ইমাম আযম আবু হানীফা নো’মান বিন ছাবেত কুফী (রহঃ) নাম ও বংশ পরম্পরা এরূপ, ইমাম আযম আবু হানীফা নো’মান বিন ছাবেত বিন নো’মান বিন মারযুবান আততায়মী আল-কূফী (রহঃ)। কেউ কেউ তাঁর দাদার নাম যোত্বা বিন মাহ বর্ণনা করেছেন। এর কারণ এই যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পূর্বে নোমানের নাম ছিল যোত্বা এবং মারযুবানের নাম ছিল মাহ। ইনি পারস্যের একটি এলাকার হাকেম ছিলেন। হাকেম বা প্রশাসককে মারযুবান বলা হয়। কারো কারো ধারণা এরূপ যে, যোত্ব শব্দটি ‘যুক্ত’ শব্দের আরবীরূপ, এর অর্থ জোতদার বা কৃষক। অবশ্য এ ধারনাটি ভিত্তিহীন। নো’মান বিন মারযুবান কাবুলের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। হযরত আলী (রাঃ)-এর খিলাফতকালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তিনি কুফায় আগমন করেন এবং সেখানেই বসতি স্থাপন করেন। হযরত আলী (রাঃ)-এর সাথে এ পরিবারের বিশেষ সম্পর্ক ছিল।
ইমাম সাহেবের পৌত্র ইসমাঈল বলেন, আমার নাম ইসমাঈল বিন হাম্মাদ বিন নো’মান বিন ছাবেত বিন নো’মান বিন মারযুবান। আমরা ফার্সী বংশোদ্ভুত। আল্লাহর কসম! আমাদের পরিবার কখনও কারো দাস ছিল না । আমার পিতামহ আবু হানিফা ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। আমার প্রপিতামহ বাল্যকালে হযরত আলীর (রাঃ) খিদমতে গিয়েছিলেন। তিনি তার জন্য এবং তার বংশের জন্য মঙ্গল কামনা করে দোয়া করেন। আমরা মনে করি তার এই দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুল করেছেন। একবার নববর্ষের উৎসবে নোমান বিন মারযুবান হযরত আলী (রাঃ) কে ফালুদা দ্বারা আপ্যায়ন করেছিলেন। তিনি বললেন, প্রতিটি দিনই আমাদের নববর্ষ। এক বর্ণনামতে এ ঘটনা মেহরাজন নামক উৎসবের সাথে সম্পৃক্ত।
বনীতায়মুল্লাহ বিন ছা’লাবা গোত্রের সাথে বন্ধুত্বঃ এ পরিবারটি কুফার একটি সম্মানিত গোত্র বনী তায়মুল্লাহ বিন ছালাবার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে চার ইমামের জীবনী তায়মী নিসবত সম্বন্ধ দ্বারা পরিচিত হয়। ভদ্রতা এবং আভিজাত্যের কারণে এ গোত্রের সদস্যদেরকে ‘মাসাবীহুযযুলাম’ বা অন্ধকারে প্রদীপ’ বলা হত।
ইমাম সাহেবের ছাত্রদের মধ্যে আবু আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ বিন ইয়াযীদ আলমুকরী আলমক্কী একজন উল্লেখযোগ্য মুকরী এবং মুহাদ্দিছ ছিলেন। ইনি বসরা কিংবা আহওয়াযের কোন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। হযরত উমর (রাঃ)-এর বংশের সাথে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল।
ইমাম ত্বাহাবী (রহঃ) তার ঘটনা এরূপ উল্লেখ করেন, আমি যখন ইমাম আবু হানিফার (রহঃ) খিদমতে উপস্থিত হলাম, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? আমি বললাম, আমি এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাআলা ইসলাম ধর্ম গ্রহণের তৌফিক দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন। এতে ইমাম সাহেব বললেন, তুমি এরূপ বলো না। বরং এ গোত্রগুলোর কারো বন্ধুত্বে এসে যাও এবং তাদের দিকে সম্পর্কিত হয়ে যাও। আমিও এরূপ ছিলাম।
ইমাম ত্বহাবীর (রহঃ) ছাত্র হাফিয ইবনে আবি আওয়াম “ফাযায়েলু আবি হানিফা ওয়া আসহাবীহী” নামক কিতাবে লিখেন যে, ইমাম সাহেব আরও বলেছেন যে “আমি তাদের সত্যবাদী পেয়েছি।”
বনী তায়মুল্লাহর আভিজাত্য এবং ভদ্রতার কারণে ইমাম সাহেবের পরিবার ছাড়াও আরো কয়েকটি জ্ঞানসমৃদ্ধ দ্বীনি পরিবার এবং ব্যক্তি তাদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলেন। এদেরই মধ্যে ছিলেন ইলমে কিরআতের প্রসিদ্ধ ইমাম আবু আম্মারা হামযা বিন হাবীব বিন আম্মারা যাইয়্যাত আলকূফী আততায়মী – যার সম্পর্কে ইমাম সাহেব বলেছিলেন, “হামযা লোকদেরকে কোরআন এবং ফারায়েয শিখতে বাধ্য করেছে।”
এ সকল উদ্ধৃতি দ্বারা সুস্পষ্টরূপে বুঝা যায় যে, ইমাম সাহেবের পরিবার বনী তায়মুল্লাহর দাস ছিলেন না বা তাদের হাতে ইসলাম গ্রহণও করেননি। বরং অন্যান্য অনারব নও মুসলিম পরিবারের মত এ পরিবারটিও একটি অভিজাত গোত্রের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে তাদের সাথে সম্বন্ধযুক্ত হয়েছিল।
এ বর্ণনাটি সম্পূর্ণ অমূলক যে, ইমাম সাহেবের পিতাকে কাবুল হতে বন্দী করে কুফায় আনা হলে বনী তায়মুল্লাহর এক মহিলা তাকে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। অথবা তার পিতামহ ঐ গোত্রের দাস ছিলেন। দ্রুপ একথাটিও ভিত্তিহীন যে, আরবী বংশোদ্ভূত । সম্ভবতঃ এ কথাটি যারা তাকে অনারব দাস বলত তাদের জবাবে বলা হয়েছে।
বাসস্থান এবং ব্যবসাস্থল:
হযরত উমর (রাঃ)-এর নির্দেশ এবং পরামর্শক্রমে ১৭ হিজরীতে হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) কুফায় বসতিস্থাপন করেন। শহরের মধ্যখানে জামে মসজিদ এবং প্রশাসন ভবনের ভিত্তিস্থাপন করেন। এর পূর্বদিকে ইয়ামানী গোত্রসমূহ এবং পশ্চিম দিকে হিজাযের নাযারী গোত্রসমূহের বসতি ছিল। উক্ত এলাকার মাঝখানে ময়দান ছিল। এরই মধ্যে ছিল জামে মসজিদ এবং প্রশাসন ভবনের ইমারত। ঐ ময়দানের একপার্শ্বে হযরত আমর বিন হুরাইছ স্বীয় বাড়ী নির্মাণ করেছিলেন। এ কারণে ঐ এলাকাকে রিকাকে আমর বলা হত । সেখানে তার সন্তানদের আধিপত্য ছিল। পরে সেখানে সরকারী শাসকগোষ্ঠি এবং কর্মচারীগণ বসতি স্থাপন করেন। ফলে এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়। ঐ স্থানেই ছিল ইমাম সাহেবের পরিবারের দোকান। বসতবাড়ীও এরই সন্নিকটে পূর্ব এলাকায় ছিল যেখানে ইয়ামানী গোত্রসমূহ বসতি স্থাপন করেছিল। তাদেরই মধ্যে ছিল বনী তায়মুল্লাহ বিন ছালাব- যারা ইয়ামানী গোত্রসমূহের সাথে সম্বন্ধযুক্ত ছিল। ইমাম সাহেবের পরিবার তাদেরই বন্ধুত্বে ছিল। সম্ভবতঃ ঐ গোত্রের নিকটেই তাদের বসতবাড়ী ছিল। এর সমর্থন এ ঘটনা থেকে পাওয়া যায় যে, ইমাম শাবী যিনি ইমাম সাহেবের প্রধান শায়খ এবং শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন এবং তার সম্পর্কও ইয়ামানী গোত্রের সাথে ছিল তিনিও কূফার পূর্ব এলাকায় বাস করতেন। একবার যুবাকালে ইমাম সাহেব ঘর থেকে দোকানের দিকে যাবার সময় ইমাম শাবীর দরসগাহের সামনে দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিলেন। ইমাম শাবী তাকে নিকটে ডেকে এনে ইলমে দ্বীন অর্জন করার উপদেশ দেন যার বিস্তারিত বর্ণনা পরে আসছে।
জন্ম এবং বাল্যকাল:
খলীফা আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের খিলাফতকালে ৮০ হিজরীতে কূফার পূর্বাঞ্চলে ইমাম সাহেব জন্মগ্রহণ করেন। এটা কুফায় বসতি স্থাপনের ৬৬-৬৭ বৎসর পরের ঘটনা। তখন সাহাবায়ে কিরাম এবং তাবেঈনদের আধিক্য ছিল। তাদের কারণে কূফার আনাচে কানাচে শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। চারিদিকে দ্বীনি এবং ইলমী মজলিস বসত। এমনি এক পরিবেশে ইমাম সাহেব বোধসম্পন্ন হন। জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম ছিল রেশমী কাপড়ের ব্যবসা। কুফার জামে মসজিদের সন্নিকটে হযরত আমর বিন হোরায়েছ (রাঃ)-এর বরকতময় স্থানে ছিল তার দোকান।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যবাণী,
ইমাম আযম আবু হানিফা (রহঃ)-কে আল্লাহ তা’আলা যে জ্ঞানের পূর্ণতা, ইজতেহাদের যোগ্যতা, কোরআন এবং হাদীছের অগাধ জ্ঞান দান করেছেন, তা যেন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভবিষত্বাণীকে বাস্তবরূপ দেয়ার জন্যই করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
অর্থঃ “আবু হুরাইরা (রাঃ) রেওয়ায়েত করেন, আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত ছিলাম। সে সময়ে সুরায়ে জুম’আ অবতীর্ণ হয়। যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরআনের (আরবী)এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলে, উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ অপর লোকেরা কারা যারা আমাদের সাথে এখনও মিলিত হয়নি? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেননি। তাঁকে সে প্রশ্ন দু’তিনবার করা হলে, তিনি সালমান ফারসীর কাঁধে হাত রেখে বললেন, যদি ঈমান ‘ছুরাইয়া’ তারকার নিকটও হত তবুও এদের থেকে কেউ কেউ তা পেয়ে যেত”।
উপরোক্ত হাদীছটি বুখারী, মুসলিম এবং তিরমিযী শরীফে উল্লেখ রয়েছে।
মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় এরূপ রয়েছে,
ইলম যদি ছুরাইয়া তারকার নিকটও হত পারস্যের কেউ কেউ অবশ্যই তা পেত।
হাফেয জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহঃ) বলেন যে, এ হাদীছে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ এ কথা স্পষ্ট যে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর সময়ে ফিকাহ এবং ইলমী মর্যাদায় কেউ তার সমকক্ষ হতে পারেনি। এমনকি কেউ তাঁর ছাত্রদের সমপর্যায়ও পৌছতে পারেনি। ইলমে হাদীছের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী প্রত্যেকেই এ বিষয়ে অবগত যে অধিকাংশ মুহাদ্দেছীনদের মতে এ ভবিষ্যত্বাণী ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে প্রযোজ্য।
হাফেয জালালুদ্দীন সুয়ুতী লিখেন যে, সুসংবাদের বিষয়ে এ হাদীছটি নির্ভরযোগ্য।
শাহ ওলীউল্লাহ (রহঃ) লিখেন, এ হাদীছ নিয়ে একদিন আমরা আলোচনা করলাম। আমি বললাম, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সুসংবাদের অন্তর্ভুক্ত। কারণ ইলমে ফিকাহর প্রসার তাঁর মাধ্যমেই ঘটেছে। তাঁর দ্বারা অনেকেই সংশোধন হয়েছেন। বিশেষ করে এ সময়ে সারা মুসলিম বিশ্বে বাদশাহও হানাফী, কাযীও হানাফী এবং (মুদাররিস) শিক্ষকগণও হানাফী।
নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান লিখেন, ইমাম আবু হানিফাও এ হাদীছের অন্তর্ভুক্ত এবং পারস্যের (অনারব) সকল মুহাদ্দিছগণও। উপরোল্লেখিত হাদীছের দৃষ্টিতে দেখা যায় যে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি স্পষ্ট মোজেযা। ইবনে হজর হাইছমী (রহঃ) আল খাইরাতুল হিসান’ নামক কিতাবে লিখেন,
“এটা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্পষ্ট মোজেযা যে তিনি ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন।”
সুতরাং ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর অস্তিত্ব রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত সত্য হওয়ার প্রমাণ। কাজেই ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। কারণ তাঁকে অস্বীকার করা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যৎবাণী অস্বীকার করার নামান্তর। হাদীছ শরীফে, (আরবি) অনারব শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। অনারবদের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি নেই, যাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যৎবাণীর সঠিক প্রমাণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
তাই প্রত্যেক মুসলমানকে ইমাম আবু হানিফার ব্যক্তিত্ব ও মহত্ব স্বীকার করতে হবে।
হাফেজ আব্দুল আযীয বিন মায়মুন (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ইমাম আবু হানিফাকে মহব্বত করে সে সুন্নী আর যে তাঁকে ঈর্ষা করে সে বিদআতী।
জনৈক বুযুর্গের স্বপ্ন,
মুসাদ্দাদ বিন আব্দির রহমান আল বসরী বর্ণনা করেন, আমি একবার রুকন এবং মাকামের মধ্যবর্তী স্থানে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। স্বপ্নে দেখতে পেলাম যে, জনৈক বুযুর্গ এসে আমাকে বলছেন, তুমি এ স্থানে ঘুমিয়ে পড়েছ? অথচ এটা এমন স্থান যেখানে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা তা কবুল করে নেন। আমি অতি তাড়াতাড়ি ঘুম হতে জাগ্রত হয়ে গুরুত্ব এবং আগ্রহ সহকারে মুসলমানদের জন্য দোয়া করতে লাগলাম। দোয়া করতে করতেই আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। এবার স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যিয়ারত আমার নসীব হল। আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুফায় বসবাসকারী নু’মান নামক লোকটি সম্বন্ধে আপনি কি বলেন? আমি কি তার থেকে ইলম অর্জন করব? হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, হ্যাঁ, তার থেকে ইলম হাসিল কর এবং সে অনুযায়ী আমল কর। কারণ সে ভাল লোক।
আমি যখন ঘুম হতে জাগ্রত হলাম তখন ফজরের আযান হয়ে গেছে। খোদার কসম! ইতিপূর্বে ইমাম সাহেবকে আমি সবচেয়ে খারাপ লোক মনে করতাম। তাঁর সম্পর্কে এরূপ খারাপ ধারণা পোষণ করার কারণে এখন আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
জনৈক সাহাবীর যিয়ারত এবং তার থেকে রেওয়ায়েত,
বাল্যকালে ইমাম ছাহেব হজ্জ মৌসুমে মক্কা মুকাররমায় জনৈক ছাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ বিন হারিছ (রাঃ)এর যিয়ারত করেন এবং তাঁর নিকট থেকে এটি শ্রবণ করে তার বর্ণনা করেন। মুসনাদে আবি হানিফার আল ইলম অধ্যায়ে উল্লেখ রয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা বলেন, ৮০ হিজরীতে আমার জন্ম হয়। ১৬ বৎসর বয়সে ৯৬ হিজরীতে পিতার সাথে হজ্জে গমন করি। যখন মসজিদে হারামে প্রবেশ করলাম একটি ‘হালকা’ দেখতে পেলাম। আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার হালকা? তিনি বললেন, এটা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছাহাবী আব্দুল্লাহ বিন হারিছ (রাঃ)-এর হালকা।
অতঃপর আমি তার নিকটবর্তী হয়ে তাঁকে এ কথা বলতে শুনলাম “আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করে, আল্লাহ তাআলা তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেন এবং ধারণাতীতভাবে আল্লাহ তাআলা তাকে রিযিক দিবেন”।
‘জামিউ বয়ানিল ইলম’ নামক কিতাবে ইবনে আব্দুল বারর এবং আখবারু আবি হানিফা ওয়া আসহাবীহী’ নামক কিতাবে কাযী আবু আব্দিল্লাহ ইমাম সাহেবের বর্ণনা এরূপ উল্লেখ করেন, ৯৬ হিজরীতে ১৬ বৎসর বয়সে আমি আমার পিতার সাথে হজ্জ আদায় করতে গেলাম। দেখলাম, লোকেরা এক বুযুর্গের নিকট সমবেত হয়ে আছে। আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন ছাহাবী। এর নাম আব্দুল্লাহ বিন হারিছ (রাঃ)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাঁর নিকট কি আছে যার কারণে লোকেরা তাঁর পাশে জমায়েত হয়ে আছে”? তিনি বললেন, তার নিকট হাদীছ আছে যা তিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রবণ করেছেন। আমি বললাম আমাকে সামনে এগিয়ে দিন যেন আমিও শুনতে পারি। তিনি আমার সম্মুখ থেকে ভিড় সরিয়ে দিতে লাগলেন। যখন আমি তাঁর নিকটবর্তী হলাম তখন তিনি বলছিলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, (এস্থলে পূর্বোক্ত হাদীছ বর্ণনা করলেন।)”
হযরত আব্দুল্লাহ বিন হারিছ (রাঃ) মিশরে বাস করতেন। ৮৫,৮৬, অথবা ৮৭ হিজরীতে তার ইন্তেকাল হয়। সুতরাং এ ঘটনা অন্য কোন আব্দুল্লাহ বিন হারিছের হবে। ইবনে হজর আল-ইসাবা নামক গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন হারিছ নামের ১৮-১৯ জন ছাহাবীর উল্লেখ করেন।
‘জামিউ বয়ানিল ইলম’ কিতাবে ইমাম সাহেবের বর্ণনায় এ শব্দগুলো রয়েছে।
“আমি আমার পিতার সাথে ৯৩ হিজরীতে হজ্জ আদায় করি তখন আমার বয়স ছিল ১৬ বৎসর।”
আমাদের ধারনা, এ বর্ণনায় বৎসর গনণায় ভুল হয়ে গেছে। মূলতঃ বর্ণনাটি এরূপ হয়ে থাকবে।
“ আমি আমার পিতার সাথে ৮৬ হিজরীতে হজ্জ পালন করি। তখন আমার বয়স ছিল ৬ বৎসর। ‘ এর সমর্থন পরবর্তী বর্ণনা দ্বারা পাওয়া যাচ্ছে।
অতঃপর আমি বললাম, আমাকে তাঁর দিকে এগিয়ে দিন যেন আমি তার কথা শুনতে পারি। তিনি আমার সামনে এসে লোকদের সরিয়ে দিতে লাগলেন। এতে আমি তার নিকট পৌছে গেলাম। অতঃপর তাকে বলতে শুনলাম।
আবি হানিফা ওয়া আসহাবীহী’ নামক কিতাবে কাযী আবু আব্দিল্লাহ ইমাম সাহেবের বর্ণনা এরূপ উল্লেখ করেন, ৯৬ হিজরীতে ১৬ বৎসর বয়সে আমি আমার পিতার সাথে হজ্জ আদায় করতে গেলাম। দেখলাম, লোকেরা এক বুযুর্গের নিকট সমবেত হয়ে আছে। আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন ছাহাবী। এর নাম আব্দুল্লাহ বিন হারিছ (রাঃ)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাঁর নিকট কি আছে যার কারণে লোকেরা তাঁর পাশে জমায়েত হয়ে আছে? তিনি বললেন, তার নিকট হাদীছ আছে যা তিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রবণ করেছেন। আমি বললাম আমাকে সামনে এগিয়ে দিন যেন আমিও শুনতে পারি। তিনি আমার সম্মুখ থেকে ভিড় সরিয়ে দিতে লাগলেন। যখন আমি তাঁর নিকটবর্তী হলাম তখন তিনি বলছিলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, (এস্থলে পূর্বোক্ত হাদীছ বর্ণনা করলেন।)
হযরত আব্দুল্লাহ বিন হারিছ (রাঃ) মিশরে বাস করতেন। ৮৫,৮৬, অথবা ৮৭ হিজরীতে তার ইন্তেকাল হয়। সুতরাং এ ঘটনা অন্য কোন আব্দুল্লাহ বিন হারিছের হবে। ইবনে হজর আল-ইসাবা নামক গ্রন্থে আব্দুল্লাহ বিন হারিছ নামের ১৮-১৯ জন ছাহাবীর উল্লেখ করেন।
‘জামিউ বয়ানিল ইলম’ কিতাবে ইমাম সাহেবের বর্ণনায় এ শব্দগুলো রয়েছে।
“আমি আমার পিতার সাথে ৯৩ হিজরীতে হজ্জ আদায় করি তখন আমার বয়স ছিল ১৬ বৎসর।”
আমাদের ধারনা, এ বর্ণনায় বৎসর গনণায় ভুল হয়ে গেছে। মূলতঃ বর্ণনাটি এরূপ হয়ে থাকবে।
“ আমি আমার পিতার সাথে ৮৬ হিজরীতে হজ্জ পালন করি। তখন আমার বয়স ছিল ৬ বৎসর। ‘ এর সমর্থন পরবর্তী বর্ণনা দ্বারা পাওয়া যাচ্ছে।
অতঃপর আমি বললাম, আমাকে তাঁর দিকে এগিয়ে দিন যেন আমি তার কথা শুনতে পারি। তিনি আমার সামনে এসে লোকদের সরিয়ে দিতে লাগলেন। এতে আমি তার নিকট পৌছে গেলাম। অতঃপর তাকে বলতে শুনলাম।
১৬ বৎসরের যুবক পিতার নিকট এ ধরনের আবদার করে না। আর পিতাও এমন ছেলের জন্য আগে বেড়ে রাস্তা পরিস্কার করে না। মুহাদ্দিছগণ ছোট ছোট ছেলেদের কাঁধে চড়িয়ে হাদীছের হালকায় নিয়ে বসিয়ে দিতেন এবং তাদের হাদীছ শুনাতেন। পূর্বে এর প্রচলন ছিল। সুতরাং এ ঘটনা তাঁর বাল্যকালের হবে। এ ধরনের ভুল হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। যেমন, সিন্ধুবিজয়ী মুহাম্মদ বিন কাসেম সম্পর্কে প্রায় সকল ইতিহাসবিদগণ উল্লেখ করেন যে, ৯৩ হিজরীতে সিন্ধু আক্রমণ করার সময় তার বয়স ছিল ১৭ বৎসর। অথচ এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল। এ বয়স ছিল তার ঐ সময়ের যখন তিনি পারস্যের অধিনায়ক ছিলেন। সেখানে থেকে সরাসরি তিনি ৯২ হিজরীতে সিন্ধু বিজয়ের জন্য অভিযান চালান। তখন তার বয়স ছিল ২৬-২৭ বৎসর।
অন্যান্য ছাহাবায়ে কিরামের যিয়ারত এবং তাদের থেকে রিওয়ায়েতঃ চার ইমামের মধ্যে শুধুমাত্র ইমাম সাহেব কয়েকজন ছাহাবীর যিয়ারত এবং তাদের সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি উল্লেখযোগ্য তাবেঈনদের মধ্যে গণ্য। তাঁর বাল্যকালে কূফায় কয়েকজন ছাহাবী জীবিত ছিলেন। যাঁদের যিয়ারত এবং সাক্ষাৎ দ্বারা মুসলমানগণ ফয়েযইযার (ধন্য) হচ্ছিলেন। তাঁর দোকানের মালিক হযরত আমর বিন হুরাইছ (রাঃ) স্বয়ং জীবিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় ৮৫ হিজরীতে। তখন ইমাম সাহেবের বয়স ছিল পাঁচ বৎসর। স্পষ্টতঃই তিনি কখনও কখনও দোকানে আসা-যাওয়া করতেন এবং এ বালকটি তাঁকে দেখে থাকবেন। এতদ্ভিন্ন অধিকাংশ জীবনী লিখক এতে একমত যে, বাল্যকালে ইমাম সাহেব হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) কে দেখেছেন। হাফিয যাহাবী লিখেন যে, ৮০ হিজরীতে ইমাম সাহেবের জন্মের সময় ছাহাবাদের এক জামাত কূফায় বর্তমান ছিলেন।
ইনশাআল্লাহ! তাঁদের যিয়ারতের কারণে তিনি তাবেঈনদের দলভূক্ত হবেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে প্রমাণিত যে, হযরত আনাস (রাঃ) কুফায় আগমন করলে তিনি তাঁর যিয়ারতে যান। হাফিয যাহাবী ‘তাযকিরাতুল হুফফায’ কিতাবে উল্লেখ করেন যে, হযরত আনাস (রাঃ) কূফায় আগমন করলে ইমাম সাহেব তাকে একবার দেখেছিলেন। ‘আল ইবার’ নামক কিতাবেও এর উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনে নদীম লিখেন যে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কয়েকজন ছাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন।
ইবনে খালিকানের বর্ণনানুসারে ইমাম সাহেব চারজন ছাহাবীকে জীবদ্দশায় পেয়েছিলেন।
– আনাস বিন মালেক এবং
– আব্দুল্লাহ বিন আবি আওফাকে কূফায়
– সাহল বিন সাদ সায়েদীকে মদিনায়
– আবু তোফায়েল আমের বিন ওয়াছিলা (রাঃ) মক্কায়।
ইমাম সাহেব এদের সাথে মিলিত হয়ে ফয়েয। লাভ করেন। তবে ইমাম সাহেব ছাহাবাদের এক জামাত থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন, এ কথা প্রমাণিত নয়।
ইমাম সাহেব বলেন, হযরত আনাস (রাঃ) কূফায় আগমন করেন এবং নাখা গোত্রের নিকট অবস্থান করেন। তিনি লাল খিযাব ব্যবহার করতেন। তাঁকে আমি কয়েকবার দেখেছি।
হাফিয ইবনে হজর (রহঃ) তার ফতোয়ায় লিখেন, ইমাম আবু হানিফার জন্মের সময় ছাহাবাদের এক জামাত জীবিত ছিলেন। তিনি ৮০ হিজরীতে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আবি আওফা (রাঃ) তথায় অবস্থান করছিলেন। তাঁর মৃত্যু ৮৮ হিজরী অথবা এরও পরে হয়েছিল। ইবনে সাদ বর্ণনা করেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) হযরত আনাস (রাঃ) কে দেখেছিলেন। এ দুজন ব্যতীত অন্যান্য শহরে আরও ছাহাবী ছিলেন। কেউ কেউ ইমাম আবু হানিফার, ছাহাবাদের থেকে শ্রুত হাদীছগুলো কিতাবাকারে সংকলন করেছেন। কিন্তু সেগুলোর সনদ ত্রুটিমুক্ত নয়। নির্ভরযোগ্য মত এটাই যে, তিনি কোন কোন ছাহাবীকে দেখেছিলেন। ফলে তিনি তাবেঈনদের মধ্যে গণ্য। তাঁর সমকালীন ইমামদের মধ্যে অন্য কারো এ সৌভাগ্য হয়নি। যেমন সিরিয়ায় ইমাম আওযায়ী, বসরায় হাম্মাদ বিন যায়েদ এবং হাম্মাদ বিন সালমা মদীনায় মালেক বিন আনাস, মিশরে লাইছ বিন সাদ ছিলেন। কিন্তু তাদের এ সুযোগ হয়নি।
প্রথম জীবনেই ইমাম সাহেব পারিবারিক ব্যবসার সাথে সাথে বহছ-মুনাযারা তথা তর্কবিদ্যায় অনেক এগিয়ে গিয়েছিলেন। সমস্ত মেধা শক্তি ইলমে কালাম বা আকীদা শাস্ত্রে এবং যিন্দিক ও মুলহিদের সাথে মুনাযারা করার পিছনে ব্যয় করতেন। ফলে ধর্মীয় জ্ঞান তথা হাদীছ এবং ফিকাহর দিকে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ ছিল না। ঐ সময়েই ইমাম শাবী তাকে ধর্মীয় জ্ঞান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি তাঁদের (উলামা এবং মুহাদ্দিছীনদের) মজলিসে কম আসা-যাওয়া করি।
এ কারণেই ঐ সময়েই হাদীছের প্রতি মনোযোগ কম ছিল এবং ছাহাবাদের থেকে হাদীছ বর্ণনা করার মর্যাদা লাভ হয়নি।
যিন্দিক, মুলহিদ এবং বাতিল সম্প্রদায়ের সাথে মুকাবিলা
ইমাম সাহেব খুবই মেধাবী, তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। যুবাকাল তিনি আনন্দের সাথে নিশ্চিন্ত মনে কাটাচ্ছিলেন। তখন একদিকে ফিকাহবিদগণ এবং মুহাদ্দিছীনগণ স্বীয় দ্বীনি এবং ইলমী হালকায় হাদীছ বর্ণনায় এবং মাসয়ালা গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন। অপরদিকে অনারবদের সংমিশ্রণের ফলে বাতিল সম্প্রদায়গুলো ইসলামী আকীদা এবং চিন্তাধারার বিপরীত মুনাযারায় লেগেছিল। স্বয়ং মুসলমানদের গোমরাহ সম্প্রদায়ের মধ্যে জাহমিয়া, কাদরিয়া, জবরিয়া, খাওয়ারিজ, রাওয়াফিয প্রভৃতি দলের সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। এর সাথে সাথে মাজুসিয়্যাত, ছানুবিয়্যাত, সমুমানিয়্যাত, ইলহাদ, যান্দাকার চিন্তাধারা ডানা বিস্তার করছিল। এদের মুকাবিলায় উলামায়ে ইসলাম ইলমে কালামের অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসেন।
ইমাম আবু হানিফা এঁদের মধ্যেই একজন ছিলেন। যুবাকালে তিনি এ ময়দানে অবতরণ করেন এবং খোদা প্রদত্ত মেধা, তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং চিন্তাশক্তি দ্বারা ইসলামী আকায়েদ এবং চিন্তাধারার সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে যিন্দিক এবং মুলহিদদেরকে পরাস্ত করে দেন। এমনকি এ ব্যাপারে ইমাম সাহেবের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেন, প্রথম জীবনে আমি বহছ-মুনাযারায় ব্যস্ত থাকতাম। ঐ সময়ে বসরা ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বহছ-মুনাযারার কেন্দ্র। তাদের সাথে বহছ করার জন্য বিশবারের অধিক আমাকে সেখানে আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। কখনও এক বৎসর আবার কখনও এর কম সময় সেখানে অবস্থান করতাম এবং খাওয়ারিজ ও হাশরিয়াদের সাথে মুনাযারা করতাম। ঐ সময়ে ইলমে কালাম আমার নিকট সবচেয়ে উত্তম ইলম ছিল। এরূপ ধারনা করতাম যে এটাই দ্বীনের ভিত্তি। এতে দ্বীনের অনেক বড় খিদমত হচ্ছে।
চিন্তাধারার পরিবর্তন
ইমাম সাহেব বলেন, দীর্ঘকাল পর্যন্ত একে ইলমে দ্বীন মনে করে ইসলামের শত্রুদের মুকাবিলা করছিলাম। পরে ভেবে দেখলাম যে, ছাহাবায়ে কিরাম এবং তাবেঈনগণ আমাদের চেয়ে অধিক জ্ঞানী এবং অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন। তাঁরা তো কখনও বহছ-মুবাহাছার পিছনে পড়েননি। বরং ধর্মীয় বিষয়ে ঝগড়া-ঝাটি করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তাঁরা শরয়ী বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতেন। তারা ফিকাহর মাসয়ালা গবেষণায় নিমগ্ন থাকতেন। এর জন্য তারা দ্বীনি এবং ইলমী হালকা কায়েম করতেন। আর দেখতে পেলাম যে, যারা ইলমে কালাম এবং তার বহছ-মুবাহাছায় লিপ্ত তারা সলফদের অনুরূপ নয়।
ইমাম হাম্মাদ আবি সুলাইমানের দরসী হালকায়
ইমাম সাহেব বলেন, আমাদের মজলিস ছিল হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমানের ফেকহী শিক্ষা মজলিসের সন্নিকটে। যখন আমি এসব চিন্তা-ভাবনার কারণে অস্থির ছিলাম তখন একদিন জনৈকা মহিলা আমাকে জিজ্ঞেস করল যে, কোন স্বামী তার স্ত্রীকে সুন্নাত মুতাবেক তালাক দিতে চায়। তার পদ্ধতি কি? আমি অনুতপ্ত এবং লজ্জিত হয়ে ঐ মহিলাকে বললাম, তুমি হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান থেকে জেনে নিয়ে আমাকেও জানিয়ে দিও। ঐ মহিলা তদ্রুপই করল। আমার মনে এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া এরূপ হল যে, আমি বললাম আমার ইলমে কালামের প্রয়োজন নেই। অতঃপর আমি জুতা তুলে নিয়ে হাম্মাদের মজলিসে গিয়ে বসলাম। এরপর থেকে তাঁর দরসী হালকায় উপস্থিত হতে লাগলাম।
হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান আমার আগ্রহ এবং একাগ্রতা দেখে বললেন, আবু হানিফা ব্যতীত অন্য কেউ আমার সামনে বসবে না। আমি এভাবে এক নাগাড়ে দশ বছর তাঁর খিদমতে থেকে ইলমে ফিকাহ শিক্ষা লাভ করি। মাঝে একবার খেয়াল হয়েছিল যে, নিজেই একটা দুরস হালকা কায়েম করি। কিন্তু পরে হাম্মাদের হালকাতেই একাগ্রতা সহকরে শিক্ষা অর্জন করতে লাগলাম। এ সময়ে বসরা হতে তাঁর আত্মীয়ের মৃত্যু সংবাদ এল। তিনি আমাকে তাঁর আসনে বসিয়ে দিয়ে বসরায় চলে যান। সেখানে তিনি দু’মাস ছিলেন। এ সময় আমার নিকট নতুন নতুন মাসয়ালা এসেছিল যেগুলো সম্পর্কে হাম্মাদ থেকে কিছুই শুনিনি। আমি সেগুলোর উত্তর দিয়ে লিখে রেখেছিলাম। সেগুলো সংখ্যায় ছিল ষাটটি।
হাম্মাদ বসরা থেকে এসে সে মাসয়ালাগুলো দেখলেন। চল্লিশটি মাসয়ালায় আমার সাথে একমত হলেন আর বিশটি মাসয়ালার ব্যাপারে ভিন্নমত প্রকাশ করলেন। অতঃপর আমি কসম করলাম যে, হাম্মাদের জীবদ্দশায় আমি তাঁর হালকা থেকে বের হব না। তাঁর মত পর্যন্ত আমি সেখানেই রইলাম।
ইমাম সাহেব থেকে একটি বর্ণনায় এরূপ রয়েছে যে, যখন আমি হাম্মদ বিন আবি সুলাইমানের দরস থেকে পৃথক হওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছিলাম,তখন বসরায় যাওয়ার সুযোগ হল। সেখানকার লোকেরা আমাকে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলে কয়েকটি মাসয়ালার উত্তর দিতে পারিনি। এজন্য সংকল্প করলাম, হাম্মাদ জীবিত থাকাকালে আমি তাঁর থেকে পৃথক হব না। অতএব আঠার বৎসর পর্যন্ত তাঁর খিদমতে ছিলাম।
ইমাম হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমানের মৃত্যু হয় ১২০ হিজরীতে। তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ইমাম সাহেব তাঁর সাথেই ছিলেন। আর এ সাহচর্যকাল ছিল আঠার বৎসর। এ হিসেবে দেখা যায় ইমাম সাহেব তাঁর বাইশ বৎসর বয়সে ১০২ হিজরীতে তাঁর দরসে শরীক হন। এর পূর্বে তিনি ইলমে কালাম এবং বহছ-মুবাহাছার মাধ্যমে ইসলামের প্রতিরক্ষামূলক খিদমত করেন।
ইমাম সাহেব শুরুতে যখন হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমানের নিকট গেলেন তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এসেছ? ইমাম সাহেব বললেন, ফিকাহ অর্জন করার জন্য।’ হাম্মাদ বললেন, তুমি দৈনিক তিনটি মাসয়ালা শিখবে। এর অধিক নয়। ইমাম সাহেব তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করলেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যে তিনি ফিকাহ শাস্ত্রে নজীরবিহীন যোগ্যতা ও খ্যাতি অর্জন করে ফেললেন।
ইমাম শাবীর সাথে মুলাকাত
যে সময় ইমাম সাহেব ইলমে কালাম এবং বহছ-মুবাহাছা থেকে আস্থাহীন হয়ে পড়ছিলেন, তখন আরও একটি ঘটনা ঘটে যা তাঁর সমস্ত মনোযোগ ইলমে দ্বীনের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
ইমাম সাহেবের বর্ণনা:
একদিন আমি ইমাম শাবীর দরসগাহের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি আমাকে দেখে ডাক দিলেন। তার নিকট উপস্থিত হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কার নিকট আসা-যাওয়া কর? আমি বললাম, আমি অমুক ব্যক্তির নিকট যাচ্ছি। ইমাম শাবী বললেন, আমার প্রশ্নের উদ্দেশ্য বাজারে আসা-যাওয়া নয়। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে তুমি কোন্ কোন্ উলামার দরসী মজলিসে অংশ নাও। আমি বললাম, আমি তাদের নিকট আসা-যাওয়া কম করি। এতে তিনি বললেন, তুমি এরূপ করো না। তুমি ইলমে দ্বীন এবং উলামাদের মজলিসে আসা-যাওয়া কর । আমি তোমার মধ্যে জাগ্রত চিন্তাশক্তি এবং চেতনা দেখতে পাচ্ছি।
ইমাম শাবীর একথা আমার অন্তরে প্রভাব ফেলল। ঐ সময় থেকেই বাজারে এবং দোকানে আসা-যাওয়া বন্ধ করে ইলমে দ্বীন অর্জনে লেগে গেলাম। ইমাম শাবীর কথায় আল্লাহ তাআলা আমাকে অনেক উপকৃত করেছেন।
ইমাম আবু হানিফা এবং ইলমে হাদীছ
ইমাম সাহেব প্রায় বাইশ বৎসর বয়স পর্যন্ত ইলমে কালাম এবং মুবাহাছার মাধ্যমে ইসলামের খিদমত করেন। এ বিষয়ে তিনি পূর্ণতা অর্জন করেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তিনি ইলমে দ্বীন থেকে বিশেষ করে ইলমে হাদীছ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। বরং এ সময়েও তিনি ইলমে হাদীছের মজলিসে উপস্থিত হয়ে মুহাদ্দিছ এবং শায়খদের থেকে হাদীছ গ্রহণ করতেন। অবশ্য ইলমে কালামে ব্যস্ততা বেশী থাকার কারণে ইলমে হাদীছের দিকে মনোযোগ কম ছিল। যেমন তিনি নিজেই ইমাম শাবীর নিকট বলেছেন আমি উলামাদের নিকট আসা-যাওয়া কম করি।’
হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমানের দরসী মজলিসে শামিল হবার পর ইমাম সাহেব রাত-দিন ইলমে দ্বীন অর্জন করায় লেগে গেলেন। ইমাম হাম্মাদের ফিকহী দরসে দৈনিক মাত্র তিনটি মাসয়ালা নিয়ে হাদীছের আলোকে আলোচনা হত। অবশিষ্ট সময়ে অন্যান্য উলামা এবং মুহাদ্দিছীনদের মজলিসে আসা-যাওয়া করতেন।
ইমাম সাহেবের জীবনীকারগণ তাঁর হাদীছ শাস্ত্রের অনেক শায়খের নাম উল্লেখ করেছেন। আবু হাফস আল কবীরের নির্দেশে ইমাম সাহেবের শায়খদের তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এতে তাঁর শায়খদের সংখ্যা চার সহস্রে উপণীত হয়। হাফিয আবু বকর মুহাম্মদ বিন উমর আল জুবালী তাঁর কিতাব কিতাবুল ইনতিসার’ এর বিশেষভাবে ইমাম সাহেবের অনেক শায়খের আলোচনা করেছেন। শায়খ শামসুদ্দীন মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আসসালেহী আদদামেশীকী ‘তাসহীলুসসাবীল’ নামক কিতাবে ইমাম সাহেবের শায়খদের নাম উল্লেখ করেন। ‘উকুদুল জুমান’ কিতাবে ইমাম সাহেবের শায়খদের নাম আরবী বর্ণমালা হিসেবে গণনা করা হয়েছে। তাঁদের সংখ্যা ২৮০ এরও অধিক।
ফিকাহ শাস্ত্রে ইমাম সাহেবের প্রধান শায়খ হচ্ছেন ইমাম হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান। তদ্রুপ হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর প্রধান শায়খ হচ্ছেন ইমাম শাবী। আল্লামা যাহাবী লিখেন- তিনি আবু হানিফার প্রধান শায়খ।
ফিকাহ এবং ইজতিহাদে ইমাম সাহেব চার ইমামের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আর ফিকাহ এবং ইজতিহাদের ভিত্তি হল কিতাব এবং সুন্নাহ। এ দুটি বিষয় ছাড়া কোন আলেমই ফকীহ কিংবা মুজতাহিদ হতে পারেন না। অবশ্য তিনি (ফকীহ, মুজতাহিদ) হাদীছ রেওয়ায়াত করার তুলনায় হাদীছ নিয়ে গবেষণা করা এবং তা থেকে মাসয়ালা উদঘাটন করার প্রতি অধিক মনযোগী হয়ে থাকেন। এজন্য প্রত্যেক ফকীহ এবং মুজতাহিদের জন্য মুহাদ্দিছ হওয়া আবশ্যক।
ইমাম আমাশ (রহঃ) ইমাম সাহেবের হাদীছের শিক্ষক ছিলেন। একবার ইমাম সাহেব তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি তাঁকে কয়েকটি ইলমী প্রশ্ন করলেন। তিনি প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর দিলেন। প্রতিটি উত্তরের পর ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করতেন তুমি এ উত্তরটি কোন দলীল দ্বারা দিচ্ছ? ইমাম সাহেব বলতেন আপনারই বর্ণিত হাদীছ দ্বারা উত্তর দিচ্ছি। অবশেষে ইমাম আমাশ বললেন, হে ফিকাহবিদগণ! তোমরা হচ্ছ চিকিৎসক। আর আমরা হচ্ছি ঔষধ বিক্রেতা।
ইমাম সাহেবের বিশিষ্ট ছাত্র কাযী আবু ইউসুফ বলেন, আমি হাদীছের ব্যাখ্যা এবং তার ফিকহী গূঢ়তত্ত্ব সম্পর্কে আবু হানিফা হতে অন্য কাউকে অধিক জ্ঞাত দেখিনি। আমি কোন কোন মাসয়ালায় তাঁর সাথে মতভেদ করার পর চিন্তা করে দেখতে পেলাম যে, ইমাম সাহেবের মতটিই ঠিক। অনেক সময়ে ফিকাহর বিপরীত হাদীছের দিকে ঝুঁকে পড়তেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম যে, সহীহ হাদীছ সম্পর্কে ইমাম সাহেব আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত।
কাযী আবু ইউসুফ আরও বলেন, একদা আমাশ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ফিকাহর উস্তাদ আবু হানিফা হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)এর এ কথাটি কেন তরক করলেন যে, বাঁদীকে মুক্ত করে দিলেই সে তালাক হয়ে যায়। আমি বললাম,
এ হাদীছের কারণে যা আপনি আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, ইব্রাহীম আসওয়াদ থেকে, তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে রেওয়ায়েত করেছেন যে, বারীরাকে যখন আযাদ করে দেয়া হল তখন তাকে অধিকার দেয়া হয়েছিল। এ কথা আমাশ বললেন, বস্তুতঃ আবু হানিফা হাদীছের স্থান এবং মহল ভালভাবেই জানেন। এ বিষয়ে সদাসতর্ক। আবু হানিফার ইলমে হাদীছ এবং তা দ্বারা মাসয়ালা প্রমাণ করার ব্যাপারে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করলেন।
হাসান বিন সালেহ বর্ণনা করেন, হাদীছের নাসেখ (রহিতকারী) এবং মনসুখ (রহিতকৃত) যাচাই করার ব্যাপারে ইমাম সাহেব বড়ই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীদের যে হাদীছ, তাঁর হাদীছ গ্রহণের মাপকাঠিতে গ্রহণযোগ্য হত, তিনি সে হাদীছ অনুযায়ী আমল করতেন। কূফায় উলামায়ে কিরামের হাদীছ এবং ফিকাহ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি নিজ শহরের কার্যাবলী (তাআমুল) অবলম্বন করতেন, যে সকল কার্যাবলীর উপর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত হয়েছে এবং কূফার উলামাদের নিকট যা পৌছেছে তা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন।
একবার মুহাম্মদ বিন ওয়াসে’ আল-খোরাসানী খোরাসান গমন করেন। লোকেরা তাঁকে কিছু ফিকহী মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, ফিকাহ তো কূফার যুবক আলেম আবু হানিফার শাস্ত্র। তারা বলল, তিনি তো হাদীছ জানেন না। সেখানে আব্দুল্লাহ বিন মুবারক উপস্থিত ছিলেন। তিনি এমন কথা শুনে রাগান্বিত হয়ে বললেন, তোমরা কি করে বল যে, আবু হানিফা হাদীছ জানেন না?
একবার তাঁকে ভেজা (কাঁচা) খেজুর শুকনো খেজুরের বিনিময়ে বিক্রি করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তা বৈধ বলে ফতোয়া দিলেন। এর বিপরীত হযরত সাদের হাদীছ উল্লেখ করা হলে তিনি বললেন, এ হাদীছটি শায। যায়দ বিন আবি আয়্যাশ রাবীর কারণে হাদীছটি গ্রহণযোগ্য নয়। যে ব্যক্তি এরূপ কথা বলে সে কি হাদীছ জানে না?
সুফিয়ান বিন উয়াইনা বলেন, সর্বপ্রথম আবু হানিফা আমাকে মুহাদ্দিছ বানিয়েছেন এবং হাদীছ রেওয়ায়েত করার জন্য বসিয়েছেন। ঘটনা হচ্ছে, আমি কূফায় গেলে আবু হানিফা সেখানকার উলামাদেরকে বললেন, আমর বিন দীনারের হাদীছ সম্পর্কে সুফিয়ান বিন উয়াইনা সবচেয়ে অধিক জ্ঞাত। এরপর সেখানকার উলামাগণ পাশে সমবেত হয়ে গেলেন। আমি আমর বিন দীনারের হাদীছ বর্ণনা করলাম। স্মর্তব্য যে, আমর বিন দীনার ইমাম আবু হানিফারও হাদীছের উস্তাদ ছিলেন। কিন্তু তিনি সুফিয়ান বিন উয়াইনাকে তাঁর হাদীছের সবচেয়ে বড় আলেম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
আব্দুল্লাহ বিন দাউদ বলতেন, আবু হানিফার জন্য দোয়া করা মুসলমানদের উপর ফরয। কারণ তিনি তাদের জন্য সুনান অর্থাৎ হাদীছ এবং ফিকাহ সংরক্ষণ করে গেছেন।
সুফিয়ান ছাওরী বলেন, আবু হানিফা শুধুমাত্র সহীহ হাদীছ গ্রহণ করতেন। নাসেখ এবং মনসুখ হাদীছ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। নির্ভরযোগ্য রাবীদের থেকেই বর্ণনা করতেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ আমল এবং কুফাবাসীদের মতানুসারে আমল করতেন। একেই দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। একদল তাঁকে বিদ্রুপ করেছে, বদনাম করেছে। এমন ব্যক্তিদের সম্পর্কে আমরা চুপ থাকি এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।
হাদীছ বর্ণনা করার ব্যাপারে ইমাম সাহেব বলতেন, শুধুমাত্র ঐ হাদীছই গ্রহণ করা উচিত, যা শ্রবণের সময় থেকে বর্ণনা করার সময় পর্যন্ত স্মরণ রেখেছে। ইয়াহয়া বিন মায়ীন বলেন, আবু হানিফা নির্ভরযোগ্য রাবী। যা স্মরণ থাকে তা বর্ণনা করেন আর যা স্মরণ থাকে না তা বর্ণনা করেন না।
ইমাম সাহেবের ছাত্র আব্দুর রহমান মক্কী সম্পর্কে বিশর বিন মুসা বর্ণনা করেন, যখন তিনি আবু হানিফা থেকে রেওয়ায়েত করতেন তখন বলতেন শাহানশাহ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন।
একবার ইয়াহয়া বিন মায়ীন ছাওরীর ঐ হাদীছগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে- যেগুলো তিনি আবু হানিফা থেকে রেওয়ায়েত করেছেন তিনি বললেন,
আবু হানিফা নির্ভরযোগ্য রাবী। তাঁকে দূর্বল বলতে কাউকে শুনিনি। শোবা বিন হাজ্জাজ আবু হানিফাকে হাদীছ বর্ণনা করতে লিখেন। আর শোবার তুলনা শোবাই।
একবার আবু সাদ সানআনী ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, সুফিয়ান ছাওরী থেকে হাদীছ বর্ণনা করার ব্যাপারে আপনার কি মত?
তিনি বললেন,
তুমি তাঁর হাদীছ লিখে রাখ। কারণ তিনি নির্ভরযোগ্য। তবে হারেছ থেকে বর্ণিত আবু ইসহাকের হাদীছগুলো এবং জাবের জুফীর হাদীছগুলো লিখো না।
হাদীছের রাবীদের সমালোচনা সম্পর্কেও ইমাম সাহেবের মত বিভিন্ন কিতাবে রয়েছে। তাঁর একটি মত এরূপ
‘আমি জাবের জুফী থেকে অধিক মিথ্যাবাদী এবং আতা বিন আবি রাবাহ হতে অধিক উত্তম কাউকে দেখিনি।
ইমাম সাহেব ইলমে হাদীছের সকল উৎস থেকেই হাদীছ গ্রহণ করেছেন। একবার তিনি খলীফা আবু জাফর মনসুরের নিকট গমন করেন। সেখানে ঈসা বিন মুসা তাঁর সম্পর্কে বলেন, বর্তমান দুনিয়ায় ইনি সবচেয়ে বড় আলেম। আবু জাফর মনসূর জিজ্ঞেস করলেন আপনি কার নিকট থেকে ইলম অর্জন করেছেন? ইমাম সাহেব উত্তরে বললেন, হযরত উমর (রাঃ)-এর ইলম তাঁর শিষ্যদের থেকে, হযরত আলী (রাঃ)-এর ইলম তাঁর শিষ্যদের থেকে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর ইলম তাঁর শিষ্যদের থেকে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ইলম তাঁর শিষ্যদের থেকে অর্জন করেছি। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর সময় তাঁর চেয়ে বড় দ্বিতীয়জন ছিলেন না। এ কথা শুনে আবু জাফর মনসূর বললেন, আপনি বড়ই নির্ভরযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য ইলম অর্জন করেছেন।
ইমাম সাহেবের হাদীছ সম্পর্কিত জ্ঞান
মক্কী ইবনে ইব্রাহীম (রহঃ) ছিলেন ইমাম সাহেবের ছাত্র। হাদীস এবং ফিকহ উভয়টিই ইমাম সাহেব হতে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। ইসমাঈল বিন বাশার বলেন, একবার আমি মক্কী ইবনে ইব্রাহীমের মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। তিনি আবু হানিফা (রহঃ) থেকে হাদীছ বর্ণনা করতে লাগলেন। এক ব্যক্তি বলে উঠল, ইবনে জুরাইজের কোন রেওয়ায়াত বর্ণনা করুন। আবু হানিফার রেওয়ায়াত আমাদের প্রয়োজন নাই।
এক কথা শুনতেই তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘তুমি আমার মজলিস থেকে উঠে যাও।’ সে ব্যক্তি উঠে যাওয়া পর্যন্ত তিনি কোন রেওয়ায়াত বর্ণনা করেন নাই।
শাদ্দাদ বিন হাকীম বলেন, আবু হানিফা হতে অধিক জ্ঞানী আমি আর কাউকে দেখি নাই।
মারুফ বিন হাসান বলেন, যে সমস্ত উলামার সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে। তাদের মধ্যে হতে কেউ ফিকহ্, তাকওয়া, রিয়াযত, ইবাদতে ইমাম সাহেবের সমতুল্য ছিলেন না।
ইউসুফ বিন খালিদ বলেন, আবু হানিফা ছিলেন বিশাল সমুদ্র। তাঁর তুল্য কাউকে দেখিও নাই, শুনিও নাই।
খলফ বিন আইয়ুব বলেন, আবু হানিফা (রহঃ) ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলেন, প্রথম প্রথম আমি ইবনে আবি লায়লার মজলিসে যেতাম। পরে ইমাম সাহেবের মজলিসে যোগ দিলাম। একবার ইবনে আবি লায়লার সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি ইমাম সাহেবের অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর বললেন, তাঁর মজলিস ত্যাগ করো না। ফিকহ্ এবং ইলমে তাঁর সমতুল্য কাউকে আমি দেখি নাই।
খলফ ইবনে আইয়ূব বলেন, ইলম আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসেছে। অতঃপর তা ছাহাবাদের মধ্যে বন্টন হয়েছে। তারপর তাবেয়ীনদের মধ্যে বন্টন হয়েছে। এরপর আবু হানিফা এবং তাঁর শাগরেদদের মধ্যে।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রহঃ) বলেন, যদি আশংকা না হত যে, আমার প্রতি সীমালংঘনের অভিযোগ করা হবে তাহলে আমি আবু হানিফার উপর কাউকে অগ্রগণ্য করতাম না।
আবু ইছমা বলেন, আমি আমার উস্তাদদের থেকে শিখা অনেকগুলো হাদীছ ইমাম সাহেবের সম্মুখে পেশ করলাম। তিনি প্রত্যেকটি হাদীছের প্রয়োজনীয় অবস্থা বলে দিলেন যে, অমুক হাদীছটি গ্রহণযোগ্য অমুকটি গ্রহণযোগ্য নয়। এখন আমার আফসোস হচ্ছে যে, সবগুলো হাদীছ তাঁকে কেন শুনালাম না।
আবু হানিফা ছিলেন ইমাম আযম বা মহা ইমাম
ইব্রাহীম বিন ত্বহমান বলেন, আবু হানিফা প্রত্যেক বিষয়ের ইমাম ছিলেন।
আবু ইমাইয়্যাকে জিজ্ঞাসা করা হল ইরাক হতে আগত উলামাদের মধ্য হতে ফিকহ্ সম্বন্ধে অধিক অভিজ্ঞ কে? তিনি বললেন, আবু হানিফা এবং তিনিই ইমাম।
ইবনে মুবারক (রহঃ) বলেন, তোমরা একথা কিরূপে বল যে, ইমাম আযম হাদীছ জানেন না।
অর্থাৎ যিনি অন্যান্য ইমামদেরও ইমাম তিনি হাদীছ জানবেন না তা কিরূপে হতে পারে?
