ছোটকালে অনেক বন্ধু ছিল! তাদের মধ্যে ভালোর চেয়ে দুষ্টের আধিক্যই বেশী। তার মধ্যে আবার তিন জন ছিল যোগ্যতা-দক্ষতায় অতুলনীয়! এক কথায় ‘দুষ্ট-ধাঁচের ত্রি-রত্ম’! ঠগবাজ, ধাপ্পাবাজ, কপট ও ইঁচড়ে পাকা বন্ধুর সান্নিধ্য হলে, জীবনের কি লাভ-লোকসান তার হিসেব করা সহজ হয়। কেননা জীবন চলার আঁকে-বাঁকে, দুষ্ট বন্ধুদের থেকেও যে শিখা যায় এবং নিজের অভিজ্ঞতা ভারী করা যায়; তা অনেকেই সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
তাদের প্রথমজন ছিল প্রবঞ্চক! ঠগ-বাজি করা, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অন্যের টাকায় খেয়ে নেয়া, ওয়াদা খেলাপ করা, এসব ছিল তার নিত্য-নৈমিত্তিক খাসিয়তের অন্যতম। নিজের পকেটের পয়সা বাঁচিয়ে অন্যের পকেটের টাকা শ্রাদ্ধ করতে সে ছিল বেজায় পটু। হর-হামেশা নতুন বাহানা বানিয়ে তার ইচ্ছা চরিতার্থ করত! ঠগবাজ বন্ধুর উপকারিতা
দ্বিতীয়জন ছিল ইঁচড়ে পাকা! বুড়োমি কথায় পারদর্শী। তার বয়সের চেয়ে ভারী তার জ্ঞান! এলাকার বড়দের আচরণ ও কথা রপ্ত করে, ছোটদের নিকট কৌতূহলী ভাষায় প্রকাশ করায় তার জুড়ি ছিল না! সেটার সাথে আরো সাত-পাঁচ মিশিয়ে খবরকে তৈলাক্ত করে ছোটদের কাছে আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপন করত। ফলে ছোটদের কাছে তার ছিল মেলা কদর! বয়স ও অভিজ্ঞতা তাদের চেয়ে কম হবার কারণে, তার বলা সকল কথার মর্মার্থ আমরা কয়েক জন বছর খানেক পরে বুঝতাম! তবুও সবাই তাকে খুব ইজ্জত দিত। আবার তার কথা যারা পরে বুঝে, তার মধ্যে আমি ছিলাম অগ্রগণ্য। এর ফলে নানা উপায়ে আমাকে বরাবর ঠকতেই হত।
তৃতীয়জন ছিল কপট ধাপ্পাবাজ! ছোট ঘটনাকে বড় করিয়ে; আবার ঘটেই নাই এমন কল্পনাকে কাহিনী বানিয়ে রটাতে, তার ছিল বেজায় দক্ষতা। শহরের ওদিকে ছিল তার নানাবাড়ি। আবার নানাবাড়ির সন্নিকটেই ছিল একটা সিনেমা হল। সেই সুবাদে সিনেমা জগতের নতুন কাহিনী জোগাড় করে, বাড়ীতে এসে বন্ধুদের নিকট বানোয়াট গল্প জুড়ে দিত। সে ছিল বন্ধুদের মন মগজ বুঝায় বেজায় পটু। ফলে বন্ধুদের চিন্তা আর তার পকেটের স্বাস্থ্যের সাথে খাপ খাইয়ে, নতুন কাহিনী ফাঁদত। নতুন কথা শোনা কিংবা অভিনব ঘটনা জানার জন্যে বন্ধুরা তাকে মূল্য দিত। এই ফাঁকে বন্ধুদের জমানো টাকাটা বাজারে চায়ের দোকানে বসে চিচিং ফাঁ হয়ে যেত !
