Tipu vai
  • মুলপাতা
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • কোরআন
    • হাদিস
    • ডায়েরি
    • জীবনী
  • সাহিত্য
    • গল্প
    • রচনা
    • প্রবন্ধ
    • রম্য রচনা
    • সামাজিক
  • পরিবেশ
    • উদ্ভিদ জগত
    • প্রাণী জগত
    • ভেষজ হার্বাল
    • জলবায়ু
  • শিক্ষা
    • প্রাতিষ্ঠানিক
    • মৌলিক
    • ইতিহাস
    • বিজ্ঞান
    • ভ্রমণ
    • শিশু-কিশোর
  • বিবিধ
    • ঘরে-বাইরে
    • জীবন বৈচিত্র্য
    • প্রতিবেদন
    • রাজনীতি
    • তথ্যকণিকা
  • লেখক পরিচিতি
No Result
View All Result
নজরুল ইসলাম টিপু
  • মুলপাতা
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • কোরআন
    • হাদিস
    • ডায়েরি
    • জীবনী
  • সাহিত্য
    • গল্প
    • রচনা
    • প্রবন্ধ
    • রম্য রচনা
    • সামাজিক
  • পরিবেশ
    • উদ্ভিদ জগত
    • প্রাণী জগত
    • ভেষজ হার্বাল
    • জলবায়ু
  • শিক্ষা
    • প্রাতিষ্ঠানিক
    • মৌলিক
    • ইতিহাস
    • বিজ্ঞান
    • ভ্রমণ
    • শিশু-কিশোর
  • বিবিধ
    • ঘরে-বাইরে
    • জীবন বৈচিত্র্য
    • প্রতিবেদন
    • রাজনীতি
    • তথ্যকণিকা
  • লেখক পরিচিতি
No Result
View All Result
নজরুল ইসলাম টিপু
No Result
View All Result

ইমাম মালেক বিন আনাস আছবাহী (রহঃ)

আগস্ট ৬, ২০২০
in জীবনী
9 min read
0
ইমাম মালিক
শেয়ার করুন
        

মালেক বিন আনাস এর বংশ পরম্পরা

ইমামে দারুল হিজরত আবু আব্দিল্লাহ ইমাম মালেক বিন আনাস বিন মালেক বিন আবু আমের নাফে’ বিন আমর বিন হারেছ বিন উছমান বিন জুছায়েল বিন আমর বিন হারেছ যূ-আছবাহ আল আছবাহী আল হিমইয়ারী আল মাদানী (রহঃ)। কেউ কেউ উছমানের স্থানে গায়মান উল্লেখ করেছেন। তাঁর বংশ ইয়ামানের প্রসিদ্ধ গোত্র হিমইয়ার বিন সাবার সাথে মিলিত হয়; যার সম্পর্ক ছিল ইয়ারব বিন কাহতানের সাথে।

 

ইমাম সাহেবের পিতামহ মালেক বিন আবু আমের নাফে ইয়ামানের একটি এলাকায় ছদকা এবং যাকাত আদায়ের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কোন কোন হাকেমের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মদীনা মুনাওয়ারায় চলে আসেন এবং কোরাইশ বংশের শাখা বনী তামীম বিন মুররার সাথে সম্পর্ক এবং বন্ধুত্ব স্থাপন করে তাদের সঙ্গে বাস করতে থাকেন।

 

বনু তামীমের সাথে বন্ধুত্ব

ইমাম সাহেবের পিতৃব্য আবু সহল বলেন, আমরা শূ-আছবাহ গোত্রের লোক। আমাদের পিতামহ মদীনায় এসে বনী তামীমে বিবাহ করেন। এজন্য আমরা সেদিকে সম্পর্কিত হই। এ সম্পর্ক এবং বন্ধুত্ব ছিল তালহা বিন উবাইদুল্লাহ তায়মীর ভাই হযরত উছমান বিন উবাইদুল্লাহ তায়মীর সাথে।

 

ইমাম সাহেবের মাতার নাম ছিল আলীয়া। ইনি ছিলেন শরীফ বিন আব্দির রহমান বিন শরীকের ছাহেবজাদী। কাযী আব্দুর রহমান তায়মী বলেন, ইমাম মালেক ছিলেন হিমইয়ার গোত্রের। তাদের এবং আমাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। অবশ্য তার মাতা ছিলেন আমার পিতৃব্য উছমান বিন উবাইদুল্লাহর বাঁদী।

 

আবু আমের নাফে’ বিন আমর ছাহাবী ছিলেন। বদরের যুদ্ধ ছাড়া অন্যান্য সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন। মালেক বিন আবি আমের ছিলেন বিশিষ্ট তাবেঈদের মধ্যে গন্য, তিনি অভিজ্ঞ আলেম এবং বুযুর্গ ছিলেন। কয়েকজন ছাহাবী থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। তিনি নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিছ ছিলেন। তাঁর চারজন ছাহেবজাদা ছিলেন। আনাস, উয়াইস, আবু সহল নাফে এবং রবী। এদের প্রত্যেকেই তার থেকে হাদীছ বর্ণনা করেন। সম্ভবতঃ আনাস ছিলেন সবার বড়। এ কারণে তার কুনিয়াত ছিল আবু আনাস। চার ভাইয়ের প্রত্যেকেই তৎকালীন উলামা এবং মুহাদ্দিছদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। ইমাম সাহেবের পিতা থেকে তার দুই পুত্র মালেক ও মুহাম্মদ বিন শিহাব যুহরী হাদীছ রেওয়ায়েত করেন।

 

বাসস্থান

মদীনা মুনাওয়ারা হতে কয়েক মাইল দূরে আকীক নামক উপত্যকা। ওখানেই ছিল ‘জুরুফ’ নামক প্রসিদ্ধ নিম্নভূমি। ওখানে চাষোপযোগী জমি এবং বাগান ছিল। সেখানেই ছিল হযরত উমর (রাঃ)-এর জায়গীর। এ স্থানটি সবুজ-শ্যামল হওয়ার কারণে বড়ই আর্কষণীয় ছিল। ঐ এলাকাতেই ছিল ইমাম সাহেবের পিতার সুরম্য প্রাসাদ, যা কছবুল মুকআদ নামে পরিচিত ছিল। কাযী ‘আয়ায লিখেন,

 

“ইমাম মালেকের পিতা আনাস মুকআদ ছিলেন। জুরুফে তার একটি প্রাসাদ ছিল। তা কছরুল মুকআদ নামে পরিচিত ছিল।”

 

মুকআদনুসব এবং মুকআদুল হসব এমন ব্যক্তিকে বলা হয় যার বংশ ছোট অথবা যে বংশহীন। এতে বোঝা যায় ইমাম সাহেবের পরিবার যখন ইয়ামান থেকে আগমন করেন তখন তার সদস্য সংখ্যা কম এবং অপরিচিত ছিল।

 

ইমাম মালেক (রহঃ)-কে লোকেরা একবার আকীক’ এ থাকার কারণ জিজ্ঞেস করল এবং বলল যে, এতে তো আপনার মসজিদে নবুবীতে আসা-যাওয়ায় কষ্ট হয়। ইমাম সাহেব বললেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকীক উপত্যকাকে ভালবাসতেন এবং সেখানে তাশরীফ নিতেন। কোন কোন ছাহাবা সেখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে মসজিদে নবুবীর নিকট আসতে চাইলে তিনি বললেন, তোমরা কি মসজিদ পর্যন্ত আসা-যাওয়ায় ছওয়াব মনে কর না? অবশ্য পরে ইমাম সাহেব মদীনায় চলে আসেন। ইবনে বুকাইর বর্ণনা করেন ইমাম সাহেব প্রথমে ‘আকীক’ এ থাকতেন পরে মদীনায় চলে আসেন। এখানে তিনি হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এর বাড়ীতে অবস্থান করতেন, যা হযরত উমর (রাঃ)-এর বাড়ীর নিকট, মসজিদে নবুবীর সাথে মিলিত ছিল। এতেকাফ করার সময় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানা-পত্র ঐ বাড়ীতে রাখা হত।

 

জন্ম এবং বাল্যকাল

ইমাম মালেক (রহঃ) ৯৩ হিজরীতে জুরুফ এলাকার যি-মেরওয়া নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। কেউ কেউ তাঁর জন্ম সাল ৯০ হিজরী, ৯৪ হিজরী বা ৯৫ হিজরী বলেছেন।

 

জীবনী-লেখকদের অনেকের মতে ইমাম সাহেব মাতৃগর্ভে তিন বছর ছিলেন। আবার কেউ কেউ দুই বছরের কথা উল্লেখ করেছেন।

 

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ইমাম মালেক (রহঃ) হতে তের বছরের বড় ছিলেন। ইমাম মালেক বাল্যকালেই তাঁকে দেখেছিলেন। একবার ইমাম আবু হানিফাকে লোকেরা জিজ্ঞেস করল যে, মদীনার নবীন ছেলেদেরকে আপনি কেমন পেয়েছেন? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে কেউ যদি উন্নতি লাভ করে তবে সে হবে ‘মালেক’।

 

এক বর্ণনায় ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেন, আমি মদীনায় ইলম বিক্ষিপ্তভাবে দেখেছি। যদি কেউ তা সুবিন্যস্ত করে, তবে এ ছেলেটিই করবে। ইবনে গানেস বলেন, আবু হানিফার এ কথাটি পরে আমি ইমাম মালেকের নিকট বলেছি। তিনি বললেন, আবু হানিফা সত্য বলেছেন। আমি তাকে দেখেছি। তিনি খুবই বুদ্ধিমান ছিলেন। হায়! তিনি যদি ফিকাহর ভিত্তি আছল অর্থাৎ মদীনাবাসীর ‘আছর’ বা হাদীছের উপর রাখতেন।

 

আরো পড়ুন…

 

  • ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ)
  • উম্মুল মোমেনীন মারিয়া কিবতিয়া (রাঃ)
  • উম্মুল মোমেনীন হাফসা (রাঃ)

 

হাদীছ শিক্ষার পূর্বে কাপড়ের ব্যবসা

নিয়মিতভাবে হাদীছ শিক্ষার পূর্বে তিনি তাঁর ভাই নযরের সাথে সুতি কাপড়ের ব্যবসা করতেন। এ ব্যবসায় তিনি তার অংশীদার ছিলেন। পরে তিনি হাদীছ শিক্ষা লাভ করেন।

 

এ কারণে প্রথমতঃ তাঁর ভাই নযরের সাথে সম্পর্কিত করে তার পরিচয় দেয়া হত। বলা হত নযরের ভাই মালেক। হাদীছ শিক্ষায় মেহনত করার কারণে তাঁর প্রসিদ্ধি ছড়িয়ে পড়লে পরে বিপরীতভাবে পরিচয় হতে লাগল এবং লোকেরা মালেকের ভাই নযর বলে তাঁর ভায়ের পরিচয় দিতে লাগল।

 

ইমাম সাহেবের শায়খ নির্বাচন বৈশিষ্ট্য

ইমাম মালেক (রহঃ) শুধুমাত্র সে সমস্ত শায়খদের থেকেই রেওয়ায়াত গ্রহণ করতেন, যাদের যোগ্যতা, সততা, বুদ্ধিমত্তা এবং তাকওয়া-বুযুর্গী প্রশ্নাতীত ছিল। যাদের স্মৃতিশক্তি প্রখর নয় কিংবা ফিকাহ সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞান নেই তিনি কখনো এমন লোকের মজলিসে বসতেন না। তিনি প্রায়শঃ বলতেন, ফিকাহবিদ না হলে আমি কখনো কোন বুযুর্গের মজলিসে বসতাম না। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, এ গুণটি ইমাম মালেক (রহঃ)এর চরিত্রে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হত।

 

ইমাম মালেক (রহঃ) প্রায়ই বলতেন, এই মসজিদে নববীর স্তম্ভের পাশে আমি সত্তরজন শায়খকে রাসূলে করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ বর্ণনা করতে শুনেছি। কিন্তু একদিনও আমি তাদের কারো নিকট বসি নাই। কখনও কখনও এরূপ বলতেন, মদীনায় এমন অনেক লোক ছিলেন যাদের নিকট হতে লোকেরা ইলম শিখেছে কিন্তু আমি তাঁদের নিকট হতে কোন ইলম শিখি নাই।

 

মুতাররাফ বিন আব্দিল্লাহ বলেন, আমি স্বয়ং ইমাম সাহেবকে বলতে শুনেছি, “আমি এ শহরে অনেক নেককার ভাল লোককে পেয়েছি কিন্তু তাদের নিকট হতে আমি হাদীছ গ্রহণ করি নাই!” লোকেরা তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তারা যা কিছু বলেন, নিজেরাই সেটার অর্থ বোঝেন না!

 

তখন অনেক প্রকার লোকই প্রকাশ পেয়েছিল। কেউ কেউ নিজের অজ্ঞাতসারে মিথ্যা বলত। কেউ কেউ এমন ছিল যে, প্রকৃত জ্ঞানের খবরও তার নিকট ছিল না। আবার অনেকে ছিল সম্পূর্ণ মূর্খ।

 

ইমাম সাহেবের স্বনামধন্য শাগরেদ আব্দুল ওহাব বলেন, ইমাম সাহেব বলেছেন, মদীনাতে এমনও অনেক লোক রয়েছেন যারা বৃষ্টির জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করলে সে দোয়া কবুল হবে। তারা অনেক মাসয়ালা মাসায়েল এবং হাদীছ সম্বন্ধেও অবগত আছেন। কিন্তু আমি কখনো তাদের থেকে কোন ফায়দা গ্রহণ করিনি। কারণ তারা শুধুমাত্র মুত্তাকী এবং বুযুর্গ ছিলেন। কিন্তু রেওয়ায়াত এবং ফতোয়ার কাজ শুধুমাত্র বুযুর্গী এবং তাকওয়ার দ্বারা চলে না। তার সাথে সাথে জ্ঞান বুদ্ধিরও বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। হাদীছ রেওয়ায়াত করা এবং ফতোয়া দেওয়া সহজ ব্যাপার নয়। অজ্ঞ এবং অসতর্ক লোকেরা যারা হাদীছ রেওয়ায়াত করে এবং ফতোয়া দেয় কিয়ামতের দিন তাদের এ পরিণাম ফল খুবই খারাপ হবে।

 

ইমাম সাহেবের ভাগিনা ইসমাঈল বর্ণনা করেন, আমি আমার মামাকে বলতে শুনেছি এই ইলমে হাদীছও দ্বীন। কাজেই কার নিকট হতে গ্রহণ করছ তৎপ্রতি লক্ষ্য রেখো। আমি মসজিদে তাদের নিকট হতে একটি অক্ষরও শিখিনি। অথচ তাদের মধ্যে এমন একজনও ছিলেন না যে, তার নিকট লক্ষ টাকা আমানত রাখলে একটা কপর্দক বিনষ্ট হবার আশঙ্কা থাকবে। কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে, তাঁরা এ বিষয়ের উপযুক্ত লোক নহেন।

 

ইমাম সাহেবের শায়খ নির্বাচনের সময় এদিকেও লক্ষ্য রাখতেন যে, যাঁর থেকে তিনি হাদীছ গ্রহণ করবেন তিনি যেন বার্ধক্যে উপনীত না হয়ে থাকেন। ইমাম সাহেব বলেন, মদীনাতে আমি এমন অনেক লোককে দেখেছি যে, তারা একশত বছর বা একশত পাঁচ বছর জীবিত ছিলেন। কিন্তু একজন বৃদ্ধ লোকের নিকট হতেও কোন হাদীছ গ্রহণ করা চলে না। কারণ এসব লোক হতে হাদীছ গ্রহণ করা হলে তাতে দোষ-ত্রুটি থেকে যেতে পারে।

 

ইমাম মালেক (রহঃ)-এর এ কথাটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। কারণ বার্ধক্যের কারণে যে বুদ্ধি এবং স্মৃতিশক্তি লোপ পায় তা অনস্বীকার্য। ইমাম সাহেবের এ সূক্ষ্মদৃষ্টি এবং সতর্কতার ফলে অবস্থা এমন হল যে, ইমাম সাহেব যাঁর থেকে হাদীছ গ্রহণ করতেন তাকে বিশ্বাসযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য মনে করা হত।

ইয়াহয়া বিন মাঈন বলেন, ইমাম মালেককে সম্মুখে রেখে আমরা সব কাজ করে যেতাম। প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁকে অনুসরণ করতাম। যখনই কোন শায়খের নাম আমাদের সামনে আসত তখন আমরা লক্ষ্য করতাম যে, ইমাম মালেক তাঁর থেকে কোন রেওয়ায়াত গ্রহণ করেছেন কি না। যদি তিনি গ্রহণ করে থাকতেন তবে আমরাও তার থেকে গ্রহণ করতাম, অন্যথায় গ্রহণ করতাম না।

 

ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের নিকট কোন এক ব্যক্তি জনৈক রাবী সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমার বিবেচনায় তিনি গ্রহণযোগ্য। কেননা, ইমাম মালেক তাঁর থেকে রেওয়ায়াত গ্রহণ করেছেন।

 

ইমাম সাহেবের দাদা মালেক বিন আবি আমের যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার বয়স ছিল বার বা তের বছর কিন্তু তার থেকে তিনি কোন হাদীস গ্রহণ করেননি। তদ্রুপ সালেম বিন আব্দিল্লাহ এবং সুলাইমান বিন ইয়াসার প্রমূখকে তিনি পেয়ে থাকলেও কোন মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি তাদের হাদীছ গ্রহণ করেননি। কারণ এদেরকে তিনি তাঁদের বার্ধক্যাবস্থায় পেয়েছিলেন।

 

শায়খ নির্বাচন 

ইমাম মালেক (রহঃ)-এর জমানায় প্রত্যেক ইমামেরই অসংখ্য শায়খ তথা শিক্ষক থাকত। এটাকে তারা গৌরবের এবং বরকতের বিষয় মনে করতেন। কিন্তু ইমাম মালেক (রহঃ) ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তিনি শায়খের সংখ্যাধিক্যকে গৌরবের বিষয় মনে করতেন না।

 

সাহাবাদের যুগ শেষ হওয়ার পর তাবেয়ীদের যুগ শুরু হল। এটা ছিল দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ যুগ। তখনকার জনসাধারণের চরিত্র ছিল নিষ্কলুষ। অন্তর ছিল পবিত্র। মিথ্যা বলাকে পাপ মনে করত। তথাপি এ কথা বলা যাবে না যে, তখনকার দিনে মিথ্যা কথা বলতে দ্বিধাবোধ করবে না এমন লোক ছিল না। তদ্রুপ এমন লোকও বিরল ছিল না যারা অন্যদেরকে নিজেদের মত সরল সত্যবাদী মনে করে যে কারো রেওয়ায়াত গ্রহণ করতেন। নিজেদের অজ্ঞাতেই তারা মিথ্যার আশ্রয় বনে যেতেন। এমনও অসংখ্য রেওয়ায়াতকারী দেখা দিল যারা তাদের রেওয়ায়াতকৃত হাদীছের গুঢ়তত্ত্ব অবগত থাকা তো দূরের কথা সে সম্বন্ধে তাদের মোটামুটি জ্ঞানও ছিল না। এজন্যই ইমাম মালেক (রহঃ) যাচাই বাছাই করে শায়খ নির্বাচন করতেন।

 

আবু হাযেম সালমা বিন দীনার 

ইমাম মালেক (রহঃ) হযরত আবু হাযেম হতেও হাদীছের শিক্ষা গ্রহণ করেন। আবু হাযেম একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী ছিলেন। তিনি হযরত সহল বিন সায়ীদ রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তার থেকে হাদীছ রেওয়ায়াত করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। হযরত সহল বিন সায়ীদ (রাঃ) মদীনার সর্বশেষ ছাহাবী ছিলেন। তিনি একশত বছর বয়সে ৮৮ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। হযরত আবু হাযেম সালমা বিন দীনার হযরত সহল বিন সায়ীদ (রাঃ) ব্যতীতও অপরাপর ছাহাবী থেকে হাদীছ রেওয়ায়াত করেন যদিও তিনি তাদের থেকে হাদীছ শ্রবণ করেননি।

 

তাবেয়ীদের মধ্য হতে তিনি হযরত মুহাম্মদ বিন মুনকাদের, সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব প্রমুখ হতে হাদীছের শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী হতে বয়স্ক ছিলেন। এতদসত্ত্বেও তার থেকে তিনি হাদীছের শিক্ষা গ্রহণ করতেন। ইমাম মালেক, ইবনে উয়াইনা, সুফিয়ান ছাওরী, হাম্মাদ প্রমুখ তার ছাত্র ছিল।

মুহাদ্দেছদের মধ্য হতে তিনি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ছিলেন। তিনি অনেক হাদীছ রেওয়ায়াত করেন। কোন কোন সময় তিনি মসজিদে নবুবীতে ওয়াজ করতেন। তাঁর শিক্ষা মজলিসে বহু শ্রোতার সমাবেশ ঘটত। কখনো কখনো এমনও হতো যে, বিলম্বে আসলে মজলিসে স্থান পাওয়া যেত না।

 

একদিন ইমাম মালেক (রহঃ)-এর তার শিক্ষা মজলিসে আসতে বিলম্ব হয়ে গেল। তিনি সেখানে এসে দেখলেন যে মজলিসে তিল ধারনেরও ঠাঁই নেই। তাই তিনি ফেরৎ চলে এলেন।

 

লোকেরা তাকে ফিরে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাদীছ শ্রবণ করা আমার নিকট পছন্দ হয়নি।

