তাঁকে ঘুরিয়েছে, সারা দুনিয়ার ৭৫ হাজার মাইল পথ!
আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশ পরিভ্রমণ করে ২৯ বছর পর ১৩৫৪ সালে যখন নিজ মাতৃভূমিতে পা রাখেন, তখন তার পিতা-মাতা কেউ বেঁচে নেই! ইতিহাসের সোনালী যুগে অক্ষয় হওয়া এই ব্যক্তির নাম ‘ইবনে বতুতা’।
যিনি হজের আকাঙ্ক্ষায় ঘর থেকে বের হয়েছিলেন এবং ফিরেছিলেন জগতের একজন সেরা পরিব্রাজক হয়ে। তিনি বার কয়েক হজ ও বহুবার ওমরা করার সুযোগ পেয়েছিলেন, অর্জন করতে পেরেছিলেন বিরল খ্যাতি। যার কারণে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন বিশ্বময়।
ইরাকের মুচি আব্দুর রহমান, হজ করার প্রত্যয়ে সারা জীবনে পাই পাই করে অর্থ জমিয়েছিলেন। কিন্তু হজে যাবার কালে প্রতিবেশীর বাচ্চারা মরা প্রাণীর গোশত খেয়ে জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়েছে জেনে হজের জন্য জমানো সমুদয় অর্থ তাদের দিয়ে দেন। ফলে তিনি আর হজে যেতে পারেন নি!
স্বপ্নের মাধ্যমে আদিষ্ট হয়ে তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, তার হজ্জ কবুল হয়েছে! এটাকে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারি কেননা সত্যতা উৎঘাটনে ইতিহারসের নির্ভরযোগ্য কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু এমন ঘটনা রূহের আধ্যাত্মিকতার খোরাক যোগায়। মানুষকে হৃদয়কে পরিপূর্ণ মানবিকতার দিকে টেনে নেয়। মানুষকে সামাজিক হতে শিখায়।
আমাদের এলাকার এক দীনহীন গরীব মহিলা হজের টাকার জন্য সাহায্য চাইতেন। তিনি অভাবী ছিলেন। দুনিয়াতে এক গরীব ভাই ব্যতীত তার কেউ জীবিত ছিলনা। ব্যতিক্রমী এই সাহায্য প্রার্থিনীকে প্রতিবছর একই কথা বলতে দেখতাম। মানুষের একই প্রশ্নের উত্তরে, তিনিও বলতেন,
“একবার হজের টাকাটা হয়ে গেলে তোমাদের আর বিরক্ত করব না। তাছাড়া মক্কায় পৌঁছে গেলে সেখান থেকে আমি আর ফিরেও আসব না”।
মানুষ মনে করতেন এটা ভিক্ষা করার একটা ভিন্ন পদ্ধতি! তারপরও মানুষ তাকে যৎসামান্য সাহায্য করতেন। সুদীর্ঘ আঠার বছরের অবিরাম প্রচেষ্টায় তিনি হজে গমন করতে পেরেছিলেন এবং সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
দাদা-নানার হজের কাহিনী শুধু শুনেছি, তাদের দেখিনি। শিশুকালে এলাকার দু’জন মক্কা ফেরত হাজির সম্মান দেখেছিলাম। সাধারণ মানুষ মাইক বাজিয়ে আনন্দ-উল্লাসের সহিত নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশের দৃশ্য এখনও আমার চেতনায় শিহরণ সৃষ্টি করে।
দু’জন ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও একজন উপ প্রধান মন্ত্রীকে ভিন্ন সময়ে আমাদের এলাকায় আসতে দেখেছিলাম, তারা উন্নয়নের জন্য ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু হাজিদের সম্মানের সহিত গ্রহণ করার জন্য যে জনস্রোত ও স্বতঃস্ফূর্ততা দেখেছি, তা কখনও মন্ত্রীদের আগমনে দেখিনি।
শিশু বয়সে হাজিদের প্রতি এই সম্মানের ঘটনা আমাকে যথেষ্ট আবেগে আপ্লুত করে। আমারও মন গেঁথে যায়, হজ করে সম্মানিত হবার ইচ্ছাটা। ক্লাস থ্রি’র বয়সে মায়ের কাছে আবদার করি আমাকে যেন হজে পাঠায়। মা বললেন, এই বয়সে হজে পাঠানো যায়না না এবং হজে যাবার সাথে সম্পদের মালিক হবার সাথেও সম্পর্কিত। ধনী হলেই হজে যেতে হয়, নতুবা নয়।
মা অবশ্য হতাশ করলেন না! তিনি একটি কথা বললেন,
“আমি যাতে হজ করতে পারি, সেজন্য তিনি প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন”!
