পৃথিবীতে নববর্ষ পালনের রীতি-নীতি প্রথম শুরু হয় ইরান থেকে। ইরানে নববর্ষকে নওরোজ তথা নতুন দিন, নতুন বছর হিসেবে চিত্রিত করা হয়। নওরোজের প্রথা চালু করে পারস্যের জেন্দাবেস্তা ধর্মের অনুসারী অগ্নি উপাসক তথা ‘মাজুসীরা’। অগ্নি উপাসকের মতে খৃষ্টপূর্ব ৮০০ সালে পরাক্রমশালী সম্রাট জামশীদ এই নওরোজের প্রচলন করেন। সে থেকে পারস্যে হাজার বছর ধরে এ অনুষ্ঠান তাদের জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান, ভারত, মধ্য এশিয়ায় এখনও নওরোজ দিবসকে জাতীয় শ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পিছনের ইতিহাস:
মোগল সম্রাট বাবরের ছেলে হুমায়ুন (১৫৫৬ খৃ) শের শাহের হাতে ক্ষমতা হারিয়ে দিল্লী থেকে পালিয়ে ইরানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে হারানো ক্ষমতা উদ্ধারের জন্য ইরানের বাদশাহ সৈন্য-সামন্ত দিয়ে হুমায়ুনকে সাহায্য করেন। হুমায়ুন দিল্লীর ক্ষমতা ফিরে পান। ইরানীদের প্রতি বদান্যতার নজীর হিসেবে, হুমায়ুন তাদেরকে দলে দলে মোগল ভারতে বরণ করে নেন। এই সুযোগে মোগল সাম্রাজ্যের রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে ইরানীরা ঢুকে পড়ে। এমনকি মোগলেরা ফার্সি ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে নিজেদের জন্য ধারণ করে। ফার্সিদের প্রভাব এতটুকু ছিল যে, মোগলেরা ফার্সি ভাষা শিখেই ভারতের শাসনকার্য পরিচালনা করত। ওদিকে মুসলমানেরা নিজেদের মূল ঐতিহ্য হারিয়ে বসে। রাষ্ট্রীয় অনুশাসনের ফলে, মুসলিম সমাজে নতুন নতুন প্রথা ঢুকে পড়ে। পীর, দরবেশ, সুফি-সাধক, মাজার, ওরসের মত ঐতিহ্য ফার্সিদেরই সৃষ্টি। মুসলমানেরা আজো এসবকে ইসলামী ঐতিহ্য ভেবে শ্রদ্ধার সহিত পালন করে। মোগলেরা নামে মুসলমান হলেও, হিন্দু সংস্কৃতি আর আত্মীয়তায় উভয়েই একাকার হয়ে গিয়েছিল। সম্রাট আকবর তো হিন্দু-মুসলমানে বিয়ে প্রথাকে আইনে পরিণত করেছিল। এই মোগলদের হাত ধরেই নওরোজ তথা নব বর্ষ পালনের নতুন ধারা ভারতীয় উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে। আগ্রা ও দিল্লীতে রাষ্ট্রীয় ভোজ, সর্বসাধারণের জন্য মেলা, ক্রীড়া, রাত্রে বাতি জালানো উৎসব পালন হত। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বাদশাহের সাথে মিলিত হবার সুযোগ পেতেন। রাষ্ট্রীয় পরিচর্যায় মোগল আমলে এই উৎসবে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে দলে দলে যোগ দিত।
এভাবেই ইরানী নববর্ষ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে জনগণের চিত্তের মূলে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। কিছু ধান্ধা-বাজ ব্যবসায়ী, নববর্ষকে অর্থ-কড়ি কামানোর মাধ্যম বানিয়ে নেয়! তারা নিজেদের নববর্ষকে ইরানী নববর্ষের মত করে ঘটা করে সাজিয়ে নেয়। এটারই প্রভাব পড়েছে খৃষ্টীয় এবং বাংলা নববর্ষের রীতি নীতিতে। বর্তমানে বাংলা নববর্ষের নামে যা উৎযাপন হয়, তা হুবহু ইরানী নওরোজেরই প্রতিফলন। এই নওরোজের সাথে কোন ধর্মেরই সম্পর্ক নাই। ত্রিশ বছর আগেও খৃষ্টীয় নববর্ষ বর্তমানের মত করে পালিত হতনা। আর বাংলা নববর্ষে তো এসব হতই না।