 

এরূপ বলার উদ্দেশ্য তাঁর এই ছিল যে, স্বস্তির সাথে নিকটে বসতে না পারলে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা যায় না। আবু হাযেম সালমা বিন দীনার ১৪০ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।

 

ইবনে শিহাব যুহরী

তাঁর প্রকৃত নাম মুহাম্মদ বিন মুসলেম বিন উবাইদুল্লাহ বিন শিহাব আয-যুহরী আল কুরাইশী। তবে তিনি ইবনে শিহাব যুহরী নামে সর্বাধিক পরিচিত। তাবেয়ীদের মধ্যে হাদীছ এবং রেওয়ায়াতের ব্যাপারে যাদেরকে স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করা হয় তাদের মধ্যে সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেবের পরেই তাঁর স্থান। সিহাহ-সিত্তার প্রতিটি কিতাবেই তার বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা পর্যাপ্ত। আবু বকর ইবনে হযমের পর তিনি দ্বিতীয় হাদিছ সংকলক হিসাবে পরিচিত। ছাহাবাদের মধ্য হতে তিনি হযরত আনাস (রাঃ), হযরত জাবের (রাঃ), ইবনে উমর (রাঃ)সহ আরো অনেক ছাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ করার এবং তাদের থেকে হাদীছ রেওয়ায়াত করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।

 

হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমরের (রাঃ) আযাদকৃত গোলাম ছিলেন হযরত নাফে’। তাঁর যোগ্যতা এবং ইলমের প্রতি তার আগ্রহ দেখে তিনি তাঁকে মুক্ত করে দেন। যোগ্যতা থাকলে ইসলাম দাসকেও মর্যাদার আসনে আসীন হওয়াতে আপত্তি করে না। এমনকি তাকে নেতার আসনেও বসাতে দ্বিধাবোধ করে না।

 

হযরত নাফে’ সূদীর্ঘ ত্রিশ বছর যাবৎ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর খিদমতে ছিলেন। ইবনে উমর ব্যতীতও তিনি হযরত আয়েশা, উম্মে সালামা, আবু হুরায়রা, আবু সায়ীদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ হতে হাদীছ রেওয়ায়াত করেন। খলীফা উমর বিন আব্দিল আযীয তাকে মিসরবাসীদের শিক্ষাদানের জন্য প্রেরণ করেন। ১১৭ হিজরীতে তাঁর ইন্তিকাল হয়।

 

 

ইমাম জাফর সাদেক

ইমাম জাফর সাদেকের বংশ পরম্পরা ছিল এরূপ; জাফর বিন মুহাম্মদ বিন হুসাইন বিন আলী বিন আবি তালেব। তিনি জাফর সাদেক নামে পরিচিত ছিলেন। ইমাম মুহাম্মদ বাকের, উরওয়া বিন যুবাইর, আত্তার মুহাম্মদ বিন মুনকাদের প্রমুখ হতে হাদীছ রেওয়ায়াত করেন।

 

ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ), ইমাম মালেক, সুফিয়ান ছাওরী, শোবা, আবু আছেম, ইয়াহয়া প্রমুখ তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

 

আবু হাতেম বলেছেন, জাফর সাদেক কিরূপ বুযুর্গ লোক এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করাও তার জন্য অপমানজনক।

 

ইবনে হাব্বান বলেন, তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর বংশধর ছিলেন। তিনি তাবেয়ীদের অন্তর্গত ছিলেন। তিনি মদীনার একজন বিখ্যাত আলেম ছিলেন।

 

তিনি মাঝে মধ্যে ছাত্রদেরকে পরীক্ষা করতেন। একবার তিনি ইমাম আবু হানিফাকে প্রশ্ন করলেন, বল তো; কেউ যদি মুহরেম অবস্থায় হরিণের উপরের মাঁড়ীর চারটি দাঁত ভেঙ্গে ফেলে তবে তার কিরূপ শাস্তি হতে পারে? ইমাম আবু হানিফা আরয করলেন, হে রাসূলের বংশধর! আমি তা অবগত নই।

 

ইমাম জাফর বললেন, হে আবু হানিফা! তুমি তো বড় সাবধানী লোক। তুমি কি জান না যে, হরিণের উপরের মাড়িতে কখনো চার দাঁত থাকে না।

 

ইমাম মালেক (রহঃ) ইমাম জাফর সাদেক হতে অনেক হাদীছ গ্রহণ করেছেন, তন্মধ্য হতে বেশ কিছু হাদীছ তিনি মুয়াত্তা কিতাবে উল্লেখ করেছেন।

 

আল্লামা যাহরী মুছআব বিন আব্দিল্লাহ হতে দু’টি রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন। একটি হচ্ছে এই যে, ইমাম মালেক বনী উমাইয়াদের রাজত্বকাল পর্যন্ত ইমাম জাফর সাদেক হতে কোনও হাদীছ রেওয়ায়াত করেন নি। আব্বাসীদের রাজত্বকাল আরম্ভ হলে তিনি ইমাম জাফর সাদেকের নিকট হতে রেওয়ায়াত করা শুরু করেন।

 

এ রেওয়ায়াতটি সঠিক হতে পারে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যে ভয়ে তিনি উমাইয়াদের রাজত্বকালে ইমাম জাফর সাদেকের হাদীছ রেওয়ায়াত করেননি, আব্বাসীদের রাজত্বকালেও তো সে ভয়টি বিরাজমান ছিল। অপর রেওয়ায়াতটি এরূপ যে, ইমাম জাফর সাদেকের বর্ণিত হাদীছের অন্য কোন সমর্থক রেওয়ায়াত না পেলে তিনি তা গ্রহণ করতেন না। এ রেওয়ায়াতটি ভিত্তিহীন বলে মনে হচ্ছে। কারণ ইমাম মালেক (রহঃ) তার কিতাব ‘মুয়াত্তা’য় ইমাম জাফর সাদেকের অনেক হাদীছ যেগুলোর সমর্থনে কোন হাদীছ তিনি উল্লেখ করেননি রেওয়ায়াত করেছেন, যার উল্লেখ ইতিপূর্বে করা হয়েছে।

 

কোন কোন রেওয়ায়াতে এরূপ বর্ণনা দেখা যায় যে, ইমাম জাফর সাদেকের ইন্তিকালের সময় তিনি ইমাম মালেককে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান। তবে নির্ভরযোগ্য ইতিহাসে এর কোন প্রমাণ মিলে না।

 

ইমাম মালেক (রহঃ) যদিও হযরত নাফে ইবনে হুরমু প্রমুখ হতে ফিকাহশাস্ত্র শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু ফিকাহর সিংহভাগই তিনি বরীয়াতুর রায় হতে অর্জন করেন। তার প্রতি ইমাম মালেক (রহঃ) এতই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, ইতিহাস এবং রিজাল সম্পর্কিত কিতাবে তাঁকে শায়খে মালেক (মালেকের শিক্ষক) বলে অভিহিত করা হয়। এমন কি এটি তার নামের অংশ বিশেষে পরিণত হয়। ইজতিহাদ এবং স্বীয় মত প্রকাশে তিনি এরূপ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন যে, তাকে রায়ী (মতবাদী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

 

ইবনে শায়বার মতে তিনি ছিলেন খুবই বিশ্বাসযোগ্য। মদীনার অন্যতম মুফতী খতীব লিখেছেন, তিনি ফকীহ আলেম এবং ফিকহ ও হাদীছ উভয় শাস্ত্রের হাফেয ছিলেন।

 

মদীনা তখন সর্বশ্রেষ্ঠ ফিকাহবিদ এবং মুহাদ্দেছীনদের কেন্দ্র ছিল। সেখানে জ্ঞানী এবং উপযুক্ত লোক ব্যতীত অন্য কারও পক্ষে ফতোয়া দেওয়া অশোভনীয় এবং অসম্ভব ছিল। জ্ঞানে গুণে তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে তখন মদীনায় ফতোয়া দেওয়া সম্ভবপর হয়েছিল।

 

তার মাসয়ালা এবং ইজতিহাদ অত্যন্ত মনোমোমুগ্ধকর ছিল। ইমাম মালেক (রহঃ) যখন মদীনায় তালীম এবং তাদরীসের কাজে নিযুক্ত ছিলেন তখন তিনি রবীয়াতুর রায়ীর হাদীছ এবং ইজতিহাদের উল্লেখ করতেন। মানুষের নিকট সেগুলো এতই হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছিল যে, তিনি যখন তা বর্ণনা করে চুপ হয়ে যেতেন তখন তারা আরো শুনার আগ্রহ প্রকাশ করত। ইমাম সাহেব তখন আরো হাদীছ এবং ইজতিহাদের কথা বর্ণনা করতেন। এতেও মানুষের আগ্রহ হ্রাস পেত না। তারা আরো অধিক হাদীছ এবং ইজতিহাদ শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করত।

 

ইমাম মালেক (রহঃ) প্রায়শঃ বলতেন, রায়ীর মৃত্যুর পর ফিকাহর স্বাদ চলে গিয়েছে।

 

তার জীবনের একটি অদ্ভুত ঘটনা রয়েছে। তিনি যখন মাতৃগর্ভে তখন তার পিতা ফররুখ সৈনিক হিসাবে খেরাসানের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে যান। যাবার সময় স্ত্রীর নিকট চল্লিশ হাযার দিরহাম দিয়ে যান। দীর্ঘ আটাশ বছর পর বাড়ী ফিরে এসে তিনি কারো অনুমতির অপেক্ষা না করে নিজ বাড়ীতে প্রবেশ করতে অগ্রসর হলেন। এমন সময় রবীয়াতুর রায়ী দেখতে পেলেন যে, এক অপরিচিত লোক কোন প্রকার অনুমতি ছাড়াই বাড়ীতে প্রবেশ করছে। তিনি বললেন, খবরদার! আর এক পাও সম্মুখে এগুবেন না। তার ঘরে এক অপরিচিত যুবাকে দেখতে পেয়ে তিনিও অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। অপরিচিত পিতা পুত্রের উভয়েই তখন আস্তিন গুটাতে আরম্ভ করলেন। একটি মহা শোরগোল আরম্ভ হল। এ সংবাদ ইমাম সাহেবের নিকট পৌঁছতেই তিনি দৌঁড়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। ইমাম সাহেবকে দেখে লোকেরা নিশ্চুপ হল। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন, জনাব! ঘর তো আরও অনেক রয়েছে। আপনি সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন না কেন?

 

আগন্তুক ব্যক্তি বললেন, আমি অন্যত্র যাব কেন? এ তো আমারই বাড়ী, আমার নাম ফররূখ।

 

এ সময়ে স্ত্রী স্বামীর আওয়াজ চিনতে পারলেন। তিনি ঘর হতে বেরিয়ে এসে পিতা পুত্রের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পিতা পুত্র একে অপরের গলা জড়িয়ে ধরলেন। পরিস্থিতি শান্ত হবার পর ফররুখ স্ত্রীকে টাকা পয়সা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। স্ত্রী বললেন, সেগুলো আমি অতি যত্নসহকারে পুঁতে রেখেছি। রবীয়াতু রায়ীর পিতার গচ্ছিত সমস্ত অর্থ তার মাতা তার শিক্ষার পিছনে ব্যয় করেছিলেন। শিক্ষা গ্রহণ শেষে তিনি তখন মসজিদে নবুবীতে শিক্ষাদান কার্যে নিয়োজিত ছিলেন।

 

ফররূখ যখন মসজিদে নবুবীতে নামায আদায় করতে গেলেন সেখানে তার পুত্রের মান-সম্মান এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখে আনন্দে তার চোখের পানি বইতে লাগল।

 

সেখান হতে বাড়ী ফিরে আসলে তার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নিকট আপনার এ পুত্র অধিক প্রিয়, নাকি আপনার ধন? তিনি বললেন, আমার এ পুত্রের সাথে দুনিয়ার কোন ধন-দৌলতেরই তুলনা হতে পারে না। তখন স্ত্রী বললেন, এ পুত্রের শিক্ষাদানেই সমস্ত সম্পদ ব্যয় করেছি।

 

বাল্যকালে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং রবীয়ার দরসে অংশ গ্রহণ

ইমাম সাহেবের পরিবারটি ছিল দ্বীনি এবং ইলমী পরিবার। মদীনায় হাদীছের রেওয়ায়েত ব্যাপক ছিল। বাল্যকালে হাদীছ শিক্ষা শুরু করার ঘটনা তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেন। আমি আমার মাকে বললাম, আমিও ইলম শিখতে যাব। তিনি বললেন, আস আমি তোমাকে ইলমে দ্বীনের উপযুক্ত পোশাক পরিয়ে দেই। তিনি আমাকে উত্তম পোশাক পরিয়ে দিলেন। মাথায় কালো লম্বা টুপি রেখে তার উপর পাগড়ী বেঁধে দিয়ে বললেন, তুমি রবীয়ার নিকট যাও। ইলম শিখার পূর্বে তার থেকে আদব শিখ। অন্য এক বর্ণনা মতে তাঁর মাতা বলেছিলেন, এখন যাও। হাদীছ লিখ।

 

যোবায়রী বলেন, মালেককে আমি রবীয়ার দরসে দেখেছি। সে সময় তার কানে বর্ণালংকার ছিল।

 

আবু উছমান রবীয়া বিন আবি আব্দির রহমান ফররুখ আত্তায়মী আল মাদানী রবীয়াতুর রাষ্ট্র নিসবত বা সম্বন্ধ দ্বারা প্রসিদ্ধ। তিনি আনাস বিন মালেক (রহঃ) এবং অন্যান্য অনেক ছাহাবী থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। তিনি বহু হাদীছ রেওয়ায়েত করেছেন। তিনি একজন নির্ভরযোগ্য রাবী, মুহাদ্দিছ এবং ফকীহ ছিলেন। মদীনার অনেক প্রসিদ্ধ আলেম এবং ফকীহ তাঁর দরসে অংশ নিতেন। তাঁর এ দরসী হলকা মসজিদে নববীতে হত, যেখানে চল্লিশজন পাগড়ী পরিধানকারী মাশায়েখ ছিলেন।

 

ইবনে উমরের (রাঃ) মাওলা নাফে’ এবং আব্দুর রহমান বিন হুরমুযের শিষ্যত্ব

 

ঐ সময়েই ইমাম সাহেব ইবনে উমরের মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) নাফে থেকেও ইলম হাছেল করছিলেন। তিনি বলেন, আমি বাল্যকালে আমাদের জনৈক কর্মচারীর সাথে ইবনে উমরের মাওলা নাফে’র নিকট যেতাম। তিনি উপর থেকে নেমে সিঁড়ির উপর বসে যেতেন এবং আমাকে হাদীছ বর্ণনা করে শুনাতেন। দুপুরে আমি তার নিকট যেতাম। রাস্তায় কোথাও ছায়াও থাকত না। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম- অমুক অমুক মাসয়ালায় ইবনে উমর কি বলেছেন। তিনি তা বর্ণনা করতেন। আর আব্দুর রহমান বিন হুরমুযের নিকট সকালে যেতাম এবং রাত্রে সেখান থেকে ফিরে আসতাম।

 

মুছআব বর্ণনা করেন, নাফে’ দৃষ্টিহীন হওয়ার পর ইমাম মালেক তাঁকে তাঁর বাড়ী থেকে যাবকী’র দিকে অবস্থিত মসজিদে নবুবীতে নিয়ে যেতেন এবং তাঁকে হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। ইমাম সাহেব বলেন, আমার এক ভাই আমার চেয়ে বয়সে বড় যিনি ইবনে শিহাবের সম-বয়সী ছিলেন। একদিন পিতা আমাদের উভয়কে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলেন। আমার ভাই সঠিক উত্তর দিলেন আর আমি উত্তরে ভুল করলাম। পিতা বললেন, কবুতর তোমাকে পড়ালেখা থেকে গাফেল করে দিয়েছে। এ কথাটি আমার মনে খুবই রেখাপাত করল। আমি আব্দুর রহমান বিন হুরমুযের দরসী হলকায় যেতে লাগলাম। সেখানে সাত বছর আমি শিক্ষা গ্রহণ করেছি। এ সময়ে অন্য কোন শায়খের নিকট যাইনি। খেজুর নিয়ে আমি তার নিকট যেতাম। বাচ্চাদের খেজুর দিয়ে বলতাম, শায়খ সম্পর্কে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে তিনি এখন ব্যস্ত। একদিন আমি ইবনে হুরমুযের বাড়ী গিয়ে পৌছলে তিনি বাঁদীর মাধ্যমে খবর নিলেন কে এসেছে। সে গিয়ে বলল, সেই আশকার (লাল-গোরা) লোকটি। ইবনে হুরমুয বললেন, তাকে আসতে দাও, সে ইমাম। মসজিদে নবুবীতে ইবনে হুরমুযের দরসী হলকায় বসত।

 

আবু দাউদ আব্দুর রহমান বিন হুরমু আল আরাজ আলমাদানী (রহঃ) হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর জামাতা ছিলেন। তিনি তার ইলমের ওয়ারেছ। ছিলেন। অনেক তাবেঈ থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি অনেক হাদীছ রেওয়ায়েত করেছেন। তিনি নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিছ ছিলেন। এর সাথে সাথে বংশ পরম্পরা, আরাবিয়্যাত এবং কিরআত সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন।

 

ছাফওয়ান বিন সুলাইমানের শিষ্যত্ব

ইমাম সাহেবের বাল্যকালীন শিক্ষকদের মধ্যে ছাফওয়ান বিন সুলাইমান একজন বুযুর্গ আলেম ছিলেন। একদিন তিনি তাঁর শাগরেদ মালেকের নিকট একটি স্বপ্নের তাবীর জিজ্ঞেস করলেন। শাগরেদ আরয করলেন, জনাব! আপনার মত বুযুর্গ আমার নিকট কোন কিছু জানতে চাওয়া আশ্চর্যজনক ব্যাপার। শিক্ষক বললেন, ভাতিজা! এতে কোন অসুবিধা নেই। স্বপ্নে দেখতে পেলাম যে, আমি আয়না দেখছি। শাগরেদ তৎক্ষণাৎ বললেন, জনাব! আপনি আপনার পরকাল সজ্জিত করছেন এবং স্বীয় প্রভুর নৈকট্য লাভের উপকরণ পাঠাচ্ছেন। এ তাবীরে উস্তাদ খুশী হয়ে বললেন,

 

আজ তুমি মুওয়াইলাক, যদি তুমি বেঁচে থাক তবে মালেক হয়ে যাবে। হে মালেক! যখন তুমি সত্যিকারে মালেক হবে তখন আল্লাহকে ভয় করবে। নচেৎ তুমি হালেক (ধ্বংসপ্রাপ্ত) হয়ে যাবে।

 

ইমাম সাহেব বলেন, ঐ সময় লোকেরা আমাকে আদর করে মুওয়াইলাক’ বলে ডাকত। ছাফওয়ান বিন সুলাইম আমাকে প্রথমবার আবু আব্দিল্লাহ কুনিয়াতে ডেকেছেন, এটা তারই দান।

 

আবু আব্দিল্লাহ ছাফওয়ান বিন সুলাইম আলকুরাশী আলযুহদী আলমাদানী (রহঃ) হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর এবং কিবারে তাবেঈদের নিকট থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেছেন। তার যুহদ এবং তাকওয়া এমন ছিল যে, যদি তাকে সংবাদ দেয়া হত যে, আগামীকাল কেয়ামত ঘটবে তবে তার অতিরিক্ত আমল করার দরকার পড়ত না। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, ছাফওয়ান শীতকালে রাত্রে ছাদে এবং গরমকালে ঘরের ভিতর নামায পড়তেন যেন শীত এবং গরমের কারণে রাত্রি জাগরণ সহজ হয়।

 

ইবনে শিহাব যুহরীর দরসী হলকায়

ইমাম সাহেবের শিক্ষক এবং শায়খ ছিলেন মদীনার প্রধান প্রধান আলেমগণ যারা উলুমে নবুওয়্যাতের স্তম্ভস্বরূপ ছিলেন। এঁদের মধ্যে ইবনে শিহাব যুহরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইমাম সাহেব তার নিকট অনেক শিক্ষা লাভ করেছেন। তিনি বলেন, আমরা হাদীছের শিক্ষার্থীরা ইবনে শিহাবের বাড়ীতে ভিড় করতাম। তাঁর দরজায় বসে থাকতাম। দরজা খুললে ভিতরে যাবার সময় ধাক্কা-ধাক্কি শুরু হয়ে যেত। হলকায়ে দরস এ ইবনে শিহাব বলতেন, ইবনে উমর এই এই বলেছেন, আর আমরা শুনে যেতাম। হালকা শেষে তাকে জিজ্ঞেস করা হত যে, ইবনে উমরের এ কথা আপনার নিকট কিভাবে পৌঁছেছে? তিনি বলতেন, তাঁর পুত্র সালেম এগুলো বর্ণনা করেছেন।

 

ইমাম সাহেব বলেন, একবার ঈদের দিনে আমি এ ভেবে যে, ইবনে শিহাব আজ অবসর থাকবেন তাই ঈদগাহ থেকে সরাসরি তাঁর বাড়ীতে গেলাম। ইবনে শিহাব কর্মচারীকে বললেন, দেখো দরজায় কে? সে গিয়ে সংবাদ দিল আপনার আশকার মাওলা (বন্ধু) মালেক। অনুমতি পেয়ে ভিতরে গেলাম। তিনি আমাকে দেখেই বললেন, আমার ধারণা তুমি বাড়ী যাওনি। ঈদগাহ থেকে সরাসরি এখানে চলে এসেছ। খানা খেয়ে নাও। আমি বললাম খাওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনি হাদীছ বর্ণনা করুন। তিনি তখন সতেরটি হাদীছ বর্ণনা করলেন। পরে বললেন, এতে তোমার কি লাভ হবে যে, আমি হাদীছ বর্ণনা করব আর তুমি সেগুলো মুখস্থ করবে না। আমি বললাম আপনি বললে আমি সব কটি হাদীছ শুনিয়ে দিই! আর ঐ সময়েই সেগুলো মুখস্থ শুনিয়ে দিলাম!

