বদান্যতার গুন একমাত্র মানুষেই দেখাতে পারে। সকল প্রাণীরা স্বভাবগতভাবেই বদান্য। তাদের মুখে ভাষা নাই বলে কদাচিৎ তাদের চোখ দেখে জ্ঞানী মানুষ অনুধাবন করে। মুমিন তুচ্ছ কিছু খেলেও আলহামদুলিল্লাহ বলে অর্থাৎ আল্লাহ তোমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহয় অবিশ্বাসীরা এটা বলে না; এমন কি তাঁর সমালোচনা করে খেলেও আল্লাহ তার গলা চিপে ধরেন না! তার উপর শোধ নেন না। এই ক্ষেত্রে যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল সে বদান্যতা দেখাল! যে করল না সে বদান্যতা প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করল।
বদান্যতার ইহ ও পারলৌকিক দুটি দিক রয়েছে। ব্যাপারটি পরিষ্কার না হলে বুঝা যাবেনা কিভাবে এটা সকল গুনের সেরা!
মানুষ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা পেতে কখনও কারো নির্ভর করতে হয়। পিতা-মাতা সন্তানের দায়িত্ব নেবার পরও কখনও বড় ভাই-বোন, চাচা, মামা, দুলাভাই, খালু, শিক্ষক কিংবা অনাহুত ব্যক্তির সহযোগিতা দরকার হয়। এই উপকারিতা পেয়ে কেউ অনেক উচ্চাসনে সমাসীন হয়; যদি সে ব্যক্তি চতুর, দক্ষ ও যোগ্য হয়। বেশীর ভাগ সময় উপকার গ্রহণকারী ব্যক্তি, শানে-মানে, ধনে-জনে উপকারীর চেয়েও সেরা হয়ে যায়। দুনিয়ার ইতিহাসে এ ধরনের উপমাই সবচেয়ে বেশী।
এক্ষেত্রে যিনি উপকার করেছেন, তার চরিত্র যদি এমন হয়; তিনি তার অবদানের জন্য খোঁটা দিবেন না, তার সন্তানদেরকে এসব কথা বলে তাকে হেয় করার অভিপ্রায় দেখাবেন না। বরং সন্তানদের তার জীবনে থেকে শিক্ষা নেওয়া ও উদাহরণ গ্রহণের জন্য অনুপ্রাণিত করবেন। ঘুণাক্ষরেও এ কথাটি তুলে আনবে না যে, তিনি জীবনের কোন একদিন তাকে বহু উপরে উঠতে সহযোগিতা করেছিলেন। উপকারী মানুষের এই চরিত্রের নামই হল ‘বদান্যতা’। মানবজীবনে এই যোগ্যতা অর্জন যেমনি কঠিন তেমনি বিপুল ধৈর্য শক্তির দরকার হয়।
অন্যদিকে যিনি উপকৃত হয়েছিলেন, তিনিও মনে রাখবেন না যে, এই ইনি একদা আমার বড় উপকারে এসেছিলেন। তাই তার দায় শোধ কিংবা উপকারের প্রতিদান দেওয়াটা দরকার! এই ভাবনা-চিন্তা নিয়ে উপকারীর জন্য কিছু করতে পারাকেও বদান্যতা বলেনা। এটাকে বলা হয় প্রতিদান! উপকারীকে সাধ্যমত এমন আন্তরিক প্রীতি, স্নেহ-সম্মান দেখাতে হবে যাতে করে তিনি বুঝতে পারেন এটা নিখাদ ভাল বাসার জন্যই করেছে, তখন এটাও হয়ে যাবে বদান্যতা। রাসুল (সাঃ) এর আজীবনের দু’জন ভৃত্য যথাক্রমে জায়েদ ও আনাস (রাঃ) ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন; তাঁরা বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন কিন্তু কোন দিনই বলেন নাই নবী (সাঃ) কখনও মুনিব সুলভ আচরণ করেছেন। এটাই প্রকৃত বদান্যতা।
এই দুই বদান্যতার মধ্যে উপরের টিই হল সবচেয়ে বড়। সে জন্য আল্লাহ কোরআনে আয়াত নাজিল করে ঘোষণা দিয়েছেন, তোমরা উপকার করে খোটা দিওনা…….. প্রয়োজনে চুপ থাক। সুতরাং বুঝা গেল উপকার করে যে দেখিয়ে না দেওয়া, ঘোষণা না করা, খোঁটা না দেওয়া, সুবিধা আদায় না করার নামই প্রকৃত বদান্যতা।
মহান আল্লাহ বদান্যতার চরিত্রই দিয়েই ঘেরাও থাকে। তাই তিনি যখন কাউকে খাওয়ায়, পড়ায়, সুখে রাখে; তাই তিনি বদান্যতার কারণেই অকৃতজ্ঞ মানুষের বিরুদ্ধে শোধ নেন না কিংবা তাকে দুনিয়াতে অ-সম্মানী করেন না। অন্যদিকে যারা আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, সঙ্গত কারণে তারা সর্বদা আল্লাহর দৃষ্টিতে থাকে। তিনি এসব দেখতে থাকেন, হিসাব রাখতে থাকেন এবং উচ্চ মূল্য দিয়ে থাকেন। ফলে, দুনিয়াতে এসব ব্যক্তি হয় বড় মর্যাদাবান ও সম্মানী। আর আখেরাতে তার জন্য তো আল্লাহ আছেনই।

Discussion about this post