মানাকেবে আবি হানিফা নামক কিতাবে বর্ণিত রয়েছে, ইমাম সাহেব বলেন, আমার নিকট কয়েক সিন্দুক হাদীছ সংরক্ষিত রয়েছে। তন্মধ্যে হতে প্রয়োজনীয় কিছু সংখ্যক হাদীছ প্রকাশ করেছি।
খলফ বিন আইয়ুব বলেন, আমি আলেমদের মজলিসে অংশগ্রহণ করতাম। তাঁদের কোন কথা বুঝে না এলে চিন্তা হত। আবু হানিফার নিকট জিজ্ঞাসা করলে তার সমাধান হয়ে যেত। এতে অন্তরে নূরের সৃষ্টি হত।
মুকাল বিন সুলাইমান (রহঃ) বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কে ইলমের ব্যাখ্যা করতে শুনেছি। তিনি এত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতেন যে, অন্তর শীতল হয়ে যেত।
ফযল বিন মুসা বলেন, আমি ঘুরে ঘুরে হিজায এবং ইরাকের আলেমগণের মজলিসে অংশ নিতাম। কিন্তু ইমাম সাহেবের মজলিসে যে ফায়দা পেতাম অন্য কারো মজলিসে তা পেতাম না।
একদা ওকী (রহঃ)-এর মজলিসে একটি হাদীছ পেশ করা হল। হাদীছটির ভাবার্থ কঠিন ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে গিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এখন লজ্জিত হয়ে কি ফায়দা হবে। কোথায় আছেন সে শায়খ (অর্থাৎ আবু হানিফা) যাঁকে দিয়ে হাদীছটি বুঝিয়ে নেওয়া যেত।
একবার ইবনে মুবারক (রহঃ) ইমাম সাহেবের কবরের পার্শ্বে দাড়িয়ে বললেন, ইব্রাহীম নখয়ী এবং হাম্মাদ বিন সুলাইমান মৃত্যুবরণ করার সময় তাঁদের যোগ্য প্রতিনিধি রেখে গিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে রহম করুন। আপনার যোগ্য প্রতিনিধি পৃথিবীর বুকে কেউ নাই। একথা বলতে বলতে তিনি হুহু করে কাঁদতে লাগলেন।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলতেন, আমার আকাংখা এই যে, ইমাম সাহেবের একটি মজলিস আমার নসীব হোক। এর জন্য আমার অর্ধেক সম্পদ ব্যয় করতেও রাজী আছি।
আসমায়ী (রহঃ) এ আকাংখার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, কোন কোন মাসয়ালায় আমার দ্বন্দ রয়েছে। সেগুলো পরিষ্কার করে নেয়া দরকার।
ঐ সময়ে ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ এর নিকট বিশ লক্ষ দিরহাম ছিল।
খাল্লাদ সকূনী (রহঃ) বলেন, একদিন আমি খুছাইব বিন মুয়াবিয়ার নিকট গেলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কোথা হতে এসেছি? আমি বললাম, আবু হানিফার নিকট হতে এসেছি। তিনি বললেন, খোদার কসম! তাঁর নিকট একদিন বসলে যেরূপ উপকৃত হবে আমার নিকট একমাস বসলেও সেরূপ হবে না।
ওকী (রহঃ) মুহাদ্দেছগণকে লক্ষ্য করে বলতেন, তোমরা হাদীছ শিখেছ অথচ তার মর্ম বুঝতে চেষ্টা করছ না। এতে তোমাদের দ্বীন এবং তোমাদের জীবন দুটোই বিনষ্ট হবে। আমার তো এ আকাংখা যে যদি আমি তাঁর ফিকহ দশভাগের এক ভাগও পেতাম।
একদিন তিনি মজলিসে উপস্থিত ছাত্রদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, ফিকহ্ ব্যতীত হাদীছ দ্বারা তোমাদের কোন ফায়দা হবে না। তোমাদের সমঝ (বুঝার দক্ষতা) সৃষ্টি হবে না। যদি না তোমরা ইমাম আবু হানিফার শাগরেদদের সাহচর্য অবলম্বন কর এবং তাঁরা তাঁদের মতের ব্যাখ্যা না করেন।
ইবনে মুবারক (রহঃ) বলেছেন, তোমরা এরূপ বলো যে, আবু হানিফার রায় বরং বলো হাদীছের ব্যাখ্যা।
ইউসুফ বিন খালিদ (রহঃ) বলেন, আমি বসরায় উছমান (রহঃ)-এর খিদমতে আসা-যাওয়া করতাম। সে সময় আমার ধারণা এল যে, আমার যথেষ্ট ইলম শিখা হয়ে গেছে কিন্তু যখন ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলাম তখন আমার চোখ খুলল। বুঝলাম আমার কোন ইলমই শিখা হয় নাই।
শাদ্দাদ বিন হাকীম বলেন, যদি ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর শাগরেদদের দ্বারা আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর ইহসান না করতেন তবে আমরা বুঝতে পারতাম না যে কোনটিকে অবলম্বন করব কোনটি করব না।
ইবনে মোবারক (রহঃ) স্বীয় শাগরেদদিগকে বলতেন, তোমরা হাদীছ এবং আছার আঁকড়ে ধর। তবে এর জন্য আবু হানিফার প্রয়োজন আছে কারণ তিনি হাদীছের অর্থ বুঝেন।
মুহাদ্দেছগণ বলতেন ইবনে মুবারক আবু হানিফা হতে বড় আলেম। এ কথা শুনে আবু সায়ীদ বিন মুয়ায বললেন, এ সমস্ত লোক রাফেযীর মত। তারা হযরত আলীকে স্বীয় ইমাম মানে অথচ স্বয়ং তাদের ইমাম যাদেরকে ইমাম হিসাবে মানে তারা তাঁদের ইমাম মানেন না। তদ্রুপ এরাও ইবনে মুবারককে নিজেদের ইমাম সাব্যস্ত করে। অথচ তিনি স্বয়ং যাঁকে নিজের ইমাম সাব্যস্ত করেছেন তারা তাকে ইমাম হিসাবে মানছে না।
সমকালীনদের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়
যেমনিভাবে বিভিন্ন কিতাবে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের বাণী দ্বারা ইমাম সাহেবের গুণাবলীর প্রকাশ পেয়েছে তদ্রুপ কোন কোন ব্যক্তি হতে ইমাম সাহেবের সমালোচনাও বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে ‘তারীখে বাগদাদ’ নামক কিতাবে খতীবে বাগদাদী ইমাম সাহেব সম্বন্ধে সমালোচনামূলক কিছু কিছু মন্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে সেগুলোর ভিত্তিহীনতা এবং বাতুলতা প্রমাণ করা হচ্ছে।
ইমাম সম্বন্ধে যে সব সমালোচনা মূলক মন্তব্য খতীবে বাগদাদী হতে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো এমন সব ব্যক্তির মন্তব্য. যাদের ইমাম সাহেবের সাক্ষাৎ নসীব হয় নাই। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন রয়েছেন যারা ইমাম সাহেবের সমকালীন ছিলেন বটে, তৰে ইমাম সাহেবের সাথে তাদের সাক্ষাতের সুযোগ এবং সৌভাগ্য হয় নাই। আবার কেউ কেউ ইমাম সাহেবের সমকালীন ছিলেন, শুনে শুনে ইমাম সাহেবের সমালোচনা করে কুৎসা গেয়ে বেড়িয়েছেন।
কাজেই ইমাম সাহেবের ব্যাপারে তাদের কারো কথাই গ্রহণযোগ্য হবে না । কারণ তারা ইমাম সাহেবকে দেখাতে পান নাই। যদি দেখার সুযোগ হতো তবেই না ইমাম সাহেবের বিরোধিতা করা যেতো।
যারা ইমাম সাহেবের সমকালীন ছিলেন এবং ইমাম সাহেবের বংশগৌরব এবং মান মর্যাদা দেখে তাঁর বদনাম গেয়ে বেড়িয়েছেন তাঁরা ছিলেন হিংসাপরায়ণ এবং ইমাম সাহেবের দুশমন। হিংসুকদের এ ধরনের কথা মমাটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সম্ভবত এ ধরনের লোকদের কথাই এ হাদীছে বলা হয়েছে,
“আমার উম্মতের এমন এক সময় আসবে যখন ফকীহরা পরস্পরকে হিংসা করবে”।
‘সিয়ারু আলামিনুবলো’ নামক কিতাবে আল্লামা যাহরীর কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, সমকালীন সমালোচকদের কথা গ্রহণযোগ্য নয়।
ইবনে হজর মক্কী (রহঃ) ‘আলখাইরাতুল হিসান ফী মানাফেকে নু’মান’ নামক কিতাবে লিখেন, সমকালীন লোকদের পরস্পর সমালোচনা গ্রহণযোগ্য নয়। হাফেয ইবনে হজর এবং আল্লামা যাহরীও এ মত প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে বুঝা যায় যে, কোন শত্রুতার কারণে অথবা মাযহাবের কারণে সমালোচনা করা হচ্ছে। কারণ হিংসা হতে আল্লাহ যাকে হিফাযত করেন সেই নিস্কৃতি পেয়ে থাকে।
আল্লামা যাহরী বলেন, কোন একটি যুগের লোক হিংসা হতে নিরাপদে রয়েছে বলে আমি শুনি নাই।
তিনি আরো লিখেন, ‘তাজ সবকী তবাকাতে বলেছেন, মুহাদ্দেছগণের নিয়মানুসারে জরাহ (দোষ বর্ণনা) তা’দীলের (গুণের) উপর মুকাদ্দম (অগ্রগণ্য)। এটা দ্বারা এরূপ বুঝো না যে, সর্বক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য। বরং সঠিক হল, যার সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও দোষমুক্তি প্রমাণিত, যার গুণ বর্ণনাকারী অধিক এবং দোষ বর্ণনাকারী কম অধিকন্তু দোষ বর্ণনাকারী স্বীয় মাযহাব ও মত প্রচার সম্পর্কিত কোন স্বার্থও এর সাথে সংশ্লিষ্ট যাকে সে ক্ষেত্রে দোষ বর্ণনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হবে না।
এ সম্পর্কে ‘ফতহুল মুগীছ আদদাউল লামে ফী আয়ানেল নিততাসে মিনহাজুসসুন্নাহ’ প্রভৃতি কিতাবেও আলোচনা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মোদ্দাকথা হল, সম-সাময়িক আলেমরা যদি একে অপরের সমালোচনা করে তবে লক্ষ্য করতে হবে যে, এর পিছনে কারণ কি? যদি দেখা যায় যে তার কারণ হচ্ছে হিংসা অথবা স্বীয় মাযহাব বা মত সম্পর্কিত কোন স্বার্থ কিংবা পার্থিব কোন উদ্দেশ্য। আর সমালোচনা করা হচ্ছে এমন ব্যক্তির যার সততা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রসিদ্ধ, যার পাপ হতে পূণ্য অধিক এবং তাঁর প্রশংসাকারীও বহুসংখ্যক তবে এমন লোকের সম্বন্ধে কোন সমালোচনাই গ্রাহ্য নয়। এ কারণেই সুফিয়ান ছাওরী ইমাম সাহেব সম্বন্ধে ইবনে আবি খিব ইমাম মালেক সম্বন্ধে, ইবনে মা’য়ীন ইমাম শাফেয়ী সম্বন্ধে, নাসাঈ আহমদ বিন সালেহ সম্বন্ধে এবং সাখাবী সূয়ূতী সম্বন্ধে যে মন্তব্য বা সমালোচনা করেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়।
তাবাকাতুশ শাফেয়ীয়া নামক কিতাবে ইমাম সুবকী (রহঃ) লিখেন, আবু যুরআ এবং আবু হাতেম ইমাম বোখারী (রহঃ) সম্পর্কে লিখেছেন যে, তিনি মতরুক (অর্থাৎ তার হাদীছ গ্রহণযোগ্য করা যায় না) কিন্তু তাঁদের লিখা দ্বারা তিনি মতরুক হননি।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত রয়েছে, উলামাদের কথা শোন। কিন্তু অন্যের বিরুদ্ধে যে কথা বলে তা সত্য মনে করো না।
মালেক ইবনে দীনার বলেন, প্রতিটি বিষয়ে উলামাদের কথা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু পরস্পরের বিরুদ্ধে যে কথা বলে তা গ্রাহ্য হবে না।
ইমাম সাহেবের সম-সমায়িক মুহাদ্দেছগণের মধ্য হতে যারা তার সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য করেছেন তাদের অধিকাংশই প্রাথমিক ভাবধারা হতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। যেমন সুফিয়ান ছাওরী, আওযায়ী ওকী (রহঃ) প্রমুখ। তারা ইমাম সাহেব সম্বন্ধে যে সব বিরূপ মন্তব্য করেছেন এর দ্বারা ইমাম সাহেবের নিস্কতা এবং নির্ভরযোগ্যতা আরো দৃঢ় হয়। কারণ তারা তাদের পূর্বের কথা তথা ইমাম সাহেব সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য হতে প্রত্যাবর্তন করা এ কথাই প্রমাণ করে যে, তাদের নিকট পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, তারা ইমাম সাহেব সম্বন্ধে যেসব , দোষারূপ করেছেন ইমাম সাহেব সেসব হতে পবিত্র।
ইমাম সাহেবের উপর তাদের; বরং সবার পক্ষ হতে এ অপবাদ ছিল যে, ইমাম সাহেব হাদীছ জানতেন না। হাদীছের বিপরীতে তিনি স্বীয় মত প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে যখন এরা তাঁর বিরোধীতা হতে প্রত্যাবর্তন করে ইমাম সাহেবের প্রশংসায় মেতে উঠলেন তখন এতে নিশ্চিতরূপে বুঝা গেল তাদের প্রদত্ত অপবাদগুলো ভিত্তিহীন।
এরপরও যারা এ মন্তব্য করেন যে, ইমাম সাহেব হাদীছ জানতেন না এবং তিনি হাদীছের বিপরীতে স্বীয় মতানুযায়ী আমল করতেন। পক্ষান্তরে তারা সুফিয়ান ছাওরী, আওযায়ী প্রমুখের উপর মিথ্যা বলার অপবাদ লাগাচ্ছেন।
অধিকন্তু, ইমাম সাহেবের (সমালোচকদের) সংখ্যা তাদীলকারীদের খুলনায় কম। তারা এদের তুলনায় মর্যাদাগত দিক থেকেও ছোট। এর দ্বারা কথা প্রমাণ হয় যে, ইমাম সাহেবের সমালোচনার কারণ ছিল হয় অজ্ঞতা অথবা হিংসাপরায়ণতা।
হাদীছের কয়েকজন শায়খের তালিকা
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, ইমাম সাহেবের উস্তাদ এবং শায়খদের সংখ্যা অনেক বেশী। এখানে প্রধান প্রধান কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে।
আমের বিন শুরাহিল আল হিময়ারী আল কূফী, হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান, মুসলিম আশআরী আল কূফী, আলকামা বিন মারছাদ আল হারামী আলকূফী, হাকাম বিন উতাইবা আলকূফী, আসেম বিন আবিন্নাজুদ আলকূফী, সালমা বিন কুহাইল আলহাযরামী আলকূফী, আলী ইবনুল আকমার আলকূফী, আতা বিন আবি রাবাহ আলমক্কী, সায়ীদ মসরুক ছাওরী, আবু জাফর বাকের মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন, আদী বিন ছাবেত আনসারী আলকূফী, আতিয়্যা বিন সায়ীদ আওফী আলকূফী, আবু সুফিয়ান সাদী, আবু উমাইয়া আব্দুল করীম, আবু মুখারেক আলবসরী, ইয়াহয়া বিন সায়ীদ আনসারী, হিশাম বিন উরওয়া আলমাদানী, নাফে মাওলা ইবনে উমর আলমাদানী, আব্দুর রহমান বিন হুরমুম আল আরাজ আলমাদানী, কাতাদা, আমর বিন দীনার আলমক্কী, আবু ইসহাক সুবায়য়ী আলকূফী, মুহারিব বিন দিছার আলকূফী, হুয়াইছম বিন হাবীব সাওয়্যাফ আলকূফী, কায়স বিন মুসলিম আলকূফী, ইয়াযীদ বিন সুহাইব আলকূফী, আব্দুল আযীয বিন রফী আলমক্কী আলকূফী, আবু যোবায়ের মুহাম্মদ বিন মুসলিম আলমক্কী, মনসূর বিন মু’তামির আলকূফী, সুলাইমান বিন মেহরান আলআমাশ আলবসরী প্রমুখ।
হাদীছের রেওয়ায়েত কম হওয়ার কারণ
যেহেতু ইমাম সাহেবের মূল বিষয় ছিল ফিকাহ এবং ইজতিহাদ, সেহেতু তিনি হাদীছের ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। হাদীছ রেওয়ায়েত করার চেয়ে সে ব্যাপারে গবেষণা করার প্রতি অধিক মনোযোগী ছিলেন। এ কারণে বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা কম মনে হয়। এ বিষয়টিকে অবলম্বন করেই পরশ্রীকাতররা তিলকে তাল করে পেশ করেছে। অথচ অধিক সতর্কতা অবলম্বন করার কারণে অন্যান্য ইমামগণের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যাও তুলনামূলক কম। যেমন ইমাম মালেক (রহঃ)-এর বর্ণিত হাদীছের সমষ্টি শুধুমাত্র তাঁর কিতাব মুয়াত্তা হাদীছের অন্যান্য কিতাবের তুলনায় এ কিতাবটি নেহায়াতই সংক্ষিপ্ত। এর অর্থ এ নয় যে, ইমাম মালেক (রহঃ) হাদীছ জানতেন না। বরং তিনি হাদীছের বিষয়ে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করেছেন এবং অধিক হাদীছ বর্ণনা করা থেকে বিরত রয়েছেন।
ইবনে আবি হাতেম বর্ণনা করেন, আমি ইয়াহয়া বিন ময়ীনকে জিজ্ঞেস করলাম যে, ইমাম মালেকের হাদীছ কম কেন? তিনি বললেন, অধিক সতর্কতা এবং যাচাইয়ের কারণে এরূপ হয়েছে। স্বয়ং ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, আমি ইবনে শিহাব যুহরী থেকে অনেক হাদীছ শ্রবণ করেছি কিন্তু সেগুলো আমি কখনও রেওয়ায়েত করিনি। করবও না। এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, এগুলো অনুসারে আমল করা হয় না। ইমাম মালেক (রহঃ) এর মৃত্যুর পর তাঁর কিতাবগুলো বের করা হলে দেখা গেল সেখানে ইবনে উমর (রাঃ) এর অনেক হাদীছ রয়েছে। মুয়াত্তায় সেসব হাদীছ থেকে মাত্র দুটি হাদীছকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, ইমাম মালেক (রহঃ) হাদীছের অংশ বিশেষে সন্দেহ হলে পুরো হাদীছটিই বাদ দিয়ে দিতেন। আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাব বলেন, মানুষের ইলম বৃদ্ধি পেতে থাকে আর হাদীছের ব্যাপারে ইমাম মালেকের ইলম কমতে থাকে। ঠিক তদ্রুপ ইমাম আবু হানিফা হাদীছের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতেন। এ বিষয়ে তিনি হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এর অনুসারী ছিলেন। যাঁর অবস্থা এই যে তিনি সহজে ” কালা কালা রাসুল (সা)” বলতেন না! যখন বলার দরকার হতো, তখন শরীরে কম্পন.এসে যেত এবং চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেত। আর যেহেতু ইমাম সাহেব হাদীছ বর্ণনা হতে তাফাকুহ অর্থাৎ গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং কোরআন ও হাদীছ থেকে মাসয়ালা বের করার পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তাই আহকামবিশিষ্ট ঐ হাদীছের উপর জোর দিয়েছেন যেগুলো গবেষণা এবং ইজতিহাদযোগ্য। ইবনে শুবরুমা বলেন, হাদীছ কম বর্ণনা কর। ফকীহ হতে পারবে। হাসান বসরী বলেন,
ফিকাহ যার মজ্জাগত বিষয় না হবে, হাদীছ বর্ণনা দ্বারা তবে কোন ফায়দা নেই।
ফকীহ হওয়ার জন্য মুহাদ্দিছ হওয়া আবশ্যক। যদি হাদীছ সম্পর্কে জ্ঞানই না থাকে, তা থেকে আহকাম এবং মাসয়ালা কিভাবে বের করবে? হাদীছ অধিক রেওয়ায়েত করা একজন ফকীহর উদ্দেশ্য নয়। এজন্য সাধারণ মুহাদ্দিছগণের মত তাঁরা হাদীছ জমা করেন না। এটা মুহাদ্দিছগণের কাজ, যাঁরা রাসূলুল্লাহ হাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক একটি হাদীছের জন্য দুর-দুরান্ত সফর করেছেন এবং কষ্ট করে সেগুলো জমা করেছেন।
অল্প সংখ্যক হাদীছ বর্ণনার অপবাদ খণ্ডন
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা খুবই কম। এটিকে ভিত্তি করে তার সমালোচকগণ অপবাদ দিচ্ছে যে তার হাদীছের জ্ঞান খুবই সীমিত।
মূলতঃ কারও বর্ণিত হাদীছের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে তার হাদীছের জ্ঞান পরিমাপ করা যায় না। কারণ স্বল্প সংখ্যক হাদীছ বর্ণনা করায় হাদীছের জ্ঞান সীমিত হওয়া বুঝা যায় না।
যেমন দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ৫৪৫টি। অথচ তিনি নবুওয়্যতের ষষ্ঠ বছর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সর্বদা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যে ছিলেন। তাঁর জানা হাদীছের সংখ্যা তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা হতে অনেক বেশী হবে।
হযরত আলী (রাঃ) সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে একজন। চব্বিশ বছর যাবৎ তিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যে ছিলেন। অথচ তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ৫৮৬টি। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এর হাদীছের সংখ্যা ৮৪৮টি অথচ তিনি ২২ বছর যাবৎ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম হিসেবে তাঁর সাহচর্যে ছিলেন।
এঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা থেকে অনেক গুণ অধিক হাদীছ জানতেন। কিন্তু অত্যাধিক সতর্কতা অবলম্বন করার কারণে খুবই কম হাদীছ বর্ণনা করতেন। কারণ হাদীছ বর্ণনায় সামান্যতম ভুলেও ভয়ের কারণ রয়েছে। এ কারণে তাঁরা সরাসরি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্পর্কিত করে হাদীছ বর্ণনা করতেন না। অবশ্য তাঁরা মাসায়েল এবং ফতোয়ার আকারে হাদীছ বর্ণনা করতেন। আল এসাবা’ নামক কিতাবে বর্ণিত রয়েছে যে, হযরত উমর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে উমর (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত যায়েদ বিন ছাবেত (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রমুখের ফতোয়া এত অধিক যে, সেগুলো সংকলন করলে প্রত্যেকের ফতোয়াই একেকটি কিতাবাকার ধারণ করবে।
হাদীছ বর্ণনা করার ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এবং তাঁর সঙ্গীগণ ছাহাবায়ে কিরামের পথ অনুসরণ করেন। তারা এরূপ করেননি, যে হাদীছই শ্রবণ করেছেন তাই বর্ণনা করেছেন। বরং তারা হাদীছের মধ্যে নাসেখ-মনসুখ। দূর্বল শক্তিশালী প্রভৃতি দিক বিবেচনা করে যেটা গ্রহণযোগ্য সেটাই বর্ণনা করতেন। অধিকন্তু তারা ছাহাবায়ে কিরামের আমল, তাদের ফতোয়া এবং বাণী দ্বারা হাদীছ নিরূপণে সহায়তা নিতেন। হানাফী মাযহাবের এ সব প্রশংসনীয় দিকের কারণে তাঁর সমালোচকরা ঈর্ষাকাতর হয়ে এ অপবাদ দিচ্ছে যে তিনি খুব কম সংখ্যক হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর অল্প সংখ্যক হাদীছ বর্ণনা করার অপবাদের আরেক উত্তর এভাবে দেয়া হয়ে থাকে যে, হাদীছ মূলতঃ দু প্রকারের। এক প্রকারের হাদীছ আহকামের সাথে সম্পর্কিত। দ্বিতীয় প্রকারের হাদীছ আহকামের সাথে সম্পর্কিত নয় ।
দ্বিতীয় প্রকারের হাদীছ বর্ণনা করার ব্যাপারে ছাহাবায়ে কিরাম এবং ফিকাহবিদগণ অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। বরং খোলাফায়ে রাশেদীন এ প্রকারের হাদীছ বর্ণনা করা থেকে বিরত রয়েছেন এবং অন্যদেরকেও তার বর্ণনা করা থেকে নিষেধ করেছেন। আর প্রথম প্রকারের হাদীছ আহকামের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে সেগুলো বর্ণনা করা থেকে নিষেধ করতেন না। বরং সেগুলো বর্ণনা করার জন্য তাকীদ করতেন। খলীফা হওয়ার পর হযরত উমর (রাঃ) বলেন, তোমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ কম বর্ণনা কর। তবে যেগুলো আমল করা প্রয়োজন সেগুলো বর্ণনা কর।
হযরত উবাদা বিন ছাবেত (রাঃ) বলেন, যে সমস্ত হাদীছে তোমাদের ধর্মীয় ফায়দা রয়েছে, সেগুলো সব আমি বর্ণনা করে দিয়েছি।
হয়রত উবাদা (রাঃ) এর এ বাণীর ব্যাখ্যায় কাযী আরায় (রহঃ) বলেন, এ কথা দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, তিনি সে সব হাদীছ রেওয়ায়েত করেননি যেগুলোতে মুসলমানদের কোন ক্ষতি বা ফিতনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কিংবা যেগুলো প্রত্যেকেই বুঝতে পারবে না। আর এগুলো সে সব হাদীছ যেগুলো আহকাম কিংবা দণ্ডবিধানের সাথে সম্পর্কিত নয়। এ ধরনের হাদীছ রেওয়ায়েত করা হযরত উবাদা বিন ছাবেত (রাঃ) এরই বিশেষত্ব নয় বরং অন্যান্য অনেক ছাহাবী থেকেও এরূপ অনেক প্রমাণ রয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)ও খোলাফায়ে রাশেদীন এবং বিশিষ্ট ছাহবায়ে কিরামের নির্দেশাবলীর প্রতি লক্ষ্য রেখে শুধুমাত্র সে সমস্ত হাদীছ বর্ণনা করেছেন যেগুলো আহকামের সাথে সম্পর্কিত।
শাহ ওলীউল্লাহ (রহঃ), হযরত উমর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) কে তাদের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা কম হওয়া সত্ত্বেও অধিক হাদীছ বর্ণনাকারীদের মধ্যে গণনা করেছেন। তিনি লিখেন, সমস্ত মুহাদ্দিছগণই অধিক হাদীছ বর্ণনাকারী হিসেবে আটজন ছাহাবীকে সাব্যস্ত করেছেন, এঁরা হচ্ছেন হযরত আবু হোরায়রাহ (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রাঃ), হযরত আনাস (রাঃ), হযরত জাবের (রাঃ), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)। আর হযরত উমর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) কে মাঝারি সংখ্যক হাদীছ বর্ণনাকারীদের মধ্যে গণনা করা হয়েছে। কিন্তু এ ফকীহের মতে এদের থেকেও অনেক হাদীছ বর্ণিত রয়েছে। কারণ, বাহ্যতঃ যে সব হাদীছ মওকুফ, বস্তুতঃ সেগুলো মরফু। আর এদের থেকে ফিকাহ, ইহসান এবং হিকমত সম্পর্কীয় যে সব বাণী বর্ণিত রয়েছে, বিভিন্ন কারণে সেগুলোও মরফু এর পর্যায়। সুতরাং তাঁদেরকে অধিক হাদীছ বর্ণনাকারীদের মধ্য গণনা করাই সমীচীন।
উল্লেখিত তিনজন ছাহাবীর প্রত্যেকের থেকে বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা পাঁচশ থেকে হাজারের মধ্যে। এদেরকে যদি অধিক হাদীছ বর্ণনাকারীদের মধ্যে গণনা করা সঠিক হয়ে থাকে তবে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কে যার বর্ণিত মরফু হাদীছ ব্যতীত ও মওকুফ হাদীছ, মাসায়েল, ফতোয়া ইত্যাদি হাজার হাজার পৃষ্ঠাব্যাপী রয়েছে তাঁকে কোন মতেই অল্প সংখ্যক হাদীছ বর্ণনাকারী বলা সমীচীন হবে না।
প্রসিদ্ধ তাবেয়ী মসরূক (রহঃ) বলেন, আমি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলাম যে, সমস্ত জ্ঞানের উৎস হচ্ছেন হযরত উমর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত যায়েদ (রাঃ), হযরত আবু দারদা (রাঃ) এবং হযরত উবাই (রাঃ)। এরপর আরো গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলাম যে, এদের সবার সমস্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার হচ্ছেন হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)।
শাহ ওলীউল্লাহ (রহঃ) এর একটি দীর্ঘ আলোচনার সারকথা এরূপ, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর শিক্ষক ইব্রাহীম নখয়ী (রহঃ) তাঁর মাযহাবের ভিত্তি রাখেন হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বর্ণিত মাসায়েল এবং ফতোয়ার উপর।
ইব্রাহীম নখয়ী ছিলেন কূফার সমস্ত আলেমদের জ্ঞান ভাণ্ডার। তাঁর ফিকাহর অধিকাংশ মাসয়ালাই ছাহাবায়ে কিরাম থেকে বর্ণিত। তিনি সে সব মাসয়ালাই সংগ্রহ করেছেন যেগুলো সহীহ হাদীছের আলোকে নির্ভুল।
এর উপসংহারে শাহ সাহেব যা লিখেছেন, তার মর্ম এরূপ, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ইব্রাহীম নখয়ী (রহঃ)-এর মাসায়েল এবং ফতোয়া অর্জন করেন।
মাসয়ালা গবেষণার ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ছিল। ইব্রাহীম নখয়ী (রহঃ) এবং তাঁর সমকালীনদের মাসায়েল এবং বাণীগুলো যদি মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, মুসান্নাফে আব্দির রাযযাক এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর কিতাবুল আছার এর সাথে মিলিয়ে দেখা হয় তবে খুব অল্প সংখ্যক মাসয়ালার মধ্যে অমিল পাওয়া যাবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর সমালোচক এবং ঈর্ষাকাতররা তাঁর দোষ তালাশেই লিপ্ত রয়েছে। মুহাদ্দিছগণ এবং ইমামগণ তাঁর যে সমস্ত গুণাবলীর সাক্ষ্য দিয়েছেন, তার প্রতি কোন লক্ষ্যই তাদের নেই। বস্তুতঃ তারা পূর্বেকার কোন কোন লিখকের অনুসরণে তাদের রচনাবলী হতে উদ্ধৃতি দিয়ে তার সমালোচনা করে থাকে। ঐ সমস্ত উদ্ধৃতি কিংবা রেওয়ায়েত মিথ্যা। গ্রহণযোগ্য হবার জন্য ইমামদের দিকে সেগুলোকে সম্পর্কিত করা হয়েছে। আর যদি সত্য বলে ধরে নেয়া হয় তবে তার কারণ হবে অজ্ঞতা এবং ভুল বুঝাবুঝি। যেমন ইমাম আওযায়ী (রহঃ) ইমাম সাহেবের ব্যাপারে ভুল ধারনা নিয়েছিলেন। পরে যখন ইমাম সাহেবের সাথে তার সাক্ষাৎ হল তখন তার ভুল ধারণার অবসান হয়। তদ্রপ যাদের লেখায় কিংবা কথায় ইমাম সাহেবের দোষ-ত্রুটির উল্লেখ রয়েছে। সেটি তাদের ভুল ধারনার কারণে হয়েছে। ইমাম সাহেব সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকলে তাদের এ ধারণার অবসান হতে পারত।
যারা ইমাম সাহেবের দোষত্রুটি বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর সমালোচনা করেছেন তাদের প্রত্যেকের থেকে আবার ইমাম সাহেবের প্রশংসাও বর্ণিত রয়েছে। এটা তখনই হতে পারে যখন তাদের ভুলের অবসান হয়ে থাকে। আর ভুল ধারনার অবসান তখনই হবে যখন তার মেধা, জ্ঞান প্রভৃতি গুণাবলী সম্বন্ধে সঠিক ধারনা হয়ে থাকে। তার সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমেই তাঁর সম্বন্ধে সঠিকভাবে জানা যেতে পারে।
একবার মদিনা মুনাওয়ারায় ইমাম সাহেবের সাথে ইমাম মালেক (রহঃ)-এর সাক্ষাত হল। দীর্ঘ সময়ব্যাপী উভয়ের মাঝে ইলমী আলোচনা হল।
ইমাম মালেক (রহঃ) যখন সেখান থেকে উঠে এলেন তখন তাঁর সমস্ত দেহ ঘর্মাক্ত ছিল। লাইছ বিন সাদ তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আবু হানিফার সাথে বিতর্ক করতে করতে ঘর্মাক্ত হয়ে গেছি। নিঃসন্দেহে এ ব্যক্তি একজন বড় ফকীহ।
ইমাম সাহেবের সমালোচনামূলক যে সমস্ত কথা ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর দিকে সম্পর্কিত করা হয় তাও সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইমাম সাহেবের মৃত্যুর বছর ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) জন্মগ্রহণ করেন। সুতরাং তিনি তাঁর সম্পর্কে সমালোচনা করতে পারেন না। বরং তিনি দীর্ঘদিন ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর নিকট থেকে ইমাম সাহেবের ফিকাহর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি আবু হানিফার শিষ্যের শিষ্য হয়ে কি করে তার সমালোচনা করতে পারেন। বরং তিনি বলেন,
“ফিকাহ এর ব্যাপারে সমস্ত মানুষ আবু হানিফার প্রতি মুখাপেক্ষী”।
তদ্রুপ ইমাম আহমদ (রহঃ)-এর দিকে ইমাম সাহেবের সমালোচনামূলক যে কথাগুলো সম্পর্কিত করা হয় তাও ভিত্তিহীন। ইমাম সাহেবের মৃত্যুর চৌদ্দ বছর পর তাঁর জন্ম হয়। তিনি তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র আবু ইউসুফ (রহঃ) থেকে হানাফী ফিকাহর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি বলেন, তিন বৎসরে আমি ইমাম আবু ইউসুফ থেকে তিন বস্তা পরিমাণ ইলম লিখেছি।
যে সমস্ত লিখক বিভিন্ন ইমাম এবং ফিকাহবিদদের থেকে ইমাম সাহেবের সমালোচনামূলক উক্তি স্বীয় কিতাবে উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে খতীবে বাগদাদী একজন। নিম্নে তার কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করা হল।
আবু হানিফা হাদীছের ব্যাপারে এতীম এবং পঙ্গু ছিলেন। তিনি হাদীছের লোক ছিলেন না।
আবু হানিফার নিকট রায়ও ছিল না হাদীছও ছিল না। তার বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে একশ’ পঞ্চাশটি। এর অর্ধেকগুলোতে আবার তিনি ভুল করেছেন।
ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তার ইতিহাসের মুকাদ্দামায় লিখেন,
আবু হানিফার বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা সতেরটি পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে কথিত আছে।
বাস্তব জগতে এটা কতটুকু সঠিক তা পূর্বের আলোচনা দ্বারাই বুঝা গেছে। পাঠকদের সামনে এসব অপবাদের আর কয়েকটি উত্তর উল্লেখ করা হচ্ছে।
১। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সর্বজন স্বীকৃত ইমাম এবং মুজতাহিদ ছিলেন। খতীবে বাগদাদী যাদের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন তারাও এ বিষয়ে একমত। এখন প্রশ্ন জাগে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) যখন হাদীছ জানতেন
মাত্র সতেরটি হাদীছ মুখস্ত ছিল, তখন কি করে অন্যান্য ইমাম এবং মুজতাহিদগণ তার ইজতিহাদ গ্রহণ করেছেন? তাঁর ফেকহী মাসায়েল শিক্ষা করে তা প্রসারের আয়োজন কেন করেছেন?
২। হানাফী ফিকাহর গবেষণায় পাঠকগণ হাজার হাজার মাসয়ালা এবং আহকাম সহীহ হাদীছের অনুরূপ পেয়েছেন। সাইয়্যেদ মুরতাজা যুবায়দী হানাফী মাযহাবের আহকাম সম্পর্কিত হাদীছগুলো আদুরারুল মুনীফা ফি আদিল্লাতে আবি হানিফা” নামক কিতাবে সংগ্রহ করেছেন।
প্রশ্ন জাগে, আবু হানিফা (রহঃ) হাদীছ না জানা সত্ত্বেও তাঁর গবেষণালব্ধ মাসয়ালাগুলো কি করে হাদীছের অনুরূপ হল?
৩। ইবনে আবি শাইবার মতে, ইমাম সাহেবের এমন মাসয়ালার সংখ্যা, একশ পঁচিশটি যেগুলো সহীহ হাদীছের অনুরূপ নয়। তার একথাটি সঠিক বলে। মেনে নিলে এর অর্থ দাঁড়ায় যে, এ গুটি কতক মাসয়ালা ব্যতীত অন্য সব মাসয়ালা সহীহ হাদীছের অনুরূপ, আর ইমাম সাহেবের গবেষণালব্ধ মাসয়ালার সংখ্যা এক বর্ণনামতে তিরাশি হাযার। অন্য এক বর্ণনা মতে বার লক্ষ।
অর্থাৎ প্রায় বার লক্ষ মাসয়ালা সহীহ হাদীছের অনুরূপ। এতে এ কথা প্রমাণ হয় যে, তিনি হাদীছের বিরাট একটা অংশের জ্ঞানী ছিলেন। সেগুলো থেকে তিনি এ সমস্ত মাসয়ালা উৎঘাটন করেন।
৪। উসূলে হাদীছের কিতাবে ইমাম সাহেবের মতামত সংকলিত হয়েছে। অর্থাৎ কোন্ রাবী গ্রহণযোগ্য কি বর্জনযোগ্য এ ব্যাপারে তাঁর মত গ্রহণযোগ্য। এমন ব্যক্তিত্বকে হাদীছের ব্যাপারে রিক্তহস্ত বলা কি মিথ্যা অপবাদ নয়?
৫। ইমাম সাহেবের শিষ্যগণ তার থেকে শ্রুত এবং পঠিত হাদীছগুলো কিতাব আকারে সংকলন করেছেন। সংকলনকা রীগণও ছিলেন বিশিষ্ট ইমাম এবং মুজতাহিদ। যেমন ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম হাসান, ইমাম যুফার (রহঃ) প্রমুখ। ইমাম সাহেবের মুসনাদের সংখ্যা সতেরটি। “জামেউল মাসানিদ” নামক কিতাবে এর অনেকগুলোকে সন্নিবেশ করা হয়েছে।
ইবনে খলদুন বলেছেন, ইমাম সাহেবের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা সতেরটি, এর এক অর্থ এটা হতে পারে যে, তার মুসনাদের সংখ্যা সতেরটি। এর অর্থ এটাও হতে পারে যে, মুয়াত্বা ইমাম মুহাম্মদে ইমাম সাহেব থেকে বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা তেরটি এবং ইমাম আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা চারটি। মোট সতেরটি। এর উপর ভিত্তি করেই বলা হয় ইমাম সাহেবের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা সতেরটি। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন মিথ্যা অপবাদ। ইবনে খলদুন ব্যতীত আর কেউ এর উল্লেখ করেননি।
ইমাম সাহেবের নামে আরেকটি অপবাদ দেয়া হয় যে, তিনি মুরজিয়া ছিলেন। মুরজিয়াদের মতে কোন মুসলমান ব্যক্তি যত পাপই করুক এতে তার কোন অসুবিধা হবে না। যেমনিভাবে কোন অমুসলমান যত নেক কাজই করুক, এতে তার কোন উপকার হবে না।
অপরদিকে খারেজীদের আকীদা এরূপ যে, কোন মুসলমান যদি কবীরা গুনাহ করে তবে সে ইসলামের সীমারেখা থেকে বের হয়ে কুফরীর সীমারেখায় প্রবেশ করবে এবং সে অনন্তকাল জাহান্নামে থাকবে। আর মু’তাযিলাদের আকীদা এরূপ যে, কোন মুসলমান যদি কবীরা গুনাহ করে তবে সে ইসলামের সীমারেখা থেকে বের হয়ে যাবে। তবে কুফরীর সীমারেখায় প্রবেশ করবে না। কিন্তু সে অনন্তকালের জন্য জাহান্নামী হবে।
খারেজী এবং মু’তাযিলাদের মতের বিপরীত হচ্ছে মুরজিয়াদের মত। কারণ তাদের মতে কোন পাপের কারণেই সে ইসলামের সীমারেখা হতে বের হবে না। অনন্তকাল দোযখে থাকার তো প্রশ্নই উঠে না।
ইমাম সাহেবের মত এ দু’ধরনের মতের মাঝামাঝি। তিনি বলেন যে, গুনাহে কবীরার কারণে কোন মুসলমান অমুসলমান হয়ে যায় না। তবে এমনও নয় যে, গুনাহ তার কোন ক্ষতি করে না। বরং পরকালে তার জন্য শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। তবে আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন। অনন্তকালের জন্য সে জাহান্নামী হবে না। কেননা বলা হয়েছে,
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা শিরক মাফ করেন না; এ ছাড়া অন্য সব গোনাহ মাফ করেন”।
যেহেতু ইমাম সাহেব কবীরা গুনাহকারীকে মুসলমান বলে স্বীকার করেন, সেহেতু খারেজী এবং মু’তাযিলা পন্থীরা তাকে মু’রজিয়া বলে থাকে। অথচ তাকে মরজিয়া বলা কোন মতেই সমীচীন নয়। কারণ তিনি তাদের মত এ কথা বলেন না যে, পাপকাজ দ্বারা তার কোন ক্ষতি হবে না। সুতরাং তিনি এ অপবাদ থেকে পবিত্র। আল্লামা ইবনে আছীর বলেন,
“ইমাম সাহেব, এ সব অপবাদ থেকে পবিত্র ছিলেন।”
ইমাম সাহেবকে মুরজিয়া প্রমাণ করার জন্য ‘গুনিয়াতুত্তালেবীন’ কিতাবের এ উদ্ধৃতি দেয়া হয়,
ইমাম আবু হানিফার কতক শিষ্য মুরজিয়া। এ উদ্ধৃতি দ্বারা ইমাম সাহেবের মুরজিয়া হওয়ার প্রমাণ হয় না। কারণ এতে তাঁর কোন কোন শিষ্যের মুরজিয়া হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটা কোন অবাস্তব ব্যাপারও নয়। আল্লামা যমখশরী গাসসান কূফী প্রমুখ ফেকহী বিষয়ে ইমাম সাহেবের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু আকায়েদের ব্যাপারে মুরজিয়া কিংবা মু’তাযিলা ছিলেন। এতে এ কথা প্রমাণিত হয় না যে, ইমাম আবু হানিফা কিংবা তার সকল শিষ্য মুরজিয়া ছিলেন।
ইমাম আবু হানিফা এবং ইলমে ফিকাহ ও ফতোয়া
ইবনে কাইয়েম (রহঃ) এলামুল মু’আকেকয়ীন’ কিতাবে লিখেন যে, ইবনে মাসউদ, যায়দ বিন ছাবেত, আব্দুল্লাহ বিন উমর, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) প্রমুখের শাগরেদদের মাধ্যমেই দ্বীন, ফিকাহ এবং ইলম প্রসার লাভ করে।
মদীনাবাসীরা যায়দ বিন ছাবেতের এবং ইবনে উমরের শাগরেদদের মাধ্যমে, মক্কাবাসীরা ইবনে আব্বাসের শাগরেদদের মাধ্যমে এবং ইরাকবাসীরা ইবনে মাসউদের শাগরেদদের মাধ্যমে ইলম লাভ করে।
ইবনে মাসউদের কূফার শাগরেদদের মধ্যে আলকামা বিন কায়স রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় জনগ্রহণ করেন। ইবনে মাসউদ ব্যতীতও তিনি হযরত উমর (রাঃ), হযরত উছমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত সা’দ (রাঃ), হযরত হুযাইফা (রাঃ), হযরত আবু দারদা (রাঃ), হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রাঃ), খালেদ বিন ওলীদ (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীদের থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। ছাহাবায়ে কিরাম আলকামা বিন কায়স থেকে ফতোয়া জিজ্ঞেস করতেন। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের (রাঃ) জ্ঞানের সঠিক উত্তরসূরী ছিলেন।
আর ইব্রাহীম বিন ইয়াযীদ নাখয়ী আলকামা থেকে ইলমে ফিকাহ শিক্ষা লাভ করেন। অন্যান্য তাবেয়ীনদের থেকেও তিনি ফয়েয লাভ করেন। তিনি আলকামার ভাগ্নে ছিলেন। এ দুজন সম্পর্কে আবুল মুছান্না রাবাহ বলেন,
তুমি যদি আলকামাকে দেখ, তবে ইবনে মাসউদকে না দেখায় কোন ক্ষতি নেই। কারণ তিনি ইবনে মাসউদের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর যখন ইব্রাহীমকে দেখবে, তখন আলকামাকে না দেখায় কোন ক্ষতি নেই।
আর ইব্রাহীম নাখয়ী থেকে হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান মুসলিম ইলমে ফিকাহ অর্জন করেন। এ ছাড়াও তিনি সায়ীদ বিন মুসাইয়্যাব, সায়ীদ বিন জুবাইর, ইকরামা, হাসান বসরী, শাবী (রহঃ) প্রমুখ থেকে শিক্ষা লাভ করেন।
আর তাঁর থেকে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ফিকাহ এবং ফতোয়া শিক্ষা লাভ করে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের (রাঃ) ফিকাহর প্রসার ঘটান এবং তাঁর থেকে অনেক ছাত্র এবং শিষ্য ফিকাহ এবং ফতোয়া শিক্ষা লাভ করেন। তাঁদের থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম নিম্নে প্রদত্ত হলঃ
কাযী আবু ইউসুফ (রহঃ), মুহাম্মদ বিন হাসান শায়বানী (রহঃ), যুফার বিন হুযাইল (রহঃ), হাম্মাদ বিন আবি হানিফা (রহঃ), হাফ বিন গিয়াস (রহঃ), ওকী বিন জাররাহ (রহঃ), হাসান বিন যিয়াদ লু’লুঈ (রহঃ), আসাদ বিন আমর (রহঃ), কাযী আফিয়া বিন ইয়াযীদ আওদী (রহঃ) প্রমুখ ।
ইমাম সাহেবের ছাত্র সংখ্যা ছিল অগণিত। তাঁদের মধ্য হতে বিশিষ্ট চল্লিশজনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এদেরকে নিয়েই তিনি ফিকহী মাসয়ালা আলোচনা করতেন। এদের মধ্যে কেউ ফিকহ্ শাস্ত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেন আবার কেউ হাদীছ শাস্ত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
নিম্নে তাদের কয়েকজন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
হযরত ইয়াহয়া বিন সায়ীদ আলকাত্তান
ফিকহ শাস্ত্রকে ভিন্ন একটি বিষয় রূপে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে যেমনিভাবে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) অগ্রনী ভুমিকা নিয়েছিলেন ঠিক তদ্রুপ হাদীছের রিজাল শাস্ত্রকে (বর্ণনাকারী সম্পর্কিত বিষয়) ভিন্ন একটি শাস্ত্রের রূপ দেন হযরত ইয়াহয়া বিন সায়ীদ আল কাত্তান।
আল্লামা যাহরী ‘মীযানুল ইত্তেদাল’ নামক কিতাবের ভূমিকায় লিখেন যে, রিজাল শাস্ত্র সম্বন্ধে ইয়াহয়া বিন সায়ীদ আল কাত্তান সর্বপ্রথম কলম ধরেন। এরপর এ শাস্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যান। তাঁর ছাত্রবৃন্দ হতে ইয়াহয়া বিন মায়ীন, আলী ইবনুল মদীনী, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল প্রমুখ। এরপর ইমাম বৌখারী এবং মুসলিমের এ বিষয়ে অনেক অবদান রয়েছে।
হাদীছ সম্বন্ধে হযরত ইয়াহয়া বিন সায়ীদ আল কাত্তানের দৃষ্টি এতই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, হাদীছের তাহকীক করার জন্য ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, আলী ইবনুল মদীনী প্রমুখ তাঁর মজলিসে দণ্ডায়মান থাকতেন। আছরের নামাজের পর হতে মাগরিব পর্যন্ত চলত সেই মজলিস। ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা দণ্ডায়মান থাকতেন।
রেওয়ায়াত সম্বন্ধে যাচাই ও নির্বাচনে তিনি এরূপ পূর্ণত্ব লাভ করেছিলেন যে, অধিকাংশ মুহাদ্দেছ এ মত দিয়েছেন যে, তিনি যে হাদীছটি গ্রহণ করেছেন আমরাও তা গ্রহণ করব। আর তিনি যেগুলো বর্জন দিয়েছেন, আমরা সেগুলো বর্জন করব।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলতেন, আমার নজরে ইয়াহয়ার মত আর কাউকে দেখিনি।
তাঁর এতসব গুণ-গরিমা থাকা সত্ত্বেও তিনি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর শিক্ষা মজলিসে যোগদান করতেন। আর তিনি ইমাম সাহেবের শিষ্যত্বের বিষয়টি সগৌরবে প্রকাশ করে বেড়াতেন। যদিও তখন পর্যন্ত কারো তাকলীদ বা অনুসরণ ধারাবাহিক রূপে প্রচলিত ছিল না। তথাপি তিনি অধিকাংশ মাসয়ালাতে ইমাম সাহেবের তাকলীদ করতেন। তিনি নিজেই লিখেছেন, অধিকাংশ মাসয়ালায় আমি ইমাম আবু হানিফার তাকলীদ করেছি।
ইয়াহয়া বিন সায়ীদ আলকাত্তান ১৩০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৮ হিজরীতে বসরা শহরে ইন্তিকাল করেন।
ইয়াহয়া বিন যাকারিয়া বিন আবি মায়েদা
তিনি একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ছিলেন। আল্লামা যাহরী রচিত ‘তাযকিরাতুল হুফফায’ নামক কিতাবে তাঁর নামও স্থান পেয়েছে। সে কিতাবে শুধুমাত্র তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে যারা হাফেযুল হাদীছ ছিলেন।
আলী ইবনুল মদীনী যিনি ইমাম বোখারীর উস্তাদ ছিলেন। তিনি বলেন, ইয়াহয়ার সময়ে তাঁর সমকক্ষ আলেম আর দ্বিতীয়জন ছিলেন না।
তাঁর রেওয়ায়াত হতে সিহাহ সিত্তার অনেক হাদীছ লওয়া হয়েছে। তিনি মুহাদ্দিছ এবং ফকীহ উভয়টিই ছিলেন। বহু বিষয়ে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি ইমাম সাহেবের ছাত্র ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি তাঁর সাহচর্যে ছিলেন। তাঁকে ইমাম সাহেবের পরিবারস্থ লোক বলে তাযকিরাতুল হুফফায’ কিতাবে আল্লামা যাহরী উপাধি দিয়েছেন। ফিকহী সংকলনের ইমাম সাহেবের যে কমিটি ছিল তিনিও সে কমিটির বিশেষ সদস্য ছিলেন। এতে তিনি ত্রিশ বৎসর যাবৎ নিয়োজিত ছিলেন বলে ইমাম ত্বহাবী উল্লেখ করেন। গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব তাঁর উপরই অর্পিত হয়েছিল।
মীযানুল ই’তিদাল’ নামক কিতাবে বর্ণিত রয়েছে কুফা নগরে তিনিই সর্বপ্রথম হাতে কলম ধরেন। একজন বিখ্যাত লেখক হিসাবে তিনি মানুষের শ্রদ্ধাভাজন হন। মাদায়েনের প্রধান কাজী রূপে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ৬৩ বৎসর বয়সে তাঁর ইন্তিকাল হয়।
হযরত ওকী ইবনুল জাররাহ
হাদীছ শাস্ত্রে তিনি একজন বিশিষ্ট স্তম্ভ ছিলেন। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) তাঁর ছাত্র হতে পারায় নিজেকে পরম সৌভাগ্যশালী মনে করতেন। রিজাল শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ ইয়াহয়া বিন মায়ীন বলেন, ওকীর চেয়ে উপযুক্ত লোক আমি আর কাউকে দেখিনি। হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর রেওয়ায়াত এবং রিজাল শাস্ত্রে তাঁর মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত।
তিনি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন, ইমাম সাহেব হতে তিনি অনেক হাদীছ শ্রবণ করেছেন। প্রায় মাসয়ালাতেই তিনি ইমাম সাহেবের তাকলীদ করতেন। ‘তাযকেরাতুল হুফফায’ কিতাবে আল্লামা যাহরী উল্লেখ করেন, ওকী ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী ফতোয়া দিতেন। ১৯৭ হিজরীতে তাঁর ইন্তিকাল হয়।
হযরত দাউদ তায়ী
আল্লাহ তাআলা তাঁকে নেক ও সৎকর্ম করার অপরিসীম ক্ষমতা দান করেছিলেন। ছুফিয়ায়ে কিরাম তাঁকে কামেল মুর্শিদ হিসাবে মান্য করতেন। তাযকিরাতুল আউলিয়া কিতাবে তাঁর অনেক প্রশংসা করা হয়েছে। হানাফী ফিকহবিদগণ তাঁর ইজতেহাদের উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন।
বিখ্যাত মুহাদ্দিছ মুহারিক বিন আত্তার বলেন, ইমাম দাউদ তায়ী যদি পূর্ব যামানায় জন্মগ্রহণ করতেন তবে কোরআন মজীদে তাঁর কাহিনী বর্ণিত হত।
প্রাথমিক জীবনেই তিনি ফিকহ এবং হাদীছ সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান লাভ করেন। অতঃপর ইলমে কালাম সম্বন্ধে পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভ করেন। তখন থেকেই তিনি তর্কবিতর্কে মেতে থাকতেন।
একদিন কোন এক ব্যক্তির সাথে তর্ক করতে করতে তার প্রতি কংকর নিক্ষেপ করে ফেললেন। তখন লোকটি বলে উঠল যে, হে দাউদ! আপনার যবান ও হাত অধিক বর্ধিত হউক।
সে ব্যক্তির এ কথাটি তাঁর জীবনে আমুল পরিবর্তন ঘটাল। তখন থেকেই তিনি বহছ-বচসা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন। তবে জ্ঞান-অর্জন তিনি ত্যাগ করেন নাই।
বছর খানেক পরেই তিনি তাঁর সমুদয় কিতাব নদীতে ফেলে দিতেন। দুনিয়ার সবকিছু হতে সম্পর্কও ছিন্ন করে ফেললেন।
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) বলেন, আমি প্রায়ই ইমাম দাউদ তায়ীর নিকট মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করার জন্য যেতাম। প্রয়োজনীয় আমলী’ মাসয়ালা হলে উত্তর দিতেন। অন্যথায় বলে দিতেন ভাই আমার অন্য প্রয়োজনীয় কাজ রয়েছে।
তিনি ইমাম সাহেবের একজন বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন। ইমাম সাহেবের নির্বাচিত কমিটির একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। ১৬০ হিজরীতে তিনি পরলোক গমন করেন।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক
‘তাহযীবুল আসমাওয়াল লুগাত’ কিতাবে হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রহঃ)-এর প্রশংসা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তিনি এমন একজন ইমাম যার নেতৃত্ব এবং শৌর্যবীর্য সম্বন্ধে সমস্ত ইমাম এবং ফিকহবিদ একমত। তাঁর আলোচনা করা হলে খোদার রহমত নাযিল হত। তাঁর সাথে ভালবাসা জন্মাতে পারলে আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রাপ্তি আশা করা যেতো।
তাঁকে মুহাদ্দেছীনগণ ‘আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীছ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর দ্বারাই হাদীছ শাস্ত্রে তার অগাধ জ্ঞান সম্বন্ধে কিছুটা অনুমান করা যায়।
একদা তাঁর জনৈক ছাত্র তাঁকে ‘হে প্রাচ্যের জ্ঞানী ব্যক্তি’ বলে সম্বোধন করলেন । বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ইমাম ছুফিয়ান ছাওরী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, আপনি বড়ই কার্পণ্য দেখালেন। তিনি শুধু প্রাচ্যের আলেম নন তিনি পাশ্চাত্যেরও আলেম।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুবারকের যামানায় হাদীছ সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁর চেয়ে অধিক চেষ্টা আর কেউ করেন নাই।
স্বয়ং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বর্ণনা করেন, আমি চার হাজার শায়খ থেকে হাদীছ শিখেছি। এদের মধ্য হতে শুধু মাত্র এক হাজার শায়খ থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছি।
বোখারী এবং মুসলিম শরীফে তাঁর বর্ণিত অনেক হাদীছের সমাবেশ ঘটেছে। রেওয়ায়াত শাস্ত্রে তিনি একজন মহা স্তম্ভস্বরূপ ছিলেন। হাদীছ ও ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর অনেক কিতাব রয়েছে। কিন্তু সেগুলো বর্তমানে দুপ্রাপ্য।
তাকওয়া, দ্বীনদারী, জ্ঞান-গরীমা ও কামালিয়াতে তিনি এরূপ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন যে, আমীর-ওমারা রাজা-বাদশাহ তাঁর তুলনায় খুবই নগন্য ছিলেন।
খলীফা হারুনুর রশীদ একবার কোথাও গমন করেন। সেখানে হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুবারকও কোন কারণে গমন করেন। ঝড়ের গতিতে সে সংবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অসংখ্য লোক তাকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য ছুটে চলল। অনেকের জুতা ও জামা কাপড় ছিড়ে গেল। কিন্তু সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। কে কার পূর্বে আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীছকে দেখবে এটাই ছিল প্রত্যেকের লক্ষ্য। অন্য কোন খেয়াল কারো ছিল না।
খলীফা হারুনুর রশীদের স্ত্রী অট্টালিকার উপর হতে এ দৃশ্য দেখতে পেলেন। তিনি জানতে চাইলেন যে, কার আগমনের কারণে লোকেরা উম্মাদের ন্যায় ছুটে চলছে। তাঁকে জানানো হলো যে, প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের আলেমের শুভাগমন হয়েছে। তিনি বললেন, একেই প্রকৃত বাদশাহী বলা চলে। এর তুলনায় হারুনুর রশীদের বাদশাহী অতি তুচ্ছ। জনগণ কখনও কোন বাদশাহকে অভ্যার্থনা জানানোর জন্য এরূপ অধীর হয়ে উঠে কি?
তিনি ইমাম সাহেবের স্বনামধন্য ছাত্র ছিলেন। উস্তাদের প্রতি তিনি পরম শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি বলতেন, আমি যা কিছু শিখেছি তা ইমাম আযম এবং সুফিয়ান ছাওরীর মেহেরবানীতে শিখেছি। একবার মনের আবেগে তিনি বলে উঠলেন,
“আল্লাহ তাআলা যদি আবু হানিফা এবং সুফিয়ান ছাওরী দ্বারা আমাকে সাহায্য না করতেন তবে আমি অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতই হতাম”।
ফিকহ বিশারদ আবু ইউসুফ ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)
আনছার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন সাহাবী ছিলেন। তাঁর পিতা একজন দরিদ্র লোক ছিলেন। দৈহিক পরিশ্রমে তাদের জীবিকা নির্বাহ হত।
১১৩ হিজরী অথবা ১১৭ হিজরী সনে ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) কূফা নগরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবকালেই তিনি লেখাপড়ার প্রতি অনুরাগী হয়ে পড়েন। কিন্তু এতে তাঁর পিতার সম্মতি ছিল না। তার আশা ছিল যে, ছেলে কাজকর্ম করে দু’পয়সা কামাই করে সংসারের মধ্যে সচ্ছলতা সুখ-শান্তি আনতে চেষ্টা করবে। কিন্তু বালক আবু ইউসুফ একটু সুযোগ পেলেই ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিসে চলে যেতেন। একদিন তিনি ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর পিতা তাঁকে সেখান হতে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে গেলেন। ঘরে গিয়ে তাকে বুঝালেন যে, দেখ বাপু! আবু হানিফাকে আল্লাহ তা’আলা ধন-দৌলত দান করেছেন। তাঁর পথের পথিক হওয়া কি গরীবের ছেলেদের জন্য সাজে? এটা কি আমাদের পক্ষে সম্ভবপর?
তিনি বাধ্য হয়ে লেখাপড়ায় ক্ষান্ত দিলেন। পিতার সাথে তিনিও রোযগারে লেগে গেলেন। দু’চারদিন পর ইমাম সাহেব তার অনুপস্থিতি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁকে তাঁর অনুপস্থিতির কারণ সম্বন্ধে অবহিত করা হল। তিনি আবু ইউসুফ (রহঃ) কে ডেকে এনে তাঁর হাতে একটি থলি তুলে দিয়ে বললেন এ অর্থ যখন শেষ হয়ে যাবে তখন আমাকে অবগত করো। তিনি থলিটি বাড়ীতে নিয়ে খুলে দেখলেন যে এতে একশত দিরহাম রয়েছে। ইমাম সাহেব আবু ইউসুফ (রহঃ) কে এরূপে সাহায্য করে যেতে লাগলেন এবং এভাবেই তার লেখাপড়া ও শিক্ষাজীবন সমাপ্ত হল।
ইমাম সাহেব ব্যতীতও কাজী আবু ইউসুফ (রহঃ) আ’মাশ বিন হিশাম বিন ‘উরওয়া, সুলাইমান তাইমী, আবু ইসহাক শায়বানী, ইয়াইয়া বিন সায়ীদ আল-আনসারী প্রমুখ হতেও হাদীছ রেওয়ায়াত করেন। তিনি মুহাম্মদ বিন ইসহাক হতে ‘কিতাবুল মাগাযী’ পাঠ করেন। মুহাম্মদ বিন আলী লায়লা হতে মাসয়ালা শিক্ষা লাভ করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এতই মেধা ও স্মরণশক্তি দান করেছেন যে, তিনি একই সময়ে সর্বপ্রকার ইলম অর্জন করেন।
তিনি হাদীছের শিক্ষা মজলিসে যোগদান করে প্রত্যহ পঞ্চাশ ষাটটি হাদীছ শিখে নিতেন।
ইমাম সাহেবের জীবদ্দশায় তিনি প্রত্যহ তাঁর শিক্ষা মজলিসে অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর ইন্তিকালের পর তিনি খিলাফতের দরবারের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
১৬৬ হিজরীতে খলীফা মাহদী আব্বাস তাঁকে কাজী পদে নিযুক্ত করেন। মাহদী আব্বাসের পরবর্তী খলীফাও তাঁকে সে পদে বহাল রাখেন। পরবর্তীতে খলীফা হারুনুর রশীদ তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ পেয়ে তাঁকে মুসলিম সাম্রাজ্যের ‘কাজিউল কুজাত’ বা প্রধান বিচারপতি পদে নিযুক্ত করেন। সে পদটি তখন যথেষ্ট গুরুত্বের দাবীদার ছিল যা ইতিপূর্বে আর দেখা যায়নি। এ পদে বহাল থাকাকালে তিনি বেশ জ্ঞানগরিমা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন।
১৮৬ হিজরী সনে রবীউল আউয়ালের পাঁচ তারিখ বৃহস্পতিবার যোহরের সময় তিনি ইন্তিকাল করেন।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) অন্তিমকালে এ কথা কয়েকটি বলে ইন্তিকাল করেন, হে আল্লাহ! তুমি জান যে, আমি জানা সত্ত্বেও কোন মীমাংসা ঘটনার বিপরীত করি নাই। আমি যে মীমাংসাগুলো করেছি সেগুলো তোমার কিতাব এবং তোমার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ অনুসারে করতে চেষ্টা করেছি। যদি কখনো মুশকিলে পড়েছি এবং তোমার কিতাব এবং তোমার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছে সমাধান পাই নাই তখন ইমাম আবু হানিফার পথ অবলম্বন করেছি। আমি যতটুক অবগত আছি সে অনুপাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, তিনি জ্ঞাতসারে কখনো তোমার পথ ছেড়ে যাননি এবং সে সম্বন্ধে বেশ ভালভাবেই অবগত ছিলেন।
কাজী সাহেব বেশ ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। সে ধনের সদ্ব্যবহার সম্বন্ধেও তিনি বেশ অবগত ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি ওছিয়ত করে যান যেন মক্কা, মদীনা, কুফা এবং বাগদাদের দরিদ্রদের মধ্যে চার লক্ষ দিরহাম বিতরণ করা হয়।
কাজী সাহেব যদিও ফিকহ শাস্ত্রের উন্নতি বিধানে সুবিখ্যাত ছিলেন, কিন্তু অন্যান্য বিষয়েও তাঁর সুগভীর জ্ঞান ছিল। সে সব বিষয়েও তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না।
হেলাল বিন ইয়াহয়া বলেন, কাজী আবু ইউসুফ মাগাযী (যুদ্ধ) এবং আইয়ামুল আরবের (আরবের ইতিহাস ঘটনাবলী) সম্বন্ধে হাফেজ ছিলেন। ফিকহশাস্ত্র তাঁর পক্ষে সাধারণ ব্যাপার ছিল। হাদীছশাস্ত্রে তিনি এতই পারদর্শী ছিলেন যে, তাঁকেও হুফফাযে হাদীছের মধ্যে গণ্য করা হত। আল্লামা যাহবী তাযকিরাতুল হুফ্ফায কিতাবে লিখেন, ইয়াহয়া বলতেন, আহলে রায়দের মধ্য হতে আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর চেয়ে অধিক হাদীছ আর কেউ রেওয়াত করেন নাই।
খতীবে বাগদাদ তাঁর কিতাবে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর এ বাণী উল্লেখ করেছেন, ইলমে হাদীছ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করার যখন আমার ইচ্ছা জাগল, তখন আমি ইমাম আবু ইউসুফের খিদমতে উপস্থিত হলাম।
ইয়াহয়া বিন মায়ীন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং হাদীছের আরও বহু ইমাম কাজী আবু ইউসুফ (রহঃ) থেকে হাদীছ রেওয়ায়াত করেছেন। তাঁর জ্ঞান-গরিমা এবং পদমর্যাদা সম্পর্কে এর চেয়ে অধিক আর কি থাকতে পারে?
ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর পাণ্ডিত্য কেউ অস্বীকার করবে না। স্বয়ং ইমাম সাহেবও তা স্বীকার করছেন। তিনি একবার অসুস্থ হলে ইমাম সাহেব তাঁকে দেখতে যান। সেখান থেকে ফিরার পথে সংগীদের সাথে বললেন, আল্লাহ না করুক! যদি এ লোকটি মারা যায় তবে দুনিয়ার অপূরণীয় ক্ষতি হবে। অন্যান্য ইমামগণও কাজী সাহেবের জ্ঞানগরীমা এবং বুদ্ধিমত্তার ভূয়সী প্রশংসা করতেন।
তৎকালে একজন বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ছিলেন ইমাম আ’মাশ। একবার তিনি কাজী সাহেবের নিকট কোন একটি মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করলেন। কাজী সাহেব উত্তর দিলেন। তিনি বললেন, আপনার উত্তরের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ আছে কি? কাজী সাহেব বললেন, হ্যা। তার প্রমাণ ঐ হাদীছটি যা আপনি অমুক ঘটনা সম্বন্ধে অমুক দিন বর্ণনা করেছেন। তখন ইমাম আ’মাশ (রহঃ) বললেন, কাজী সাহেব! এ হাদীছটি আমার তখন হতে স্মরণ রয়েছে যখন আপনার পিতা বিবাহও করেন নাই। কিন্তু এ হাদীছের মর্ম আজ আমার বুঝে এসেছে।
ফিকহ হাদীছ সম্বন্ধে কাজী সাহেবই সর্বপ্রথম কিতাব রচনা আরম্ভ করেন। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কিতাব রচনা করেন। তন্মধ্যে কিতাবুল খারাজ একটি অনন্য কিতাব। এ সম্বন্ধে কিছুটা আলোচনা করা হচ্ছে।
খলীফা হারুনুর রশীদ কাজী সাহেবের নিকট খারাজ এবং জিযিয়া সম্বন্ধে তাঁর বিস্তৃত মতবাদ জানতে চান। জবাব স্বরূপ কাজী সাহেব তাঁর নিকট কয়েকটি চিঠি প্রেরণ করেন। এ কিতাবটি সে কয়েকটি চিঠির সমষ্টিমাত্র । এতে যদিও অনেক বিষয়ের অবতারণা ঘটেছে কিন্তু খারাজ সম্পর্কিত মাসায়েলের সমাবেশ ঘটেছে সবচেয়ে বেশী। এ কারণে এ কিতাবটি খারাজ সম্পর্কিত মূল আইনগ্রন্থ হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
এতে জমির উর্বরতার পার্থক্য হিসাবে বিভিন্ন কর ধার্য করা হয়েছে। সেকালে তিনি যে অপূর্ব দূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন তাও কম আশ্চর্যের ব্যাপার নয়। কিতাবটির রচণাশৈলী এই যে, অত্যন্ত স্বাধীনভাবে অথচ উপদেশ মূলকভাবে সবকিছুকে যথাস্থানে বিন্যস্ত করা হয়েছে। তদুপরি ন্যায়পরায়ণতার প্রতি খলীফার দৃষ্টিও আকর্ষণ করা হয়েছে।
কাজী সাহেবের জীবনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল হারুনুর রশীদের ন্যায় পরাক্রমশীল খলীফার দরবারেও তিনি স্বীয় দায়িত্ব অত্যন্ত স্বাধীন এবং বেপরওয়াভাবে পালন করেছেন যার নজীর ইতিহাসে বিরল।
কিতাবটির একস্থানে তিনি খলীফাকে লিখেছেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি যদি আপনার প্রজাদের প্রতি ন্যায়পরায়ণতা দেখাতে চান, তবে প্রতিমাসে একবারও যদি দরবার করেন এবং অত্যাচারীতদের অভিযোগ শ্রবণ করেন, তবে আশা করা যায় যে, আপনার কাজে প্রজা বিদ্রোহ ঘটবে না। এরূপে দু’একটা দরবারও যদি করেন তবে আপনার রাজ্যে তা ছড়িয়ে পড়বে। ফলে মাথা তুলতে কেউ সাহসী হবে না। আর সুবেদারের নিকট যদি এ সংবাদ পৌঁছে যে, আপনি বৎসরে একবার বিচার করবেন তবে তাতেও তাদের অত্যাচার স্পৃহা আপনিতেই দমে যাবে।
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) ছিলেন ফিকহে হানাফীর দ্বিতীয় স্তম্ভ। দামেশকের নিকট একটি গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা জন্মভূমি পরিত্যাগ করে ওয়াস্তা আগমন করেন এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) ১৩৫ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন।
কুফা নগরেই তিনি শিক্ষা আরম্ভ করেন। তিনি মেসআর বিন কিদাম, সুফিয়ান ছাওরী, মালেক বিন দীনার, ইমাম আওযায়ী প্রমুখ হতে হাদীছ রেওয়ায়াত করেন। তিনি দু’ বৎসরকাল ইমাম আবু হানিফা সাহেবের খিদমতে কাটান। ইমাম সাহেবের ইন্তিকালের পর কাজী সাহেবের নিকট হইতে শিক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর মদীনায় গিয়ে তিন বৎসর যাবৎ ইমাম মালেকের নিকট হাদীছ শিক্ষা লাভ করেন।
যৌবনের শুরুতেই তাঁর জ্ঞানগরীমা ও যশ-গৌরব চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ বৎসর বয়সেই তিনি শিক্ষকের আসনে সমাসীন হন। অল্প সময়ের মধ্যেই লোক সমাজ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল। তাঁর জ্ঞান-গরিমা ও যোগ্যতার কথা অবগত হয়ে খলীফা হারুনুর রশীদ তাঁকে কাজী পদে নিযুক্ত করেন। খলীফা প্রায়ই তাঁকে তাঁর সঙ্গে রাখতেন।
একবার খলীফা কাজী সাহেবসহ বিদেশ ভ্রমণে বের হলেন। সে ভ্রমণেই কাজী সাহেবের ইন্তিকাল হয়। বিখ্যাত নাহুভী (ব্যকরণবিদ) কাসাঈও সে সফরে ছিলেন। তিনিও ইন্তিকাল করেন।
খলীফা হারুনুর রশীদ অত্যন্ত শোকাহত ও দুঃখিত হলেন। তিনি বড়ই আক্ষেপ প্রকাশ করে বললেন, আজ আমরা ফিকহ এবং নাহু (ব্যকরণ) উভয়টিকে সমাধিস্থ করে এসেছি। খলীফার সংগে একজন সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি বলেন, আমাদেরকে সফরের সময় কে রক্ষা করবে?
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) যদিও অধিকাংশ সময় রাজ দরবারে কাটিয়ে দিতেন তথাপি তিনি সবসময়ই স্বাধীনচেতা ছিলেন।
ইয়াহয়া উলুবী নামক এক ব্যক্তি বিদ্রোহ ঘোষণা করল। হারুনুর রশীদ তাকে যথা সময়ে দমন করলে সে খলীফার সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হল। সন্ধিপত্র লিপিবদ্ধ করা হলে তার সন্তুষ্টির জন্য খলীফা সে সন্ধিপত্রে বড় বড় আলেম, ফকীহ এবং মুহাদ্দেছগণের দস্তখত নিলেন। সে সন্ধিপত্রে রাজী হয়ে বাগদাদে উপস্থিত হল।
কিছুদিন পর খলীফা সে সন্ধি ভঙ্গ করতে চাইলেন। খলীফার ভয়ে ভীত হয়ে, সমস্ত আলেম ফতোয়া দিলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্ধি ভঙ্গ করা বৈধ। কিন্তু ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) প্রকাশ্যভাবেই এর বিরোধিতা করলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর এ অভিমতের উপরই অটল রইলেন।
ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, ইমাম মুহাম্মদ যখন কোন মাসয়ালা বর্ণনা করতেন তখন মনে হত যেন ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে।
এক ব্যক্তি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা কললেন, আপনি প্রশ্নের এরূপ সূক্ষ্ম সমাধান কোথা হতে শিখলেন? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মদ বিন হাসানের কিতাব হতে।
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর শিক্ষা মজলিস হতে অসংখ্য ছাত্র শিক্ষা লাভ করেছিল। তাদের মধ্য হতে শাফেয়ীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর সাহচর্য হতেই অগাধ জ্ঞান লাভ করেন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) নিজেই তা গর্বের সাথে স্বীকার করেন। হাফেজ ইবনে হজর আল আসকালানী ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর বাণী উদ্ধৃত করেন,
মুহাম্মদ বিন হাসান খলীফার দরবারে অতি সম্মানী লোক ছিলেন। আমি প্রায়ই তাঁর খিদমতে আসা-যাওয়া করতাম। ফিকহ সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা উপলদ্ধি করে আমার হৃদয় তাঁর প্রতি ভক্তিতে ভরপুর হয়ে উঠত। তাঁর শিক্ষা মজলিসে যোগদান আমার জন্য অপরিহার্য করে নিলাম। তাঁর পবিত্র মুখ হতে আমি যা কিছু শুনতে পেতাম তাই লিপিবদ্ধ করে নিতাম।
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) স্বয়ং ইমাম শাফেয়ীকে বিশেষ মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। ছাত্রদের মধ্যে তিনি তাঁকে অপরিসীম স্নেহ করতেন। একবার তিনি খলীফা হারুনুর রশীদের দরবারে রওয়ানা হলেন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)ও তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-কে দেখতে পেয়ে ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) ঘোড়া হতে নেমে গেলেন। অতঃপর খাদেমকে বললেন, যাও! খলীফাকে গিয়ে বলবে, আজ কোন কারণবশতঃ আমি দরবারে উপস্থিত হতে পারব না।
ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, না হয় আমি অন্য সময়ে আপনার খিদমতে হাজির হব। ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) বললেন, আপনার আগমনের কারণে আমি যতটুকু উপকৃত হব সেখানে তার আশা করা যেতে পারে না।
তাঁদের উভয়ের মধ্যে অনেক সময় কোন মাসয়ালা নিয়ে তর্ক-বিতর্কও হতো। সে বিতর্ক অনেক সময় দীর্ঘকাল পর্যন্ত চলত। এ কারণে অনেকে ধারণা। করেন যে, তাঁদের দুজনের মধ্যে উস্তাদ শাগরেদের সম্পর্ক ছিল না। তাঁদের এ ধারণা ভুল। কারণ তখনকার দিনে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে আলোচনামূলক তর্ক-বিতর্ক কোন আপত্তিকর ব্যাপার ছিল না। আর মূলতঃ এতে দোষণীয় কিছুই নেই।
ফিকাহশাস্ত্রের বিকাশের জন্য ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর প্রসিদ্ধি লাভ ঘটে। এ বিষয়ে তিনি অনন্য ছিলেন। তদুপরি তফসীর, হাদীছ এবং সাহিত্যেও তিনি যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন।
ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, কোরআন মজীদ সম্বন্ধে ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) হতে অভিজ্ঞ আলেম আমি আর কাউকে পাইনি। সাহিত্য সম্বন্ধে তাঁর কিতাব বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য। তবে ফিকাহর যেসমস্ত মাসয়ালা নাহভু-এর সাথে সম্পৃক্ত তার রচিত কিতাব জামে কবীরে সেগুলোর উদাহরণ পাওয়া যায়। এর দ্বারাই এ সম্বন্ধে যে তাঁর অগাধ জ্ঞান রয়েছে তার অনুমান করা যায়। ইবনে খাল্লিকান প্রমুখসহ অনেকে এর উল্লেখ করেছেন।
হাদীছশাস্ত্রে তাঁর রচিত ‘মুয়াত্তা’ একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। এর দ্বারাই বুঝা যায়। হাদীছশাস্ত্রে তাঁর কিরূপ জ্ঞান ছিল। তদুপরি তিনি তাঁর রচিত ‘কিতাবুল হজ্জ গ্রন্থেও অনেক হাদীছের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন।
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর ‘কিতাবুল হজ্জ’ কিতাবটি বেশ প্রসিদ্ধ।
এ ছাড়াও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) অনেক কিতাব রচনা করেছেন। তাঁর কিতাবের উপর হানাফী মাযহাবের দলীল প্রমাণের ভিত্তি।
ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) মদীনায় গমন করেন। সেখানে তিন বছর যাবৎ অবস্থান করে ইমাম মালেক (রহঃ) হতে মুয়াত্তা পাঠ করেন। অনেক মাসয়ালা মদীনা বাসীদের মাযহাবের সাথে ইমাম সাহেবের মাযহাবের গরমিল ছিল। ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) মদীনা হতে প্রত্যাবর্তন করে এ কিতাবটি প্রণয়ন করেন। এ কিতাবটিতে সর্বপ্রথমে ইমাম সাহেবের মাসয়ালা বা মত উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর মদীনা বাসীদের মত উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তিনি হাদীছ, আছার এবং কিয়াস দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, ইমাম সাহেবের মতই ঠিক এবং যুক্তিযুক্ত; অন্যগুলো নয়।
ইমাম যুফার (রহঃ)
ফিকাহশাস্ত্রে তাঁর গুরুত্ব ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর চেয়েও অধিক ছিল। কিন্তু তাঁর কিতাবটি দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় এবং তাঁর সম্বন্ধে লোক সমাজ তেমন পরিজ্ঞাত না থাকায় জনসমাজে তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন ও পরিচয় লাভ ঘটে নাই।
তিনি ছিলেন আরবের অধিবাসী। প্রথম হতেই তিনি হাদীছের খিদমত করতে শুরু করেন। তিনি ছাহেবুল হাদীছ বা হাদীছ বন্ধু উপাধি লাভ করেন।
‘জরাহ ও তাদীল’ শাস্ত্রের ইমাম ইয়াহয়া বিন মা’য়ীন বলেন, যুফারের অভিমত অতি মূল্যবান এবং বিশ্বাসযোগ্য।
‘কিয়াসে তিনি অতুলনীয় পাণ্ডিত্য লাভ করেন। স্বয়ং ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) তাঁর প্রশংসা করেন। তিনি কাজী পদেও নিয়োজিত হয়েছিলেন। তিনি ১১০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫৮ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।
মেস’য়ার বিন কিদাম
‘তাযকেরাতুল হুফফায’ কিতাবে তাঁর আলোচনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। তিনি ছিলেন ইমাম, হাফেজ এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
তিনি আলি ইবনে ছাবেত, হাকাম বিন উয়াইনা, কাতাদা, আমর বিন মুররা এবং তাঁদের পর্যায়ের যাঁরা ছিলেন তাদের থেকে হাদীছ রেওয়ায়াত করেন।
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, ইয়াহয়া বিন সায়ীদ কাতান, মুহাম্মদ বিন বিশর, ইয়াহয়া বিন আদম, আবু না’য়ীম, খাল্লাদ বিন ইয়াহয়া প্রমুখসহ অনেকেই তার থেকে হাদীছ রেওয়ায়াত করেন।
ইয়াহয়া বিন সায়ীদ কাত্তান বলেন, আমি তাঁর থেকে অধিক নির্ভরযোগ্য কাউকে দেখি নাই।
ইমাম আহমদ (রহঃ) নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের উপমা দিতে গিয়ে বলেন, যেমন শু’রা ও মেসয়ার।
ওকী (রহঃ) বলেন, মেস’য়ারের সন্দেহ অন্যদের ইয়াকীনতুল্য।
ইবনে উয়াইনা বলেন, আমাশ (রহঃ)-কে বলা হল, মেস’য়ার হাদীছের মধ্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বললেন, তাঁর সন্দেহও অপরের ইয়াক্বিনের সমতুল্য।
আবু জাফর মনসূর তাঁকে ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ করতে চাইলে তিনি কৌশলে সেটা প্রত্যাখ্যান করে দেন।
তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সিরকা এবং সবজির উপর সবর করে তাকে কারো নিকট মাথা নত করতে হয় না। ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিসে তাঁর বিশেষ মর্যাদা ছিল।
ইব্রাহীম বিন ত্বাহমান
‘তাহযীবুততাহযীব’ নামক কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি আবু ইসহাক সুরাইয়ী আবু ইসহাক শাইবানী, আব্দুল আযীয বিন ছুহাইবু প্রমুখ থেকে হাদীছ ‘শিক্ষা গ্রহণ করেন।
ইবনে মুবারক এবং স্বয়ং তাঁর উস্তাদ ছফওয়াদ বিন সুলাইম তাঁর থেকে হাদীছ বর্ণনা করেন।
ইয়াহয়া বিন আকসাম বলেন, খোরাসান, ইরাক এবং হিজাযের মধ্যে যাঁরা হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের সবার মধ্য তিনি সঠিক নির্ভরযোগ্য এবং জ্ঞানী ছিলেন।
আবু যুর’আ বর্ণনা করেন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) একবার হেলান নিয়ে বসা ছিলেন। উপস্থিত লোকদের মধ্যে হতে কেউ ইব্রাহীম বিন ত্বাহমানের আলোচনা করলে তিনি সোজা হয়ে বসে গেলেন এবং বললেন, এটা মানানসই নয় যে, সালেহীনদের আলোচনা হবে আর আমরা হেলান দিয়ে বসে থাকব।
‘তাযকেরাতুল হুফফায’ নামক কিতাবে বর্ণিত আছে তিনি ইমাম সাহেবের ছাত্র ছিলেন।
ইয়াযীদ বিন হারুন
তিনি আছেম আহওয়াল, ইয়াহয়া বিন সায়ীদ, সুলাইমান তাইমী, দাউদ বিন আবি হিন্দ, ইবনে আউনসহ বহু মুহাদ্দিছ থেকে হাদীছ শিক্ষা লাভ করেছেন।
ইমাম আহমদ (রহঃ) সহ অনেকেই তাঁর শিষ্যত্ব লাভের গৌরব অর্জন করেছেন।
ইবনে মদীনী বলেন, হিফযের বিষয়ে তাঁর সমতুল্য আমি আর কাউকে দেখিনি।
ইয়াহয়া বিন ইয়াহয়া বলেন, তিনি ‘ওকী’ হতেও অধিক স্মরণ শক্তিসম্পন্ন ছিলেন।
আছেম বিন আলী বলেন, তিনি সারারাত নামায পড়তেন। চল্লিশ বছরেরও বেশী তিনি ইশার অযু দ্বারা ফজরের নামায পড়েছেন।
ইবনে হুশাইম বলেন, মিশরবাসীদের কেউ তাঁর তুল্য নয়।
ইবনে আকছাম বলেন, একবার খলীফা মামুন আমাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, যদি ইয়াযীদ বিন হারুনের ভয় না থাকত তবে আমি আমার এ মত প্রকাশ করতাম যে, কোরআন মাখলুক বা সৃষ্ট। কেউ বলল, ইয়াযীদ বিন হারুন এমন কে যে, তাকে ভয় করতে হবে। তিনি বললেন, ভয় এই যে, যদি আমি আমার মত প্রকাশ করি আর তিনি তার প্রতিবাদ করেন তবে মানুষ তার অনুসরণ করবে। ফলে ফিতনা সৃষ্টি হবে।
‘তাহযিবুল আসমা ওলুগাত’ নামক কিতাবে আল্লামা নবুবী (রহঃ) লিখেছেন, তাঁর ছাত্র সংখ্যা অগণিত।
ইয়াহয়া বিন আবী তালেব বর্ণনা করেন, একবার আমি তাঁর শিক্ষা মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। তখন অনুমান করা হল যে, উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রায় সত্তর হাজার।
অধিক সংখ্যাক হাদীছ জানার ব্যাপারে তাঁর উপমা দেওয়া হত।
হাফছ বিন গিয়াস
‘তাযকেরাতুল হুফফাযে’ তাঁকে ইমাম এবং হাফেজ উপাধি দেওয়া হয়েছে।
‘তাহযীবুততাহযীব’ কিতাবে উল্লেখ রয়েছে, তিনি আপন দাদা তলক বিন মু’আবিয়া, ইসমাঈল বিন আবি খালেদ, আশ’আছ আল হাদ্দানী, আবু মালেক আশজা’য়ী, সুলাইমান আততায়মী, আছেম আহওয়াল, উবাইদুল্লাহ বিন উমর, মুছআব বিন সুলাইম, ইয়াহয়া বিন সায়ীদ আল আনছারী, হিশাম বিন উরওয়া, আমাশ, ছাওরী প্রমুখ থেকে হাদীছ শিক্ষা লাভ করেন।
ওকী (রহঃ)-কে কোন মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিতেন।
ইবনে নুমাইর বলেন, তিনি ইবনে ইদ্রীস হতেও অধিক সংখ্যক হাদীছ জানতেন।
তিনি স্বয়ং বলেন, আমি আবু হানিফা থেকে তাঁর কিতাবাদি এবং আছার’ শ্রবণ করেছি।
‘তারীখে বাগদাদে উল্লেখ রয়েছে, তিনি ইমাম সাহেবের বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন।
ইমাম সাহেব তাঁর প্রধান উস্তাদ শা’বী (রহঃ)-এর উৎসাহ দানের পর ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের প্রতি বিশেষ মনোনিবেশ করেন। এ জ্ঞান অর্জন করার পূর্বে তিনি প্রচলিত দ্বীনি উলূম বা ধর্মীয় জ্ঞান সম্পর্কে চিন্তা করলেন। এতে তাঁর নিকট ইলমে ফিকাহই অধিক উপকারী মনে হল। এর মধ্যেও হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এর ফিকাহর কেন্দ্র তাঁর নিকট উত্তম মনে হল। একারণে তিনি তাঁর (ইবনে মাসউদের) মুখপাত্র হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমানের ইলমী মজলিসে শরীক হন। সেখানে হযরত ইবনে মাসউদ ব্যতীত উমর, হযরত আলী, হযরত ইবনে উমর, হযরত ইবনে আব্বাস, হযরত যায়দ বিন ছাবেত, হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীদের থেকে বর্ণিত হাদীছ এবং জ্ঞানের আলোকে ফিকহী মাসায়েলের আলোচনা হত।
মিথ্যা নবী হতে নবুওয়াতের আলামত চাওয়া কুফর
ইমাম সাহেবের যমানায় এক ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবী করল। শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যেই হউক কিংবা বহছ মুনাযারার উদ্দেশ্যেই হউক লোকে তাকে গ্রেফতার করে আনল। মিথ্যা নবী বলল, আমাকে একটু সুযোগ দাও যেন তোমাদের সামনে আমার নবুওয়াতের আলামত এবং সত্যতার নিদর্শন উপস্থাপন করতে পারি।
মানুষ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে ভাবছিল চলো এটাও দেখে নেয়া যাক।
ইমাম সাহেব বললেন, না! কখনো এরূপ করা যাবে না। মিথ্যা নবী হতে নবুওয়তের নির্দশন চাওয়াও কুফরি। কারণ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার পরে আর কোন নবী নেই। মিথ্যা নবী হতে নবুওয়াতের নিদর্শন চাইলে বুঝা যায় যে, নবী হওয়া সম্ভব। এতে হুযুরের এ বাণীকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা হয় এবং খতমে নবুওয়াতের ব্যাপারে সন্দেহে পতিত হতে হয়, যা কুফরের কারণ।
ফতোয়ায় সতর্কতা
কোন মুসলমানকে কুফরের প্রতি সম্বন্ধ করার ব্যাপারে এবং কাফের ফতোয়া দেওয়ার ব্যাপারে ইমাম সাহেব অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তার মত ছিল যে, যদি কোন মুসলমানের মধ্যে কুফরের নিরানব্বইটি কারণ থাকে আর ঈমানের শুধুমাত্র একটি কারণ থাকে তবুও সেটাকে প্রাধান্য দেয়া হবে।
এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবের নিকট এসে আরজ করল, জনাব এক ব্যক্তি ঈমান এবং ইসলামের দাবী করে এবং নিজেকে মুসলমান বলে কিন্তু এতদসত্ত্বেও
১। সে জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা রাখে না।
২। সে জাহান্নামের অগ্নিকেও ভয় করে না।
৩। নির্দ্বিধায় মৃত প্রাণী খায়।
৪। নামায পড়ে কিন্তু রুকু সিজদা করে না।
৫। না দেখে সাক্ষ্য দেয়।
৬। তার নিকট ফিতনা প্রিয় এবং হক অপ্রিয়।
৭। রহমত হতে ভেগে যায়।
৮। ইয়াহুদী এবং নাসারাদের কথাকে সত্য বলে।
বাহ্যত এগুলো কুফরীর কারণ। এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার মত কি?
ইমাম সাহেব নির্দ্বিধায় বললেন, আমার মতে সে মুসলমান। প্রশ্নকারীকে আশ্চর্য হতে দেখে তিনি বললেন, কারণ
১। তার উপর আল্লাহর আকাঙক্ষাই প্রাধান্য পেয়েছে। তাকেই সে চায়। কাজেই জান্নাতের আকাঙ্ক্ষার প্রতি তার পরোয়া নেই।
২। সে জাহান্নামের আগুন নয় আগুনের রবকে ভয় পায়।
৩। সে মৃত মৎস খায়।
৪। জানাযার নামাজ পড়ে যাতে রুকু সেজদা নেই।
৫। আল্লাহ এবং তার রাসূলকে না দেখে তৌহীদ এবং রেসালাতেব সাক্ষ্য দেয়।
৬। ধন-দৌলত এবং সন্তান সন্ততিকে কোরআনে ফিতনা বলা হয়েছে। ভাব গতভাবেই সেগুলো মানুষের প্রিয়। মৃত্যু হক; কিন্তু ইবাদত করার জন্য মৃত্যুকে অপছন্দ করলে সেটা মন্দ নয়। বরং প্রশংসনীয়।
৭। বৃষ্টি আল্লাহর রহমত। ভিজে যাওয়ার ভয়ে সেখান থেকে সে ভেগে যায়।
৮। ইয়াহুদী এবং নাসারা পরস্পরকে বলেছে যে তারা সত্যের উপর নয়। এ কথায় সে বিশ্বাস করে আর এটাই হচ্ছে ঈমান।
প্রশ্নকারী এবং উপস্থিত ব্যক্তির। ইমাম সাহেবের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে গেল!
ইমাম সাহেব কর্তৃক জনৈক কাযীর ভ্রম সংশোধন
ইবনে আবি লায়লা দীর্ঘদিন কূফার কাযী ছিলেন। মসজিদে বসে তিনি বিচারকার্য সমাধা করতেন। তার যে সমস্ত ফয়সালা ভুল হত ইয়াম সাহেব সত্য প্রকাশের নিমিত্তে সেগুলো চিহ্নিত করে দিতেন।
একদিন তিনি বিচারকার্য সমাধা করে ফিরার পথে দেখতে পেলেন, এক মহিলা অন্য এক ব্যক্তির সাথে ঝগড়া করছে। তিনি ঐ লোকটিকে লক্ষ্য করে মহিলাটির বলা কথা শুনলেন যে, ‘হে দুই যিনাকারীর সন্তান’!
কাযী সাহেব ঐ মহিলাটিকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। স্বয়ং মসজিদে ফিরে এসে ফয়সালা দিলেন যে, মহিলাটিকে দাঁড় করিয়ে ‘হদ্দে কযফ’ লাগানো হোক এবং দুই হদ্দের একশত ষাটটি দোররা মারা হউক।
ইমাম সাহেব যখন এ ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারলেন; তখন বললেন, কাজী সাহেব এই ফয়সালায় ছয়টি ভুল করেছেন।
প্রথমত: তিনি বিচারের মজলিস সমাপ্ত করে উঠে যাওয়ার পর ফয়সালা করেছেন।
দ্বিতীয়ত: মসজিদের ভিতর ‘হদ্দ’ জারী করেছেন; যা নিষিদ্ধ।
তৃতীয়ত: মহিলাটিকে দাঁড় করিয়ে হদ্দ লাগিয়েছেন! অথচ নিয়ম হল, মেয়েদেরকে বসিয়ে হদ্দ লাগাতে হবে।
চতুর্থত: কাজী সাহেব দুইটি ‘হদ্দ’ লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন অথচ এক শব্দ দ্বারা একটি হদ্দ ওয়াজেব হওয়া চাই।
পঞ্চমত: কাজী সাহেব দুটি ‘হদ্দ’ একসাথে লাগিয়েছেন। অথচ যদি ধরে নেয়া যায় যে, কারো উপর দুটি ‘হদ্দ’ সাব্যস্ত হয়েছে তবে সে ক্ষেত্রে নিয়ম হল একটি হদ্দের চিহ্ন দুর হবার পর, আরেকটি হদ্দ লাগানো। উভয়টি একত্রে নয়।
ষষ্ঠত: ‘হদ্দে কযফ’ লাগানোর জন্য যাকে কযফ (অপবাদ) লাগানো হয়েছে তার পক্ষ হতে দাবী থাকা চাই। উল্লেখিত অবস্থায় যাকে অপবাদ দেয়া হয়েছে তার পক্ষ থেকে কোন দাবীই উঠেনি। তাহলে কাজী সাহেবের নিজের পক্ষ থেকে মোকাদ্দমা কায়েম করার কি অধিকার আছে।
কাজী সাহেব ইমাম সাহেবের এই বক্তব্য জানতে পেরে খুবই রাগান্তিত হলেন। তিনি গভর্ণরের নিকট নালিশ করলেন। ফলে গভর্ণর ইমাম সাহেবের ফতোয়অ দানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে দিলেন!
ফতোয়া দেয়া ফরযে কিফায়াহ। ইমাম সাহেব ব্যতীত কুফা নগরীতে অনেক উলামা বিদ্যমান, যারা এ দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তাই ইমাম সাহেব গভর্ণরের নির্দেশ শিরোধার্য করে নিয়ে ফতোয়া দেয়া থেকে বিরত রইলেন। এমনকি একবার তাঁর স্বীয় কন্যা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, “আজ আমি রোজা রেখেছি, দাঁত হতে রক্ত বের হয়ে থুথুর সাথে মিশ্রিত হয়ে পেটে চলে গিয়েছে। এখন রোজার কি হুকুম? তিনি বললেন, হৃদয়ের মনি! তোমার ভাই হাম্মাদকে তার হুকুম জিজ্ঞাসা কর। আমাকে ফতোয়া দেয়া হতে বারণ করা হয়েছে”।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান লিখেন, নির্দেশ পালনের উপমা এর চেয়ে বড় আর কি হতে পারে?
পরবর্তীতে গভর্ণর স্বয়ং একটি ফিকহী মাসয়ালায় ইমাম সাহেবের মুখাপেক্ষী হলে ইমাম সাহেবের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
অনুরূপ আরেকটি ঘটনা
খলীফা আবু জাফর মনছুরের সঙ্গে মুছেলবাসীরা কোন এক বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ ছিল। চুক্তিতে এ কথাটিও উল্লেখ ছিল যে, যদি মুছেলবাসীরা চুক্তিভঙ্গ করে তবে তারা হত্যার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
ঘটনাক্রমে তারা চুক্তিভঙ্গ করে ফেলল। খলীফা সমস্ত ফিকাহবিদকে সমবেত করলেন। ইমাম সাহেবও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। খলীফা বললেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি এ কথা বলেন নাই যে, মুমিনগণ শর্ত পূরণ করতে বাধ্য। মুছেলবাসীরা বিদ্রোহ না করার অঙ্গীকার করেছিল। এখন তারা আমার প্রতিনিধির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেছে। কাজেই তাদের রক্ত আমার জন্য হালাল।
উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্য হতে একজন বলল, তাদের ব্যাপারে আপনার কথা গ্রহণযোগ্য। তাদের উপর আপনার ক্ষমতা রয়েছে। আপনি যদি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন তবে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করার অধিকার সংরক্ষণ করেন। আর যদি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে তারা শাস্তির যোগ্য।
খলীফা মনছুর ইমাম সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন, আপনার মতামত কি? আমরা কি শান্তিপ্রিয় খিলাফতের গোত্র নই?
ইমাম সাহেব বললেন, মুছেলবাসীরা যে শর্ত আরোপ করেছেন তাদের তা করার ক্ষমতা নেই। আর আপনি যে শর্ত আরোপ করেছেন তাও আপনার আওতায় পড়ে না। কারণ শুধুমাত্র তিন কারণে (হত্যা, যিনা, ইরতিদাদ) মুসলমানকে হত্যা করা যেতে পারে।
কাজেই তাদেরকে শাস্তি দেয়া আপনার জন্য অবৈধ হবে। আল্লাহর নির্দেশিত শর্ত পূরণ হবার অধিক যোগ্য। আচ্ছা বলুন তো! কোন মহিলা বিবাহিতা কিংবা কারো দাসী হওয়া ব্যতীত যদি তার দেহ কারো জন্য বৈধ করে দেয় তবে কি তার সাথে সঙ্গম করা বৈধ হবে?
খলীফা মনছুর ইমাম সাহেব ব্যতীত অন্যান্য ফিকাহবিদকে সেখান থেকে চলে যেতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর ইমাম সাহেবকে একাকী রেখে বললেন, “জনাব আপনার ফতোয়াই সঠিক। আপনি অনুগ্রহ করে আপনার দেশে ফিরে যান। এখানে এমন ফতোয়া দিবেন না, যা খলীফার বদনামের কারণ হবে এবং বিদ্রোহীদের শক্তি জোগাবে”।
ইমাম সাহেবের ফিকহী উসূল
কিতাব, সুন্নাহ এবং ইজমার পর ইমাম সাহেব হযরত আলীএবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে (রাঃ) দলীল হিসাবে মানতেন। তাঁর মত ছিল, দুর্বল বা মুরসাল হাদীছ কিয়াস হতে অগ্রগণ্য। কাজেই এর কোন একটির উপস্থিতিতে কিয়াস অনুসারে আমল করা যাবে না।
ইমাম সাহেব স্বয়ং তার ফিকহী মত এভাবে বর্ণনা করেন, প্রতিটি মাসয়ালার সমাধান কিতাবুল্লা হতে পেলে সেখান থেকেই আমি গ্রহণ করি। আর যদি সেখানে না পাই তবে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত এবং তাঁর ঐ সমস্ত হাদীছ থেকে গ্রহণ করি, যেগুলো নির্ভরযোগ্য রাবীদের থেকে নির্ভরযোগ্য রাবীগণ বর্ণনা করেছেন। আর যদি এর সমাধান কোরআন এবং হাদীছে না পাই তবে ছাহাবাদের থেকে যার মত ইচ্ছা গ্রহণ করি আর যার মত ইচ্ছা পরিত্যাগ করি। অতঃপর তাদের মত ছেড়ে অন্য কারও মত গ্রহণ করি না। আর যখন এটা ইব্রাহীম, শাবী, ইবনে সীরিন, সায়ীদ বিন মুসাইয়্যেব এবং অন্যান্য মুজতাহিদ পর্যন্ত এসে পৌঁছে তখন তাদের ন্যায় আমার জন্যও ইজতিহাদ করার সুযোগ রয়েছে।
ইমাম সাহেবের এ কথাটি তাঁর ছাত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ ভিন্ন শব্দে নকল করেছেন। কাযী আৰু ইউসুফের বর্ণনা হল, যখন নির্ভরযোগ্য রাবীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ আমাদের নিকট পৌছে, তখন আমরা সেটি গ্রহণ করি। আর যখন ছাহাবাদের মত আসে তখন আমরা তার বাইরে যাই না। আর যখন তাবেঈনদের মত আসে তখন আমরাও স্বীয় মত ব্যক্ত করি।
ইমাম সাহেবের সবচেয়ে বড় সমালোচক খতীব বাগদাদী তাঁর কিতাব ‘তারিখে বাগদাদে’ আব্দুল্লাহ বিন মুবারক থেকে তার মত নকল করেন,
যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ পাওয়া যায়, তখন তা শিরধার্য। আর যখন ছাহাবাদের মতামত পাওয়া যায়, তখন সেখান থেকে যে কোন একটি অবলম্বন করি, তাদের মতের বাইরে না। আর যখন তাবেঈদের কোন কথা আসে তখন আমরাও তাদের মত ইজতিহাদ করি। অধিকন্তু খতীব বাগদাদী ‘আল ফকীহ ওয়ালা মুতাফাক্কিহ’ নামক কিতাবে ইমাম সাহেবের এ সম্পর্কিত কয়েকটি অভিমত উল্লেখ করেছেন। যেমন ইমাম সাহেবের বিশিষ্ট ছাত্র যুফার বিন হুইল থেকে ইমাম সাহেবের এ কথা! বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি ইলমে দ্বীনের কোন বিষয় সম্পর্কে কথা বলে এবং ধারণা করে যে, আলাহ,তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবে না যে, দ্বীনের বিষয়ে তুমি কিভাবে ফতোয়া দিয়েছ, তবে তার নফস যেন আত্মহত্যা এবং দিয়াত (রক্তপণ) দু’টিই সহজ করে দিয়েছে।
ইমাম সাহেবের এ বক্তব্যটি খতীব বাগদাদী উল্লেখ করেন, যদি ইলমে দ্বীন নষ্ট হওয়ার কারণে আল্লাহর জিজ্ঞাসাবাদের ভয় না থাকত, তবে আমি কাউকে ফতোয়া দিতাম না। তার জন্য হবে আনন্দ আর আমার জন্য হবে বোঝা।
ওকী বিন জাররাহ হতে খতীব বাগদাদী ইমাম সাহেবের এ কথাটি বর্ণনা করেন, কোন কোন কিয়াস হতে মসজিদে প্রস্রাব করে দেয়া উত্তম।
এরপর লিখেন যে, ইয়াহয়া বিন সালেহকে ওকী বিন জাররাহ বলতেন, তুমি দ্বীনের বিষয়ে কিয়াস করা ছেড়ে দাও। কারণ আমি আবু হানিফাকে এরূপ বলতে শুনেছি।
খালেদ বিন সালমা আবু হানিফাকে বলতেন, যদি কোন হাদীছ না পাই তবে আমরা আপনার মতের মুখাপেক্ষী হই। আর যদি কোন হাদীছ পেয়ে যাই। তবে আপনার কথা দেয়ালের উপর নিক্ষেপ করি।
যুফার বিন হুযাইল বলেন, হাদীছ না পেলে আমরা কিয়াস অনুসারে আমল করি। হাদীছ পেলে আমরা কিয়াস প্রত্যাখ্যান করে হাদীছ গ্রহণ করি।
তদ্রুপ ওকী বিন জাররাহ বলেন, প্রয়োজনের ভিত্তিতে আবু হানিফাকে যে কোন কথা বলেছেন, আমরা তার সমর্থনে হাদীছ বর্ণনা করি।
ফিকাহর কোন কোন মাসয়ালা কিয়াসের বিপরীত হয়। সেগুলোকে ইস্তিহসান বলা হয়। এ ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হলে ইমাম সাহেব খুবই সতর্কতা এবং চিন্তা ফিকিরের সাথে কাজ করতেন। এ সম্পর্কে তাঁর বিশিষ্ট শাগরেদ কাযী আবু ইউসুফ থেকে খতীব বাগদাদী এ বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন, ফিকাহ সম্পর্কিত কোন মাসয়ালা বর্ণনা করার পূর্বে এক বৎসর পর্যন্ত তিনি চিন্তা ফিকির করতেন। এ সময়ে তাঁর কোন শাগরেদের নিকট তা প্রকাশ করতেন না। এক বৎসর পর সেটাকে সুদৃঢ় করে তাদের সামনে প্রকাশ করতেন। আর যখন ইস্তিহসান সম্পর্কে কথা বলতেন তখন গভীর চিন্তা এবং বিবেচনার পর নিশ্চিন্ত হলেই কিছু বলতেন, নচেৎ বলতেন না।
ইমাম সাহেব সম্পর্কে খতীব বাগদাদীব এসব উদ্ধৃতি শত্রু স্বীকৃত গুণ এর পর্যায়ে। এতে ইমাম সাহেবের ফিকহী মতবাদ স্পষ্টরূপে প্রকাশ পেয়েছে। আলামা ইবনে হযমের এ উদ্ধৃতিটিও এ পর্যায়ের।
আবু হানিফার সমস্ত শাগরেদ এ বিষয়ে ঐক্যমত যে, আবু হানিফার মাযহাবে কিয়াস অপেক্ষা জঈফ হাদীছ উত্তম এবং অগ্রগণ্য।
ইমাম আওযায়ী (রহঃ) সিরিয়ার অধিবাসী ছিলেন। তিনি একজন প্রসিদ্ধ ইমাম ও একটি ভিন্ন মাযহাবের প্রবক্তা ছিলেন।
একবার মক্কা মুকাররমায় ইমাম সাহেবের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ লাভ হয়। তাঁরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। প্রসঙ্গক্রমে রফে ইয়াদাইন অর্থাৎ রুকুতে যাবার সময় এবং রুকু হতে উঠার সময় হাত উঠানোর মাসয়ালাটি তাঁদের আলোচনায় এসে গেল।
ইমাম আওযায়ী (রহঃ) ইমাম সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন, ইরাকবাসীরা! আপনাদের কী হল আপনারা রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু হতে উঠার সময় রফে ইয়াদাইন’ করেন না।
ইমাম সাহেব বললেন, এ সম্পর্কিত কোন প্রামাণ্য হাদীছ নেই। এতে ইমাম আওযায়ী (রহঃ) বললেন, কি করে আপনারা বলেছেন যে, এ সম্পর্কিত কোন প্রামাণ্য হাদীছ নেই। অথচ আমার নিকট ইমাম যুহরী (রহঃ) সালেমের বাদ দিয়ে তার পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায শুরু করার সময়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু হতে উঠার সময় হাত উঠাতেন।
তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এটা বুঝানো যে, এ হাদীছের রাবী প্রত্যেকেই নির্ভরযোগ্য। কাজেই রফে ইয়াদাইনের হাদীছ নির্ভরযোগ্য সনদ দ্বারা প্রমাণিত। এর উত্তরে ইমাম সাহেব বললেন, আমার নিকট হাম্মাদ ইব্রাহীম হতে, তিনি আলকামা হতে, তিনি ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায শুরু করার সময় ব্যতীত অন্য সময়ে হাত উঠাতেন না।
ইমাম আওযায়ী (রহঃ) এ কথা শুনে বলতে লাগলেন, সুবহানাল্লাহ! আমি যুহরী হতে সালেমের বরাদ দিয়ে ইবনে উমরের রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছি আর আপনি বলেছেন, হাম্মাদ আমাকে ইব্রাহীম হতে রেওয়ায়াত করেছে।
ইমাম আওযায়ী (রহঃ) বুঝাতে চেয়েছেন যে, ইমাম সাহেবের রেওয়ায়াতের তুলনায় তার রেওয়ায়াতে রাবীর সংখ্যা কম হওয়ার কারণে তার হাদীছটির সনদ আলী বা উন্নত। কারণ তাঁর বর্ণিত হাদীছের সনদে তাঁর মধ্যে এবং হাদীছ বর্ণনাকারী ছাহাবী ইবনে উমর (রাঃ)-এর মধ্যে মাত্র দু’জন রাবী রয়েছেন।
পক্ষান্তরে ইমাম সাহেবের বর্ণিত হাদীছের সনদে ইমাম সাহেব এবং হাদীছ বর্ণনাকারী ছাহাবী ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর মধ্যে তিনজন রাবী রয়েছেন। কাজেই তাঁর বর্ণিত হাদীছটির সনদ আলী। তাই সেটি অগ্রগণ্য হওয়ার দাবীদার।
এর উত্তরে ইমাম সাহেব বললেন, হাম্মাদ ফিকাহ সম্পর্কে যুহরী হতে অধিক জ্ঞাত। ইব্রাহীম ফিকাহ সম্পর্কে সালেম হতে অধিক জ্ঞাত। ফিকাহর ব্যাপারে ইবনে উমর হতে আলকামা কম জ্ঞানী নন। যদিও তিনি ছাহাবী হবার মর্যাদা লাভ করেছেন। আর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ তো নিজেই নিজের তুলনা।
ইমাম সাহেবের এ উত্তর শুনে ইমাম আওযায়ী (রহঃ) চুপ হয়ে গেলে।
আবু হানিফার (রহঃ) ফিকাহ সম্বন্ধে ইমামগণের মত
ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বর্ণনা করেন, আমি ইমাম মালেককে জিজ্ঞেস করলাম যে, আপনি কি আবু হানিফাকে দেখেছেন? ইমাম মালেক (রহঃ) বললেন, সুবহানাল্লাহ! আমি তার মত আলেম দেখিনি। আল্লাহর কসম! যদি আবু হানিফা বলেন যে, এ স্তম্ভটি স্বর্ণের তবে তিনি তা প্রমাণ করে দিবেন। এক বর্ণনায় এরূপ রয়েছে, যদি আবু হানিফা বলেন যে, এ স্তম্ভটি স্বর্ণের তবে তা তদ্রুপই হবে। তাঁকে এমন জ্ঞান দেয়া হয়েছিল যে, এটা তাঁর জন্য কঠিন কোন ব্যাপার ছিল না।
ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, আমি ফিকাহ সম্পর্কে আবু হানিফা হতে অধিক অভিজ্ঞ অন্য কাউকে দেখিনি। যে ব্যক্তি ফিকাহ শিখতে চায়, সে যেন আবু হানিফা এবং তাঁর শাগরেদদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। ফিকাহর বিষয়ে সকল আহলে ইলম আবু হানিফার মুখাপেক্ষী। তিনি আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি ফিকাহ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চায় সে যেন আবু হানিফার অনুসরণ করে।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, সুবহানাল্লাহ! আবু হানিফা ইলম, যুহদ (দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি) এবং তাকওয়ার এমন উচ্চাসনে আছেন যা অন্য কেউ পেতে পারে না। কাযীর পদ গ্রহণের জন্য আবু জাফর মনসুরের নির্দেশে তাঁকে দুররা মারা হয়েছে। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। তাঁর উপর আল্লাহর রহমত এবং সন্তুষ্টি নাযেল হোক।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে দুররা মারার পর যখন তিনি আবু হানিফা (রহঃ)-এর এ ঘটনা স্মরণ করতেন, তখন অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁর ক্রন্দন এসে যেত এবং তাঁর জন্য রহমত এবং মাগফিরাতের দোয়া করতেন।
সুফিয়ান বিন উয়াইনা বলেন, যে ব্যক্তি ইলমে মাগাযী (জিহাদ সম্পর্কিত জ্ঞান) অর্জন করতে চায় তার জন্য মদীনা, যে ব্যক্তি হজ্জের মানাসেক হাসিল করতে চায় তার জন্য মক্কা, আর যে ব্যক্তি ইলমে ফিকাহ অর্জন করতে চায় তার জন্য কূফা। সে যেন আবু হানিফার ছাত্রদের সঙ্গ অবলম্বন করে।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রহঃ) বলেন, যদি হাদীছের পর কিয়াসের প্রয়োজন পড়ে, তবে মালেক, সুফিয়ান এবং আবু হানিফার কিয়াস গ্রহণযোগ্য। এ তিনজনের মধ্যে আবু হানিফা ফিকাহ সম্পর্কে অধিক অভিজ্ঞ। তিনি সূক্ষ্ম দৃষ্টি দ্বারা ফিকাহর গভীর দেশে পৌঁছেছেন। যখন আবু হানিফা এবং সুফিয়ান কোন বিষয়ে একমত হন তবে আমি সেটাই দলীল হিসাবে গ্রহণ করি।
ইবনে আব্দিল বারর কিতাবুল ইন্তিকায় লিখেন যে, আবু হানিফা ছিলেন ফিকাহর ইমাম, কিয়াস এবং রায়ের বিষয়ে অভিজ্ঞ, মাসয়ালা গবেষণায় মেধাবী, প্রত্যুৎপন্নমতি মুত্তাকী আলেম। অবশ্য খবরে ওয়াহেদ (যে হাদীছের রাবী কোন এক পর্যায়ে হলেও একজন হয় তাকে খবরে ওয়াহেদ বলে) এর ব্যাপারে তাঁর মত ছিল যে, সর্বজন সমর্থিত নীতির বিপরীত হলে তা তিনি গ্রহণ করতেন না। এজন্য মুহাদ্দিছদের একদল তার বিরোধিতা করতেন। তাঁর সম-সাময়িকরাই সর্বাধিক পরশ্রীকাতর ছিলেন। তারা তার দোষ খুঁজতে শুরু করলেন। আর একে তারা বৈধও মনে করতেন। এর বিপরীত অন্যান্যরা তাঁকে অত্যাধিক ইয্যত সম্মান করতেন।
অন্যান্য ইমামগণের দৃষ্টিতে ইমাম সাহেবের মর্যাদা
ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) একবার ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর কবর যিয়ারতে আসলেন। ইতিমধ্যে ফজরের নামাযের সময় হলো। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) সেখানেই নামায আদায় করলেন। কিন্তু নামাযে তিনি উচ্চস্বরে বিসমিল্লাহ পড়লেন না কিংবা দোয়ায়ে কুনুতও পড়লেন না। অথচ তাঁর মাযহাব হলো সারা বৎসর ফজরের নামাযে দোয়ায়ে কুনুত পড়তে হবে এবং জাহরী বিসমিল্লাহ (নামাযে তাসমিয়া) স্বশব্দে পড়তে হবে।
এ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, এ কবরে শায়িত ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) থেকে লজ্জা হওয়ার কারণে এবং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমি আমার চিরাচরিত নিয়ম এবং মত পরিত্যাগ করেছি।
ইমাম আবু জাফর সাদেক এবং ইমাম আবু হানিফা
একবার হজ্জের সময় ইমাম আবু জাফর সাদেকের সাথে ইমাম সাহেবের সাক্ষাৎ হয়। কথা প্রসঙ্গে আবু জাফর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমার নানা (রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীছের বিপরীত কিয়াস করেন নাকি? ইমাম সাহেব বললেন, নাউযুবিল্লাহ! আমাদের নিকট আপনিও আপনার নানার মত সম্মানিত। তাশরীফ রাখুন। এ বিষয়ে আমি কিছু কথা আরয করব। ইমাম সাহেব আবু জাফরের সামনে আদবের সহিত বসলেন এবং বললেন, আমি আপনাকে তিনটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করব। আপনি উত্তর দিবেন। এরপর আমি আরয করব।
১। পুরুষ দুর্বল না মেয়ে দুর্বল? ইমাম আবু জাফর বললেন, মেয়ে দূর্বল। ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, পুরুষের তুলনায় মেয়েরা কতটুকু মিরাছ পায়? ইমাম আবু জাফর বললেন, পুরুষের অর্ধেক। ইমাম সাহেব বললেন, যদি আমি কিয়াস করতাম তবে এর বিপরীত বলতাম। কারণ মেয়েরা পুরুষের তুলনায় দুর্বল।
২। নামায উত্তম না রোযা উত্তম? ইমাম আবু জাফর বললেন, নামায উত্তম। ইমাম সাহেব বললেন, যদি আমি কিয়াস করতাম তবে বলতাম, ঋতুবর্তীরা যেন রোযার পরিবর্তে নামায কাযা করে।
৩। প্রস্রাব অধিক নাপাক নাকি শুক্র? ইমাম আবু জাফর বললেন, প্রস্রাব অধিক নাপাক। ইমাম সাহেব বললেন, যদি কিয়াস গ্রহণযোগ্য হত, তবে আমি বলতাম, শুক্র দ্বারা গোসল ওয়াজিব হবে না, বরং প্রস্রাব দ্বারা ওয়াজিব হবে।
এ কথা শুনে ইমাম আবু জাফর ইমাম সাহেবের ললাটে চুম্বন করলেন। ইমাম আবু জাফর ইমাম সাহেবের শায়খ এবং উস্তাদ ছিলেন। কেউ তাঁর নিকট বলেছিল, আবু হানিফা কিতাব এবং সুন্নাহ বাদ দিয়ে নিজের কিয়াস অনুসারে আমল করে। এজন্য সরাসরি তিনি তাঁর ছাত্র থেকে ভুল ধারণা দূর করে নিলেন।
শরীয়ত সংকলন
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)ই সর্বপ্রথম শরীয়তের বিষয়গুলো বিভিন্ন অধ্যায়ে সাজিয়ে সংকলন করেন।
জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ) লিখেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সর্বপ্রথম শরীয়ত সংকলনের এবং সেটাকে বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করার মর্যাদা লাভ করেন। অতঃপর ইমাম মালেক (রহঃ) তাঁর অনুণ করেন। আবু হানিফার আগে কেউই এ কাজ করেননি।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সহীহ হাদীছ নির্বাচিত করে সেগুলো সংকলন করে নেন। পরে তিনি সেগুলো শাগরেদদের সামনে দরস (পাঠ) হিসেবে উপস্থাপন করেন। যোগ্য শাগরেদবৃন্দ সেগুলো লিখে নিয়ে কিতাবে রূপ দেন। সেটাই ‘কিতাবুল আছার’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এটা দ্বিতীয় শতাব্দীর দ্বিতীয় চতুর্থাংশের ঘটনা।
হাদীছের অন্যান্য কিতাবের মত কিতাবুল আছারের বর্ণনাকারী অনেক হওয়ার কারণে এরও বিভিন্ন নুসখা (কপি) হয়েছে। এ কিতাবের বর্ণনাকারীদের সংখ্যা অনেক। তন্মধ্যে চারজনের বর্ণনা প্রসিদ্ধ। এঁরা হচ্ছেন- ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম যুফার এবং ইমাম হাসান (রহঃ)। এগুলোর মধ্যে আবার ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর রেওয়ায়েত অধিক প্রসিদ্ধ এবং সমাদৃত হয়েছে। হাফেয ইবনে হজর আসকালানী (রহঃ) লিখেন, এ সময়ে ইমাম আবু হানিফার হাদীছ হতে কিতাবুল আছার রয়েছে যেটি মুহাম্মদ (রহঃ) বর্ণনা করেছেন।
আবু যুহরা মিসরীর রায়
প্রসিদ্ধ লেখক আবু যুহরা মিসরী (রহঃ) কিতাবুল আছার সম্পর্কে লিখেন, তিন কারণে এ কিতাবটি মূল্যবান। প্রথমতঃ এ কিতাবটি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর বর্ণিত হাদীছগুলোর ভাণ্ডার। এ কিতাব দ্বারা আমরা জানতে পারি যে, ইমাম সাহেব মাসয়ালা গবেষণার ব্যাপারে কিভাবে হাদীছকে প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। দ্বিতীয়তঃ এ কিতাব দ্বারা আমরা জানতে পারি যে, ছাহাবায়ে কিরামের ফতোয়া এবং মুরসাল হাদীছ কোন পর্যায়ের দলীল। তৃতীয়তঃ এ কিতাব দ্বারা আমরা ইরাকের ফিকাহবিদ তাবেয়ীদের ফতোয়া, বিশেষ করে কূফার ফিকাহবিদদের ফতোয়া জানতে পারি।
কিতাবুল আছার-এর নির্বাচনঃ ইমাম আবু বকর বলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) চল্লিশ হাযার হাদীছ হতে কিতাবুল আছার নির্বাচন করেছেন।
মোল্লা আলী কারী (রহঃ) লিখেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) তাঁর রচনাবলীতে সত্তর হাজারেরও অধিক হাদীছ উল্লেখ করেছেন। আর চল্লিশ হাজার হাদীছ হতে কিতাবুল আছার নির্বাচন করেছেন।
ইয়াহয়া বিন নসর বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফার (রহঃ) একটি কামরায় প্রবেশ করলাম। দেখলাম সেটি কিতাবে ভরপুর। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কি? তিনি বললেন, এগুলো সব হাদীছ। আমি এর থেকে কমসংখ্যক হাদীছ বর্ণনা করেছি।
জামেউল মাসানিদঃ ইমাম মুহাম্মদ বিন মাহমুদ খাওয়ারেযমী (রহঃ) একটি বিরাট কিতাব আকারে ফেকহী মাসয়ালার ধারা অনুসারে সন্নিবেশ করেন। এটির নাম জামেউস মাসানীদ (মুসনাদসমূহের সমন্বয়কারী)। তিনি কিতাবের ভূমিকায় লিখেন,
শামদেশের (সিরিয়ার) জাহেলদের মুখে আমি ইমাম সাহেবের হাদীছের পরিমাণের ব্যাপারে এমন ক্ষুদ্র পরিমাণ শুনেছি যদ্বারা ইমাম সাহেবের অপমান হয়। এর কারণেই তারা ইমাম সাহেবকে অল্প সংখ্যক হাদীছ জ্ঞাত হিসেবে জানে। এর প্রমাণ হিসেবে তারা মুসনাদে শাফেয়ী এবং মুয়াত্তা ইমাম মালেক উল্লেখ করে বলে যে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর কোন মুসনাদ কিংবা হাদীছের কিতাব নেই। তিনি তো মাত্র অল্প কয়েকটি হাদীছ বর্ণনা করতেন। এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, বড় বড় আলেমদের লিখিত পনেরটি মুসনাদ আমি এক কিতাবে সন্নিবেশ করব।
এ ছাড়াও ইমাম শরফুদ্দীন ইসমাঈল বিন ঈসা আলমক্কী, আবুল বাকা আহমদ বিন জিয়া মুহাম্মদ আলকারশী, মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল করদরী প্রমুখ জামেউল মাসানিদকে বিভিন্ন নামে সংক্ষিপ্ত করে ইমাম হানিফার হাদীছের খিদমত করেন।
ইমাম বুখারী এবং ইমাম আবু দাউদের উস্তাদ আলী বিন জাদ বলেন, আবু হানিফা যখন হাদীছ উল্লেখ করেন তখন তা মোতির মত বর্ষিতে থাকে।
প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সত্তর হাজার হাদীছের চল্লিশ হাজার হতে কিতাবুল আছার নির্বাচিত করেছেন, পক্ষান্তরে ইমাম বোখারী (রহঃ) ছয় লক্ষ হাদীছ হতে র্নিবাচিত করে বোখারী শরীফ সংকলন করেছেন। তবে দেখা যাচ্ছে ইমাম বোখারী (রহঃ) ইমাম সাহেব হতে অনেক বড় মুহাদ্দিছ ছিলেন এবং তাঁর জ্ঞাত হাদীছ অনেক বেশী।
এর উত্তরে বলা যেতে পারে যে, হাদীছের স্বল্পতা কিংবা আধিক্য সনদের উপর নির্ভর করে। একই হাদীছ যদি দশটি সনদে বর্ণনা করা হয়, তবে সেখানে দশটি হাদীছ ধরা হবে। আর যদি বিশটি সনদে বর্ণনা করা হয় তবে সেখানে বিশটি হাদীছ ধরা হবে, কিন্তু মূল হাদীছ একটিই।
মূলতঃ সহীহ হাদীছের সংখ্যা উলামায়ে কিরামের গণনা হিসেবে চার হাযার চারশ’টি। ইমাম সাহেব যে সত্তর হাযার হাদীছ জানতেন তা ছিল সনদের পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে। ইমাম সাহেব এং ইমাম বোখারীর জন্মের মধ্যে একশ চৌদ্দ বছর পার্থক্য রয়েছে। এ দীর্ঘ সময়ে সনদের সংখ্যাও বহুগুণ বেড়ে গেছে। সুতরাং সত্তর হাজার এবং ছয় লক্ষের পার্থক্য মূলতঃ সনদের সংখ্যার পার্থক্য মাত্র। মূল হাদীছের নয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর পূর্বে বিশিষ্ট সাহাবী এবং তাবেয়ীগণ হাদীছের আলোচনার মত ফিকাহর আলোচনাও করতেন। হাদীছ থেকে মাসয়ালা গবেষণা করে বের করতেন। সেগুলো সংকলনও করা হত। কিন্তু সেটা কোন নিয়মতান্ত্রিক সংকলন ছিল না কিংবা সেটা ভিন্ন বিষয় হিসেবে ছিল না। এতে এমন কোন নিয়মও সংকলিত হয়নি যার উপর ভিত্তি করে আহকাম বের করা যাবে।
১২০ হিজরীতে ইমাম সাহেবের উস্তাদ হাম্মাদের মৃত্যু হয় এবং ইমাম সাহেব তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। দেশের বিভিন্ন স্থান হতে দৈনিক তাঁর নিকট ফিকাহ সম্পর্কিত শত শত প্রশ্ন আসতে লাগল। এ সবগুলোর উত্তর দেয়া এক ব্যক্তি দ্বারা সম্ভব নয়। তিনি এটাও লক্ষ্য করলেন যে, সরকারী কাযী এবং হাকেমগণ ভুল ফয়সালা করছেন। এসব চিন্তা করে তিনি একটি আইন পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। সে পরিষদ আলোচনার মাধ্যমে শরীয়তের সম্ভাব্য সমস্ত আহকাম সংকলন করে রাখবে। যেন ভবিষ্যতে যে কোন মাসয়ালার সমাধান সংকলিত আহকাম এবং নীতি নিয়মের উপর নির্ভর করে দেয়া যেতে পারে। এ দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, যে সমস্ত মাসয়ালার সম্মুখীন হতে হয় শুধু সেগুলোর সমাধানই তিনি দিয়ে যাননি বরং যে সমস্ত মাসয়ালার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে সেগুলোরও সমাধান দেয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।
একবার ইমাম কাতাদা (রহঃ) ইমাম সাহেবের ফেকহী এবং ইলমী সুনাম শুনে তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলেন। মজলিসে কোন একটি মাসয়ালার আলোচনা উঠল, ইমাম সাহেব সে মাসয়ালার সমস্ত দিকগুলো তুলে ধরে সেগুলোর আহকাম বৰ্ণনা করলেন। ইমাম কাতাদা (রহঃ) জিজ্ঞেস করলেন, এসব অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছে, না কি কাল্পনিক বর্ণনা দিচ্ছেন?