 

এক বর্ণনায় এরূপ রয়েছে, আমি আমার তখতীগুলো তাকে দেখালে তিনি আরও চল্লিশটি হাদীছ লেখালেন। তিনি বললেন, তুমি যদি এগুলো মুখস্থ করে নাও তবে এগুলোর হাফেজ হয়ে যাবে। আমি বললাম, এগুলো আমি এখনই মুখস্থ শুনাতে পারব। ইবনে শিহাব বললেন, শুনাও। আমি সে হাদীছগুলো শুনিয়ে দিলাম। তিনি বললেন, ‘উঠ, তুমি ইলমের ভাণ্ডার অথবা বললেন, তুমি ইলমের কতই না উত্তম ভাণ্ডার।

 

মুতাররাফ বিন আব্দিল্লাহ বর্ণনা করেন, একবার ইমাম মালেক বললেন, মদীনায় আমি একজন মুহাদ্দিছকেই ফকীহ পেয়েছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কে? তিনি বললেন, ইবনে শিহাব যুহরী। ইমাম সাহেব বলেন, ইবনে শিহাব সর্বপ্রথম সনদসহকারে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আমরা ইমাম সাহেবের নিকট ভিড় করে বসে থাকতাম। ইয়াহয়া বিন মাঈন বলেন, ইবনে শিহাবের শাগরেদদের মধ্যে মালেক সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য। এরপর মামার।

 

আলী বিন মাদীনী সুফিয়ান ছাওরীকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি ইমাম মালেককে দেখেছেন? তিনি বললেন হ্যা, ইবনে শিহাবের নিকট তাকে দেখেছি। আমি হিসাব করে দেখলাম ঐ সময় তাঁর বয়স আটাইশ বছর। এর পূর্বে তিনি নাফে’র দরসী মজলিসে বসতেন।

 

ফকীহ আবু বকর মুহাম্মদ বিন মুসলিম বিন উবাইদুল্লাহ বিন আব্দিল্লাহ বিন শিহাব আলকুরাশী আল যহরী আলমাদানী (রহঃ) হেজায এবং সিরিয়ার আলেম ছিলেন। তিনি অনেক সম্মানিত এবং বড় তাবেঈন থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। ফিকাহ এবং হাদীছ উভয় বিষয় সম্পর্কে তিনি পারদর্শী ছিলেন।

 

মদীনা মুনাওয়ারা দ্বীনি এবং ইলমী কেন্দ্র

ইমাম মালেক (রহঃ) মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই শিক্ষা সমাপন করেন। শিক্ষা অর্জনার্থে তাঁর মদীনার বাইরে যাওয়ার কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। ঐ সময় মদীনা ছিল দ্বীন এবং উলামায়ে দ্বীনের কেন্দ্রস্থল। ইসলামী জগতের সকল আহলে-ইলম এ কেন্দ্রে আগমন করতেন। আবু আলীয়া বছরী (রহঃ) বলেন, আমরা বছরায় ছাহাবায়ে কিরাম হতে বর্ণিত হাদীছ শ্রবণ করতাম, কিন্তু যে পর্যন্ত মদীনায় এসে স্বয়ং ঐ ছাহাবায়ে কিরাম থেকে হাদীছ শ্রবণ না করতাম, নিশ্চিন্ত হতাম না। এজন্যই ইমাম মালেক (রহঃ) মদীনায় অবস্থান করে সর্তকতা এবং দায়িত্ব সহকারে ইলম অর্জন করেছেন।

 

 

তিনি বলেন, আমি এ মদীনা শহরে এমন বুযুর্গদেরকে পেয়েছি, যদি তাদের অসীলা দিয়ে আল্লাহর নিকট বৃষ্টি প্রার্থনা করা হত তবে অবশ্যই বৃষ্টি হত। তারা হাদীছ রেওয়ায়েতও করেছেন। কিন্তু আমি তাদের থেকে হাদীছ গ্রহ করিনি। কারণ তারা আল্লাহর ভয়, যুহদ এবং তাকওয়ার জীবন গ্রহণ করেছেন। আর এ ইলমে দ্বীন তথা ইলমে হাদীছের ফিকাহর জন্য যুহদ, তাকওয়া এবং খোদাভীতির সঙ্গে গভীর জ্ঞান এবং মেধারও প্রয়োজন রয়েছে যেন বর্ণনাকারী বুঝতে পারে যে, সে কি বর্ণনা করেছে এবং আগামীতে এর পরিণাম কি দাঁড়াবে? যে আলেমের মধ্যে এ গুণাবলী না থাকবে সে নিজেও দলীল হতে পারে না এবং তার নিকট থেকেও ইলমে দ্বীন অর্জন করা যায় না। তাকে সন্দেহযুক্ত করার অধিকার আমাদের নেই। কিন্তু সে ইলমে দ্বীনের বাহক হতে পারে না।

 

ইমাম সাহেব আরও বলেন, আমি এমন অনেক আহলে ইলম দেখেছি যারা বহু ছাহাবাকে পেয়েছেন কিন্তু তাদের নিকট থেকে ইলম হাছেল করেননি।

 

একবার লোকেরা ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আমর বিন দীনারের নিকট হাদীছ পড়েছেন? তিনি বললেন, তিনি হাদীছ বর্ণনা করছিলেন আর শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লিখছিল। দাঁড়িয়ে হাদীছ লেখাটা আমার নিকট পছন্দ লাগেনি।

 

ইমাম সাহেব একবার আবু যিনাদের দরসী হলকার নিকট দিয়ে গেলেন। কিন্তু সেখানে বসেননি। পরে আবু যিনাদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমার ওখানে কেন বসেননি? ইমাম সাহেব বললেন, জায়গা সংকীর্ণ ছিল। আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ হাছেল করা আমি সমীচীন মনে করিনি।

 

ছাত্রজীবনে আর্থিক সংকট

ইমাম সাহেবের পরিবার অত্যন্ত কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করত। কাযী ইয়ায তাঁর পিতা সম্পর্কে লিখেন, ইমাম সাহেবের পিতা তীর তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

 

আগেই বলা হয়েছে যে, ইমাম সাহেবের ভাই নযর সুতী কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ইমাম সাহেব তার সাথে এ ব্যবসায় শরীক ছিলেন। কিন্তু এতে এ পরিমাণ আয় হতো না যদ্বারা ইমাম সাহেব নিশ্চিন্ত মনে ছাত্রজীবন কাটাতে পারেন। পরে আল্লাহ তাআলা তাঁকে প্রাচুর্য এবং সচ্ছলতা দান করেছেন এবং সুখী জীবন যাপন করেছেন।

 

একবার ইমাম সাহেব খলীফা আবু জাফর মনসূরকে প্রজাদের খবরাখবর নেয়ার জন্য নছীহত করলেন। তিনি বললেন, ঘটনা কি এরূপ নয় যে, আপনার ছোট মেয়ে ক্ষুধায় কাঁদতে ছিল আর আপনি খাদেমাকে চাকী চালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেন প্রতিবেশীরা কান্নার আওয়াজ না পায়। এ ঘটনা যখন আমি জানি তখন কি প্রজাদের অবস্থা আমার জানা নেই?

 

দুঃখ কষ্টের এ অবস্থা অনেক সময় বড় কঠিন হয়ে দাঁড়াত। এ কষ্টের পর তার সুখের জীবন আসল। ইবনে কাসেম বলেন, শিক্ষা জীবন ইমাম মালেককে এ অবস্থায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে যে, তিনি ঘরের ছাদের কাঠ বিক্রয় করতে বাধ্য হয়েছেন। পরে পার্থিব সম্পদ তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়েছে।

 

ঐ অভাব-অনটনের সময় ইমাম সাহেবের অবস্থা এরূপ ছিল যে, তিনি মানুষের নিকট থেকে পৃথক হয়ে গাছের ছায়ায় বসে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ মুখস্থ করতেন। তাঁর বোন পিতার কাছে তাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন যে, সে একা বসে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ মুখস্থ করছে।

 

কয়েকজন প্রসিদ্ধ শায়খ এবং উস্তাদ

ইমাম মালেক (রহঃ) যাদের নিকট থেকে ইলমে দ্বীন অর্জন করেছেন তাদের সংখ্যা অনেক। এঁদের মধ্যে বিশিষ্ট তাবেঈন, প্রসিদ্ধ ফকীহ এবং মুহাদ্দিছ রয়েছেন।

 

যুরকানী বলেন, ইমাম মালেকের শিক্ষকের সংখ্যা নয় শতাধিক। গাফেকী পঁচানব্বই জনের নাম উল্লেখ করেছেন। কয়েকজনের নাম নিম্নে দেয়া হলঃ

 

রবীয়া রাঈ, নাফে’ মাওলা ইবনে উমর, মুহাম্মদ বিন মুসলিম বিন শিহাব যুহরী, আমের বিন আব্দিল্লাহ বিন যুবাইর, নাঈম বিন আব্দিল্লাহ আল মুহমার, যায়েদ বিন আসলাম, হুমাইদুত্তবিল, সায়ীদ মাকবুরী, আবু হাযেম সালামা বিন দীনার, শরীক বিন আব্দিল্লাহ বিন আবু নোমায়ের, ছালেহ বিন কায়সান, ছাফওয়ান বিন সুলাইম, আবু্যযিনাদ, মুহাম্মদ বিন মুনকাদের, আব্দুল্লাহ বিন দীনার, আবু তেওয়ালা, আব্দুর রাব্বি বিন সায়ীদ, উমর বিন আবি আমর আলা বিন আব্দির রহমান, হিশাম বিন উরওয়া বিন যুবাইর, ইয়াযীদ বিন মুহাজির, ইয়াযীদ বিন আব্দিল্লাহ বিন খুসাইফা, আবুয যুবাইর মক্কী, ইব্রাহীম ইবনে উকবা, মুসা বিন উকবা, আইয়ুব সাখতিয়ানী। ইসমাঈল বিন আবি হাকীম,হুমাইদ বিন আব্দির রহমান, জাফর ছাদেক বিন মুহাম্মদ, হুসাইদ বিন কায়স মক্কী, দাউদ বিন হুসাইন, যিয়াদ বিন সাদ, যায়েদ বিন রাবাহ, সালেম বিন আবিদর, সুমাই মাওলা আবি বকর বিন আব্দির রহমান, সুহাইল বিন আবি ছালেহ, ছাযফী মাওলা আবি আইয়ুব, হামযা বিন সায়ীদ, ত্বলহা বিন আব্দিল মালেক আয়লী, আব্দুল্লাহ বিন আবি বকর বিন হযম, আব্দুল্লাহ বিন ফযল হাশেমী, আব্দুল্লাহ বিন ইয়াযীদ, আব্দুর রহমান বিন আব্দিল্লাহ বিন ছা’ছা, আব্দুর রহমান বিন কাসেম, উবাইদুল্লাহ বিন আব্দিল্লাহিল আগার, আমর বিন মুসলেম বিন উমারা, আমর বিন ইয়াহয়া বিন উমারা, কুতুব বিন ওহব, আবুল আসওয়াদ, ইয়াতীম, উরওয়া, মুহাম্মদ বিন আমর বিন হালহালা, মুহাম্মদ বিন ইয়াহয়া বিন হাব্বান, মাখরামা বিন-বুকাইর প্রমুখ।

 

ইরাকী শায়খ 

ইমাম মালেক (রহঃ)-এর ইরাকের কোন শায়খ ছিলেন না। তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র আবু মুছ আব বলেন, কোন এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনি ইরাকী শায়খদের কোন রেওয়ায়াত গ্রহণ করেন না কেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমি তাদেরকে দেখেছি যে, তাঁরা এমন লোকের নিকট হতে হাদীছ শিক্ষা করেন যাঁদের উপর কখনো বিশ্বাস করা যায় না। এরপরও তাদের থেকে কিভাবে আমি রেওয়ায়াত করতে পারি?

 

আবু মুছআবও এ বিষয়ে একমত যে, ইরাকী লোকেরা তাদের নিজেদের দেশে এমন লোকদের থেকে হাদীছ শিক্ষা করে যাদের উপর নির্ভর করা যায় না।

 

শুয়াইব বিন হারবও ইমাম সাহেবকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জবাবে বলেছিলেন, আমাদের বুযুর্গগণও তাদের বুযুর্গদের নিকট হতে কোন রেওয়ায়াত গ্রহণ করেন নাই। এজন্য আমিও তাদের নিকট হতে কোন রেওয়ায়াত গ্রহণ করি না।

 

মদীনার বাইরের শায়খদের নিকট হতে রেওয়ায়াত গ্রহণ করতে ইমাম সাহেব খুবই যাচাই বাছাই করে নিতেন।

 

ইরাকের শায়খদের মধ্য হতে তিনি শুধু আইয়ুব সাখতিয়ানী হতে হাদিছ গ্রহণ করেছেন। তিনি বিখ্যাত তাবেয়ীদের মধ্যে গণ্য ছিলেন।

 

সায়ীদ বিন মুসাইয়েব তার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। শো’বা তাকে সাইয়্যেদুল ফুকাহা বলেছেন।

 

ইমাম সাহেব বলেন, আমি হজ্জের মৌসুমে মক্কা শরীফে তাকে দুই হজ্জে দু’বার দেখেছি। কিন্তু তাঁর নিকট হতে তখন কোন হাদীছ লিখিনি। তৃতীয় বছর তাকে যমযম কূপের নিকট উপবিষ্ট দেখতে পেলাম। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র নাম মুবারক শুনা মাত্র তিনি এরূপ ক্রন্দন করতে লাগলেন যে, আমি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠলাম। তাঁর এ অবস্থা দেখার পর হতে আমি তার নিকট হতে হাদীছ লিখতে শুরু করি।

 

দরস ও ইফতার আসনে

মেধা, প্রচেষ্টা এবং আগ্রহের কারণে ইমাম সাহেব সতের বছর বয়সে সমস্ত দ্বীনি ইলম অর্জন করে ফেলেছেন। ঐ বয়সেই তিনি তাঁর উস্তাদদের অনুমতিক্রমে এবং তাঁর যোগ্যতার সাক্ষ্যদানক্রমে দরস এবং ইফতার আসনে বসেন। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেন, সত্তরজন উলামায়ে কেরাম আমার যোগ্যতা সম্পর্কে সাক্ষী দেয়ার পূর্বে আমি ফতোয়া দেইনি।

 

তখনও তাঁর কয়েকজন শায়খ জীবিত ছিলেন। তিনি তাদের জীবদ্দশায়ই ফতোয়া দিতেন। আইয়ুব সাখতিয়ানী বলেন, হযরত নাফে’ বেঁচে থাকা কালে আমি মদীনা গিয়েছিলাম। তখন ইমাম মালেকের দরসী হলকা কায়েম ছিল। ইবনে মুনযের বর্ণনা করেন, ইমাম মালেক (রহঃ) তাঁর শায়খ নাফে’ এবং যায়দ বিন আসলামের জীবদ্দশায়ই ফতোয়া দেয়া শুরু করেন। মুসআবের বর্ণনানুসারে নাফে’র জীবদ্দশায়ই ইমাম মালেকের দরসী হলকা বেশ বড় ছিল। শো’বাও তদ্রুপ বর্ণনা করেন।

 

ইমাম সাহেবের ইফতার এবং দরসী হলকায় তাঁর অনেক শায়খও অংশ নিতেন। তিনি বলেন, আমার শিক্ষকদের মধ্যে এমন লোক কমই আছেন যাঁরা মৃত্যুর পূর্বে আমার নিকট এসে ফতোয়া জিজ্ঞেস করেননি। ইমাম সাহেবের ইফতার এবং দরসী হলকা দু’জায়গায় অনুষ্ঠিত হত। একটি হচ্ছে মদীনায় মসজিদে নবুবীর রওযায়ে জান্নাতে। যেখানে বসে তিনি নাফে’র নিকট থেকে ইলম অর্জন করেছেন। অপরটি হচ্ছে আকীক উপত্যকার জুরুফ নামক স্থানে। যেখানে তাঁর নিজস্ব বাড়ী ছিল।

 

বাড়ীতে যে মজলিস হত সেখানে ইমাম সাহেবের ডানে বাঁয়ে শিরোধান রাখা হত। সুগন্ধির জন্য উদ কাষ্ঠ’ জ্বালানো হত। পাখা রাখা হত। মজলিসে কোনরূপ আওয়াজ হত না। কুরাইশ এবং আনছার ব্যতীতও বাইরের অনেক ছাত্রের ভিড় জমত। কিন্তু মজলিসের আদব, নীরবতা এবং গাম্ভীর্যে কোন পরিবর্তন হত না। বাহিরের ছাত্ররা কোন প্রশ্ন করলে তিনি পালাক্রমে সেগুলোর উত্তর দিতেন। হাদীছে রাসূলের (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আদব সর্ববস্থায়ই রক্ষা করা হত।

 

ইমাম মালেকের শিক্ষা মজলিস

হযরত নাফে’ (রহঃ) যিনি হযরত ইবনে উমর (রাঃ)-এর স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। তিনি মৃত্যুবরণ করলে ইমাম মালেক (রহঃ) তার স্থলাভিষিক্ত হন। কূফার সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ শো’বা বলেন, আমি হযরত নাফে’র ইন্তিকালের পর মদীনায় এসে দেখলাম, ইমাম মালেক ধর্মজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। 

 

শো’বার এ উক্তি দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম মালেক (রহঃ) ১১৮ হিজরীতে তাঁর শিক্ষা মজলিস কায়েম করেন। কারণ ১১৭ হিজরীতে হযরত নাফে’র মৃত্যু হয়। অবশ্য কোন কোন বর্ণনামতে বুঝা যায় যে, হযরত নাফে’র জীবদ্দশায়ও ইমাম মালেক ফতোয়া দিতেন এবং তার দরসী হলকা কায়েম ছিল।

 

হাদীছ বর্ণনা করার পূর্বে ইমাম সাহেব অযু-গোসল করে অতি মূল্যবান উত্তম পোশাক পরিধান করতেন। তিনি কেশ বিন্যাস এবং সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। এ সমস্ত কাজ করার পর তিনি বাড়ী হতে বের হতেন।

 

শিক্ষা মজলিস শুরু হলে শিক্ষার্থী এবং শ্রোতাগণ নীরবে বসে যেতেন। এমন কি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ও যখন সে মজলিসে যোগ দিতেন তখন তিনিও সেখানে বিনয়ের সাথে বসে যেতেন। মজলিসে নীরবতা বিরাজ করত।

 

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, সভার নীরবতা বিনষ্ট হবার আশংকায় আমরা কিতাবের পাতাও অতি সর্তকতার সহিত উল্টাতাম। এসব নিয়মনিষ্ঠা এবং জাঁকজমকের সামনে রাজদরবারের জাঁকজমকও ম্লান হয়ে যেত।

 

ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিসের প্রশংসা করতে গিয়ে জনৈক কবি বলেন, ইমাম সাহেব যদি জবাব না দিতেন তবে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং গাম্ভীর্যতার কারণে কারো কোন প্রশ্ন করার সাহস হত না।

 

তিনি এত গুরুগম্ভীর ছিলেন যে, তাঁর গাম্ভীর্যতার প্রতি সকলেরই গভীর শ্রদ্ধা ছিল সকুলই প্রভাবিত ছিলেন। মানুষ তাকে ভয় করত। অথচ তার মাথায় কোন রাজ মুকুটও ছিল না। কিংবা তার হাতে কোন রাজদণ্ডও ছিল না। তবে এ কথা সত্য যে রাজদণ্ডের অধিকারীরা তার খিদমতে এসে বিনীত হয়ে বসে থাকতেন।

 

খলীফা হারুনুর রশীদ যখন মদীনায় আসলেন তখন তিনি ইমাম সাহেবের নিকট মুয়াত্তা কিতাবের ব্যাখ্যা শুনার বাসনা প্রকাশ করলেন। ইমাম সাহেব বললেন, আগামীকাল এ সম্বন্ধে আলোচনা হবে। খলীফার ধারণা ছিল আগামীকাল ইমাম সাহেব খলীফার দূরবারে উপস্থিত হবেন। কিন্তু ইমাম সাহেব খলীফার দরবারে না গিয়ে নিয়মিত শিক্ষা মজলিসে শিক্ষাদান আরম্ভ করলেন। খলীফা হারুনুর রশীদ এ বিষয় জানতে চাইলে ইমাম সাহেব বললেন, ইলমের নিকট লোক আসবে। ইলম কারো নিকট যাবে না।

 

শেষ পর্যন্ত খলীফা হারুনুর রশীদ সেই দরবারে আসার সিন্ধান্ত নিলেন যেই দরবারে সাধারণ শ্রোতা এবং অসাধারণ শ্রোতার মধ্যে কোন পার্থক্য চলে না। তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে সাধারণ লোেকদের তথা শ্রোতাদের বের করে দিতে বললেন। ইমাম সাহেব বললেন, ব্যক্তিগত স্বার্থে জনগনের স্বার্থ বরবাদ করা চলে না।