শিশুকাল থেকেই এই কথা শতভাগ নিশ্চয়তার সহিত বিশ্বাস করতাম যে, মা যে দোয়াই করেন, আল্লাহ তা কবুল করবেই। তাই দোয়ার জন্য তাকে পিড়াপিড়ি করতাম। তিনি আমার সদা পীড়ন উপভোগ করতেন এবং সারা জীবন আমার জন্য দোয়া করেছেন।
আগের দিনে আমাদের দেশ থেকে হজ করা অনেক কঠিন ছিল। রাস্তা ছিল দুটি। একটি ইরাকের পেট ছিরে জর্ডানের উপর দিয়ে ফিলিস্তিন এবং লোহিত সাগর হয়ে মদিনা ও মক্কা। আরেকটি নদী পথে। ইরানের আব্বাস বন্দর, ইয়েমেনের এডেন বন্দর থেকে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে জিদ্দা হয়ে মক্কা। এতে কম করেও ছয় মাস লেগে যেত। পথে পথে বাধা-বিপত্তি ছিলই।
হুমায়ুন নামাতে লিখিত আছে, তদানীন্তন ইরানের উপর হজ্জের কাফেলা দিয়ে যেতে হলে, আগে শিয়া মতবাদ গ্রহণ করতে হত। তারপরই পারস্যের ভূভাগ পাড়ি দেবার সুযোগ হত। নতুবা হাজিদের উল্টো নিজ দেশে ফেরত পাঠাতো! এমন শর্ত গ্রহণ না করার কারণে সম্রাট হুমায়ুন হজ্জ করতে পারেন নাই!
এই কঠিন যাত্রাপথ পাড়ি দিয়ে আসা-যাওয়াতে কম সংখ্যক হাজিরাই জীবিত ফেরত আসত। এখন দিন বদলিয়েছে, উড়োজাহাজের কল্যাণে সময় বাঁচতে বাঁচতে যাত্রাপথের সময় এখন ছয় ঘণ্টায় এসে থেমেছে। মৃত্যুর হার কমেছে, সুযোগ প্রসারিত হয়েছে, হাজি বেড়েছে। কিন্তু হজের সেই প্রাণ, সেই অনুভূতি, সে জোয়ার এখন আর আগের মত দেখা যায় না!
পশু খামার করতে গিয়ে ভয়ানক অর্থনৈতিক মার খাওয়া, ব্যাংক থেকে তোলা কর্জের বিরাট অংক বিশ্বাসী একজন কর্তৃক মেরে দেওয়া। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সব শেষ হওয়া, সর্বোপরি টাইফয়েডে আমার দুই বছরে শিক্ষা জীবন বিঘ্নিত হবার মধ্য দিয়ে কর্জের সাগরে ভাসতে রইলাম।
হ্যাঁ, দেশে আমার একটি ভাল চাকুরী ছিল কিন্তু ব্যাংকের চক্রবৃদ্ধি সূদের মাসুল গুনতে গেলে সারা জীবন শুধু সুদ দিতে হবে, আসল পরিশোধ করা যাবেনা। এমন দৈন্যদশার গ্যাঁড়াকলে পড়ে, ব্যাংকের সুদী কর্জ পরিশোধ কল্পে, দেশের সুখময় সম্মানী চাকুরী ফেলে দিয়ে প্রবাস জীবনকে বরন করতে বাধ্য হয়েছিলাম।
দীর্ঘ প্রবাস জীবনের বিরাট অংকের টাকাটা গেছে, ব্যাংকের কর্জ শোধ করতে। অবশেষে দেনা মুক্ত হতে পারার জন্য, আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলাম। তওবা করেছিলাম, প্রয়োজন গরীবের মত জীবন ধারণ করব তবুও কোনদিন কর্জ করব না এবং সূদের আশে পাশেও থাকব না।