ইমাম সাহেব বললেন, আলেমদের উচিত লোকদের যে সমস্ত বিষয়ের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলোর সমাধানের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুত হয়ে থাকা। কোন মাসয়ালার সম্মুখীন হওয়ার পূর্বে তার আহকামগুলো ভেবে রাখা চাই। এমন যেন না হয় যে, সমস্যা তো এসে পড়ল কিন্তু সমাধান জানা নেই। বরং এমন হওয়া চাই যে, সমস্যা আসার সময় সে জানবে শরীয়তে এর থেকে নিষ্কৃতির কি ব্যবস্থা রয়েছে।
ফিকাহর সংকলন এবং তার শ্রেণী বিন্যাস যেমনি গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনি নাজুক এবং সতর্কতার দাবীদার। এ কারণেই ইমাম সাহেব এককভাবে এ দায়িত্ব পালন করেননি। বরং তিনি আইন প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। এ কমিটিতে এমন লোকদের নেয়া হয় যাদের প্রত্যেকেই ফেকহী মাসয়ালার ব্যাপারে ইজতেহাদের যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এঁদের সংখ্যা ছিল চল্লিশ।
অধিকন্তু নীতি নির্ধারণের জন্য যেসব বিষয়ে জ্ঞান থাকা আবশ্যক সেসব বিষয়ে পারদর্শী লোকও, সে কমিটিতে ছিলেন। যেমন ইমাম মুহাম্মদ আরবী ভাষা এবং আদবে (সাহিত্য), কাসেম বিন মায়ীন সাহিত্যে, ইমাম যুফার (রহঃ) মাসয়ালার গবেষণার ব্যাপারে, কাযী আবু ইউসুফ, দাউদ তাঈ, ইয়াহয়া বিন আবি যায়েদা, আব্দুল্লাহ বিন মুবারক এবং হাফস বিন গিয়াস রেওয়ায়েত এবং হাদীছে পারদর্শী ছিলেন।
চল্লিশ সদস্যের পরিষদ ব্যতীত তের সদস্যের একটি কমিটি ছিল। এ কমিটির কাজ ছিল চল্লিশ সদস্যের কমিটিতে আলোচিত মাসয়ালা গুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এ কমিটিতে আব্দুল্লাহ বিন মুবারক, ইমাম আবু ইউসুফ ইমাম যুফার, ইউসুফ বিন খালিদ এবং স্বয়ং ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ও ছিলেন।
সমস্ত মাযহাবের মধ্যে হানাফী মাযহাবেরই এ মর্যাদা রয়েছে যে, এটি আইন পরিষদ দ্বারা সংকলিত হয়েছে। অন্য কোন মাযহাবে এ সৌভাগ্য হয়নি। মুয়াফেক মক্কীর বর্ণনা মতে, এ মাযহাবের নাম ‘শুরাই মসলক’ বা আলোচনামূলক মাযহাব।
ইমাম আবু হানিফার খিদমতে প্রথমে প্রতিটি মাসয়ালার বিভিন্ন দিক এবং এর বিভিন্ন উত্তর উপস্থাপন করা হত যেটা সর্বাধিক প্রযোজ্য এবং সঠিক মনে করতেন তিনি তাই বলতেন। এভাবে কোন কোন মাসয়ালা দীর্ঘদিন পর্যন্ত আলোচনা করা হত এরপর তা লিখা হত। ইমাম সাহেব কখনো তাঁর শাগরেদদেরকে তাঁর মত গ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করেননি। বরং প্রত্যেকেই স্বাধীনভাবে নিজের মত যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করতেন এবং এরপর আলোচনার পর যার যে মত ইচ্ছে গ্রহণ করতেন।
ইমাম সাহেবের প্রতিষ্ঠিত দস্তরী কমিটি অর্থাৎ আইন পরিষদ তিরিশ বছর পর্যন্ত এভাবে কাজ করতে থাকে এবং ইসলামী নীতিমালা সংকলন করতে থাকে। এ নীতিমালার সমষ্টির কিতাবগুলো আবু হানিফা (রহঃ)-এর ফিকাহর কিতাব নামে পরিচিতি লাভ করে। এগুলোতে ফিকাহর তিরাশি হাজার দফা, লিপিবদ্ধ ছিল। ইমাম সাহেবকে বাগদাদের জেলে স্থানান্তর করার পরও এ কাজ চলতে থাকে। ঐ নীতিমালার মধ্যে সংযোজন করলে মাসয়ালার সংখ্যা পঞ্চাশ লাখে উন্নীত হয়।
ফিকহে হানাফীর এ কিতাবগুলো সর্বত্র সমাদৃত হয়। ইসলামী হুকুমত সরকারীভাবে এগুলোকে কাযীদের নিকট রেখেছিলেন। এগুলোর দ্বারা তারা উপকৃত হয়েছিলেন। ইয়াহয়া বিন আদম বলেন,
“খলীফা ইমাম এবং হাকেমগণ এগুলো দ্বারা বিচার করতেন, পরবর্তীতে এর উপরই আমল হতে লাগল।“
ফিকহে হানাফীর মধ্যে ইসলামী আইন সম্পর্কীয় যে সমস্ত কিতাব সংকলিত হয় সেগুলো নিম্নরূপঃ (ক) যাহেরুর রেওয়ায়েতের কিতাব। এখানে ছয়টি কিতাব রয়েছে, এগুলোর প্রণেতা ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)।
১। জামে সগীর। এটিকে ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর রেওয়ায়েত হতে সংকলন করেন। এ কিতাবটির চল্লিশটি ব্যাখ্যা লিখা হয়েছে।
২। জামে কবীর। এটিতে জামে, সগীর অপেক্ষা অধিক মাসয়ালা সংকলন করা হয়েছে। ইমাম সাহেবের মতামত ছাড়াও ইমাম আবু ইউসুফ এবং যুফার (রহঃ)-এর মতামত এটিতে স্থান পেয়েছে। এটিও ইমাম মুহাম্মদের রচনা। যাহেরুর রেওয়ায়েতের সবকটি কিতাব ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) রচিত।
৩। মসুত। এটি ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর সর্বপ্রথম রচনা এবং আসল নামে পরিচিত।
৪। যিয়াদাত। এটিতে সেসব মাসয়ালা স্থান পেয়েছে যেগুলো জামে সগীর। কিংবা জামে কবীরে নেই।
৫। সিয়ারে সগীর। এটিতে প্রশাসন, রাজনীতি এবং জিহাদ সম্পর্কিত মাসয়ালা লিখা হয়েছে।
৬। সিয়ারে কবীর। এটি ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর সর্বশেষ কিতাব।
ইমাম আবুল ফযল মুহাম্মদ বিন আহমদ মারওযী (রহঃ) যাহেরুর রেওয়ায়েতের সবকটি কিতাবকে একত্রে সংকলন করেছেন। এটির নাম কাফী। ইমাম সরখসী তিরিশ খণ্ডে এটির ব্যাখ্যা লিখেছেন। মসুত নামে এ ব্যাখ্যাটি পরিচিত।
কুতুবে নাওয়াদের। উল্লেখিত ছয়টি কিতাব ছাড়া ইমাম মুহাম্মদের রচিত ফিকাহ সম্পর্কিত অন্যান্য কিতাবকে নাওয়াদের বলা হয়। যেমন, কায়সানিয়াত, জুরজানিয়াত, হারুনিয়াত, আমালী ইমাম মুহাম্মদ প্রভৃতি। এগুলো ছাড়াও ফিকাহ এবং হাদীছে ইমাম মুহাম্মদ এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর কিতাবগুলোকেও নারওয়াদেরাত বলা হয়। যেমন কিতাবুল আছার, কিতাবুল হজ্জ প্রভৃতি।
দরস তাদরীস বা শিক্ষাদানের হালকা
ইমাম সাহেবের দরসী হালকায় বসার বিস্তারিত ঘটনা হাম্মাদ বিন সালমা। এবং দাউদ ত্বায়ী বলেছেন,
ইব্রাহীম নাখয়ীর মৃত্যুর পর হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান তাঁর স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। ফিকাহ এবং ফতোয়ায় সবার নিকট গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আহলে ইলমগণ তাঁর জা-নশীনের তালাশ করলেন। তাঁর শাগরেদদের নির্বাচনী দৃষ্টি ইসমাঈল বিন হাম্মাদের উপর পড়ল। আবু বকর নহশলী, আবু বুরদা আতাবী, মুহাম্মদ বিন জাবের হানাফী, আবু হুসাইন, হাবীব বিন ছাবেত এবং তাঁর ছাত্রদের এক জামাত ইসমাঈলকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝা গেল যে, তিনি আরবী ব্যাকরণ, আরবী ভাষা এবং আরবী কবিতা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানী হলেও ফিকাহ এবং ফতোয়ায় সে যোগ্যতা, নেই যার আশা করা হয়েছিল। এতে অন্যান্যরা আবু বকর নহশলীকে হাম্মাদের জা-নশীন করতে চাইলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। আবু বুরদাকে বলা হলে তিনিও অসম্মতি প্রকাশ করলেন। এ জন্য সবাই এ বলে আবু হানিফাকে নির্বাচিত করলেন, ‘এ রেশম বিক্রেতার বয়স কম হলেও ফিকাহ সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখে”।’
সাথীদের অনুরোধ রক্ষার্থে ইমাম সাহেব আপন শিক্ষকের হালকায় শিক্ষক
হিসাবে বসতে রাষী হলেন। হাম্মাদ বিন সুলাইমানের বড় বড় শাগরেদগণও তাঁর দরসী হালকায় শরীক হন। এ সংবাদ কূফায় ছড়িয়ে পড়লে আবু ইউসুফ, আসাদ বিন আমর, কাসেম বিন মাআন, যুফার বিন হুইল, ওলীদ বিন আবান, আবু বকর হুযালী এবং অন্যান্য আহলে ইলম তাঁর দরসী হালকায় আসতে লাগলেন এবং কুফার মসজিদ এত আকর্ষণীয় হয়ে উঠল যে, আমীর-হাকেম, এবং অভিজাত শ্রেণীর লোকজনও সেখানে সমবেত হতে লাগলেন।
ইমাম সাহেব স্বীয় উস্তাদের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার এবং দরসী হালকা কায়েম করার ব্যাপারে প্রথমে দ্বিধাদ্বন্দে ছিলেন। ঐ সময় তিনি একটি স্বপ্ন দেখেন যা বাহ্যতঃ চিন্তার কারণ ছিল। তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র কবর খনন করছি। এতে আমার বড়ই ভীতির সঞ্চার হল। আমি বসরায় গিয়ে এক ব্যক্তির মাধ্যমে এর তাবীর ইবনে সীরিনকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছের মর্ম প্রকাশ করবে। এরপর ইমাম সাহেব আনন্দের সাথে ফিকাহ এর ফতোয়ার দরস দিতে শুরু করলেন।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রহঃ) হতে ইবনে খিল্লিকান বর্ণনা করেন, ‘ একবার ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) স্বপ্নে দেখতে পেলেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর মুবারক খনন করে তাঁর পবিত্র দেহের হাঁড়সমূহ সংগ্রহ করছেন। ঘুম হতে জাগ্রত হয়েই তিনি পেরেশান এবং চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পরে তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী প্রসিদ্ধ আলেম আল্লামা ইবনে সীরিনের নিকট গিয়ে তাঁর পরিচয় প্রকাশ না করে স্বপ্নের বর্ণনান্তে তার ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন।
ইবনে সীরিন (রহঃ) বললেন, এ স্বপ্ন দ্রষ্টা ইলমের প্রচার ও প্রসার এমনভাবে করবে যে রূপে’ আর ইতিপূর্বে কেউ করে নাই। অতঃপর বললেন, এ স্বপ্ন ইমাম আবু হানিফা দেখে থাকবে।
ইমাম সাহেব আরয করলেন, জনাব! আমার নামই আবু হানিফা। ইবনে সীরিন (রহঃ) ইতিপূর্বে ইমাম সাহেবকে দেখেন নাই। তবে তাঁর পিঠ এবং বাম পাঁজরে তিল ছিল বলে জানতেন। তিনি তা দেখে বললেন, হ্যা, আপনিই আবু হানিফা। অতঃপর স্বপ্নের এ ব্যাখ্যা করলেন যে, এর উদ্দেশ্যে হচ্ছে ইলম পূনর্জীবিত করা এবং তার সংকলন করা।
ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) তাবয়ীজুসসহীফা’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেন, আমি প্রত্যহ হাম্মাদ (রহঃ)-এর মজলিসে যেতাম। তাঁর থেকে যা কিছু শুনতাম মুখস্ত করে নিতাম। পরদিন তা নির্ভুলভাবে তাঁকে শুনাতাম। অপর ছাত্ররা অনেক ক্ষেত্রে ভুল করে ফেলত। এ কারণে হাম্মাদ (রহঃ) নির্দেশ দিলেন যে, আবু হানিফা ব্যতীত মজলিসের অগ্রাসনে অন্য কেউ বসবে না। দশ বৎসর যাবৎ এরূপে আমি তাঁর মজলিসে থেকে শিক্ষা অর্জন করেছি।
একদিন আমার মনে এ ধারণা আসল যে, আমার তো যথেষ্ট ফিকাহ্ শিখা হয়ে গেছে। কাজেই আমি ভিন্নভাবে এখন শিক্ষা মজলিস প্রতিষ্ঠা করতে পারি। এ আশা নিয়ে আমি বের হলাম। মসজিদে প্রবেশ করে যখন হাম্মাদ (রহঃ)-কে দেখলাম তখন শিক্ষকের বিপরীতে আরেকটা শিক্ষা মজলিস কায়েম করতে আমার আর সাহস হল না। তাই তাঁর মজলিসেই বসে গেলাম। ঠিক সে রাত্রেই বসরা হতে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মৃত্যুর সংবাদ এলো। তিনি ব্যতীত তার কোন উত্তরাধিকারী ছিল না। এ সংবাদ শুনার সাথে সাথেই তিনি আমাকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে দিয়ে সেখানে চলে গেলেন। দুই মাস যাবৎ আমি তার এ কাজ সমাধা করলাম। এ সময় ষাটটি এমন মাসয়ালা উত্থাপিত হয়েছিল যেগুলোর উত্তর তার থেকে শুনা হয়নি। সেগুলোর উত্তরও আমি দিয়েছি। কিন্তু তা লিখে রেখেছি। তিনি ফিরে আসলে আমি তার সম্মুখে প্রশ্ন এবং উত্তরগুলো পেশ করলাম। সেগুলো দেখে তিনি চল্লিশটি মাসয়ালায় আমার সাথে একমত হলেন। অবশিষ্ট বিশটিতে একমত হলেন না। এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি কখনো তাঁর শিক্ষা মজলিস পরিত্যাগ করবো না।
হাম্মাদ (রহঃ)-এর মৃত্যুর পর ইমাম সাহেবকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য তার সঙ্গীগণ চাপ সৃষ্টি করলেন। কিন্তু তিনি এতে সম্মত হলেন না। অবশেষে তিনি এ শর্তে রাজী হলেন যে, তাদের মধ্য হতে দশজন লোক এক বৎসর পর্যন্ত ইমাম সাহেবের সঙ্গে থেকে তার ফতোয়া কাজে সহযোগিতা করবেন। পরিশেষে তদ্রুপই করা হল। এরপর ইমাম সাহেব ফিকাহ সঙ্কলনের কাজ আরম্ভ করেন। এ কাজের জন্য তিনি হাদীছ বিশারদদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন।
রদ্দুল মুখতার গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, ফিকাহ সঙ্কলনের সময় ইমাম সাহেবের নিকট এক হাজার উলামার সমাবেশ ছিল। এদের মধ্যে চল্লিশজন এমন ছিলেন যাদের মধ্যে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা ছিল। তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, দেখ! ফিকাহর মধ্যে আমি লাগাম লাগিয়ে দিয়েছি। তোমাদের জন্য গদি বা বসার আসনও বেঁধে দিয়েছি। এখন তোমরা আমার সহায়তা কর। অতঃপর কোন মাসয়ালার সম্মুখীন হলে তিনি তাদের সাথে আলোচনা করে নিতেন! যেসব হাদীছ কিংবা ছাহাবাদের মতামত তাদের জানা থাকত তারা তা বর্ণনা করতেন। ইমাম সাহেবও যা জানতেন তাও তিনি বর্ণনা করতেন। সেগুলো নিয়ে তাঁরা আলোচনা করতেন। কোন কোন সময় এমনও হত যে, কোন মাসয়ালার সিদ্ধান্তে পৌঁছতে এক মাস লেগে যেত। সবাই যখন একমত হতেন তখন তা লিপিবদ্ধ করা হত।
সীরাতুন্নুমান কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে, খতীবে বাগদাদী (রহঃ) ওকী ইবনুল জাররাহ (রহঃ)-এর জীবনী লিখতে গিয়ে বর্ণনা করেন, একবার কয়েকজন বিজ্ঞ আলেম তার নিকট সমবেত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্য হতে কোন একজন বললেন, অমুক মাসয়ালাটিতে ইমাম সাহেব ভুল করেছেন। এ কথা শুনতেই তিনি বলে উঠলেন, ইমাম সাহেব কিভাবে ভুল করতে পারেন অথচ তাঁর নিকট রয়েছেন, আবু ইউসুফ এবং যুফারের মত কিয়াস সম্বন্ধে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, ইয়াহয়া বিন যায়েদা, হাফছ বিন গিয়াস ও হাব্বানের মত হাদীছ বিশারদ, কাসেম বিন মাআনের ন্যায় ভাষাবিদ, যুহদ এবং তাকওয়ায় রয়েছেন দাউদ তায়ী এবং ফোযায়েল বিন আয়াবের মত ব্যক্তিত্ব। এমন লোক যাঁর সঙ্গে থাকে তিনি কি করে ভুল করতে পারেন? আর যদি তিনি ভুল করেও ফেলেন তবে এঁরা তাঁকে কি সে ভুলের উপর থাকতে দিবেন?
‘আলখাইরাতুল হিসাব’ নামক কিতাবে বর্ণিত রয়েছে এক ব্যক্তি ওকী (রহঃ)-এর নিকট বলল, আবু হানিফা ভুল করেছেন। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, এ ধরনের কথা যে বলে সে পশুর সমতুল্য বরং এর চেয়েও নিকৃষ্ট। তাঁর সাথে রয়েছেন আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মদের মত ফিকাহবিদ। ফোযায়েল এবং দাউদ তায়ীর মত যাহেদ, মুত্তাকী, অসংখ্য হাদীছ বিশারদ এবং ভাষাবিদ। যার নিকট এমন সব ব্যক্তিত্বের সমাবেশ তিনি কখনো ভুল করতে পারেন না। যদি ভুল। করেও বসেন তবে তারা তাঁকে সত্যমুখী করে দিবেন।
ইবনে মুবারক (রহঃ) বলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মজলিসে আমি সবসময়ই উপস্থিত হতাম। একবার হায়েযের একটি মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা শুরু হল। তিনদিন সকাল সন্ধ্যা সে মাসয়ালাটি নিয়ে আলোচনা চলল। তৃতীয়দিন সন্ধ্যার পূর্বক্ষণে সমস্বরে আল্লাহু আকবর বলে উঠলেন। এ তকবীর দ্বারা বুঝা যেত যে, মজলিসের সবাই কোন মাসয়ালায় একমত হয়েছেন।
একবার ইমাম যুফার (রহঃ) এশার নামাযের পর কোন একটি মাসয়ালার ব্যাপার তাঁর সন্দেহের কথা ইমাম সাহেবের নিকট পেশ করলেন। ইমাম সাহেব মাসয়ালার জবাব দিলেন। কিন্তু এতে তাঁর সন্দেহ নিরসন হল না। তারা যে মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা করছিলেন তা ফজরের সময় পর্যন্ত স্থায়ী হল। ইমাম সাহেব যে মত প্রকাশ করেছিলেন শেষ পর্যন্ত তাই সঠিক বলে প্রমাণিত হল।
ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, ইসলামের মধ্যে ইমাম আবু হানিফার ষাট হাজারটি মত রয়েছে। অর্থাৎ তাঁর এত সংখ্যক ফিকহী মাসয়ালা রয়েছে। আরেকটি নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম সাহেব তিরাশি হাজার মাসয়ালা লিপিবদ্ধ করেছেন। তন্মধ্যে আটত্রিশ হাজার মাসয়ালা ইবাদত সম্পর্কিত এবং পঁয়তাল্লিশ হাজার মাসয়ালা মু’আমালাত বা আচার-আচরণ ও লেন-দেন সম্পর্কিত। যেহেতু ইমাম মালেক (রহঃ) তাঁর সময়ের ইমাম ছিলেন এবং মদীনায় অবস্থান করতেন যেখানে মুহাদ্দেছগণের আগমন আবশ্যকীয় ছিল; সেহেতু ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিসের মুহাদ্দেছগণও সেখানে আগমন করতেন। তাদের সাথেও ইমাম মালেক (রহঃ)-এর সাক্ষাৎ হত। তাঁদের থেকে শ্রুত মাসয়ালার সংখ্যাই ইমাম মালেক (রহঃ) এখানে উল্লেখ করেছেন। এ কারণেই তিনি সন্দেহসূচক কোন শব্দ ব্যবহার করেন নাই।
ইমাম মালেক (রহঃ)-এর এ বাণীতে একটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হল তিনি ইমাম সাহেবের মাসয়ালার সংখ্যা উল্লেখ করার সময় কোন প্রকার বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নাই। এতে বুঝা যায় ইমাম সাহেবের মাসয়ালাসমূহ কোরআন ও সুন্নাহর সমর্থিত ছিল। যদি কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী হত তবে ইমাম মালেক (রহঃ) অবশ্যই সেটা প্রকাশ করতেন। অন্ততঃপক্ষে নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন। অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা তো দূরের কথা বরং সেগুলোর উপর তাঁর অগাধ আস্থা ছিল।
মুহাম্মদ বিন উমর, আল ওয়াকেদী বর্ণনা করেন, ইমাম মালেক (রহঃ) অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মতামত অনুসন্ধান করতেন। অধিকাংশ সময়ে তার মতানুসারে ফতোয়া দিতেন। যদিও তিনি তা প্রকাশ করতেন না। এ কারণেই তাঁদের উভয়ের মত ও রায়ের মধ্যে এত মিল ও সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
প্রশ্ন জাগতে পারে ইমাম সাহেব এবং তাঁর শিষ্যদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণ কি? এ প্রশ্নের উত্তর সহল বিন মুযাহেমের কথা থেকেই বুঝা যাবে। তিনি বলেন, যে সব মাসয়ালায় ইমাম সাহেবের সাথে ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর মতবিরোধ হয়েছে তার কারণ ছিল ইমাম সাহেব যে দলীলের ভিত্তিতে কোন মাসয়ালায় স্বীয় মত প্রকাশ করেছেন সে দলীলের গুরুত্ব ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) অনুধাবন করতে পারেননি।
মূলতঃ ইমাম সাহেবের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই গভীর ছিল। ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) স্বয়ং বর্ণনা করেন, যে সব মাসয়ালায় ইমাম সাহেবের মতের সাথে আমার মত মিলে যেত, সেসব ক্ষেত্রে আমার অন্তরে শক্তি এবং নূর সৃষ্টি হত। আর যেসব ক্ষেত্রে তার মত আমি গ্রহণ করি নাই সেসব ক্ষেত্রে পাহাড় পরিমাণ দুর্বলতা এবং সন্দেহ থেকে যেতো।
একটু চিন্তা করলেই মতভেদের কারণ বুঝে এসে যাবে। যে সকল মাসয়ালার গবেষণার সময় ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) অনুপস্থিত ছিলেন, ইমাম সাহেবের উপস্থাপিত প্রমাণাদি শুনতে পান নাই সে সব মাসয়ালাতেই ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) নিজে ইজতিহাদ করার মুখাপেক্ষী হয়েছেন। সে সকল মাসয়ালা হতে যেগুলোর মধ্যে ইমাম সাহেবের মতের সাথে তাঁর মতের মিল হয় নাই সেগুলোতেই মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। আর যে সকল মাসয়ালার গবেষণার সময় তিনি উপস্তিত ছিলেন সেগুলোতে মতানৈক্য হওয়ার প্রশ্নই আসে না কারণ সেখানে এই নীতি নির্ধারিত ছিল যে, যে পর্যন্ত সবাই কোন মাসয়ালায় একমত না হবেন সে পর্যন্ত তা লিপিবদ্ধ করা হবে না। এ কারণেই কোন মাসয়ালায় এক মাস যাবৎও আলোচনা হত।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর মত ব্যক্তিত্ব কোন মাসয়ালার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করবেন আর ইমাম সাহেব সেদিকে কর্ণপাত না করে সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন তা কখনো হতে পারে না।
প্রশ্ন হতে পারে, যেহেতু ইমাম সাহেব এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই হানাফী মাযহাব অবলম্বনকারীদের উচিত শুধুমাত্র ইমাম সাহেবের মতানুসারে আমল করা। অথচ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় তাঁর মত বাদ দিয়ে আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর মতানুসারে ফতোয়া দেওয়া হয় এবং তদনুযায়ী আমল করা হয়। এর কারণ কি?
এ প্রশ্নের জবাবে বলা যেতে পারে যে, যদি কোন মাসয়ালায় আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর মতানুসারে আমল করা হয় তবে পক্ষান্তরে ইমাম সাহেবের মতানুসারেই আমল করা হয়। কারণ তাঁর একাধিক মত হতেই ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) একটি গ্রহণ করেছেন। তাঁর স্বীয় মত প্রকাশ করেননি।
মূলতঃ ব্যাপার এই যে, কোন দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে ইমাম সাহেব কোন মত প্রকাশ করেছেন। পরবর্তীতে এমন হয়েছে যে, সে মতের বিপরীত অধিক শক্তিশালী কোন দলীল প্রমাণ তিনি পেয়েছেন। তাই তিনি পূর্ববর্তী মত হতে প্রত্যাবর্তন করে আরেকটি নতুন মত ব্যক্ত করেছেন। এভাবে তাঁর একাধিক মতের সৃষ্টি হয়েছে। সে মতগুলো হতে ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর নিকট যেটি অধিক যুক্তিযুক্ত এবং প্রামাণ্য সাব্যস্ত হয়েছে তিনি সেটিই ব্যক্ত করেছেন। এখন যে মতটি আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর নিকট অধিক প্রামাণ্য সেটিকে যদি ইমাম সাহেবের নিকটও অধিক যুক্তিযুক্ত বলা হয় তবে তা অত্যুক্তি বা ভুল হবে
কারণ ইমাম সাহেব বলেছেন, যখন কোন হাদীছ সঠিক বলে প্রমাণিত হয় তবে ধরে নিবে যে, সেটাই আমার মাযহাব।
কাজেই ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর নিকট হাদীছ সহীহ প্রমাণিত হওয়ার কারণে তিনি যে মতটি অবলম্বন করেছেন সেটিকে ইমাম সাহেবের মাযহাব বললেও ভুল হবে না বরং তা বলাই যুক্তিসঙ্গত। তাই কোন মাসয়ালায় আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর অনুসরণ করা দ্বারা আবু হানিফা (রহঃ)-এরই অনুসরণ করা হয়।
উপরোল্লেখিত আলোচনা দ্বারা বুঝা যায় যে, অসংখ্য মুহাদ্দেছ ও হাদীছ বিশারদের উপস্থিতিতে ইমাম সাহেব কোরআন এবং হাদীছ গবেষণা করে মাসয়ালা বের করতেন এবং তাদের মতামত সাপেক্ষে তা সঙ্কলন করতেন।
নিম্নে ফিকহে হানাফী সম্বন্ধে বিশিষ্ট মুহাদ্দেছ ও হাদীছ বিশারদগণের বাণী উল্লেখ করা হচ্ছে, যা দ্বারা ফিকহে হানাফী সম্বন্ধে তাঁদের অধিক আস্থা প্রকাশ পাচ্ছে।
আব্দুল্লাহ বিন দাউদ বলেন, কেউ যদি চায় যে, অজ্ঞতার অপমান হতে বের হয়ে ফিকহ অর্জন করবে সে যেন আবু হানিফার কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করে।
ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) প্রায়ই বলতেন, আমি ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) হতে এক উটের বোঝা পরিমাণ ইলম অর্জন করেছি।
আবু উবাইদ কাসেম বিন সালাম ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি ফিকাহ শিখতে আগ্রহী সে যেন আবু হানিফার শিষ্যদের সঙ্গ অবলম্বন করেন। খোদার কসম! আমি শুধুমাত্র আবু হানিফার কিতাব পাঠ করেই ফকীহ হয়েছি। তাঁর যামানায় আমি থাকলে কখনো তাঁর শিক্ষা মজলিস তাগ করতাম না।
একবার আব্দুল্লাহ বিন মুবারক হাসান বসরী হতে বর্ণনা করেন, তোমরা লক্ষ্য রেখো কার থেকে হাদীছ শিখছ। কারণ তা তোমাদের দ্বীন।
এ রেওয়ায়াত বর্ণনা করার পর ইবনে মুবারক (রহঃ) বললেন, যে ক্ষেত্রে হাদীছ নির্ভরযোগ্য লোকদের থেকে গ্রহণ করা অবশ্যক সে ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের থেকেই ফিকহ গ্রহণ করা চাই। অতঃপর বললেন, যদি কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী তোমার নিকট আবু হানিফার কোন মত বর্ণনা করে তবে সেটি গ্রহণযোগ্য মনে করো।
আবু ইসহাক বলেন, তাদের জন্য আমার করুণা জাগে যাদের আবু হানিফার ইলমের কোন অংশই নসীব হয়নি।
আব্দুল আযীয বিন খালেদ ছাফ্ফানী বর্ণনা করেন, আমি আবু হানিফার কিতাব তাঁর থেকেই পাঠ করেছি। পাঠ শেষে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি কি এ সমস্ত কিতাব আপনার থেকে রেওয়ায়াত করব? তিনি তার অনুমতি প্রদান করলেন।
হাফছ বিন গিয়াস বলেন, আমি আবু হানিফা থেকে তাঁর কিতাব পাঠ করেছি, তাঁর থেকে ‘আছার’ শুনেছি। তাঁর চেয়ে অন্য কাউকে মেধাবী পাইনি। আহকামের ব্যাপারে বিশুদ্ধ ভুল সম্বন্ধে তিনি সর্বাধিক অবগত ছিলেন।
ইয়াহয়া বিন আকছাম বলেন, ওহাব বিন জরীরকে আমি বলতে শুনেছি, আমার পিতা জরীর বিন আছেম আমাকে আবু হানিফার কিতাব অধ্যয়ন করার প্রতি অনুপ্রাণিত করতেন। তিনি ইমাম সাহেবের হালকায় অংশ নিতেন।
মুহাম্মদ বিন দাউদ বর্ণনা করেন, একবার আমি ঈসা বিন ইউনুসের নিকট গেলাম। দেখতে পেলাম তিনি তাঁর সম্মুখে আবু হানিফার কিতাব নিয়ে পাঠ করছেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি তাঁর থেকে রেওয়ায়াত করেন? তিনি বললেন, তাঁর জীবদ্দশায় আমি তাঁর উপর সন্তুষ্ট ছিলাম। তাঁর মৃত্যুর পর কি তাঁর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যাব?
মারূফ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, একবার আমি আলী বিন আছেমের নিকট গিয়েছিলাম। তিনি তাঁর শাগরেদদেরকে বললেন, তোমরা ফিকাহ এবং ইলম শিক্ষা কর। আমরা বললাম, আপনার নিকট যা শিখেছি তা ইলম নয়? তিনি বললেন, ইলমের কথা যদি বল তবে তা হচ্ছে আবু হানিফার ইলম। ইমাম সাহেবের প্রতি আলী ইবনে আছেমের যথেষ্ট ভালবাসা ছিল। তাঁর শাগরেদবৃন্দ যদি কখনো তাঁকে সন্তুষ্ট করতে চাইতেন তবে ইমাম সাহেবের আলোচনা তুলে দিতেন। তিনি আনন্দের সাথে ইমাম সাহেবের গুণাবলী এবং ঘটনাসমূহ বর্ণনা করতেন।
তিনি বলেছেন, ইমাম সাহেবের ইলমের সাথে যদি তাঁর সমকালীন সবার ইলম পরিমাপ করা হয় তবে তাঁর ইলমই অধিক হবে। তিনি এও বলতেন, যে ব্যক্তি আবু হানিফার মতামত শিখবে না, অজ্ঞতার কারণে সে ব্যক্তি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করে দিবে এবং সে গোমরাহ হয়ে যাবে।
মুহাম্মদ বিন সা’দান বর্ণনা করেন, একবার ইয়াহয়া বিন মা’য়ীন, আলী ইবনুল মদনী, আহমদ বিন হাম্বল, যুহাইর বিন হারব প্রমুখসহ আমরা কয়েকজন ইয়াযীদ বিন হারুনের নিকট উপস্থিত ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি এসে তাঁর নিকট কোন মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আহলে ইলমদের নিকট যাও।
আলী ইবনুল মদনী জিজ্ঞাসা করলেন, সে কি আপনার নিকট আসেনি। অর্থাৎ আপনি নিজেই তো, আহলে ইলমের অধিকারী। তিনি বললেন, আবু হানিফার সঙ্গী-শাগরেদরাই হচ্ছে আহলে ইলম। আর তোমরা হচ্ছ আত্তার। (ঔষধ বিক্রেতা)।
তার এ কথা দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, আমল করার জন্য তিনি ফিকহকে বিশেষ করে ফিকহে হানাফীকে আবশ্যকীয় মনে করতেন। হাদীছের জ্ঞান যে পরিমাণই হোক না কেন ফতোয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
ইয়াযীদ বিন হারুনকে আবু মুসলিম জিজ্ঞাসা করলেন, আবু হানিফা এবং তাঁর কিতাবসমূহ সম্বন্ধে আপনার মতামত কি? তিনি বললেন, তুমি যদি চাও যে, ফিকহ এবং বুদ্ধিমত্তা অর্জন করবে তবে তাঁর কিতাব অধ্যয়ন কর। কোন ফকীহকে তার মত ও রায়কে অপছন্দ করতে দেখিনি। সুফিয়ান ছাওরী কৌশলে তাঁর ‘কিতাবুর রেহন’ নামক কিতাবটি হস্তগত করে সেটি নকল করে নেন।
জনৈক ব্যক্তি ইয়াযীদ বিন হারুনকে জিজ্ঞাসা করল, মানুষ কখন ফতোয়া দেওয়ার যোগ্য হয়? তিনি বললেন, যখন আবু হানিফার মত হবে। অতঃপর বললেন, প্রত্যেকেই তার ইলম এবং কিতাবের মুখাপেক্ষী। সেগুলো দ্বারা মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পায়।
মুহাম্মদ বিন ইয়াযীদ বলেন, আমি প্রায়শঃ আমের (রহঃ)-এর নিকট যেতাম। একবার তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আবু হানিফার কিতাবসমূহ পড়েছ? আমি বললাম, আমি হাদীছ শিখেছি। তাঁর কিতাবের আমার কি প্রয়োজন? তিনি বললেন, সত্তর বছর যাবৎ আমি আছার (হাদীছ) শিখেছি। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আবু হানিফার কিতাব পড়ি নাই ভালভাবে ইস্তিঞ্জা করার পদ্ধতিও জানতে পারি নাই।
আতিয়্যা বিন আসবাত বলেন, ইবনে মুবারক যখনই কুফায় আগমন করতেন, যুফার (রহঃ) হতে ইমাম সাহেবের কিতাব ধার নিয়ে সেগুলো নকল করে নিতেন। অনেকবারই তিনি এরূপ করেছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল যে, ফিকহ সম্বন্ধে ইমাম মালেক (রহঃ) অধিক জ্ঞাত, না কি ইমাম সাহেব? তিনি বললেন, ইমাম সাহেব ফিকহ সম্বন্ধে সর্বাধিক জ্ঞাত।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, যে মাসয়ালায় তিন ব্যক্তি একমত হয়েছে এর বিপরীত কোন কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল সে তিন ব্যক্তি কে কে? তিনি বললেন, আবু হানিফা, আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মদ বিন হাসান (রহঃ)।
মুহাম্মদ বিন তালহা (রহঃ) বলেন, যদি কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর মাধ্যমে তোমার নিকট আবু হানিফা (রঃ)-এর কোন বাণী এসে পৌঁছে তবে তার উপর নির্দ্বিধায় নির্ভর করতে পার। কারণ তাঁর কথা সবসময়ই নির্ভরযোগ্য হয়ে থাকে। আমাদের নিকট যে কিতাব দেখছ এতে ইমাম সাহেবের নির্ভরযোগ্য বাণী রয়েছে। যেগুলো বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর মাধ্যমে আমাদের নিকট পৌঁছেছে।
ইয়াযীদ বিন হারুন বলেন, ফিকহশাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফার তুল্য কেউ ছিল বলে শোনা যায় নাই। জ্ঞানী বুদ্ধিমানরাই তাঁর মতামত পছন্দ করে এবং সেগুলো আয়ত্ব করে।
ইমাম সাহেবের দৃষ্টিতে হাদীছ ও ইজতিহাদ
ইমাম আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রহঃ) বলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) শুধুমাত্র সেসব হাদীছই গ্রহণ করতেন যেগুলো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে নির্ভুলভাবে বর্ণিত হয়ে এসেছে। নাসেখ (রহিতকারী) ও মনসুখ (রহিত) সম্পর্কে যথেষ্ঠ জ্ঞান রাখতেন। সবসময়ই নির্ভরযোগ্য রাবীদের হাদীছ অনুসন্ধান করতেন। কূফার উলামাদের যে সমস্ত আমল সঠিক পেতেন সেগুলো তিনি অনুসরণ করতেন। এতদসত্ত্বেও মানুষ তার সমালোচনা করলে আমরা নীরবতা অবলম্বন করতাম, আর তজ্জন্য থেকে তা ইস্তেগফার করতাম।
তিনি আরো বলেন, আবু হানিফা (রহঃ) বলতেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করা হবে। ছাহাবাদের মধ্যে কোন মাসয়ালা যদি মতভেদ দেখা যায় তবে তাঁদের কোন একটি মত গ্রহণ করা হবে। তাদের মতের বাইরে যাওয়া যাবে না। আর তাবেয়ীদের সাথে। আমরাও ইজতিহাদ করব।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলেন, যখন কোন ঘটনা সামনে আসত ইমাম সাহেব আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করতেন, এ সম্পর্কিত কোন আছর তোমাদের জানা আছে কি? যদি আমাদের নিকট কিংবা তাঁর নিকট কোন আছর তথা ছাহাবীর মত থাকত তবে সেটাই গ্রহণ করা হত। আর যদি ছাহাবাদের মতের মধ্যে বিরোধ থাকত তবে অধিকাংশের মত গ্রহণ করা হত। আর যদি কোন আছর পাওয়া না যেত সেক্ষেত্রে কিয়াস করতেন। আর যদি কিয়াসও দুষ্কর হয়ে যেত তবে তখন ইসতিহসান দ্বারা ফয়সালা করতেন।
কোন মাসয়ালা উপস্থিত হলে ইমাম সাহেব তাঁর শাগরেদদেরকে তৎসম্পর্কিত আছর জিজ্ঞাসা করতেন। কারণ এ নয় যে, সে সম্পর্কিত কোন আছর তার জানা নেই। যদি এমন হত তবে দূর-দূরান্ত হতে মুহাদ্দেছগণ তাঁর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য আগমন করতেন না। যে ব্যক্তি প্রতিটি মাসয়ালায় শাগরেদদের মুখাপেক্ষী হয় তার নিকট তাদের কি ফায়দা? বরং শাগরেদরাই বলতেন, জনাব! প্রতিটি মাসয়ালায়ই আপনি উল্টো আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন তবে আপনার শিক্ষকতা কোন্ ক্ষেত্রের জন্য?
বস্তুতঃ কয়েকটি কারণে ইমাম সাহেব তাঁর শাগরেদদেরকে জিজ্ঞাসা করতেন। তন্মধ্যে একটি কারণ হল তাদের প্রত্যেকের হাদীছ সম্বন্ধে জ্ঞানের পরিধি পরিমাপ করা। আর কোন হাদীছ দ্বারা কোন মাসয়ালার হুকুম সাব্যস্ত করে তা প্রত্যক্ষ করা।
আরেকটি উদ্দেশ্য হল, ছাত্রদের হিম্মত ও সাহস বৃদ্ধি করা। যেন চিন্তা-ভাবনা করে প্রত্যেকেই তার জানা হাদীছ এবং আছারের মধ্য হতে সে মাসয়ালা সম্পর্কিত নির্দেশ বের করার প্রয়াসী হয়। এতে তাদের মধ্যে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে।
তৃতীয়তঃ, প্রত্যেকেই তার চিন্তাভাবনা উপস্থাপনা করার ফলে সে মাসয়ালায় তাদের পূর্ণ জ্ঞান অর্জিত হবে। এ কারণেই আ’মাশ (রহঃ)-কে কোন ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, আবু হানিফার মজলিসে যাও। সেখানে তাদের পারস্পরিক আলোচনার কারণে মাসয়ালাটি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
হাসান বিন যিয়াদ বলেন, ইমাম সাহেব বলতেন, যদি কোন মাসয়ালার ব্যাপারে কোরআনের নির্দেশ কিংবা হাদীছ অথবা ইজমা পাওয়া যায় তবে কারো জন্য স্বীয় রায় মোতাবেক কিছু বলা বৈধ হবে না। আর যদি কোন বিষয়ে ছাহাবাদের মতভেদ হয় তবে তন্মধ্য হতে যেটি কোরআন হাদীছের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ আমরা সেটাই গ্রহণ করব। আর যদি এরূপ কোন কিছু পাওয়া না যায়, তাহলে আমরা ইজতিহাদ করব। কারণ, ফকীহদের ইজতিহাদ করার সুযোগ রয়েছে; যদি তারা ইখতিলাফ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান রাখে এবং সঠিকভাবে কিয়াস করার যোগ্যতা রাখে। সলফে সালেহীন বা সুযোগ্য পূর্বসূরিদের নিয়ম এটাই ছিল।
আবু হামযা বলেন, আমি আবু হানিফা (রহঃ)-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, কোন মাসয়ালায় যদি কোন হাদীছ পাওয়া যায় তবে তার বিপরীতে আমরা কারো মতামত গ্রহণ করি না। শুধুমাত্র হাদীছই গ্রহণ করি। আর যদি ছাহাবাদের থেকে বিভিন্ন মত বর্ণিত থাকে, তবে সেখান থেকে যে কোন একটি মত গ্রহণ করি।
আব্দুল করীম বিন হেলাল বলেন, আমি আবু হানিফাকে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের যে নির্দেশ আমাদের নিকট পৌঁছে সেটিকে আমরা অতিক্রম করে যাই না। আর যে বিষয়ে ছাহাবাদের মতভেদ রয়েছে, সেখান থেকে আমরা যে কোন একটি মত গ্রহণ করি। ছাহাবা ব্যতীত অন্য কারো মত হলে আমরা যদি সমীচীন মনে করি তবে তা গ্রহণ করি; অন্যথায় প্রত্যাখ্যান করি।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলেন, একবার আমাশ (রহঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হল। তিনি আমাকে বললেন, তোমাদের উস্তাদ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বিরোধিতা করেছেন। কারণ তাঁর মতে কোন দাসীকে বিক্রয় করলে তালাক হয় না। অথচ ইবনে মাসউদ (রাঃ) দাসীর বিক্রয়টাকেই তালাক মনে করে থাকেন।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলেন, আমি বললাম, আপনার থেকে আমাদের নিকট রেওয়ায়াত পৌঁছেছে যে, দাসীকে বিক্রয় করাটা তালাক নয়। তিনি বললেন, কিভাবে? আমি বললাম, আপনি ইব্রাহীমের মাধ্যমে আসওয়াদ হতে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন, আয়েশা বারীয়াকে ক্রয় করার পর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে এখতিয়ার (স্বামীর বিবাহে থাকা, না থাকার অনুমতি) দিয়েছিলেন। এখন আপনিই বলুন যদি বিক্রয় করা দ্বারাই তালাক হয়ে যায় তবে এখতিয়ার দেওয়ার কি অর্থ হতে পারে? তিনি বললেন, এ হাদীছটি কি এ ব্যাপারে? আমি বললাম, জী হ্যা! তিনি বললেন, বস্তুতঃ আবু হানিফার হাদীছ প্রয়োগের স্থান ভালভাবেই জ্ঞাত। ইবনে মাসউদ (রাঃ) একজন বিশিষ্ট ছাহাবী এবং ইমাম সাহেবের উস্তাদ। কিন্তু মর্যু হাদীছ থাকার কারণে তিনি তাঁর মত গ্রহণ করেন নাই।
আহমদ বিন ইউনুস বলেন, আবু হানিফা (রহঃ) সহীহ হাদীছ অনুসরণ করার প্রতি খুবই গুরুত্ব দিতেন।
ফোযায়েল বিন আয়ায (রহঃ) বলেন, কোন মাসয়ালায় কোন সহীহ হাদীছ পাওয়া গেলে ঐটির অনুসরণ করাই ছিল ইমাম আবু হানিফার রীতি।
ওহাব (রহঃ) বলেন, আব্দুল আযীয বিন রিযমা ইমাম সাহেবের হাদীছের জ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বললেন, একবার কূফায় একজন মুহাদ্দিছ এসেছিলেন। ইমাম সাহেব তাঁর মজলিসের সদস্যদের বললেন, তোমরা জেনে দেখ তো তাঁর নিকট এমন কোন হাদীছ আছে কি না যা আমাদের নিকট নাই। পরে অন্য এক মুহাদ্দিছ আগমন করলেন। তখনো তিনি তদ্রুপ বললেন।
জনৈক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রহঃ)-কে বললেন, হাদীছে বর্ণিত রয়েছে আহলে রায়গণ হচ্ছে সুন্নাতের দুশমন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য আবু হানিফা।
ইবনে মুবারক (রহঃ) বললেন, সুবহানাল্লাহ! আবু হানিফা সব সময়ই সুন্নাত মুতাবেক আমল করতে চেষ্টা করতেন। সুন্নতের বাইরে কোন আমল করতেন না। তিনি সুন্নতের দুশমন কি করে হতে পারেন? এ হাদীছ দ্বারা তাদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা প্রবৃত্তির দাস, কলহপ্রিয়। যারা কিতাবুল্লাহ এবং সুন্নতে রাসূল পরিত্যাগ করে নিজেদের প্রবৃত্তির আনুগত্য করে।
উসূলে বয়দভী কিতাবে রয়েছে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মতে সুন্নতের এ শক্তি রয়েছে যে, তার দ্বারা কিতাবুল্লাহকে মনসূখ করা যাবে। হাদীছ যদিও মুরসাল হয় তবুও তদানুযায়ী তিনি আমল করেন। মজহুল বা অজানা ব্যক্তির রেওয়ায়াতকে তিনি কিয়াসের তুলনায় অগ্রগণ্য বলে মনে করেন। কিয়াসকে তিনি কোন ছাহাবার মতের উপর অগ্রাধিকার দেন না। কারণ, সম্ভাবনা রয়েছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেই তা বলেছেন।
ইবনে হযম বলেন, আবু হানিফার শাগরেদরা এতে একমত যে, তার নিকট একটি দুর্বল হাদীছও কিয়াস হতে অগ্রগণ্য।
যুফার (রহঃ) বলেন, বিরোধীদের কথার প্রতি কখনো কর্ণপাত করো না। ইমাম সাহেব যা কিছু বলেছেন তা তিনি কিতাবুল্লাহ অথরা সুন্নতে রাসূল অথবা ছাহাবাদের বাণী থেকে বলেছেন। এরপরই তিনি এগুলোর উপর কিয়াস করেছেন।
উসূলে বয়দভীর ব্যাখ্যা কাশফুল আসরার এ ইয়াহয়া বিন আদম হতে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোরআনের আয়াতের মতই হাদীছের মধ্যে নাসেখ-মনসুখ রয়েছে। নু’মান (অর্থাৎ ইমাম সাহেব) সমস্ত হাদীছের মধ্যে গবেষণা করে যেসব হাদীছ সংগ্রহ করেছেন সেগুলো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষভাগে প্রকাশ পেয়েছে। সে অনুযায়ীই তিনি ফতোয়া দিয়েছেন।
হাসান বিন সালেহ বলেন, ইমাম সাহেব হাদীছের নাসেখ এবং মনসুখ অনুসন্ধান করতেন। যে হাদীছটি তাঁর নিকট প্রমাণিত সে হাদীছ অনুসারেই তিনি আমল করতেন। চাই তা মরফু হাদীছ অর্থাৎ স্বয়ং রাসূলে আকরাম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী হোক কিংবা ছাহাবীর বাণী হোক। তিনি বলতেন, কোরআনের মত হাদীছের মধ্যেও নাসেখ-মনসুখ রয়েছে। হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বশেষ কার্যাবলী সম্বন্ধে তিনি সম্যক অবগত ছিলেন, যেগুলো তার শহরে পৌঁছেছে।
খতীবে বাগদাদী আবু নায়ীম হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি যদি কখনো ইমাম যুফার (রহঃ)-এর নিকট দিয়ে যেতাম তিনি ডেকে বলতেন, আস তোমার হাদীছগুলোকে যাচাই করি। আমি আমার হাদীছগুলো তাঁর নিকট পেশ করলে তিনি বলতেন, অমুক হাদীছটি গ্রহণযোগ্য, অমুকটি গ্রহণযোগ্য নয়। অমুকটি নাসেখ আর অমুকটি মনসুখ।
এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম সাহেবের মজলিসে সকল হাদীছই যাচাই করা ছিল যে, অমুকটি নাসেখ অমুকটি মনসুখ।
ইব্রাহীম বিন সুলাইমান যাইয়াত বলেন, ইসরাঈলের সামনে ইমাম সাহেবের আলোচনা উঠল। তিনি বললেন, এ সময়ে মানুষ যে সমস্ত বিষয়ের মুখাপেক্ষী সে সম্বন্ধে তিনি সবচেয়ে বেশী জ্ঞাত।
এ কথা তো সুস্পষ্ট যে, মানুষ সে সময় সহীহ হাদীছ এবং আছর দ্বারা প্রমাণিত মাসয়ালারই মুখাপেক্ষী ছিল সবচেয়ে বেশী। ইসরাঈলের সাক্ষ্য দ্বারা বুঝা যায়, ইমাম সাহেব সে সম্বন্ধে সবচেয়ে বেশী জ্ঞাত ছিলেন।
হাফছ বিন গিয়াস বলেন, আমি ইমাম সাহেব থেকে তাঁর কিতাবাদি এবং আছার শ্রবণ করেছি। তিনি খুবই বুদ্ধিমান এবং মেধাবী ছিলেন। আহকাম সম্পর্কিত আছার সম্বন্ধে তাঁর চেয়ে অধিক জ্ঞাত আর কাউকে দেখিনি।
হযরত আবু বকর ছিদ্দীক (রাঃ)-এর মতের উপর আমল করার ব্যাপারে ইমাম সাহেব সবচেয়ে বেশী প্রয়াসী ছিলেন। সর্বপ্রকার কাজ-কর্ম এবং চাল-চলনে বিশেষভাবে তাঁর অনুকরণ করতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। যেমনি ভাবে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক (রাঃ)ফিকাহ্, তাকওয়া, যুহদ, দানশীলতা, ইবাদত, রিয়াযতে সমস্ত ছাহাবার ঊর্ধ্বে ছিলেন, তদ্রপ ইমাম সাহেবও এসব গুণাবলীতে তাঁর সমকালীন সবার ঊর্ধ্বে ছিলেন। এমনকি যেমনি ভাবে মক্কা নগরীতে হযরত আবু বকর (রাঃ) কাপড়ের ব্যবসা করতেন, তদ্রুপ ইমাম সাহেবও কাপড়ের ব্যবসা করতেন। এছাড়াও ইমাম সাহেব অনেক বিষয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুসরণ করতেন।
যেমনিভাবে যথেষ্ট পরিমাণ হাদীছ জানা থাকা সত্ত্বেও তিনি খুবই অল্পসংখ্যক হাদীছ বর্ণনা করেছেন, তদ্রুপ ইমাম সাহেবের বহু সংখ্যক হাদীছ জানা থাকা সত্ত্বেও সামান্য সংখ্যক হাদীছ বর্ণনা করেছেন। যার ফলে বিরোধীদের এ কথা বলার সুযোগ হয়েছে যে, তিনি মোটেই হাদীছ জানতেন না।
যেমনিভাবে তিনি প্রত্যেক ব্যাপারে ছাহাবাদের হাদীছ জিজ্ঞাসা করতেন, তেমনি করে ইমাম সাহেবও তাঁর শাগরেদদের হাদীছ জিজ্ঞাসা করতেন।
যেমনি ছিদ্দীকে আকবর (রাঃ) কোরআন মজীদ জমা করে হিফাযত করে গিয়েছেন তদ্রুপ ইমাম সাহেবও ফিকাহ্ সংকলন করে হাদীছ হিফাযত করেছেন।
যেরূপে ছিদ্দীকে আকবর (রাঃ) স্বীয় রায় এবং কিয়াস দ্বারা যাকাত অস্বীকারকারীদের কতলের ফতোয়া দিয়েছেন এবং সহীহ হাদীছ পেশ করা সত্ত্বেও তিনি স্বীয় মতে অটল ছিলেন। কোন ছাহাবীর বাধা মানেন নাই; তদ্রুপ ইমাম সাহেবও প্রয়োজনের সময় স্বীয় রায় দ্বারা কিয়াস করতেন; কোন আহলে হাদীছের বিরোধীতার প্রতি ভূক্ষেপ করতেন না। যেমনিভাবে ন্যায়পরায়ণগণ ছিদ্দীকে আকবরের রায় মেনে নিয়েছেন তদ্রুপ ইমাম সাহেবের রায়ও তারা মেনে নিয়েছেন।
মোদ্দাকথা, ছিদ্দীকে আকবরের সাথে তাঁর একটি বিরাট সাদৃশ্য ও মিল ছিল, যার ফলে ছিদ্দীকদের মধ্যে যেমনিভাবে তাঁকে ছিদ্দীকে আকবর (মহান ছিদ্দীক) বলা হত, তদ্রুপ ইমাম সাহেবকেও-ইমামদের মধ্যে ইমামে আযম (মহান ইমাম) বলা হত।
কোন মহান ব্যক্তিত্বের সাথে এরূপ মিল হওয়া আল্লাহ তাআলার বিশেষ দান। তিনি যাকে চান তাঁকে এ মর্যাদা দান করেন।
আবু গাসসান বলেন, আমি ইসরাঈলকে এ কথা বলতে শুনেছি, নু’মান উত্তম ব্যক্তি ছিলেন। ফিকহী মাসয়ালা সম্পর্কিত অনেক হাদীছ তাঁর জানা ছিল। এ ধরনের হাদীছ তিনি খুবই অনুসন্ধান করতেন।
ইয়াহয়া বিন আব্দুল্লাহ বলেন, জনৈক মুহাদ্দিছ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, আমি ইমাম সাহেবের নিকট পাঁচশত মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি প্রত্যেকটি মাসয়ালার ব্যাপারে ফতোয়া দিলেন। অতপর আমি সুফিয়ান ছাওরীর নিকট জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি প্রত্যেকটি মাসয়ালা সম্পর্কিত একটি করে হাদীছ শুনিয়ে দিলেন।
এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম সাহেবের কোন ফতোয়াই হাদীছের পরিপন্থী ছিল না। তাঁকে মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি শুধুমাত্র উত্তর দিয়ে যেতেন; হাদীছ বর্ণনা করতেন না। কিন্তু তিনি যে জবাব দিতেন তা হাদীছ মোতাবেকই হত; হাদীছের পরিপন্থী ছিল না।
আসাদ বিন আমর বলেন, ইমাম সাহেব বলতেন, যখন আমি তোমাদের নিকট এমন কোন কথা বলি যে সম্পর্কে ছাহাবাদের থেকে কোন রেওয়ায়াত পাওয়া না যায় তবে রেওয়ায়াত না পাওয়া পর্যন্ত তালাশ করতে থাক। একদিন তিনি বললেন, কোন স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বলে তিন মাস পর্যন্ত আমি তোমার নিকট যাব না তবে তার দ্বারা ঈলা সাব্যস্ত হবে না। এ সম্পর্কিত কোন আছর তিনি উল্লেখ করেন নাই। বরং বললেন, তোমরা এ সম্পর্কিত আছর তালাশ করে বের কর। দীর্ঘদিন পর সায়ীদ বিন আরুবাকে আমরা এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ইবনে আব্বাছ (রাঃ)-এর বাণী রয়েছে তিনি বলেছেন, যদি কোন ব্যক্তি কসম করে যে, তিন মাস পর্যন্ত তার স্ত্রীর নিকট যাবে না তবে এর দ্বারা ঈলা সাব্যস্ত হবে না। এ কথা শুনে আমরা ইমাম সাহেবকে সুসংবাদ দিলাম যে, আপনি যে ফতোয়া দিয়েছেন তা ইবনে আব্বাছ (রাঃ)-এর আছর দ্বারাও সাব্যস্থ ও প্রমাণিত হয়।
আমরা ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম, জনাব! এ কথাটা আমাদেরকে বলুন যে, তিনি কোন দলীলের ভিত্তিতে তাঁর মত প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বললেন, এ সেই আয়াত দ্বারা।
অর্থাৎ “যারা আপন স্ত্রীদের সাথে ঈলা করে তাদেরকে চার মাস অপেক্ষা করতে হবে”।
এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম সাহেব যখন কোন ফতোয়া দিতেন তখন কোন দলীলের ভিত্তিতেই ফতোয়া দিতেন।
আমর বিন হারুন বলেন, আমি ইবনে জুরাইজকে বলতে শুনেছি, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) মজবুত কোন দলীল ব্যতীত ফতোয়া দিতেন না। এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, প্রতিটি মাসয়ালার ব্যাপারেই তাঁর এ নিয়ম ছিল।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রহঃ) বলেন, আমি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছি। অনেক নাম করা আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। কিন্তু ইমাম সাহেবের সাহচর্যে আসার পূর্বে আমি হালাল হারামের নিয়ম-নীতি জানি নাই।
ইমাম সাহেবের মজলিসে জ্ঞানী–গুণীদের সমাবেশ
ইমাম সাহেব দ্বীনের তাত্ত্বিক জ্ঞান শিক্ষা দিতেন। তাঁর দরসী হালকায় উলামাদের এক বিরাট জামাত অংশগ্রহণ করতেন। এঁদের মধ্যে প্রত্যেক বিষয়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তি থাকতেন। একবার ওকী বিন জাররাহ বলেন, ধর্মীয় বিষয়ে আবু হানিফা কি করে ভুল করতে পারেন; যখন তাঁর দরসী হালকায় প্রত্যেক বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন? কিয়াস এবং ইজতিহাদে রয়েছেন আবু ইউসুফ, যুফার বিন হাইল, মুহাম্মদ বিন হাসানের মত ব্যক্তিত্ব। হাদীছের অভিজ্ঞতা নিয়ে রয়েছেন ইয়াহয়া বিন যাকারিয়া বিন আবি যায়েদা, হাফস বিন গিয়াস, হাব্বান বিন আলী এবং মাযাল বিন আলীর মত ব্যক্তিত্ব। আরবী ভাষার অভিজ্ঞতা নিয়ে রয়েছেন কাসেম বিন মাআন বিন আব্দির রহমান, আর দাউদ বিন নুসাইর ত্বাঈ এবং ফুয়েল বিন আয়ায রয়েছেন। যুহদ এবং তাকওয়া নিয়ে যাঁর দরসী হালকায় এ ধরণের আহলে ইলম শরীক থাকেন কিভাবে তিনি ভুল করতে পারেন? যদি কখনও এমন হয় তবে এঁরা অবশ্যই তাকে সংশোধন করে দিবেন।
উল্লেখযোগ্য ছাত্রবৃন্দ
এমনি তো ইমাম সাহেবের দরসী হালকায় অনেক উলামা শরীক থাকতেন। কিন্তু এদের মধ্যে দশজন এমন ছিলেন যারা সব সময় হালকায় উপস্থিত থাকতেন। তন্মধ্যে চারজন কোরআনের মতই ফিকাহরও হাফিজ ছিলেন। এরা হচ্ছেন যুফার বিন হুযাইল, আবু ইউসুফ, আসাদ বিন আমর, আলী বিন মুসাহির। এক বর্ণনাতে সুফিয়ান ছাওরী, আলী বিন মুসাহিরের মাধ্যমে ইমাম সাহেব মতামত সংগ্রহ করতেন। আলজামে কিতাবটি সংকলনের সময় তিনি আলী বিন মুসাহিরের সাথে আলোচনা করে সহযোগিতা নিয়েছেন। ইমাম সাহেবের পৌত্র ইসমাঈল বিন হাম্মাদ বলেন, ইমাম আবু হানিফার বিশিষ্ট শাগরেদ ছিলেন দশজন। আবু ইউসুফ, যুফার, আসাদ বিন উমর আলবাজালী, আফিয়া আওদী, দাউদ ত্বাঈ, কাসেম বিন মাআন মাসউদী, আলী বিন মুসাহির এবং তার ভাই মন্দল। এদের মধ্যে আবু ইউসুফ এবং যুফারের মত কেউ ছিলেন না।
ইসমাঈল আরো বর্ণনা করেন যে, ইমাম সাহেব বলেছেন, আমার ছাত্র ছত্রিশজন। এদের মধ্যে আটাশজন কাযীর পদ পাবার যোগ্য। ছয়জন ফতোয়া দেয়ার যোগ্য এবং দুজন কাযী এবং মুফতীদের তালীম তরবীয়াত শিক্ষা দেয়ার যোগ্য। এতকথা বলে আবু ইউসুফ এবং যুফার (রহঃ)-এর দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
ইমাম সাহেবের ছাত্ররা তাঁর দরসী হালকায় ফিকহী মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করতেন। যদি আফিয়া আওদী উপস্থিত হতেন তবে তাদেরকে বলতেন, আফিয়া আসা পর্যন্ত তোমরা এ আলোচনা বন্ধ রাখ। আর যখন আফিয়া আসতেন আর কোন মাসয়ালা তাঁদের সাথে একমত হতেন, তখন ইমাম সাহেব তাঁর শাগরেদদের বলতেন, এ মাসয়ালাটি লিখে রাখ। আর যদি আফিয়া একমত না হতেন তবে নিষেধ করে দিতেন।
একবার আবু ইউসুফ এবং যুফার (রহঃ) ইমাম সাহেবের দু’পাশে বসে কোন একটি মাসয়ালা আলোচনায় একে অপরের দলীল খণ্ডন করছিলেন। এর মাঝেই যোহরের সময় হয়ে গেল। ইমাম সাহেব যুফারকে বললেন, যেখানে আবু ইউসুফ থাকবে সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব লাভের আশা করো না। এ কথা বলে আবু ইউসুফের সমর্থনের সিন্ধান্ত দিলেন।
সুফিয়ান বিন উয়াইন বলেন, একবার আমি মসজিদে আবু হানিফার দরসের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম তাঁর শাগরেদরা তাঁর আশে পাশে বসে উচ্চস্বরে বহছ-মুবাহাছা করছে। আমি বললাম, আপনি তাদেরকে শোর করা থেকে বাধা দেন না কেন? তিনি বললেন, তাদেরকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিন। এভাবেই তারা ফিকাহ শিখবে। দরসের মজলিসে দাউদ ত্বাঈর আওয়াম সবচেয়ে উচু ছিল।
ইমাম সাহেবের নিয়ম ছিল জটিল মাসয়ালায় তিনি অনেক চিন্তা-ভাবনা করতেন। যে পর্যন্ত এ ব্যাপারে সন্দেহমুক্ত না হতেন, শাগরেদদের মধ্যে তা প্রকাশ করতেন না।
একই মাসয়ালায় বিভিন্নমুখী দলীল
একবার ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর বাগদাদ আগমনের সংবাদ শুনে তার ছাত্রদের মধ্য হতে আবু ইউসুফ, যুফার, আসাদ বিন আমর সহ আরো অনেকে মিলে একটি মাসয়ালা আলোচনা করে ঠিক করে রাখলেন। ইমাম সাহেব দরসী হালকায় বসার সাথে সাথে সর্বপ্রথম সে মাসয়ালাটি জিজ্ঞেস করা হল। ইমাম সাহেব তাদের সিদ্ধান্তকৃত উত্তরের বিপরীত উত্তর দিলেন। এতে মজলিসে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল! সাবই বলে উঠল হে আবু হানিফা! আপনার কি হল? সফরের কারণে কি আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন? ইমাম সাহেব তাদের লক্ষ্য করে বললেন, থাম! থাম! আস্তে আস্তে বল। শোরগোল দ্বারা কোন লাভ হয় না। আচ্ছা! তোমরা কি বলতে চাও? তারা বললেন- এ মাসয়ালার উত্তর তা নয় যা আপনি বলেছেন। ইমাম সাহেব বললেন, তোমরা কি দলীলের উপর ভিত্তি করে বল, না কি দলীল ছাড়াই? তারা বললেন, দলীলের ভিত্তিতে। ইমাম সাহেব বললেন, তোমাদের দলীল বল।
মুনাযারা শুরু হল। পরিশেষে ইমাম সাহেবের দলীল দ্বারা প্রমাণিত হল। তারা ইমাম সাহেবের উত্তর মেনে নিলেন। ইমাম সাহেব জিজ্ঞস করলেন, তোরা এ মাসয়ালার সঠিক উত্তর জানলে তো? তারা বললেন, হ্যা! এরপর ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, সে ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের কি ধাবনা যে তোমাদের প্রথম উত্তরকে সঠিক বলে এবং আমার উত্তরকে ভুল বলে। তারা সবাই একবাক্যে বলে উঠলেন, এটা কখনো হতে পারে না। দলীল দ্বারা আপনার উত্তর সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।
আবার ইমাম সাহেব যুক্তি প্রমাণ দ্বারা তাদের উত্তরটাকে সঠিক এবং স্বীয় উত্তরকে ভুল প্রমাণ করলেন। তারা বলে উঠলেন, আপনি আমাদের সাথে ন্যায় আচরণ করেননি। আমাদের উত্তরটাই তো সঠিক ছিল। এরপর আবার ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা সে ব্যক্তি সম্পর্কে কি বল যে এ উভয় উত্তরকে ভুল বলে এবং তৃতীয় অন্য এক উত্তরকে সঠিক বলে? তারা বললেন। এটা কখনও হতে পারে না যে, উভয় উত্তর ভুল হবে। ইমাম সাহেব তৃতীয় একটি উত্তর বের করে দলীল দ্বারা সেটা সঠিক প্রমাণ করে দিলেন।
সবাই বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন, হে ইমাম সাহেব! মূল ব্যাপারটি আমাদেরকে বলুন। তখন ইমাম সাহেব বললেন, অমুক অমুক দলীলের ভিত্তিতে তো প্রথম উত্তরটিই সঠিক। তবে আমার উদ্দেশ্য ছিল তোমাদেরকে এ বিষয়টি জানানো যে, এ মাসয়ালাটির তিনটি দিক হতে পারে। এর প্রত্যেকটিই যুক্তিযুক্ত এবং কোন না কোন ফকীহর মাযহাব। এগুলো কাল্পনিক ধারণা মাত্র নয়।
ইমাম আবু ইউসুফের অনুতাপ
একবার ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) ইমাম সাহেব হতে পৃথক হয়ে একটি দরসী হালকা কায়েম করেন। এতে ইমাম সাহেব হতে অনুমতিও ছিল না এবং ইমাম সাহেব তার জন্য দরসী হালকা কায়েম করা সমীচীনও মনে করেননি। তাই তিনি এক ব্যক্তিকে একটি প্রশ্ন শিখিয়ে আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর দরলী হালকায় পাঠালেন। প্রশ্নটি এরূপ- এক ব্যক্তি কোন এক ধোপীকে কাপড় ধুইতে দিল। ধোপী কাপড় নেয়ার একটি তারিখ নির্ধারণ করে দিল। নির্দিষ্ট তারিখে কাপড়ের মালিক কাপড় আনতে গেলে ধোপী কাপড় দিতে অস্বীকৃতি জানালো। পরে ধোপী স্বয়ং কাপড় নিয়ে কাপড়ের মালিকের নিকট এল। এখন কি ধোপীকে তার পারিশ্রমিক দেয়া কাপড়ের মালিকের উপর আবশ্যক? তিনি ঐ ব্যক্তিকে এও বলে দিলেন যে, যদি আবু ইউসুফ বলে পারিশ্রমিক দিতে হবে তুমি বলবে ভুল। আর যদি বলে দিতে হবে না তবুও বলবে ভুল।
সে ব্যক্তি ইমাম ইউসুফের মজলিসে গিয়ে তাই করল। ইমাম আবু ইউসুফ অত্যন্ত মেধাবী এবং দূরদর্শী ছিলেন। তৎক্ষণাৎ পটভূমি বুঝে নিলেন। তিনি নিজের এ কর্মের উপর সতর্ক হয়ে ইমাম সাহেবের নিকট উপস্থিত হলেন। ইমাম সাহেব বললেন, ধোপীর মাসয়ালা তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ইমাম আবু ইউসুফ স্বীয় কর্মের উপর অনুতপ্ত হলেন।
ইমাম সাহেব এ মাসয়ালার বিশ্লেষণে বললেন, ধোপী যদি কাপড় ধোয়ার পূর্বেই দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে থাকে তবে সেটা হবে ‘গসব’ বা আত্মসাৎ। আর আত্মসাৎকারীকে পারিশ্রমিক দিতে হয় না। আর যদি কাপড় ধোয়ার পর অস্বীকৃতি জানিয়ে থাকে তবে কাপড় ধোয়ার কারণে তার পারিশ্রমিক দেয়া আবশ্যক! পরে যখন ধোপী নিজেই কাপড়ের মালিকের নিকট কাপড় ফেরৎ দিতে এল তখন আত্মসাতের অপরাধ বাকী রইল না। তার পারিশ্রমিক বহাল থাকবে।
ইমাম সাহেবের বিনয়
কুফার বাজারে এক ব্যক্তি এ কথা জিজ্ঞেস করতে করতে প্রবেশ করল, ফকীহ (ফিকাহবিদ) আবু হানিফার দোকান কোনটি? ঘটনাচক্রে এ প্রশ্নটি স্বয়ং আবু হানিফা (রহঃ)-কে করা হয়েছিল। তিনি বললেন, সে তো ফকীহ নয় বরং জোর করে মুফতী হয়ে বসে আছে।
ইমাম সাহেবের জীবনের একমাত্র আদালতী ফয়সালা
ইমাম সাহেবের নিকট প্রধান বিচারপতি হবার প্রস্তাব আসলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে দু’একদিনের জন্য ছোট এক বস্তির কাযীর পদ গ্রহণ করেন। সে সময়ে তার আদালতে একটি মুকাদ্দামা দায়ের হয়। এটিই ছিল তাঁর আদালতে সর্বপ্রথম এবং সর্বশেষ মুকাদ্দামা। এরপর তিনি কাযীর পদ থেকে ইস্তফা দেন।
এক গরীব হাঁড়ি বিক্রেতা জনৈক ব্যক্তির নিকট একটি হাঁড়ির মূল্য বাবদ দু’দেরহাম চার পয়সা দাবী করল। ইমাম সাহেব বিবাদীকে এর সত্যতা জিজ্ঞেস করলে সে তা অস্বীকার করল। বাদীর নিকটও কোন সাক্ষী নেই। বিচারের ধারা হিসেবে এখন বিবাদী কসম করে বলবে। ইমাম সাহেব বিবাদীকে কসম করে বলতে বললে সে নির্দ্বিধায় কসম করতে লাগল। কসম করার ব্যাপারে তার এ সাহস ইমাম সাহেরেব সহ্য হল না। তিনি তার কসম বন্ধ করে দিয়ে বাদীকে তার হাতব্যাগ হতে দু’টি ভারি ভারি দেরহাম বের করে তাকে দিয়ে বললেন, তুমি তার উপর যে মূল্য দাবী করেছ তা আমার থেকে নিয়ে যাও।
বদান্যতা ও দানশীলতা
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর ‘মজলিসুল বারাকা’ এর নাম জীবনীকারগণ অনেক কিতাবে উল্লেখ করেছেন। নিম্নে এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা উল্লেখ করা হচ্ছে যেটি অনেক জীবনীকারকই উল্লেখ করেছেন। এ ঘটনা থেকে ইমাম সাহেবের নিবাসকে ‘মজলিসুল বারাকা’ নামকরণের কারণ ও সার্থকতাও বুঝে আসবে।
কুফা নগরীতে এক ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে তার অবস্থারও পরিবর্তন ঘটল। দারিদ্র্য তাকে গ্রাস করল। তিনি দরিদ্র হলেন বটে, কিন্তু তার আত্মসম্মানবোধ ছিল অটুট। তার দিন অভাব অনটনেই কেটে যাচ্ছে তবুও তিনি কারও নিকট হাত পাতেন নি।
একদিন তার ছোট এক মেয়ে তাজা কাকড়ি দেখে দৌড়ে এসে মায়ের নিকট কাকড়ি খাওয়ার জন্য পয়সা চাইল। কিন্তু দরিদ্র স্বামীর ঘরে থেকে মা পয়সা পাবে কোথায়! মেয়েটি কাঁদতে লাগল। পিতা বসে বসে তা দেখছিলেন আর তার চোখ বেয়ে অশ্রু বইতেছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, ইমাম আবু হানিফার থেকে সাহায্য চাইবেন। ইমাম সাহেবের মজলিসে উপস্থিত হলো। যে কোন দিন কারো নিকট কিছু চায় নাই আজও তার পক্ষে মুখ খোলা সম্ভবপর হয়ে উঠল না। লজ্জা এবং আত্মসম্মানবোধ প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ালো! শেষ পর্যন্ত কিছু না বলেই তিনি উঠে চলে গেলো।
ইমাম সাহেব তার চেহারা দেখেই বুঝে নিয়েছেন যে, তার কোন প্রয়োজন ছিল কিন্তু মর্যাদাবোধ তা প্রকাশ করা থেকে তাকে বিরত রেখেছে। লোকটি যখন বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো ইমাম সাহেব গোপনে তাকে অনুসরণ করে তার বাড়ীটি ভালভাবে চিনে এলেন। দিন শেষে যখন রাত্র এল এবং রাত গভীর হল ইমাম সাহেব পাঁচশত দিরহামের একটি থলি নিয়ে তার বাড়ীতে গিয়ে পৌঁছলেন। দরজায় করাঘাত করলেন। যখন দরজার নিকটে এল তখন ইমাম সাহেব সে থলিটি দরজার চৌকাঠের উপরে রেখে পিছনের দিকে যেতে যেতে বললেন, তোমাদের দরজায় যে থলিটি পড়ে আছে সেটি তোমাদের।
ভিতরে গিয়ে থলি খুলে একটি কাগজের টুকরা দেখতে পেলো। তাতে লিখা ছিল এ অর্থ নিয়ে আবু হানিফা তোমার নিকট এসেছিল। এগুলো বৈধ উপায়ে অর্জিত। নির্দ্বিধায় সেগুলো খরচ কর।
প্রসিদ্ধ ইমাম ইব্রাহীম ইবনে উয়াইনাকে একবার কয়েদ করে জেলখানায় পাঠানো হয়েছিল। কারণ, তিনি লোকদের থেকে ঋণ এনে তা পরিশোধ করেননি।
ইমাম সাহেবের নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি খুবই দুঃখিত হলেন। তিনি তার সংগীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তার যিম্মায় কত টাকা ঋণ আছে? তাকে জানানো হল যে, চার হাযার দিরহামেরও বেশী।
ইমাম সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁর ঋণ পরিশোধ করে তাঁকে মুক্ত করে আনার জন্য কি অন্য কারো থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে?
