ভাষা আল্লাহর দান! কথাটি সবাই বলে। যদি ব্যাখা করতে বলা হয় তবে অনেক জ্ঞানী মানুষও বেকায়দায় পড়ে যাবে। কারণ সম্যক জ্ঞানের অভাব! তাই প্রতিটি মানুষকে এই বিষয়টি অবশ্যই জানা থাকা দরকার। মানুষ বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে, মনের ভাব প্রকাশ করে। বোবা লোকের নিজস্ব ভাষা আছে কিন্তু অক্ষর জ্ঞানী মানুষ তা বুঝে না। শিশুর ভাষা শিশুরা ঠিকই বুঝে। যদিও বড়দের নিকট তা অর্থহীন ও কৌতুক প্রদ। অবুঝ প্রাণী মানুষের চোখ দেখে মানুষের মনের ভাষা বুঝে নেয়। এটা থেকে বুঝা যায়, আমরা যে ভাষায় কথা বলি সেটাই আসল ভাষা নয়। ভাষার পিছনেই লুকিয়ে থাকে, নাম না জানা আরো অনেক ভাষা। আল্লাহ এটাকে লক্ষ্য করে বলেছেন,
তাঁর নিদর্শনা বলীর মধ্যে রয়েছে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের পার্থক্য! অবশ্যই তাঁর মধ্যে রয়েছে চিন্তাশীল জ্ঞানীদের জন্য বহু নিদর্শন। সুরা রূম-২২
লক্ষ্য করুন, আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির পরেই আল্লাহ ভাষা ও বর্ণের কথা টেনেছেন। সাধারণ মানুষের নিকট ভাষা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কিছু নজরে পড়েনা কিন্তু আল্লাহ বলেছেন এটার অন্তনিহিত রহস্য উৎঘাটন করতে গেলে চিন্তাশীল ধী-শক্তি সম্পন্ন মানুষের গবেষণায় লেগে থাকতে হবে! তবেই মানুষ বুঝতে পারবে, মহান স্রষ্টার কি ধরনের কারিগরি জ্ঞান এতে ধাপে ধাপে লুকিয়ে আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা সম্পর্কিত দুটো বিভাগ রয়েছে একটি হল ‘বাংলা’ অন্যটি ‘ভাষা বিজ্ঞান’। বাংলা সাহিত্য ও ভাষা বিজ্ঞান বিষয় দুটোর পার্থক্য ব্যাপক। এখানেও লক্ষ্য করুন ভাষা কে বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। ভাষা বিজ্ঞান বিষয়টি খুবই জটিল ও দূরহ। কখনও ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং এর চেয়েও কঠিন। যথেষ্ট অধ্যবসায়ী ও গবেষণার মনোবৃত্তি না থাকলে এই বিষয়টি ছাত্রদেরকে পাগল করে ছাড়বে। ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ ও ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষার দুজন বিখ্যাত পণ্ডিত। যারা জগত জোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এই ভাষা বিজ্ঞানে গবেষণা করার কারণেই।
যাই হোক ভাষার মধ্যে আল্লাহর নিদর্শন কি, তার একটি সংক্ষিপ্ত সারাংশ পাঠকের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করব। ময়না, তোতা দু’একটি লাইন কথা বলতে পারলে, তার কদর সন্তানের মত হয়ে যায়। যার বাজার দরও অনেক। সে শিশুকালে মানুষের সাথে থাকার কারণে দুই একটি কথার প্রতি মনোনিবেশ করেছিল, তাই সে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। সকল পাখি এটা করতে পারেনা! নতুবা হাঁস-মুরগীও কাদচিৎ কথা বলা শুরু করত।
এই কথা বলতে পারার জন্য লাগে আল্লাহ প্রদত্ত কিছু উপাদান। যেমন, পাতলা লিকলিকে মোচড়ানো উপযোগী একটি জিহ্বা। প্রতি সেকেণ্ডে কম্পন সৃষ্টি করতে পারে এমন এক জোড়া ঠোট! বাতাসকে শক্ত করে আবদ্ধ করার মত একটি মুখ গহ্বর। উন্মুক্ত গলনালি এবং নাসিকা দিয়ে কম্পন যুক্ত শব্দ বের করার মত সুযোগ সম্বলিত ছিদ্র! জিহ্বা বেঁটে, লম্বা, পুরু হলে তো নয়ই; পুরো মুখের সর্বত্র দখলে রাখার মত আকৃতি হতে হবে। তাহলে যথাযথ উচ্চারণ করা যাবে। কথা এখানে শেষ নয়, শব্দ উচ্চারণের জন্য মাথার সাথে সংযুক্ত আরো মেকানিজমের দরকার তার চেয়েও বেশী দরকার শোনার ক্ষমতা সম্পন্ন কান।