আল্লাহ আমাকে একটি ক্ষুদ্র উপযোগী জীবনে দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। ব্যাংকের কর্জ সামলাতে গিয়ে আরো কিছু পার্শ্ব কর্জ সৃষ্টি হয়েছিল। যে বছর ব্যাংকের কর্জ শোধ করেছিলাম সে বছরই সিদ্ধান্ত নিলাম হজে যাব। দরকার শুধু মায়ের অনুমতি ও অনুভূতি যোগাড় করা। ফোন অনেক ব্যয় সাধ্য কিন্তু ততদিনে বৃদ্ধা মা ক্ষুদ্র শব্দ কানে শোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।
স্ত্রীকে দিয়ে জানালাম! তিনি জানতে পেরে খুবই খুশী। আমার আরো কর্জ বাকী, তবে তা ব্যাংকের পরিমাণের চেয়ে কম কিন্তু বুক ভরা সাহস যোগাড় হয়েছে। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করলে তো হজের পরেই বাকী টাকা শোধ করতে পারব।
বাসে করে আবুধাবিতে থেকে হজে যাবার সিদ্ধান্ত পাকা হয়েছে। এখান থেকে মক্কার দূরত্ব দুই হাজার দুইশত কিলোমিটার। এই যাত্রাটা অনেক কষ্টকর। হজের মৌসুমে ইমিগ্রেশনে বিশাল জট লেগে যায়। তাই মক্কায় পৌছতে সর্বনিম্ন ৪৮ ঘণ্টা তথা দুই দিন। আর সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা তথা তিনি দিন।
এটা ছিল ভয়ঙ্কর শীতের কাল। এদেশে শীতে বৃষ্টি হয়। দূরের যাত্রায় গাড়ীতে বসে থাকলে, অনেকের পায়ে পানি জমা হয়ে, পা দুটো ফুলে যায়। সচল মানুষ অচল হয়ে পড়ে। তার গতি থমকে দাঁড়ায়।
কোন কারণে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা সাথে নিয়ে হজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছি। সারাক্ষণ ব্যস্ত এই শহরে, আমাদের দেশের মত রাস্তা এগিয়ে দেবার কেউ নাই। তাই নিজের যাত্রাপথের বস্তা নিজেই আলগিয়েই যাত্রা শুরু করলাম।
সকাল থেকে শুরু হওয়া মাথার ব্যাথাটা ক্ষণে ক্ষণে বাড়ছেই। অনেক প্যারাসিটামল খাওয়া হয়েছে, অন্য সময়ে এত ট্যাবলেট লাগেনা কিন্তু আজ কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। গাড়ি চারশত মাইল পাড়ি দিয়েছে কিন্তু আমার মাথা ব্যথায় ছটফটানি শুধু বাড়ছেই। পুরো রাত সীমান্তে কাটালাম, কাস্টমস-ইমিগ্রেশন শেষ হল বিকালে।
ব্যথা কমার কোন লক্ষণেই নাই। দু’রাত পার হল, পথিমধ্যে মরুভূমির মাঝে একটি ঘর দেখতে পেলাম। এখানে কেউ জিরিয়ে নেয়, কেউ নামাজ পড়ে। আরো গাড়ি এসে থামল, ডাক্তার কেউ আছে কিনা জানতে চাইলাম।
একজন বাঙ্গালী ফার্মাসিস্টের সাথে দেখা হল, তিনি আমার প্রেশার মাপলেন। চোখ বড় করে হা করে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ! এত হাই ব্লাড প্রেশার নিয়ে বেঁচে আছি কেমনে। তাও দীর্ঘ দুদিনের বেশী। তকদির খারাপ, কারো কাছে কোন ঔষধ নাই, পরবর্তী শহরের দূরত্ব আটশত মাইল। ব্লাড প্রেশার সম্পর্কে শুনেছি কিন্তু এটা কেমন সমস্যা করে তা জানতাম না।