 

ইমাম মালেক (রহঃ) হাদীছের আলোচনা এবং চর্চা মসজিদে নবুবী এবং শিক্ষা মজলিসের বাইরে করতেন না। একারণেই খলীফা হারুনুর রশীদের দরবারে হাদীছের আলোচনা করতে ইমাম সাহেব সম্মত হননি।

 

রাস্তায় চলাকালে কিংবা কোন কাজে ব্যাস্ত থাকলে তিনি হাদীছ বর্ণনা করতেন না। একে তিনি আদবের খেলাফ মনে করতেন। অধিকন্তু কোন কিছু পরিপূর্ণভাবে শ্রবণ করতে এবং তার মর্ম অনুধাবন করতে পূর্ণ একাগ্রতার প্রয়োজন যা এরূপ অবস্থায় অসম্ভব প্রায়। উলামাদের মজলিসে উচ্চস্বরে কথা বলাটাও আদবের পরিপন্থী। একবার খলীফা আবু জাফর মনসুর ইমাম সাহেবের মজলিসে কোন বিষয়ে তর্ক বিতর্ক করার সময় তার কণ্ঠস্বর উচু হয়ে যায়। ইমাম সাহেব তাকে শাসাতে গিয়ে একটি আয়াত পাঠ করলেন, যার অর্থ হচ্ছে, ‘নবীর আওয়াজ থেকে তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না’।

 

ইমাম সাহেবের নিয়ম ছিল ফজরের নামাযের পর হতে সূর্য উদয় পর্যন্ত তিনি নামাজের বিছানাতে বসেই দোয়া দরুদ পড়তেন এবং যিকর আযকার করতেন। সূর্যোদয়ের পর লোক সমাগম আরম্ভ হলে ইমাম সাহেব তাদের প্রতি মনোনিবেশ করতেন। ইমাম সাহেব আস্তে আস্তে গম্ভীরস্বরে হাদীছের আলোচনা করতেন। একটি হাদীছ শেষ না করে অপর হাদীছ শুরু করতেন না।

 

মালেকী ফিকহ

ইমাম মালেক (রহঃ)-এর ফিকাহর ভিত্তি মদীনার ফিকাহ। মদীনায় অবস্থানকারী ছাহাবীদের থেকে তাবেয়ীরা যে ফিকাহ গ্রহণ করেছিলেন। ইমাম মালেক (রহঃ) তার উপরই তাঁর ফিকাহর ভিত্তি রাখেন।

 

শাহ ওলীউল্লাহ (রহঃ) লিখেন, ইমাম মালেক (রহঃ)-এর ফিকাহকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছের ছায়ারূপে মনে হয়।

 

এতে স্থান পেয়েছে ফারুকে আযমের শাসন পদ্ধতি। এই ফিকাহর ফতোয়া সমূহ ইবনে উমর এবং অন্যান্য ছাহাবায়ে কিরামের ফতোয়ার প্রতিধ্বনি করত।

 

মুয়াত্তা কিতাবের দলিলাদি হাদীছ সমূহ এবং ‘আছার’ গভীর মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করলে এটাই প্রতীয়মান হবে যে, ইমাম মালেক (রহঃ)-এর ফিকাহ্ এবং ফতোয়া হুকুমতে এলাহীর প্রতিধ্বনি ব্যতীত আর কিছুই নয়। ‘

 

মদীনার শায়খগণ ইমাম সাহেবের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মর্যাদার স্বীকার করা সত্ত্বেও সত্তরজন আলেমের অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত তিনি ফতোয়া দেননি।

 

সরকারী ঘোষণা

শুধু মদীনা এবং হেজাজ হতে নয় বরং বিভিন্ন দেশ হতে আগত প্রশ্নকারীরা ইমাম সাহেবের নিকট ভিড় লাগিয়ে থাকত।

 

হজ্জের মৌসূমে মুসলিম বিশ্বের মুসলমানগণ যখন আরাফার ময়দানে সমবেত হত এবং কূফা, বসরা ও খোরাসানের উলামায়ে কিরাম হারাম শরীফে একত্রিত হতেন, তখন সরকারীভাবে ঘোষণা করে দেওয়া হত যে, ইমাম মালেক এবং ইবনে আবী যি’ব ব্যতীত অপর কেউ যেন ফতোয়া না দেন।

 

মাসআলার ব্যাপারে ইমাম সাহেবের অনড়তা

ইমাম মালেক (রহঃ)কে খিলাফতের পক্ষ হতে যে অসাধারণ সম্মান দেওয়া হয়েছিল, অপর কাউকে যদি এরূপ সম্মান দেখানো হতো তবে তিনি খলীফার রীতিমত তোয়াজ করে চলতেন। কিন্তু ইমাম মালেক (রহঃ) ছিলেন ভিন্ন প্রকৃতির। তাই তো তিনি শরীয়তের কোন মাসয়ালার ব্যাপারে কোরআন হাদীছের আলোকে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তা প্রকাশ করতে রাজকীয় মতবাদের কোন তোয়াক্কা করেননি।

 

প্রশ্ন উঠল, কোন ব্যক্তি যদি অপরের জোর প্রয়োগের কারণে বাধ্য হয়ে নিজ স্ত্রীকে তালাক দেয় তবে কি এ তালাক পতিত হবে? ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মতে এ তালাক পতিত হবে কিন্তু ইমাম মালেক (রহঃ) এবং অধিকাংশ মুহাদ্দেছগণের মতে তালাক সাব্যস্ত হবে না।

 

মদীনার গভর্ণর ছিলেন জাফর বিন সুলাইমান। তিনি ছিলেন আব্বাসীয় বংশের সন্তান। খলীফা আবু জাফর মনসুরের চাচাত ভাই। তিনি ইমাম মালেক (রহঃ) এর উপর এই নির্দেশ জারী করলেন যে, তিনি যেন বাধ্য হয়ে যে তালাক দেয় তার তালাক পতিত না হওয়া সম্পর্কিত পূর্বের অভিমত অনুযায়ী ফতোয়া না দেন।

 

কিন্তু ইমাম সাহেব স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে তার স্বীয়মত ঘোষণা করলেন। ইমাম সাহেবকে তার এ সম্পর্কিত মতবাদ হতে বিরত রাখার জন্য সরকারী নির্দেশে দুররা মেরে শাস্তি দেওয়া হল। কিন্তু এতে কোন ফল ফলল না। তাঁকে নির্দয়ভাবে বেদম প্রহার করা হল। তথাপি ইমাম সাহেবের যতক্ষণ কথা বলার শক্তি ছিল; দুররা মারার সাথে সাথে বলতে ছিলেন মালেক বিন আনাস ফতোয়া দিচ্ছে যে, জোর জবরদস্তিতে বাধ্য হয়ে তালাক দিলে তালাক পতিত হবে না।

 

জবাবে চিন্তা এবং অনুসন্ধিৎসা

ইমাম মালেক (রহঃ) মাসায়েল বর্ণনা করার সময় এবং ফতোয়া দেওয়ার সময় যুগোপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে খোঁজ খবর নিয়ে সুচিন্তিতভাবে জবাব দিতেন।

 

ইবনে আবী উয়াইস বলেন, একবার ইমাম সাহেব বললেন, মাঝে মধ্যে এমন মাসয়ালা পেশ হয় যে, তাতে আমার আহার নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটায়। আমি বললাম, আপনার কথা লোকেরা পাথরে খোদিত বাণীর ন্যায় শিরোধার্য মনে করে থাকে। তথাপি আপনি এমন মাথা ঘামান কেন? ইমাম সাহেব তখন অতি সূক্ষ্ম উত্তর দিয়ে বললেন, হে ইবনে আবী উয়াইস! “এজন্যই তো আমার আরো অধিক সতর্ক এবং সাবধান হওয়া উচিত”।

 

এতদসত্ত্বেও যদি তার কোন মাসয়ালা ভুল হয়ে যেত এবং কেউ তা সংশোধন করে দিতেন তবে তিনি তা মেনে নিতেন।

 

জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করল, অযুর সময় পায়ের আঙ্গুল খিলাল করা কি আবশ্যকীয়? ইমাম সাহেব বললেন, এটা আবশ্যকীয় নয়। ইবনে ওহহাব নামক ইমাম সাহেবের এক ছাত্র সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, খিলাল সম্পর্কিত একটি হাদীছ আমার নিকট রয়েছে। ইমাম সাহেব হাদীছটি শ্রবণ করে বললেন, হাদীছটি গ্রহণযোগ্য। এরপর থেকে ইমাম সাহেব সর্বদাই সে হাদীছ অনুযায়ী ফতোয়া দিতেন।

 

দীর্ঘ প্রায় ষাট বৎসরকাল ক্রমাগতভাবে ইমাম ফিকহ এবং ফতোয়া সংকলন করেছেন। কাযী আসসাদ বিন ফোরাত আফ্রিকী নামক তাঁর জনৈক ছাত্র এ সম্পর্কিত সর্বপ্রথম কিতাব প্রনয়ন করেন। কিতাবটির নাম দেওয়া হয়েছিল আস’আদীয়া। ইবনে কাসেম নামক তার অপর এক শাগরেদ আল মুদাওয়ানা নামক অপর একটি কিতাব সঙ্কলন করেন। এ কিতাবটিই সর্ব প্রসিদ্ধ। তাঁর অপর এক শিষ্য ইবনে ওহহাব মিসরী ‘আল মুজালাছাত আন মালেক’ নামক আরেকটি কিতাব সংকলন করেন। এ কিতাবসমূহে ইমাম সাহেবের অজস্র ফতোয়ার সমাবেশ ঘটেছে।

 

আল মুদাওয়ানা কিতাব সংকলক ইবনে কাসেম সম্পর্কে বলা হয় যে, ইমাম সাহেবের চল্লিশ হাযার মাসয়ালা তার মুখস্ত ছিল।

 

ইমাম সাহেবের গুণ-গরিমা

ফিকহ ও হাদীছ শাস্ত্রের পাণ্ডিত্য পরিমাপের যদি কোন মাপকাঠি থেকে থাকে তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যাবে যে সে মাপকাঠি অনুযায়ী ইমাম সাহেবের স্থান অনেক উর্ধ্বে। তাঁকে আবরাবে রায় বা বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে গণ্য করা হয়।

 

ইয়াহয়া বিন মাঈন হাদীছ এবং রিজালের পরীক্ষক ছিলেন। তিনি ইমাম মালেক (রহঃ) কে আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদীছ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

সুফিয়ান বিন উলাইয়া যিনি একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ছিলেন। তিনি বলেন, ইমাম মালেকের তুলনায় আমরা অতি নগণ্য। তোমরা-আমরা প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর অনুসরণ করে থাকি। ইমাম মালেক যে শায়খের নিকট থেকে হাদীছ গ্রহণ করেছেন আমরাও তার থেকে হাদীছ গ্রহণ করেছি। আর তিনি যার রেওয়ায়াত গ্রহণ করেন নাই আমরাও তার কোন রেওয়াত গ্রহণ করি নাই।

 

আব্দুর রহমান বিন মাহদী বলেন, এ বিশ্ব চরাচরে ইমাম মালেকের চেয়ে হাদীছে নববীর অধিক আমানতদার আর কেউ ছিলেন না। অপর করো উপর অধিক গুরুত্ব দেয়া চলে না।

 

ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি যদি কারও হাদীছ হিফজ করতে চান তবে কার হাদীছ হিফজ করবেন? ইমাম আহমদ বললেন, মালেক বিন আনাসের হাদীছ হিফজ করবে।

 

প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ইমাম মাহদীকে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, আমি শুনেছি যে, আপনি বলে থাকেন, ইমাম মালেক ইমাম আবু হানিফা হতে ও শ্রেষ্ঠ ফিকাহবিদ। তিনি বললেন, আমি তা বলি না। কিন্তু আমি এ কথা বলে থাকি যে, ইমাম মালেক ইমাম আবু হানিফার উস্তাদ হাম্মাদের চেয়ে বড় ফকীহ।

 

ইবনে মাঈন বলেন, যুহরীর শিষ্যদের মধ্য হতে ইমাম মালেকের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য আর কেউ ছিলেন না। তিনি আরও বলেছেন, ইমাম মালেক খোদার তরফ হতে সৃষ্টি জগতের জন্য একটি প্রমাণ স্বরূপ।

 

ইমামুল হাদীছ ইয়াহয়া বিন সায়ীদ আল কাত্তান বলেছেন, মালেক উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য রহমতস্বরূপ

 

জনৈক বুযুর্গ বলেছেন, ইমাম মালেকের চেয়ে বড় আলেম আমি আর কাউকে দেখিনি।

 

আত্মসম্মানবোধ

আলেমদের আত্মসম্মানবোধ না থাকার অর্থ হল ইলমের সম্মান না করা। তাদের যথেষ্ট আত্মসম্মানবোধ থাকা চাই। তাদের জীবনধারণ এমন হওয়া চাই যে, তাদেরকে দেখে মানুষ যেন ইলমের প্রতি আগ্রহশীল হয়ে উঠে। ইমাম মালেক (রহঃ) সব সময়ই এ দিকে লক্ষ্য রাখতেন।

 

বড় বড় আমীর ওমরা ও বিচারকগণ ইমাম সাহেবের খিদমতে উপস্থিত হতেন। তাদের অনেকে ইমাম সাহেবের ভয়ে কম্পমান থাকতেন।

 

হারুনুর রশীদ তাঁর তাঁবুতে হাদীছের আলোচনা করার জন্য ইমাম সাহেবকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। ইমাম সাহেব তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, মানুষ ইলমের নিকট আসবে; ইলম মানুষের নিকট যাবে না। খলীফা ইমাম সাহেবের খিদমতে উপস্থিত হলেন। তিনি সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন হতে চাইলেন। ইমাম সাহেব জানিয়ে দিলেন শিক্ষা মজলিসের আদব রক্ষা করা উচিত। খলীফা নিম্নে আসন গ্রহণ করে বললেন, আপনি মুয়াত্তা পাঠ করুন। ইমাম সাহেব বললেন, ইহা আমার অভ্যাস বহির্ভূত। অতঃপর তাঁর ইঙ্গিতে জনৈক শাগরেদ পড়তে শুরু করেন।

 

উলামাদের প্রতি শ্রদ্ধা

খলীফা হারুনুর রশীদ যখন ইমাম সাহেবের খিদমতে উপস্থিত হলেন খলীফা হওয়া সত্ত্বেও তাকে উচ্চাসনের আশা ত্যাগ করে নিম্ন আসনে বসতে হয়েছে। পক্ষান্তরে একবার যখন ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলেন তখন ইমাম মালেক (রহঃ) তাঁকে এরূপ সম্মান প্রদর্শন করলেন যে, তাঁর নিজের চাদর ফরাশের উপর বিছিয়ে দিলেন। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) চলে যাওয়ার পর ইমাম মালেক (রহঃ) তাঁর ছাত্রদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, ইনি ইরাকের আবু হানিফা। তিনি যদি একটি স্তম্ভকে স্বর্ণে পরিণত করতে চান তবে তাঁর জন্য তাও সম্ভব।

 

এরপর কূফার মুহাদ্দিছ সুফিয়ান আগমন করেন, তাঁর প্রতি ইমাম মালেক (রহঃ) সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন।

 

আব্দুর রহমান বিন কাসেমের নিকট কোন পত্র লিখাকালে ইমাম মালেক (রহঃ) তাকে মিসরের ফকীহ বলে সম্বোধন করতেন।

 

একদা কানাবী নামক জনৈক মুহাদ্দিছ তাঁর খিদমতে গেলে তিনি ছাত্র সহকারে গিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন।

 

ইমাম সাহেবের দরসের পদ্ধতি

ইমাম সাহেবের দরসে তাঁর ব্যক্তিগত কাতেব (লেখক) হাবীব হাদীছ পড়তেন আর দরসে অংশগ্রহণকারী অন্যান্যরা শুনতেন। ইমাম সাহেবের ভয়ে কেউ নিজের কিতাব দেখত না এবং তাকে কোন প্রশ্ন করত না। হাবীব কোন ভুল করলে ইমাম সাহেব তা সংশোধন করে দিতেন। তিনি নিজে তা পড়ে শুনাতেন না। দরজায় ছাত্রদের ভিড় লেগে গেলে তাদেরকে ভিতরে ডাকার নির্দেশ দিতেন। প্রথমে বিশেষ ছাত্রদেরকে এবং পরে সাধারণ ছাত্রদেরকে ডাকতেন। কখনও কখনও আবার ইমাম সাহেব নিজেই ছাত্রদের সামনে স্বীয় কিতাব পাঠ করে শুনাতেন। ইয়াহয়া বিন বুকাইর বলেন, আমি ইমাম সাহেব থেকে চৌদ্দবার তাঁর কিতাব শুনেছি।

 

ছাত্র যদি স্বীয় উস্তাদের সামনে হাদীছ পাঠ করে তবে তাকে মুহাদ্দিছদের পরিভাষায় ‘আরয’ বলা হয়। এমতাবস্থায় ছাত্র (حدثنا) বলতে পারে। আর যদি এর বিপরীত উস্তাদ ছাত্রের সামনে হাদীছ পাঠ করে শুনান তবে এমতাস্থায় হাদীছ বর্ণনা করার সময় اخبرنا বলা চাই। ইমাম সাহেব উভয় প্রকারই আমল করেছেন।

 

ইমাম সাহেবের কন্যা ফাতেমার মুয়াত্তা মুখস্থ ছিল। দরস চলাকালে তিনি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতেন। যদি কোন পাঠক ভুল পড়ত তিনি নখ দিয়ে দরজায় খটখটাতেন। এতে ইমাম সাহেব বুঝে নিতেন এবং তা সংশোধন করে দিতেন। কখনও কখনও ইমাম সাহেবের পুত্র ইয়াহয়া বে-পরওয়াভাবে দরসে এসে যেতেন। ইমাম সাহেব শাগরেদদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন, একমাত্র আল্লাহই আদব শিখান, এ আমার ছেলে আর এ আমার মেয়ে। কিছুকাল পরে আর ইয়াহয়া বিন ইমাম মালেকের এ বেপরওয়াভাব রয়নি। তিনি মুয়াত্বা বর্ণনা করেন এবং একজন বিশিষ্ট আলেম হিসাবে প্রসিদ্ধ হন। তার নিকট থেকে ইয়ামানে মুয়াত্বা রেওয়ায়েত করা হয়। তিনি মিশর গিয়ে হাদীছের দরস দেন।

 

দরসী মজলিসে খলীফার পুত্র

একবার হজ্ব উপলক্ষে খলীফা মাহদী মদীনা মুনাওয়ারা গমন করেন। ইমাম মালেক তার সাক্ষাতে গেলে তিনি বড়ই তাযীমের সহিত তাঁর সাথে মিলিত হন এবং তার দুই ছাহেবজাদা মুসা এবং হারুনকে নির্দেশ দিলেন যেন তারা ইমাম সাহেবের নিকট হাদীছ পড়ে।

 

সরকারী কর্মকর্তারা তাঁকে ডেকে পাঠালে তিনি যাননি। খলীফা এর কারণ জানতে চাইলেন। ইমাম সাহেব বললেন, আমীরুল মুমেনীন! ইলম সম্মানের বস্তু। তার নিকট আসা চাই। খলীফা এ কথা মেনে নিলেন এবং ছেলেদেরকে তাঁর খিদমতে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁকে বলা হল যেন তিনি তাদের হাদীছ পড়ে শুনান। ইমাম সাহেব বললেন, এ শহরে উস্তাদের সামনে ছাত্ররা পড়ে যেমনিভাবে বাচ্চারা উস্তাদের সামনে বসে পড়ে, আর যখন কোন ভুল করে তখন উস্তাদ তা শুধরিয়ে দেন। পুত্রদ্বয় খলীফার নিকট গিয়ে এ কথা বলল। খলীফা লোক মারফতে ইমাম সাহেবকে বললেন, মুসা এবং হারুনকে ডেকে নেয়ার পর আপনি নাকি তাদেরকে পড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন? ইমাম সাহেব উত্তর লিখে পাঠালেন, আমীরুল মুমেনীন! আমি ইবনে শিহাবকে বলতে শুনেছি যে, আমরা সায়ীদ বিন সুমাইয়্যের, আবু সালমা, উরওয়া বিন যুবাইর, সালেম, খারেজা, সুলাইমান এবং নাফে’ থেকে এ স্থানে এভাবেই ইলম অর্জন করেছি। ইবনে হুরমু, আবুয যিনাদ, রাবীয়া, বাহরোল উলুম ইবনে শিহাব মুখের সামনে হাদীছ পাঠ করা হত। তাঁরা নিজেরা পড়তেন না। এরপর খলীফা মাহদী তার ছেলেদেরকে বললেন, তোমার গিয়ে নিজেরা পাঠ কর। এরা দ্বীনের ইমাম; অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয়। অতঃপর মুআল্লিম ইমাম সাহেবের সামনে হাদীছ পাঠ করেন আর তারা শ্রবণ করে।

এক বর্ণনানুসারে-এর ঘটনা হারুন-অর-রশিদের সাথে ঘটেছে। তার পুত্র আকীক উপত্যকায় ইমাম সাহেবের বাড়ীতে যেত। দরজা খোলা পর্যন্ত বাইরে বালিতে বসে থাকত।

 