ইতিবাচক জবাব দিলে ইমাম সাহেব বললেন, প্রত্যেকের অর্থ ফিরিয়ে, দাও। ইব্রাহীমের সমস্ত ঋণ আমি একাই পরিশোধ করব।
পরে প্রত্যেকের অর্থ ফিরিয়ে দেয়া হল এবং ইমাম সাহেব একাই তার ঋণ পরিশোধ করলেন।
আব্দুল্লাহ বিন বকর সাহমী বর্ণনা করেন, মক্কা মুকাররমায় যাওয়ার পথে আমার সফরসঙ্গী ছিল জামাল। কিছু টাকার ব্যাপারে তার সাথে আমার ঝগড়া হয়ে গেল। কথায় কথা বেড়ে গেল। সে আমাকে ইমাম সাহেবের মজলিসে টেনে নিয়ে গেল। তিনি যখন আমাদেরকে মুকাদ্দমার ধরন জিজ্ঞাসা করলেন; তার বর্ণনা দিতে গিয়ে অর্থের পরিমাণে আমাদের উভয়ের মধ্যে মতভেদ হল। ঝগড়া শুরু হল। ইমাম সাহেব এটা দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। তিনি জানতে চাইলেন, ভাই! কি পরিমাণ অর্থ নিয়ে তোমরা ঝগড়া করছ? আমার সঙ্গী জামাল বলল, চল্লিশ দিরহাম।
ইমাম সাহেব বলতে লাগলেন, আশ্চর্য ব্যাপার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ একেবারে শেষ হয়ে গেছে।
ইমাম সাহেবের এ কথায় আমার বড়ই লজ্জা হল। তিনি স্বীয় পকেট হতে চল্লিশ দিরহাম বের করে জামালকে দিয়ে দিলেন।
তাঁর দয়া-দাক্ষিণ্য দ্বারা এভাবে ঝগড়াটির মীমাংসা হয়ে গেল।
হাদিয়া-তোহফা বন্টনের প্রতি ইমাম সাহেবের বড়ই সখ ছিল। এটা তার অভ্যাস এবং স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। হাদিয়া-তোহফা বন্টনের সময় ইমাম সাহেব মাঝে মধ্যে বলতেন, ভায়েরা! তোমরা আশ্চর্যবোধ করছো কেন? এটা তো হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই বাণী যে, আমি তো শুধুমাত্র কোষাধ্যক্ষ। যেখানে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেখানেই রাখি।
মুহাম্মদ বিন ইউসূফ সালেহী ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনার এ উক্তিটি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমার নিকট ইমাম আবু হানিফা এত অধিক পরিমাণ হাদিয়া পাঠালেন যে, তা দেখে আমি ঘাবড়ে গেলাম।
এরপর ইবনে উয়াইনা ইমাম সাহেবের দয়া-দাক্ষিণ্যের আধিক্যের কথা তার কোন শিষ্যের নিকট বললে তিনি বললেন, আপনার নিকট কি এমন পরিমাণ হাদিয়া যায় যে, আপনি বিরক্ত হয়ে গেছেন? সায়ীদ ইবনে আবি আরুবার নিকট ইমাম সাহেবের মূল্যবান তোহফা সব সময়েই যেতে থাকে। আপনি যদি তা দেখতেন তবে আল্লাহ জানেন আপনি কী বলতেন?
এরপর বললেন, ইমাম সাহেব প্রত্যেক মুহাদ্দিছকেই পর্যাপ্ত পরিমাণ হাদিয়া তোহফা দিয়েছেন।
গোরক সাদী আলকূফীর বর্ণনা, আমি একবার ইমাম সাহেবের খিদমতে কিছু হাদিয়া তোহফা পাঠাইলাম। ইমাম সাহেব তার দ্বিগুণ তোহফা দান করলেন। এ দেখে আমি তার খিদমতে আরজ করলাম, হযরত! আমি যদি জানতাম আপনি এত কষ্ট করবেন এবং আমার হাদিয়ার বিনিময়ে দ্বিগুণ দান করবেন তবে কখনো আমি এ কাজ করতাম না।
ইমাম সাহেব বললেন, এরূপ কথা কখনো বলবেন না। কারণ প্রথম ব্যক্তি অধিক সওয়াব এবং ফযীলতের প্রাপ্য। আপনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণী শুনেননি, যে ব্যক্তি তোমার সাথে সদাচরণ বা ইহসান করে তুমি তার বিনিময়ে ইহসান কর। যদি তার বরাবর বদলা কিংবা ইহসান করার শক্তি তোমার না থাকে, তবে ইহসানকারীর শুকরিয়া আদায় কর। যবান দ্বারা তার প্রশংসা কর।
বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে আমি বললাম জনাব! হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণী আমার নিকট সমস্ত ধন-সম্পদ হতেও প্রিয়। অন্য এক বর্ণনায় এ কথাটি ইমাম সাহেবের দিকে সম্পর্কিত করা হয়েছে।
শাগরেদের জন্য ইমাম সাহেবের আর্থিক সাহায্য ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) একজন বিত্তশালী ও দানবীর ব্যক্তি ছিলেন। বন্ধু-বান্ধবের আপ্যায়ন তাঁর প্রিয় কাজ ছিল। শাগরেদ এবং দরসী হালকায় অংশগ্রহণ কারীদের প্রতি তাঁর বিশেষ লক্ষ্য ছিল। হাসান বিন যিয়াদ তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন। তিনি যখন ইমাম সাহেবের মজলিসে শরীক হতে লাগলেন, তাঁর পিতা ইমাম সাহেবের নিকট এসে বললেন, আমার কয়েকটি কন্যা রয়েছে। একমাত্র হাসান ছাড়া আর কেউ আমার কাজে সাহায্য করার নেই। তাই আমি অত্যন্ত চিন্তিত। ইমাম সাহেব হাসান বিন যিয়াদকে ডেকে বললেন, তোমার পিতা এরূপ বলছেন। তুমি আমার নিকট থেকে যাও। আমি কোন ফকীহকে ফকীর থাকত দেখিনি। এর সাথে সাথে ইমাম সাহেব তাঁর জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিলেন। যা তাঁর শিক্ষা শো হওয়া পর্যন্ত চালু ছিল।
ইমাম আবু ইউসুফ বলেন, আমি অভাব অনটনের মাঝেই ইমাম সাহেব থেকে তা’লীম হাসিল করছিলাম। একদিন আমার পিতা এসে আমাকে দরস থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, আবু হানিফা সচ্ছল ব্যক্তি। তুমি অভাবগ্রস্ত। তাঁর সমান হতে যেয়ো না। এরপর আমি ইমাম সাহেবের নিকট আসা বন্ধ করে দিলাম। ইমাম সাহেব আমার অনুপস্থিতির কারণ জিজ্ঞেস করলেন। কয়েকদিন পর আমি আবার সেখানে গেলে তিনি আমার অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলেন। আমি সাংসারিক অভাবের কথা বললাম। মজলিস শেষে তিনি আমাকে বসে যেতে ইঙ্গিত করলেন। সবাই চলে গেলে তিনি আমাকে একটি থলি দিয়ে বললেন, নিজের কাজ চালিয়ে যাও এবং সবসময় এখানে আসতে থাক। এ অর্থ শেষ হয়ে গেলে আমাকে জানাবে। ঐ থলিতে একশত দিরহাম ছিল। এর কিছুদিন পরেই আরেকটি থলি দিলেন। এভাবে তা চালু রইল। আমি বড়ই প্রশান্তির সাথে তালীম শেষ করলাম।
সতের বছর পর্যন্ত আমি আবু হানিফা (বহঃ)-এর খিদমতে এভাবে ছিলাম যে, দুই ঈদের দিন ব্যতীত অন্য কোন দিন অনুপস্থিত ছিলাম না।
একবার হাজীগণ তাঁর খিদমতে কিছু জুতো হাদিয়া স্বরূপ পেশ করলেন। কিছুদিন পর ইমাম সাহেব নিজের জন্য জুতা কিনতে চাইলে লোকেরা জিজ্ঞেস করল হাদিয়ার জুতোগুলো কোথায়? তিনি বললেন, এর এক জোড়াও আমার নিকট নেই। আমি আমার শাগরেদদের সবকটি দিয়ে দিয়েছি।
শাগরেদদের হিম্মত বর্ধন
ইমাম সাহেবের নিকট শিক্ষা গ্রহণের সময়েই ইমাম যুফারের বিবাহ হয়। তিনি তার উস্তাদের নিকট বিবাহ পড়ানোর আকাঙ্ক্ষা পেশ করলে ইমাম সাহেব সানন্দে তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেন। বিবাহের খোৎবায় তাঁর সম্পর্কে ইমাম সাহেব এ মর্যাদাপূর্ণ শব্দগুলো বলেন,
এ হচ্ছে হুযাইল তনয় যুফার; যে বংশধারা, আভিজাত্য এবং ইলমের কারণে মুসলমানদের ইমাম এবং দ্বীনের একজন উল্লেখযোগ্য ইমাম।
শাগরেদ সম্পর্কে উস্তাদের এ বাক্যে উপস্থিত ব্যক্তিগণ খুবই সন্তুষ্ট হলেন। কিন্তু তাঁর পরিবারেব কেউ কেউ তাঁকে বললেন, তোমাদের গোত্রের অভিজাত শ্রেণীর লোক এখানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তুমি আবু হানিফা দ্বারা বিবাহ পড়ালে?
যুফার বললেন, যদি আমার পিতাও উপস্থিত থাকতেন তবুও আমি আবু হানিফাকেই এ ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতাম।
ইমাম সাহেবের এক শাগরেদ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ফিকহী দূরদৃষ্টি কিভাবে অর্জন করা যেতে পারে? তিনি বললেন, সম্পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতার সাথে চেষ্টা করলে।
শাগরেদ বললেন, এ কি করে সম্ভব? তিনি বললেন, পার্থিব ব্যস্ততা পরিহার করে। শাগরেদ বললেন, এটা কিভাবে হবে? ইমাম সাহেব বললেন, যে বস্তু যতটুকু প্রয়োজন তা ততটুকই গ্রহণ কর। এর অধিকের চিন্তায় পড়ে না। শাগরেদদের সাহস বর্ধন, তাদের মঙ্গল ও প্রয়োজনের লক্ষ্য রাখা ইমাম সাহেবের দবসী হালকার বিশেষত্ব ছিল।
কয়েকজন বিশিষ্ট শাগরেদের নাম
ইমাম সাহেবের শাগরেদদের সংখ্যা কয়েক সহস্র। তাঁর সমকালীন কোন মুহাদ্দিছ কিংবা ফকীহর ছাত্র এত অধিক ছিল না। হাফিয আবুল হাজ্জাজ ‘তাহযীবুল কামাল’ কিতাবে প্রায় একশত শাগরেদের নাম উল্লেখ করেছেন। ‘উকুদুল জুমান- গ্রায় আটশত শাগরেদের নাম উল্লেখ রয়েছে, যারা নিম্নে বর্ণিত দেশ ও শহর থেকে এসে ইমাম সাহেব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেনঃ
মক্কা মুকারমা, মদীনা মুনাওয়ারা, দামেশক, বসরা, কূফা, ওয়াসেত, মুসেল, জাযীরা, রিককা, নসীবীন, রমলা, মিশর, ইয়ামান, বাহরাইন, বাগদাদ, আহওয়ায, কেরমান, ইস্পাহান, ইস্তারাবাদ, হুলওযান, হামদান, রায়, কুমাস, দামণান, তিবরিস্তান, জুরজান, সরখসী, নাসা, মারভ, বুখারা, সমরকন্দ, কাসসাস, তিরমিয, বলখ, হিরাত, কুহস্তান, যুম্ম, খাওযারযেম, সিজিস্তান, মাদায়েন, মাসীসা, হিমস প্রভৃতি।
অনেকেই নিজ নিজ দেশ বা শহর ভিত্তিক ইমাম সাহেবের শাগরেদদের নাম এবং জীবনী নিয়ে আলোচনা করেছেন, যাঁদের মধ্যে ফকীহ্, মুহাদ্দিছ, কাযী সবই অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কয়েকজনের নাম নিম্নরূপঃ
কাযী আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন ইব্রাহীম, মুহাম্মদ বিন হাসান শায়বানী, যুফার বিন হুযাইল আম্বরী, হাম্মাদ বিন আবি হানিফা, হাসান বিন যিয়াদ লুলুঈ, আবু ইসমত নূহ বিন আবি মরিয়ম, কাযী আসাদ বিন আমর, আবু মূতী’ হাকাম বিন আব্দিল্লাহ বলখী, মুগীরা বিন মিকসাম, যাকারিয়া বিন আবি যায়েদা, মিসআর বিন কিদাম, সুফিয়ান ছাওরী, মালেক বিন মেগওয়াল, ইউনুস বিন আবি ইসতাক, দাউদ ত্বাঈ, হাসান বিন সালেহ, আবু বকর বিন আয়্যাশ, ঈসা বিন ইউনুস, আলী বিন মুসহির, হাফস বিন গিয়াস, জরীর বিন আব্দিল হামীদ, আব্দুল্লাহ বিন মুবারক, ওকী বিন জাররাহ, আবু ইসহাক ফাযারী, ইয়াযীদ বিন মক্কী বিন ইব্রাহীম, আবু আসেম নবীল, আব্দুর রাযযাক বিন হাম্মাদ সানআনী, আবু আব্দির রহমান মক্কী, হুশাইম বিন বশীর, আলী বিন আসেম আব্বাদ বিন আওযাম, জাফর বিন আওন, ইব্রাহীম বিন তহমান, হামযা বিন হাবীব ত্বাইয়্যাৎ ইয়াযীদ বিন যুবাঈ, ইয়াহয়া বিন ইয়ামান, খারেজা বিন মুসআব, মুসআব বিন মিকদাম, রবীয়া বিন আব্দির রহমান মাদানী, ইয়াহইয়া বিন নসর বিন হাজেব, আমর বিন মুহাম্মদ আনকারী, হাওয়া বিন খলীফা, উবাইদুল্লাহ বিন মুসা প্রমুখ।
জীবিকা নির্বাহ
ইমামগণের কেউ ইলমে দ্বীনকে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম বানাননি বা তদ্বারা কোন পার্থিব স্বার্থও উদ্ধার করেননি। বরং দ্বীনি খিদমত হিসাবে ফিকাহ বা হাদীছ ইত্যাদি শিক্ষা করা বা শিক্ষা দেয়ার সাথে সাথে জীবিকার জন্য কাজ-কর্ম বা ব্যবসা ইত্যাদি করতেন। উপদেশ গ্রহণের জন্য তাঁদের নামের সাথে পেশাও উল্লেখ করা হত। বিভিন্ন কিতাবে পূর্বেকার ইমামগণের নামের সাথে বায ( কাপড় বিক্রেতা) খায্যার (রেশম বিক্রেতা) যাইয়াত (তৈল বিক্রেতা) সাম্মান (ঘি-বিক্রেতা) হান্নাত (গম বিক্রেতা) হাততাব (কাষ্ঠ বিক্রেতা) বাযযার (শস্য বিক্রেতা) এবং এধরনের অনেক খেতাব পাওয়া যায়।
রেশমের কারখানা
ইমাম আবু হানিফাও খাযর অর্থাৎ রেশম বিক্রেতা ছিলেন। এটা তাঁদের পারিবারিক পেশা ছিল। তাঁদের রেশম এবং রেশমী কাপড় তৈরী করার বিরাট কারখানা ছিল। সেখানে বহু কারিগর এবং কর্মচারী কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করত। রেশমী কাপড় বিক্রির একটি বড় দোকানও ছিল। সেখানে কারখানায় তৈরী রেশমী কাপড় বিক্রয় করা হত। ইমাম যাহাবী বলেন,
“আবু হানিফা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ফিকাহ, ইবাদত, পরহেযগারী, দানশীলতা প্রভৃতি গুণসমূহের সমাবেশ তিনি নিজের মধ্যে ঘটিয়েছেন। তিনি সরকারী কোন অনুদান গ্রহণ করতেন না। বরং নিজের আয় থেকে অন্যের জন্য ব্যয় করতেন। নিজের প্রয়োজন থেকে অপরের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতেন। তাঁদের রেশম ও রেশমী কাপড় তৈরী করার একটি বিরাট কারখানা ছিল। সেখানে বহু কারিগর এবং কর্মচারী কাজ করত।”
রেশমের এ কারখানাটি সম্ভবত, কুফার পূর্বদিকে ইমাম সাহেবের বাসস্থানের নিকটেই ছিল। ইমাম মালেক (রহঃ) বাযযায অর্থাৎ সুতি কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে তিনি দ্বীনি এবং ইলমী বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করেন। এই উভয় বুযুর্গেরই জীবিকার মাধ্যম ছিল কাপড়ের ব্যবসা।
রেশমী কাপড়ের দোকান
ইরাক ছিল ইসলামী এবং অনারব সংস্কৃতির মিলন-কেন্দ্র। শামের শহরগুলোতে রোমীয় এবং পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া যেত। আর ইরাকে অনারব এবং ইরানী সংস্কৃতির আভাস পাওয়া যেত। বাগদাদ শহরের পতন হওয়ার পূর্বে কূফা এবং বসরা শহর দু’টি সুখ-সমৃদ্ধির কেন্দ্র ছিল! কূফায় উন্নতমানের সুতি এবং রেশমী কাপড় তৈরী হত। বহু পূর্ব থেকেই ইমাম সাহেবের পরিবার রেশমী কাপড়ের ব্যবসা করত। শহরের মাঝখানে জামে মসজিদ এবং প্রশাসন ভবনের নিকটে আমর হুরাইছ (রাঃ)-এর সুপরিচিত প্রকাণ্ড বাড়ীতেই ছিল তাঁর দোকান।
খতীব বাগদাদী লিখেন, আবু হানিফা রেশম বিক্রেতা ছিলেন। আমর বিন হুরাইছের বাড়ীতে তার দোকানটি বেশ পরিচিত ছিল।
তাঁর বাড়ী এবং দোকানের গুরুত্ব বুঝার জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামের ওফাতের সময় হযরত আবু সায়ীদ আমর বিন হুরাইছ মাখযুমী (রাঃ)-এর বয়স ছিল বার বৎসর। তিনি বলেন, একবার আমার পিতা আমাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামের খিদমতে নিয়ে যান। তিনি আমার মাথার উপর হাত বুলিয়ে আমার বেচা-কেনায় বরকত এবং রিযিকের প্রাচুর্যের জন্য দোয়া করলেন। একবার আমার ভাই সায়ীদ আমাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামের খিদমতে নিয়ে গেলেন। তিনি ঐ সময় স্বর্ণ বন্টন করছিলেন। আমাকেও একটি টুকরা দান করলেন। আমি মনে মনে বললাম, এটা যে কাজেই লাগাব তাতে বরকত হবে। তার শেষাংশ এ বাড়ীতে ব্যয় করেছি।
অতএব এর ফল এই যে, তিনি বহু সম্পদের অধিকারী হয়ে গেলেন এবং কূফার শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন।
হযরত আমর বিন হুরাইছ (রাঃ) কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কুফায় বসতি স্থাপন হলে তিনি সেখানে চলে আসেন। ইবনে সা’দের বর্ণনায় তিনি কূফায় এসে জামে মসজিদের সন্নিকটে একটি বিরাট বাড়ী তৈরী করেন। ইবনে সা’দ আরো বর্ণনা করেন, সেটা বিশাল এবং প্রসিদ্ধ। বর্তমানে (তৃতীয় শতাব্দী) সেখানে রেশম ব্যবসায়ীরা বাস করে।
কুফার আমীর যিয়াদ যখন শহরের বাইরে যেতেন, তখন তাকেই নিজের জায়গায় আমীর বানিয়ে যেতেন। তিনি ৮৫ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর এ বাড়ীতে দোকান পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করা হত। কারণ, প্রতিটি দোকান এত বরকতময় ছিল যে, খুবই সাধারণ দোকানদার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই যথেষ্ট সম্পদশালী হয়ে যেত। এ বিশাল বাড়ীটিতে অনেক দোকান ছিল। যেগুলোতে রেশম ব্যবসায়ী থাকত।
ক্রয়-বিক্রয়ে সততা এবং পরিচ্ছন্নতা
হাফস বিন আব্দির রহমান ইমাম সাহেবের ব্যবসায় শরীক ছিলেন। তিনি এখানে মাল পাঠিয়ে দিতেন। তিনি বিক্রয় করতেন। একবার মাল পাঠিয়ে দিয়ে তাকে জানিয়ে দিলেন, এখানে খুঁত রয়েছে। তাই গ্রাহককে জানিয়ে দিবেন। কিন্তু হাফসের এ কথাটি স্মরণ ছিল না, সেহেতু তিনি এ থানটিও স্বাভাবিক দামেই বিক্রয় করলেন। ক্রেতার ঠিকানা জানা যায়নি। ইমাম সাহেব তার সম্পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিলেন।
এক ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি রং-এর কাপড় তালাশ করছিল। ইমাম সাহেব বললেন, অপেক্ষা কর। এ ধরনের কাপড় আসলে তোমার জন্য রেখে দিব। সপ্তাহ পুরা হওয়ার আগেই সে রং-এর কাপড় দোকানে এসেছে। ঐ ব্যক্তি দোকানের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল। ইমাম সাহেব তাকে ডেকে বললেন, তোমার পছন্দের কাপড় এসে গেছে। সে মূল্য জিজ্ঞেস করলে ইমাম সাহেব বললেন, এক দিরহাম। সে ভাবল ইমাম সাহেব ঠাট্টা করছেন। ইমাম সাহেব বললেন, আমি দুটো কাপড় বিশ দীনার এক দিরহাম দ্বারা ক্রয় করেছি। তন্মধ্যে একটি বিশ দীনারে বিক্রয় করেছি। আমার পুঁজির এক দিরহাম কম রয়েছে। তুমি অন্য কাপড়টি নিয়ে যাও এবং এক দিরহাম দিয়ে দাও। আমি আমার বন্ধুদের কাছ থেকে লাভ করিনা।
এক ব্যক্তি দোকানে এসে ইমাম সাহেবকে বলল, আমার বিয়ের কথাবার্তা সম্পন্ন হয়ে গেছে। আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন। দু’টি কাপড়ের প্রয়োজন। দুই সপ্তাহ পর ইমাম সাহেব ঐ ব্যক্তিকে ডাকলেন। সে ব্যক্তি আসলে ইমাম সাহেব তাকে বিশ দীনারেরও অধিক মূল্যের দুটি কাপড় এবং নগদ এক দীনার দিয়ে বললেন, ‘তুমি এগুলো নিয়ে যাও।’ তাকে আশ্চার্যান্বিত হতে দেখে ইমাম সাহেব বললেন, তোমার নামে বাগদাদে কিছু সামান পাঠিয়েছিলাম। সেগুলো বিক্রয় করেই তোমার কাপড় কেনা হয়েছে এবং এক দীনার অবশিষ্ট রয়েছে। তুমি এগুলো নিয়ে যাও। নচেৎ আমি এগুলো বিক্রয় করে তার মূল্য এবং অতিরিক্ত এক দীনার দান করে দিব। লোকেরা এর কারণ জানতে চাইলে ইমাম সাহেব বললেন, এক ব্যক্তি এসে বলল, আমার প্রতি ইহসান করুন। আর আমার উস্তাদ আতা বিন আবি রাবাহ হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ)-এর এ কথা বর্ণনা করেছেন যে, যদি কোন ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের নিকট বলে যে, আমার উপর ইহসান কর- তবে সে নিজের ভাইকে তার গোপন কথার আমীন (আমানতদার) বানিয়ে দিল। এ জন্য আমি ঐ ব্যক্তির সাথে যথাসম্ভব সদাচার এবং তার প্রতি ইহসান করতে চাই।
মালীহ বিন ওকীর পিতা বর্ণনা করেন, আমি ইমাম সাহেবের দোকানে বসা ছিলাম। জনৈকা বৃদ্ধা রেশমী কাপড় বিক্রয় করার জন্য এসেছিল। ইমাম সাহেব মূল্য জিজ্ঞেস করলে সে বলল, একশত দিরহাম। ইমাম সাহেব বললেন, এ কাপড় এর চেয়েও দামী। সে বলল, দুইশত দিরহাম। ইমাম সাহেব বললেন, এর চেয়েও দামী। সে বলল তিনশত দিরহাম। ইমাম সাহেব বললেন, এর চেয়েও মূল্যবান। সে বলল, চারশত দিরহাম। ইমাম সাহেব বললেন, এখনও এর দাম কম। বৃদ্ধা বুঝল, ইমাম সাহেব কৌতুক করছেন। ইমাম সাহেব বললেন, তুমি এমন কাউকে ডেকে আন, যে এর সঠিক দাম বলবে, ইমাম সাহেব ঐ কাপড়টি পাঁচশত দিরহামে ক্রয় করে নিলেন।
এক ব্যক্তি দোকানে এসে কাপড় কিনতে চাইল। ইমাম সাহেব কর্মচারীকে বললেন, কাপড় বের করে দেখাও। সে থান বের করল এবং তার উপর হাত রেখে বলল- ছাল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মাদ। এটা শুনে ইমাম সাহেব বড়ই রাগান্বিত হলেন এবং কর্মচারীকে বললেন, তুমি আমার কাপড়ের প্রশংসা দুরূদ শরীফ দ্বারা করছ? আজ বেচা-কেনা হবে না। পরে তাই করলেন।
তাকওয়া ও খোদাভীরুতা, সন্দেহযুক্ত খাদ্য পরিহার
একবার লুটের কতিপয় ছাগল কুফাবাসীদের ছাগলের সাথে মিশ্রিত হয়ে গিয়েছিল। লুটের ছাগল এবং কুফাবাসীদের নিজস্ব ছাগলের মধ্যে পার্থক্যও করা যাচ্ছিল না যে, সেগুলো পাল হতে পৃথক করে মালিকের নিকট হস্তান্তর করা যাবে। এখন এ আশংকা হচ্ছিল যে, কসাই বাজার হতে যে ছাগল এনে জবাই করবে হয়তোবা তন্মধ্যে লুটের ছাগলও থাকবে এবং বাজারের মধ্যে সেটার গোস্তও বিক্রয় হবে। এভাবে লুটের ছাগলের গোস্ত লোকদেরকে খাইয়ে দিবে। এমন গোস্ত খাওয়া থেকে কিভাবে বেঁচে থাকা যায়। ইমাম সাহেব সে বিষয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি মানুষকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, একটি ছাগল কতদিন জীবিত থাকতে পারে? তারা বলল সাত বৎসর। ইমাম সাহেব দীর্ঘ সাত বৎসর পর্যন্ত কুফাবাসীদের থেকে বাজারের গোস্ত খরিদ করেন নাই।
জনৈক অগ্নিপূজকের ইসলাম গ্রহণ
‘তফসীরে কবীর’ নামক বিখ্যাত তফসীরগ্রন্থে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী উল্লেখ করেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) তাঁর এক মাজুসী (অগ্নিপূজক) প্রতিবেশীর নিকট কিছু ঋন পাওনা হলেন। ইমাম সাহেব একদিন সেগুলোর তাগাদা করার উদ্দেশ্যে তার বাড়ীতে গেলেন। তার ঘরের নিকটবর্তী হলে কিছু নাপাক তাঁর জুতায় লেগে গেলো। তা দূর করার জন্য তিনি জুতো খুলে ঝাঁকি দিলেন। এতে কিছু নাপাকী তার ঘরের দেয়ালে লেগে গেলো। এতে ইমাম সাহেব বড়ই দুঃখিত হলেন এবং মনে মনে ভাবতে লাগলেন আমি যদি এভাবে নাপাকী রেখে দেই তবে দেয়ালটি কদাকার হয়ে যাবে। আর যদি তা তুলে ফেলতে যাই তবে দেয়ালের মাটি খসে পড়বে। এতে ঘরের মালিকের ক্ষতি হবে। অবশেষে তিনি তার দরওয়াজা খটখটালেন। একজন বাঁদী বেরিয়ে এল। ইমাম সাহেব তাকে বললেন, তোমার মালিককে বল আবু হানিফা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বাঁদী সংবাদ পৌঁছালে সে বেরিয়ে এল এবং ভাবতে লাগল। সম্ভবতঃ তিনি ঋণ শোধ করতে বলবেন। তাই সে ওযরখাহী করতে লাগল। ইমাম সাহেব নাপাক লাগার ঘটনা বলে জিজ্ঞাসা করলেন, এমন কোন পদ্ধতি বল যার দ্বারা তোমার দেয়াল পরিষ্কার হয়ে যায়।
মাজুসী ব্যক্তি ইমাম সাহেবের তাকওয়া এবং পরহেযগারী দেখে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ফেলল।
ঘরের ছায়া ছেড়ে রৌদ্রে গিয়ে অবস্থান
ইসমাঈল বাগদাদী বলেন, আমি ইয়াযীদ বিন হারুনকে জিজ্ঞাসা করলাম মানুষ কখন ফতোয়া দেওয়ার যোগ্য হতে পারে? তিনি বললেন, মানুষ যখন ইমাম আবু হানিফার মত সতর্কতা অবলম্বন করে। প্রশ্নকারী বললেন, জনাব! আপনি এ কথা বলেছেন? তিনি বললেন, হ্যা আমি আরও বলবো যে, আমি তাঁর চেয়ে বড় ফকীহ এবং মুত্তাকী দেখিনি। একদিন ইমাম সাহেব এক ব্যক্তির ঘরের দরওয়াজার সামনে রৌদ্রে বসা ছিলেন। আমি আরজ করলাম যদি আপনি রৌদ্র হতে সরে এসে ঘরের ছায়ায় বসেন তবে ভাল হয়।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আমি ইমাম আবু হানিফাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম যে, আপনি ছায়া ছেড়ে কেন রৌদ্রে বসলেন? তিনি বললেন, এ ঘরওয়ালার কাছে আমার কিছু ঋণ আছে। আমি ঋণ গ্রহীতার ঘরের ছায়া এ ভেবে ব্যবহার করতে অপছন্দ করলাম যে, যেন সেটা অবৈধ উপকার এবং সুদের মধ্যে গণ্য না হয়। হাদীছ শরীফে আছে ঋণ দ্বারা যদি কোন উপকার হাসেল হয় তবে সেটা সুদ।
চোখের হিফাযত
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) বাল্যকালে খুবই সুন্দর এবং সুশ্রী ছিলেন। তিনি যখন ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তার নিকট গমন করেন তখন একবারই মাত্র ইমাম সাহেবের দৃষ্টি তার উপর পড়েছিলো। তাও ছিল অনিচ্ছাকৃত। এরপর তিনি কখনও তার দিকে চোখ তুলে তাকাননি। তিনি যখন তাকে পড়াতেন তখন স্তম্ভের পিছনে তাকে বসাতেন, যেন অনিচ্ছায়ও তাঁর দৃষ্টি তার উপর পতিত না হয়।
জনৈকা বাঁদীর খেদমত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা
খারেজা বিন মুছআব হতে বর্ণিত রয়েছে, তিনি বলেন, আমার যখন হজ্জে যাবার সৌভাগ্য হল তখন বাঁদীকে ইমাম সাহেবের খিদমত করার জন্য তাঁর নিকট রেখে গেলাম। প্রায় চার মাস মক্কা মুকাররমায় অবস্থান করলাম। সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে ইমাম সাহেবের খিদমতে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। হযরত, আমার বাঁদীর চরিত্র এবং খিদমত কেমন মনে হলো? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি কোরআন পড়ে, মানুষকে তদানুসারে আমল করতে উৎসাহিত করে, হালাল-হারাম সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করে, তার জন্য আবশ্যক সে যেন তার নফস এবং দৃষ্টি সাধারণ লোকদের চেয়ে বেশী হিফাযত করে। খোদার কসম! যখন থেকে আপনি চলে গিয়েছেন। আমি আপনার বাঁদীর দিকে চোখ তুলেও তাকাইনি।
খারেজা বলেন, এরপর আমি আমার বাঁদীকে ইমাম সাহেবের আখলাক এবং তাঁর ঘরোয়া মুআমালা ও আচরণ বিধি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। সে বললো, আমি আবু হানিফার মত পবিত্র পাকদামান ব্যক্তিত্ব আর দেখি নাই। শুক্রবারে ফজরের নামায পড়তে বেরিয়ে যেতেন। সেখান থেকে এসে চাশতের নামায পড়তেন। এরপর গোসল করে তেল লাগিয়ে জুমার নামাযের জন্য বেরিয়ে যেতেন। তাঁকে কোনদিন বেরোজা দেখিনি। তিনি ঘুমাতেনও খুব কম।
ঋণ গ্রহীতার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা
প্রসিদ্ধ সুফী শকীক বলখী তার স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একদিন আমি ইমাম আবু হানিফার সাথে যাচ্ছিলাম। এ সময়ে দূর হতে আগত এক ব্যক্তি আমাদেরকে দেখে রাস্তা পরিবর্তন করে অন্য এক গলিতে ঢুকে গেল। শকীক বলখী বলেন, দেখতে পেলাম ইমাম সাহেব তাকে ডেকে বলছেন, যে রাস্তা দিয়ে তুমি আসছিলে সে রাস্তায় চলে এসো। অন্য রাস্তায় কেননা গেলে? এ কথা শুনে পথিক বেচারা দাঁড়িয়ে গেল। আমরা তার নিকটে গিয়ে দেখলাম যে, সে লজ্জিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ইমাম সাহেব তাকে রাস্তা পরিবর্তনের কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, আপনি দশ হাজার দিরহাম আমার নিকট পাবেন। সেগুলো দিতে দেরি হয়ে গেছে। আপনাকে দেখে লজ্জা হচ্ছিল। আপনার দিকে তাকাতে লজ্জাবোধ করছিলাম। তাই অন্য পথ ধরেছিলাম।
ইমাম সাহেব বললেন, সুবহানাল্লাহ! সামান্য এ কারণে তুমি আমার থেকে লুকানোর জন্য অন্য পথ ধরেছিলে। যাও! আমার পক্ষ থেকে তোমাব সমস্ত ঋণ মাফ করে দিলাম।
শকীক বলেন, শুধু এতটুকুই নয়। ইমাম সাহেব অনুনয় করে তাকে বলছিলেন, ভাই! আমাকে দেখে তোমার মনে যে লজা বা ভয় এসেছিল। এজন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও।
ইবাদত এবং রিয়াযাত বা সাধনা
কিতাব এবং সুন্নাহের তালীম, ফিকাহর সংকলন এবং ব্যবসায়িক ব্যস্ততার সাথে সাথে যুহদ ও তাকওয়া এবং ইবাদত ও রিয়াযাতে পুরোজীবন অতিবাহিত করেন। বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ শরীক বলেন, আমি হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান, আলকামা বিন মারছাদ, মুহারিব বিন দিছার, আওন বিন আব্দিল্লাহ, আব্দুল মালেক বিন উমায়ের, আবু হুমাম সালুলী, মুসা বিন তালহা এবং আবু হানিফাকে দেখেছি এবং তাঁদের সঙ্গে রয়েছি। এদের মধ্যে কাউকে আৰু হানিফা থেকে অধিক সুন্দরভাবে রাত কাটাতে দেখিনি। আমি তার সাথে এক বছর রয়েছি। এ সময় কখনো রাত্রে তাকে বিছানায় দেখিনি।
আবু নায়ীম বলেন, আমি আমাশ, মেসআর, হামযা যাইয়াত, মালেক বিন মেগওয়াল, ইস্রাইল, উমর বিন ছাবেত শরীক এবং অন্যান্য অনেক উলামার সাথে রয়েছি এবং তাদের সাথে নামায পড়েছি। কিন্তু তাদের কাউকে আবু হানিফা থেকে উত্তম নামায পড়তে দেখিনি। তিনি নামাযের পূর্বে কান্নাকাটি এবং দোয়া করতেন। স্বয়ং ইমাম সাহেব বর্ণনা করেন, কোরআনে এমন কোন সূরা নেই যা আমি নফল নামাযে পড়িনি।
কাসেম বিন মাআন বলেন, এক রাত্রে আবু হানিফা নামাযে দাঁড়ালেন। সারারাত তিনি (আরবি) এ আয়াত পড়ে বারবার পড়ছিলেন এবং কাঁদছিলেন।
যায়েদা নিজের ঘটনা বর্ণনা করেন, এক রাত্রে আমি আবু হানিফার সাথে এশার নামায পড়লাম। ইমাম সাহেব আমার আগমনের সংবাদ জানতে পারেননি। নিভৃতে তাঁকে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করার ছিল। এজন্য এক কিনারে বসে গেলাম। মানুষ নামায পড়ে চলে গেল। ইমাম সাহেব নফল নামায শুরু করলেন। সকাল পর্যন্ত নামাযে তিনি বারবার এ আয়াত পড়তে রইলেন। আমি তাঁর অপেক্ষায় বসে ছিলাম।
কাযী আবু ইউসুফ বলেন, একবার আমি ইমাম সাহেবের সাথে যাচ্ছিলাম। রাস্তায় ছেলেরা তাঁকে দেখে পরস্পরে বলাবলি করতে লাগল, ইনি হচ্ছেন আবু হানিফা। ইনি সারারাত জাগ্রত থাকেন। ইমাম সাহেব বললেন, আবু ইউসুফ দেখ! ছেলেরা কি বলছে, আজ থেকে রাত্রে আমি আর ঘুমাব না।
আব্দুল মজীদ বিন রাওয়াদ বলেন, হজ্জের সময়ে আমি আবু হানিফা থেকে তওয়াফ, নামায এবং ফতোয়ায় অধিক ব্যস্ত অন্য কাউকে দেখিনি। সারাদিন এবং সারারাত্র তিনি ইবাদতে ব্যস্ত থেকে তালীমও দিতেন। একটানা দশদিন পর্যন্ত তিনি নামায, তওয়াফ এবং তালীমে ব্যস্ত ছিলেন।
আব্দুল্লাহ বিন লবীদ বর্ণনা করেন, রমযান মাস আসলে আবু হানিফা কোরআন তেলাওয়াতে নিমগ্ন থাকতেন। আর রমযানের শেষের দশকে তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ হত না।
আমর বিন হাইছাম বলেন, একবার আমি ইমাম সাহেবের নিকট শোবার একটি পত্র নিয়ে উপস্থিত হলাম। তখন আছরের নামাযের সময়। তিনি মসজিদেই আছর, মাগরিব এবং এশার নামায আদায় করে আমাকে নিয়ে ঘরে গেলেন। খানা খাইয়ে আমাকে একটি বিছানায় শুতে দিয়ে তিনি ঘরের এক কোণায় নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। সারারাত নামায পড়লেন।
সকালে আমাকে ঘুম হতে জাগিয়ে ওযুর পানি দিয়ে মসজিদে চলে গেলেন। ফজরের নামাযের পর তিনি নিজ স্থানে বসা ছিলেন। হঠাৎ মসজিদের ছাদ হতে তার উপর একটি সাপ পতিত হল। তিনি সাপটির মাথার উপর পা রেখে নিরবে বসে রইলেন। শান্তভাবে আল্লাহর যিকর আযকার করতে লাগলেন।
সূর্যোদয়ের পরেও তিনি এ দোয়া পাঠ করলেন, এরপর তিনি সাপটি ফেলার নির্দেশ দিলেন। এশরাকের নামাযের পর ইমাম সাহেব এ ঘটনাকে সামনে রেখে একটি হাদীছ শুনালেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের নামাযের পর হতে সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর যিকর ব্যতিত কোন কথা না বলে সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী। ‘
এ ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় হাদীছের মর্মানুসারে আমল করার ব্যাপারে ইমাম সাহেবের আকাঙ্খা কী পরিমান ছিল।
ইমাম সাহেবের মুজাহাদা, রিয়াত, তাহাজ্জুদ এবং রাত্রি জাগরণের ঘটনা জীবনীকারগণ এতবেশী উল্লেখ করেছেন যে, সেগুলো তাওয়াতুর বা বহুল বর্ণিত সংবাদের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। মুহাম্মদ বিন ইউসুফ সালেহী এবং মুজাম কিতাবের লিখক উল্লেখ করেন, ইমাম সাহেবের অধিক পরিমাণে রাত্রি জাগরণের কারণে তাকে ওতাদ (পেরেক) বলা হত। এ সম্পর্কে বিভিন্ন কিতাবে একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণিত হয়ে আসছে। ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিবেশীর এক ছোট ছেলে পিতাকে জিজ্ঞাসা করল, আব্বাজান! আবু হানিফার ছাদে প্রতিরাত্রে যে স্তম্ভটি দেখতে পেতাম সেটি কেথায়? পিতা আদরের সাথে ছেলেকে বললেন, হৃদয়ের টুকরা! সেটি কোন স্তম্ভ ছিল না। সেটি ছিল শরীয়তের স্তম্ভ আবু হানিফা।
ইমাম সাহেবের রিয়াত এবং মুজাহাদা দেখে জনৈক ভক্ত একটি কবিতা বলে উঠলেন যার অর্থ হচ্ছে
আবু হানিফার দিবস হচ্ছে অন্যকে উপকৃত করার জন্য। আর আবু হানিফার রাত্র হচ্ছে আল্লাহর ইবাদতের জন্য।
খতীবে বাগদাদী আবু মুহাম্মদ আল হারেছী’ আবু আব্দিল্লাহ বিন খসরু প্রমুখ মেসআর বিন কিদাম হতে তাঁর একটি উক্তি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর খিদমতে তার মসজিদে উপস্থিত হলাম। দেখতে পেলাম যে, তিনি ফজরের নামায আদায় করে লোকজনকে ইলমে দ্বীন শিক্ষাদানে মশগুল হয়ে গেছেন। শিক্ষাদানের এ ধারা যোহরের নামাযের সময় পর্যন্ত চলল। অতঃপর যোহরের নামাযের জন্য বিরতি দেয়া হল। যোহরের নামাযের পর আছর পর্যন্ত, আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত এবং মাগরিব থেকে এশা পর্যন্ত সেস্থানে বসে বসে তালীম দিতে রইলেন। এক নাগাড়ে ইলম শিক্ষা দানে ইমাম সাহেবের ব্যস্ততা দেখে আমি আশ্চর্যম্বিত হলাম। তাঁর শিক্ষাদানের একাগ্রতা এবং মাসায়েল শিখানোর ব্যস্ততা যদি এরূপ হয় তবে তিনি কিতাব অধ্যয়ন করার জন্য এবং নফল ইবাদত করার জন্য সময় পান কখন? সুন্নত, নফল এবং মুস্তাহাব কাজগুলো কিভাবে আদায় করে থাকেন? আমি এরূপ চিন্তায় থাকতে থাকতেই লোকজন এশার নামায পড়ে চলে গেল। এরপর দেখতে পেলাম ইমাম সাহেব পরিষ্কার সাদা পোশাক পরিধান করে খুশবু লাগিয়ে মসজিদের এ কোণে এসে নামাযে দাঁড়িয়ে গেছেন। সোবহে সাদেক পর্যন্ত তিনি নামায পড়লেন। রাত্রি জাগরণ এবং ইবাদত রিয়াত শেষে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন। এরপর যখন তিনি পুনঃবার আসলেন তখন তাঁর পোশাক পরিবর্তিত ছিল। ফজরের নামাজ জামাতের সহিত আদায় করলেন। এরপর পূর্বের মত তালীম এবং তাদরীসের কাজ শুরু হল। এশা পর্যন্ত তা চলল। আমি মনে মনে ভাবলাম, আজ রাত অবশ্যই তিনি বিশ্রাম করবেন। কারণ গত দিবস এবং রাত্র পুরোটাই জাগ্রত ছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় রাত্রি আগের রাতের মত কাটিয়ে দিলেন। তৃতীয় রাত্রিও আগের রাতের মত অতিবাহিত করলেন। এরপর সিন্ধান্ত নিলাম যে, আমি আবু হানিফার শিষ্যত্ব এবং সঙ্গ ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড়ব না যতক্ষণ না তাঁর কিংবা আমার মৃত্যু ঘটে। তাই আমি সেই মসজিদে অবস্থান করতে লাগলাম। সেখানে আমার অবস্থান কালে ইমাম সাহেবকে দিনে কখনো বে-রোজা এবং রাত্রে কখনো জাগ্রত ছাড়া দেখিনি। তবে যোহরের পূর্বে কিছুক্ষণ আরাম করে নিতেন। এটাই তার স্বাভাবিক নিয়ম ছিল।
ইবনে আবি মুয়ায বর্ণনা করেন, মেস’য়ার বিন কিদাম বড়ই সৌভাগ্যবান। তার মৃত্যুও ইমাম সাহেবের মসজিদে সেজদার অবস্থায় হয়েছিল।
ইমাম সাহেবের মুনাজাত
ইয়াযীদ বিন কুমাইত বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেব সর্বদাই আল্লাহর ভয়ে ভীত এবং পরকালের চিন্তায় চিন্তিত থাকতেন।
একবার আলী ইবনুল হুসাইন আল মুয়াজ্জেন আমাদেরকে এশার নামায পড়ালেন। নামাযে তিনি সুরায়ে যিলযাল তেলাওয়াত করলেন। আমাদের সাথে ইমাম আবু হানিফাও তার পিছনে নামায পড়ছিলেন। নামাজ শেষে লোকজন চলে গেলো। কিন্তু ইমাম সাহেব তাঁর জায়গায় বসে রইলেন। মনে হলো তিনি পরকালের চিন্তা করছেন। আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিন্তু ইমাম সাহেব চিন্তায় নিমগ্ন থাকার কারণে আমি ভাবলাম ইমাম সাহেব আমার প্রতি লক্ষ্য করবে না। তাই আমি চলে গেলাম। অবশ্য বাতিটি রেখে গেলাম। তাতে তেল অপর্যাপ্ত ছিল। ফজরের সময় হলে আমি নিয়মানুসারে মসজিদে গেলাম। দেখতে পেলাম ইমাম সাহেব আল্লাহ তাআলার দরবারে দাঁড়িয়ে আছেন। স্বীয় দাড়ি হাত দ্বারা ধরে অনুনয় বিনয়ের সহিত কেঁদে কেটে দোয়া করছেন। বলছেন, হে আল্লাহ! যদি কেউ সামান্য পরিমাণও নেক কাজ করবে আপনি তাকে তার পুরা প্রতিদান দিবেন। আর যে কেউ অণু পরিমাণও পাপ করবে আপনি তাকে শাস্তি দিবেন। আপনার এ দুর্বল বান্দা নোমানকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করুন। ছোট বড় সকল খারাপ কাজ হতে বাঁচিয়ে রাখুন। আপনার রহমতের দরিয়ায় তাকে আশ্রয় দিন।
আলী ইবনে হুসাইন বলেন, আমি ইমাম সাহেবের নিকটবর্তী হলাম। দেখলাম যে, বাতিটি জ্বলছে আর ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে দোয়ায় মগ্ন রয়েছেন। আমাকে দেখে বললেন, বোধ হয় তুমি তোমার চেরাগ নিতে এসেছ। আমি আরজ করলাম, জনাব! রাত অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। ফজরের আযানও দিয়ে দিয়েছে।
ইমাম সাহেব বুঝে গেলেন যে, সে আমার সমস্ত অবস্থা দেখে ফেলেছে। বড়ই মিনতির সাথে বললেন, তুমি যা দেখেছ তা গোপন রাখবে; কারো কাছে প্রকাশ করবে না।
অতঃপর ইমাম সাহেব নিজেকে সামলে নিয়ে দু’রাকাত নামায পড়ে মসজিদে বসে রইলেন। নামায শুরু হলে তিনি আমাদের সাথে নামায পড়লেন।
আমার বিশ্বাস, ইমাম সাহেব ফজরের নামায এশার অযু দ্বারা আদায় করেছেন।
ইলমের সাথে আমল প্রয়োজন
ইসলামের বিশিষ্ট ওলীদের মধ্যে দাউদ তায়ী অন্যতম। তিনি ইমাম সাহেবের প্রথম যুগের শিষ্য ছিলেন। তাঁর শিষ্যত্বে থেকে তিনি হাদীছ, ফিকাহ, তফসীর, কিরাত প্রভৃতি বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন।
একদিন ইমাম সাহেব তাকে বললেন, দাউদ! উপকরণ তো তোমার পরিপূর্ণ হয়েছে। দাউদ তায়ী আরয করলেন, কোন জিনিস বাকী রয়েছে কি?
