কলেজ জীবনের এক বন্ধুকে প্রবাসে মিলিওনর হিসেবে চিনতে পারি। কলেজ জীবনে বি,এস,সি তে পড়াকালীন তাকে বি’এ ক্লাসের বন্ধু হিসেবে পেয়ে যাই। জানিনা ছাত্র হিসেবে কেমন ছিল তবে প্রবাসে যখন তার দেখা পাই, তখন তার খ্যাতি মধ্য গগনে। ততদিনে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও বিশাল পরিমাণের অর্থ সম্পদের মালিক বনে যান। কথার তালে প্রায়শই আমেরিকা-কানাডার কথা তার মুখে উচ্চারিত হত।
প্রবাসে আমাদের উভয়ের পারিবারিক সম্পর্ক আগা-গোড়াই বজায় ছিল। সন্তানদের মানুষ করার ব্যাপারে তাকে সর্বদা উদ্বিগ্ন দেখা যেত। সবার সাথে মিশতেন না। এ ব্যাপারে একটু বাচ-বিচারের অভ্যাস ছিল। তার সন্তানেরা যে স্কুলে পড়ে, সে স্কুলের সম পরিমাণ কিংবা আরও দামী স্কুলের ছাত্র না হলে মিশতে চাইতেন না। উল্লেখ্য আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাঝে কম-বেশী সবার নিকট কৃত্রিম ঐতিহ্যের ঠাট দেখানোর প্রবণতা একটু বেশীই দেখেছি। দৃশ্যত এসব কৃত্রিম ঐতিহ্য বংশগত শ্রেষ্ঠত্বের তরে নয়। সবটাই চাকুরীর ধরন, ব্যবসায়ের প্রকৃতি কিংবা ব্যাংক ব্যালেন্সের পরিমাণের সাথেই জড়িত।
যাই হোক উপরে বর্ণিত বন্ধুটির সাথে আমার সবদিকেই ব্যাপক দূরত্ব ছিল। তারপরও কেন জানি তিনি আমার পরিবারের সাথে নিজেই সম্পর্ক রাখতে চাইতেন। সে হিসেবে আমারও তাদের কাছাকাছি হবার সুযোগ ছিল। তাদের বাসা আমার কাছেই ছিল। ফলে নিকটে থেকে তাদের আচরণ, বৈশিষ্ট্য, মনো-চিন্তার ধরণ দেখা ও বুঝার সুযোগ পেয়েছি। অবশ্য বহু পড়ে বুঝেছিলাম কেন তিনি আমাকে তার পছন্দের তালিকায় রাখতেন। আজকের বিষয়টি ভিন্ন বলে সে কথাটি এখানে আনলাম না। তবে সামনের কোন এক লিখায় সেটা আসবে।
তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল যত দামী স্কুল তত উন্নত লেখাপড়া। ফলে প্রতিবছর তার সন্তানদের আরও উন্নত স্কুলে ভর্তি করানোর পেরেশানিতে থাকতেন। অবশেষে তিনি কানাডার সিলেবাসে পরিচালিত একটি নামকরা স্কুলে তার সন্তানদের ভর্তি করিয়ে বুকভরা শান্তি ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। জরুরী ভিত্তিতে আমার পরিবারকে রাত্রে দাওয়াত দিলেন। রাত্রে জনা দশটি পরিবারের ঝাঁক-ঝমক পূর্ণ এই ঘরোয়া দাওয়াতের বিরাট আয়োজন দেখে ভাবলাম অন্তত সওয়াবের আশায় এই দাওয়াতের আয়োজন করা হয়নি!
বেশীক্ষণ লাগেনি তার দাওয়াতের উদ্দেশ্য বুঝতে। তিনি নিজেই পরিষ্কার করলেন, সন্তান দু’টোকে কানাডিয়ান স্কুলে ভর্তি করাতে পেরেছেন। সে উপলক্ষেই আজকের পার্টির আয়োজন। সব মিলিয়ে এক বাচ্চার পিছনে বছরে খরচ আসবে প্রায় পনের হাজার ডলারের মত। আমার গিন্নির চোখে বেকুবি কাজ হলেও, বরাবরের মত আমি একই প্রশ্ন ওনাকেও করে বসলাম, কি কি সুবিধাদি আছে সে স্কুলে?