দরসী মজলিসে জনৈক আলেম উপরোল্লেখিত ঘটনা খলীফার সাথে সম্পৃক্ত ছিল। ইমাম সাহেব খলীফার পুত্রদ্বয়কে পড়াতে অস্বীকার করেছেন এবং এরই উপর অটল ছিলেন। এর বিপরীতে একজন যাহেদ আলেমের ঘটনা শুনুন যাকে ইমাম সাহেব হাদীছ পাঠ করে শুনিয়েছেন।

 

আব্দুল মালেক বিন আব্দিল আযীয মাজেশুন বর্ণনা করেন, আমি ইমাম সাহেবের মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। ছুফী শ্রেণীর একজন আলেম এসে ইমাম সাহেবকে বললেন, আপনি আমাকে তিনটি হাদীছ বর্ণনা করুন। ইমাম সাহেব বললেন, তোমার প্রয়োজন হলে সেগুলো পড়ে আমাকে শুনিয়ে আমার পক্ষ থেকে রেওয়ায়েত কর। উক্ত আলেম বললেন, আবু আব্দিল্লাহ! আমাদের মাঝে আরয (শাগরেদ উস্তাদের সামনে পড়বে) এর প্রচলন নেই। ইমাম সাহেব বললেন, তুমি এ সম্বন্ধে ভাল জ্ঞান রাখ। তিনি বার বার এ কথা বলছিলেন। আর ইমাম সাহেব এ উত্তর দিচ্ছিলেন। ইমাম সাহেব যখন মজলিস থেকে উঠে যাচ্ছিলেন, সে ব্যক্তি ইমাম সাহেবের কাপড় আঁকড়ে ধরে বললেন, এ কবরবাসীর প্রতিপালকের কসম, যে পর্যন্ত আপনি আমাকে হাদীছ তিনটি বর্ণনা না করেন আপনার দামান (আঁচল) ছাড়ব না।

 

ইমাম সাহেব তাঁর শাগরেদ আবু তালহাকে বললেন, আমাকে তার হাত থেকে বাঁচাও। সে পাগল মনে হচ্ছে। আবু তালহা বললেন, পাগল মনে হয় না। আপনি যদি সমীচীন মনে করেন, তবে হাদীছ তিনটি বর্ণনা করুন। এরপর ইমাম সাহেব তাকে বললেন, আচ্ছা আস, কি চাও বল। তিনি বললেন, প্রথম হাদীছটি এই যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করার সময় কি তাঁর মাথায় শিরস্ত্রান ছিল? ইমাম সাহেব বললেন,

 

‘হযরত আনাস (রাঃ) থেকে ইমাম যুহরী আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিরস্ত্রান পরিহিত অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করেন। মালেক বলেন, অতঃপর ইবনে শিহাব বললেন, এ দিন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহরিম (এহরামকারী) অবস্থায় ছিলেন না।’

 

ঐ ছুফী আলেম বললেন, দ্বিতীয় হাদীছটি হচ্ছে, ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, এক ব্যক্তির দুই স্ত্রী; তন্মধ্যে একজন একটি বালককে অপরজন আরেকটি বালিকাকে দুধ পান করিয়েছে। ইমাম সাহেব বললেন,

 

‘আমর বিন শারীদ হতে ইবনে শিহাব আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে আব্বাসকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। যার দু’জন স্ত্রী। একজন একটি ছেলেকে এবং অপরজন একটি মেয়েকে দুধ পান করাল। তাদের উভয়ের মধ্যে কি বিবাহ হতে পারবে? তিনি বললেন, না! কারণ তারা উভয়ই এক দুধ পান করেছেন।

 

ছুফী আলেম বললেন, ইবনে উমর কি বকী থেকে একামত শুনেছেন? ইমাম সাহেব বললেন,

 

‘ইবনে উমর থেকে নাফে আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, বকী’ (মদীনার একটি কবরস্থান) থেকে তিনি একামত শুনতে পেয়েছেন। অতঃপর তিনি দ্রুত চলা শুরু করলেন।

 

স্পেনীয় এক তালেবে ইলম

ইমাম সাহেবের ছাত্রদের মধ্যে আবু মুহাম্মদ ইয়াহয়া বিন ইয়াহয়া আললায়ছী একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি স্পেন থেকে মদীনায় এসে ইমাম মালেক (রহঃ)-এর দরসী হলকায় শরীক হন। একদিন বাহিরে শোর উঠল, হাতি এসেছে! হাতি এসেছে! সমস্ত ছাত্র হাতি দেখার জন্য বাইরে চলে গেল। কিন্তু তিনি স্বীয় স্থান থেকে উঠেননি। ইমাম সাহেব তার মনের দিকে চেয়ে বললেন, তুমিও যাও হাতি দেখে এস। যোগ্য ছাত্র তার শিক্ষকের স্নেহ এবং ভালবাসার যে উত্তর দিয়েছেন, তা বর্তমান শিক্ষক-ছাত্র সবার জন্য একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে। তিনি বলেছেন,

 

“আমি আপন শহর থেকে আপনাকে দেখার এবং আপনার নিকট থেকে ইলম আদব শিক্ষা গ্রহণের জন্য এসেছি। আমি হাতি দেখার জন্য আসিনি”।

 

ইমাম সাহেব তাঁর প্রিয় ছাত্রের এ উত্তর শুনে খুবই আনন্দিত হলেন এবং তাকে ‘স্পেনের বুদ্ধিমান’ উপাধি দ্বারা ভূষিত করলেন।

 

ইয়াহয়া বিন ইয়াহয়া স্পেনে যান। সেখানে তার ইলম এবং জ্ঞানের প্রসিদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তার ইলমী এবং দ্বীনি প্রচেষ্টায় মালেকী মাযহাবের প্রসার ঘটে। বিশেষ করে তার নিকট থেকে মুয়াত্বা ইমাম মালেক রেওয়ায়েত করা হয়। মুয়াত্তা ইমাম মালেকের কয়েকটি কপি রয়েছে। তন্মধ্যে ইয়াহয়া বিন ইয়াহয়া মছমুদী কতৃক বর্ণিত কপি সবচেয়ে বেশী প্রচলিত এবং প্রসিদ্ধ।

 

শিষ্য এবং ছাত্র

ইমাম মালেক (রহঃ)-এর দরসগাহ থেকে দ্বীনি এবং ইলমী ফয়েযপ্রাপ্ত ছাত্রদের সংখ্যা অনেক বেশী। কাযী ইয়ায তরতীবুল মাদারেক কিতাবে আরবী বর্ণমালার ক্রমানুসারে তাদের নাম সংগ্রহ করেছেন। সেখানে তাদের সংখ্যা তের শতাধিকে উন্নীত হয়।

 

যাহবী লিখেন, ইমাম মালেক হতে এত অধিক সংখ্যক লোক হাদীছ বর্ণনা করেছেন যাদের সংখ্যা গণনা করা মুশকিল।

 

ইমাম মালেক (রহঃ) হতে তাঁর যে সমস্ত উস্তাদ এবং শায়খ হাদীছ রেওয়ায়েত করেছেন ইবনে হজর তাদের নাম বর্ণনা করেছেন। ইবনে শিহাব যুহরী, ইয়াহয়া বিন সায়ীদ আলকারী, ইয়াযীদ বিন আব্দিল্লাহ বিন হাদ এবং অন্যান্য অনেকে। সম-সাময়িকদের মধ্যে আওযায়ী, সুফিয়ান ছাওরী, ওয়ারকা বিন উমর, শো’বা বিন হাজ্জাজ, ইবনে জুরাইজ, ইব্রাহীম বিন তাহমান, লাইছ বিন সাদ মিছরী, সুফিয়ান বিন উয়াইনা প্রমুখের নাম উল্লেখ করেছেন। এঁদের পরে ইয়াহয়া বিন সায়ীদ কাত্তান, আব্দুর রহমান বিন মাহদী, ইমাম শাফেঈ, আব্দুল্লাহ বিন মুবারাক, ইবনে ওহ, ইবনে কাসেম, আবু আছেম, আবুল ওলীদ তায়ালেসী, মা’আন বিন ঈসা, সায়ীদ বিন মনছুর, মক্কী বিন ইব্রাহীম, ইয়াহয়া বিন আব্দিল্লা বিন বুকাইর এবং অন্যান্যদের নাম উল্লেখ করেছেন।

 

ফিকাহ এবং ফতোয়া

ইমাম মালেক (রহঃ) ফুকাহায়ে হাদীছের মধ্যে গণ্য। তাঁর ফেকহী মসলাক (মতবাদ) ছিল মদীনাবাসী; বিশেষ করে আব্দুল্লাহ বিন উমরের (রাঃ) মসলাক অনুরূপ। কিয়াস দ্বারাও তিনি মাসয়ালার সমাধান দিতেন। তাঁর প্রথম উস্তাদ রবীয়া রাষ্ট্র সম্বন্ধে তিনি মন্তব্য করেন, রবীয়ার মৃত্যুর পর ফিকাহর স্বাদ চলে গেছে।

 

ইমাম মালেক (রহঃ) তাঁর দ্বিতীয় উস্তাদ ইবনে শিহাব যুহরী সম্পর্কে যে মন্তব্য করেন, মুতাররফ বিন আব্দিল্লা তা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন,

 

আমি মদীনায় একজনকেই ফকীহ মুহাদ্দিছ পেয়েছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম তিনি কে? তিনি বললেন, ইবনে শিহাব যুহরী।

 

ইমাম আবু হানিফার (রহঃ) উস্তাদ হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান ফিকাহ এবং ফতোয়ায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আলীর (রাঃ) অনুসারী ছিলেন। মুহাদ্দেছদের, এক জামাত তাঁর ফিকাহ এবং ফতোয়ার খেলাফ ছিলেন। কিন্তু ইমাম মালেককে (রহঃ) তাঁর কোন কোন ছাত্র হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান হতেও ফিকাহ সম্বন্ধে অধিক জ্ঞানী বলে মন্তব্য করেছেন। আব্দুর রহমান বিন রস্তা বর্ণনা করেন, আমার সামনে একবার আব্দুর রহমান বিন মাহদীকে বলা হয়েছে, আবু সায়ীদ! জানতে পারলাম যে, ইমাম মালেককে (রহঃ) আপনি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) হতেও বিজ্ঞ ফিকাহবিদ মনে করেন। ইবনে মাহদী বললেন, আমি শুধু এতটুকু বলি না, বরং বলি যে, মালেক আবু হানিফার উস্তাদ হাম্মাদ হতেও বড় ফিকাহবিদ। এক বর্ণনায় রয়েছে, ইবনে মাহদী ইমাম মালেককে ইমাম আবু হানিফা হতে বড় ফিকাহবিদ বলেছেন।

 

ইবনে হযম ইমাম মালেককে ‘আলফকীহ’ বলেছেন। যাহবী তাকে ‘ফকীহুল উম্মাহ’ উপাধিতে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনে হজর ও আল-ফকীহ বলেছেন। ইবনে কুতাইবা আছহাবুর রায়’ এ ইমাম সাহেবের নাম উল্লেখ করেছেন। আখবারুল ফোকাহা’ কিতাবে ইবনে নদীম সর্বপ্রথম তাঁর আলোচনা করেছেন।

 

ইবনে ওহব বর্ণনা করেন, আমি মদীনায় ঘোষণা করতে শুনেছি যে, মালেক এবং ইবনে আবি যি’ব ব্যতীত অন্য কেউ লোকদেরকে ফতোয়া দিবেন না। তাঁরই বর্ণনা, ১৪০ হিজরীতে আমি হজ্জ করেছি। তখন ঘোষণাকারীকে বলতে শুনেছি যে, মালেক, ইবনে আবি যিব এবং আব্দুল আযীয মাজেশুন ব্যতীত অন্য কেউ ফতোয়া দিবেন না।

 

ইমাম সাহেবের ভাগিনা ইসমাঈল বিন আবি উয়াইস বলেন, আমার মামা ব্যতীত ফতোয়া দিতেন না।

 

ফতোয়ায় বিশেষ সর্তকতা

ইমাম সাহেব বলেন, আমার নিকট এটাই খুব কঠিন মনে হয় যে, আমাকে হালাল-হারাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়। মদীনায় আমি এমন আলেম এবং ফকীহ দেখেছি, যাদের নিকট ফতোয়া দেওয়া হতে মৃত্যু উত্তম ছিল। আর বর্তমানে লোকদেরকে দেখা যাচ্ছে যে, তারা ফিকাহ এবং ফতোয়ার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করছে। এর পরিণাম পরে কি হবে তা যদি জানত তবে এ কাজ থেকে তারা বিরত থাকত। হযরত উমর এবং হযরত আলী (রাঃ) শ্রেষ্ঠ ছাহাবী ছিলেন। যদি তাঁদের সামনে কোন মাসয়ালা আসত তবে তাঁরা সকল ছাহাবাদেরকে সমবেত করে পরামর্শ করতঃ ফতোয়া দিতেন। আর আমাদের যামানায় ফতোয়া দেওয়া গর্বের বিষয়। এজন্যই তাদেরকে সে পরিমাণ ইলম দেয়া হয়েছে। প্রকৃত ইলম থেকে তারা বঞ্চিত। আমাদের পূর্বসূরীদের পদ্ধতি ছিল যে, তারা বলতেন এটাকে আমি খারাপ মনে করি, এটাকে আমি পছন্দ করি। সরাসরি কোন বিষয়কে হালাল বা হারাম বলতেন না। কারণ হালাল-হারাম এমন দু’টি বিষয় যা আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

 

কানাবী বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেবের মৃত্যু-রোগের সময় আমি তাকে দেখতে গেলাম। সালাম করে বসে গেলাম। দেখলাম তিনি কাঁদছেন। আমি তাঁকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, কানাব তনয়! আমার চেয়ে কাঁদার অধিক হকদার কে? খোদার কসম! আমার আকাঙক্ষা, যে সমস্ত মাসয়ালা আমি নিজের রায় অনুযায়ী ফতোয়া দিয়েছি, সেগুলোর পরিবর্তে আমাকে দুররা মারা হত এবং আমার পদস্খলনগুলো ক্ষমা করা হত। হায় আফসোস! আমি যদি আমার রায় অনুসারে ফতোয়া না দিতাম।

 

আব্দুর রহমান বিন মাহদী বলেন, আমরা ইমাম সাহেবের নিকট বসা ছিলাম। এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বলল, হে আবু আব্দিল্লাহ! আমি ছয় মাসের দূরত্ব অতিক্রম করে আপনার নিকট এসেছি। আমার শহরবাসী কয়েকটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করার জন্য আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছে। অতঃপর সে কয়েকটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করল। সেগুলো শুনে ইমাম সাহেব বললেন, এ সম্বন্ধে আমার তাহকীক নেই। এ কথা শুনে সে খুবই আশ্চর্য হয়ে গেল। বলল, আমি আমার শহরবাসীদেরকে কি জবাব দিব? ইমাম সাহেব বললেন, তুমি গিয়ে শহরবাসীদের বলবে যে, মালেক বলেছে তার এ সম্বন্ধে ভালরূপে তাহকীক নেই।

 

হুছাইম বিন জুবাইল বলেন, আমার সামনে ইমাম সাহেবকে আটচল্লিশটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তন্মধ্যে তেত্রিশটির ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “আমার জানা নেই”!

 

খালেদ বিন খেরাশ বলেন, আমি ইমাম সাহেবকে চল্লিশটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করেছিলাম। তন্মধ্যে তিনি পাঁচটি মাসয়ালার উত্তর দিয়েছেন।

 

ইবনে ওহব বলেন, অধিকাংশ মাসয়ালায়ই ইমাম সাহেব আমার জানা নেই বলতেন।

 

ইমাম সাহেব বলেন, কোন কোন মাসয়ালার ব্যাপারে গবেষণা করতে গিয়ে আমি সারা রাত কাটিয়ে দেই। একটি মাসয়ালা নিয়ে দশ বছর পর্যন্ত চিন্তা করছি কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।

 

সলফদের ইত্তেবা (অনুসরণ) এবং বেদআতের প্রতি ঘৃণা

 

সুন্নতের অনুসরণে ইমাম সাহেব অনেক অগ্রগামী ছিলেন। বিদআত এবং মুহাছাত (ধর্মে নব সংযোজিত বিষয়সমূহ) কে খুবই ঘৃণা করতেন। আকায়েদের বিষয়ে কিতাব এবং সুন্নাহর শক্ত পাবন্দ ছিলেন। প্রতিটি দ্বীনি বিষয়ে সলফে ছালেহীনদেরকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে নিতেন। তাঁর সময়ই ই’তেযাল, ইলমে কালাম, জবর, কদর, রিফয, খুরুজ এবং অন্যান্য অনেক মাসয়ালা এবং মতবাদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু তিনি এসব কিছু হতে দূরে থেকে সলফদের পথে চলতেন। এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করল,

 

“রহমান আরশের উপর অধিষ্ঠিত, এর মর্ম কি?

ইমাম সাহেব উত্তর দিলেন,(আরবী)

 

আবু জুওয়াইরা নামক এক ব্যক্তির মুরজিয়া ফেরকার সাথে সম্পর্ক ছিল! একদিন সে ইমাম মালেককে বলল, হে আবু আব্দিল্লাহ! আপনার সাথে আমি কিছু কথা বলতে চাই। আপনি শুনুন। এ সম্পর্কে আমি আপনার সাথে বহছ-মুবাহাছা (তর্ক-বিতর্ক) করব। ইমাম সাহেব বললেন, তুমি আমাকে তোমার উপর সাক্ষী করো না। আবু জওয়াইরা বলল, আল্লাহর কসম! সত্যের অনুসন্ধানই আমার উদ্দেশ্য। আপনি সেগুলোর জবাব দিন। যদি সত্য হয় তবে আমি তা মেনে নেব। নচেৎ আপনি আমাকে তা মেনে নেয়ার জন্য যুক্তি দিবেন। ইমাম সাহেব বললেন, যদি এ তর্কে তুমি জয়ী হয়ে যাও? সে বলল, এমতাবস্থায় আপনি আমার কথা মেনে নিবেন। ইমাম সাহেব বললেন, যদি আমি বিজয়ী হয়ে যাই? সে বলল, তবে আমি আপনার কথা মেনে নেব। ইমাম সাহেব বললেন, যদি তৃতীয় কোন ব্যক্তি আমাদের মাঝে এসে যায় এবং আমাদের উভয়ের উপর জয়ী হয়ে যায়। সে বলল, তবে আমরা উভয়ই তার কথা মেনে নেব।’

 

একথায় ইমাম সাহেব বললেন, হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি মাত্র দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন। আর তোমাকে দেখছি তুমি এক দ্বীন ছেড়ে অন্য দ্বীন গ্রহণ করছ। উমর বিন আব্দিল আযীয বলেছেন, যে ব্যক্তি দ্বীনকে লড়াই ঝগড়ার বস্তু বানিয়ে নেয়, সে দ্বীন পরিবর্তন করতে থাকে।

 

এক ব্যক্তি ইমাম মালেক (রহঃ)-কে বাতেনী ইলম সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করল। ইমাম সাহেব রাগান্বিত হয়ে বললেন, বাতেনী ইলম সে আলেমই জানতে পারে যে যাহেরী ইলম জানে। কলবের মধ্যে নূর সৃষ্টি হলেই এ ইলম মিলবে। অতঃপর তাকে বললেন,

 

তুমি সঠিক দ্বীন অবলম্বন কর। সাবধান! তা থেকে মোটেই বিচ্যুত হবে না। তুমি যা জান, তা অবলম্বন কর, আর যা জান না, তা ছেড়ে দাও।

 

যখন কোন বক্র আকীদার লোক এসে তার সাথে কথা বলতে চাইত, তখন তিনি তাকে এ কথা বলে বিদায় করে দিতেন যে, আমি তো আমার প্রভুকেই দলীল হিসেবে মেনে নিয়েছি। তুমি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে আছ। তুমি তোমার মত আরেকজনের সাথে গিয়ে তর্ক-বিতর্ক কর।।

 

সুফিয়ান বিন উয়াইনা বলেন, আমি এমন ব্যক্তি সম্পর্কে যে হজ্জের ইচ্ছা করল এবং মীকাতের পূর্বে এহরাম বেঁধে ফেলল ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এ কাজ আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের নির্দেশের পরিপন্থী। এমন ব্যক্তি সম্বন্ধে আমি দুনিয়াতে ফিতনা এবং আখেরাতে কঠোর শাস্তির আশংকা করছি। তুমি কি আল্লাহ তাআলার এ বাণী শুননি

 

 “যারা আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করে তারা যেন এ বিষয়ের আশংকা করে যে, তাদের উপর কোন ফেত্না এসে যাবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক আযাব এসে যাবে।”

 

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মীকাত থেকে এহরাম বাঁধার নির্দেশ দিয়েছেন।

 

যুহদ, তাকওয়া, ইবাদত এবং রিয়াযত

সলফে ছালেহীনদের নিকট ইলম, আমল, যুহদ, তাকওয়া, ইবাদত এবং রিয়াযত এ সবকিছুর অর্থই হচ্ছে দ্বীন। আর ইমাম মালেক (রহঃ) এসব গুণে গুণান্বিত ছিলেন। তাঁর মধ্যে পূর্ণভাবেই এ গুণাবলীর সমাবেশ ছিল।

 

ইমাম সাহেব বলতেন, যে ব্যক্তি চায় যে, তার অন্তর উজ্জ্বল হোক, মৃত্যুর কষ্ট থেকে নাজাত লাভ হোক, কিয়ামতের বিভীষিকা থেকে নিরাপদে থাকুক, তার যাহেরী আমল হতে বাতেনী আমল অধিক হওয়া বাঞ্চনীয়।