বিশ্বাসী মুসলমানেরা ঐতিহ্য গত ভাবেই, অশালীন, অসুন্দরকে পরিহার করে চলে। ফলে বাংলা নববর্ষের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক তৈরি হয়নি, বরং উপেক্ষা করেই চলে। এমনকি মুসলমানদের ইসলাম ধর্মীয় নববর্ষ, হিজরি সনকেও তারা ঘটা করে পালন করেনা। কালক্রমে বিরাট শূন্যতার কারণে, বাংলা নববর্ষ পালন, এক প্রকার ধান্ধা-বাজ ব্যবসায়িক দের কবলে চলে যায়। ব্যবসায়ের নামে তারা যা সৃষ্টি করে, পরবর্তীতে সেটাকে দেশের গ্রহণীয় সংস্কৃতি হিসেবে বলতে থাকে। প্রথমে লোকাল সংস্কৃতি বলা হত, পরে বাঙ্গালী সংস্কৃতি, এখন বলা হচ্ছে জাতীয় সংস্কৃতি! আজ বাংলাদেশে তাই হচ্ছে। যাক আমার বক্তব্যের বিষয় কিন্তু নববর্ষ উৎযাপনের রীতি নীতি নিয়ে।
ইরানে নববর্ষ বা নওরোজ পালনকে তাদের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়ভাবে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। নওরোজকে তারা ঈদে নওরোজ বলে এবং এটা পালনে দেশে লম্বা ছুটি থাকে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে ইরানী দূতাবাসগুলো এই দিনটিকে ঘটা করে পালন করে। আশ্চর্যের বিষয়, মুসলমানদের দুই ঈদের চেয়েও ইরানের নওরোজ বেশী আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে পালিত হয়।
জরথুস্ত বা মাজুসীদের সৃষ্ট নববর্ষের এই আয়োজনে মানুষ মদ পান, জুয়া সহ নানা অসামাজিক কার্যক্রমে জড়িতে পড়ত। ধনীরা অর্থ ব্যয় করত, তরুণেরা উদ্দীপ্ত হত। অনুষ্ঠান গুলো যখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছিল, তখন সমাজের একটি বড় অংশ এতে আগ্রহী হল। হিন্দুরাও এই অনুষ্ঠানকে নিজেদের মত করে সাজিয়ে নেয়। নওরোজকে ঘিরে ঘট পূজা, গণেশ পূজার জন্য পৃথক ব্যবস্থাই করে ফেলে। হিন্দুরা যেভাবে এই উৎসবে অংশ গ্রহণ করেছে, আবার নিজেদের মত করে এই উৎসবকে ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যস্ত রেখেছে। যার উপস্থিতি আজ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই। মুসলমানেরা এসব থেকে দূরে থেকেছে, উপরন্তু এটাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করার কারণে, তাদের থেকে নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে গেছে।
শাসন ব্যবস্থায় প্রকৃত মুসলমানদের কোন প্রতিনিধিত্ব ছিলনা বরং অনীহা ছিল। আলেমেরা এই উৎসবকে না নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, না মানুষদের ধর্মীয় উৎসাহ সৃষ্টি করে এসব থেকে দূরে রাখতে পেরেছে। বরং তারা এটাকে কঠোরতার সাথে হারাম ঘোষণা করে নিজেরা মাঠ থেকে কেটে পড়েছে। ফলে অন্যদের খালি মাঠ দখল করা সহজ হয়েছে। সেই খালি মাঠ দখল করে উল্টো তারাই বলছে, ‘ওরা সাম্প্রদায়িক’! বিখ্যাত হানাফি ফকিহ ইমাম ‘আবু হাফস (রহঃ) তো এই মর্মে ফতোয়াই জারি করেছেন যে, “যদি কেউ নওরোজ উপলক্ষে একটি ডিমও দান করে তবে তার ৫০ বছরের আমল বরবাদ হয়ে যাবে।” এত কঠোরতার পরও মানুষকে এই পথ থেকে ফিরানো যায় নি।
