রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা নম্র হও এবং কঠোর হয়ো না। শান্তি দান কর, বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না’। বুখারী-৬১২৫
আজকে ওয়াজ নসিহতের নামে যেভাবে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে তাতে মুসলমানদের মধ্যে ভাতৃঘাতী হানাহানি বেড়ে যাচ্ছে। হালাকু খান যখন ইরাক আক্রমণ করে, তখন ইরাকের মুসলমানদের প্রিয় কাজ ছিল ওয়াজ নসিহতের নামে আলেমদের বাহাস তথা মোনাজেরা উপভোগ করা! এসব বাহাসের শেষ দিকে ঝগড়া বেঁধে যেত। পরে মারামারি খুনোখুনির মাধ্যমে রাত শেষ হত। সকালে শহীদানদের কবরস্ত করে জীবিকার সন্ধানে মানুষ বের হয়ে পড়ত।
সপ্তাহান্তে আরেক বিষয় নিয়ে বাহাসের তারিখ ঠিক হত। আলেমেরা জ্ঞান অন্বেষণ করত মোনাজেরায় জিতার জন্য। যুক্তি তর্ক শিখত প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নিমিত্তে। সরকারী তরফ থেকেও এসব বন্ধ করার জন্য কোন উদ্যোগ নেওয়া হত না। পুলিশ কর্মকর্তা স্টেজে ঘোষণা দিত আপনারা লাঠি-তরবারি নিয়ে ওয়াজ শুনতে আসবেন না। ধৈর্য ধরে ওয়াজ শুনবেন বলে হাত তুলে ওয়াদা করুন। সবাই ওয়াদা করলে বাহাস শুরু হত। অতঃপর হানাহানি-খুনোখুনি!
চার লক্ষ্যের উপরে সেনা মজুদ ছিল মোহতাসিম বিল্লার মুসলিম বাহিনীতে। তখনকার সিরাজ নগরীতেই ছিল প্রায় বিশ লক্ষ মুসলমানদের বাস। কিন্তু সমাজে ছিল আলেমদের দ্বারা সৃষ্ট অনৈক্য ও বিভেদ। শাসকেরা ছিল সামাজিক চিন্তা নিয়ে উদাসীন। মুসলমানদের এই ধরনের অনৈক্যের সমাজে ষাট হাজার আধা উলঙ্গ সৈন্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন হালাকু খান।
লাখে লাখে মুসলমানকে হত্যা করে হালাকু বাহিনী। সে শুক্রবারে জামে মসজিদের সামনে দাড়িয়ে মুসল্লিদের প্রশ্ন করেছিল, তোমরা কাকে ভয় কর? মুসল্লিরা উত্তরে জানায়, আল্লাহর গজবকে। হালাকু বলেন, ‘আমিই সেই আল্লাহর গজব’। সে গজব দেখানো শুরু করেছিল আলেম ওলামাদের দিয়েই! তারপর সরকারী কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রনায়কদের। নারীদের পেট থেকে তলোয়ার দিয়ে শিশু বের করে শূন্যে ছুড়ে দিত, মাটির পড়ার আগে শূন্যেই তরবারি দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে ভ্রণ হত্যা করত। দর্শক হিসেবে দাঁড়াতে হত স্বামী, পিতা ও ভাইদের। বীভৎস উল্লাসে হালাকুর গজব মুসলমানদের উপর পতিত হয় কিন্তু আসমান থেকে প্রত্যাশিত সাহায্য আসেনি! যে সাহায্যের কথা বলে জনগণের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে ইতিপূর্বে মুসলমানেরা বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়েছিল।
লাখে লাখে ভীত-বিহ্বল মুসলমান! শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কিভাবে করবে জানেনা! কিন্তু মোল্লা মৌলবির মোনাজেরায় উত্তেজিত হয়ে, ভাইদের কিভাবে হত্যা করতে হয়, এই হিংস্রতা ঠিকই জানত। বড় দুঃখের বিষয় আজকে বাংলাদেশের আকাশে আমরা তার আলামত দেখতে পাচ্ছি! দিন দিন বাংলাদেশের পরিস্থিতি সেদিকেই মোড় নিচ্ছে। মানুষদের চরিত্র পরিবর্তন করার ওয়াজ নাই, মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে এটাই ছিল আগে দরকার! মানুষকে দায়িত্ববান করার কোন ওয়াজ-নসিহত নাই, যেখানে পুরো জাতির বিরাট অংশ চোর-বাটপারে ভরে যাচ্ছে! অন্যদিকে এক পীরের অনুসারী অন্য-পীরের চামড়া ছিলে নেবার নেশায় মত্ত্ব! এক দল অন্য দলের মাংস থেঁতলানোর কসরতে ব্যস্ত। আমাদের চারিদিকে হালাকুর চেয়েও বেশী বীভৎসতা অপেক্ষা করছে কিন্তু কত জন মুসলমান সচেতন। তাই বিদ্বেষ বাদ দিয়ে ঐক্যের আহবানই এই মুহূর্তে সেরা এবাদত। আসুন আমরা একে অপরের ভাল দিক গুলো নিয়ে অন্তত কাছাকাছি হবার চেষ্টা করি।

Discussion about this post