 

মুছআব বিন আব্দিল্লাহ বর্ণনা করেন, যখন ইমাম সাহেবের সামনে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম নেয়া হত এবং তাঁর আলোচনা হত তখন তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেত এবং মাথা নীচু হয়ে যেত। আর বলতেন, আমি যা কিছু দেখেছি তা যদি তোমরা দেখতে তবে আমার এ অবস্থা দেখে আশ্চর্য হতে না। মুহাম্মদ বিন মুনকাদের সাইয়্যেদুল কোররা ছিলেন। আমরা তাঁর নিকট কোন হাদীছ জিজ্ঞেস করলে তিনি কান্না শুরু করতেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমি তাঁর নিকট আসা-যাওয়া করেছি। সবসময়েই তাঁকে তিন অবস্থার কোন এক অবস্থায় পেয়েছি। হয়ত নামাযরত অবস্থায় পেতাম, নচেৎ রোযাদার অবস্থায় পেতাম অথবা কোরআন তেলাওয়াতের অবস্থায় থাকতেন। অযু সহকারে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ বর্ণনা করতেন। তিনি আবেদ এবং যাহেদ ছিলেন। আমি তার নিকট গেলে তিনি তাকিয়া (উপাধান) রেখে দিতেন। অন্তরে যখন কঠোরতা বা গাফলতি অনুভব করি তখন মুহাম্মদ বিন মুনকাদিরকে এক নযর দেখে নেই। এতে কয়েকদিন পর্যন্ত আমার অন্তর তাঁর নেক প্রভাবে প্রভাবিত থাকে। প্রত্যেক মাসের প্রথম তারিখের পুরো রাত্রিটিই ইমাম সাহেব ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। কেউ এ অবস্থায় তাঁকে দেখলে বুঝতে পারত যে, তিনি এ মাসকে ইবাদত দ্বারা শুরু করেছেন এবং সম্ভাষণ জানাচ্ছেন। ইমাম সাহেবের কন্যা ফাতেমা বলেন, সত্যেক রাত্রেই ইমাম সাহেব তাঁর অযিফা আদায় করতেন। শুক্রবারের পুরো মাত্র তিনি ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন।

 

মুগীরা বর্ণনা করেন, একরাত্রে আমি ইমাম সাহেবের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি আলহামদুলিল্লাহ আলহাকুমুত্তাকাছুর সূরা পড়ছিলেন। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে গেলাম। ইমাম সাহেব যখন “লাতুস আলুন্না ইয়াওয়মা ইজিন আনিন নাইম” পর্যন্ত পৌছলেন তখন দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে থাকলেন এবং এ আয়াতই বার বার পড়ছিলেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে আমি সেখানে রয়ে গেলাম। ফজর হয়ে যাবে এমন সময় তিনি রুকু করলেন। আমি অযু করে মসজিদে প্রবেশ করলাম, দেখলাম তিনি ঐ অবস্থায়ই আছেন। তাঁর চেহারায় নুর চমকাচ্ছিল।

 

নফল নামাযে তিনি দীর্ঘ রুকু এবং দীর্ঘ সেজদা করতেন। দুররার শাস্তি প্রাপ্তির পর লোকেরা তাঁকে বলল, আপনি সংক্ষিপ্ত নামায পড়ুন। তিনি বললেন, বান্দার তো উচিৎ আল্লাহর জন্য যে আমল করবে তা যেন ভালভাবে করে আল্লাহ তাআলা বলেন,

 

নিশ্চয় তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন তোমাদের মধ্যে কে উত্তম আমলকারী।

 

ইমাম সাহেবের অবস্থা গোপন করার নমুনা এমন ছিল যে, তিনি রুমাল ভাঁজ করে রাখতেন। নামাযের সময় তার উপর সেজদা করতেন। তিনি বলতেন, এরূপ আমি এ কারণে করি যেন, সেজদার চিহৃ আমার কপালে না থাকে। কারণ মানুষ এটা দেখে ভাববে যে, আমি রাত্রি জাগরণ করি। তিনি বলতেন, আমি যদি জানতে পারি যে, আবর্জনাস্থলে গিয়ে বসলে আমার আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ হবে তাহলে আমি সেখানে গিয়েই বসব।

 

ইমাম সাহেব নির্জনস্থানে নফল ইবাদত করতেন যেন কেউ তাঁকে না দেখে এবং তাঁর বুযুর্গী প্রকাশ না পায়।

 

 

ইমাম সাহেবের গুণ ও স্বভাব চরিত্র

ইমাম সাহেব ঐ সমস্ত গুণে গুণান্বিত ছিলেন যেগুলো ছাহাবায়ে কিরাম এবং তাবেঈদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। যে গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি ইসলামী তা’লীমাতের নমুনা এবং আদর্শ ছিলেন। আকীক উপত্যকাস্থ ইমাম সাহেবের বাড়ীর দরজায় লেখা ছিল “মাশায়াল্লাহ” কেউ তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, কোরআন শরীফে বর্ণিত এক ঘটনায় রয়েছে।

“তুমি যখন আপন বাগানে প্রবেশ করলে তখন মাশাআল্লাহু বললে না কেন?”

 

ইমাম সাহেব মদীনার অপর একটি বাড়ীতে ভাড়া করে থাকতেন যার প্রকৃত মালিক ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)।

 

একবার খলীফা মাহদী তাঁকে তার ব্যক্তিগত বাড়ী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমার নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, (আরবী) “মানুষের সম্বন্ধই হচ্ছে তার বাড়ী”। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এর বাড়ীর সম্বন্ধই যথেষ্ট। তাঁর বাড়ীতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ফুরশ বিছানো থাকত। তাঁর আবাসগৃহ শাহী দরবার মনে হত। তিনি উত্তম এবং মূল্যবান কাপড় ব্যবহার করতেন। তিনি বলতেন, এতে আল্লাহ তাআলার নেয়ামতের প্রকাশ পায় এবং আমলী শুকরিয়া আদায় হয়। একবার কেউ তাঁকে বলল, আপনার ঘরে ছবি রয়েছে। তিনি বললেন, এ পর্যন্ত আমি তা দেখিনি। যা হোক তুমি মিটিয়ে দাও।

 

তিনি মদীনায় কখনও সওয়ারীতে চলতেন না। তিনি বলতেন, যে মাটিতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাফন হয়ে আছেন এবং যেখানে তিনি চলাফেরা করতেন তার উপর সওয়ারীর উপর আরোহণ করে চলা আদবের খেলাফ।

 

ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, একবার আমি ইমাম সাহেবের ঘরের সামনে উত্তম খোরাসানী ঘোড়া এবং মিশরীয় খচ্চর দেখতে পেলাম। এ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এগুলো আমি দান করলাম। আমি বললাম, কমপক্ষে একটা রেখে দিন। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহ তাআলার নিকট লজ্জাবোধ করছি যে, একটি চতুষ্পদ জন্তু দ্বারা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যমীন পদদলিত করব।

 

কোন কোন বর্ণনামতে ইমাম সাহেব মদীনার বাইরে সওয়ার হতেন। আব্দুস সামহ বর্ণনা করেন, একবার আমি ইমাম সাহেবকে একটি উন্নত খচ্চরের উপর সওয়ার দেখেছি। সেটার উপর উন্নতমানের গদি ছিল। এর উপর কাপড় ছিল। খাদেম তাঁর পিছে পিছে চলছিল। এভাবেই তিনি আকীক উপত্যকাস্থ বাড়ীর দরজা পর্যন্ত গেলেন।

 

খুবই উন্নতমানের খানা-পিনার ব্যবস্থা ছিল। তাঁর ভাগিনা ইসমাঈল বিন আবি উওয়াইস বলেন, দৈনিক দুই দেরহামের গোস্ত কেনা হত। এতে নাগা (বিরতি) হত না। কখনও কখনও এর জন্য ব্যবসার সামান বিক্রয় করতে হত। তার বাবুর্চী সালমাকে নির্দেশ দিতেন যেন শুক্রবার দিন খানা বেশী পাক করা হয়। পানীয় দ্রব্য গরমকালে চিনি এবং শীতকালে মধু ব্যবহার করতেন।

 

ইমাম সাহেব কলা খুবই পছন্দ করতেন। বলতেন, এ ফলে মাছিও বসে না এবং অপরিস্কার হাতও লাগে না। এটা জান্নাতের ফলের অনুরূপ। শীত গরম প্রত্যেক মৌসুমেই পাওয়া যায় যা জান্নাতের ফলের বিশেষত্ব।

 

তিনি সন্তান-সন্ততি এবং ঘরের অন্যান্যদের সাথে সদাচরণ করতেন। বলতেন, এতে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি পাওয়া যায়। সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং হায়াত বৃদ্ধি পায়; রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন ছাহাবার বর্ণনা থেকে এরূপই বুঝা যায়।

 

তিনি খুবই কম কথা বলতেন। কখনও হাসতেন না। বরং মুচকি হাসি হাসতেন। ইমাম সাহেবের নিকট চারশো দীনার ছিল। তিনি সেগুলোর দ্বারা ব্যবসা করতেন। লভ্যাংশ দ্বারা পরিবারের ব্যয় বহন করতেন। একবার তাঁকে তিন হাজার দীনার দেয়া হয়েছিল। তিনি সেগুলো গ্রহণ করেননি। বাড়ীও বানাননি বা ব্যবসায়ও লাগাননি। আগেই বলা হয়েছে যে, ইমাম সাহেবের পিতা নেযা বা বর্শা তৈরী করতেন এবং এটাই ছিল তার জীবিকার মাধ্যম। আর ইমাম সাহেবের ভাই নযর বাযযায (সুতি কাপড় বিক্রেতা) ছিলেন। প্রথমত ইমাম সাহেবও সে ব্যবসায় শরীক ছিলেন।

 

ইমাম সাহেব জ্ঞান-বুদ্ধিতে বাল্যকাল থেকেই প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর প্রথম উস্তাদ রবীয়া রাঈ তাঁকে আসতে দেখলে বলতেন ‘আকেল’ অর্থাৎ জ্ঞানী আসছে। ইবনে মাহদী বলেন, আমি মালেক, সুফিয়ান, শো’বা এবং ইবনুল মুবারকের মধ্যে মালেককেই সর্বাধিক বুদ্ধিমান পেয়েছি। আমার দু’চোখ তাঁর চেয়ে গম্ভীর, জ্ঞানী-বুদ্ধিমান এবং মুত্তাকী আর কাউকে দেখেনি।

 

ইবনে ওহব (রাহঃ) বলেন, আমরা ইমাম সাহেব থেকে ইলম অপেক্ষা আদব বেশী শিখেছি। ইমাম সাহেব স্বয়ং বলেন, আমি কখনো বোকা অথর্ব বাজে মানুষের সাথে বসি না।

 

ইয়াহয়া বিন ইয়াহয়া মছমুদ উলসী ইমাম সাহেব থেকে ইলম অর্জ করার পর এক বছর তাঁর খেদমতে থেকে ইসলামী আদব শিখেন। তিনি বলেন আমি ইমাম মালেকের অভ্যাস এবং গুণাবলী শেখার জন্য অবস্থান করি। কারণ এটা ছাহাবা এবং তাবেঈদের চরিত্র এবং গুণ। এজন্যই ইমাম মালেক ‘আকেল’ বলা হত।

 

সততা ও নির্ভীকতা

সততা এবং নির্ভীকতা উলামায়ে ইসলামের বিশেষ গুণ। এ বিষয়েও ইমাম সাহেব সলফে ছালেহীনদের পথ অবলম্বন করেছেন। কয়েকটি ঘটনা আগে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি খলীফা এবং আমীরদের সাথে মিলিত হয়ে নির্ভীকতার সাথে তাদের সামনে সত্য কথা বলে আসতেন। একবার লোকেরা ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কেন যালেম-অত্যাচারী শাসকদের নিকট আসা-যাওয়া করেন? ইমাম সাহেব বললেন, ‘তাদের নিকট নয় তো সত্য কথা কাদের নিকট বলা হবে’!

 

ইমাম সাহেব বলেন, আমি আবু জাফর মনছুরের নিকট অনেক বার গিয়েছি। কিন্তু একবারও তার হাতে চুমো দেইনি। অথচ হাশেমী, অহাশেমী প্রত্যেকেই তার হাতে চুমো দিয়েছে।

 

আবু জাফর মনসুর ১৫০ হিজরীতে একবার মদীনায় আগমন করেন। আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি বললেন, মালেক! আপনার চুল অনেক বেশী সাদা হয়ে গিয়েছে। আমি বললাম, আমীরুল মুমেনীন! যার বয়স অধিক হয় তার চুলও অধিক সাদা হয়। অতঃপর তিনি বললেন, মালেক! ছাহাবায়ে কিরাম থেকে আপনি হযরত ইবনে উমরের (রাঃ) মতের উপর অধিক নির্ভর করেন। এর কারণ কি? আমি বললাম, আমীরুল মু’মেনীন! আমাদের এখানে তিনিই সর্বশেষ জীবিত ছিলেন। প্রয়োজনের সময় লোকেরা তাঁকে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করত এবং তদানুসারে আমল করত। এ কথা শুনে আবু জাফর মনুছুর বললেন, নিঃসন্দেহে আপনার নিকট সত্য রয়েছে।

 

ইমাম সাহেব বর্ণনা করেন, একবার আবু জাফর মনছুর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, পৃথিবীতে কি আপনার চেয়েও বড় আলেম রয়েছেন? আমি বললাম, হ্যা। তিনি বললেন, তাদের নাম বলুন, আমি বললাম তাদের নাম আমার স্মরণ নেই। এরপর তিনি বললেন, আমি চাই যে, আপনার ইলম (মুয়াত্বা) সারাদেশে চালু করে দেই। সেনাপতি এবং কাযীদের নিকট নির্দেশ পাঠিয়ে দেই, যেন তারা এ ইলম শিখে এবং সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়। আর যে ব্যক্তি এর বিরুদ্ধাচরণ করবে, যেন তার গর্দান উড়িয়ে দেয়। আমি বললাম, আমীরুল মুমেনীন! রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের জন্য আর্দশ ছিলেন। গযওয়া এবং জিহাদের জন্য তিনি সৈন্য পাঠাতেন। তাঁর জীবদ্দশায় অনেক দেশই বিজয় হয়নি। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে হযরত আবু বকর (রাঃ) এ দায়িত্ব পালন করেন। তখনও অনেক দেশ বিজয় হয়নি।

 

এরপর হযরত ওমর (রাঃ)-এর যুগ আসে। তাঁর হাতে অনেক দেশ বিজয় হয়। তিনি বিজিত দেশগুলোতে ছাহাবায়ে কিরামকে মুআলেম হিসেবে পাঠান। তাঁদের কাছ থেকে ইলমে দ্বীন হাছেল করা হত। এমনকি বর্তমানেও এ ধারা প্রচলিত রয়েছে। এখন আপনি যদি ছাহাবা কিরামের ছাত্রদের মধ্যে আমারই ইলম প্রবর্তন করেন তবে তাদের নিকট যে ইলম রয়েছে তার বিপরীত এই ইলম অপরিচিত মনে হবে; ফলে ফিতনা সৃষ্টি হবে। কাজেই প্রত্যেক শহরবাসীদের তাদের ইলমের উপর থাকতে দিন। আপনি নিজে আমার ইলমের উপর আমল করুন। এ কথা শুনে আবু জাফর বললেন, এটা তো অত্যন্ত দূরদর্শিতার কথা। আপনি আমার ছেলে মাহদীর জন্য এ ইলম (মুয়াত্বা) লিখে দিন।

 

হুসাইন বিন উরওয়া বলেন, একবার হজ্জের সময় বাদশা হারুনুর রশীদ মদীনা আগমন করেন। ইমাম সাহেবের খিদমতে পাঁচশ দীনারের একটি থলি তিনি প্রেরণ করলেন। হজ্জ সমাপ্ত করে তিনি আবার মদীনায় আগমন করেন এবং ইমাম সাহেবের নিকট তিনি এ পয়গাম পাঠান যে, আমীরুল মুমেনীনের ইচ্ছা যে, মালেক বাগদাদ পর্যন্ত তার সফরসঙ্গী হোন।

 

এর জবাবে ইমাম সাহেব দূতকে বললেন, তুমি গিয়ে বল যে, ঐ থলিতে এখনও মোহর মারা আছে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “মদীনা তাদের জন্য উত্তম যদি তারা জানত।”

 

এ কথা শুনে হারুনুর রশীদ তার ইচ্ছা থেকে বিরত হলেন।

 

ইমাম সাহেবের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরা একবার আবু জাফর মনছুরের নিকট গিয়ে বলল, মালেক আপনাদের বাইয়াত বৈধ মনে করেন না এবং আব্বাসীয় খিলাফত স্বীকার করেন না। এতে আবু জাফর মনছুর রাগান্বিত হয়ে ইমাম সাহেবের দেহ নিরাবরণ করে কোড়া মারলেন। এতে তাঁর হাত ভেঙ্গে যায় এরপরও আরো অনেক শাস্তি দেয়।

 

কিন্তু এর ফলে ইমাম সাহেবের মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পেল। এ কোড়া যেন তাঁর জন্য অলংকার হল। তাঁর জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে গেল।

 

সমকালীন হাদীছ ও ফিকাহবিদগণের দৃষ্টিতে ইমাম সাহেব

 

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা ও আব্দুর রাজ্জাক সানআনী বলেন, হযরত আবু হোরায়রাহ হুযুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে যে হাদীছ বর্ণনা করেছেন, “অচিরেই বহু দূর-দূরান্ত থেকে কিছু লোক ইলম হাসিল করার উদ্দেশ্যে সফর করে আসবে তখন তারা মদীনার আলেমের চেয়ে বড় কোন আলেম পাবে না।” আমাদের মতে তিনিই হচ্ছেন ইমাম মালেক।

 

ইমাম শাফীঈ (রহঃ) বলেন, যদি ইমাম মালেক এবং সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা না থাকতেন, তাহলে হেজাজ হতে ইলম শেষ হয়ে যেত।

 

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) বলেন, ইমাম মালেক হাদীছের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর নিকট থেকে যে ব্যক্তি হাদীছ গ্রহণ করেছে তার সম্পর্কে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে না। এ ধরনের আরো বহু হাদীছ ও ফিকাহ্ বিশারদগণ তাঁর ইলমী পরিপক্কতার সাক্ষাৎ প্রদান করেছেন।

 

ইমাম সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর ব্যক্তি ছিলেন। তাঁকে দেখলেই ভয়ের সঞ্চার হতো। কারো তাঁর সামনে কথা বলার সাহস হত না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তিনি খোশকছুফি ছিলেন। বরং স্থান বিশেষে তিনি হাসি কৌতুকও করতেন।

 

একবার কবি ইবনে সরজুন তার কবিতা ইমাম সাহেবকে শুনানোর প্রস্তাব দিল। ইমাম সাহেব ভাবলেন কারো নিন্দা সম্পর্কিত কবিতা হতে পারে, তাই তিনি শুনতে অস্বীকৃতি জানালেন। কিন্তু ইবনে সরজুন বার বার অনুরোধ জানালে তিনি শেষ পর্যন্ত শুনতে সম্মত হলেন। কবিতাটি এই (আরবী)

 

অর্থঃ মুফতী মালেককে প্রেম যৌবন এবং সুন্দরীদের ভালবাসা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস কর। তিনি ফতোয়া দিবেন যে আমি ভুল করিনি। এসব দ্বারা তো আমি শুধু চিন্তা দূর করি। যে প্রেমিক প্রেম এবং ভালবাসা গোপন রাখে, সে কি গুনাহগার? এবং সে কি ধ্বংস হচ্ছে?