হজে যাচ্ছি বলে বন্ধুরা দাওয়াত খাইয়েছিল। যে কোন ধরনের ভর্তা আমার পছন্দ। ভর্তা মানেই ব্যাপক কাচা লবণের ব্যবহার। হ্যাঁ এই লবণই আমার যাত্রাপথের জন্য মরণের কারণ হয়ে উঠল। জানলে তো এ কাজ করতাম না। কিন্তু এখন কোন উপায় নেই! উপায় একটা বাকী আছে, সেটা হল আল্লাহকে বলা।
যেই ভাবা সেই কাজ। সেই মসজিদে নামাজ পড়ে একান্ত মনে, হজ্জ সম্পর্কিত আমার অতীতের ইচ্ছা-অভিলাষ, আমার প্রস্তুতি, মায়ের দোয়া ইত্যাদি বিস্তারিত তুলে ধরলাম। আমি আল্লাহর সাহায্য চাইলাম।
বললাম, “হে আল্লাহ! মক্কার এই যাত্রা যদি আমার জীবনের শেষ যাত্রা হয়, আর এটাই যদি আমার তকদির হয়, তাহলে অন্তত যেন আমাকে মক্কা অবধি পৌছার সুযোগ করে দাও”। আমি শুধু মায়ের কাছে এই খবরটাই পৌছাতে চাই যে, মা, তোমার দোয়া কবুল হয়েছে এবং তোমার ছেলে কাবার সামনে দাড়িয়ে আছে। মায়ের স্মৃতিটাই বারবার মানস-পটে ভেসে উঠছিল।
আট মাস বয়সের নাদুস নুদুস একটা মাসুম বাচ্চার পিতা আমি। তাকে তখনও আমি দেখিনি, ছবিতে দেখেছি মাত্র। তার মুখের প্রথম বুলি ফুটেছে ‘আব্বু’ বলে। তাকে ধরে দেখার ইচ্ছেটা প্রবল ছিল। আগের বাচ্চাটিও মারা গেছে, তাকেও দেখিনি।
আট মাস বয়সের নাদুস নুদুস একটা মাসুম বাচ্চার পিতা আমি। তাকে তখনও আমি দেখিনি, ছবিতে দেখেছি মাত্র। তার মুখের প্রথম বুলি ফুটেছে ‘আব্বু’ বলে। তাকে ধরে দেখার ইচ্ছেটা প্রবল ছিল। আগের বাচ্চাটিও মারা গেছে, তাকেও দেখিনি।
তবুও এত মায়াকে পিছনে ফেলেই আমি হজ করার ইচ্ছাটাকে প্রাধান্য দিয়েছি। কিন্তু পথিমধ্যে আমার যে দশা, তাতে মনে হয়না আমি বেশী সময় বাঁচতে পারব। প্রেশার নিচে এবং উপরে দুদিকেই বিপদজনক পর্যায়ে। এসব বলে আল্লাহর কাছে কান্না করলাম। অনেক, অনেক কান্না। মোনাজাতের শেষ কথাটি আমি আজো ভুলিলি। বললাম,
“আল্লাহ অন্তরে আমি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস রাখলাম যে, তুমি আমার দোয়া কবুল করেছ এবং আমাকে মক্কায় পৌঁছিয়েছ”।
সাথে সাথেই আমার ব্যথার পরিবর্তন শুরু হল! ব্যথা কমতে লাগল। আধা ঘণ্টার মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলাম। অথচ আজ প্রায় দুই দিন এই কষ্টে প্রাণ যায় যায় দশা।
হজ যাত্রার আসা যাওয়ার লম্বা পথে বহু ধরনের মজার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছিল। যার দ্বারা বুঝতে পেরেছিলাম, বহু হাজিই হজের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানেনা। যা জানাটা প্রত্যেক হাজির জন্য একান্ত দরকার। আমাদের দেশ থেকে উড়োজাহাজে যাত্রা পথের সময় পাঁচ ঘণ্টার মত কিন্তু সৌদি আরবের পাশের দেশ আমিরাত থেকে গাড়িতে যেতে লাগে দুই দিনের বেশী।