ইমাম সাহেব বললেন, হাঁ, ইলম অনুযায়ী আমল করা বাকী রয়েছে।
ইমাম সাহেব এ কথা বলার সাথে সাথেই সেখান থেকে উঠে গিয়ে তিনি উত্তরাধিকারী সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি চারশত দিরহামে বিক্রি করে দিয়ে দুনিয়াবী ঝামেলা হতে মুক্ত হয়ে যান। এরপর মানুষের সাথে খুব কমই মেলামেশা করতেন। একদিন ফোযায়েল বিন আয়ায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। দরজা খুললেন। ফোযায়েল বাইরে বসে কাঁদতে লাগলেন। দাউদ তায়ী ভিতরে বসে ক্রন্দন করছিলেন। ফোযায়েল বললেন, যাব কোথায় আমি তো মানুষের তালাশ করছি। দাউদ তায়ী বললেন, জী হ্যা এটাই সে হারানো বস্তু যা তালাশ করলেও পাওয়া যায় না।
মায়ের সেবা
ইমাম সাহেবের পিতা-মাতা বড়ই নেককার ছিলেন। ব্যবসার ব্যস্ততা সত্ত্বেও ধর্মীয় জীবন যাপন করতেন। আহলে ইলমদের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। পিতা ছাবেত বিন নোমান তাবেঈ ছিলেন। বাল্যকালে তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর যিয়ারত লাভ করেন এবং তাঁর দোয়াপ্রাপ্ত হন। হযরত আমর বিন হুরাইছ মাখযুমী (রাঃ)-এর বাড়ীতে তাঁর দোকান ছিল। সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সাথে সাক্ষাত হত। তাঁর পুত্রকে নিয়ে তিনি হজ্জে যান এবং সেখানে পিতা-পুত্র উভয়ই হযরত আব্দুল্লাহ বিন হারেছ (রাঃ)-এর যিয়ারত লাভ করেন। ইমাম সাহেব তাঁর পিতা-মাতার খিদমতের জন্য সদা প্রস্তুত থাকতেন। তাঁদের ইন্তেকালের পর সদা তাঁদের জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলেন, আমি আমার নেক আমল গুলোকে তিনভাগ করেছি। একভাগ নিজের জন্য, একভাগ পিতা-মাতার জন্য, আরেকভাগ আমার উস্তাদ হাম্মাদের জন্য।
ইমাম সাহেবের পিতা আগে মারা যান। তাঁর মাতা পরে ১৩০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। এজন্য সেবা করার অধিক সুযোগ পেয়েছেন।
কাযী আবু ইউসুফ বলেন, ছাত্রজীবনে ইমাম সাহেব তাঁর মায়ের কোন কথা অমান্য করতেন না। এমন কি উমর বিন যরের মজলিসে যাওয়ার সময় তাঁর মাকে সওয়ারীর উপর বসিয়ে নিয়ে যেতেন। হাসান বিন যিয়াদ বর্ণনা করেন, একবার ইমাম সাহেবের মাতা কোন ব্যাপারে কসম করলেন এবং এ সম্পর্কে তাঁর ছেলের নিকট ফতোয়া জিজ্ঞেস করলেন। ইমাম সাহেব উত্তর দিলেন। কিন্তু এতে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন না। বললেন যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি যুরআর নিকট জিজ্ঞেস না করবে আমি নিশ্চিন্ত হব না। ইমাম সাহেব তাঁর মাকে নিয়ে যুরআর নিকট গেলেন। তাঁর মা নিজেই তাঁকে ফতোয়া জিজ্ঞেস করলেন। যুরআর আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, কূফার ফকীহ আপনার সাথে আপনাকে কি ফতোয়া দিব? ইমাম সাহেব তাঁকে ফতোয়ার উত্তর জানিয়ে বললেন, আপনি এভাবে ফতোয়া দিন। তিনি তদ্রুপই করলেন। ইমাম সাহেবের মাতা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে এলেন।
কুফার আমীর ইয়াযীদ বিন উমর ফাযারী ইমাম সাহেবকে কাযীর পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এতে ইয়াযীদ তাঁকে একশত দুররা মেরে শাস্তি দিল। তিনি বললেন, এ শাস্তিতে আমার তত কষ্ট হয়নি যতটুকু হয়েছিল এ ঘটনায় আমার মায়ের দুঃখ-কষ্ট এবং চিন্তার কারণে। মা বললেন, নোমান! যে ইলমের কারণে তোমার এ অবস্থা, তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন কর। আমি বললাম, যদি এ ইলম দ্বারা দুনিয়া লাভ করতে চাইতাম তবে অনেক বেশী অর্জন করতে পারতাম। এ ইলম আমি শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি এবং নিজের নাজাতের জন্য অর্জন করেছি।
স্বভাব চরিত্র এবং ব্যক্তিগত জীবন
ইমাম সাহেব জন্মলাভ করেছিলেন এবং লালিত-পালিত হয়েছিলেন একটি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারে। প্রচুর সম্পদের মালিক ছিলেন। কিন্তু তিনি খুবই সাদাসিধা ভাবে চলতেন। তিনি বলেন, চল্লিশ বছর পর্যন্ত আমার নিয়ম এই ছিল যে, প্রতি বছর চার হাজার দিরহাম আমার নিকট রাখতাম এবং অতিরিক্ত টাকা খরচ করে ফেলতাম। কারণ, হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন, পারিবারিক ব্যয়ের জন্য সর্বোচ্চ চার হাজার দিরহামই যথেষ্ট। যদি আমার এ আশংকা না থাকত যে, নিজের প্রয়োজনের জন্য সম্পদশালীদের নিকট ধর্ণা দিতে হবে তাহলে একটি দিরহামও আমার নিকট রাখতাম না।
ফয়েয বিন মুহাম্মদ রাকী বলেন, একবার আমি বাগদাদে আবু হানিফার সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, আমি কুফায় যাওয়ার আশা করেছি। কোন সংবাদ থাকলে বলুন। ইমাম সাহেব বললেন, তুমি আমার ছেলে হাম্মাদের সাথে সাক্ষাৎ করে আমার পক্ষ থেকে বলবে যে, আমার মাসিক ব্যয় দুই দিরহাম। কখনও ছাতু, কখনও রুটি খেয়ে কালাতিপাত করি। আর তুমি তাও পাঠাচ্ছ। তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দাও।
অভাবগ্রস্ত উলামা, মুহাদ্দিছ এবং মাশায়েখদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য কিছু ব্যবসায়িক দ্রব্য বাগদাদে পাঠিয়ে দিতেন। সেগুলো ওখানে বিক্রয় করে অন্য দ্রব্য কূফা হতে আনিয়ে নিতেন। যেগুলো তথায় বিক্রয় হত। সারা বছরের লাভ তিনি সংগ্রহ করে আহলে ইলমদের পিছনে ব্যয় করতেন এবং তাদেরকে বলতেন, আপনারা শুধুমাত্র আল্লাহর শোকর করবেন। কারণ আমি আমার পুঁজির কিছুই দেইনি। এসবই আপনাদের দ্রব্যের লাভ।
শরীক বলেন, ইমাম সাহেব নিজের সমস্ত ছাত্রের ব্যয় বহন করতেন, যেন তারা নিশ্চিন্ত মনে তালীম হাসিল করতে পারে। লেখাপড়া শেষ হওয়া পর্যন্ত তাদের সন্তানদের ভাতা দিতেন। লেখাপড়া থেকে অবসর হলে তাদেরকে বলতেন, তোমরা হালাল হারামের পরিচয় লাভ করে গনীয়ে আকবার বা শ্রেষ্ঠ ধনীর মর্যাদায় পৌছে গেছ।
হাসান বিন যিয়াদ লুলুঈ বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেব শাগরেদদেরকে হীন অবস্থায় দেখলে দরসী মজলিস শেষে তাদের বসার নির্দেশ দিতেন। অতঃপর তাদেরকে আর্থিক সাহায্য করতেন। একদিন এক তালেবে ইলমের গায়ে পুরোনো ছেড়া জামা দেখে নিয়ম মাফিক তাকে বসতে বললেন। সবাই চলে গেলে তাকে বললেন, মুসাল্লা সরিয়ে দেখ, ওর নীচে মুদ্রা আছে সেগুলো নিয়ে নাও এবং নিজের অবস্থা পরিবর্তন কর। ঐ তালেবে-ইলম বলল, আমি ধনী ব্যক্তি। সুখ-সমৃদ্ধির মাঝেই কালাতিপাত করি। আমার এর প্রয়োজন নেই। ইমাম সাহেব বললেন, তোমার কি এই হাদীছ জানা নেই। আল্লাহ তা’আলা আপন বান্দাদের মধ্যে তাঁর নিয়ামতের নিদর্শন দেখতে পছন্দ করেন। তুমি যদি ধনী ব্যক্তি হয়ে থাক তাহলে নিজের অবস্থা সংশোধন করে নাও, যাতে তোমার বন্ধুরা তোমার এ অবস্থা দেখে দুঃখিত না হয়।
কেউ ইমাম সাহেবের দরসী হালকার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে গিয়ে বসে যেত। ইমাম সাহেব তার অবস্থা জিজ্ঞেস করতেন। যদি অভাবগ্রস্ত হত তবে তার অভাব পূরণ করে দিতেন। যদি অসুস্থ হত তবে তার সেবা শুশৃষার জন্য যেতেন এবং তাকীদ করতেন, যেন সে সম্পর্ক বজায় রাখে।
একবার আব্বাসীয় খলীফা আবু জাফর মনসুর ইমাম সাহেবের নিকট ত্রিশ হাজার দিরহাম পেশ করলেন। তিনি বললেন, হে আমীরুল মুমেনীন! আমি বাগদাদ শহরে একজন অপরিচিত মুসাফির। এখানে এগুলো হিফাযত করার জায়গা নেই। আপনিই এগুলো আমার নামে বাইতুল মালে রেখে দিন। আবু জাফর তাই করলেন। ইমাম সাহেব দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন আর সেগুলো এভাবেই পড়ে রইল।
মুহাম্মদ বিন আব্দির রহমান মাসউদী বলেন, আমি আবু হানিফা হতে অধিক আমানতদার কাউকে দেখেনি। মৃত্যুর সময় তাঁর নিকট পঞ্চাশ হাজার দিরহাম মূল্যের জিনিসপত্র আমানত ছিল। তার থেকে একটি দিরহামও বিনষ্ট হয়নি।
কাযী আবু ইউসুফ বলেন, একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা ইমাম সাহেবের দরসী হালকায় তাঁর আশেপাশে বসা ছিলাম। উপস্থিতদের মধ্যে দাউদ তাই, কাসেম বিন মাআন, আফিয়া বিন ইয়াযীদ, ওকী বিন জাররাহ, মালেক বিন মগেওয়াল, যুফার বিন হুযাইল প্রমুখ ছিলেন। ইমাম সাহেব আমাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা আমার হৃদয়ের আনন্দ, নয়নের আলো। আমি তোমাদেরকে দ্বীনের জ্ঞান দিয়ে এর যোগ্য করে তুলেছি। লোকেরা তোমাদের অনুসরণ করবে। তোমাদের প্রত্যেকেই কাযী হওয়ার যোগ্য। আমি আল্লাহ তাআলা এবং তোমাদের ইলমের দোহাই দিয়ে বলছি, বিনিময় ও মযদুরীর অপমান থেকে ইলমে দ্বীনকে রক্ষা করবে। একে জীবিকার মাধ্যম বানাবে না। তোমাদের কেউ যদি কাযী পদে অধিষ্ঠিত হয় এবং এ ব্যাপারে নিজের মধ্যে কোন ত্রুটি অনুভব করে যেটা সম্পর্কে জনসাধারণ অবগত নয় তবে তার জন্য এ পদে থাকা বৈধ হবে না। আর যদি বাধ্য হয়ে সে পদে যেতেই হয় তবে সর্বসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে না। সবার মহল্লার মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে। তাদের দ্বীনি প্রয়োজন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। যদি অসুস্থ হয়ে পড় এবং বিচারের মজলিসে উপস্থিত না হও তবে অনুপস্থিত দিনের ওযীফা নিবে না।
যে ব্যক্তি কোন বিচারে বে-ইনসাফী করবে, তার সে বিচার গ্রহণযোগ্য হবে না।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর জীবনের প্রতিটি দিক এমন আকর্ষণীয় ছিল যে, প্রত্যেক শ্রেণীর লোকেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হত। উলামা, উমারা এবং সাধারণ শ্রেণীর লোক প্রত্যেকেই তাঁর বশ্য ছিল। ফলে পৃথিবীর পুরাতন ধারা মতেই তাঁর পরশ্রীকাতর এবং তাঁর অমঙ্গলকামীরা তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার অপবাদ গড়তে লাগল। ইমামগণের কারও বিরুদ্ধে হিংসা-বিদ্বেষ এবং শত্রুতার এত বড় তুফান উঠেনি যা উঠেছিল ইমাম সাহেবের বিরুদ্ধে। এর ধারা আজও বাকী আছে। তার বদনাম গেয়ে আমলনামা কালো করার মত ব্যক্তি বর্তমানেও আছে। এসব হিংসুক অমঙ্গলকামীদের প্রতি উত্তরে তিনি সব সময় দোয়া দিতেন এবং ক্ষমা প্রদর্শন করতেন।
ইউসুফ বিন খালেদ যখন ইমাম সাহেব থেকে শিক্ষা সমাপন করে বসরা ফেরৎ যাচ্ছিলেন, তখন তাকে এ উপদেশ দিলেন যে, বসরায় পূর্ব থেকেই আহলে ইলমদের এক জমাত রয়েছে, যারা ইলমী এবং দ্বীনি বিষয়ে নেতৃত্বের অধিকারী। কাজেই তুমি স্বীয় দরসী হালকা কায়েম করার ব্যাপারে, তাড়াহুড়া করোনা। আর আবু হানিফার উক্তি এরূপ’ এ কথাও বলো না। নচেৎ তোমাকে অতিশীঘ্রই দরসী হালকা থেকে উঠে যেতে হবে। কিন্তু ইউসুফ বিন খালেদ বসরায় পৌঁছেই স্বীয় দরসী হালকা প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন এবং আবু হানিফা এরূপ বলেছেন’ ‘এটা আবু হানিফার উক্তি, এসব বলতে শুরু করলেন। ফলে ইউসুফ বিন খালেদকে মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে হল। এরপর যুফার বিন হুযাইল বসরায় গেলেন এবং তিনি ইমাম সাহেবের পরামর্শ অনুসারে দরসী হালকা প্রতিষ্ঠা না করে বসরার উলামা এবং মাশায়েখদের মজলিসে বসতে লাগলেন। তিনি তাদের মত এবং রায়ের সমর্থনে এমন সব দলীল পেশ করতেন, যেগুলো সম্পর্কে তারা অবগত ছিল না। এ কারণে তাঁরাও আনন্দিত হতেন। এরপর যুফার তাদেরকে বলতেন, এর চেয়েও উত্তম একটি মত আছে। আর সেটাকে দলীল প্রমাণসহ উপস্থাপন করতেন। সে মতটি তাদের অন্তরে বসে গেলে বলতেন, এটা আবু হানিফার মত। তারা এর উত্তরে বলতেন।
অর্থাৎ এটি একটি উত্তম মত। কে বলেছে তা নিয়ে আমরা ভাবি না।’ এত সর্তকতা সত্ত্বেও ইমাম সাহেব সারাজীবন হিংসা সহ্য করে গেলেন এবং এভাবে স্বীয় অন্তরকে পরিস্কার রাখার সাথে সাথে হিংসুকদেরকে এ বলে দোয়া দিতেন।
হে আল্লাহ! যার অন্তর আমাদের কারণে সংকীর্ণ আমাদের অন্তর যেন তাদের কারণে প্রশস্ত থাকে।
ইমাম সাহেব এটাও বলতেন, যে ব্যক্তি আমাকে হিংসা করে আল্লাহ তাআলা তাকে মুফতি বানিয়ে দিন।
এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবের নিকট এসে বললেন, সুফিয়ান ছাওরী আপনার সম্পর্কে অসমীচীন কথা বলেন না। তিনি তার উত্তরে বললেন, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করুন।
ইয়াযীদ বিন কুমাইত বলেন, এক ব্যক্তি আমার সামনে ইমাম সাহেবের কুৎসা বর্ণনা করল এবং তাকে যিন্দীক বলে গালি দিল। ইমাম সাহেব বললেন, আল্লাহ তোমাকে মাফ করুন। তিনি ভালভাবেই জানেন, আমি তা নই যা তুমি বলছ।
আব্দুর রাযযাক সানআনী বর্ণনা করেন, আমি আবু হানিফা হতে অধিক সহনশীল কাউকে দেখিনি। আমরা মসজিদে খায়ফে বসাছিলাম। বসরার এক হাজী ইমাম সাহেবকে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তর দিলেন। সে বলল, এ মাসয়ালায় হাসান বসরী এরূপ বলেন। ইমাম সাহেব বললেন, হাসান বসরী ভুল করেছে। এ কথা শুনে সেখানে উপস্থিত একব্যক্তি ইমাম সাহেবকে খুবই খারাপ গালি দিতে লাগল এবং বলল, তুমি বলছ হাসান বসরী ভুল করেছেন।
এ অবস্থা দেখে অন্যান্যরা তাকে প্রহার করার জন্য এগিয়ে আসল। কিন্তু ইমাম সাহেব সবাইকে বারণ করলেন এবং বললেন, হ্যাঁ হাসান বসরী এ মাসায়ালায় ভুল করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ হাদীছ রেওয়ায়েত করেছেন যা আমার বক্তব্যের সমর্থন করে।
ইমাম সাহেব কুফার জামে মসজিদে পড়াচ্ছিলেন। একব্যক্তি মসজিদের কিনারায় দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেবকে মন্দ বলতে লাগল। তিনি সবকিছু শুনছিলেন এবং পড়াচ্ছিলেন। শাগরেদদেরকেও কথা বলতে নিষেধ করে দিলেন। পড়ানো শেষে ইমাম সাহেব মসজিদ থেকে বের হলে সে ব্যক্তিও ইমাম সাহেবের পিছু নিল। ইমাম সাহেব বাড়ীর দরওয়াজায় পৌঁছে তাকে বললেন, এটা আমার ঘর। তোমার কথা যদি এখনো শেষ না হয়ে থাকে তবে ভিতরে এসে পুরো করে যাও। ভয়ের কিছুই নেই। এই কথা শুনে সে ব্যক্তি লজ্জিত হয়ে ফিরে গেল।
ইমাম সাহেবের মেধা, তীক্ষ্ণজ্ঞান ও অনুভূতি
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) জ্ঞান, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, মেধা অনুভূতি ইত্যাদি গুণে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে শীর্ষে ছিলেন। ফিরাসতে মু’মিন তথা মুমিনের অন্তদৃষ্টির এক বিরাট অংশ তিনি পেয়েছেন। ইমাম যাহাবী লিখেন, ইমাম আবু হানিফা অত্যন্ত প্রতিভাবান ব্যক্তি ছিলেন।
মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ আনসারী থেকে খতীব বাগদাদী বর্ণনা করেন, আবু হানিফার চালচলন এবং কথাবার্তা থেকে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা প্রকাশ পায়।
আলী বিন আসেম বলেন, যদি আবু হানিফার জ্ঞান জগৎবাসীদের অর্ধেকের জ্ঞানের সাথে মাপা হয় তবে তাঁর জ্ঞানের পাল্লা ভারি হবে।
তবীয়া নামক ইমাম সাহেবের এক শাগরেদ বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেব আমাকে বললেন, যখন আমি রাস্তায় চলি অথবা কারও সাথে কথাবার্তা বলি, অথবা দাঁড়িয়ে থাকি কিংবা হেলান দিয়ে থাকি, এমতাবস্থায় আমাকে দ্বীনি বিষয়ে কোন কিছু জিজ্ঞেস করো না। কারণ এ সময় মানুষের বুদ্ধি স্থিতিশীল থাকে না। পরে একদিন আমি ইমাম সাহেবের সাথে পথ চলাকালে ইলমী প্রেরণার বশীভূত হয়ে তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে তার উত্তর লিখে রাখলাম। পরদিন শিক্ষা মজলিসে সবাই উপস্থিত হলে আমি পূর্ব দিনের প্রশ্নগুলো শুনাতে শুরু করলাম। কিন্তু আজ ইমাম সাহেব গতকালের উত্তর গুলোকে ভুল বলে দিলেন এবং বললেন, আমি কি তোমাকে এ কথা বলিনি যে, অমুক অমুক সময়ে আমাকে প্রশ্ন করবে না?
ইমাম সাহেবের মেধা, জ্ঞান এবং তাৎক্ষণিক-বুদ্ধির কয়েকটি দৃষ্টান্ত
কূফার এক ব্যক্তি হযরত উছমান (রাঃ)-কে ইয়াহুদী বলত (নাউযুবিল্লাহ)। একদিন ইমাম সাহেব তার নিকট গিয়ে বললেন, আমি তোমার মেয়ের বিবাহের পয়গাম নিয়ে এসেছি। ছেলে একান্তই ভদ্র, সম্পদশালী, হাফেযে কোরআন, দানশীল, খোদাভীরু, নামায রোযার পাবন্দ।
সে বলল, আমি তো এর চেয়েও কম মর্যাদাশীল পাত্রে মেয়ে দিতে রাজী। এ পাত্র তো খুবই ভাল। ইমাম সাহেব বললেন, কিন্তু একটি কথা হলো ছেলেটি ইয়াহুদী। এ কথা শুনেই সে কঠোরভাবে অস্বীকৃতি জানালো। সে বলল, একজন ইয়াহুদীর সঙ্গে আপনি আমার মেয়ের বিবাহ দিতে চান? ইমাম সাহেব উত্তরে বললেন, তোমার ধারণায় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দুজন কন্যার বিবাহ একজন ইয়াহুদীর সাথে দিয়েছিলেন কি? এ কথা শুনতেই সে বলল, আসতাগফিরুল্লাহ! আমি তওবা করছি। আর কখনও এমন কথা বলব না।
খলীফা আবু জাফর মনসুর একবার হজ্জের সময় মসজিদে হারামের সংকীর্ণতা দেখে তা প্রশস্ত করার ইচ্ছা করলেন। আশেপাশের ঘরগুলোকে। হারামের সাথে মিলানোর জন্য সেগুলোর মালিকদেরকে অর্থ দিতে চাইলেন। কিন্তু কোন মতেই হারামের পরশ ছেড়ে যেতে রাজি হলেন না। আবু জাফর মনসুর বড়ই চিন্তিত হলেন। জোরপূর্বকও তা দখল করে নেয়া যায় না। এ বৎসর আবু হানিফাও হজ্জে গিয়েছিলেন। লোকেরা তা জানতে পারেনি। আর তখনও তিনি মুফতী এবং ফকীহ হিসাবে প্রসিদ্ধ ও পরিচিত হননি। ইমাম সাহেব এ ঘটনা জানতে পেরে স্বয়ং আবু জাফরের নিকট গেলেন এবং বললেন, এটা খুবই সহজ ব্যাপার। আমীরুল মুমেনীন! ঘরের মালিকদের ডেকে জিজ্ঞেস করুন যে, কাবা তোমাদের প্রতিবেশী হিসাবে এসেছে, না তোমরা তার পাশে এসে বসতি স্থাপন করেছ? যদি তারা বলে, কাবা আমাদের প্রতিবেশী হয়ে এসেছে তবে তা মিথ্যা। আর যদি বলে, আমরা তার নিকট এসে বসতি স্থাপন করেছি; তবে তাদেরকে বলা হবে যে, যিয়ারতকারী এবং হাজীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। মেহমানদের তুলনায় তার আঙ্গিনা ছোট হয়ে গেছে। আর সে নিজের সম্মুখস্ত ময়দানের অধিক হকদার। অতএব তার জন্য তার নিজের জায়গা খালী করে দাও। আবু জাফর ইমাম সাহেবের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়ীর মালিকদের ডেকে এ কথাই বললেন। হাশেমী প্রতিনিধিরা স্বীকার করলেন যে, আমরাই কাবার নিকট এসে বসতি স্থাপন করেছি। এরপর সবাই নিজ নিজ বাড়ী বিক্রয় করতে রাজী হয়ে গেলেন।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, পাত্রে গোশত পাকানো হচ্ছিল। এমতাবস্থায় তাতে একটি পাখী পড়ে মারা গেল। এ ব্যাপারে আপনি কি বলেন? ইমাম সাহেব তার শাগরেদদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এ মাসয়ালার ব্যাপারে কি রায় দাও? তাঁরা হ্যরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের একটি হাদীছ উল্লেখ করলেন, যার মর্মমতে শোরবা ফেলে দিয়ে গোশত ধুয়ে খাওয়া যাবে। ইমাম সাহেব বললেন, আমিও তাই বলি। তবে যদি পাখী ফুটন্ত পানিতে পড়ে থাকে তবে গোশত এবং শোরবা দুটোই ফেলে দিতে হবে। আর যদি ঠাণ্ডা হবার পর পড়ে থাকে তবে শোরবা ফেলে দিতে হবে এবং গোশত পরিস্কার করে খাওয়া যাবে। আব্দুল্লাহ বিন মুবারক এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন পাত্রে পানি ফোটাকালে পাখী পড়লে তা মশল্লার মতই গোশতের সাথে মিশে যাবে এবং ক্রিয়া ভিতরে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু ঠাণ্ডা থাকাকালে পড়লে গোশতের সাথে লেগে যাবে কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করবে না। এ কথা শুনে ইবনে মুবারক বললেন, এটা অতি মূল্যবান কথা।
এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবের নিকট এসে বলল, আমি ঘরে কোন একটি বস্তু মাটিতে পুঁতে রেখেছিলাম। এখন ঐ জায়গা ভুলে গিয়েছি। ইমাম সাহেব বললেন, তোমার জানা নেই তো আমি বলব কিভাবে? অতঃপর শাগরেদ দেরকে নিয়ে তার বাড়ীতে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাপড়-চোপড় কোথায় রাখ? সে স্থান দেখিয়ে দিলে ইমাম সাহেব শাগরেদদেরকে নিয়ে সেখানে গেলেন এবং তাদেরকে বললেন, তোমরা এ ঘরে কোন জিনিস পুঁতে রাখলে কোথায় রাখতে? পাঁচজন তালেবে ইলম নিজ নিজ জায়গা চিহ্নিত করল। ইমাম সাহেব সে জায়গাগুলো খনন করতে নির্দেশ দিলেন। তৃতীয় জায়গা খনন করার সময় উক্ত জিনিস পাওয়া গেল।
তদ্রুপ অন্য এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবকে তার পুঁতে রাখা বস্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এটা ফিকাহর কোন মাসয়ালা নয় যে, আমি তোমাকে জানাব। যাও সারারাত নামায পড়। তোমার জিনিস মিলে যাবে। সে ব্যক্তি তাই করল। রাত্রের এক চতুর্থাংশ অতিবাহিত হতে না হতেই স্মরণ হয়ে গেল। সে ব্যক্তি ইমাম সাহেবের নিকট এসে ঘটনা বর্ণনা করল। তিনি বললেন, আমার জানা ছিল যে, শয়তান তোমাকে সারারাত নামায পড়তে দিবে না। আফসোস! তুমি যদি আল্লাহর শোকর আদায় করে সারারাত নামায পড়তে।
ইমাম সাহেবের দরসী হালকার সম্মুখ দিয়ে একব্যক্তি যাচ্ছিল। তিনি বললেন, এ ব্যক্তি এখানে নতুন এসেছে, তার আস্তিনে মিষ্টি লেগে আছে, আর এ ব্যক্তি বাচ্চাদের মু’আল্লিম। এক শাগরেদ তার পিছে পিছে গিয়ে যাচাই করে দেখল যে, তিনটিই ঠিক। শাগরেদরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এ ব্যক্তি পথ চলার সময় ডানে বাঁয়ে দেখছিল। অপরিচিত ব্যক্তি এরূপই করে থাকে। তার আস্তিনে মাছি বসা ছিল; এতে বুঝলাম যে, সেখানে মিষ্টি লেগে আছে। আর ঐ ব্যক্তি বাচ্চাদের দিকে দেখছিল, এতে অনুমান করলাম যে, সে’মুআল্লিম।
একদিন কতক লোক ইমামের পিছনে কিরআত সম্পর্কে তর্ক করার জন্য ইমাম সাহেবের নিকট সমবেত হল। ইমাম সাহেব বললেন, আমি এত লোকের সাথে একা কিভাবে কথা বলব। সবার পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করে দিলে তার সাথে আলোচনা করব। সবাই এতে সম্মত হয়ে একজনকে নির্বাচিত করে দিলে তিনি বললেন, তোমাদের সাথে আমার তর্ক শেষ। যেভাবে সবার পক্ষ থেকে তোমরা একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করে দিলে, নামাযেও ঠিক তাই হয়।
মুক্তাদীদের পক্ষ হতে ইমাম প্রতিনিধি হন
একবার খারেজীদের নেতা যাহ্হাক ইমাম সাহেবের নিকট এসে তলোয়ার উচিয়ে বলল, আপনি তওবা করুন। ইমাম সাহেব বললেন, কোন কথা থেকে। সে বলল, এ আকীদা হতে যে, হযরত আলী এবং হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর বিবাদ মিটানোর জন্য তৃতীয় ব্যক্তিকে সালিশ মানা হয়েছে। কারণ যদি তিনি সত্যের উপর থেকে থাকেন তাহলে তৃতীয় ব্যক্তিকে মানার অর্থ কি? ইমাম সাহেব বললেন, আমার কিছু বলার অনুমতি আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ আমি তর্কই চাই। ইমাম সাহেব বললেন, যদি তর্কের মাধ্যমে, আমরা সিদ্ধান্তে পৌছতে না পারি তবে কি হবে? সে বলল, জয় পরাজয় নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য তৃতীয় ব্যক্তিকে সাব্যস্ত করে নিব। অতঃপর সে নিজেই নিজদল থেকে একজনকে সাব্যস্ত করে নিল। ইমাম সাহেব বললেন, এ কাজটিই তো হযরত আলী (রাঃ) করেছিলেন। তাঁকে কিভাবে দোষারোপ করা যায়? এ কথা শুনে যাহহাক স্তব্ধ হয়ে গেল।
একদিন ইমাম সাহেব, সুফিয়ান ছাওরী, ইবনে আবি লায়লা প্রমুখ একটি মজলিসে বসা ছিলেন। একব্যক্তি এসে এ মাসয়ালাটি জিজ্ঞেস করল যে, এক স্থানে কতক লোক বসা ছিল। হঠাৎ একটি সাপ একজনের গায়ে এসে পড়ল। সে আত্মরক্ষার্থে সাপটিকে নিক্ষেপ করল। তা আরেক জনের উপর গিয়ে পড়ল। সেও তদ্রুপ করল। এভাবে কয়েক জনের পর এক জনকে সাপটি দংশন করলে সে মারা গেল। এখন এর দিয়াত (রক্তপণ) কার উপর ওয়াজিব হবে? উত্তরে কেহ বললেন, দিয়াত সবাইকে দিতে হবে। আবার কেহ বললেন, প্রথম জনকে দিতে হবে। প্রত্যেকেই ভিন্নমত প্রকাশ করল। পরিশেষে সবাই ইমাম সাহেবকে তাঁর মত জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, প্রথম ব্যক্তি তার দেহ হতে সাপ নিক্ষেপ করার পর দ্বিতীয় ব্যক্তি যখন তার দেহ হতে সাপ নিক্ষেপ করে বেঁচে গেল, তখন প্রথম ব্যক্তি অপরাধ হতে মুক্ত হল। এভাবে প্রত্যেকেই মুক্ত হল। বাকী রইল যার নিক্ষেপের পর শেষ ব্যক্তি মারা গেল। এখন দেখতে হবে যদি তার সাপ নিক্ষেপের সাথে সাথেই তাকে দংশন করে থাকে তবে দিয়াত দিতে হবে। আর যদি সাথে সাথে দংশন না করে থাকে বরং কিছুক্ষণ পরে করে থাকে, তবে তার দিয়াত দিতে হবে না। কারণ সে তার অলসতার কারণে মারা গেছে। ইমাম সাহেবের এ মতে সবাই একমত হলেন।
একবার তৎকালীন খলীফা স্বপ্লে মালাকুল মউতকে দেখে তার হায়াত কতদিন আছে জানতে চাইলে তিনি পাঁচ আঙ্গুল দ্বারা ইঙ্গিত করলেন। পরদিন এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞেস করা হল। কিন্তু কেউ এর ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না। পরে ইমাম সাহেবকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, পাঁচ আঙ্গুল দ্বারা সে পাঁচটি ইলমের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যেগুলো আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। অর্থাৎ
১। কিয়ামত কখন হবে
২। বৃষ্টি কখন হবে
৩। গর্ভের সন্তান কেমন হবে
৪। কে আগামীকাল কি আয় করবে
৫। কে কোথায় মারা যাবে।
একবার বাগদাদের ইয়াহুদী ইমাম সাহেবের নিকট এসে তাঁকে অনেক প্রশ্ন করল। তিনি সব কয়টি প্রশ্নের উত্তর দিলেন। তন্মধ্যে একটি প্রশ্ন এটা ছিল, এ দুনিয়ায় কোন শহরে ষাটটি মহল্লা,আছে যার ত্রিশটি উজ্জল ত্রিশটি অন্ধকার? অন্ধকার মহল্লার মধ্যে একটি মহল্লা এমন রয়েছে যা হাজার মহল্লা হতে উত্তম।
ইমাম সাহেব উত্তরে বললেন, শহরটি হল রমযান শরীফের মাস। ষাটটি মহল্লা হল ত্রিশদিন এবং ত্রিশরাত। রাত্রি অন্ধকার আর দিন উজ্জল। রাত গুলোর মধ্যে একটি রাত হাজার রাত হতে উত্তম। সেটি হচ্ছে লাইলাতুল কদর। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন লাইলাতুল কদর সহস্র রজনী হতে উত্তম।
একদিন ইমাম আবু হানিফা খলীফা মনসুরের দরবারে উপস্থিত হলেন। সেখানে খলীফার পেশকার রবী উপস্থিত ছিল। সে বলল, এ ব্যক্তি আমীরুল মুমেনীনের দাদা আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের বিরোধীতা করে। কারণ তাঁর কথা ছিল, কোন ব্যক্তি যদি কোন বিষয়ে কসম করে একদিন পরও ইনশাআল্লাহ বলে তা কসমের সাথে গণ্য হবে, তার কসম পূরণ করতে হবে না। আর এ ব্যক্তি বলেছে, কসমের সাথে সাথেই যদি ইনশাআল্লাহ’ বলা হয় তবে তা কসমের সাথে গণ্য হবে নচেৎ কসমের সাথে গণ্য হবে না।
ইমাম সাহেব বললেন, আমীরুল মু’মেনীন! রবীর ধারণামতে আপনি লোকদের যে বাইয়াত নিয়েছেন, তার কোন মূল্য নেই। কারণ লোকেরা দরবারে বাইয়াত করে বাড়ী গিয়ে যদি ইনশাআল্লাহ বলে, তবে রবীর ধারণা মতে এ বাইয়াত অর্থহীন হয়ে যাবে। খলীফা মৃদু হেসে বললেন, আবু হানিফার মাথা আনতে তোমার অস্ত্র চলতে পারে না। দরবার হতে বের হয়ে রবী বলল, আপনি আজ আমার জীবন নাশ করে ফেলছিলেন। ইমাম সাহেব বললেন, এটা তোমারই ইচ্ছা ছিল। আমি শুধু তা প্রতিহত করেছি মাত্র।
একদিন ইমাম সাহেব মসজিদে বসা ছিলেন। এমন সময় খারেজীদের একদল মসজিদে প্রবেশ করল। লোকেরা ভয়ে পলায়ন করতে চাইল। ইমাম সাহেব তাদের শান্তনা দিয়ে বসিয়ে রাখলেন। খারেজীদের দলনেতা ইমাম সাহেবের নিকট এসে বলল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি আশ্রয় প্রার্থনাকারী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, মুশরেকীনদের থেকে যদি কোন ব্যক্তি আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দিও, যেন সে আল্লাহর কালাম শুনতে পারে। অতঃপর তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছিয়ে দিও।’ খারেজীদের ধারণা ছিল শুধুমাত্র তারাই মুসলমান, অন্য সবাই কাফির মুশরিক। তাদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব। এখানে ইমাম সাহেবকে পরীক্ষা করার জন্য এসেছিল। কিন্তু ইমাম সাহেবের উত্তর তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করে দিল। তাদের দলনেতা তাদেরকে আদেশ করল তোমরা তাদেরকে কোরআন শুনাও। অতঃপর বাড়ী পৌছিয়ে দাও।
একবার জনৈক খ্রীষ্টান পাদ্রী বাগদাদ এসে ঘোষণা করল যে, যে ব্যক্তি তার চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে সে তার ধর্ম গ্রহণ করবে। এতে তার চারিদিকে অনেক লোক জমায়েত হয়ে গেল। সে পথে ইমাম সাহেবও যাচ্ছিলেন। তিনি ব্যাপারটা জানতে পেরে পাদ্রীর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার প্রশ্ন চারটি কি কি? পাদ্রী বলল, আপনি কি উত্তর দিবেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ! অতঃপর বললেন, আমি উত্তরদাতা আর তুমি প্রশ্নকারী। আর প্রশ্নকারী হতে উত্তরদাতা উত্তম। তাই তোমার উচিত নীচে নেমে এসে আমাকে তোমার স্থানে বসতে দেয়া। সে তাই করল। ইমাম সাহেব আসনে বসে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমার প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, এখন আল্লাহ কি করেন? ইমাম সাহেব উত্তরে বললেন, এখন আল্লাহ তাআলা তোমার মত পাদরীকে নীচে নামিয়ে আমার মত নগণ্য লোককে উপরে উঠালেন। আমাকে সম্মানিত করলেন আর তোমাকে অসম্মানিত করলেন। এ উত্তর শুনে পাদ্রী চুপ হয়ে গেল।
ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তোমার দ্বিতীয় প্রশ্ন কি? পাদ্রী বলল, আল্লাহর পূর্বে কি ছিল? ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তুমি গণনা জান কি? সে বলল, হ্যাঁ! ইমাম সাহেব বললেন, গণনা কর। সে এক, দুই থেকে দশ পর্যন্ত গণনা করল। ইমাম সাহেব বললেন, এবার উলটো দিকে গণনা কর। সে দশ, নয় থেকে এক পর্যন্ত গণনা করল। ইমাম সাহেব বললেন, এরপর আরও গণনা কর। সে বলল, এক এর পূর্বে আর কোন সংখ্যা নেই যে গণনা করব। ইমাম সাহেব বললেন, এ সংখ্যাগুলো সৃষ্ট। তা সত্ত্বেও এক এর পূর্বে কোন সংখ্যা আছে কিনা বলতে পারছ না। আল্লাহ তাআলা স্রষ্টা, সত্যিকারের একক, তাঁর পূর্বে তো কিছুই থাকতে বা হতে পারে না। এ উত্তর শুনে পাদরী নিরব হয়ে গেল।
ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তোমার তৃতীয় প্রশ্ন কি? সে বলল, আল্লাহর মুখ এখন কোন দিকে? ইমাম সাহেব বললেন, মোমবাতি জ্বালানোর পর তার আলোর মুখ কোনদিকে থাকে? পাদরী বলল, আমি বলতে পারব না। ইমাম সাহেব বললেন, ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত মোমবাতির আলোর মুখ সম্পর্কে যখন অজ্ঞ, তখন অনাদি অনন্ত আল্লাহ তাআলার মুখ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা মুখতা নয় কি? এ উত্তরে পাদরী স্তব্ধ হয়ে গেল। ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তোমার চতুর্থ প্রশ্ন কি? সে বলল, এখন আল্লাহ কোথায় আছেন? ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বলতে পার তোমার রূহ দেহের কোথায় আছে? সে বলল, না। ইমাম সাহেব বললেন, রূহ সৃষ্ট। তা কেথায় আছে যখন তুমি বলতে পারছ তখন স্রষ্টা আল্লাহ কোথায় আছেন তা কিভাতে বলা যেতে পারে? পাদরী এ কথা শুনে চুপ হয়ে গেল এবং সর্বান্তকরণে মুসলমান হয়ে গেল।
ইবনে মুবারক (রহঃ) বর্ণনা করেন, আমি ইমাম সাহেবকে একটি মাসয়ালার সমাধান জিজ্ঞাসা করলাম। মাসয়ালাটি ছিল এরূপ, এক ব্যক্তির দুই দিরহামের সাথে অন্য ব্যক্তির একটি দিরহাম মিলে গেল। অতঃপর সে তিন দিরহাম হতে দুই দিরহাম হারিয়ে গেল। কিন্তু সে দুই দিরহাম কোনগুলো ছিল তা জানা গেল না- এখন অবশিষ্ট এক দিরহাম কার হবে?
ইমাম সাহেব উত্তর দিলেন, অবশিষ্ট এক দিরহাম তিনভাগ করে একভাগ এক দিরহাম যার ছিল তাকে দিবে এবং দুই ভাগ দুই দিরহাম ওয়ালাকে দিবে।
ইবনে মুবারক বলেন, এরপর আমি ইবনে শুরুমার সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে এ মাসয়ালাটিই জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, এর পূর্বেও এই সম্বন্ধে কাউকে জিজ্ঞাসা করেছ? আমি আরজ করলাম, হ্যা, ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞাসা করেছি। মাসয়ালার বিবরণ তাঁর নিকট পেশ করলাম। তিনি বললেন, সঠিক উত্তর দেওয়ার ব্যাপারে এ ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা হতে ভুল হয়ে গেছে। অতঃপর মাসয়ালাটি স্পষ্ট করার জন্য তিনি বললেন, যে দুই দিরহাম হারিয়ে গেছে তন্মধ্য হতে এক দিরহামের ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, সেটি দুই দিরহাম ওয়ালার ছিল। তাই বলা যেতে পারে হারানো দুই দিরহামের অবশিষ্ট দিরহাম উভয়ের। কাজেই অবশিষ্ট এক দিরহাম উভয়ের। মধ্যে সমান ভাগে বন্টন করা হবে।
ইবনে মুবারক বলেন, আমার নিকট এ উত্তরটি পছন্দ হলো। এরপর ইমাম সাহেবের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। ইনিই তো সেই ইমাম যার জ্ঞান অর্ধেক দুনিয়াবাসীর জ্ঞানের বিপরীত পাল্লায় যদি রাখা যায় তবে তাঁর পাল্লাই ভারী। হবে। তিনি আমাকে বললেন, ইবনে শুরুমার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তোমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি এরূপ উত্তর দিয়েছেন যে অবশিষ্ট এক দিরহাম। উভয়ের মাঝে সমানভাবে ভাগ হবে। আমি বললাম, আপনি ঠিক বলেছেন।
তখন ইমাম সাহেব বললেন, ভাই! ব্যাপারটা এরূপ নয়। মূলত ব্যাপারটি হল যখন উভয় পক্ষ হতে তিন দিরহাম পরস্পরে মিলে গেল তখন প্রত্যেকটি দিরহাম উভয়ের দিরহামের সংখ্যানুপাতে উভয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কাজেই প্রত্যেকটি দিরহামে দুই দিরহামওয়ালার অংশ হবে তিনভাগের দুই ভাগ। আর এক দিরহামওয়ালার হবে তিন ভাগের একভাগ। তাই দুই দিরহাম হারানোর ফলে তাদের অংশ হিসাবে হারিয়েছে বলে গণ্য করা হবে। আর অবশিষ্ট দিরহাম তাদের অংশীদারিত্বের অংশ হিসাবে বাকী রয়েছে বলে ধরা হবে। কাজেই যার দুই দিরহাম ছিল সে পাবে তিন ভাগের দুই ভাগ। আর যার এক দিরহাম ছিল সে পাবে এক ভাগ।
কাজী শরীক বর্ণনা করেন, একবার ঘটনাক্রমে বনী হাশেমের এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সন্তানের জানাযায় সুফিয়ান ছাওরী, ইবনে শুরুমা, কাজী ইবনে আবি লায়লা, আবুল আহওয়াছ, হাব্বান এবং ইমাম আযম একত্রিত হলেন। এদের ছাড়াও আরো অনেক উলামা, ফকীহ এবং শহরের গণ্যমান্য লোক জানাযায় শরীক ছিলেন।
হঠাৎ জানাযা থেমে গেল। পরস্পরে জানাযা থেমে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করতে লাগল। কানাঘুষা হতে লাগল। পরে জানা গেল যে, মৃত ছেলের জননী পাগলবৎ হয়ে জানাযার সাথে বেরিয়ে এসেছে। স্বীয় উড়না জানাযার উপর ফেলে উলঙ্গ মাথায় জানাযার সাথে চলছে।
মৃত ছেলের পিতা যখন জানতে পারলেন যে, তার স্ত্রী উদাসিনী হয়ে জানাযার সাথে এভাবে চলছে। তখন তিনি উচ্চস্বরে তার স্ত্রীকে ডেকে বললেন, ফিরে চলে যাও কিন্তু স্ত্রী ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। স্বামী তখন রাগান্বিত হয়ে হলফ করে বললেন, তুমি যদি এখান থেকেই ফিরে না যাও তবে তুমি তালাক।
প্রকাশ থাকে যে, তখনো জানাযাগাহে জানাযা পৌছেনি। জানাযার নামায সেখানেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। স্বামীর কথার উত্তরে স্ত্রীও কসম করল। বলল আমি ততক্ষণ পর্যন্ত ফিরব না যতক্ষণ না তার জানাযার নামায পড়া হয়। যদি এর আগে ফিরে যাই তবে আমার সমস্ত দাস মুক্ত।
মাসয়ালাটি কঠিন ছিল। মানুষের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল। উপস্থিত উলামায়ে কিরামদের কেউ তার সমাধান দিতে পারলো না। ছেলের পিতা ইমাম সাহেবের নিকট এসে বললেন, জনাব! আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদেরকে সাহায্য করুন।
ইমাম সাহেব অগ্রসর হয়ে মৃত ছেলের মাতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কিভাবে হলফ করেছ? সে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিল।
অতঃপর স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি বলে হলফ করেছেন? সে তার কসমের বাক্য ইমাম সাহেবের নিকট বর্ণনা করল।
প্রকৃত ঘটনা সম্বন্ধে অবহিত হয়েই ইমাম সাহেব বললেন, জানাযার খাট রেখে দাও। তাই করা হল। অতঃপর বললেন জানাযার নামায এখানেই হবে। তোমরা ছফ বন্দী হয়ে যাও। মৃতের পিতাকে বললেন, জনাব! আগে গিয়ে জানাযার নামায পড়িয়ে দিন।
জানাযার শেষে ইমাম সাহেব জনতাকে বললেন, মৃতকে দাফন করার জন্য কবরস্থানে নিয়ে যাও।
স্ত্রীলোকটিকে বললেন, এখান থেকেই ফিরে যাও। তোমার কসম পূরণ হয়ে গেছে। কারণ জানাযার নামাযের পরই তুমি ফিরে যাচ্ছ।
তার স্বামীকে বললেন, আপনিও কসম হতে মুক্ত হয়েছেন। আপনার নির্দেশে স্ত্রী এখান থেকেই ফিরে যাচ্ছে।
ইমাম সাহেবের প্রত্যুৎপন্নমতি দেখে ইবনে বরুমা বলে উঠলেন, তোমার মত জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান সন্তান জন্ম দিতে মেয়েরা অপারগ হয়ে গেছে। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। যে কোন ইলমী সমস্যার সমাধান তুমি অনায়াসে করে দিতে পার।
ওকী ইবনুল জাররাহ (রহঃ) বর্ণনা করেন, একবার আমরা ইমাম আবু। হানিফা (রহঃ)-এর মজলিসে বসা ছিলাম। সেখানে একজন মহিলা এসে বলল, আমার ভাই মারা গিয়েছে। তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি ছিল ছয়শ দীনার। সম্পত্তি বন্টন করা হলে আমাকে ছয়শত দীনার হতে মাত্র একটি দীনার দেওয়া হয়েছে।
তার বলার উদ্দেশ্য হল তার সাথে বেইনসাফী করা হয়েছে। সে ভেবেছিল যে, মৃত ব্যক্তির বোন হওয়ার কারণে সে আরো অধিক মীরাছ পাওয়ার যোগ্য ছিল। অথচ তাকে মাত্র একটি দীনার দেওয়া হয়েছে।
ইমাম সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, কে এরূপ বন্টন করেছেন? সে বলল, দাউদ তায়ী।
ইমাম সাহেব বললেন, তোমার প্রাপ্য ছিল এক দীনার; তোমাকে তাই দেওয়া হয়েছে।
সে বলল, কিভাবে? ইমাম সাহেব বললেন, তোমার ভাই কি দুটি কন্যা সন্তান রেখে যাননি? সে বলল, হ্যাঁ। ইমাম সাহেব বললেন, তার মাতাও জীবিত রয়েছেন। সে বলল, ঠিক। ইমাম সাহেব বললেন, তার স্ত্রীও জীবিত রয়েছে। সে বলল, তাও ঠিক। ইমাম সাহেব বললেন, এদের ছাড়াও তার বার ভাই এক বোন জীবিত আছে।
সে বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন।
এরপর ইমাম সাহেব তাকে মাসয়ালাটির ব্যাখ্যা বুঝাতে গিয়ে বললেন, মৃতের দুই কন্যা পরিত্যাক্ত সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ পাবে। কাজেই তারা চারশত দীনার পারে। তার মা পাবেন এক ষষ্ঠাংশ। তাই তার অংশে পড়বে একশত দীনার। তার স্ত্রী আট ভাগের এক ভাগ হিসাবে পাবে পঁচাত্তর দীনার। অবশিষ্ট থাকবে মাত্র পঁচিশ দীনার। তার বার ভাই পাবে চব্বিশ দীনার। অবশিষ্ট এক দীনার পাবে তুমি। দাউদ তায়ী সেটাই তোমাকে দিয়েছেন।
একবার ইমাম সাহেব কুফার মসজিদে আগমন করেছিলেন। প্রসিদ্ধ রাফেযী তার্কিক শয়তান, তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, বলুন তো দেখি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় শক্তিশালী কে?
ইমাম সাহেব বললেন, আমাদের নিকট শক্তিশালী হচ্ছেন হযরত আলী (রাঃ), আর তোমাদের মতে হযরত আবু বকর (রাঃ)। শয়তান তাক বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি তো কথা উল্টিয়ে দিলে। মূলতঃ আমাদের মতে আশাদুন্নাস মানব সিংহ শক্তিধর ব্যক্তি হচ্ছেন হযরত আলী আর তোমাদের নিকট আবু বকর।
ইমাম সাহেব বললেন, কক্ষনো এরূপ নয়। আমরা যে হযরত আলীকে আশাদুন্নাস সাব্যস্ত করি তার কারণ হল যখন তিনি জানতে পারলেন যে খিলাফতের অধিকার আবু বকরের, তিনি তো মেনে নিলেন। সারাজীবন তার আনুগত্য করেছেন। আর তোমরা বলছ খিলাফত হযরত আলীর প্রাপ্য ছিল। আবু বকর তা জোর করে ছিনিয়ে নিয়েছে। কিন্তু হযরত আলীর নিকট এ পরিমাণ শক্তি ছিল না যে, তার প্রাপ্য হযরত আবু বকর হতে ফিরিয়ে আনবে। বুঝা যাচ্ছে হযরত আলী হতেও হযরত আবু বকর অধিক শক্তিশালী।
শয়তান তাক রাফেযী ইমাম সাহেবের এ উত্তর শুনে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেল।
দুই ব্যক্তি হাম্মাম খানায় গোসল করতে গিয়ে হাম্মামীর নিকট কিছু আমানত রাখল। তাদের একজন আগে গোসল করে বেরিয়ে এসে আমানতের বস্তু আম্মামীর নিকট হতে নিয়ে চলে গেল। এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি বেরিয়ে এসে আমানতের বস্তু ফেরৎ চাইল। হাম্মামী বলল, সেটা তোমার সঙ্গীর নিকট দেয়া হয়েছে। এতে সে আদালতের শরণাপন্ন হল। কাযী সাহেব হাম্মামীকে এ বলে দোষী সাব্যস্থ করলেন যে, যেহেতু তারা উভয়ে মিলে তোমার নিকট আমানত রেখেছে কাজেই তোমার উচিত ছিল উভয়ের উপস্থিতিতে আমানত ফিরিয়ে দেয়া।
হাম্মামী বেচারা পেরেশান হয়ে ইমাম সাহেবের শরণাপন্ন হল। ইমাম সাহেব বিস্তারিত ঘটনা শুনে বললেন, যাও! তুমি গিয়ে সে ব্যক্তিকে বল, আমি তোমার আমানত ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু নিয়ম মোতাবেক তোমার একার নিকট দিব না। তোমার সঙ্গীকে নিয়ে এসে আমানত নিয়ে যাও।
সে তার সঙ্গীকে উপস্থিত করতে পারে নাই। এভাবে মজলুম হাম্মামী জুলুম হতে রক্ষা পেল।
ইমাম আমাশ ছিলেন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী এবং বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ। তাঁর আসল নাম ছিল সুলাইমান। চক্ষুরোগে আক্রান্ত থাকার কারণে তাঁকে আ’মাশ বলা হত। ৬১ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৪৭ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি চার হাজার হাদীছ মুখস্থ শুনিয়ে দিতে পারতেন। তার নিকট কোন কিতাব থাকত না।
ব্যাহ্যিক আকৃতি তাঁর সুশ্রী ছিল না। অধিকন্তু চোখে ত্রুটি ছিল। পক্ষান্তরে তার স্ত্রী ছিল সুন্দরী এবং রূপসী। স্বীয় রূপ সৌন্দর্যে সে গর্বিতা ছিল। কথায় কথায় স্বামীর সাথে ঝগড়া করত, ঝগড়ার কথা বের করত। বিভিন্নভাবে ইমাম আমাশকে বিরক্ত করত, যেন সে তার থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে।
একদিন এশার পরে উভয়ের মধ্যে বিবাদ হল। উভয় পক্ষ হতেই কথা বাড়াবাড়ি হল। শেষ পর্যন্ত স্ত্রী তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল। ইমাম আ’মাশ হাজারও প্রচেষ্টা করলেন কিন্তু স্ত্রী কথা বলতে নারাজ। শেষ পর্যন্ত গোসায় এসে তিনি বললেন, যদি আজ, রাতে তুমি আমার সাথে কথা না বল তবে তোমাকে বায়েন তালাক। ক্রোধের আতিশায্যাতে তার মুখ থেকে এ কথা বেরিয়ে গেছে। কিন্তু স্ত্রীর অভাবে যে সমস্ত অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় সেগুলো ভেবে তিনি খুবই লজ্জিত হলেন। এখন কী করা যায়? অনেকের নিকটই ধর্ণা দিলেন। কিন্তু কেউ কোন সমাধান দিতে পারল না। অবশেষে ইমাম সাহেবের নিকট এসে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। তিনি বললেন, চিন্তা কোন কারণ নেই। নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনার মহল্লার ফজরের আযান আর আগে এর সমাধান দিয়ে দিব।
অতঃপর ইমাম সাহেব নিজে গিয়ে মসজিদের মুয়াজ্জিনকে ফজরের আযান সুবহে সাদেকের আগে দিতে রাজী করিয়ে নিলেন। সুবহে সাদেকের পর মুয়াজ্জেন আযান দিয়ে দিল।
এদিকে ইমাম আ’মাশের স্ত্রী ফজরের আযানের অপেক্ষায় ছিল। আযান শুনতেই সে খুশীতে টগবগিয়ে উঠে বলল, আল্লাহর শোকর, আজ বদ আখলাক বুড়ো হতে নিষ্কৃতি পেলাম।
ইমাম আ’মাশ বললেন, আল্লাহর শোকর! আবু হানিফা ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক পুনরায় গড়ে দিল।
আব্দুল আযীয বিন আবি দাউদ বর্ণনা করেন, একবার তাকে খলীফার দরবারে ডাকা হল। তিনি ইমাম সাহেবের ছাত্র ছিলেন। পেরেশান হয়ে তার সাথে পরামর্শ করতে এলেন। বললেন, খলীফার দরবারে আমাকে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করা ব্যতীত ফিরে আসা আমার জন্য কঠিন ব্যাপার। এ বিষয়ে আমাকে কিছু নসীহত করুন।
ইমাম সাহেব বললেন, তার দরবারে গিয়ে সুন্নত অনুসারে সালাম দিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে। যখন তিনি তোমার নিকট কোন মাসয়ালা কিংবা পরামর্শের কথা জিজ্ঞাসা করবেন এবং সেটার উত্তর তোমার জানা থাকে তবে খোলা মনে তা বলে দিও। সে সময় তোমার কথার ফাঁকে এ কথাগুলোও বলে দিও, হে আমীরুল মুমিনীন! দুনিয়া চার জিনিসের জন্য অর্জন করা হয়। ইজ্জত এবং সম্মানের জন্য। আলহামদুলিল্লাহ! আপনি শুধু সম্মানীই নন। আপনি সম্মানীর পুত্রও। রাজত্বের জন্য। আল্লাহর শোকর। আপনার সেটা অর্জিত হয়েছে। আপনার মাল-দৌলতও যথেষ্ট রয়েছে। হে আমীরুল মুমিনীন! এখন আপনি তাকওয়া অবলম্বন করুন এবং নেককাজ করতে থাকুন। এতে দুনিয়া ও আখেরাতের দৌলত এবং চিরস্থায়ী সৌভাগ্য অর্জিত হবে।
উপস্থিত বুদ্ধির ক্ষেত্রে ইমাম সাহেব ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভা ও অনন্য প্রত্যুৎপন্নমতি। যে কোন কঠিন সমস্যা উপস্থিত হলে তিনি এত দ্রুত তার সমাধান দিতেন যে, মানুষ তাতে বিষ্মিত না হয়ে পারত না।
মাসয়ালা মাসায়েলের ব্যাপারে যদিও অনেকেই অভিজ্ঞ ছিলেন কিন্তু কোন প্রকার চিন্তা ভাবনা ছাড়াই মাসয়ালার সঠিক উত্তর দেয়ার ব্যাপারে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না।
জনৈক ব্যক্তি কোন এক ব্যাপারে তার স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে বলল যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে কথা না বল, ততক্ষণ পর্যন্ত আমিও তোমার সাথে কথা বলব না। তার স্ত্রীরও ছিল বদমেজাজী। সে সাথে সাথে বলে উঠল, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে কথা না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমিও তোমার সাথে কথা বলব না।
রাগের সময় তাদের কেউ তলিয়ে দেখে নাই যে, এ ধরণের কথাবার্তার পরিনাম কি হতে পারে। পরে যখন উভয়ের মেজাজ শান্ত হল তখন বুঝতে পেরে উভয়ই অনুতপ্ত হল।
এ মাসয়ালার সমাধানের জন্য স্বামী ইমাম সুফিয়ান ছাওরীর নিকট উপস্থিত হয়ে সমস্ত বিবরণ খুলে বলল। তিনি বললেন, এ অবস্থায় কসমের কাফফারা দেয়া ব্যতীত গত্যন্তর নেই। কসমের কাফফারা আদায় করে পরে একে অপরের সাথে কথা বলতে পারবে।
অতঃপর সে ব্যক্তি ইমাম আযম আবু হানিফা (রহঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হল। তার সমস্যা পেশ করে সমাধান জানতে চাইল। ইমাম সাহেব বললেন, যাও। সানন্দে তোমার স্ত্রীর সাথে কথাবার্তা বল। এ জন্য কাউকে কাফফারা দিতে হবে না।
ইমাম সাহেবের এ উত্তর ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ)-এর কর্ণগোচর হলে তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। তিনি ইমাম সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, আপনি মানুষকে ভুল মাসয়ালা বলে থাকেন।
ইমাম সাহেব তৎক্ষণাৎ সে ব্যক্তিকে ডাকিয়ে এনে ঘটনাটি পুনরায় বলতে বললেন। সে ব্যক্তি ঘটনাটি পুনরায় বলল। ইমাম সাহেব বললেন, আগে যা বলেছি এখনও তা-ই বলি। অর্থাৎ কাউকে কাফফারা দিতে হবে না। নির্দ্বিধায় পরস্পরে কথা বলতে পারবে।
তখন ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) এর গুরুত্ব জানতে চাইলেন। ইমাম সাহেব বললেন, স্বামীর কসম করার পর তার স্ত্রী তাকে লক্ষ্য করে কসমের কথা বলল। ফলে স্ত্রীর পক্ষ হতে প্রথম কথা বলার শর্তটি পূরণ হয়ে গেল। কাজেই স্বামীকে আর কসমের কাফফারা দিতে হবে না।
ইমাম সাহেবের এ ব্যাখ্যা শুনে ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বললেন, উপস্থিত ক্ষেত্রে আপনার বুদ্ধি যতদূর পর্যন্ত পৌঁছে সে পর্যন্ত আমার কল্পনাও পৌঁছে না।
একদা ইমাম সাহেব মসজিদে বসে ছাত্রদের পাঠদান করছিলেন। জনৈকা মহিলা মসজিদে প্রবেশ করে ইমাম সাহেবের সম্মুখে একটি আপেল রেখে দিল। আপেলটির অর্ধেকটা ছিল লাল আর অর্ধেক হলুদ।
ইমাম সাহেব আপেলটির মাঝখানে কেটে দু’টুকরা করে দিয়ে মহিলাটির হাতে তুলে দিলেন। সে তা নিয়ে চলে গেল।
এ ঘটনাটি উপস্থিত লোকদের নিকট ধাঁধার মত মনে হল। তারা আশ্চর্যবোধ করল। ইমাম সাহেবের নিকট এর রহস্য জিজ্ঞাসা করল।
উত্তরে ইমাম সাহেব ধাঁধার সমাধান দিতে গিয়ে বললেন, মহিলাটির হায়েযের রক্তের রং কখনো লাল হয় কখনো হলুদ হয়। আপেলের দুটি রংয়ের মাধ্যমে সে তা বুঝিয়ে সে জানতে চেয়েছে যে, কখন সে পবিত্র হবে? আমি আপেলটি কেটে দিয়ে এটা বুঝিয়েছি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না এর ভিতরের সাদা অংশের মত সাদা পানি আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পবিত্র হবে না।
একবার ইমাম সাহেবের নিকট এমন একটি মাসয়ালা উপস্থাপন করা হলো যার সমাধান দিতে তাঁর সমকালীন উলামায়ে কেরাম অপারগ হয়ে গিয়েছিলেন। মাসয়ালাটি ছিল এরূপ।
জনৈক স্ত্রীলোক সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে ছাদে উঠছিল। হঠাৎ তার স্বামীর দৃষ্টি তার দিকে পড়ল। স্ত্রীর এ কাজটি তার অপছন্দ হলো। স্ত্রীকে বলল, তুমি যদি ছাদে উঠ তবে তোমাকে তিন তালাক। আর যদি নীচে নেমে আস তবুও তোমাকে তিন তালাক। এমতাবস্থায় স্ত্রীর উপর তালাক পতিত না হওয়ার জন্য কোন কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে?
ইমাম সাহেব বললেন, খুবই সহজ ব্যাপার। মহিলাটি আর উপরেও উঠবে না, নীচেও নামবে না। কিছু সংখ্যক লোক গিয়ে সিড়িটি মেয়েলোকটি সহ নামিয়ে মাটিতে রেখে দিবে। এতে তার উপর তালাক পতিত হবে না। কারণ, মেয়েলোকটি উপরেও উঠে নাই নীচেও নামে নাই।
প্রশ্নকারীরা জিজ্ঞাসা করল অন্য কোন পন্থা আছে কি?