 

এ কবিতা শুনে ইমাম মালেক (রহঃ) হেসে উঠলেন, অথচ তিনি এরূপ খুব কমই হাসতেন।

 

মুহাম্মদ বিন ফযল মক্কী বর্ণনা করেন, একবার ইমাম মালেক (রহঃ) এক গায়িকাকে এ কবিতাগুলো গাইতে শুনলেন, (আরবী)

 

অর্থঃ তুমি আমার বোন। তুমি আমার প্রতিবেশীর ইযযত। প্রতিবেশীর হিফাযত করা আমার কর্তব্য। যতদিন সে অনুপস্থিত থাকে, আমি তার রক্ষক। তার অনুপস্থিতিতে আমি তার বিষয়াদি দেখাশুনা করি। প্রতিবেশীর দরজার পর্দা ঝুলানো থাকুক বা না-ই থাকুক; সর্ববস্থায়ই আমি তার হেফাযত করি।

 

এ কবিতা শুনে ইমাম সাহেব বললেন, এগুলো যদি কা’বার পাশে শুনানো হয়, তবু জায়েয হবে। তোমরা তোমাদের যুবকদের এধরনের কবিতা মুখস্থ করাও।

 

আবু হাযেম বললেন, জাহেলিয়াতের যমানার লোকেরা তোমাদের চেয়ে উত্তম প্রতিবেশী ছিলেন। তদানীন্তন কালের এক কবি বলেন,(আরবী)

 

অর্থঃ আমার আগুন এবং প্রতিবেশীর আগুন এক। আমার আগেই তার ওখানে পাতিল নামান হয়। আমি যে প্রতিবেশীর প্রতিবেশী তার দরজার পর্দা না থাকায় কোন অসুবিধা নেই। যখন আমার প্রতিবেশী বের হয়, সে পর্দার আড়ালে যাওয়া পর্যন্ত আমি অন্ধ হয়ে থাকি।

 

এ ধরনের কবিতা শুনায় শুনানোতে কোন অসুবিধা নেই। ইমাম সাহেবের ভাগিনা ইবনে আবি উওয়াইস বলেন, আমি ইমাম সাহেবের সাথে হেঁটে চলছিলাম। আমার খাদেমা পানির পাত্র মাথায় নিয়ে বলছিল,

 

অর্থঃ এমন যদি হত! আমি সালমার যমীন হতাম আর সে আমাকে তার দু’পা দিয়ে পদদলিত করে যেত। এমন যদি হত! আমি সালমার জামা হতাম। সে আমাকে পরে তার উপর চাদর জড়াত! এমন যদি হত! আমি সালমার খাদেম হতাম (এমন খাদেম) যে এমন জায়গায় বসে আসে যেখান থেকে তাকে দেখা যায়। 

 

এ কবিতা শুনে ইমাম সাহেব বললেন, ইসমাঈল! এ পুরুষ না মেয়ে? আমি বললাম, এ হচ্ছে বনী আমারার দাসী গাযাল। তিনি বললেন, সে বড়ই বাকপটু, সাহিত্য সম্বন্ধেও ভাল জ্ঞান রাখে।

 

ইমাম সাহেব একজন যুবককে দেখতে পেলেন যে, সে দাম্ভিকতার সাথে চলছে। ইমাম সাহেব সে যুবকের পাশে গিয়ে তার মত হাঁটতে লাগলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার এ চলনটা কি ভাল? সে বলল, এ চলনটা ঠিক নয়। ইমাম সাহেব বললেন, তবে তুমি কেন এভাবে চল? এ কথা শুনে সে তার চলনভঙ্গি সংশোধন করে নিল।

 

ইবনে মাহদী একবার ইমাম সাহেবকে বললেন, অনেকদিন হল মদিনার এসেছি। বাড়ীর অবস্থা কেমন চলছে জানা নেই। ইমাম সাহেব মুচকি হেসে বললেন, ভাতিজা! আমার ছেলে সন্তান আমার নিকটেই আছে কিন্তু আমার জানা নেই, তারা কি অবস্থায় আছে। ইবনে আবি মরিয়ম বলেন, একবার ইমাম সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে মিশরীয়! তোমাদের ওখানে মসজিদে কি দারোয়ান থাকে? আমি বললাম, হ্যা থাকে। তিনি বললেন, তবে তো এটা মসজিদ নয়; জেলখানা।

 

ইমাম সাহেব বললেন, একবার ইবনে শিহাব যুহরী মদীনায় আগমন করলেন। তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য খুব ভােরেই তাঁর নিকট গেলাম। তিনি মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যেই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়ে গেল। ঐ সময় তার সাথে ছিল তার গোলাম আনাস। ইবনে শিহাব তার এক বাদীর বিবাহ তার সাথে করে দিয়েছিল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বিবিকে কেমন পেয়েছ? আনাস উত্তর দিল। জনাব! তাকে জান্নাত পেয়েছি। এ কথা শুনে ইবনে শিহাব বললেন, আল হামদুলিল্লাহ! আর আনাসের কথার অর্থ বুঝতে পেরে আমি হেসে উঠলাম। ইবনে শিহাব আমাকে হাসার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, গোলামের কথার অর্থ হল তার বিবির সাথে তার মিল হয়নি। জান্নাতে প্রশস্ততা এবং শীতলতা রয়েছে। ইবনে শিহাব আনাসকে জিজ্ঞেস করলেন, এমন নাকি? সে বলল, ব্যাপারটা ঠিক এরকমই। আমার কথায় ইবনে শিহাব অনেক হাসলেন।

 

সমসাময়িকদের সমালোচনা

হাদীছ বর্ণনাকারীদের সম্বন্ধে ইমাম সাহেব যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন। তিনি তাদের সমালোচনায় (জরাহ-তাদীল) স্বীয়মত জনসমক্ষে প্রকাশ করতেন। এ ব্যাপারে তার নিকট কোন কোন আলেম সম্বন্ধে এমন সব মন্তব্য পাওয়া যায় যাতে সম-সাময়িকতার আভাস রয়েছে। যেমন তার শাগরেদ মুহাম্মদ বিন ফুলাইহ বর্ণনা করেন, দু’জন কুরাইশী শায়েখ থেকে বর্ণনা করতে ইমাম সাহেব আমাকে নিষেধ করেছেন। তিনি নিজে সে দুজন থেকে কয়েকটি রেওয়ায়েত মুয়াত্বায় উল্লেখ করেছেন এবং এ উভয় শায়েখই হুজ্জাত। এ বর্ণনাটি উল্লেখ করার পর ইব্রাহীম বিন মুনযের বলেন, একে অপরের প্রতি মন্তব্য এবং সমালোচনা করা থেকে অনেক লোকই বাঁচতে পারেনি। যেমন ইমাম শাবী সম্বন্ধে ইব্রাহীম নখয়ী মন্তব্য করেছেন। আবার ইকরামা সম্বন্ধেও স্বয়ং ইমাম শাবীর মন্তব্য রয়েছে। এ ধরনের সমসাময়িকীয় মন্তব্যের প্রতি আহলে ইলমগণ ভ্রুক্ষেপ করেননি এবং এর দ্বারা আদালতও বিনষ্ট হয় না। তবে এর সাথে সাথে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় তবে আদালত থাকবে না। কারণ অস্পষ্ট। জারাহ বা অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়।

 

ইমাম মালেক এবং ইবনে ইসহাক

ইমাম মালেক (রহঃ) একবার মদীনার প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ এবং সমর-ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ বিন ইসহাকের সমালোচনা করেন। ইবনে আব্দিল বার এ সম্বন্ধে লিখেন যে, এ মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। (আরবী)

 

অর্থঃ তদ্রুপ মুহাম্মদ বিন ইসহাক সম্বন্ধে ইমাম মালেক (রহঃ)-এর মন্তব্য। তার কারণ এ ছিল যে, তার নিকট তার ইলম এবং বংশপরম্পরা সম্বন্ধে কোন তথ্য পৌছেনি।

 

ইবনে ইদ্রীস বর্ণনা করেন, আমি ইমাম সাহেবের নিকট উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আবু আব্দিল্লাহ! আমি রায় দেশের উযীর আবু উবাইদিল্লাহর মজলিসে বসছিলাম। সেখানে মুহাম্মদ বিন ইসহাকও উপস্থিত ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, আমার সামনে মালেকের ইলম (মুয়াত্বা) উপস্থিত কর। আমি ঐটির চিকিৎসক। এ কথা শুনে ইমাম সাহেব বললেন, সে তো দাজ্জালদের মধ্যে একজন।

 

অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, ইমাম সাহেব বললেন, সে তো দাজ্জালদের মধ্য হতে এক দাজ্জাল। তাকে আমরা মদীনা শহর থেকে বের করে দিয়েছি।

 

ইবনে হাব্বান বলেন, এ কথাটি ইমাম সাহেব একবার মাত্র বলেছিলেন। এরপর তিনি তার সাথে ন্যয়সঙ্গত আচরণ করেন। অধিকন্তু ইমাম সাহেব হাদীছের বিষয়ে ইবনে ইসহাক সম্বন্ধে সমালোচনা করেননি। বরং তার কারণ এই যে, নও-মুসলিম ইয়াহুদীদের সন্তান থেকে যারা খায়বার এবং অন্যান্য যুদ্ধের ঘটনা মনে রেখেছে মুহাম্মদ বিন ইসহাক গযওয়া (যুদ্ধ) সম্পর্কিত রেওয়ায়েত গ্রহণ করতেন। ইমাম মালেক (রহঃ) এ বিষয়টি অপছন্দ করতেন। অথচ ইবনে ইসহাকও এ ধরণের রেওয়ায়েত দলীল মনে করতেন না। আর ইমাম মালেক (রহঃ) রেওয়ায়েতের ব্যাপারে এত কঠিন ছিলেন যে, তিনি শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য রাবীদের রেওয়ায়েতই জায়েয মনে করতেন।

 

কারো কারো ধারণা এরূপ যে, ইবনে ইসহাক সম্বন্ধে ইমাম মালেকের (রহঃ) মন্তব্য করার কারণ এ ছিল যে, তার দিকে শিয়া এবং কদরীয়া মতবাদের সম্বন্ধ করা হয়েছিল। তবে হিফজ (স্মরণশক্তি) এবং ছিদক (সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা) এর ব্যাপারে বলা যায় যে, তিনি ছদুক (খুবই বিশ্বস্ত) এবং হাফেযে হাদীছ ছিলেন। ইবনে শিহাব যুহরী তার প্রসংশা করেছেন। শো’বা, সুফিয়ান ছাওরী, সুফিয়ান বিন উয়াইনা প্রমুখসহ ইমামদের একদল তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। এক বর্ণনা মতে বুঝা যায় যে, হিশাম বিন উরওয়ার অনুকরণ করে তার সম্বন্ধে একথা বলেছেন। এক বর্ণনায় এরূপও রয়েছে যে, ইমাম সাহেব সম্বন্ধে মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেছেন যে, তিনি কুরাইশদের গোত্র বনু তাইমের মওলা (আযাদকৃত দাস) ছিলেন। ইমাম সাহেব সে কথাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন। একথাগুলো সাময়িক ছিল। কিন্তু পরবর্তী আহলে ইলমগণ একে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। ঐ দুজন বুযুর্গের মনে যা ছিল না তা বর্ণনা করা হয়েছে।

 

জ্ঞানের বাণী

মহৎ ব্যক্তিদের কথা তাদের অভিজ্ঞ জীবনের-আয়না এবং অপরের জন্য পথপ্রদর্শক। তাদের সাধারণ কথাও বিরাট ফলদায়ক হয়ে থাকে। সেগুলো মেনে আমল করে জীবন সৌন্দর্যমণ্ডিত করা যায়। ইমাম মালেক (রহঃ)-এর এ ধরনের অনেক বাণীই কিতাবে উল্লেখ রয়েছে। কয়েকটি বাণী উল্লেখ করা হচ্ছে

 

আহলে ইলম অনেক রকমের রয়েছে। 

 

১। যে আলেম নিজের ইলমানুসারে আমল করে। এমন ব্যক্তি সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবী)

“আল্লাহর বান্দাদের মধ্য হতে একমাত্র আলেমরাই আল্লাহকে ভয় করে।”

 

২। যে আলেম নিজে ইলম অর্জন করে অপরকে তা শিক্ষা দেয় না, তার সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,

 

“যারা আমার নাযিলকৃত প্রমাণসমূহ এবং হেদায়াত গোপন করে।”

 

৩। যে আলেম নিজে ইলম অর্জন করার পর তা অপরকে শিক্ষা দেয় কিন্তু নিজে তদনুসারে আমল করে না। এমন ব্যক্তি সম্বন্ধে আল্লাহ বলেন, (আরবী)

 

“তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়।”

 

যুবাইরী বলেন, আমি ইমাম সাহেবকে বললাম, যখন আমি সৎকাজে আদেশ দেই তখন কেউ কেউ আমার কথা মেনে নেয়। আবার কেউ কেউ আমাকে কষ্ট দেয়, আমার ক্ষতি করে এবং আমার সাথে খারাপ আচরণ করে। এমতাবস্থায় আমার কি করা উচিৎ? ইমাম সাহেব বললেন, যদি তুমি বুঝতে পার যে, লোকেরা তোমার কথা গ্রহণ করবে না, তবে তুমি তাদের ছেড়ে দাও। মনে মনে তাদের পাপকার্য ঘৃণা কর। এ সুযোগ তোমার রয়েছে। আর যে ব্যক্তি থেকে তোমার ক্ষতির কোন আশংকা নেই, তুমি তাকে ভাল কাজের নির্দেশ দাও এবং মন্দকাজ থেকে নিষেধ কর। এ কাজটা তুমি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হিসাবে কর। এর ফল তুমি ভালই দেখবে। বিশেষ করে যখন তোমার মধ্যে এ ব্যাপারে নম্রতা পাওয়া যায়। আল্লাহ মুসা এবং হারুনকে (আঃ) নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা ফেরআউনের সাথে নম্র ব্যবহার আচরণ করে। এরূপ করলে শ্রবণকারী তোমার কথার প্রতি মনোযোগ দিবে, তা গ্রহণ করবে।

 

– বাতেলের নৈকট্য ধ্বংসের কারণ। বাতেলের মধ্যে এবং হকের মধ্যে অনেক দূরত্ব রয়েছে। ধর্ম এবং মর্যাদা বিনষ্টের পর যে পার্থিব সম্পদ লাভ হয় তার মধ্যে কোনই মঙ্গল নেই। যদিও তা অনেক হয়।

 

– আমি জানতে পেরেছি যে, কিয়ামতের দিন যেসব প্রশ্ন নবীদেরকে করা হবে, আলেমদেরকেও সে সব প্রশ্ন করা হবে।

– মসজিদে মুনাফিকদের উপমা সে পাখীর মত যাকে খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। যখনই দরজা খোলা হল পাখী উড়ে গেল।

– রেওয়ায়েতের আধিক্য দ্বারা ইলমে দ্বীন অর্জিত হয় না। বরং তা এমন একটি নূর যা আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে ঢেলে দেন। ইলমে দ্বীন অর্জন করা খুবই উত্তম। তবে তোমাদের দেখতে হবে যে, তজ্জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কি করতে হবে- সেটা অবলম্বন করা চাই।

– একবার ইমাম সাহেব মুতাররফকে জিজ্ঞেস করলেন, মানুষ আমার সম্পর্কে কি বলে? মুতাররফ বললেন, বন্ধুরা প্রশংসা করে আর শত্রুরা নিন্দা করে। ইমাম সাহেব বললেন, মানুষের অবস্থা এই যে, তার শত্রু-মিত্র উভয়ই থাকে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মানুষের মন্দ বলা থেকে নিরাপদে রাখুন।

– এ উম্মতের শেষ স্তরের লোক ঐ জিনিস দ্বারাই কল্যাণ পেতে পারে যদ্বারা তার প্রথমস্তরের লোকেরা কামিয়াব হয়েছে।

– অহংকার, হিংসা এবং কার্পণ্য থেকে পাপের সৃষ্টি হয়।

– যে বস্তুকেই চাও তুমি খেলার বস্তু বানাও কিন্তু নিজের দ্বীনকে নয়।

– আল্লাহ তাআলার আরশের উপর ‘মুসতাবী’ আছে কিন্তু তার অবস্থা (ধরন) অজানা। এ সম্পর্কে কথা হওয়া জানা বলা বিদআত।

– যদি দু’টি বিষয়ে তুমি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাক তবে যেটা তোমার অনুকূলে সেটা অবলম্বন কর।

– তুমি ইলম হাছেল করার পূর্বে হিলম (গাম্ভীর্য) হাছেল কর।

– যে ব্যক্তি কথাবার্তায় সততা অবলম্বন করবে। মৃত্যু পর্যন্ত সে তার আকল বা জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হতে থাকবে এবং বৃদ্ধাবস্থায় প্রলাপ থেকে নিরাপদে থাকবে।

– আল্লাহ তাআলার আদব কোরআনে রয়েছে, তাঁর রাসূলের (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আদব সুন্নাত হাদীছে রয়েছে এবং ছালেহীনদের আদব ফিকাহতে রয়েছে।

 

অবয়ব এবং পোষাক-পরিচ্ছদ

ইমাম সাহেবের দেহের বর্ণ লাল-সাদা মিশ্রিত ছিল। তিনি দীর্ঘাঙ্গী ছিলেন। তার মাথা ছিল বড়, চক্ষুদ্বয় ছিল আয়ত। তাঁর চেহায়া ছিল সুন্দর ও কান্তিময়।

 

তার শশু ছিল দীর্ঘ। গোঁফ ছিল পরিমিত। তিনি খেযাব ব্যবহার করতেন না। তিনি খুবই উত্তম পোশাক ব্যবহার করতেন এবং উত্তম খাদ্য আহার করতেন। আদন, খোরাসান, মরভ এবং ত্বারাযের উন্নত কাপড় ব্যবহার করতেন। সাধারণতঃ তাঁর পোশাক সাদা রংয়ের হত। কখনও কখনও হালকা হলুদ রংয়ের কাপড়ও ব্যবহার করতেন। তাঁর আংটিতে কালপাথর খচিত থাকত। সেখানে ‘হাসবুন্নাল্লাহে ওয়া নেয়মাল ওয়াক্বিল’ খোদিত ছিল। উত্তম সুগন্ধি এবং আতর ব্যবহার করতেন। সাধারণতঃ সুখ-সমৃদ্ধি প্রকাশ করতেন, যেন ইলমী মর্যাদা ক্ষুন্ন না হয়। কখনও কেউ এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, এতে আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত নেয়ামতের প্রকাশ পায়।

 

রচনা

ইমাম সাহেবের যমানায় হাদীছ এবং ফিকাহর সংকলন শুরু হয়েছিল। ১৪০ হিজরী থেকে ১৫০ হিজরীর মাঝে ইসলামী জগতের প্রধান শহরগুলোয় উলামায়ে কিরাম ফিকাহর ক্রমানুসারে কিতাব লিখেন। এর প্রায় ত্রিশ বছর পর ১৭৯ হিজরীতে ইমাম সাহেবের মৃত্যু হয়। এ সময়ে অনেকেই কিতাব রচনা করেন। তন্মধ্যে ইমাম সাহেব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচিত কিতাবগুলোর মধ্যে ‘কিতাবুল মুয়াত্তা’ মাইল পোষ্টের মত।

 

কাযী আয়ায ইমাম সাহেবের রচিত কিতাব থেকে এ কিতাবগুলো চিহ্নিত করেছেন।

 

১। কিতাবুল মুয়াত্তা ২। রিসালাতুহু ইলা ইবনে ওহব ফিল কদর। ৩ কিতাবুননুজুমি ওয়া হিসাবি মাদারিয যমান ওয়া মানাযিলিল কমার। ৪। রিসালাতু মালেক ফিল আকযিয়া। ৫। রিসালাতুহু ইলা আবি গাসসান ফিল ফাতওয়া ৬। রিসালাতুহু ইলা হারুনির রাশীদ ফিল আদাবি ওয়াল মাওয়ায়েযে ৭। আতাফসীর লিগারীবিল কোরআন। ৮। কিতাবুস সিয়ার ৯। রিসালাহে ইলালায়েছ ফি ইজমায়ে আহলিল মদীনা।

 

মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক 

মুয়াত্তা সম্বন্ধে ইমাম শাফেয়ী বলেন,

 

পৃথিবীর বুকে ‘মুয়াত্তা মালেক’ হতে ধিক নির্ভুল কিতাব আর দ্বিতীয়টি নেই। কথিত আছে যে, বাদশাহ হারুনুর রশিদের অনুরোধে তিনি এ কিতাব লিখেন।

 

আতীক যুবাইরী বলেন, প্রায় দশ হাযার হাদীছ থেকে নির্বাচন করে ইমাম সাহেব মুয়াত্বা সংকলন করেন এবং প্রতি বছর তাহকীক তানকীহ (অনুসন্ধান এবং সত্যতা যাচাই) করতে থাকেন। এভাবে এ কিতাবটি সংক্ষিপ্ত হতে থাকে। একারণেই ইয়াহয়া বিন সায়ীদ কাত্তানের মন্তব্য রয়েছে যে, মানুষের ইলম দিনদিন বাড়তে থাকে আর ইমাম মালেকের কমতে থাকে। তিনি যদি আরও কিছু দিন বেঁচে থাকতেন তবে তা শেষ হয়ে যেত। সুলাইমান বিন বিলাল বলেন, মুয়াত্বায় প্রথমে চার হাযার বা তারও অধিক হাদীছ ছিল। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের সময় এক হাজারের কিছু বেশী হাদীছ বাকী রয়ে গেছে। ইমাম সাহেব প্রতি বছর তা সংক্ষিপ্ত করতে থাকেন প্রাচ্য পাশ্চাত্যের বহু আলেম ইমাম সাহেব থেকে মুয়াতা রেওয়ায়েত করেছেন। আবার অনেকে তার মৃত্যুর পর রেওয়ায়েত করেছেন। এ কারণে মুয়াত্ত্বার অনেক নুশখা। কাযী আয়ায এর সংখ্যা প্রায় বিশটি উল্লেখ করেছেন। আবার কেউ কেউ ত্রিশ উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে আবার কয়েকজন রাবী নিজের পক্ষ থেকে কিছু বাড়িয়ে কমিয়ে ভিন্ন কিতাবের রূপ দিয়েছেন। যেমন মুয়াত্বা ইমাম মুহাম্মদ। মূলতঃ সেটা ইমাম মালেকের মুয়াত্বা। কিন্তু এখন একটি ভিন্ন কিতাবের রূপ নিয়েছেন।

 

মুয়াত্তার বিভিন্ন রেওয়ায়াত

ইমাম মালেক (রহঃ) হতে মুয়াত্তা পাঠকারীর সংখ্যা অনেক। এদের প্রত্যেকেই যখন পরবর্তীতে মুয়াত্তা বর্ণনা করেন, তখন সেখানে কিছু কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এরূপ পার্থক্যের কারণে ইমাম মালেক (রহঃ)-এর মুয়াত্তার রেওয়াত ত্রিশ রকমের হয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে ইয়াহয়া ইবনে বুকাইর, আবু মাসহাব ইবনে ওহহাব প্রমুখসহ মোট এগারজনের রেওয়ায়াত নির্ভরযোগ্য। এদের মধ্যে আবার ইয়াহয়া উন্দুলসীর রেওয়ায়াতটিই সর্বাধিক প্রামাণ্য, সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত এবং গ্রহণযোগ্য। এর রেওয়াতের হাদীছগুলো সুনানের ক্রমানুসারে বিন্যস্ত রয়েছে।