এই যাত্রা অনেক বেশী কষ্টকর। যখন মক্কায় পৌঁচই, তখনই আমি সহ আরো কয়েকজনের পা দুটো ফুলে ফেঁপে একাকার। ভয়ানক ব্যথায় পা তোলাও কষ্টকর হচ্ছিল। আড়াই দিনের যাত্রায় পা ফুলে যে আকার ধারণ করেছে পরবর্তী দশ দিনেও তা আর আগের যায়গায় ফিরে যায়নি।
অসহ্য ব্যথা বেদনা নিয়ে আরাফা থেকে মক্কার দীর্ঘপথ খুড়িয়ে খুড়িয়ে পায়ে হেঁটে আসতে হয়েছিল। আর পুরো পথেই শুধু ভেবেছি আর কেঁদেছি, হাশরের ময়দান আরো প্রসস্থ, আরো উত্তপ্ত হবে এবং শারীরিক বৈকল্যতা নিয়ে হাজার বছরের রাস্তা পাড়ি দিতে হবে! সেটা কিভাবে সম্ভব হবে।
হজে যাবার আগে তিনটি সিরাত গ্রন্থ (রাসুলের জীবনী) শেষ করেছিলাম। ছয় মাস ধরে হজ, মক্কা, মদিনা, তায়েফ, হুনাইন সহ সমগ্র আরবের যতটুকু সম্ভব ইতিহাস পড়ে নিয়েছিলাম এবং মসজিদে হারামের হালনাগাদ সমুদয় তথ্যাদি খুঁটিনাটি জেনে নিয়েছিলাম। এটা আমার জন্য বেজায় কাজ দিয়েছিল। পুরো দেশটাই যেন আমার জন্য খুবই পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
দুই হারামের প্রতিটি বস্তুই যেন আমার কাছে অনেক দিনের পরিচিত বলে মনে হচ্ছিল। মানুষ হজের আহকাম মোটামুটি জেনেই হজে যায়। কিন্তু সেখানে গেলে মানুষের প্রশ্নগুলো ভিন্ন হয়ে উঠে। এটার ইতিহাস কি? ওটার পরিচিতি কি ইত্যাদি। এসব প্রশ্নগুলোর সদুত্তর অনেকেই দিতে পারেনা। দিলেও মন গড়া কিছু যোগ হয়। তাই যখনই এ বিষয়ে কথা বলা শুরু করতাম, সবাই শোনায় মনোনিবেশ করত। ভাবনাটা যেন এমনই, এটাই তো শুনতে চেয়েছিলাম।
মাসা-ধিক কাল থাকার পরে, মদিনা থেকেই আবুধাবির উদ্দেশ্যে আমাদের দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয়েছে। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানালাম, তিনি আমার ও আমার মায়ের দোয়া কবুল করেছেন। আমাকে হজ করা ও রাসুল (সাঃ) মদিনা জেয়ারতের সুযোগ দিয়েছেন।
আমিরাতে আসার রাস্তা যেন সহজ হয়েছিল। গাড়ির ড্রাইভার অনবরত গাড়ি চালিয়েছে। পুরা দিন মুষলধারায় বৃষ্টি পড়েছে তাই কোথাও থামতে পারেনি আবার পুরা রাত নিরবচ্ছিন্ন গাড়ি চালিয়েছে। নামাজের জন্য হালকা যাত্রা বিরতি টানা হয়েছিল কিন্তু সেসব স্থানে খাদ্যের যোগান ছিলনা। দানা পানি কিছুই পড়েনি পেটে, সামনে কোথাও থেমে করব এটা সেটা ভাবতেই গাড়ী সীমান্তে চলে এলো।