এখনও মনে আছে সেই ঘটনাটি! “সওদাগর ছবিতে, সমুদ্রের পানির ধাক্কায় নায়িকা অঞ্জু ঘোষের কাপড় হাঁটু অবধি চলে আসে”। সে এই কথাটিকে পূঁজি করে, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে, চটকদার মসল্লা মিশিয়ে; একে একে গ্রামের সকল ছেলেদেরকে শহরে নিয়ে, অঞ্জু ঘোষের পা দেখিয়ে, সিনেমা দেখার অভ্যাস করিয়েছিল! ঠগবাজ বন্ধুর উপকারিতা
যদিও জমানা এখন বদলে গেছে। বুড়ো নায়িকার পা দেখার জন্য সিনেমা হলে যেতে হয় না। বরং পুরো দেশটাই সিনেমা হল হয়ে গিয়েছে! উল্টো টিন এজ মেয়েরা নিজেদের দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ করতে, ছেলেদের দিকেই শিষ মারে! ঠগবাজ বন্ধুর উপকারিতা
বাল্যকালে উপরোক্ত বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কতবার ঠকেছি, তার হিসাব মেলানো ভার। কদাচিৎ এদের সাহায্য-সহযোগিতা নিতে হত। এতে উপস্থিত ঠকা তো লাগতই অধিকন্তু ভবিষ্যতেও চায়ের দোকানে আরো উত্তম মেহমানদারি হবে, সে ওয়াদাও রেখে আসতে হত! নিজের ঈমান বাঁচাতে ওয়াদা রক্ষার চেষ্টা থাকলেও, তারা বরাবরই তাদের ওয়াদা খেলাপ করে নিজেরা মোনাফেক হয়েও, অন্যদের চা মিষ্টি খাওয়ানোর দেওয়া ওয়াদা পালনের জোড় তাগিদ দিত!
এদের হাতে ঠকতে গিয়ে একদা মনে করতাম, যদি এদের সাথে কোনদিন বন্ধুত্বই না হত, তাহলে কতই না ভাল হত। কদাচিৎ তাদের এড়িয়ে চলতে চাইতাম কিন্তু পারতাম না। কেননা নতুন কথা শোনা, নতুন কিছু জানার সুযোগ রহিত হয়ে যাবে! বাবা-মায়ের ধমক থাকত, এদের সাথে না মেশার জন্য। গ্রামীণ জীবনে এটা সম্ভব নয়, স্কুলে গেলে কিংবা খেলার মাঠে তো সঙ্গী হয়েই যায়! আমার বাবা বন্ধু হিসেবে আমার বন্ধু হিসেবে এমন একজনকে ঠিক করে দিয়েছিল, যার তথ্য ভাণ্ডারের সঞ্চয় ছিল আমার চেয়েও নগণ্য। উল্টো সে তথ্য জানতে আমার উপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে যা হবার তাই হত, যেন গ্রামীণ সেই প্রবাদের মত, ‘যেই লাউ, সেই কদু’।
পরিণত বয়সে বুঝতে পারি, সেই স্মৃতিময় বন্ধুগুলো আমার জীবনের একটি বিরাট উপকার সাধন করেছিল। তাদের ছোট-খাটো ধাপ্পাবাজি, ঠগ-বাজির ঠেলায় বাল্যকালে যত অভিজ্ঞতা হয়েছে; এই অভিজ্ঞতা যদি পূর্বাহ্ণেই অর্জিত না হত, তাহলে পরিণত জীবনে আরো অনেক বেশী মাত্রায় ঠগতে হত! তাদের কল্যাণেই এখন মানুষের আচরণ দেখলে, ঠগ-বাজ দেখলেই চিনি, কারো কথার চাতুর্যতা মুহূর্তেই ধরে ফেলতে পারি! তবুও, সকল গিন্নীর দৃষ্টিতে তাদের স্বামী যেমন গোবেচারা! শুধু ঠকে! আফসোস, আমিও আজ অবধি সেই ক্লাব থেকে বের হতে পারিনি!
এক পিতা আফসোস করে বলেছেন, “আমাদের সন্তানগুলো চার দেওয়ালের মাঝে বড় হচ্ছে। তারা এখনও চোর, ছেঁচড়, ঠগ, শঠ, প্রবঞ্চকের পাল্লায় পড়বে দূরের কথা; তারা আজো চোখেই দেখেনি চোর দেখতে কেমন। এরা জীবনকে উপলব্ধি করতে পারবে না। শিশুকালে সামান্য ঠগে শিখলে পিতার ক্ষতি কম হত। পরিণত বয়সে ঠকলে, বড় আকারে ঠকবে কিন্তু সেটা উত্তরণের রাস্তা পাবেনা”।
মূলত পৃথিবীটা হল একটি শিক্ষার স্থান। এখানে কেউ ‘ঠকে শিখে আবার কেউ ঠকাতে শিখে’।

Discussion about this post