বুঝলাম, তিনি এ ধরনের একটি প্রশ্নেরই আশা করেছিলেন। কেননা সেখানে বাকি নয় পরিবার শুধু বলতে, জানাতে ও গৌরব দেখাতে অভ্যস্ত। কারটা কে বলবে এটা নিয়েই কদাচিৎ বক্তব্য জট লাগেই। আমি ব্যতিক্রমী শ্রোতা হবার কারণে, এ ধরনের পরিবেশে কাঙ্ক্ষিত জনের বক্তব্য রাখার সুযোগ তৈরি হয়। স্কুলের ধরণ ও বিদ্যা-শিক্ষা নিয়ে আমার জানার আগ্রহ ব্যাপক, তাই আমি সর্বদা সুবিধাটি এভাবে গ্রহণ করতাম। ফলে জানার আশায় প্রশ্ন করলেও, গিন্নি এটাতে বিব্রত-বোধ করেন; কেননা মহিলাদের কেউ কেউ ভাবার সুযোগ নেন, যেহেতু অসমর্থ পিতা হিসেবে ছেলেকে দামী স্কুলে পাঠাতে পারিনি। তাই দামী স্কুলের কথা শুনে হলেও মনের শান্তি জোগানের ব্যর্থ চেষ্টা করি।
বন্ধুবর স্কুলের সুবিধা বর্ণনা অব্যাহত রাখলেন। সকল পড়া স্কুলে পড়িয়ে দিবে এমনকি মুখস্থ করানো, হোম ওয়ার্ক বানিয়ে দেওয়াও স্কুলের দায়িত্বে। স্কুল ম্যানেজমেন্ট ঘরে পড়ানোর কোন টেনশন পিতা-মাতার জন্য রাখেন নি। সন্তানেরা ভিডিও গেইম খেলতে পছন্দ করে, এতে তারা ঘরে বসে মনের সুখে গেইম খেলতে পারবে। পিতা-মাতাও নিজেদের মত করে ঘরের সময় পার করতে পারবে। সব চেয়ে বেশী কাজের কথা হল, সন্তানদের কে সচল ও কার্যকর রাখতে এই স্কুলে আছে নানাবিধ ‘এক্টিভিটিস’ তথা ক্রিয়াকাণ্ড। বহুবিধ এক্টিভিটিসের জন্যই এই স্কুলের এত উচ্চ বেতন। শহরের সবচেয়ে নামী-দামী মানুষের সন্তানেরাই এই স্কুলে পড়তে পারে। বড় হলে তো কানাডাতে বসবাসের সুযোগ আছেই!
স্কুলের এক্টিভিটিস উপকরণ গুলো পাওয়া যায় কিছু নির্দিষ্ট শপিং কমপ্লেক্সে। এসব স্থানে সাধারণ একটি জিনিষের দামও অনেক। ধনীর সন্তানদের জন্য জিনিষ চাই, তাই একটি স্ক্রু-ড্রাইভারের দামও চড়া।
একদা তার সন্তানদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম লেখাপড়া পরবর্তী এক্টিভিটিস গুলোতে কি করানো হয়? জানাল, ডিজিটাল বোর্ডে এলার্ম বাজানো, লাইট জ্বালানোর নিয়ম শিখানো হয়। স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে প্যাঁচানো পেরেক খোলানো হয় আবার তা লাগাতে শিখানো হয়! কাঠে কিভাবে পেরেক মারতে হয়, শসা ও আলুর চামড়া কিভাবে চিলতে হয়, পিয়াজ কিভাবে কাটতে হয়, গ্যাসের চুলায় কিভাবে আগুন ধরাতে হয়, ফুটবল-ভলিবল সহ নানাবিধ খেলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশ্চাত্য বিশ্বে স্কুলের শিক্ষার মধ্যেই জীবনাচরণের সাথে সম্পর্কিত কাজগুলো বিভিন্ন প্রোগ্রামে বিভিন্ন নামে শিক্ষার্থীদের দিয়ে করানো হয়। যাতে করে, জীবন চলার পথে কারো সাহায্যের জন্য নির্ভর করতে না হয়। এটা বিদ্যা শিক্ষারই