ফিরতি পথে অতি দ্রুতই সীমান্তের কাজ শেষ হল। শেষ রাত্রে আবারো রওয়ানা হল গাড়ী। সীমান্তের ওপারে বৃষ্টি হলেও এপারে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা জনপদ। দশ মিটার দূরের রাস্তাও নজরে আসছে না, ঘড়িতে সময় বুঝা যাচ্ছে তবে বেলা দেখার উপায় নাই। অনেক সতর্কতার পরও বারবার রাস্তার পাশের হোটেলগুলো হারিয়ে ফেলেছি। মনে হল পেটের চামড়া যেন পিটের সাথে লেগে গেল। বেলা এগারটার দিকে গাড়ী আবুধাবির গন্তব্যে দাঁড়াল।
কারো গায়ে বল নেই। দীর্ঘ ভ্রমণে চলার ধকলে চলার ক্ষমতাও যেন হারিয়েছি। আগে ভাগেই কাউকে ফোন করে জানাব সে সুযোগ ছিলনা। এটাই অফিসের সবচেয়ে ব্যস্ততম সময়। বললেও কেউ আসতে পারত না। সকল হজ যাত্রীর একই দশা।
নিজেদের ব্যাগটি টেনে-তুলে সহযোগিতা করবে, রাস্তার পাশে একজন মানুষের অস্তিত্ব দেখা গেলনা। মনে পড়ে গেল, ছোটকালে দেখা আমাদের গ্রামের সেই দুই হাজির কথা। যাদের আগমনে পুরো তল্লাটে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। দেশ-ভেদে হাজিদের কত সম্মান, কত ইজ্জত! প্রবাস বড় কঠিন জায়গা এখানে, কেউ কারো জন্য নয়!
কষ্টে-সৃষ্টে মালামাল টেনে ট্যাক্সি নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সেখানেও মাল টানার ঝামেলা। খিদের জ্বালায় প্রথমে ঢুকলাম পরিচিত বাংলাদেশী রেস্তোরায়। রেস্তোরা মালিকের উল্টো প্রশ্ন, কত দিন আপনাকে দেখিনি, আপনি কি অসুস্থ?
বললাম, হজে গিয়েছিলাম অসুস্থ নই; ভয়ঙ্কর খিদে, খাবার জন্য কিছু আছে? জানালেন বেলা এগারটায় খানা কি আর থাকে? ‘খাজা’ আছে দেব কি? মাথা ভোঁ করে ঘুরে গেল। ৩২ দিন আগে এই খাজা দিয়ে কয়েকজনকে মেহমান দারী করে হজের রাস্তা ধরেছিলাম! এখনও টুকরা দশেক বিক্রির অপেক্ষায় আছে!
কোন বিকল্প না থাকাতে দুর্বল শরীরে মালামাল নিয়ে ঘরে উঠলাম। জানি ঘরে কেউ থাকবেনা, থাকার কথাও নয়। তারপরও মনে টান পড়ছিল, ঈশ! ঘরে কেউ যদি থাকে, তাহলে আমার জন্য সামান্য খাবারের ব্যবস্থা হবে। নাহ! কেউ নাই, ঘর ফাঁকা সবাই অফিসে। অবশেষে বন্ধুর পাতিলে হাত দিলাম। আগে থেকে আমরা দুজন একসাথে খাই।
আ-হা-হা, ঠাণ্ডা ভাত আছে, বাসী তরকারী আছে। হজ করে এসে, প্রথম ঘরে ঢুকেই, এভাবে জঠর জ্বালা নিবারণ করা হবে, ভাবনাতেই ছিল না। এটা প্রবাসের বাস্তব চিত্র। বারবার মনে পড়ছিল আমার দেখা ছোটকালের কথা, একজন হাজির সেকি ইজ্জত, কত দাওয়াত, কত মহব্বত, কত মিছিল! এই প্রবাসে মানুষ বড় একাকী, বড় অসহায়।
আ-হা-হা, ঠাণ্ডা ভাত আছে, বাসী তরকারী আছে। হজ করে এসে, প্রথম ঘরে ঢুকেই, এভাবে জঠর জ্বালা নিবারণ করা হবে, ভাবনাতেই ছিল না। এটা প্রবাসের বাস্তব চিত্র। বারবার মনে পড়ছিল আমার দেখা ছোটকালের কথা, একজন হাজির সেকি ইজ্জত, কত দাওয়াত, কত মহব্বত, কত মিছিল! এই প্রবাসে মানুষ বড় একাকী, বড় অসহায়।