ইমাম সাহেব বললেন, আরেকটি ব্যবস্থা এরূপ করা যেতে পারে যে, কিছু সংখ্যক মহিলা গিয়ে সে স্ত্রী লোকটিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক মাটিতে নামিয়ে রাখবে। এতে স্বামীর হলফ ভঙ্গ হবে না। অর্থাৎ স্ত্রীর উপর তালাক পতিত হবে না।
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তির ঘরে চোর প্রবেশ করল। তারা তার ঘরের সমস্ত মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে গেল। ঘরের মালিক টের পেয়ে গেল। চোরেরা তাকে ধরে এরূপ কসম করতে বাধ্য করল যে, সে ব্যক্তি যদি চিৎকার করে কিংবা কারো নিকট চোরদের পরিচয় প্রকাশ করে দেয় তবে তার স্ত্রী তিন তালাক।
সকাল বেলায় সে ব্যক্তি বাজারে গিয়ে দেখতে পেল যে, তার ঘরের মূল্যবান মালামাল চোরেরা বাজারে বিক্রয় করছে কিন্তু তালাকের কসমের কারণে কোন কিছু বলার কিংবা কাউকে জানানোর ক্ষমতা তার ছিল না। এ নিয়ে সে খুবই চিন্তিত ছিল।
পরিশেষে সে ভাবল যে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করা যেতে পারে। এতে হয়ত এর কোন সুরাহা হয়ে যাবে।
ইমাম সাহেব যখন সমস্ত ঘটনা শুনলেন, বললেন, তোমাদের মহল্লার মসজিদে ইমাম, মুয়াজ্জেন এবং কিছু সংখ্যক প্রভাবশালী লোকদের নিয়ে এস।
তাদেরকে যখন ইমাম সাহেবের নিকট আনা হল তিনি বললেন, তোমরা কি চাও আল্লাহ তা’আলা এই বেচারার মালগুলো ফিরিয়ে দিক? সবাই ইতিবাচক উত্তর দিলে ইমাম সাহেব বললেন, তোমরা তোমাদের মহল্লার সমস্ত খারাপ এবং সন্দেহযুক্ত লোকদেরকে একটি ঘরে কিংবা মসজিদে একত্রিত করবে। দু’একজন লোক যার মালামাল চুরি হয়েছে তাকে নিয়ে দরজায় দাঁড়াবে। অতঃপর ঘর হতে একজন একজন করে বের করতে থাকবে এবং তাকে জিজ্ঞাসা করতে থাকবে, এই কি তোমার চোর? সে ব্যক্তি যদি চোর না হয়ে থাকে তবে বলবে এ চোর নয়। আর যদি চোর হয়ে থাকে তবে সে চুপ থাকবে। যার ব্যাপারে চুপ থাকবে তাকে আটকে রেখো। কারণ, সেই চোর। এভাবে চোরকেও ধরা যাবে। আর তার স্ত্রীও তালাক হবে না।
লোকজন এসে ইমাম সাহেবের নির্দেশিত পন্থায় কাজ করে চোর আটক করল। সে ব্যক্তি তার মালামাল ফেরৎ পেল। আর তার স্ত্রীও তালাক হলো না।
আব্দুর রহমান বিন আবি লায়লা একজন প্রসিদ্ধ ফকীহ এবং কাজী ছিলেন। দীর্ঘ তেত্রিশ বৎসর যাবৎ তিনি কাজী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
একবার ইমাম সাহেবের এক প্রতিবেশী তাঁর আদালতে হাজির হয়ে কোন এক ব্যক্তির বাগান সম্পর্কে সাক্ষী দিতে চাইল।
কাজী ইবনে আবি লায়লা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, যে বাগান সম্পর্কে তুমি সাক্ষী দিতে চাচ্ছ, বলতো সে বাগানে গাছের সংখ্যা কতটি? সে ব্যক্তি গাছের সংখ্যা বলতে না পারায় কাজী সাহেব তার সাক্ষ্য গ্রহন করলেন না।
একদিন ইমাম সাহেবের সাথে তার সাক্ষাৎ হলে কথা প্রসঙ্গে তাঁর নিকট তাঁর সাক্ষ্য অগ্রাহ্য হবার কথা বর্ণনা করল। ইমাম সাহেব তাকে কাজীর দরবারে ফেরত পাঠিয়ে বললেন, যাও! কাজী সাহেবকে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর যে, আপনি বিশ বৎসর যাবৎ কুফার যে জামে মসজিদে বসে মামলা-মোকাদ্দমা মীমাংসা করে আসছেন, বলুন তো দেখি সে মসজিদের খুঁটির সংখ্যা কয়টি?
ইমাম সাহেবের প্রতিবেশীর এ কথায় কাজী ইবনে আবি লায়লা আশ্চার্যন্বিত হয়ে গেলেন। স্বীয় কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হয়ে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করে নিলেন।
এক ব্যক্তি কসম করল যে, রমযান মাসে দিনের বেলায় সে স্ত্রী সহবাস করবে।
কসম করার ফলে এখন যদি সে রমজানে দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস না, করে তবে কসমের কাফফারা দিতে হবে। আর যদি স্ত্রী সহবাস করে তবে রোজা ভঙ্গের কাফফারা দিতে হবে। অধিকন্তু পরকালের শাস্তি এবং গুনাহ তো আছেই।
এ সমস্যার সমাধানের জন্য সে অনেকের নিকট ধর্না দিল। কিন্তু কেউ তার কোন সদুত্তর দিতে পারল না। অবশেষে ইমাম সাহেবের নিকট এর সমাধানের জন্য সমস্যা উত্থাপন করা হলে তিনি তৎক্ষণাৎ বলে দিলেন যে, সে রমযানের মধ্যে সফর করবে। সফররত অবস্থায় রোজা না রেখে দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস করবে। এতে তার কসমও পূরণ করা হবে। কাফফারাও দিতে হবে না। আর রোজা ভঙ্গের গুনাহও হবে না।
একবার কাজী ইবনে আবি লায়লা ভ্রমনের জন্য একটি বাগানে প্রবেশ করলেন। ঘটনাচক্রে ইমাম সাহেবও সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। বাগানের অপর প্রান্তে কিছু সংখ্যক মহিলা ছিল। তারা গান গাইতে লাগল। গান গেয়ে যখন তারা ক্ষান্ত হল তখন ইমাম সাহেব বলে উঠলেন, তোমরা খুব ভাল করেছ।
এ কথা দ্বারা বাহ্যত এটাই বুঝা যায় যে, ইমাম সাহেব তাদের গানের প্রশংসা করেছেন। কাজী ইবনে আবি লায়লাও তাই বুঝলেন। বললেন, এ-কি? মেয়েদের গানের প্রশংসা করছেন। এ দ্বারা তো আপনি ফিসক কাজে লিপ্ত হয়েছেন যার ফলে আপনার বিরুদ্ধে আপনার সাক্ষী অগ্রাহ্য হাবার মামলা পায়ের করা যেতে পারে।
ইমাম সাহেব বললেন, কাজী সাহেব আমি কি বলেছি? তিনি বললেন,আপনি মেয়েদের গানের প্রশংসা করেছেন।
ইমাম সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, কখন এ কাজ করলাম? তিনি বললেন, মেয়েরা যখন গান গাওয়া বন্ধ করল তখন।
ইমাম সাহেব বললেন, আমি এ কথার প্রশংসা করলাম যে, তাঁরা ফিসক (গান) পরিত্যাগ করে নিরবতা অবলম্বন করেছে। এটা ভাল করেছে। তাই আমি তাদের বললাম তোমরা খারাপ কাজ পরিত্যাগ করে ভাল করেছ।
একবার ইমাম সাহেবের এক প্রতিবেশীর একটি ময়ূর হারানো গিয়েছিল। ময়ূরটিকে বড়ই সখ করে সে পালত। অনেক খোঁজাখুজি করেও তার কোন সন্ধান পায়নি। অবশেষে ইমাম সাহেবের খিদমতে উপস্থিত হয়ে তার পেরেশানী প্রকাশ করে বলল যে, আমার ময়ূরটি হারানো গিয়েছে। অনেক তালাশ করেও তার সন্ধান পাইনি।
ইমাম সাহেব বললেন, নিশ্চিন্ত থাক। আল্লাহ তোমার সাহায্য করবেন। সকাল বেলায় ইমাম সাহেব মসজিদে গেলেন। অন্যান্য কথার মাঝে তিনি এ কথাও বলে ফেললেন, তোমাদের মধ্য হতে তার লজ্জা শরম থাকা উচিত যে স্বীয় প্রতিবেশীর ময়ূর চুরি করে নামায পড়তে আসে অথচ তার মাথায় এখনো ময়ূরের পালক লেগে আছে।
একথা শুনতেই ময়ূর চোর তার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। ইমাম সাহেব তাকে লক্ষ্য করলেন। সবাই চলে যাওয়ার পর ইমাম সাহেব নির্জনে তাকে বুঝিয়ে তার থেকে ময়ূর নিয়ে মালিকের নিকট পৌঁছিয়ে দিলেন।
একবার ইমাম সাহেব গভর্ণর ইবনে হুবায়রার দরবারে গিয়ে দেখতে পেলেন তার সম্মুখে এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করে কতল করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইমাম সাহেব সেখানে পৌঁছতেই গভর্ণর তার সম্মান শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে লাগলেন। মজলুম বেচারা দেখল যে এখন ইমাম সাহেবের যথেষ্ট ইজ্জত করা হচ্ছে এবং তার রেয়াত করা হচ্ছে। তাই সে গভর্ণরের সম্মুখে ইমাম সাহেবের নিকট আরজ করল, হে আবু হানিফা আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?
ইমাম সাহেব তার প্রশ্নের উদ্দেশ্য বুঝে নিয়েছেন। তার সাথে তাঁর পূর্ব পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও তিনি বললেন, হ্যাঁ, আপনাকে আমি চিনেছি। আপনি তো সে ব্যক্তি যে আযান দেওয়ার সময় লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু কলেমাটি দীর্ঘ করে পড়েন। সে বলল, হ্যাঁ! আপনি ঠিকই বলেছেন।
ইমাম সাহেবের উদ্দেশ্য ছিল যে, আমি তাকে মুসলমান হিসাবে চিনি। এ কথা শুনে ইবনে হুবায়রা বললেন, আচ্ছা ভাই! আযান দাও, সে ব্যক্তি আযান দিল। ইমাম সাহেব বললেন, ঠিক আছে। মাশাআল্লাহ। জাযাকাল্লাহ।
এটা দেখে গভর্ণর ইবনে হুবায়রা তাকে মুক্ত করে দিলেন।
বশীর বিন ওলীদ বর্ণনা করেন। ইমাম সাহেবের এক প্রতিবেশী যুবক ছিল। সে তাঁর মজলিসে প্রায়ই আসা-যাওয়া করত। একদিন সে ইমাম সাহেবের খিদমতে আরজ করল যে, আমি কুফার অমুক গোত্রের সাথে আত্মীয়তা করতে চাই। এ প্রসঙ্গে আমি তদের নিকট বিবাহের প্রস্তাবও পাঠিয়েছি। কিন্তু তারা আমার নিকট এ পরিমাণ মহর দাবী করছে যা আমার ক্ষমতার বহির্ভূত। আর এদিকে বিবাহ করতেও মন চাচ্ছে। এখন আমি কি করতে পারি?
ইমাম সাহেব বললেন, প্রথমে ইস্তিখারা করে নাও। এরপর তারা যে পরিমার্ণ মহর দাবী করে তা যে কোন উপায়ে সংগ্রহ করে বিবাহ করে নাও।
ইমাম সাহেবের পরামর্শ অনুযায়ী সে পাত্রীর গোত্রকে জানিয়ে দিল যে, সে তাদের দাবীকৃত মহরের পরিমাণে বিবাহ করতে রাজী। যথারীতি বিবাহ হয়ে গেল।
এরপর সে ব্যক্তি আবার ইমাম সাহেবের খিদমতে উপস্থিত হয়ে বলল, জনাব! আমি পাত্রীর পরিবারের নিকট আবেদন করছিলাম যে, এখন মহরের কিছু অর্থ নিয়ে নিন। বাকীটা আমার যখন সুযোগ হয় আদায় করে দিব। কিন্তু এতে তারা রাজী হচ্ছে না। মহরের সম্পূর্ণ অর্থ আদায় করার পূর্বে তারা তাদের মেয়ের রোখছতী দিতে নারাজ।
ইমাম সাহেব বললেন, একটি কৌশল অবলম্বন কর। এখন কারো থেকে ঋণ নিয়ে তাদের দাবীকৃত অর্থ আদায় করে দাও। কোনোভাবে তোমার স্ত্রীর রোখছতী করিয়ে নাও। আমার বিশ্বাস তাদের কঠোর মনোভাবের কারণে আল্লাহ চাহে তো তোমার কাজ সহজ হয়ে যাবে।
সে ব্যক্তি তাই করল। মানুষের থেকে ঋণ নিয়ে যার বেশীর ভাগই ইমাম সাহেব দিয়েছেন মহর আদায় করল। পাত্রীর পিতামাতা তাকে রোখছতী করে দিল।
এরপর ইমাম সাহেব তাকে বললেন, তুমি একথা রটিয়ে দাও যে, এ শহর থেকে তোমার অনেক দূরে যাওয়ার ইচ্ছে আছে, সাথে করে স্ত্রীকেও নিয়ে যাওয়ার খেয়াল। এতে তোমাকে কেউ বাধা দিতে পারবে না।
সে ব্যক্তি ইমাম সাহেবের পরামর্শ মতেই কাজ করল। দুটি উট ভাড়া করে আনল। আর ঘোষণা করে দিল যে, জীবিকা উপার্জনের জন্য তার খোরাসান যাওয়ার ইচ্ছে। সাথে করে তার স্ত্রীকেও নিয়ে যাওয়ার আশা আছে।
তার এ ইচ্ছে আকাঙ্খ পাত্রী পক্ষের অপছন্দ হল। তারা ইমাম সাহেবের নিকট এসে তার অভিযোগ করে এ সম্পর্কিত শরীয়তের নির্দেশ জানতে চাইল।
ইমাম সাহেব বললেন, শরীয়তের দৃষ্টিতে তার এ অধিকার রয়েছে যে, সে তার স্ত্রীকে যেখানে ইচ্ছে নিয়ে যেতে পারবে।
তারা বলল, আমরা আমাদের কলিজার টুকরাকে কোনভাবেই দূরে নিয়ে, যেতে দিতে রাজী নই। তার বিরহ আমাদের জন্য বড়ই কষ্টদায়ক হবে।
ইমাম সাহেব বললেন, এটা তো সহজ ব্যাপার। তাকে কোন উপায়ে রাজী করে নাও। সহজ উপায় হল এটাই যে, তার থেকে যে পরিমাণ অর্থ, তোমরা নিয়েছ তা তাকে ফিরিয়ে দাও।
তারা যখন এতে রাজী হল ইমাম সাহেব সে যুবককে ডেকে এনে বললেন, পাত্রী পক্ষ তোমার থেকে মহর বাবত যে অর্থ নিয়েছে তা ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়েছে। এতে তোমার ঋণ পরিশোধ হয়ে যাবে।
সে বলল, আমি অতিরিক্ত আরো কিছু আদায় করে নিতে চাই।
ইমাম সাহেব তাকে অবৈধ পদক্ষেপ নিতে নিষেধ করে বললেন, তোমার স্ত্রী যদি কারো ধন নিজ দায়িত্বে করে নেয় তবে তার ঋণ আদায় না করা পর্যন্ত তুমি তাকে কোথাও নিতে পারবে না।
এ কথায় সে যুবক শংকিত হয়ে বলল, আপনি যা আদায় করিয়ে দেন তাতেই আমি সন্তুষ্ট।
ইমাম লাইছ বিন সা’দ (রহঃ) ছিলেন মিশরের একজন প্রখ্যাত ইমাম। তিনি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর জ্ঞান-গরিমার কথা অনেক শুনেছিলেন। কিন্তু তাঁর সাথে মুলাকাত করার সুযোগ হয়ে উঠেনি।
একবার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি ইমাম সাহেবকে একটি প্রশ্ন। করলেন। তিনি বললেন, হে ইমাম আবু হানিফা! আমার একটি বদ মেজাজী পুত্র সন্তান আছে। যদি আমি তাকে বিবাহ করিয়ে দেই তবে সে তালাক দিয়ে দেয়। আর যদি তাকে দাসী ক্রয় করে দেই তবে সে তাকে মুক্ত করে দেয়। বলুন; এমতাবস্থায় আমি কোন পন্থা অবলম্বন করতে পারি।
ইমাম সাহেব বললেন, আপনি আপনার ছেলেকে নিয়ে বাজারে যাবেন। আপনার ছেলে বাজারের যে দাসীটি পছন্দ করে আপনি তাকে ক্রয় করে এনে আপনার ছেলের সাথে বিবাহ করিয়ে দিবেন। পরে যদি আপনার ছেলে তাকে তালাক দিয়ে দেয় তবে আপনার কোন ক্ষতি হবে না।
ইমাম লাইছ বিন সা’দ ইমাম সাহেবের উপস্থিত বুদ্ধি দেখে আশ্চার্যাম্বিত হয়ে গেলেন।
একবার লুলুঈ গোত্রের একটি দল কুফায় আগমন করল।
এদের মধ্যে হতে এক ব্যক্তির, স্ত্রী খুবই রূপসী ছিল। জনৈক কূফাবাসীর সাথে তার সম্পর্ক গড়ে উঠল। পরিশেষে এক সময় সে কূফাবাসী দাবী করে বসল। বলল, এ মেয়েলোকটি আমার স্ত্রী।
মহিলাটিকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল তখন সে তার স্ত্রী হওয়ার কথা স্বীকার করল।
লুলুঈ গোত্রের লোকটি, যে তার প্রকৃত স্বামী ছিল সে খুবই পেরেশান হয়ে পড়ল। সে বলছিল, এ আমার বিবাহিতা স্ত্রী কিন্তু তার কোন সাক্ষী ছিল না।
ইমাম সাহেবের নিকট ঘটনাটি পেশ করা হলে তিনি কাজী ইবনে আবি লায়লা প্রমুখসহ কাজী এবং ফকীহদের একটি জামাত এবং মেয়েদের একটি দল নিয়ে লুলুঈদের আবাসভূমির দিকে রওয়ানা হলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি মেয়েদেরকে নির্দেশ দিলেন, যে ব্যক্তি মহিলাটিকে আপন বলে দাবী করছে তোমরা তার তাঁবুতে প্রবেশ কর। কিন্তু দেখা গেল যখন কোন মেয়েলোক তাঁবুর দিকে এগুতে যাচ্ছে তখন লুলুঈর কুকুর তাদের তাড়িয়ে আসছে। অবশেষে যে মেয়ে লোকটিকে নিয়ে বিরোধ ইমাম সাহেব তাকে তাঁবুর দিকে যেতে নির্দেশ দিলেন। মহিলাটি যখন তাঁবুর নিকটবর্তী হল তখন কুকুরটি তাকে দেখে সানন্দে সংবর্ধনা জানালো।
ইমাম সাহেব বললেন, মাসয়ালা সমাধান হয়ে গেছে। যা সত্য ছিল তাই প্রকাশ পেয়েছে।
পরে যখন মহিলাটিকে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তখন সে স্বীকার করল যে, বস্তুতঃ সে লুলুর স্ত্রী কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে সে কুফী ব্যক্তির স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিয়েছিল।
খারেজীদের একটি দল একবার ইমাম সাহেবের নিকট এসে তলোয়ার উত্তোলন করে বলল, যেহেতু কবীরা গুনায় লিপ্ত ব্যক্তিকে তুমি কাফের বল না, তাই তোমাকে হত্যা করা হবে।
মুনাযারায় বিজয়ী হওয়ার কৌশল বর্ণনা করতে গিয়ে ইমাম সাহেব একবার এ কথাও বলেছেন যে, কখনো যদি কারো সাথে মুনাযারা করার সুযোগ হয় তবে উল্টো তাকে প্রশ্ন করা শুরু কর। তবে তুমি বিজয়ী হবে। ইমাম সাহেবও এ ক্ষেত্রে তাই করলেন।
তিনি তাদেরকে বললেন, উত্তেজিত না হয়ে ঠাণ্ডা মেজাজে কথাবার্তা বল। প্রথমে জেনে নিবে। যদি মূলতঃ আমারই ভুল হয়ে থাকে তবেই হত্যা করতে অগ্রসর হও। সবচেয়ে ভালো হয় যদি তলোয়ারগুলো খাবের ভিতর রেখে দাও। পরে প্রশ্নোত্তরের পর মনে যা আসে তাই করবে।
খারেজীরা বলল, আমরা আপনার রক্তদ্বারা আমাদের তলোয়ার রঞ্জিত করব। এ কাজ সত্তর বৎসর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা হতে উত্তম বলে। আমাদের বিশ্বাস। ইমাম সাহেব বললেন, আলোচনায় আসা যাক। তোমরা কি বলতে চাও?
খারেজীরা বলল, বাইরে দুই জানাযা পড়ে আছে। একটি পুরুষের অপরটি মেয়েলোকের। পুরুষটি শরাব পান করেছে এবং সে অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। আর স্ত্রীলোকটি ছিল গর্ভবতী। সে আত্মহত্যা করেছে। এখন এদের ব্যাপারে আপনার মত কি?
ইমাম সাহেব ভীতও হলেন না; তাঁর বুদ্ধিও লোপ পেল না। তিনি উল্টো, তাদের প্রশ্ন করতে লাগলেন। বললেন, তোমরা বল এরা উভয় কি ইয়াহুদী ছিল, কি খৃষ্টান কিংবা মজুসী? খারেজীরা বলল, এরা ইয়াহুদীও ছিল না, খৃষ্টানও ছিল না, মাজুসীও না। ইমাম সাহেব বললেন, তবে কোন মিল্লাতের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল?
তারা বলল, এদের সম্পর্ক ছিল, সে গোত্রের সাথে যারা কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে এবং বলে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নাই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।
ইমাম সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা তোমরা বল এ কালেমাটি ঈমানের কতটুকু? এটা কি ঈমানের অর্ধেক না চার ভাগের এক ভাগ নাকি এক তৃতীয়াংশ।
খারেজীরা বলল, ঈমানের কোন অংশ হয় না। কাজেই এটাই পুরো ঈমান।
ইমাম সাহেব বললেন, যখন ঈমানের অংশ হয় না আর এরা উভয় কালেমায়ে শাহাদাতের স্বীকারকারী এবং তাতে বিশ্বাসী তবে তোমরাই বল এ জানাযা দুটি কাদের হবে? মুসলমানের হবে না কি কাফেরের?
এ কথায় খারেজীরা পেরেশান এবং হতভম্ব হয়ে গেল। তারা বলল, এ কথা বাদ দিন। অন্য একটি প্রশ্নের উত্তর দিন। বলুন এরা উভয়ই জান্নাতী হবে না জাহান্নামী?
ইমাম সাহেব বললেন, এ কথার উত্তরে আমার নিকট নবীদের উত্তম আদর্শ রয়েছে। আমি সে কথাই বলব যে কথা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এ দুজন হতেও বড় পাপীদের সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে আরজ করেছেন।
যে আমার অনুসরণ করল সে আমার মধ্যে হতে। আর যে আমার কথা অমান্য করল তবে হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল দয়াময়।
আমি সে রূপই বলব যে রূপ হযরত ঈসা (আঃ) বলেছেন, যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন তবে তারা আপনার বান্দা। আর যদি তাদের ক্ষমা করেন তবে আপনি পরাক্রমশীল প্রজ্ঞাময়।
আমি সে কথাই বলব যে কথা হযরত নূহ (আঃ) বলেছেন, তারা যা কিছু করেছে সেটা আমার উপর আসবে না। তাদের হিসাব তো আল্লাহর কাছে।
ইমাম সাহেবের এরূপ যুক্তিযুক্ত কথা শুনে খারেজীরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হল। উত্তোলিত তলোয়ার খাবে ঢুকিয়ে নিল। তারা তওবা করে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের দলভুক্ত হয়ে গেল।
রচনা জগতে ইমাম সাহেবের খ্যাতি
ফিকাহর ধারা অনুসারে রীতিমত কিতাব রচনার প্রচলন হয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। ইসলামী জগতের বিশিষ্ট উলামা এবং মুহাদিচ্ছগণ কিতাব প্রনয়ন করেন। রবী বিন সবীহ বসরায়, মামার বিন রাশেদ ইয়ামানে, ইবনে জুরাইজ মক্কায়, সুফিয়ান ছাওরী কুফায়, আব্দুল্লাহ বিন মুবারক খোরাসানে, ওলীদ বিন মুসলিম সিরিয়ায়, হুছাইম বিন বশীর ওয়াসেতে। আর ঐ সময়েই ইমাম আবু হানিফাও কুফায় ফিকাহ সংকলন করেন। তাঁর ছাত্রদের থেকে কয়েকজনকে নিয়ে ফিকাহ কমিটি গঠন করেন। তাদেরকে হাদীছ এবং ফিকাহ লিপিবদ্ধ করান। পরে তাঁর শাগরেদরা নিজ নিজ দরসী হালকায় তা রেওয়ায়েত করেন যার কারণে ঐ কিতাবসমূহ তাদের দিকে সম্পর্কিত হয়। এরপরও কিছু সংখ্যক কিতাব তার নামে বাকী রয়েছে। ইবনে নদীম সে সব কিতাবের নাম উল্লেখ করেছেন।
১। কিতাবুল ফিকহিল আকবর
২। কিতাব রিসালাতুন ইলাল বসতী
৩। কিতাবুল আলেম ওয়াল মুতাআল্লেম
৪। কিতাবুরদ্দে আলাল কাদেরিয়া।
ইমাম সাহেবের ওফাতের অনেক পর পর্যন্তও আলেমগণ এসব কিতাব দ্বারা উপকৃত হচ্ছিলেন বলে তাদের লেখা থেকে প্রতীয়মান হয়। আব্দুল্লাহ বিন দাউদ ওয়াসেতী বলেন, কেহ যদি অজ্ঞতা এবং জ্ঞানান্ধত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায় এবং ফিকাহর স্বাদ পেতে আগ্রহী হয়, সে যেন আবু হানিফার কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করে।
যায়েদা বিন কুদামা বর্ণনা করেন, আমি সুফিয়ান ছাওরীর শিয়রে একটি, কিতাব পেলাম যেটি তিনি পড়তেন। সেটি দেখার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে দিয়ে দিলেন। ঐটি ছিল আবু হানিফার ‘কিতাবুর রেহন’। আমি তাঁকে বললাম, আপনি কি আবু হানিফার কিতাব পড়েন? তিনি বললেন, আমার আকাঙ্ক্ষা তো এরূপ যে, তাঁর সমস্ত কিতাব আমার নিকট বিদ্যমান থাকুক আর আমি সেগুলো অধ্যয়ন করি। তাঁর কিতাবে তিনি প্রত্যেকটি ইলমী বিষয়ের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মূলতঃ আমরা আবু হানিফার সাথে ইনসাফ করিনি।
সাজ্জাদ বর্ণনা করেন, আমি এবং আবু মুসলিম মুসতামিলী উভয়ই ইয়াযীদ বিন হারুনের নিকট গেলাম। তিনি তখন বাগদাদে খলীফা মনসুরের নিকট অবস্থান করছিলেন। আবু মুসলিম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু খালেদ! আবু হানিফা এবং তাঁর কিতাব অধ্যয়ন করা সম্পর্কে আপনার কি অভিমত? তিনি বললেন, তোমরা যদি ফকীহ হতে চাও, তবে তাঁর কিতাব অধ্যয়ন কর। আমি কোন ফকীহকে আবু হানিফার রায়কে অপছন্দ করতে দেখিনি। সুফিয়ান ছাওরী কৌশলে তাঁর কিতাবুর রেহনে নকল করেছেন।
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বর্ণনা করেন, আমি শাম দেশে ইমাম আওযায়ীর নিকট গেলাম। বৈরুতে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হল। তিনি আমাকে বললেন, হে খোরাসানী! কুফায় আবু হানিফা নামে কোন বিদআতী আবির্ভূত হয়েছে? আমি তখন কোন উত্তর না দিয়ে স্বীয় বাসস্থানে ফিরে এলাম এবং আবু হানিফার কিতাব বের করলাম। তিনদিন পর্যন্ত সমস্ত কিতাব মুখস্ত করে ভাল ভাল মাসয়ালাগুলো চিহ্নিত করলাম। তৃতীয়দিন আমি তাঁর নিকট গেলাম। মাসয়ালার কিতাবটি আমার হাতে ছিল। আওযায়ী আমাকে বললেন, এটি কোন্ কিতাব? আমি তাকে কিতাবটি দিয়ে দিলাম। তিনি তা দেখতে শুরু করলেন। একটি মাসয়ালায় তার দৃষ্টি পড়ে গেল যাতে আমি ‘নোমান বলেছেন লিখেছিলাম। আযান হয়ে গেছে। একামতের সময়ও নিকটবর্তী। আবার তাকেই ইমামতী করতে হবে। এতদসত্ত্বেও তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিতাবের প্রথমভাগ পড়ে নিলেন। অতঃপর আস্তিনে কিতাবটি রেখে নামায পড়ালেন। এরপর আবার পড়া শুরু করলেন এবং পুরো কিতাবটি পড়ে নিলেন। পরে জিজ্ঞেস করলেন, হে খোরাসানী! এ নোমান বিন ছাবেত কে? আমি বললাম, ইনি একজন ইকারে। আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করেছি। আওযায়ী বললেন, ইনি একজন উচ্চ পর্যায়ের শায়খ। তুমি তাঁর নিকট গিয়ে আরো জ্ঞান অর্জন কর। এরপর আমি বললাম, ইনিই আবু হানিফা, যার নিকট যেতে আপনি আমাকে নিষেধ করেছেন।
উপরোক্ত ঘটনা সম্পর্কে ‘উকুদুলজুমান’ নামক কিতাবে আরো বর্ণিত রয়েছে যে, আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বর্ণনা করেন, আবু হানিফা এবং আওযায়ী উভয় মক্কায় মিলিত হন। আওযায়ীকে দেখতে পেলাম তিনি ঐ সব মাসয়ালা নিয়ে আবু হানিফার সাথে আলোচনা করেছেন। আবু হানিফা ঐ মাসয়ালাগুলোকে আমি যেভাবে লিখেছিলাম তার চেয়েও স্পষ্ট দলীল দিয়ে বর্ণনা করেছেন। পরে আমি আওযায়ীর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি স্বীকার করলেন যে, সত্যিই আবু হানিফার ইলমের প্রাচুর্য এবং জ্ঞানে পূর্ণতা ঈর্ষণীয়। আমি ভুল বুঝেছিলাম। তুমি তার সাথে থেকে ইলম অর্জন কর।
ইমাম শাফেয়ী বলেন, যে ব্যক্তি ইমাম আবু হানিফার কিতাব অধ্যয়ন করবে না সে ফিকাহর গভীরতা অর্জন করতে পারবে না।
ইমাম মালেক (রহঃ) খালেদ বিন মাখলাদের নিকট আবু হানিফার কিতাবগুলো চেয়ে চিঠি পাঠান। তিনি সে সব কিতাব তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেন।
আব্দুল্লাহ বিন দাউদ বলেন, আমাশ (রহঃ) একবার হজ্জ করার ইচ্ছা করলেন এবং বললেন, এমন কেউ আছে কি, যে আবু হানিফার নিকট থেকে আমাদের জন্য ‘কিতাবুল মানাসিক’ লিখে আনবে?
নুসাইর বিন ইয়াহয়া বলখী বলেন, একবার আমি আহমদ বিন হাম্বলকে বললাম, আপনি অবু হানিফার সমালোচনা করেন কেন? তিনি বললেন, তাঁর কিয়াস এবং রায়ের কারণে। আমি বললাম, ইমাম মালেক (রহঃ) তো কিয়াস করেছেন। ইমাম আহমদ বললেন, হ্যাঁ। তবে আবু হানিফার রায় এবং কিয়াস কিতাবে সংরক্ষিত হয়ে গেছে। এতে আমি বললাম, ইমাম মালেকের রায় এবং কিয়াসওতো কিতাবে আছে। ইমাম আহমদ বললেন, আবু হানিফা তাঁর চেয়ে অধিক কিয়াস করতেন। আমি বললাম, তাহলে আপনি তাদের উভয়ের হিস্যা অনুপাতে সমালোচনা করুন।
‘ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর রচনা এবং কিতাব সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িকদের সাক্ষ্য প্রদানের পরও এ ধারণা রাখা যে, তিনি কোন কিতাব লিখেননি নিতান্ত অজ্ঞতার পরিচয়। বরং বাস্তব এটাই যে, ইমাম সাহেবের কিতাবসমূহ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। ফকীহ এবং তত্ত্ববিদগণ সেসব কিতাব দ্বারা উপকৃত হয়েছেন।
আল ইকমাল কিতাবে আবু হামেদ বিন ইসমাঈলের জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি আবু হানিফা এবং আবু ইউসুফের কিতাবসমূহ আহমদ বিন নসর থেকে শ্রবণ করেছেন। তিনি আবু সুলাইমান জুরজানী থেকে আর তিনি মুহাম্মদ থেকে এ কিতাবগুলো শ্রবণ করেছেন।
কাযী আবু আসেম মুহাম্মদ বিন আহমদ আমেরী হানাফী মাযহাবের একজন বড় ইমাম ছিলেন। তিনি বলেন, যদি আবু হানিফার কিতাবসমূহ বিনষ্ট হয়ে যায় তবে আমি সেগুলো স্মৃতি থেকে বলতে পারব। ১৪০ এবং ১৫০ হিজরীর মাঝে কয়েকজন ইমাম ফিকহীধারা অনুসারে কিতাব লিখেন। পরে সেগুলো তাদের শাগরেদদের বর্ণনা এবং কিতাবে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সেগুলোর মূলকপি বিনষ্ট হয়ে যায়। ঠিক ঐ সময় ইমাম আবু হানিফাও কয়েকটি কিতাব লিখেন যেগুলো তাঁর নামেই পরিচিত হয়। উলামা এবং মুহাদ্দিছগণ সেগুলো থেকে ইলমী উপকার লাভ করেছেন। কিন্তু তৎকালীন প্রথা অনুসারে তাঁর শাগরেদগণ সেগুলোকে স্বীয় রচনার অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং সেগুলো পরে তাদের নামের সাথে সম্পর্কিত হয়ে যায়। তাঁর শাগরেদদের মধ্য হতে কাযী আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মদ (রহঃ)-এর কয়েকটি কিতাব প্রকাশিত হয়েছে যেগুলো মূলতঃ তাঁদের উস্তাদ আবু হানিফার কিতাব। তাঁরা সেগুলোতে কিছুটা পরিবর্তন পরিবর্ধন করে। উপস্থাপন করেছেন। এজন্য তাদের কিতাব হিসাবে পরিচিত হয়ে গেছে।
অবয়ব, পোষাক-পরিচ্ছদ, চালচলন এবং কথাবার্তা
ইমাম সাহেবের চেহারা ছিল অতিকমনীয় ও আকষর্ণীয়। তাঁর দেহ ছিল মধ্যাঙ্গী। গায়ের রং ছিল গোধূমী। তিনি উত্তম পোষাক এবং সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। সুগন্ধির কারণে পূর্ব থেকেই তার আগমন বুঝা যেত। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। তাঁর আওয়াজ ছিল সুমধুর। তিনি উত্তম জুতা ব্যবহার করতেন। মোজাও ব্যবহার করতেন। তাঁর কয়েকটি টুপি ছিল। জামে মসজিদের দরসী হালকায় কালো লম্বা টুপি ব্যবহার করতেন যা কূফার ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রয়োজনে তিনি পশমী কাপড়ও ব্যবহার করতেন।
জুমার দিন রেদা ও কামিস (লুঙ্গি এবং জামা) পরিধান করতেন যার মূল্য আনুমানিক চার দিরহাম ছিল। সাধারণতঃ ঘরে চাটাই বিছানো থাকত।
নযর বিন মুহাম্মদ বর্ণনা করেন, একদিন আমি ইমাম সাহেবের সাথে ফজরের নামায পড়লাম। ঐ সময়ে আমার গায়ে একটি কোমসী কম্বল ছিল। ইমাম সাহেব কোথাও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমার কাছে কম্বলটি চাইলেন। ফেরৎ এসে বললেন, তোমার কম্বলের কারণে আমার লজ্জা হচ্ছিল। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এটা মোটা। অথচ এ কম্বলটি আমার পছন্দের ছিল। এটা আমি পাঁচ দীনার দিয়ে খরিদ করেছি। এরপর আমি ইমাম সাহেবের গায়ে একটি কোমসী কম্বল দেখেছি যার মূল্য আমার ধারণায় ত্রিশ দীনার ছিল।
জেলখানায় বিষপানে মৃত্যু
শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক ইমাম সাহেব বহু নির্যাতিত হয়েছেন। উমাইয়া শাসনামলে ইরাকের আমীর ইবনে হুবাইরা তাঁকে কাযী পদের প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে তাঁকে প্রতিদিন একটি আবর্জনাস্থলে নিয়ে দশটি করে দুররা মারা হত। এভাবে তাঁকে একশত দশটি দুররা মারা হয়। কিন্তু তারপরও তিনি কাযীপদ গ্রহণ করেননি। এরপর আব্বাসীয় শাসনামলে তাঁকে কাযী পদ গ্রহণ করার প্রস্তাব দেয়া হয়। তখনও তিনি উক্ত দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। অবশেষে তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়।
কাযী পদ গ্রহণ না করায় দুররা মারা বা বিষপান করানোর নেপথ্যে কারণ ছিল অন্যটি। ইমাম সাহেবের মতে উমাইয়া এবং আব্বাসীয় শাসকগোষ্ঠী সঠিক পথ থেকে অনেক দূরে ছিল। অন্যায় অত্যাচারে সীমা অতিক্রম করত।
সুতরাং কাযীর পদ গ্রহণ করা জুলুমে সহযোগীতা করার শামিল ছিল। তখনকার সতর্ক এবং বিচক্ষণ আলেমদের চিন্তাধারা এটাই ছিল। তাঁরা রাষ্ট্রীয় কোন পদে কাজ করাকে পাপ মনে করতেন। তাঁদের এ ভাবমূর্তিতে আমীর এবং খলীফাগণ ভীত ছিল। কোন প্রকার বাহানা করে তাদেরকে নিজ মতানুসারী করার চেষ্টা করত। বিরাট অংকের অর্থ এবং বড় বড় পদ দিয়ে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করত। ইমাম সাহেবের সাথেও এরূপই করা হয়েছে। ইমাম সাহেব যেহেতু এসব বিষয়ের বিরুদ্ধাচারণ করেছেন এবং আলাভী আলেমদের ন্যায়সঙ্গত পক্ষ অবলম্বন করেছেন, তাই আবু জাফর মনসুর কাযীর পদ গ্রহণ না করার বাহানায় ইমাম সাহেবকে জেলখানায় বিষপান করান।
খতীব বাগদাদী যুফার বিন হুযাইলের উক্তি বর্ণনা করে বলেন, ইমাম সাহেব ইব্রাহীম বিন আব্দিল্লাহ বিন হাসান বিন আলী বিন আবি তালিবের জোর সমর্থন করেন। আমি তাঁকে বললাম, মনে হচ্ছে আপনি আমাদের গলায় রশি লাগিয়ে ছাড়বেন। তখনই কূফার আমীর ঈসা বিন মুসার নিকট আবু জাফরের নির্দেশ এলো যে, আবু হানিফাকে আমাদের নিকট পাঠিয়ে দাও। ইমাম সাহেবকে বাগদাদ নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে তিনি পনের দিন জীবিত ছিলেন। অতঃপর তাঁকে বিষপ্রয়োগে মারা হয়।
ইব্রাহীম বিন আব্দিল্লাহ তার ভাই মুহাম্মদ আন্নাফ সুয়যাকিয়া নিহত হওয়ার পর বসরায় আবু জাফরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আবু জাফর তার চাচাত ভাই এবং কূফার আমীর ঈসা বিন মুসাকে পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে আসার নির্দেশ দিল। কূফার নিকটে বাখুমরা নামক স্থানে উভয় দলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ইব্রাহীম বিন আব্দিল্লাহ যুদ্ধে মারা যান। এটা ১৪৫ হিজরীর ঘটনা। ইমাম সাহেব ইব্রাহীম বিন আব্দিল্লাহর সমর্থক ছিলেন। হাফিয যাহাবী লিখেন, খলীফা মনসুর ইমাম সাহেবকে বিষপান করায়। তিনি ইব্রাহীমের সমর্থন করার কারণে শাহাদাত লাভ করেন।
অন্যান্য জীবনী লিখকগনও এ ঘটনা অনুরূপভাবে বর্ণনা করেছেন
ইমাম সাহেবকে আবু জাফর মনসুরের সামনে নেয়া হলে তাঁকে কাযী পদের প্রস্তাব দেয়া হয়। তিনি অস্বীকৃতি জানালে তাকে জেলে পাঠান হয়। সেখানেই তিনি ১৫০ হিজরীতে বিষপ্রয়োগে শহীদ হন। তাঁর লাশ পাঁচজন সরকারী কর্মচারী বের করে আনে। অতঃপর তাঁকে গোসল দেয়া হয়। তাঁর জানাযায় পঞ্চাশ হাজারেরও অধিক লোক অংশ নিয়েছিল। ছয়বার জানাযার নামায পড়া হয়েছিল। পূর্ব বাগদাদের খায়রান নামক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। বাগদাদের কাযী হাসান বিন উমারা গোসল দেয়ার পর ইমাম সাহেবের প্রতি এভাবে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন।
হে আবু হানিফা! আল্লাহ আপনাকে রহম করুন, আপনি ত্রিশ বৎসর রোযা রেখেছেন। চল্লিশ বৎসর রাত্রে ঘুমাননি। আমাদের মধ্যে আপনি সবচেয়ে বড় ফকীহ, সবচেয়ে বড় আবেদ, সবচেয়ে বড় যাহেদ এবং সবচেয়ে বেশী সৎগুণের অধিকারী ছিলেন। নেক ও সুন্নাতের উপর মৃত্যুবরণ করেছেন। আপনার পরবর্তী লোকদেরকে দুঃখে রেখে গেলেন। উলামাদের সুনাম চলে গেল।
সামআনী বর্ণনা করেন, প্রচণ্ড ভীড়ের কারণে ছয়বার জানাযা পড়া হয়। শেষবার তাঁর পুত্র হাম্মাদ জানাযা পড়ান।
একবার কাযী হাসান বিন হাসান ইমাম সাহেবের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি রহম করুন। আপনি সলফদের সত্যিকার উত্তরসুরী ছিলেন। আপনি এমন শাগরেদ রেখে গেছেন যারা আপনার ইলমের উত্তরসূরী হতে পারেন। কিন্তু তাকওয়া পরহেযগারীতে আল্লাহর তৌফিকেই উত্তরসূরী হওয়া যায়।
একবার আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বাগদাদ আগমন করলেন। তিনি ইমাম সাহেবের কবরের পাশে গিয়ে বললেন, আবু হানিফা! ইব্রাহীম নাখয়ী মারা যাবার পর তাঁর জানশীন (প্রতিভু) রেখে গেছেন। হাম্মাদ বিন সুলাইমান মারা যাবার পর তাঁর জা-নশীন রেখে গেছেন। কিন্তু আপনি মারা যাবার পর পৃথিবীর বুকে আপনার জা-নশীন কেউ নেই। একথা বলে অঝেরে কাঁদতে লাগলেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মৃত্যুর পর তাকে সাধারণ কবরস্থানে দাফন না করে পৃথক স্থানে দাফন করা হল। খলীফা মনছুর তাঁর জানাযার নামাজ পড়তে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ইমাম সাহেবকে সাধারণ কবরস্থানে দাফন না করে অন্যত্র দাফন করার কারণ কি?
উত্তরে বলা হল ইমাম সাহেব অছিয়ত করে গেছেন যে, তাকে যেন পৃথক স্থানে দাফন করা হয়। কারণ ইমাম সাহেবের মতে বাগদাদ শহরের ভূমি গুলো ভূমির মালিকদের থেকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে আনা হয়েছে। এ ভূমির ব্যাপারে ইমাম সাহেবের ফতোয়া এটাই ছিল। আর তাঁর অছিয়ত এটাই ছিল যে, তাঁকে যেন এমন স্থানে দাফন না করা হয় যা অবৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে।
এ কথা শুনে খলীফা মনছুর বলে উঠল, তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর কে আমাকে তার থেকে রক্ষা করবে।
সন্তান-সন্ততি
ইমাম সাহেবের সন্তানদের মধ্যে হাম্মাদ ব্যতীত অন্য কারো সন্ধান পাওয়া যায় না। তার নাম স্বীয় উস্তাদ হাম্মাদের নামানুসারে রেখেছেন। তিনি তাঁর পিতার উত্তরাধিকারী ছিলেন এবং তাওয়া পরহেয গারীতে তার নমুনা ছিলেন। ফিকাহ এবং হাদীছের উসূল সম্পকে অভিজ্ঞ ছিলেন। তার ছেলে ইসমাঈল মামুনের খিলাফতের সময় বসরার কাযী ছিলেন। তিনি ছাড়াও আবু হাব্বান, উছমান এবং উমর নামে হাম্মাদের তিন পুত্র ছিলেন।
ইমাম সাহেবের জ্ঞানসূলভ কয়েকটি বাণী
জ্ঞান এবং প্রজ্ঞায় ইমাম সাহেব সমকালীন সবার শীর্যে ছিলেন। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি এবং অনুধাবন শক্তি সর্বজনস্বীকৃত ছিল। তাঁর জ্ঞান-সূলভ বাণী বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখ রয়েছে। তার কিছুমাত্র এখানে উল্লেখ করা হল।
– উলামায়ে দ্বীনের ঘটনা বর্ণনা করা, তাদের মজলিসে বসা আমাদের মতে অনেক ফিকহী মাসয়ালার আলোচনা হতেও উত্তম। কারণ তাদের বাণীতে এবং মজলিসে তাদের আদব এবং আখলাক ফুটে উঠে
-কোন প্রয়োজনীয় কাজ সামনে এলে তা সমাধান না করে খাবার খেয়ো না। কারণ খাবার বুদ্ধি হ্রাস করে।
– সময়ের পূর্বেই যে ব্যক্তি মান সম্মান এবং নেতৃত্বের আশা করে, সারাজীবন সে অপমানিত থাকবে।
– যে ব্যক্তি দুনিয়ার জন্য ইলমে-দ্বীন শিখবে, সে তার বরকত থেকে বঞ্চিত হবে। তার অন্তরে ইলম দৃঢ় হবে না এবং তদ্বারা সে কাউকে উপকৃত করতে পারবে না।
– আল্লাহর উপর ঈমান আনা সবচেয়ে বড় ইবাদত এবং কুফর সবচেয়ে বড় পাপ।
– যে ব্যক্তি ফিকাহর জ্ঞান ব্যতীত হাদীছ অধ্যায়ন করে সে ঐ ব্যক্তির মত, যে ঔষধ বিক্রয় করে, কিন্তু সে জানে না কোনটি কি রোগের জন্য। তা চিকিৎসকেরাই জানে। তদ্রুপ মুহাদ্দিছগণ হাদীছ জানেন কিন্তু তাদের ফকীহর মুখাপেক্ষী হয়।
– কোন স্থান থেকে কোন মহিলা উঠে গেলে ঐ স্থান যতক্ষণ পর্যন্ত উষ্ণ থাকে তাতে বসবে না।
প্রথমাবস্থায় আমি গোনাহর কাজ অপমান এবং অসম্মানের ভয়ে বর্জন করতাম। পরে তা আমার দ্বীন এবং দিয়ানতে পরিণত হয়ে গেলো।
– কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে আমাকে দাঁড় করান হলে হযরত আলী এবং হযরত মু’আবিয়া (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। বরং যে সব কাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সে সম্পর্কেই আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ঐ সব কাজে লিপ্ত থাকাই আমার জন্য উত্তম।
ইমাম সাহেব এ কবিতা পড়তেন,
তোমাদের দান হতে আরশের অধিপতির দান উত্তম। তাঁর দান অতি প্রশস্ত যার আশা এবং প্রতীক্ষা করা হয়। তোমরা যে অনুগ্রহ কর তা তোমাদের বলে বেড়ানোর দ্বারা বিনষ্ট হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ এসব দোষ হতে পবিত্র।
ইমাম আযম আবু হানিফা (রহঃ) তাঁর দুই বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ এবং ইউসুফ বিন খালেদ (রহঃ)-এর নিকট দু’টি চিঠি লিখেন। এ চিঠি দু’টিতে মূলতঃ ইসলামী শিক্ষার সারমর্মের সমাবেশ ঘটেছে। নিম্নে চিঠি দুটির অনুবাদ উল্লেখ করা হল।
প্রথম চিঠিটি ইমাম আবু ইউসুফের (রহঃ) নামে,
হে ইয়াকুব! (ইমাম আবু ইউসুফের নাম ইয়াকুব) বাদশার সম্মান কর এবং তার মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখ। তার সামনে কখনো মিথ্যা কথা বলো না। কোন ইলমী প্রয়োজন ব্যতীত তার নিকট যখন-তখন উপস্থিত হয়ো না। কারণ, তুমি যদি তার সাথে অধিক মেলামেশা কর তবে তার দৃষ্টিতে হীন হয়ে পড়বে এবং তোমার মর্যাদা কমে যাবে। সুতরাং তুমি তার সাথে এমন আচরণ কর যেমনটি আগুনের সাথে কর। তার দ্বারা উপকৃত হবে এবং তার নিকট থেকে দূরে থাকবে, তার নিকট যাবে না। কারণ বাদশাহ অপরের প্রতি তেমন মনোযোগ দেয় না, যা তারা নিজের প্রতি দেয়। তার সামনে অধিক কথা বলো না। কারণ সে তার নিকট উপস্থিত ব্যক্তিদের নিকট একথা প্রমাণ করার জন্য তোমার ভুল ধরবে যে, সে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞান রাখে। আর সে তোমার ভুল ধরার কারণে তার সহচরদের দৃষ্টিতে তুমি হেয় হয়ে যাবে। তুমি যখন তার নিকট যাবে তখন তোমার মর্যাদা এবং অন্যদের মর্যাদার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তার প্রতি যেন লক্ষ্য থাকে।
আর যখন তার নিকট তোমার অপরিচিত কোন আলেম উপস্থিত থাকে। তখন তার নিকট যেয়ো না, কারণ তুমি যদি ইলমী মর্যাদায় তার চেয়ে হীন হও আর অজ্ঞতাবশতঃ তার চেয়ে জ্ঞানী প্রমাণ করতে চাও, তবে তোমার ক্ষতি হবে। আর যদি তার চেয়ে জ্ঞানী হও এবং কোন ব্যাপারে তাকে ধমক দাও, তবে বাদশার সুদৃষ্টি তোমার উপর থাকবে না।
আর যখন সে তোমাকে কোন পদ দান করে তবে তা গ্রহণ করো না। তবে তুমি যদি জানতে পার যে, সে তোমার মাযহাবের ইলম এবং কাযা (বিচার) সম্পর্কে নিশ্চিন্ত, তবে তা গ্রহণ করতে পার। এটা এ কারণে যে, যেন অন্য কোন মাযহাব অনুসারে ফয়সালা করতে না হয়। বাদশার সহচর কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে না। শুধুমাত্র সুলতানদের সাথে সম্পর্ক রাখবে এবং তার সহচরবৃন্দ থেকে দূরে থাকবে। এতে তোমার মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে।
সাধারণ লোকদের সামনে দ্বীনি মাসয়ালা কিংবা প্রয়োজনীয় কথা ব্যতীত অন্য কথা বলবে না। আর সাধারণ লোক কিংবা ব্যবসায়ীদের সাথে শুধুমাত্র ইলম সম্পর্কিত কথাবার্তা বলবে, যেন তাদের এ’ধারণা না হয় যে মালের প্রতি তোমার আসক্তি রয়েছে। কারণ এতে তোমার প্রতি তাদের ধারণা খারাপ হয়ে যাবে এবং এ বিশ্বাস করবে যে, তাদের নিকট থেকে তোমার ঘুষ নেয়ার লিপসা রয়েছে। সর্বসাধারণের সামনে তুমি হাসবে না এবং বাজারে অধিক যাবে না। শ্মশ্রুবিহীন বালকদের সাথে কথা বলো না। এতে ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে শিশুদের সাথে কথা বলায় এবং তাদের মাথা মুছে দেয়ার কোন দোষ নেই।
বয়োবৃদ্ধ এবং সাধারণ লোকদের সঙ্গে একসাথে রাস্তায় চলো না। কারণ তুমি যদি তাদের আগে যেতে দাও, তবে ইলমে দ্বীনের অপমান হবে। আর যদি তাদের আগে যাও তাও দোষনীয়। কারণ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করেনা এবং বড়দের সম্মান দেখায় না সে আমাদের মধ্য হতে নয়’।
মানুষের চলার পথে বসো না। যদি বসার প্রয়োজন হয় তবে মসজিদে গিয়ে বসো। বাজারে কিংবা মসজিদে কিছু খেয়ো না। পানির ‘সবীল’ (যেখানে ভ্রমণকারীদের জন্য বিনামূল্যে পানির ব্যবস্থা রয়েছে।) হতে কিংবা সেখানকার নির্ধারিত ব্যক্তির হাতে পানি পান করো না। দোকানে বসো না। মখমল, অলংকার এবং রেশমী পোষাক পরিধান করো না, এতে ঔদ্বত্য সৃষ্টি হয়।
স্বীয় প্রাকৃতিক প্রয়োজন মিটানোর সময় প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ব্যতীত স্ত্রীর সাথে বিছানায় অধিক কথা বলো না। তার সাথে অধিক ছোঁয়াছুয়ি করো না। আল্লাহর যিকির ব্যতীত তার নিকট যেয়ো না।
অন্যদের স্ত্রী কিংবা বাঁদী সম্পর্কে তার সাথে কথা বলো না। এতে সে তোমার সাথে কথাবার্তায় বেপরোয়া হয়ে যাবে। এরও সম্ভাবনা রয়েছে যে, তুমি যখন অন্যের স্ত্রী সম্পর্কে আলাপ করবে সেও তোমার সামনে অন্য পুরুষ সম্পর্কে আলাপ করবে।
আর সম্ভব হলে এমন মেয়েকে বিয়ে করো না যার পূর্ব স্বামী কিংবা পূর্বস্বামীর দিকের কন্যা বা পিতা রয়েছে। হ্যা এ শর্তে বিবাহ করতে পার যে, তার কোন আত্মীয় তোমার ঘরে তার নিকট আসবে না।
কারণ মেয়েলোক যদি সম্পদশালী হয় তবে তার পিতা দাবী করে যে, সমস্ত সম্পদ তার এবং এখন তা তার নিকট ধারস্বরূপ এবং এ শর্তে যে, যথাসম্ভব সে তার পিতার ঘরে যাবে না। আর বিয়ের পর তুমি শ্বশুরালয়ে বাসররাত্রি যাপন করতে সম্মত হয়ো না। নচেৎ তারা তোমার মাল নিয়ে নিবে এবং মেয়ের ব্যাপারে অনেক কিছুর লালসা করবে।
এমন মেয়েলোককে বিয়ে করো না যার সন্তান-সন্ততি রয়েছে। কারণ সে সমস্ত সম্পদ তাদের জন্য সঞ্চয় করে রাখবে এবং তোমার মাল থেকে নিয়ে তাদের জন্য ব্যয় করবে। কারণ তার সন্তান তার নিকট তোমার চেয়ে অধিক প্রিয়। দু’স্ত্রীকে এক বাড়ীতে রেখো না। স্ত্রী পরিজনের ব্যয় বহন করার ক্ষমতা হওয়া পর্যন্ত বিয়ে করো না।
প্রথমে জ্ঞান অর্জন কর। এরপর মাল সঞ্চয় কর এবং এরপর বিবাহ কর। কারণ তুমি যদি শিক্ষার সময় মালের অন্বেষণে থাক তবে শিক্ষার্জন থেকে অপারগ হয়ে পড়বে। সঞ্চিত সম্পদ তোমাকে দাস-দাসী ক্রয় করার প্রতি উৎসাহিত করবে। এভাবে শিক্ষা গ্রহণের পূর্বেই তুমি দুনিয়া এবং স্ত্রীদের সংস্রবে থাকার কারণে সময়ের অপব্যবহার হবে এবং পরিবার-পরিজন বেড়ে যাবে। তাদের প্রয়োজন মিটাতে তোমাকে ব্যস্ত থাকতে হবে। ফলে ইলম শিখা হবে না।
যৌবনের প্রথম থেকেই ইলম অর্জন করা শুরু কর-যখন তোমার দিল ও দেমাগ দুনিয়ার ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকে। এরপর মাল সঞ্চয় কর। কারণ সন্তান-সন্ততির আধিক্য অন্তরকে অস্থির করে তুলে। যখন মাল সঞ্চয় হবে তখন বিয়ে করো।
সর্বদা অন্তরে আল্লাহর ভয় রেখো। আমানত আদায় করো। সর্বশ্রেণীর লোকদের উপকার করো। লোকদের হেয় জ্ঞান করো না। নিজের এবং লোকদের ইজ্জত করো। তাদের মেলামেশার পূর্বে তুমি তাদের সাথে অধিক মেলামেশা করো না। মাসয়ালার আলোচনার মাধ্যমে তাদের সাথে মেলামেশা করো। তাদের মধ্যে যদি যোগ্য লোক থাকে তবে উত্তর দিবে।
সাধারণ লোকের সাথে ইলমে কালাম (আকীদা জাতীয়শাস্ত্র) নিয়ে আলোচনা করো না, তারা তোমার অনুসরণ করে এতে লিপ্ত হতে পারে। (যা তাদের জন্য ক্ষতিকর।)।
কেউ যদি তোমাকে কোন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করে তবে শুধুমাত্র সেটার উত্তর দিও। এর সাথে অন্যকিছু সংযোজন করো না। কারণ এতে তার প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে পারে।
ইলম হতে কোন সময়েই বিমুখ হয়ো না, যদি দশ বছরেও জীবিকা অর্জিত না হয়। কারণ যদি ইলম হতে বিমুখ হও তবে তোমার জীবিকা সংকীর্ণ হয়ে যাবে।
যারা তোমার নিকট ফিকাহ শিখতে আসবে তাদের প্রতি স্বীয় ছেলের মত লক্ষ্য রাখবে। এতে শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়বে।
সাধারণ লোক কিংবা বাজারের লোক যদি ঝগড়া করে তবে তাদের সাথে ঝগড়া করতে যেয়ো না। এতে তোমার অসম্মান হবে।
সত্য কথা বলার সময় কারো মাহাত্ম বা ঐশ্বর্যের প্রতি লক্ষ্য করো না, যদিও সে সুলতান বা বাদশাহ হয়।
অন্যেরা যে পরিমাণ ইবাদত করে তুমি তার চেয়ে অধিক ইবাদত করো। কারণ সাধারণ লোক যে পরিমাণ ইবাদত করে তুমি যদি তার অধিক ইবাদত কর তবে তারা ধারণা করবে যে, ইবাদতের প্রতি তোমার আগ্রহ কম। এরূপ ধারণাও করবে যে, তাদের অজ্ঞতা তাদেরকে যে উপকার দিয়েছে তোমার জ্ঞান তোমাকে তার অধিক কিছুই দেয়নি।
যদি এমন কোন শহরে যাও যেখানে আহলে ইলম রয়েছেন, তবে সেটাকে আপন ধর্ম মত প্রচারের স্থল হিসাবে গ্রহণ করো না। বরং সাধারণ একজন শহরবাসীর মতই সেখানে অবস্থান করো যেন তারা জানতে পারে যে, তাদের মান-সম্মানের সাথে তোমার কোন সম্বন্ধ নেই। নচেৎ তারা তোমার বিরুদ্ধাচরণ শুরু করবে এবং তোমার মাযহাব সম্পর্কে বিদ্রুপ করবে। আর সাধারণ লোকও তোমার বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং হীন দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকাবে ফলে তুমি অনর্থক তাদের দৃষ্টিতে ভৎর্সনার পাত্র হবে।
আর যদি তোমাকে কোন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করে তবে মুনাযারা-মুবাহাছা করো না। সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতীত তাদের নিকট কোন কিছু উল্লেখ করো না। আর তাদের উস্তাদ সম্পর্কে ভৎর্সনা করো না নচেৎ তারাও তোমাকে বিদ্রুপ করবে। অন্যদের সম্পর্কে সতর্ক থেকো।
তোমার বাহ্যিক অবস্থার মত তোমার ভিতরের অবস্থাও খালেছ আল্লাহর জন্য কর। আর ইলম ততক্ষণ পর্যন্ত সংশোধন হবে না যতক্ষণ না তার বাতেন অর্থাৎ ভিতরের অবস্থাকে যাহের অর্থাৎ বাহিরের অবস্থার মত করা হয়।
সুলতান বা রাষ্ট্রপতি তোমাকে কোন দায়িত্ব অর্পণ করেন যা তোমার জন্য সমীচীন নয় তবে তা গ্রহণ করো না। হ্যা, তুমি যদি জানতে পার যে, তোমার ইলমের জন্যই এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তবে গ্রহণ করো। ভীত অবস্থায় চিন্তা-ভাবনামূলক কথা বলো না। কারণ এতে কথাবার্তায় ভুল-ত্রুটি হয় এবং জিহবায় জড়তার সৃষ্টি হয়। অধিক হেসো না। এতে অন্তর মরে যায়। নিশ্চিন্ত হয়ে চলো। কাজকর্মে তাড়াহুড়া করো না। যদি কেউ পশ্চাৎ হতে তোমাকে ডাকে তবে তার জবাব দিও না। কারণ পশুদের পশ্চাৎ হতে ডাকা হয়। কথাবার্তার সময় চিৎকার করো না এবং উচ্চ আওয়াযে কথা বলো না। নীরবতা এবং ধীরস্থিরতা অবলম্বন কর। এতে মানুষের নিকট তোমার দৃঢ়তা প্রকাশ পাবে। মানুষের সামনে আল্লাহর যিকির অধিক কর যেন লোকজন তোমার নিকট থেকে এ গুণ অর্জন করতে পারে। নামাযের পর আল্লাহর যিকির ও কোরআন তেলাওয়াতের নিয়ম করে নিবে। আল্লাহ তা’আলা তোমাকে ধৈর্যের যে গুণ দিয়েছেন এবং অন্যান্য যে নেয়ামত দিয়েছেন তার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় কর। প্রতিমাসে নির্দিষ্ট কিছুদিন রোযা রাখার অভ্যাস গড়ে তোল, যেন অন্যেরা এ বিষয়ে তোমার অনুসরণ করতে পারে। তুমি নিজের প্রতিটি কাজকর্মের প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং অন্যের প্রতি দৃষ্টি রাখবে যেন তোমার ইলম দ্বারা দুনিয়া এবং আখেরাতে উপকৃত হতে পার।
তুমি নিজে ক্রয়-বিক্রয় করো না। বরং এমন একজন খাদেম রাখ যে সঠিকভাবে তোমার এসব প্রয়োজন মেটাবে এবং তুমি তার উপর এসব ব্যাপারে নির্ভর করতে পারবে।
তুমি দুনিয়া কিংবা তোমার বর্তমান থেকে নিশ্চিন্ত থেকো না। কারণ আল্লাহ তাআলা তোমাকে এসব কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। শশ্রুবিহীন বালক গোলাম ক্রয় করো না।
সুলতানদের সাথে তোমার নৈকট্য এবং বিশেষ সম্পর্কের কথা কারো নিকট প্রকাশ করো না, যদিও তোমার আপনজন হয়। কারণ মানুষ সুলতানদের সাথে তোমার নৈকট্যের বিষয় জানতে পারলে সুলতানদের নিকট তাদের প্রয়োজনের কথা উত্থাপন করতে বলবে। তুমি যদি তা কর তবে তোমার মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে। আর যদি না কর তোমাকে দোষী করবে।
ভুল বিষয়ে মানুষের অনুসরণ করো না। বরং সঠিক বিষয়ে তাদের অনুসরণ কর। কোন ব্যক্তির মধ্যে যদি কোন দোষ দেখ তবে তার সে দোষসহ তার আলোচনা করো না বরং তার কোন ভাল গুণের অনুসন্ধান করে তা সহ তার আলোচনা কর। তবে দ্বীনের ব্যাপারে যদি কোন দোষ দেখ, তা মানুষকে জানিয়ে দাও যেন তারা তার অনুসরণ না করে তার থেকে দূরে থাকে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ফাসেক ব্যক্তি যে খারাপগুণে লিপ্ত তা প্রচার করে দাও যেন লোকজন তার অপকার থেকে বেঁচে থাকতে পারে। যদিও সে সম্মানী ব্যক্তি হয়।
কারো মধ্যে ধর্মীয় ব্যাপারে যে ত্রুটি দেখ তাও বর্ণনা করে দাও। তার মান-মর্যাদার দিকে লক্ষ্য করে ভীত হয়ো না। কারণ আল্লাহ তা’আলা তোমার এবং দ্বীনের সহায়ক। এরূপ যদি একবার কর, তবে মানুষ তোমাকে ভয় করবে এবং কেউ দ্বীনের মধ্যে বিদআত সৃষ্টি করতে সাহস পাবে না।