 

ইয়াহয়া বিন ইয়াহয়া আল মসমুদী আল উলুসী ছিলেন বরবর নামক স্থানের অধিবাসী। সর্বপ্রথম তার দাদা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আবু আব্দিল্লাহ যিয়াদ বিন আব্দির রহমান বিন যিয়াদ আল খামসী ছিলেন ইমাম মালেক (রহঃ)-এর একজন বিশিষ্ট ছাত্র। ইনি কর্ডোভায় শিক্ষাদান করতেন। ইয়াহয়া প্রথমে তার নিকট পূর্ণ মুয়াত্তা পাঠ করেন। এরপর তিনি মদীনায় আগমন করে ইমাম মালেক (রহঃ)-এর নিকট হতে মুয়াত্তা পাঠ করতে থাকেন। কিন্তু পূর্ণ মুয়াত্তা পাঠ করার পূর্বেই ইমাম সাহেবের ইন্তিকাল হয়ে যায়।

 

ইমাম সাহেব ইয়াহয়াকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। স্পেনের শাসনকর্তাও তাঁকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তিনি ১৫২ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮২ বছর বয়সে ২৩৪ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। চারটি মাসয়ালা ব্যতীত অন্যান্য সব মাসয়ালায় তিনি ইমাম সাহেবের অনুসরণ করতেন।

 

আব্দুল্লাহ বিন ওহ্হাব মিশরীও মুয়াত্তা লিপিবদ্ধকারীদের একজন। বিখ্যাত মুহাদ্দিস লাইন্দ বিন সায়ীদ মিশরীর নিকট হতে তিনি হাদীছ শিক্ষা লাভ করেন। ইমাম মালেক (রহঃ)-এর খ্যাতির কথা শুনে তিনি মদীনায় গমন করেন। সেখানে ইমাম মালেক (রহঃ)-এর সঙ্কলন ও কিতাবাদি লিপিবদ্ধ করার কাজে তিনি নিয়োজিত হন। মসমুআতে ইমাম মালেক নামে তিনি তিন খণ্ডের একটি কিতাব লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর রচিত কিতাবগুলোতে এক লক্ষ বিশ হাজার হাদীছ স্থান পেয়েছে। সব হাদীছই বিশুদ্ধ।

 

ইবনুল কাসেম মালেকী ছিলেন মালেকী মাযহাবের একজন বিখ্যাত ফকীহ। তিনি মালেকী মাযহাবের প্রখ্যাত কিতাব আল মুদাউওয়ানাতুল কুবরা সঙ্কলন করেন। ইমাম সাহেবের সমস্ত ফতোয়াকে তিনি কিতাবাকারে সঙ্কলন করেন। ১৯১ হিজরীতে তিনি ইন্তিকাল করেন।

 

মা’ন বিন ঈসা ছিলেন ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিসের হাদীছ পাঠক। খলীফা হারুনুর রশীদ ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিসে তারই পাঠদান শ্রবণ করেছিলেন। ইমাম সাহেবের চল্লিশ হাজার ফতোয়া তাঁর মুখস্থ ছিল। তিনি ইমাম বোখারী, মুসলিম এবং তিরমিযীর শায়খ ছিলেন। ১৯৮ হিজরীতে মদীনায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

মুয়াত্তা কিতাবের মর্যাদা

বোখারী, মুসলিম এবং মুয়াত্তার মধ্যে তুলনা করলে মুয়াত্তার স্থান কোথায়, উলামাদের মধ্যে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে। সাধারণতঃ এই কিতাবকে তিরমিযীর পরে স্থান দেওয়া হয়। আবার অনেকে সিহাহ সিত্তার পরে স্থান দেন। কিন্তু পূর্ববর্তী মুহাক্কেকীন বা হাদীছতাত্ত্বিকগণ এবং পরবর্তীতে শাহ ওলীউল্লাহ, শাহ আব্দুল আযীয প্রমুখ মুয়াত্তাকে বোখারীর উপরে স্থান দিয়েছেন।

 

মুয়াত্তার সর্বশ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য এই যে, এটি ইসলামের প্রথম কিতাব। কিতাবুল্লাহর পরেই হাদীছের স্থান। আর এই কিতাবটির মধ্যেই হাদীসে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ পেয়েছে সর্বপ্রথম। কাশফুযযুনূন কিতাবে বলা হয়েছে, মুয়াত্তা ইমাম মালেকই ইসলামের সর্বপ্রথম রচিত কিতাব।

 

এ কিতাবের ব্যাখ্যায় ইবনুল আরাবী উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামী শরীয়ত সম্পর্কে লিখিত কিতাবের মধ্যে এটিই সর্বপ্রথম।

 

সুফিয়ান বলেছেন, বিশুদ্ধ কিতাব সর্বপ্রথম ইমাম মালেকই লিখেন।

 

ইমাম মালেক (রহঃ)-এর মুয়াত্তা যে তার সমকালীন কিতাবগুলোর মধ্যেই শ্রেষ্ঠ তা নয়; পরবর্তীতে সঙ্কলিত কিতাবগুলো হতেও শ্রেষ্ঠ। তাই ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, কিতাবুল্লাহর পরে পৃথিবীর বুকে ইমাম মালেকের মুয়াত্তার চেয়ে বিশুদ্ধ কিতাব আর দ্বিতীয়টি নেই।

 

মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাকারী ইমাম নবুবী বলেন, আমি এমন একটি কিতাব পেয়েছি যা বোখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ ও নাসাঈ হতেও শ্রেষ্ঠ। যদিও এ সমস্ত কিতাব উত্তম কিন্তু মুয়াত্তা এমন এক কিতাব যার সঙ্কলনকারী সমস্ত মুহাদ্দেছের শায়খদেরও শায়খ।

 

ইমাম মালেক (রহঃ)-এর রেওয়ায়াত গ্রহণের উৎস এবং ইমাম বোখারী ও মুসলিমের রেওয়ায়াতের উৎসের মর্যাদার মধ্যে অনেক তফাৎ রয়েছে। কাজেই মুয়াত্তার রেওয়ায়াত এবং অন্যান্য কিতাবের রেওয়ায়াতের মধ্যেও পার্থক্য থাকবে। আর এটাই স্বাভাবিক।

 

মুজতাহিদদের মধ্যে ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এবং ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এবং মুহাদ্দেছগণের মধ্যে অনেকেই মুয়াত্তা’ কিতাব হতে রেওয়ায়াত করেছেন। মুহাদ্দেছগণের মধ্যে আব্দুল্লাহ বিন মুবারক হাশেম জামীল, ইমাম মনসুর বিন সালমা, আব্দুল্লাহ বিন ওহহাব, ইয়াহয়া প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

সূফীকুল শিরমণি যুনুন মিসরীও মুয়াত্তা হতে রেওয়ায়াত করেছেন।

 

খলিফাদের মধ্য হতে হাদী, মাহদী, হারুনুর রশীদ, আল মামুন, আল আমীনও এ কিতাব হতে রেওয়ায়াত গ্রহণ করেছেন। সাধারণ আলেমদের মধ্য হতে এ কিতাবের রেওয়ায়াত গ্রহণকারীর সংখ্যা অগণিত।

 

তানবীরুল হাওয়ালেক নামক কিতাবে আল্লামা সুয়ুতী লিখেন, ইমাম মালেকের নিকট হতে যত সংখ্যক রেওয়ায়াতকারী রয়েছেন অন্যান্য ইমামদের বেলা তা দেখা যায় না।

 

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হাদীছ বর্ণনাকারীর মাধ্যমের সংখ্যা যত কম হবে হাদীছের গুরুত্ব এবং মর্যাদাও তত অধিক হবে। এ বিষয়েও ইমাম মালেক (রহঃ) এর মুয়াত্তা, বোখারী মুসলিম হতেও অনেক উর্দ্ধে রয়েছে। কারণ মুয়াত্তায় তিনের অধিক মাধ্যম নেই। পক্ষান্তরে বোখারী, মুসলিমের অধিকাংশ হাদীছেই পাঁচ ছয়জন মাধ্যম রয়েছেন। বোখারী শরীফে মাত্র গুটি কয়েক হাদীছ রয়েছে। যেগুলোর মাধ্যম তিনজন। অথচ মুয়াত্তায় তিনের অধিক মাধ্যম কোন রেওয়ায়াতেই নেই। বরং এমন কিছু রেওয়ায়াত রয়েছে যেগুলোর মাধ্যম মাত্র দু’জন।

 

মুয়াত্তা ও সমসাময়িক কিতাব

মুয়াত্তার কিতাবের সমসাময়িক এবং তৎপূর্বে সঙ্কলিত সনদ সম্বলিত হাদীছের কিতাব যেগুলো বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে, সেগুলোর সাথে ইমাম মালেক (রহঃ)-এর এ কিতাবটির তুলনা করলে দেখা যাবে যে, বোখারী শরীফ এবং বায়হাকী শরীফ সঙ্কলকের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে ঠিক ততটুকু পার্থক্য রয়েছে মুয়াত্তার সঙ্কলক এবং তার সমসাময়িক ও তার পূর্বেকার কিতাব সঙ্কলকগণের মধ্যে।

 

মুয়াত্তার পূর্বে সঙ্কলিত কিতাবগুলোর মধ্যে সাহাবী এবং তাবেয়ীদের ‘আছার’ এবং ফতোয়ার উপর অধিক নির্ভর করা হয়েছে। পক্ষান্তরে মুয়াত্তার মধ্যে অকাট্য সনদ সম্বলিত হাদীছ এবং মুরসাল হাদীছের উপর নির্ভর করা হয়েছে অধিক। তারপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আছার’ এবং ফতোয়ার উপর।

 

অন্যান্য কিতাবগুলোর সাথে মুয়াত্তার একটি বিশেষ পার্থক্য এটাও যে, মুয়াত্তা কিতাবে সে সমস্ত হাদীছ সঙ্কলন করা হয়েছে যেগুলোর বিশুদ্ধতার বিষয়ে কোন অভিযোগ নেই। পক্ষান্তরে অন্যান্য কিতাবের হাদীছ অভিযোগ-মুক্ত নয়।

 

অধিকন্তু মুয়াত্তা সঙ্কলিত হয়েছে মদীনায়। ফলে এতে রয়েছে হেজাজী রেওয়ায়াত। যে রেওয়ায়াতের বিশুদ্ধতা সম্বন্ধে হাদীছ বিশারদগণ একমত। পক্ষান্তরে অন্যান্য কিতাবে হেজাজ ব্যতীত কুফা, বসরা, খোরাসান, সিরিয়া প্রভৃতি স্থানের রেওয়ায়াত স্থান পেয়েছে।

 

‘মুয়াত্তা‘ কিতাবের নামকরণের সার্থকতা

‘মুয়াত্তা’ শব্দটি তাওত্বীয়া শব্দের কর্মকারক। এ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, কোন কিছুর উপর দিয়ে চলা। যে পথে ইমাম, আলেম এবং বুযুর্গগণ চলেছেন মুয়াত্তা শব্দ দ্বারা, কেউ কেউ সে পথকে বুঝে থাকেন। এ কিতাবের নাম মুয়াত্তা রেখে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এ কিতাবের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সবাই একমত। এ কিতাবের রচনা শেষে হাদীছের শায়খদের নিকট পেশ করা হলে তারা সবাই এ কিতাবরে বিষয়বস্তু সম্বন্ধে একমত হয়েছেন এবং একে সমর্থন করেছেন। এ কারণে কিতাবটি মুয়াত্তা নামে প্রসিদ্ধ লাভ করে।

 

কেউ কেউ মুয়াত্তা শব্দের এই অর্থ গ্রহণ করেছেন, যে পথে অধিকাংশ লোক যাতায়াত করে তাকে মুয়াত্তা বলা যেতে পারে। এ অর্থেই কিতাবের নাম মুয়াত্তা রাখা হয়েছে। এটা সে পথ, যে পথে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা এবং তাঁর সাহাবাগণ চলে গিয়েছেন।

 

মুয়াত্তা সঙ্কলন

ইমাম মালেক (রহঃ) সর্বদাই মদিনায় অবস্থান করতেন। ফলে এ কথা সহজেই বলে দেওয়া যায় যে, মদীনা মুনাওয়ারাতেই মুয়াত্তার সঙ্কলন হয়েছিল। তবে কোন্ সনে সঙ্কলণ হয়েছে তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। একটুকু বলা যেতে পারে যে, হিজরী ১৩০ সন হতে ১৪০ সনের মধ্যে কিতাবটি সঙ্কলিত হয়েছিল।

 

১৩০ হিজরীতে বনী উমাইয়াদের পতনের সূচনা ঘটে। এর পূর্বে কিতাব রচনায় কিংবা সঙ্কলনে খুব বেশী লোক হাত দেননি।

 

খলীফা মনসুর ১৪৪ হিজরীতে সর্বশেষ হজ্জ করেন। সে সময়েই ‘মুয়াত্তা’ সর্বপ্রথম প্রচারিত হয় এবং প্রসিদ্ধি লাভ করে।

 

এক বর্ণনায় এরূপ রয়েছে যে, খলীফা মনসুরের আদেশক্রমেই মুয়াত্তা কিতাব সঙ্কলন করেন।

 

ইমাম সাহেবের মুয়াত্তা সঙ্কলনের কাজ আরম্ভ করার কথা মদিনায় রটে গেলে অন্যান্য আলেমগণও নিজ নিজ হাদীছসমূহ সঙ্কলন করতে আরম্ভ করলেন। ইমাম সাহেব এ কথা শুনে বললেন, শুধু নেক নিয়তই বাকী থাকবে।

 

ইমাম সাহেবের এ কথা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হল। এ কারণেই দেখতে পাই মুয়াত্তা কিতাব আজও সবার নিকট সমাদৃত। অথচ অন্যান্য কিতাবগুলির নাম পর্যন্ত কেউ অবগত নয়।

 

ইমাম মালেক (রহঃ) সঙ্কলন কার্য সমাপ্ত করে কিতাবটি হাদীসের শায়খদের খিদমতে পেশ করলেন। তাদের সকলেই কিতাবটিকে অত্যন্ত পছন্দ করলেন। মদিনাবাসী এতে আনন্দিত হল। মজলিসে যখন আলেমগণ ইমাম মালেকের মুয়াত্তার প্রশংসা করছিলেন, তখন সায়ীদ নামক জনৈক কবি একটি কবিতা পাঠ করলেন, যার অর্থ নিম্নরূপ

 

আমি তাদেরকে আহবান করছি যাঁরা হাদীছ রেওয়ায়াত করেন এবং লিপিবদ্ধ করেন, ফিকহর রাস্তায় বিচরণ করেন এবং এ সমস্ত জানতে কৌতুহলী। আপনি যদি চান যে, পৃথিবীর বুকে আপনি আলেম হিসাবে পরিচিত হবেন তবে শরীয়তের বাইরে কখনো পা বাড়াবেন না। আপনি কি সেই ঘর পরিত্যাগ করতে চান যে ঘরে আল্লাহর প্রিয় জিবরাঈল (আঃ) আসা-যাওয়া করতেন এবং যে ঘরে আল্লাহর রাসূল ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর ছাহাবাগণ সেটাকে স্বযত্নে হিফাযত করেছেন। আপনারা লক্ষ্য রাখবেন, যেন ইমাম মালেকের মুয়াত্তা বিনষ্ট হয়ে না যায়। যদি বিনষ্ট হয় তবে সত্য নিরাশ্রয় হয়ে পড়বে। আপনি মুয়াত্তার খাতিরে অন্য সব কিছু পরিত্যাগ করতে পারেন। কারণ মুয়াত্তা সূর্য স্বরূপ এবং অন্যগুলো তারকা স্বরূপ।

 

ইন্তিকাল

ইমাম সাহেব জীবনের শেষ বছরগুলোতে নির্জনতা ও একাকী জীবন গ্রহণ করে নেন। এমনকি জামাত বা জুমআর জন্যও বের হতেন না। তিনি বলেন, প্রত্যেকেই তার ওযর প্রকাশ করতে পারে না। এতদসত্ত্বেও তাঁর মকবুলিয়াত বা মর্যাদায় কোন পার্থক্য আসেনি।

 

এক বর্ণনামতে অবশেষে তিনি বলেছেন যে, আমি বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছি। এ অবস্থায় আমি মসজিদে নববীতে যেতে চাই না। কারণ এতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাযীম অক্ষুন্ন রাখতে পারব না। আর আমি আমার অসুস্থতার কথা জানিয়ে আল্লাহর নিকট অভিযোগ করতে চাই না। ইমাম সাহেব ২২ দিন অসুস্থ ছিলেন। ১৪ রবিউল আউয়াল, ১৭৯ হিজরী শনিবার দিন তিনি ইন্তেকাল করেন। ইবনে কেনান এবং ইবনে যুবাইর তাঁকে গোসল দেন। আর তাঁর পুত্র ইয়াহয়া এবং কাতেব হাবীব পানি ঢেলে সহযোগিতা করছিলেন। তাঁর অছিয়্ত অনুসারে সাদা কাপড় দ্বারা-কাফন দেয়া হয়। মদীনার আমির আব্দুল আযীয বিন মুহাম্মদ জানাযার নামায পড়ান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি (কলেমায়ে শাহাদাৎ) পড়েন এবং বলেন, “আল্লাহর জন্যই সমস্ত ক্ষমতা আগেও পরেও।” জান্নাতুল বাকীতে তাঁকে দাফন করা হয়।

 

মুসলিম বিশ্বের জন্য ইমাম সাহেবের মৃত্যু ছিল একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা।

 

উলামায়ে কিরাম সমবেদনা প্রকাশ করলেন, তার উচ্চ মর্যাদার স্বপ্ন দেখেন। কবিগণ শোকগাঁথা পড়লেন। যেখানেই এ সংবাদ পৌঁছল, সেখানেই শোকের ছায়া নেমে পড়ল।

 

আসাদ বিন খাররাত বর্ণনা করেন, আমরা বাগদাদে ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান শাইবানীর দরসী হালকায় বসা ছিলাম। একব্যক্তি অনেক কষ্টে তার নিকট গেল। এরপর ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) ইন্নালিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন পড়ে বললেন,

কত বড় মুছিবত এসে পড়েছে! মালেক বিন আনাস ইন্তেকাল করেছেন। হাদীছের সম্রাট ইন্তেকাল করেছেন।

মসজিদে যখন এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল তখন চারিদিকে শোকের এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়ে গেল।

সন্তান-সন্ততি

ইবনে হযম লিখেন, ইমাম মালেকের দু’জন ছেলে ছিলেন। একজন ইয়াহয়া অপরজন মুহাম্মদ। মুহাদ্দিছদের দৃষ্টিতে এ দুজনই যয়ীফ তথা দূর্বল। তাঁর এক পৌত্র আহমদ বিন ইয়াহয়া বিন মালেক ছিলেন। উওয়াইস, আবু সহল নাফে এবং রবী তিন জনই মালেক বিন আবি আমের নাফে’র সন্তান ছিলেন।

লিখা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য:

এই ইতিহাস সংগ্রহ করা হয়েছে “চার ইমামের জীবনী” গ্রন্থ থেকে। বইটি লিখেছেন, মাওলানা মতিউর রহমান, জামেয়া আরাবিয়া ফরিদাবাদ, ঢাকা। এটি প্রকাশ করেছে, মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার ঢাকা। এখানে আমার কোন মন্তব্য, তথ্য সংযোজন কিংবা বিয়োজন করা হয়নি।

 

Tags: জীবনী
Previous Post

ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ)

Next Post

ইমাম আযম আবু হানীফা (রহঃ)

Discussion about this post

নতুন লেখা

  • জ্বালানী তেল যেভাবে তৈরি হয়
  • শাহ পদবীটা বিরাট অদ্ভুত
  • তীর তথা ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিতে বলিয়ান হতে স্বয়ং রাসুল (সাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন।
  • তসবিহ দানা বৃত্তান্ত!
  • হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী দেওবন্দি ও বেরেলভী আকিদার সূত্রপাত

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় লেখা

No Content Available

নজরুল ইসলাম টিপু

লেখক পরিচিতি । গাছের ছায়া । DraftingCare

Facebook Twitter Linkedin
© 2020 Nazrul Islam Tipu. Developed by Al-Mamun.
No Result
View All Result
  • মুলপাতা
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • কোরআন
    • হাদিস
    • ডায়েরি
    • জীবনী
  • সাহিত্য
    • গল্প
    • রচনা
    • প্রবন্ধ
    • রম্য রচনা
    • সামাজিক
  • পরিবেশ
    • উদ্ভিদ জগত
    • প্রাণী জগত
    • ভেষজ হার্বাল
    • জলবায়ু
  • শিক্ষা
    • প্রাতিষ্ঠানিক
    • মৌলিক
    • ইতিহাস
    • বিজ্ঞান
    • ভ্রমণ
    • শিশু-কিশোর
  • বিবিধ
    • ঘরে-বাইরে
    • জীবন বৈচিত্র্য
    • প্রতিবেদন
    • রাজনীতি
    • তথ্যকণিকা
  • লেখক পরিচিতি

© 2020 Nazrul Islam Tipu. Developed by Al-Mamun.