চিত্ত-বিনোদনের অপসংস্কৃতিকে শুধুমাত্র বিরোধিতা করে বন্ধ করা যায় না। পৃথিবীতে কোথাও কখনও কেউ পারে নি। সেটার জন্য দরকার মানুষের মনের পরিবর্তন সাধন। কিছু মানুষের মনে ঘৃণা ঢুকিয়ে দিয়েও এটার পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। যদি না রাষ্ট্র ও সরকার দ্বারা এসব কাজকে নিয়ন্ত্রণ করানো না হয়। নিকট অতীতের যতগুলো সরকার দেশে এসেছে, তাদের কথাবার্তায় বুঝা গেছে যে, বাংলা নববর্ষ মানেই তরুণ তরুণীদের উচ্ছলতা। বর্তমানে তো বলাই হচ্ছে, এটা একটা ভিন্ন ধর্মেরই নিজস্ব বার্তা বহন করে। পচন তো মাথায় শুরু হয়েছে। প্রায় সকল ধার্মিক মুসলমানদের লক্ষ্য করেই বলা হয়, ওরাই সাম্প্রদায়িক। যদিও এটা আবিষ্কারের আসল হর্তা-কর্তা তারাই।
পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে ১৯৬৭ সাল থেকেই ছায়ানট একাজে ভূমিকা রাখতে শুরু করে। পাক সরকার বাধা দেয়, মতলব বাজেরা পাকিস্তানীদের বাধাকে ইসলামের নামে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়। পরবর্তীতে সেটা ইসলাম ও মুসলমানদের কষে গালি দেবার এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯৮৯ সাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইউনিটের ছাত্র-ছাত্রীরা ঘটা করে বাঁশ-বেতের ভুত-পেঁচার মুখোশ সহ নানাবিধ সংস্কৃতির প্রবেশ ঘটায়। যদিও এটার সাথে অতীতের বাংলা নববর্ষ পালনের কোনই সম্পর্ক নাই। এই দিনটাকে তাদের কর্ম-প্রদর্শনীর জন্য বাছাই করে নিয়েছিল। এর আগে এসব হতোনা। চৈত্র সংক্রান্তিতে হিন্দুরা পান্তা ভাত, মরিচ পোড়া, আলু ভর্তা, পিয়াজ দিয়ে ভাত খেত। এটা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ছিল। ওদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা এই দিনটিকে সামনে রেখে এক সপ্তাহ আগে থেকেই নাওয়া, খাওয়া, ঘুম ছেড়ে রাত দিন কাজে লেগে যেত। পহেলা বৈশাখের পুরো রাত রাস্তায় আলপনা আঁকত। সকালের খালি পেটে তারা পান্তা-ইলিশ খেয়ে শরীরে চাঙ্গা ভাব ফিরিয়ে আনত। তখনকার দিনে ইলিশের এত দাম ছিলনা, প্রায় সব মৌসুমে পাওয়া যেত। ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত আসলেই মজাদার। এটার সুযোগ গ্রহণ করে ব্যবসায়ীরা। দৃশ্যত বর্তমান পৃথিবীর বেশীর ভাগ আনন্দ-বিনোদনের অনুষ্ঠান গুলোতে ব্যবসায়ীরা অর্থ লগ্নি করে থাকে। তারাই অনুষ্ঠান বানায়, তারাই এক একটি আইটেম বানিয়ে এড দেয়। তরুণ প্রজন্মকে আগ্রহী করতে মডেল-তারকাদের দিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালায়। এতে দলে দলে দিকভ্রান্ত তরুণ, যুবক পঙ্গপালের মত নিজেদেরকে সেখানে মেলে ধরে।
নববর্ষ উৎযাপনের রীতিতে আজ আর কোন নিদ্দিষ্ঠ ফর্ম নেই! হিন্দুদের হোলী খেলা আজ মুসলমান ছেলেরা দখল করেছে। এসব গুলোর পিছনে ব্যবসায়ীদের একটি ধান্ধা-বাজি চাঙ্গা থাকে আর তরুণদের পকেট খালির মাধ্যমে চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা হয়।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছেন! এখানে আরো চমক থাকে। সরকার গুলো ভাবে, যুবকদের মাতোয়ারা করে রাখো। তারাই তো ভোটের আঞ্জাম দেবে। তাই তাদের হতাশ করোনা। আর ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে আশ্বস্ত করতে, প্রশাসন কিছু কঠোর দিক নির্দেশনা দিবে। চৌকশ কর্তারা ভালই বুঝে; গায়ে গণ্ডারের চামড়া লাগিয়ে, কোনমতে এক তারিখের রাত টা পার করতে পারলে হয়, হুজুরেরা অন্তত এক বছরের জন্য মুখ বন্ধ রাখবে। এই বুদ্ধিতে দুই কুল রক্ষা হয়।

Discussion about this post