সুলতানদের মধ্যে যদি ইলমে দ্বীনের পরিপন্থী কোন বিষয় দেখ, তবে তার আনুগত্য প্রকাশ করে তাকে তা প্রকাশ করে দাও কারণ তার হাত তোমার হাত হতে অধিক শক্তিশালী। তুমি এরূপ বলবে, আপনার রাজত্বের প্রতি এবং ক্ষমতার প্রতি আমার আনুগত্য আছে। তবে আপনার অমুক অভ্যাস যা ইলমে দ্বীনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, সে ব্যাপারে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এরূপ একবার করলেই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। বারবার এরূপ করলে তোমার সাথে তাদের কঠোর আচরণের সম্ভাবনা রয়েছে, যা দ্বীনের জন্য অপমানজনক। সে যদি একবার কিংবা দু’বার খারাপ আচরণ করে এবং দ্বীনি বিষয়ে তোমার প্রচেষ্টা এবং সৎকাজে আদেশের প্রতি তোমার আগ্রহ দেখে আবার সে কাজে লিপ্ত হয়, তবে এককভাবে তার নিকট গিয়ে তাকে নসীহত কর। সে যদি বিদআতী হয় তার সাথে মুনাযারা কর। আর যদি সুলতান হয় তবে কোরআন হাদীছের যা কিছু তোমার স্মরণে আছে তা তাকে স্মরণ করিয়ে দাও। সে যদি তা কবুল করে তবে তো ভাল। নচেৎ আল্লাহর নিকট দোয়া কর যেন তিনি তোমাকে তার অনিষ্ট থেকে হিফাযতে রাখেন আর মৃত্যুর স্মরণ করতে থাক।
তোমার শিক্ষকদের জন্য, যাদের নিকট থেকে ইলম অর্জন করেছ। ইস্তেগফার করতে থাক। সবসময়ে কোরআন তিলাওয়াত করতে থাক। কবরস্থান, মাশায়েখ এবং পবিত্রস্থানগুলো অধিক পরিমাণ যিয়ারত করতে থাক।
সাধারণ লোকের স্বপ্ন, যা নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা বুযুর্গদের সম্পর্কীয় হয় মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করো। দ্বীনের দিকে আহবান করার উদ্দেশ্য ব্যতীত দুনিয়াদার লোকদের সাথে বসো না। অধিক খেলাধুলা এবং গালাগালি করো না।
আযান হয়ে গেলে মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ কর যেন সাধারণ লোকেরা তোমার আগে যেতে না পারে। সুলতানের কাছাকাছি বসবাস করো না। তোমার প্রতিবেশীর মধ্যে দোষণীয় কোন কিছু পেলে তা সুলতানের নিকট প্রকাশ করো না। এটা আমানতদারী। মানুষের গোপন কথা প্রকাশ করো না। কেউ যদি তোমার নিকট কোন পরামর্শ কামনা করে, তবে তোমার জ্ঞানানুসারে তাকে সঠিক পরামর্শ দাও। এতে তুমি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে।
আমার এ নসীহতগুলো তুমি গ্রহণ কর। ইনশাআল্লাহ ইহকালে এবং পরকালে উপকৃত হবে।
কৃপণতা করো না। এতে লোক ঘৃণিত হয়। অধিক লালায়িত কিংবা মিথ্যাবাদী হয়ো না। সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না। প্রত্যেক বিষয়ে তোমার মনুষ্যত্ব হিফাযত করো। সর্বাবস্থায় সাদা পোশাক পরিধান কর।
দুনিয়ার প্রতি অনীহা দেখিয়ে স্বীয় ঐশ্বর্য প্রকাশ কর। নিজেকে ঐশ্বর্যশালী প্রকাশ কর। তুমি গরীব হলেও তা প্রকাশ করো না।
সাহসী হও। যার সাহস কম তার মর্যাদাও কম। রাস্তায় চলাকালে এদিক ওদিক তাকিও না। হাম্মাম খানায় গেলে তার ভাড়া এবং বৈঠক খানার ভাড়া অন্যদের সমান দিও না। বরং তার চেয়ে অধিক দিও। এতে তাদের মাঝে তোমার দানশীলতা প্রকাশ পাবে এবং তোমাকে সম্মান করবে। নিজ হাতে জোলা কিংবা কারিগরের নিকট স্বীয় জিনিসপত্র দিবে না। বরং এ সমস্ত কাজের জন্য নির্ভরযোগ্য একজন কর্মচারী রাখ।
দিনার ও দেরহাম বেচাকেনায় সতর্ক থাকো। দেরহামের ওজন নিজে করো। এ ব্যাপারে অন্যের উপর নির্ভর করো না। দুনিয়ার সম্পদ যা আহলে ইলমদের নিকট মুল্যহীন সেটাকে হীন জ্ঞান করো। কারণ আল্লাহর নিকট যা আছে তা এ থেকে অনেক উত্তম। তোমার সর্বপ্রকার কাজকর্ম অন্যের উপর ন্যস্ত করে দাও, যেন ইলমে দ্বীনের প্রতি অধিক মনোযোগী হতে পারো। এ পদ্ধতিতে কাজ করলে তোমার প্রয়োজন অধিকতর সুন্দরভাবে মিটবে।
অপ্রকৃতস্থ লোকদের সাথে এবং আহলে ইলমদের মধ্যে যারা মুনাযারার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অজ্ঞ তাদের সাথে আলোচনা করো না। যারা মান সম্মানের আকাঙ্ক্ষী, তারা অন্যদের ব্যাপারে আশ্চর্য মাসয়ালা বর্ণনা করে। তারা তোমাকে লজ্জিত করতে চাইবে। তোমার মর্যাদার প্রতি তারা ভ্রুক্ষেপও করবে না। যদিও তুমি সত্যের উপর থাক।
যদি কখনও মর্যাদাশীল লোকদের নিকট যাও তবে তাদের উপর শ্রেষ্ঠত দেখাতে যেও না। যে পর্যন্ত তারা তোমাকে শ্রেষ্ঠত্বের দরুন মর্যাদা না দেয়। নচেৎ তাদের পক্ষ থেকে তোমার ক্ষতি হতে পারে।
মানুষের সামনে নিজে এগিয়ে ইমামতি করতে যেয়ো না। যদি না তারা তোমাকে সম্মান দেখিয়ে ইমামতির অনুরোধ করে।
দুপুরে কিংবা সকালে হাম্মামে যেয়ো না। ভ্রমণস্থানে কখনও যেয়ো না। বাদশাহর জুলুমের স্থানে উপস্থিত থেকো না। তবে তোমার যদি এ বিশ্বাস হয় যে, জুলুম থেকে তাদেরকে বিরত রাখতে পারবে তাহলে যেয়ো। কারণ তোমার উপস্থিতিতে যদি অন্যায় কাজ হয়, তবে তোমার বাধা না দেয়ার কারণে মানুষ সেটাকে বৈধ মনে করতে পারে।
শিক্ষা মজলিসে কখনও ক্রোধান্বিত হয়ো না। সাধারণ লোকের নিকট কখনও কিসসা-কাহিনী বর্ণনা করো না। কারণ কিসসা বলতে গিয়ে মিথ্যে বলতে হয়।
তুমি এ উদ্দেশ্যে কোথাও বসো না যে, তোমার উপস্থিতিতে কেউ দরস বা শিক্ষা দান করবে আর তুমি তার যোগ্যতা যাচাই করবে; বরং এর জন্য অন্য কাউকে পাঠিয়ে তার মাধ্যমে অবস্থা জেনে নাও।
কেউ যদি কোন যিকির বা ওয়াজ মাহফিল করে আর সেখানে তোমার উপস্থিতি কামনা করে এজন্য যে, তুমি উক্ত মাহফিলে তার সাফাই বর্ণনা করবে। তাহলে তুমি নিজে সেখানে যেয়ো না বরং কোন শাগরেদদের সাথে নির্ভরযোগ্য অন্যান্য লোকদেরকে পাঠিয়ে দাও।
বিবাহ পড়ানোর কাজ অন্য কোন লোক খতীব ও ইমামের উপর ন্যস্ত করে দাও। এমনি ভাবে ঈদ ও জুমআর নামাযের ইমামতির দায়িত্বও অন্যকে অর্পণ করে দাও।
সর্বশেষ উপদেশ হল নেক দোয়ায় আমাকে কখনও ভুলবে না। আর এসব উপদেশ আমার পক্ষ থেকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নাও। সাথে সাথে এটাও মনে রেখো যে, এসব উপদেশ আমি তোমাকে নিছক দ্বীনি স্বার্থে দান করেছি।
ইউসুফ বিন খালেদ সমতী (রহঃ) ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) থেকে শিক্ষা গ্রহণ শেষে স্বদেশ বসরায় প্রত্যাবর্তনের অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, আমি তোমাকে কিছু নসীহত করব যা তোমার জন্য সর্বক্ষেত্রে উপকারী প্রমাণিত হবে। এ নসীহতগুলো দ্বীন এবং দুনিয়ার প্রতি পর্যায়ে কাজে লাগবে।
স্মরণ রেখো! তুমি যখন লোক সমাজকে খারাপ জানবে, তখন তারা তোমার শত্রুতে পরিণত হবে। এমনকি তোমার মাতা-পিতা হলেও। আর যখন তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে তারা তোমার জন্য মাতা-পিতার ন্যায় হয়ে যাবে।
ইউসুফ বিন খালেদ বলেন, অতঃপর ইমাম সাহেব আমাকে বললেন, ধৈর্য সহকারে আমাকে কিছু কথা বলতে দাও। আমি তোমাকে এমন সব বিষয় বলব যেগুলো তুমি স্বীকার করে নিয়ে শুকরিয়া আদায় করতে বাধ্য হবে।
একটু পরে বললেন- মনে কর আমি তোমার সাথে রয়েছি তুমি বসরায় প্রবেশ করলে এবং তোমার প্রতিদ্বন্দীদের প্রতি মনোযোগ দিলে, নিজেকে তাদের উপর মর্যাদা দিতে লাগলে। ইলমের কারণে নিজেকে তাদের চেয়ে বড় মনে করতে লাগলে, তাদের সাথে চলাফেরা করা থেকে দুরে রইলে। তাদের বিরোধিতা শুরু করলে। তারাও তোমার বিরোধিতা করতে লাগল। তুমি তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে। তারাও তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। তুমি তাদের গালি দিলে। তারাও তোমাকে গালি দিল। তুমি তাদের পথভ্রষ্ট বললে। তারাও তোমাকে তা বলল। পরিণামে তোমাকে সেখান থেকে দূরে কোথাও সরে যাওয়ার দরকার হলো। এটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সে ব্যক্তিকে কখনও জ্ঞানী বলা যায় না যার সৌজন্যমূলক আচরণ করার প্রয়োজন অথচ সে তা করে না।
তুমি বসরায় প্রবেশ করলে লোকেরা তোমাকে অভ্যর্থনা জানাবে। তোমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসবে। তোমার হক (অধিকার) জানবে। প্রত্যেককেই তার মান অনুপাতে মর্যাদা দিও। সম্মানিতদের সম্মান দেখাও। আহলে ইলমদের তাযীম কর। বৃদ্ধদের শ্রদ্ধা কর। অল্প বয়স্কদের সাথে নম্র ব্যবহার কর। সাধারণ লোকদের নিকটে থাকো। ভাল-মন্দ প্রত্যেকের সাথে ভদ্র ব্যবহার কর। সুলতানকে অপমান করো না। কাউকে হীন জ্ঞান করো না। ভদ্রতা দেখাতে ত্রুটি করো না। কারো নিকট নিজের গোপন কথা বলো না। পরীক্ষা করা ব্যতীত কারো উপর বিশ্বাস রেখো না। অভদ্র এবং হীন চরিত্রের লোকদের বিশ্বাস করো না। যে তোমাকে অপছন্দ করে তার সাথে মহব্বত প্রকাশ করে না। আহমকদের সাথে মিলিত হয়ে খুশী প্রকাশ করো না। তার দাওয়াতেও যেও না। হাদিয়াও গ্রহণ করো না।
সর্বদা নম্র ব্যবহার করবে। ধৈর্য-সহ্যের গুণ তোমার মধ্যে থাকা চাই। সুন্দর চরিত্র অবশ্যই নিজের জন্য আবশ্যকীয় করে নিবে। অন্তর প্রশস্ত রাখবে। উত্তম পোষাক পরিধান করবে এবং সুগন্ধী ব্যবহার করবে। একটা সময় নির্দিষ্ট করে নিয়ে, স্বীয় সাথীদের খোঁজ-খবর রাখবে। অধিক তিরস্কার-ভৎর্সনা করো না। এতে উপদেশ দাতা অপমানিত হয়। তোমাকে আদব বা শিষ্টাচার শিখাবে এ সুযোগ দিও না।
নামাযের পাবন্দী করো। দানশীলতা অবলম্বন কর। কারণ কৃপণ কখনো নেতৃস্থানীয় হতে পারে না। মানুষের অবস্থা সম্পর্কে তোমাকে অবগত করার মত একজন লোক থাকা চাই। যখন কোন দোষ জানতে পারবে, অতিসত্ত্বর সংশোধন করবে আর যদি কোন গুণ সম্পর্কে জানতে পার, তবে সে ব্যাপারে তাকে আরও উৎসাহিত করবে।
যে তোমার সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে আসে তার সাথেও তুমি সাক্ষাৎ করতে যেয়ো। আর যে ব্যক্তি না আসে তার সাথেও সাক্ষাৎ কর।
সদাচারী ও অসৎ আচরণকারী উভয়ের সাথে তুমি সদাচার করো। ক্ষমার গুণ অবলম্বন কর। সৎকাজের নির্দেশ দাও। অনর্থক কাজের প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করো না। যে তোমাকে কষ্ট দেয় তাকে পরিহার করে চলো। অন্যের অধিকার আদায় করতে সচেষ্ট থেকো। তোমার ভাইদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে তুমি স্বয়ং গিয়ে তার পরিচর্যা করো। মাঝে মধ্যে অন্যের মাধ্যমেও তার খবরা-খবর নিও।
যদি কেউ তোমার নিকট আসা-যাওয়া বন্ধ করে দেয় তবে তুমি তার নিকট যাওয়া-আসা বন্ধ করো না। কেউ তোমার উপর অত্যাচার করলে তুমি তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো। কেউ তোমার নিকট আসলে তাকে সম্মান করো। কেউ তোমার সাথে অন্যায় করলে তুমি তাকে ক্ষমা করে দিও। তোমার সম্পর্কে যদি কেউ বদমাম করে তুমি তার সম্পর্কে ভাল কথা বলো। কেউ মারা গেলে তুমি অধিকার (প্রাপ্য) আদায় করে দিও। কারো সুসংবাদ এলে তুমি তাকে অভিনন্দন জানিও এবং মুসিবতের সময় তাকে সমবেদনা জানিও।
কারো উপর যদি মুসিবত এসে পড়ে তবে তাতে দুঃখ প্রকাশ করো। কেউ যদি তোমার দ্বারা কোন কাজ করিয়ে নিতে চায় তবে তা করে দিও। তোমার নিকট কোন ফরিয়াদকারী এলে তার ফরিয়াদ শ্রবণ করো। কেউ সাহায্য চাইলে তাকে সাহায্য করে। মানুষের প্রতি ভালবাসা দেখাবে। সকলের মাঝে সালাম কে ব্যাপক করো। কেউ মসজিদে কিংবা তোমার নিকট কোন মাসয়ালা বর্ণনা, করলে তার বিরোধিতা করো না।
তোমাকে যদি কোন মাসয়ালা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় তবে মানুষের যা জানা থাকে তাই বলো। অতঃপর এরূপ বলো যে, এখানে আরও একটি মত রয়েছে। তা এরূপ এবং সেটা এ দলীলের ভিত্তিতে। তারা তোমার এরূপ কথা শুনলে তাদের অন্তরে তোমার মর্যাদা বাড়বে। কেউ তোমার সাথে মতবিরোধ করলে তাকে চিন্তা-ভাবনার মত ইলম দাও। ইলমের যা স্পষ্ট তা বলো। সূক্ষ্ণ কথা বলো না। তাদের সাথে স্নেহ-ভালবাসা দেখিও। মাঝে মধ্যে হাসি কৌতুক করো। এতে মানুষের মাঝে তোমার ভালবাসা সৃষ্টি হবে এবং ইলমের চর্চা বাকী থাকবে। কখনো কখনো তাদের আহার করিয়ে দিও। তাদের ছোট ছোট অপরাধের প্রতি শৈথিল্য দেখিও। তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে দিও। তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করো। তাদের ক্ষমা করে দিও। কারো ব্যাপারেই মনের সংকীর্ণতা কিংবা কঠোরতা দেখিও না। তুমি তাদের সাথে এমনভাবে চলবে যেন তুমি তাদেরই একজন। তুমি তাদের জন্য তা পছন্দ করো যা নিজের জন্য কর।
তুমি স্বীয় নফসের হিফাযত কর এবং তার অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখ। ফিৎনা থেকে দূরে থেকো। যে তোমার সাথে কঠোর আচরণ করে তুমি তার সাথে রূঢ় ব্যবহার করো না। কেউ যদি তোমার কথা মনোযোগ সহকারে শুনে, তুমি তার কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো। মানুষ তোমাকে যে কাজের জন্য মুকাল্লাফ (বাধ্য) করেনি তুমিও তাদের সে কাজের জন্য মুকাল্লাফ করো না। তারা জেদের ব্যাপারে যে বিষয়ের উপর সন্তুষ্ট, তুমিও তাদের জন্য সে বিষয়ের উপর সন্তুষ্ট থেকো। নেক নিয়তের সাথে মানুষকে স্বাগত জানাও। সর্বদা সততা অবলম্বন করো। অহংকার যেন তোমাকে স্পর্শ করতে না পারে।
কেউ তোমাকে ধোকা দিলেও তুমি কাউকে ধোকা দিও না। আমানত আদায় করো। যদিও কেউ তোমার খিয়ানত করে। অঙ্গীকার রক্ষা কর। তাকওয়া অবলম্বন কর। আহলে কিতাবদের সাথে সেরূপ আচরণ কর, যেরূপ তারা তোমার সাথে করে। তুমি যদি আমার এ নসীহত অনুযায়ী চল, তবে সকল বিপদ হতে মুক্ত থাকবে বলে আশা করি।
আমার নিকট থেকে তোমার দূরে সরে যাওয়াটা আমাকে দুঃখিত করছে। আর এ ভেবে খুশী লাগছে যে, তুমি ভাল-মন্দের পরিচয় লাভ করবে। চিঠিপত্রের মাধ্যমে আমার সাথে সম্পর্ক রাখবে। তোমার প্রয়োজন সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবে। এ সব বিষয়ে তুমি আমার জন্য সন্তান-স্বরূপ। কারণ আমি তোমার জন্য আপন পিতার মত।
রাজনৈতিক জীবন
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর রাজনৈতিক জীবনকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম দুটি পর্যায় অপেক্ষার ছিল। এ সময়ে বিপ্লব করা যেতো, নিজের জীবন দিয়ে দেয়া যেতো। কিন্তু এতে ব্যক্তিগত উপকার অর্থাৎ শহীদ হওয়া ব্যতীত জাতির কোন উপকার হতো না। এ কারণে এ সময়ে ঘরোয়া ভাবে পরিকল্পনার সাথে সাথে আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়িত করার জন্য ব্যাপকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যান। এ আন্দোলন সম্পূর্ণ রূপে সফল হয়।
যখন অপেক্ষার পালা শেষ হলো, আইন প্রণয়ন মজলিস স্বীয় কাজ সমাপ্ত এবং বিপ্লব দ্বারা ইসলামের স্বার্থ রক্ষা হবে বলে বিশ্বাস হল, তখন ইমাম সাহেব স্বীয় জীবন উৎসর্গ করে ব্যক্তিগত স্বার্থের সাথে সাথে জাতির রক্ষায় প্রশংসনীয় ভুমিকা রাখেন, যা ইসলামী রাজনীতির ময়দানে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। এ পর্যায়টি হচ্ছে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর রাজনৈতিক জীবনের তৃতীয় পর্যায়।
ইমাম সাহেবের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্যায় কায়রোর বনী উমাইয়্যার অত্যাচার, এ সময়ে ইমাম সাহেবের রাজনৈতিক কর্মধারা হযরত যায়দের সমর্থনে ফতোয়া এবং ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা, গভর্ণর ইবনে হুবায়রার নির্মম অত্যাচার এবং বনী উমাইয়্যার বিরুদ্ধে আব্বাসীয়দের আন্দোলনের সময় ইমাম সাহেবের হারমাইন শরীফে হিজরত।
দ্বিতীয় যুগে আবু মুসলিম খোরাসানীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে এককভাবে ইব্রাহীম সায়েগের বিদ্রোহ, ইমাম সাহেব তাকে ব্যাপক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা বুঝানো সত্ত্বেও, তার ঈমানী আবেগের কারণে এককভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া, জাতীয় স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে ইমাম সাহেবের আইন প্রণয়ন এক সংকলনের প্রতি মনোনিবেশ করা।
তৃতীয় যুগ যা ইমাম সাহেবের রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্যায়, যখন খলীফা আবু জাফর মনসুরের শাসনামলে ফিকাহ এবং ইসলামী আইন সংকলনের কাজ সমাপ্ত হয় ইমাম সাহেব থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে কাজ শুরু করে দেন। অপর দিকে মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ নফসে যাকিয়্যা এবং ইব্রাহীম নফসে রাযিয়্যার নেতৃত্বে বিরাট একটি আন্দোলনের জাল বিস্তারের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। এ আন্দোলনটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ইমাম সাহেব এতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন।
কিন্তু তদবীরের মোকাবেলায় তকদীর ছিল শক্তিশালী; তাই দৃশ্যত আন্দোলনকে দমন করে দেয়া হয়েছে। ইমাম সাহেবকে প্রতিশোধমুলক হত্যা করা হয়। এর বিনিময়ে ইমাম সাহেব ব্যক্তিগত স্বার্থ শাহাদাৎ লাভ ছাড়াও জাতীয় পর্যায়ে এতটুকু লাভ হয়েছে যে ফিকাহে হানাফীর সংকলিত আইন ৫৩০ বছর পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে বাস্তবায়িত ছিল যার কোন নজীর মানব জগতে দেখা যায় না। শুধু তাই নয় বরং হানাফী ফকীহ এবং কাযীদের সম্মুখে আব্বাসীয়দেরকে অত্যাচারী খলীফাদের নত থাকতে হয়েছে।
ইমাম আযম আবু হানিফা (রহঃ) তখন আবির্ভূত হন যখন সারা বিশ্ব বনী উমাইয়্যার অত্যাচারে জর্জরিত ছিল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রপৌত্রদ্বয়কে শহীদ করা হয়েছিল, হাররার ঘটনায় মদীনা মুনাওয়ারার পবিত্রতা নস্যাৎ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন যাবৎ মসজিদে নববীতে নামায পড়ার মত সায়ীদ মুসাইয়্যেব ব্যতীত আর কেউ ছিল না। হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ) কে বাইতুল্লাহর প্রান্তে শহীদ করা হয়েছিল।
ইমাম সাহেবের জন্মের সময় ইবনে যিয়াদ এবং এরপর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ গরীব এবং অসহায়দের উপর অত্যাচার চালায়।
হাসান বসরী, ইবনে সিরিন, ইব্রাহীম নখয়ী এবং ইমাম শাবী (রহঃ)-এর মত আহলে ইলম এবং বুযুর্গদের নিচুপ থাকা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।
মুসলিম বিশ্বের এ নাজুক অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনের হিফাযতের জন্য এমন একজনকে খলীফা মনোনীত করলেন যিনি অন্যায়-অত্যাচার করার পরিবর্তে মানুষের নিকট ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহর নাফরমানীতে তোমরা আমার আনুগত্য করো না। এ সময় ইমাম সাহেব যৌবনে পদার্পণ করেছেন। খলীফা উমর বিন আব্দিল আযীযের এ ঘোষণায় তিনি প্রভাবান্বিত হন। তিনি হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমানের দরসে শরীক হন।
এ দিকে খলীফা উমর বিন আব্দিল আযীযের মৃত্যু হলে ইয়াযীদ ক্ষমতায় আসে। ইয়াযীদের পর ছয়জন বনী উমাইয়্যা একে একে খলীফা নিযুক্ত হয়।
তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে ইমাম সাহেব মক্কায় হিজরত করেন আব্বাসীয়দের ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন।
কুফায় প্রত্যাবর্তনের পর ইমাম সাহেব ফিকাহ এবং আইন সংকলনের সাথে সাথে এগুলো প্রয়োগের জন্য এমন রাজনৈতিক পদ্ধতি অবলম্বন করে যাতে প্রচলিত রাজনীতির মত প্রোপাগাণ্ডা, মিছিল প্রভৃতি ছিল না। ইমাম সাহেব স্বীয় প্রসিদ্ধি এবং পরিচিতির পরিবর্তে আইনের ক্ষমতা দেখাতে চাইতেন।
আব্বাসী খলীফা আবু জাফর মনসুর ইমাম সাহেবকে কাযীর পদ গ্রহণ করার জন্য বাধ্য করতে চাইলে তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন, আপনার চতুঃপার্শ্বে যে সমস্ত লোক রয়েছে তাদের প্রয়োজন এমন শাসকের যিনি আপনার কারণে তাদেরকে সম্মান করবেন। এ কথা দ্বারা ইমাম সাহেব এ দিকে ইশারা করলেন যে, আপনার সহচরদের কেউ ন্যায় বিচারের আকাঙ্ক্ষী নয়। খলীফাকে লক্ষ্য করে আরও বলেন, যদি আপনার বিরুদ্ধে কোন মোকাদ্দমা দায়ের হয় আর আপনি আমার পক্ষ থেকে এটা চান যে, আমি আইনানুগ বিচার না করি এবং আমাকে এ হুমকি দেন যে, যদি এরূপ না কর তবে তোমাকে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা হবে, তবে স্মরণ রাখুন, আমি ডুবে যাওয়াটা পছন্দ করব কিন্তু অন্যায় বিচার করা আমার দ্বারা সম্ভব হবে না।
একবার খলীফা আবু জাফর মনসুর ইমাম সাহেবের নিকট কিছু জিনিষ পাঠালেন। ইমাম সাহেব তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। বন্ধুরা এ পরামর্শ দিলেন, এগুলো গ্রহণ করে সদকা করে দিন। ইমাম সাহেব বললেন, তার নিকট হালাল কিছু আছে কি?
ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁকে যখন সাধারণ কবরস্থান হতে পৃথক দাফন করা হল তখন খলীফা মনসুর ইমাম সাহেবের কবরে নামায পড়তে গেলে পর জিজ্ঞেস করলেন যে, তাকে সাধারণ কবরস্থান হতে পৃথক স্থানে কেন দাফন করা হল? লোকজন উত্তরে বলল যে, ইমাম সাহেবের মতে বাগদাদের শাসক ‘আরদে মগসুবা’ (জবরদখলকৃত) আর ইমাম সাহেবের এ ফতোয়া অসিয়ত ছিল যে, তাঁকে যেন এমন স্থানে দাফন করা না হয় যা অবৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে। খলীফা মনসুর কবরের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, জীবদ্দশায় এবং মরনের পর আপনার হাত থেকে আমাকে কে বাঁচাবে।
উম্মতে মুহাম্মদীর উপর অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচার দেখে ইমাম সাহেব সব সময় চিন্তিত ছিলেন যে, কিভাবে এদের হাত থেকে উম্মাতে মুহাম্মদীকে নিষ্কৃতি দেয়া যায়। তার সামনেই ইমাম যয়নুল আবেদীনের সাহেব জাদা হযরত যায়েদকে শহীদ করা হয়। আবার মুহাম্মদ নফসে যাকিয়্যাকে হত্যা করা হয়। হযরত যায়দের শাহাদতের ঘটনা স্মরণ হলেই তিনি কেঁদে উঠতেন। হযরত আব্দুলাহ বিন যুবাইরের সাহেবজাদা হাসান বর্ণনা করেন, আমি আবু হানিফাকে দেখেছি যে, তিনি মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন হাসানের শাহাদতের পর তার কথা আলোচনা করেছেন। তার চোখ দুটো থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল।
মুসলিম বিন সালেম বলেন, আমি অনেক বড় বড় আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা হতে উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি অধিক শ্রদ্ধাশীল অন্য কাউকে দেখিনি।
উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি অধিক শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কারণেই তিনি স্বয়ং বিছানা হিসেবে চাটাই ব্যবহার করতেন। খোরাকী বাবদ মাসে দু’দিরহামের অধিক ব্যয় করতেন না। কিন্তু অধিক অর্থ আয়ের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে ব্যবসা শুরু করেন। এ অর্থ দিয়ে গরীব মিসকীনদের, আলেমদের, শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা উদ্দেশ্য ছিল। তিনি তাদের সর্বদা আর্থিক সহায়তা করার কারণে তাঁর মজলিসকে ‘মজলিসুল বারাকা’ বলা হত।
এদিকে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর বাসস্থান কূফায় ইবনুন্নাসরানিয়া খালেদ ১০৫ হিজরী হতে ১২০ হিজরী পর্যন্ত গভর্নর নিযুক্ত ছিল। গভর্নর খালেদের হাতে কূফাবাসী দীর্ঘ পনের বছর পর্যন্ত নির্যাতিত এবং নিপীড়িত ছিল। মুসলমানদের মসজিদের মিনার ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল। মুসলমানদের অর্থ দ্বারা খৃষ্টানদের গির্জা তৈয়ার করা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর খলীফাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত উছমান (রাঃ) কে অভিসম্পাত করা হয়েছিল। প্রজাদের ক্ষুধায় মারা হয়েছিল। গভর্নর খালেদের অপসারণের পর ইউসুফ নামক অন্য একজন গভর্নর নিযুক্ত হয়। সেও খালেদ হতে কম অত্যাচারী ছিল না। তার আমলে দিনকে দিন বলাও অপরাধ ছিল রাত বলাও অপরাধ ছিল।
ঠিক এমনি সময়ে হযরত যায়দ বিন আলী বনী উমাইয়্যার সাথে মুকাবিলা করার জন্য কুফায় আগমন করেন। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর প্রিয়ভাজন হযরত মনসুর বিন মু’তামির প্রকাশ্যে বনী উমাইয়্যার সাথে মুকাবিলা করার জন্য হযরত যায়দের পক্ষ হতে বাইয়াত লওয়া শুরু করেন। এ আন্দোলনে চার হাজার ব্যক্তি হযরত যায়দের সাথে মিলে বনী উমাইয়্যার বিরুদ্ধে লড়তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। হযরত সুফিয়ান ছাওরী এবং ইমাম আমাশ (রহঃ) ও তার সমর্থন করেন। হযরত যায়দ একজন বিশেষ দূত ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর খিদমতে পাঠিয়ে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করলে ইমাম সাহেব তার সমর্থনে ফতোয়া প্রদান করেন যে, এ সময় অন্যায়ের প্রতিবাদে হযরত যায়দের পক্ষে দাঁড়ানো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদরের ময়দানে গমন করার শামিল। জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে নিশ্চুপ থাকা ইমাম সাহেবের মতে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করার কোরআনী নির্দেশ রহিত করার নামান্তর। আবার অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি যদি বুঝতে পারতেন যে, এ ক্ষেত্রে অসৎকাজের প্রতিবাদ করতে গেলে আরো খারাপ একটা মন্দ কাজের প্রচলন হবে, তবে সে ক্ষেত্রে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করতেন। এটাও তিনি কোরআনের নির্দেশ মত করতেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ফাজাক্কির ইন-নাফায়াতিজ জিকরা’ অর্থাৎ নসীহত কর যদি নসীহত উপকারে আসে।
এ বিষয়ে হানাফী মাযহাব হচ্ছে যে, যদি সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করাটা উপকারে না আসে, যাদেরকে খারাপ কাজ হতে বিরত করা প্রয়োজন তাদের মুকাবিলা করার শক্তি না থাকে এবং তা করতে গেলে আরো খারাপ অবস্থার সম্মুখীন হওয়াটা নিশ্চিত হয় তবে এ সময়ে প্রত্যেকেই নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে রাখবে।
এ সময় সম্পর্কেই বলা হয়েছে যে,
“ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু আলাইকুম আনফুসুকুম লা ইয়াদুর্রুকুম মান দাল্লা ইজাহতাদাইতুম”
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের প্রতি লক্ষ্য রাখ। পথভ্রষ্টরা তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না- যদি তোমরা সঠিক পথে চল।
এমন ছোট ছোট দলের কোরবানী যার উপকার নিজেদের শহীদ হওয়া পর্যন্ত সীমিত থাকে। জনগণের কোন উপকারে আসেনা। এটা হতে- এমন একটি বড় দলের কোরবানী যার সুফল জনগণ পর্যন্ত পৌছে- অধিক প্রয়োজনীয়। ইমাম সাহেব বলেন,
যদি সৎ সহযোগীর দল মিলে যায় এবং তাদের মধ্য হতে একজন নেতৃত্ব দেয় এবং সে এমন ব্যক্তি হয় যে আল্লাহর দ্বীনের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য এবং স্বীয় পথ হতে না ফিরে তখন মুসলমানদের এ সম্মিলিত দায়িত্ব আদায়ের জন্য এ ময়দানে অটল থেকে অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে এক সীসাঢালা দেয়ালের মত হয়ে যাওয়া চাই।
এতদসত্ত্বেও কেউ যদি ইসলামী বিপ্লবের আশা নিয়ে এককভাবে এ পথে এসে নিজেকে শহীদ করে দেয় তবে সে ব্যক্তি ছওয়াবের অধিকারী হবে।
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী বলেন,
সে যদি বুঝতে পারে যে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের মারধর সে সইতে পারবে, কারো নিকট তার অভিযোগ করবে না এবং স্বেচ্ছায় খারাপ কোন কিছুর কারণও হবে
‘তবে এমন ব্যক্তি সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করতে পারে, বরং এমন ব্যক্তিকে মুজাহিদ বলা যাবে।’
হযরত যায়দ কুফায় জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে দল গঠন করেছিলেন। ব্যক্তি হিসেবেও তিনি নির্ভরযোগ্য ছিলেন। কিন্তু তিনি যাদের নিয়ে দল গঠন করেছিলেন তাদের সম্পর্কে ইমাম সাহেব সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এরা শেষ মুহূর্তে তাকে একা ফেলে পালিয়ে যাবে। এ কারণে ইমাম সাহেব তার সাথে সরাসরি শরীক হননি। তিনি বলেন, যদি আমি জানতাম যে লোকজন হযরত যায়দকে ছেড়ে যাবে না, তারা তার সাথে যুদ্ধে দাঁড়াবে, তবে অবশ্যই আমি হযরত যায়দের সাথে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতাম। কারণ ইনি সঠিক ইমাম। তবে ইমাম সাহেব হযরত যায়দকে তার জিহাদে দৈহিকভাবে সহযোগিতা না করে থাকলেও আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। তিনি হযরত যায়দের দূত ফোযাইলের হাতে দশ থলি মুদ্রা দিয়ে বলেছিলেন, আমি এ মাল দিয়ে হযরত যায়দের খেদমত করছি। তার নিকট এ আরজ করবে যে, তার শত্রুদের মুকাবিলায় যেন এ অর্থ ব্যয় করেন।
বনী উমাইয়্যার সাথে ইমাম সাহেবের সম্পর্ক কিরূপ ছিল এ সম্পর্কে ইবনে আসাকের হাকাম বিন হিশামের বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আমাদের প্রশাসন চাইল যে, তার ধনাগারের চাবি আবু হানিফার নিকটি সমর্পন করে দিবে অথবা সে তার পিছে কোড়া গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। ইমাম আবু হানিফা শাসকদের শাস্তিকে গ্রহণ করলেন!
ইমাম সাহেবের ব্যাপারে বণী উমাইয়্যা প্রথমে নরম আচরণ করে। কিন্তু এতে যখন তাদের উদ্দেশ্য পুরণ হয়নি তখন তারা কঠোরতা অবলম্বন শুরু করে। বনী উমাইয়্যার শাসকদের মধ্যে ইবনে হুবাইরা এ কৌশল অবলম্বন করে।
ইবনে হুবাইরা ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর নিকটি আরজ করল “হে শায়খ! আপনি যদি আমাদের নিকট একটু বেশী আসা-যাওয়া করেন তবে আমরাও আপনার দ্বারা উপকৃত হব-আর আপনিও আমাদের দ্বারা উপকৃত হবেন।”
জবাবে ইমাম সাহেব বললেন, তোমার নিকট এসে আমি কি করব? যদি তুমি আমাকে তোমার নৈকট্য দান কর তবে আমাকে ফিৎনায় ফেলবে। আর যদি আমাকে দূরে রাখ অথবা নৈকট্যদানের পর দূরে সরিয়ে দাও তবে অনর্থক আমাকে চিন্তায় ফেলা হবে। তোমার নিকট এমন কোন কিছুই নেই যার কারণে আমি তোমাকে ভয় করব!
এতে যখন গভর্নর ইবনে হুবায়রার ইচ্ছা পূরণ হল না তখন সে অন্য কৌশল অবলম্বন করল। গভর্ণরের পর সর্বোচ্চ পদটি গ্রহণে তাকে আবেদন করল।
রবীর মাধ্যমে ইমাম সাহেবকে এ প্রস্তাব দিল যে, গভর্নরের সীলমোহর তার হাতে সমর্পণ করা হবে যেন যদি কোন নির্দেশ প্রকাশিত হয় কিংবা সরকারের পক্ষ হতে কোন কাগজ প্রচারিত হয় অথবা কোষাগার হতে কোন মাল বের করা হয় সব যেন ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর তত্ত্বাবধানে হয়।
ইমাম সাহেব এ পদ গ্রহণেও অস্বীকৃতি জানালেন। ইমাম সাহেবের এ অস্বীকৃতির ভয়াবহ পরিনামের প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রমুখ প্রসিদ্ধ উলামায়ে কিরাম ইমাম সাহেবের খিদমতে এসে তাকে বুঝাতে লাগলেন “আমরা আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি আপনি নিজেকে ধ্বংস করবেন না। আমরা আপনারই ভাই-বন্ধু। শাসনের সাথে এ সম্পর্ককে আমরাও অপছন্দ করি কিন্তু এ মুহুর্তে তা গ্রহণ করা ব্যতীত আমরা অন্য কোন উপায় দেখছি না।”
কিন্তু ইমাম সাহেব এ মঙ্গলকামীদের উত্তরে বললেন, এ চাকুরি তো অনেক বড় ব্যাপার। প্রশাসন যদি আমাকে শহরের মাঝের দরজাগুলো গণনা করার দায়িত্বও দেয় তবুও আমি তা গ্রহণ করব না।
অস্বীকৃতির পরিনাম নিয়ে উলামাদের এ দলটি চিন্তিত ছিলেন। এ দিকে ইবনে হুবাইরাও ইমাম সাহেবকে রাজি করানোর জন্য সর্বপ্রকার ক্ষমতা প্রয়োগের কসম করে বসেছে। ঐ দিকে ইমাম সাহেবও প্রশাসনে শরীক না হওয়ার কসম করেছেন। “খোদার কসম! আমি কখনও নিজেকে এতে জড়িত করব না।”
তখন ইবনে আবি লাইলা এ কথা বললেন, ‘তোমরা তোমাদের সাথীকে সত্যের উপর ছেড়ে দাও। তিনি ব্যতীত অন্যেরা ভুলের উপর আছে।’
ইমাম সাহেবের এ অসহযোগিতা এক মুহূর্তের জন্যও সহ্য হয়নি। গভর্ণর ইবনে হুবাইরা ইমাম সাহেবকে পনের দিনের জন্য জেলখানায় পাঠিয়ে দিল। সেখানেও ইমাম সাহেবকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখানো হল। বিভিন্ন পদের প্রস্তাব দেয়া হল। ইমাম সাহেব সেগুলোও প্রত্যাখান করলেন। এতে ইবনে হুবাইরা রাগে ফেটে পড়ল। কসম করল যদি সে এরূপ না করে (আমার প্রস্তাব গ্রহণ করে) তবে তাকে অবশ্যই কোড়া মারব।
কিন্তু ইমাম সাহেব এতে মোটেই ভীত হলেন না বরং তিনি আরো কঠিন শপথ করলেন,
‘খোদার কসম! আমাকে যদি হত্যাও করা হয় তবু আমি তা গ্রহণ করব না।’
ইমাম সাহেবের এ উত্তর গভর্ণরের মর্যাদার মিনারে কুঠারাঘাত করল। ইমাম সাহেবকে জেলখানা থেকে বের করে সামনে উপস্থিত করা হল। তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দেয়া হল। ইমাম সাহেব শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
মৃত্যুতো একটাই,
ইবনে হুবাইরার ইঙ্গিতে জল্লাদ ইমাম সাহেবের খালি মাথায় কোড়া দ্বারা আঘাত করতে লাগল। প্রহারের পর যখন ইমাম সাহেবকে পুনরায় জেলখানায় নেয়া হচ্ছিল তখন তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
১৩০ হিজরী। আবু মুসলিম খোরাসানী বনী উমাইয়্যার বিরুদ্ধে আব্বাসীদের ষড়যন্ত্র শুরু করল। ইব্রাহীম বিন মায়মুন এবং মুহাম্মদ বিন ছাবেত আবদী সহ অনেকে তার সাথে হাত মিলাল। কিন্তু ইমাম সাহেব আবু মুসলিমের অত্যাচার এবং এ বিপ্লবের পরিণামের প্রতি লক্ষ্য রাখলেন। এ বিপ্লব যদিও বনী উমাইয়্যার বিরুদ্ধে চলছিল এবং ইমাম সাহেব তাদের দ্বারা অত্যাচারিত হওয়ার কারণে মানবিক চাহিদা মুতাবেক আবু মুসলিম খোরাসানীর সাথে মিলে বনী উমাইয়্যা থেকে প্রতিশোধ নেয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু যেহেতু এ বিপ্লবে কোন সুফলের আশা ছিল না। বরং পরিবর্তনই এর উদ্দেশ্য ছিল। তাই ইমাম সাহেব তার সাথে সহযোগিতা করেন নি।
ঠিক যে সময় আব্বাসীয়দের বিপ্লব প্রকাশ পেলো এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় বনী উমাইয়্যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ল। সে সময় ইমাম সাহেব হারামাইন শরীফাইনে হিজরত করেন। বনী উমাইয়াদের পরাজিত করে আব্বাসীয়দের নিজেদের হাতে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে,অবস্থান করেন।
আবু মুসলিম খোরাসানী খোরাসানের স্বাধীন শাসক ছিল। ১৩১ হিজরী হতে ১৩৬ হিজরী পর্যন্ত তার শাসনকাল ছিল। ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে সে সামান্য কারণেই মানুষকে হত্যা করত। কালো পোষাক কেন পরিধান করেছেন? এ ক্ষুদ্র প্রশ্নের কারণে প্রশ্নকারীকে হত্যা করা হয়েছে। তার জুলুম অত্যাচারের শিকারের সংখ্যা ইতিহাসবিদদের বর্ণনামতে ছয় লক্ষ। তার নির্মম কার্যকলাপ হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হতে কোন অংশেই কম নয়।
বনী উমাইয়্যার বিরুদ্ধে যারা আবু মুসলিম খোরাসানীকে সৎ উদ্দেশ্যে সাহায্য করেছিলেন, তার অমানুষিক কার্যকলাপ প্রকাশ পাওয়ার পর তারা সবাই তাদের ভ্রান্তি বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হলেন। ইমাম সাহেব প্রথমেই তার ভেতরের কুকুরটি দেখতে পেয়েছিলেন। তাই তিনি তাকে কোনরূপ সাহায্য করেননি।
ইব্রাহীম আসসায়েগের নিকট যখন আবু মুসলিমের সত্যিকার রূপ প্রকাশ পেল তখন তার অন্তরে সত্য প্রকাশের আগুন জ্বলে উঠল। আবু মুসলিমকে তার কপটতার এবং অন্যায় অত্যাচারের শাস্তি দেয়ার এবং একটি ইসলামী বিপ্লবের রূপ দেয়ার সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেন।
এ বিষয়ে তিনি ইমাম আযম আবু হানিফা (রহঃ)-এর সাথে আলোচনা করেন। উভয়ে এ ব্যাপারে একমত হন যে, আবু মুসলিমের মুকাবিলা করা এ মুহূর্তে ফরয। এরপর ইব্রাহীম আসসায়েগ ইমাম সাহেবকে বললেন,
‘আপনি হাত বাড়ান, আমি আপনার হাতে বায়য়াত করব।’
ইব্রাহীম সায়েগ ইমাম সাহেবকে যে কাজের জন্য উৎসাহিত করতে চাইলেন-তাঁর দৃষ্টি এর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রতি নিবন্ধ ছিল। তিনি অবসর সময়ে শরীয়তের আইন প্রণয়নে ব্যস্ত থাকতেন। বাহ্যত, দেখা যেত তিনি ব্যবসা-বানিজ্য এবং ছাত্রদের শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত আছেন।
এদিকে ইব্রাহীম সায়েগ তাঁকে যে পথের পথিক হবার আহবান জানিয়েছেন, সে পথের উপযুক্ত এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক পথিক এবং পাথেয় অপর্যাপ্ত হওয়ার কারণে ব্যর্থ হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত ছিল। আর তা হলে ইমাম সাহেব যে নীরব জিহাদ তথা শরীয়তের আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সেটাও সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হবে। এসবদিক চিন্তা করেই ইমাম সাহেব ইব্রাহীম সায়েগের প্রদর্শিত পথে পা দেননি। বরং স্বপথে স্বীয়গতিতে তিনি এগিয়ে যেতে লাগলেন এবং স্বীয় লক্ষ্যে তিনি সফল হলেন। তিনি ফিকাহবিদ, মুজতাহিদ, কাযী এবং মুফতিদের একটি দল তৈরী করেন।
শাসকগণ তাঁর মুখাপেক্ষী হল। খলীফাদের দরবারে তাঁর আলোচনা হতে লাগল। লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, ইমাম সাহেব সারাজীবন শাসকদের থেকে দূরে ছিলেন, প্রশাসন থেকে বিমুখ ছিলেন, রক্তের সাগর বয়ে যেতে দেখেও বন্ধুদের তথা শিক্ষার্থীদের ছেড়ে আসেন নি। এসব বিষয়ে অবশ্য অনেকে তার সাথে শরীক ছিলেন। কিন্তু তাঁর বিশেষত্ব ছিল তিনি শাসকদের থেকে দূরে ছিলেন। অথচ তাদেরকে তাঁর মুখাপেক্ষী করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। স্বীয় মজলিস খলীফাদের আলোচনা হতে মুক্ত রাখেন। কিন্তু তাদের মজলিসে তাঁর আলোচনা পৌঁছিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, বরং তিনি সুকৌশলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন যে, খলীফাগণ, ইমামগণ এবং হাকেমগণ তাঁর সংকলিত আইনানুসারে ফয়সালা করতে লাগলেন! মানুষের গতি তাঁর দিকে ফিরে গেল। বড় বড় আমীর এবং হাকেমগণ তাঁর সম্মান করতে লাগল। তিনি এমন কাজ করে দেখালেন যা অন্যের দ্বারা সম্ভব হয়নি।
মোটকথা, ইমাম সাহেবের ইলমী এবং আমলী প্রচেষ্টায় এবং কৌশলে পরিবেশ এমন সৃষ্টি করে রেখেছিলেন যে, প্রশাসনিক কাজে ইমাম সাহেবকে আহবান করা একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেমন খলীফা আবু জাফর মনসুর বাগদাদ শহর পত্তন করার সময় বিভিন্ন কাজে ইমাম সাহেবের সহযোগিতা নিয়েছিলেন।
এরপর ইমাম সাহেব খলীফা আবু জাফর মনসুরের সাথে সাক্ষাতের সময় এ প্রচেষ্টাই করতেন যে, তিনি সারাজীবন চেষ্টা করে যে সব ইসলামী আইন সংকলন করেছেন সেগুলো যেন জন-জীবনে বাস্তবায়িত করা হয়।
এ সময় খলীফার পক্ষ হতে ইমাম সাহেবের নিকট বিভিন্ন প্রকারের হাদিয়া তোহফা আসতে লাগল। এতে খলীফার উদ্দেশ্য ছিল ইমাম সাহেবকে তার সমর্থক বানানো। ইমাম সাহেব এ সবকিছু বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি সরকারী সকল প্রকার উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করেন!
এর মাঝেই একদিন খলীফা আবু জাফর মনসুর ইমাম সাহেব, ইমাম মালেক এবং ইবনে আবি যিব এদের তিনজনকে তার দরবারে ডাকালেন। তাদের তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সত্য করে বলুন তো প্রশাসনের ক্ষমতা যা আমাদের হাতে এসেছে বস্তুত, আমরা তার উপযুক্ত কিনা!
এর জবাবে ইমাম সাহেব খলীফার দরবারে যে দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন তার সারাংশ হচ্ছে, “কোন প্রকারেই তোমাদের প্রশাসন শরীয়ত সমর্থিত এবং আইনানুগ নয়। তোমরা যখন প্রশাসনের ক্ষমতা হাতে নাও তখন দু’জন মুফতিও তোমাদের খেলাফতের ব্যাপারে একমত হননি!”
এ বক্তব্যে খলীফা মনসূর ইমাম সাহেবের উপর রাগান্বিত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোন কিছু করতে সাহস করেননি। তিনি ইমাম সাহেবকে নির্বিঘ্নে বাড়ী ফেরার অনুমতি দিলেন।
ইমাম সাহেবের এ বক্তব্য দ্বারা তাঁর সম্পর্কে খলীফার যে সন্দেহ ছিল তা বিশ্বাসে পরিণত হল, ইমাম সাহেবের ব্যাপারে খলীফা কোন সিন্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি যে তাকে কিভাবে দমানো যেতে পারে।
এদিকে মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ নফসে যাকিয়্যা মদীনায় বিদ্রোহ এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত করেছেন। তার এ আন্দোলনটি ব্যাপক এবং বিপ্লবী আন্দোলন ছিল। সমস্ত মুসলিম বিশ্বে একই দিনে অভূত্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মদীনায় এমন কেউ ছিল না যে তার সমর্থক ছিল না। এ আন্দোলনের নেতা মুহাম্মদ নফসে যাকিয়্যা এবং তার ভাই ইব্রাহীম নফসে রাযিয়্যা উভয়ই যোগ্য ছিলেন।
এদিকে ইমাম সাহেব যে মহৎকাজ শুরু করেছিলেন তা সম্পন্ন হয়ে গেছে। আর তিনি যেরূপ নিয়মতান্ত্রিক ব্যাপক আন্দোলনের প্রত্যাশী ছিলেন, নফসে রাযিয়্যা এবং নফসে যাকিয়্যা ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে তাও আত্মপ্রকাশ করেছে। তাই তিনি প্রশাসন হতে সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া হয়ে এ আন্দোলনের প্রকাশ্যে সমর্থন করেন। তিনি লোকদের দিয়ে প্রশাসনের তথা আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেন।
খলীফা মনসুর বিদ্রোহ দমন করার জন্য কুফায় আগমন করেন। তার কর্মীরা সন্দেহভাজন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই হত্যা করত। এ সময়ে হাশবীয়ারা এবং মুহাদ্দেছীনদের একদল এ ফতোয়া দিল যে, “এ মূহুর্তে প্রশাসনের বিরোধিতা করা, কোন নেক কাজ তো নয়ই বরং এতে ফিৎতা-ফাসাদ সৃষ্টি হয়।
ইমাম সাহেব এসব দিক ভ্রুক্ষেপ না করে জিহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি এ ফতোয়া প্রচার করলেন যে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা পঞ্চাশবার হজ্জ করা হতেও উত্তম।
এ আন্দোলনের ব্যাপারে ইমাম সাহেবের প্রেরণা এবং উদ্দীপনা শেষ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। এতে তাঁর সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের উপর। বিপদের আশংকা দেখা দিয়েছিল।
এদিকে ইমাম সাহেব খলীফা মনসুরের প্রধান সেনাপতি হাসান বিন কাহতাবাকে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নিয়েছিলেন। তার পিতা কাহতাবা ছিলেন আব্বাসী খলীফার দক্ষিন হস্ত।
আব্বাসীয়দের খেলাফত প্রতিষ্ঠার সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সমাধা করেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে হাসান তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং তার ছেলে তারই মত আব্বাসীয়দের অনুগত ছিলেন। বিদ্রোহের পূর্বক্ষণে এমন এক ব্যক্তিকে তাদের (সরকারী) দল থেকে সরিয়ে এনে নিজেদের দলে ভিড়ানো; এটা ছিল ইমাম সাহেবের কারামত অথবা অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।
ইমাম সাহেবের এ রাজনৈতিক কৌশলের সামনে খলীফা মনসুর নিজেকে অসহায় বোধ করলেন। নিজে একজন সাহসী যোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও তিনি কুফা শহরের প্রতিটি দরজায় দ্রুতগামী ঘোড়ার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। যেন প্রয়োজনের সময় যেদিকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আসে পালাতে পারেন। এসব সত্ত্বেও ইমাম সাহেবের উপর হাত তোলার সাহস খলীফার হয়নি। কারণ তিনি তখন শুধু ইরাকেরই নয় বরং সমস্ত প্রাচ্যের নেতা ছিলেন। সরাসরি তাঁর উপর হাত তোলার ভয়াবহ পরিণতির কথা অবিদিত ছিল না।
একটা অভূত্থানের সমস্ত আয়োজন সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য ছিল বিরূপ। এ আন্দোলনের নেতৃদ্বয়কে শহীদ করা হয়। ফলে আন্দোলন দমে যায় কিন্তু তবুও ইমাম সাহেবের দিকে খলীফা হাত বাড়াননি।
বিদ্রোহ দমনের পর খলীফা আবু জাফর মনসুর বাগদাদ শহর পত্তনের দিকে মনোনিবেশ করলেন। এর সাথে সাথে যারা এ বিদ্রোহে জড়িত ছিল তাদেরকে বেছে বেছে প্রতিশোধ নিতে লাগলেন। ইমাম মালেক (রহঃ) তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়ার কারণে তাঁকে ৩০ টি কোড়া এবং অন্য বর্ণনামতে ১০০ কোড়া মারা হয়।
ইমাম সাহেবকে দমন করার জন্য খলীফা বিভিন্ন পন্থা খুঁজতে লাগলেন। তিনি এর জন্য দু’টি পথ দেখতে পেলেন। হয়ত তাঁকে সরকারী কোন পদে অধিষ্ঠিত করে স্বীয় অনুগত করে নেয়া। অথবা কোন অজুহাতে তাঁর মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেয়া।
তিনি প্রথমে প্রথম পন্থা অবলম্বন করতে চাইলেন। তাঁকে কূফা থেকে বাগদাদে ডেকে এনে কাযীর পদ গ্রহণ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে লাগলেন। প্রথমে স্থানীয় কাযী হওয়ার জন্য বললেন। এতে তিনি অস্বীকৃতি জানালে কয়েকটি প্রদেশের কাযী হওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। এতেও তিনি রাযী না হলে সমস্ত মুসলিম বিশ্বের প্রধান কাযীর পদ গ্রহণ করার জন্য তাঁকে বলা হল।
এ পদগুলো গ্রহণ করাটাই বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইমাম সাহেবের জন্য সমীচীন ছিল। কারণ এতে তাঁর সংকলিত ইসলামী আইন মানবজীবনে প্রতিষ্ঠার সুযোগ ছিল। কিন্তু ইমাম সাহেবের দূরদৃষ্টিতে খলীফার দূরভিসন্ধি ধরা পড়ে ছিল। এ জন্য তিনি খলীফার ফাঁদে পা দেননি। অবশ্য তার জন্যও দুটি পথ খোলা ছিল। হয়ত খলীফার প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রাণে বেঁচে যাওয়া অথবা নিজের মিশনকে বাকী রাখার জন্য স্বীয় জীবনকে বিপদে ফেলা। দ্বিতীয় পথটিই ইমাম সাহেবের নিকট কামিয়াবীর একমাত্র পথ মনে হল। তাই তিনি এ পথটি অবলম্বন করলেন। তিনি তাঁর শাগরেদদের কূফার জামে মসজিদে সমবেত করে তাদের উদ্দেশ্যে বিশেষ বক্তব্য রাখেন। তার অংশ বিশেষ এরূপ:-
“তোমরা আমার হৃদয়ের আনন্দ। তোমাদের মাধ্যমেই আমি আমার ব্যথা-বেদনা দূর করব। আমি অবস্থা এমন করে দিয়েছি যে, মানুষ তোমাদের পদাংক অন্বেষণ করে তা অনুসরণ করবে। তোমাদের প্রতিটি কথা মানুষ তালাশ করবে। তোমাদের চলার পথ সহজ করে দিয়েছি।
অতঃপর তাঁর চল্লিশজন বিশেষ শাগরেদকে নিকটে ডেকে বললেন, “এখন তোমরা আমাকে সাহায্য করার সময় এসেছে। আমি এ কথা বলতে চাই যে, তোমাদের এ চল্লিশ জনের প্রত্যেকেই কাযী হওয়ার যোগ্যতা নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করে নিয়েছ। তন্মধ্যে দশজন এমন যে, তারা কাযীদেরও সুন্দরভাবে শিক্ষা দিতে পারবে।
তোমাদের নিকট আমার এ আকাঙ্ক্ষা যে, তোমরা ইলমকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাবে। কাযীর পদে ততক্ষণ পর্যন্ত অধিষ্ঠিত থাকা বৈধ, যতক্ষণ তার ভিতর এবং বাহির একরূপ থাকবে। এমন ব্যক্তির জন্যই অযিফা (বেতন) নেয়া বৈধ। মুসলমানদের কোন বাদশাহ কিংবা আমীর যদি কোন মানুষের সাথে অন্যায় আচরণ করে তবে তার নিকটতম কাযীর দায়িত্ব তাকে এমন অন্যায় থেকে ফিরিয়ে রাখা।
খলীফা মনসুর ইমাম সাহেবের এ বক্তব্যের কথা শুনে বিচলিত হলেন। তিনি ঈসা বিন মূসার নিকট নির্দেশ পাঠিয়ে ইমাম সাহেবকে বাগদাদে তলব করলেন।
ইমাম সাহেবকে বাগদাদে খলীফার দরবারে পৌছানো হল। সেখানে তাঁকে প্রধান বিচারপতির পদের প্রস্তাব দেয়া হয়। তিনি বললেন আমার মধ্যে এর যোগ্যতা নেই।
খলীফা বললেন, বরং তুমি এর যোগ্য।
ইমাম সাহেব যখন আবার বললেন, আমি এর যোগ্য নই। তখন খলীফা রাগান্বিত হয়ে বললেন, তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি নিশ্চয়ই এর যোগ্য। ইমাম সাহেব নিশ্চুপ রইলেন না। তিনি বেপরোয়া ভাবে বললেন, আপনি স্বয়ং আপনার বিরুদ্ধে ফয়সালা করেছেন, আপনার দৃষ্টিতে যে ব্যক্তি মিথ্যাবাদী, তাকে কাযী বানানো আপনার জন্য বৈধ হবে কি?
ইমাম সাহেবের এ উত্তরের সামনে খলীফা পরাজিত হয়ে অপমানে আরও অধিক রাগান্বিত হয়ে কসম করলেন যে, ইমাম সাহেবের দ্বারা অবশ্যই এ কাজ করিয়ে ছাড়বেন।
ইমাম সাহেবও কসম করলেন, খোদার কসম কখনও আমি এ কাজ করব না।
এতে খলীফা রাগে দিশেহারা হয়ে ইমাম সাহেবকে প্রহার করার নির্দেশ দিলেন। তাঁকে-তিরিশটি কোড়া মারা হল। এরপর তাঁকে যখন বাইরে আনা হল তখন তাঁর পরিধানে একটি পাজামা ব্যতীত অন্য কোন পোশাক ছিল না। তাঁর সমস্ত দেহ রক্তাক্ত ছিল। এ কঠোর শাস্তি সত্ত্বেও ইমাম সাহেব কোন পদ গ্রহণে রাজী হননি! পরে খলীফা আবু জাফর তাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দিয়ে এ নির্দেশ দিলেন যে, তার সাথে যেন কঠোর আচরণ করা হয়।
ইমাম সাহেবের বয়স তখন প্রায় সত্তর বছর। এ বৃদ্ধদেহে তিরিশটি কোড়া মারা হয়েছে। আবার জেলখানার কষ্টসহ অন্যান্য কষ্টের কারণে তাঁর দেহ ভেঙ্গে পড়েছিল। তাঁর জীবনীশক্তি ফুরিয়ে গিয়েছিল। তিনি মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পেলেন। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দিলেন। সেজদার অবস্থায় স্রষ্টার নিকট প্রাণ সমর্পন করলেন।
অবশ্য কোন কোন বর্ণনামতে তাঁকে বিষপান করানো হয়েছিল।
লিখা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য:


Discussion about this post