পাঠকেরা নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন, কথা বলার শুরুতে শিশুরা দাদা, বাবা, মা বলে শব্দ উচ্চারণ করে। অনেকে মনে করে যে, শিশু কথা বলতে শুরু করেছে। মোটেও ঠিক কথা নয়! এটি তার ধাপ মাত্র, উক্ত শব্দগুলো উচ্চারণ করার জন্য সে, তারও অনেক আগে থেকেই প্রচেষ্টা করে যাচ্ছিল। মা-বাবার সাহায্য ব্যতীত এভাবে উচ্চারণ প্রচেষ্টার জন্য তার পিছনে কেউ কাজ করে যাচ্ছিল; সেটাই হল মূল বক্তব্য।
মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ব্যস্ত ব্যক্তির নাম ‘শিশু’! সে ঘুম থেকে উঠে আবারো ঘুমে যাবার আগ পর্যন্ত সর্বক্ষণ কাজে ব্যস্ত থাকে! সে জন্যই সে হয়রান হয়, শু’তে গেলেই ঘুমিয়ে পড়ে! প্রশ্ন হবে, কি তার কাজ? তার প্রথম কাজ হল, এই ভাষা শিক্ষার কাজ। মানুষ দেখতে পায়, শিশু একমনে একটি খেলনাকে কেন্দ্র করেই খেলছে। অর্থাৎ সে একটি কাজে ব্যস্ত। মূলত সে মন দিয়ে বড়দের কথা শুনছে! পাখিদের গান, বিড়াল-কুকুরের ডাক অনুধাবন করছে। আর এই ফাঁকে সে শব্দ উচ্চারণের জন্য একনিষ্ঠতার সাথে ভেবে চলছে! এই কাজে কেউ একজন তাকে ধাপে ধাপে, ধীরে-ধীরে সহযোগিতাও করে যাচ্ছে। সে জন আর কেউ নয়। আল্লাহর বাছাই করা ফেরেশতারাই এই কাজে নিয়োজিত! সে জন্য তার চোখ একদিকে, মনোনিবেশ অন্যদিকে আর চিন্তায় থাকে ভিন্ন কিছু। শিশুর এই চরিত্র পিতা-মাত-দাদা-দাদী ভিন্ন ভাবেই উপভোগ করে।
পাঠকেরা দেখে থাকবেন, শিশুরা গাড়ী চালাবার মত শব্দ উচ্চারণ ভ্রো-র-র-র করে থাকে, এটা তার ঠোটের কসরত। আবার কখনও ড্রি-র-র-র করে চলছে। বড়রা মনে করে সে গাড়ী কিংবা ইঞ্জিন চালাচ্ছে। মোটেও না! এ গুলো হল শিশু শব্দ উচ্চারণের জন্য শারীরিক অনুশীলন করছে।
বোবা ছেলে এসব শব্দ উচ্চারণ করেনা, যেহেতু সে কানে শুনে না তাই তার অনুশীলনও বন্ধ থাকে। শিশু মুখের গভীর অনুশীলনের মাধ্যমে, তার মুখ যে কোন ধরণের কঠিন-জটিল উচ্চারণের জন্য উপযোগী হয়ে উঠে। তাকে যা শিখানো হবে, তাই সে শিখবে হুবহু করতেও পারবে। পরবর্তীতে পরিণত বয়সে পরিবেশ, পরিস্থিতি, ভৌগলিক অবস্থা, জলবায়ুর তারতম্য এবং স্বীয় মাতৃভাষার সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ হয়ে অনেক শব্দ ইচ্ছা করলেও উচ্চারণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনা। যেমন, আরবিরা বাংলা ‘প’ উচ্চারণ করতে পারেনা তাই তার উচ্চারণ ‘ব’ দিয়ে করে। পারসিকেরা ‘স’ এর উচ্চারণ ‘হ’ দিয়ে করে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড, জাপান পর্যন্ত ঐ সীমারেখার কিছু আদি মানুষ ‘র’ এর উচ্চারণ ‘ল’ দিয়ে করে!
পৃথিবীর কোন প্রাণী কথা বলতে পারে না; একমাত্র মানুষ ছাড়া। মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য, আল্লাহ এই ক্ষমতা তাঁর কুদরতি শক্তির মাধ্যমে মানুষকে পাইয়ে দিয়েছেন। কথা বলতে পারার জন্য মানুষের কোন প্রচেষ্টা ছিলনা। এখানে তার কোন কৃতিত্ব নাই। আল্লাহ বড় করুণা করে, রহম করে তাঁর বান্দাকে এটা দান করেছেন। সেই দৃষ্টিতে ভাষা আল্লাহর দান। মূলত আল্লাহ মানুষকে কথা বলার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়েছেন এই জন্যই যে, তারা অবিরত আল্লাহর পবিত্রতা, কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা করবে। কিন্তু মানুষ তা করেনা, তাই মানুষকে বড় অকৃতজ্ঞ বলেছেন। প্রশংসা করতে না পারলে চুপ থাকতে বলেছে। কিন্তু মানুষ চুপ থাকেনা বরং এই ভাষার অস্ত্র দিয়েই, এক মানুষ অন্য মানুষকে আহত করছে। পুরো মানব সভ্যতাকে জিঘাংসা আর হানাহানি দিয়ে ভরিয়ে রেখেছে।


Discussion about this post