বন্ধুটি খবর পেয়ে খুব তাড়াতাড়ি বাসায় পৌঁছল। খুব আফসোস করল আমার দুর্দশা দেখে, সে নিজেকে অপরাধী সাব্যস্ত করল, আমার জন্য পূর্ব থেকেই কিছু রান্না করে রেখে যেতে না পারার অপরাধে! প্রবাস জীবনের হজ যাত্রা সবার প্রায় সবার এভাবেই হয়ে থাকে। পেটের তাগিদে এরা প্রবাসী হয়। স্নেহ, মায়া, মমতা, দয়া-দাক্ষিণ্য প্রবাসীরা দেশেই রেখে আসে।
খবর পেলাম মায়ের অবস্থা তত ভাল নয়, আরাফাতের দিন লাখ লাখ মানুষের ভীর থেকে টিভি পর্দায় আমাকে দেখার বিফল চেষ্টা করেছেন। বাসায় এসেই তাঁর একখানা অডিও ক্যাসেট পাই, তাতে উপদেশ মূলক কথায় ভরপুর। তাঁর আবদার ছিল, আমি যেন তার জন্য দোয়া করতে কখনও না ভুলি।
সহসা দেশে যাবার ইচ্ছা করলাম, কোনমতেই ছুটি ম্যানেজ করা যাচ্ছিলোনা। এক মাসের হজ ছুটিতে, কাজের পাহাড় জমা হয়েছিল। প্রাপ্ত ছুটি দিয়েই তো হজ করে আসলাম। ছুটির আর বাকী থাকে কি? তারপরও কিছু ছুটি ম্যানেজ করতে লেগে রইলাম।
রাত দেড়টায় মোবাইল বেজে উঠল, কেন জানি ধড়ফড়িয়ে উঠলাম, এত রাতে কখনও ফোন আসেনা। অচেনা নম্বর, ভয়ে ভয়ে ধরলাম। ওদিকে বড় ভাইয়ের কণ্ঠস্বর। তিনি জানালেন আধা ঘণ্টা আগে, মানে বাংলা দেশের সময় রাত তিনটায় মা ইন্তেকাল করেছেন! মায়ের অন্তিম ইচ্ছামত তিনি সকালেই তাঁকে কবরস্থ করতে চান, আমার কি মতামত?
মাথার উপর পুরো জগৎখানা যেন ঘুরছিল। সপ্তাহে বাংলাদেশের মাত্র দুটি ফ্লাইট, একটি আজ রাত্রে চলে গিয়েছে, অন্যটি তিনদিন পরে যাবে। বড় কষ্টে মায়ের দাফন জলদি করতে বড় ভাইকে অনুমতি দিলাম। তাছাড়া লাশ ধরে না রাখতে মা ক্যাসেটে আমাকে বারবার তাগাদা দিয়েছিলেন।
মাকে আর আমার হজের উপলব্ধির কথা বলা হলনা। যেটা পাওয়ার জন্য তিনিই আমার একমাত্র মাধ্যম ছিলেন। আমার সকল আশা পূরণ হল, তবে তিনি নাই। ফুঁপিয়ে কান্না করতেও পারছিলাম না। মনে হল পৃথিবীর পরিধি যেন আমার জন্যে খুব ছোট হেয় গেল!
মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার ভয়ে, রান্নাঘরে গিয়ে কান্না করছি। আবার বড় করে কান্না করার সুযোগ নেই। বুক ফেটে যাচ্ছিল। পুরো শহর ঘুমে অচেতন। নীরব-নিথর-নিস্তব্ধ। বহু জাতি, বহু ধর্মের মানুষের বাস এই ভবনে। এই শহরে। প্রবাস জীবনের একাকীত্বের গহীন রাতে এখানে কান্না করার অধিকারও সীমিত। সবাই ব্যস্ততার অবসরে ঘুমে অচেতন, এমন কেউ নাই যে সান্ত্বনা দেবার, “ভাই কান্না করো না, মানুষ সদা মরণশীল, আমাদেরও বাবা-মা কেউ জীবিত নাই”।


Discussion about this post