অংশ এবং একাজে স্কুল একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু উপরে উল্লেখিত স্কুলের কর্মকাণ্ডে এত সব আইটেম, সামান্য সামান্য করে সবই স্কুল সময়ের মধ্যেই সারানো হয়! ক্লাস গুলোকে সংকোচিত করে কিছুটা সময় বের করে, সে সময়ের মধ্যে এক্টিভিটিস তথা চলমান জীবনে প্রয়োজনীয় কিন্তু অনভ্যস্ত কাজ গুলোর দক্ষতা হাতে কলমে দেখিয়ে দেয়। আমাদের দেশের স্কুল পড়ুয়া কৃষকের সন্তানেরা সবাই জন্মগত ভাবে এ কাজে এমনিতেই পারদর্শী। ওদিকে ওরা ধনের গৌরবে সন্তানকে কাজ না করানোর ফলে একটি মামুলী কাজও তারা করতে পারে না।
লাখ লাখ টাকায় বহুবিধ এক্টিভিটিসে বেড়ে উঠা পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছেলেটিকে একদা একটি পার্কে পেয়ে যাই। সে তার বাবাকে বাহাদুরির সাথে কিছু প্রদর্শন করছিল। দেখ বাবা! আমি দুটো ইট বসিয়ে তার উপর দিয়ে এক লাফে পার হতে পারি। তার পিতাকে প্রশ্ন করলাম, পিতা-পুত্রে কিসের আলাপ চলছে? পিতা যথেষ্ট বিব্রত বোধ হলেন এই ভয়ে যে, তার ছেলে যদি লাখ টাকা খরচ করে অর্জিত প্রশিক্ষণের ফলাফল তথা ইটের উপর লাফ দেবার কৃতিত্ব আমাকে দেখিয়ে ফেলে! তাহলে আমি তো বটেই একজন বেকুব মানুষও বুঝে ফেলবে মিলিয়ন টাকার কি এই ফল?
সেই দয়ালু সতিনের কথা মনে পড়ে গেল, যিনি সতীনের ছেলেটিকে কোলে নিয়ে বসে থাকেন, আর নিজের ছেলেকে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে বাধ্য করেন। গ্রামের সবাই বলে, আহা, কত ভাল মহিলা, দুনিয়াতে এমন সতীন কি দ্বিতীয়টি আছে! যে নিজের সন্তানকে মাটিতে বসিয়ে রেখে, সতীনের ছেলেকে কোলে তুলে আদর করে? নিজের সন্তানের প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ না করার জন্য তারই ছোট বোন বারণ করলে, সে প্রত্যুত্তরে জানায়, “এটা সতীনের প্রতি প্রতিশোধ! তার ছেলেকে আদরের নামে কোলে বসিয়ে অকর্মণ্য করে দিবে, আর নিজের ছেলেকে শাস্তি দেবার ছলনায়, সকল কাজে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলবে”। বড় হলে সতীনের ছেলের তুলনায় তার ছেলে অনেক চালাক, বুদ্ধিমান ও কর্মঠ হবে।
উপরে বর্ণিত ঘটনাটি একটি বাবার জীবন থেকে নেওয়া। শত শত বাচ্চা এভাবে তৈরি হচ্ছে। মুখে হয়ত সুন্দর ইংরেজি বলছে কিন্তু নিজেকে রক্ষায় এরা বড় অসহায়! আজকে দেশে বিদেশে সর্বত্র উচ্চ বিদ্যা অর্জনের নামে সন্তানদের অকর্মণ্য করে তোলা হচ্ছে। বিদ্বান অকর্মণ্য সন্তান, পিতা-মাতার মৃত্যুকালেও কোন কাজে আসেনা কেননা সে জানে না কিভাবে সাহায্য করতে হবে কিংবা কারো দিয়ে কাজ আদায় করে নিবে।

Discussion about this post