মানুষ শব্দের উৎপত্তি কিভাবে সেটা বিস্তারিত জানা না গেলেও অনেকে বাংলায় সন্ধি বিচ্ছেদের মত করে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেটা হল ‘মান‘ আর ‘হুশ‘ অর্থাৎ মানুষ। যার সম্মানবোধ ও হুশ আছে সেই মানুষ। আরবি ভাষায় মানুষ শব্দের তাৎপর্য ব্যাপক ও চিত্তাকর্ষক।
মানুষ শব্দের আরবি হল ‘ইনসান‘। ইনসান শব্দটি আরবি ‘নাসিয়ূন‘ উৎস-মূল থেকে সৃষ্টি হয়েছে। যার অর্থ ভুলে যাওয়া বা ভুল হওয়া। সে হিসেবে তার সাদামাটা অর্থ হল, ইনসান এমন সৃষ্টির নাম যে, বারে বারে তার অতীত ভুলে যায়, তার ওয়াদার কথা ভুলে যায়, স্বীয় প্রভুর কথা ভুলে যায়।
আরেক ভাবে যার অর্থ সে বারে বারে ভুল করে। ভুলের উপলব্ধি স্মরণ হলে সে ক্ষমা চায়, লজ্জাবোধ করে। এভাবে সে প্রতিনিয়ত ভুল করে এবং প্রতিনিয়ত ক্ষমা চায়, এ ব্যাপারে তার দুর্বলতা ও অক্ষমতার কথা স্বীকার করে আল্লাহর সাহায্য চায়। সেই প্রকৃত পরিপূর্ণ ইনসান। মানুষ হবার একমাত্র উপাদান এটিই। দাম্ভিক অহঙ্কারীদের দেখতে মানুষের মত লাগলেও, তারা প্রকৃত মানুষ হবার উপাদান থেকে বঞ্চিত হবে এবং সদা আল্লাহর রহম ও দয়া থেকে নিরাশ থাকবে। সদা ইবাদতে মশগুল ইবলিশ এই জায়গায় এসে ব্যর্থ হয়েছিল।
মানুষ কেন কিভাবে ভুল করে ও ভুলে যায় তার একটি কৌতূহলোদ্দীপক লম্বা হাদিস আছে, সে হাদিসের অংশবিশেষ থেকে জানা যায়,
আদম (আ) এর পৃষ্ঠদেশ থেকে সকল মানব সন্তানদের বের করে তার সামনে রাখা হয়। আদম (আ) প্রশ্ন করলেন, এরা কারা? আল্লাহ বললেন, এরা তোমারই সন্তান! আদম (আ) নিজেরটি সহ প্রতিটি সন্তানের বয়স দেখতে পাচ্ছিলেন। সেখানে একটি আলোকিত-উজ্জ্বল সন্তান দেখতে পান, যার বয়স মাত্র চল্লিশ বছর! তিনি প্রশ্ন করলেন, এর নাম কি এবং তার বয়স এত কম কেন? আল্লাহ বললেন, এ হল তোমার সন্তান ‘দাউদ‘, আমি তার জন্য এই সময়টাই বরাদ্দ করেছি। আদম (আ) বললেন, আমার থেকে তার জন্য ষাট বছর বয়স দান করলাম! আল্লাহ বললেন, এটা তোমার তার মধ্যকার ব্যাপার।
দুনিয়াতে আসার পরে আদম (আ) স্বীয় বয়সের হিসাব রাখতেন। একদিন মৃত্যুর ফেরেশতা হাজির। আদম (আ) তাকে দেখে বললেন, এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছ? আমার বয়স তো এক হাজার বছর লিখা আছে। তাঁকে জানানো হল, তা অবশ্যই ঠিক কিন্তু আপনি আপনার বয়স থেকে ষাট বছর আপনার সন্তান দাউদকে দান করেছেন। আদম (আ) এটা অস্বীকার করে বসে। ফলে তাঁর সন্তানদের চরিত্রেও অস্বীকার করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। তিনি নিজের দেওয়া কথা ভুলে গেছেন, তাই তার সন্তানেরাও ভুলে যায়। সেদিন থেকে আদম সন্তানের দিনলিপি লিখে রাখা ও সাক্ষী (ক্বিরামান-কাতিবীন) রাখার ব্যবস্থা করা হয়। (ইব্ন হিব্বান, হাকেম ও আবু আসেম, হাদিসে কুদসি-১২৪)
এসব বিষয় মনে করিয়ে দিতে, আল্লাহ দুনিয়াতে বারে বারে নবী রাসুল পাঠিয়েছেন। মানুষকে সতর্ক ও সচেতন রাখতে আসমানি কিতাব দিয়েছেন। ইতিহাসের বহু ঘটনাকে নিদর্শন হিসেবে সৃষ্টি করে রেখেছেন, যাতে করে বছর ঘুরতে না ঘুরতে এই ইতিহাস জানা-শোনার পুনরাবৃত্তি হয়। মানুষ তার স্মৃতিও স্মরণকে কে তাজা-সতেজ করতে পারে। মানব জীবনে বহু দিনকে আল্লাহ মহিমান্বিত করেছেন, যাতে করে এসব দিনগুলোর প্রভাব মানুষকে নতুন ভাবে উদ্দীপ্ত করতে পারে। হজ্জ, ঈদ, মোহররম সহ নবীদের বিভিন্ন ঘটনার দিন গুলো মানুষের স্মৃতিকে ওয়াদার কথা স্মরণ করাতে সাহায্য করে। এই দিন গুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, …. এবং তাদেরকে মানব ইতিহাসের শিক্ষণীয় ঘটনাবলী শুনিয়ে উপদেশ দাও। ওসব ঘটনাবলীর মধ্যে রয়েছে বিরাট নিদর্শন এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য, যে ধৈর্য ধারণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। সুরা ইব্রাহীম-৫
মানুষ ভুল করবে এটা তার স্বভাব। মানুষ পাপ করবে এটা ভুলের খেসারত। তাই মানুষের উচিত সর্বদা আল্লাহর কাছে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া। আল্লাহ মানুষকে ক্ষমা করে তার স্বীয় মহত্ত্ব দেখিয়ে আনন্দ পায়। যত বড় পাপই হোক, আল্লাহ সেটা ক্ষমা করবেন। মানুষ পাপ করলেও তার একটা সীমানা থাকে কিন্তু আল্লাহর অফুরন্ত দয়ার কোন সীমানা নেই! হাদিসে এসেছে, মানুষ যদি পাপ করতে করতে দুনিয়ার মত ওজনদার করে ফেলে! সে ধরনের পাপ ক্ষমা করার জন্য আল্লাহ দুনিয়া ও মহাকাশের উচ্চতার সমান ক্ষমা ও দয়া নিয়ে হাজির হবেন।
তাই আসুন আমরা প্রতিনিয়ত দোষ স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। রাসুল (আ) এর কোন গুনাহ বা পাপ ছিলনা। তার পরও তিনি তিনি দৈনিক সত্তর বারের অধিক হারে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। কেননা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে মানুষ তার কাছাকাছি হতে পারে, আল্লাহর দৃষ্টিকে নিজের দিকে নিবদ্ধ করা যায়। আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব দৃঢ় করা যায়। একজন ব্যক্তি মানব জীবনকে প্রবল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও আলোকিত করতে পারে শুধুমাত্র ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করার গুন দিয়ে। কেননা ক্ষমা করাটা খোদায়ী গুন।

Discussion about this post