শিশুদের জীবনে উত্তম পরিবেশের প্রভাব আজীবন বিরাজ করে

প্রথমত আমার সেই সব শিশুবন্ধুদের কথা বলি, যারা মসজিদে গিয়ে দুষ্টামী করত। নামাজের কাতারে দাঁড়িয়ে একে অপরের সাথে ঠেলাঠেলি করত। ভদ্র দুষ্টুমির কোনটাই বাকি থাকত না যারা এসব না করে থেকেছে। কখনও শিশুতোষ হাসি ছড়িয়ে পড়ার পর নিজেরা হঠাৎ স্তিমিত হয়ে জানান দিত, বেশী ভুল হয়ে গেছে। ব্যস মুরুব্বীদের বকাঝকার ভয়ে চুপ মেরে যেত। সে সব শিশুরা এখন বুড়ো হয়েছে। তাদের কেউ বাবা-নানা হয়েছে। শিশুকালে মসজিদে গিয়ে দুষ্টামী করলেও এখন তারা পাক্কা মুসল্লি বনে গেছেন। পরবর্তী জীবনেও যে সব শিশুদের দুষ্টামী করতে দেখতাম তারাও পাক্কা নামাজি হয়েছে। এমনটি কোথাও হয়নি শিশু অবস্থায় যে মসজিদে গিয়েছে কিন্তু পরিনত বয়স সে বেনামাজি হয়েছে। যারা অন্যের সন্তানদের দুষ্টামীকে বেয়াদবী মনে করে গোস্বা দেখাত, তার সন্তানেরা কোনদিন নামাজি হয়নি।

আরব বিশ্বে তো বটেই পাশ্চাত্য সমাজেও শিশুদের মসজিদে নিয়ে যাবার প্রভাব লক্ষ্যনীয়। পাশ্চাত্যে যে সব অভিভাবক ধার্মীক; তারা বুঝে, চিন্তে, স্বজ্ঞানে ধার্মীক হয়। এটার উপকার ও না মানার পরিনতি সর্ম্পকে ওরা অনেক সজাগ। সে জন্য পিতা-দাদা ধার্মীক হলে তাদের সন্তানদেরকেও সে ধরনের পরিবেশে নিয়ে যায়। সে পরবিশে তারা যাতে উৎফুল্ল থাকে, সে সবের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকেই। আরব দেশের মসজিদে শিশুদের উপস্থিতি বেশ লক্ষনীয়। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালয়, ইন্দোনেশিয়া সহ পৃথিবীর সকল দেশের ইমানদার মুসলমানেরা ঈদের দিনের মত করে শিশুদের প্রতি শুক্রবারে মসজিদে নিয়ে আসে। মাসুম কন্যারাও হিজাব পড়ে মসজিদে যায়। তারাও বাবার সাথে নামাজে জামায়াতের কাতারে দাড়ায়। পিছনের কোন নামাজীকে দেখিনি এদের পিতাকে ভৎসনা করতে। বরং দেশে রেখে পরিবারের বহু পিতাকে আফসোস করতে দেখেছি, ইশ! যদি আমার পরিবার এখানে থাকত তাহলে নিজ সন্তানকেও মসজিদে নিয়ে আসতাম।
আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে শিশুরা মসজিদের গেলে কিছুটা স্বাধীনতা লাভ করে। মাসয়ালা উল্লেখ করে বুঝিয়ে দেয়া হয়, সকল শিশুরা পিছনের কাতারে যাবে। আমি যখন শিশু ছিলাম তখন পিছনের কাতারে দাড়ালে সেখানে মুরুব্বী গোছের কেউ এলে টেনে তার পিছনের কাতারে স্থান করে দিতেন। নামাজ চলা অবস্থায় এভাবে পিছনে যেতে যেতে মসজিদের দেওয়ালে পিট ঠেকে যেত। অভিভাবক দ্বারা বিতাড়িত শিশুদের শয়তান দারুনভাবে বাগে পেয়ে যায়। তারা তখন নিত্য নতুন দুষ্টমি উদ্ভাবন করে মসজিদে ব্যস্ত থাকে। যদিও এসব শিশুরাও পরে নামাজি হয় কিন্তু যথাযত পদ্ধতি অনুসরন না করার ফলে মসজিদে নামাজের কিছু বিঘ্ন ঘটে তাতে কেও বলে শিশুদের মসজিদে আনা যাবেনা।
আরব দেশে শিশুরা পিতা-ভ্রাতার পাশেই থাকে। তাদের শাসনে থাকে বলে শিশুদের দুষ্টামী চোখে পড়ে না। বরং ধৈর্যশীল শিশু হিসেবে তাকে দেখা যায়। নামাজে সালাম ফিরানোর পরে পাশে বসা মুসল্লী এসব শিশুদের সাথে হ্যান্ডশেক করে, মাথায় হাত বুলায় এতে তারা নিজেদের সম্মানী ও স্পেশাল নামাজী ভাবতে শিখে। পরে এসব শিশুই্ অন্য শিশুদের আদর্শ হয়। নামাজের মধ্যেই পিতা অন্য শিশুকে দেখিয়ে বলে দেখ, ঐ শিশুটি কিভাবে শান্ত হয়ে বসে আছে।
আরব দেশ মুসলমানদের ঐতিহ্য বহন করে। সেখানে শিশুরা পিতার সাথে থেকেই নামাজ শিখে, মসজিদের আদব জানে। যদি আমাদের দেশের মসজিদ গুলোতে পিতাদের এভাবে সুযোগ করে দিত, তাহলে অনেক পিতার সু-সন্তান তৈরীর পথ সুগম হত। অনেক পিতা কারো কথা শুনার ভয়েই সন্তানকে মসজিদে নেয় না। এই পরিবেশ যদি আমরা না বদলাই, তাহলে একদিন মসজিদ থাকবে কিন্তু মুসল্লি থাকবেনা। আর যে সব মুসল্লী আসবে তাদর যথোপুযুক্ত নামাজী শিষ্টাচার থাকবে না। কেননা শিশুকালেই তারা বড়দের দেখে নামাজ শিখতে ব্যর্থ হয়েছিল। শিশুরা, শিশুকালে যে পরিবেশের ছোঁয়া পেয়ে বড় হয়, আজীবন তারই প্রতিনিধিত্ব করে। শিশু অবস্থায় শরম না থাকার কারণে, নির্লজ্জ সবাইকে অনুসরণ করে বলেই সেই শিক্ষাটা সারাজীবন যথাযত হয়ে যায়। এ সময়কে কেন্দ্র করেই তার জীবনের সত্য-মিথ্যা, বিবেক, বিবেচনাবোধ আবর্তিত হতে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *