শিশু জন্মের পরে মায়ের বুকের দুধ পানের আগে যে জিনিষটি আগে চাটতে হয়, তারা নাম হল মধু। মানুষের ধারণা মধু মুখে দিয়ে দুনিয়ায় হাসি দিলে, সারাজীবন সেই শিশুর আচরণ মধুময় হয়ে থাকবে। তাই বলে দুনিয়ার তিক্ত স্বভাবের মানুষ গুলোর মুখে জন্মকালে তিতা করল্লার রস লাগানো হয়েছিল এমন ধারণা করার সুযোগ নেই। যাই হোক পিতা-মাতা সন্তানের কল্যাণ চায় বলে শিশুকে মধু দিয়ে বরণ করে। তবে মানুষ যদি মৌমাছির মত চরিত্র অর্জন করতে পারত, তাহলে বিশ্ব জাহানে মানুষের মধ্যে গরীব, রোগী, অভাবী বলে কেউ থাকত না। তার উত্তর এই প্রবন্ধে রয়েছে। মৌ প্রেমের বিরল অভিজ্ঞতা
কম-বেশী মৌমাছি সবাই দেখেছে। তবে একথা হলফ করে বলা যায় যে, মৌমাছির সম্পর্কিত জ্ঞান সবার কাছে সমানে নেই। সৃষ্টিকুলের মধ্যে মৌমাছি একমাত্র পতঙ্গ যার বানানো খাদ্য মানুষ খাবার জন্য পাগল পারা হয়। গরীব, দিনমজুর, ধনী থেকে মহারাজা পর্যন্ত সবাই মৌমাছির বানানো খাদ্যের প্রতি আস্থাশীল। তাই মৌমাছিই একমাত্র পতঙ্গ যার কোন শত্রু নেই, যাকে কেউ ঘৃণা করেনা। মৌ প্রেমের বিরল অভিজ্ঞতা
আরো পড়তে পারেন…
- আল্লাহর সৃষ্টির বিরল নিপুণতা
- শামখোলের ঠোঁট অভিনব যন্ত্র
- পাখির রাজা ঠগবাজ ফিঙ্গে
ফুলের সবচেয়ে বেশী পরাগায়ন হয়, মৌমাছির মাধ্যমে। যার ফলে কৃষক ও কৃষির উৎকৃষ্ট বন্ধু হল মৌমাছি। সোনালী দেহ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মৌমাছির রয়েছে আক্রমনাত্মক আচরণ ও একটি ধারালো বিষাক্ত সুঁই। একবার গুতো খেলে দ্বিতীয়বার সমিহ করতে হয় যে প্রাণীটিকে তার নাম মৌমাছি। এর বিষাক্ততার মাত্রা ও ব্যথাকে উপরিয়ে গিয়েছে, এর গুঞ্জণ, ছন্দ, সশৃঙ্খল জীবন প্রলাণীর মত গুন ও প্রাণের গতিকে সঞ্জীবতা দানকারী মধুর কারণে।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ধারালো সূইয়ের জ্বালার মধ্যে বিষের চেয়ে উপকারী উপাদানই বেশী রয়েছে। শরীরের কোন জায়গার স্নায়ুতন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়লে, সেখানটায় অবশ হয়ে পড়ে। অনেকে এটাকে প্যারালাইসিস মনে করে ভুল করে। প্রাচীন কাল থেকেই চিকিৎসকেরা শরীরের অবস হয়ে পড়া এসব স্থানে দুই দিন পর পর মৌমাছির একটি ‘হুল’ ফুটিয়ে চিকিৎসা করতেন। এর জ্বালা-শিহরণের প্রভাব মস্তিস্কের কেন্দ্রে আঘাত করত। মৌমাছির এই হুল থেরাপির ফলে মস্তিস্ক সেখানে দ্রুত রক্ত সঞ্চালন শুরু করত এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অবসতা ভাল হয়ে যেত। হুশ-বুদ্ধি কম সম্পন্ন পাঠক দয়া করে বোলতা, ভিমরূল দিয়ে এই পরীক্ষা করতে যাবেন না। তাহলে কপালে নির্ঘাত খারাবী আছে। সাহস থাকলে বেশীর বেশী মৌমাছির হুল নিজে গায়ে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা যায়। আশা করা যায় মরবেন না কেননা আমার ডান হাতে পঞ্চাশটির মত মৌমাছি হুল ফুটিয়ে দেবার পরও আমি বেঁচে আছি!
যাই হোক বলছিলাম মৌমাছির কথায়। বর্ষাকাল কিংবা ফল-ফুলের অভাবের দিনে কি খেয়ে বাঁচবে? এই দুশ্চিন্তায় তাড়িত হয় বলেই শ্রমিক মৌমাছি অহর্নিশি পরিশ্রমের মাধ্যমে মধু সঞ্চয় করে! মধু যাতে পচে না যায়, চুরি না হয়, সে জন্য সতর্কতার সহিত, দুর্ভেদ্য প্রকোষ্ঠে গুদামজাত করে। বড় পরিতাপের বিষয় হল, একটি শ্রমিক মৌমাছির ৪২ দিনের ক্ষণিকের ছোট্ট জীবনে নিজেদের সঞ্চিত মধু পান করার সৌভাগ্য তাদের খুব কমই জোটে! ভাগ্য বিড়ম্বিত এসব পতঙ্গের মজুত করা মধু বিভিন্ন প্রাণী চুরি করে খায়। আর মানবজাতি লুণ্ঠিত মধু উপভোগ করে, চির যৌবনের লাভের আশায়!
মধু মক্ষিকা তথা মৌমাছির সাথে মিতালী করা আমার দীর্ঘ দিনের বিরল অভিজ্ঞতার অন্যতম একটি দিক। আমার সাথে মৌমাছি চলা ফেরা করত, বসলে আমাকে ঘিরে ধরত, এমনকি হাটে বাজারে গেলেও তারা আমাকে ঠিকই খুঁজে বের করে নিত। বাজারের মুদির দোকানে খোলা-মেলা চিনির বস্তায় যখন মৌমাছি হামলে পড়ত, তখন মুদি দোকানদার আমার কাছে অভিযোগ করত, তোমার মৌমাছির জ্বালায় দোকানের মিষ্টি দ্রব্যের মুখ খোলা দায়, বাবা এসব নিয়ন্ত্রণ করো!
মিষ্টির দোকানদার তো রীতিমত ক্ষেপাই থাকত। বাজারের অলস দোকানদারের রসের গোল্লার হাড়িতে দৈনিক বিশ-পঞ্চাশ টা মৌমাছির লাশ তো নির্ঘাত থাকতই! এতে শুচিবায়ু আক্রান্ত ক্রেতারা সেসব মিষ্টি কিনতে চাইতেন না। দোকানদার ত্যক্ত স্বরে বলতেন, তোমাকে শিখানোর জন্য তোমার বাবা বুঝি আর কোন বিষয় পায় নাই!
বলতাম! চাচা, আপনি যদি মিষ্টির আলমারিটা বন্ধ রাখেন, তাহলে তো মৌমাছির বাপের পক্ষেও মিষ্টির হাড়িতে পড়ার কথা না! মুরুব্বী কটর মটর করে বলতেন, আমার কাজ কিভাবে করব সেটা আমার ব্যাপার। তোমার মৌমাছি যেন আমার দোকানে না আসে। মৌ প্রেমের বিরল অভিজ্ঞতা
কটু কথা চোখ বুঝে সইতাম! এই জমানার শিশু হলে, নইলে অবশ্যই তাকে বলতে পারতাম! আধা মাইল দূরে অবস্থিত আমার বাড়ী থেকে আপনার দোকানে মৌমাছি হানা দিয়েছে! এই কথা আপনারে কে বলেছে? আমার মৌমাছি বলে কি ওদের গায়ে নাম লিখা আছে?
বস্তুত অলস এই মানুষটির উপর আমিও ত্যক্ত হয়ে থাকতাম! তিনি যখন আমাকে তার রসের গোল্লার ব্যবসার করুন দশা দেখাত; তখন তার মিষ্টির পাতিলের রসের মধ্যে প্রাণ হারানো অগণিত মৌমাছির লাশ ভাসতে দেখে আমার ধৈর্য ধরা কঠিন হত।
পবিত্র কোরআনে মৌমাছির জীবন ও তার সৃষ্ট উৎপাদনকে মানুষের জন্য উপকারী দৃষ্টান্ত বানিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ‘সুরা নহল’ তথা মৌমাছি নামে একটি চ্যাপ্টার রয়েছে। মৌমাছি সম্পর্কে কোরআনে এভাবে বলা হয়েছে,
“আর দেখো তোমার রব মৌমাছিদের কে অহীর মাধ্যমে একথা বলে দিয়েছেন যে, তোমরা পাহাড়-পর্বত, গাছপালা ও মাচার ওপর ছড়ানো লতাগুল্মে নিজেদের চাক নির্মাণ করো। তারপর সব রকমের ফলের রস চুষো এবং নিজের রবের তৈরি করা পথে চলতে থাকো। এই মাছির ভেতর থেকে একটি বিচিত্র রঙ্গের শরবত বের হয়, যার মধ্যে রয়েছে, মানুষের জন্য নিরাময়। অবশ্য এর মধ্যেও একটি নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।” সুরা নাহল-৬৮, ৬৯
মৌমাছির কৌতূহল উদ্দীপক জীবন নিয়ে পবিত্র কোরআনেই গুরুত্বপূর্ন ইঙ্গিত রয়েছে। আরো বলা হয়েছে, সেখানে রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত, যারা নিজেদের বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে চায়। সে জন্য মৌমাছিকে বুঝতে হলে, তার আগে জানতে হবে মৌমাছির জীবন ধারা। মৌমাছির জীবন নিয়ে অনেক বই বাজারে আছে, এগুলো তাত্ত্বিক বই। আজকের এই প্রবন্ধে থাকবে বহু সাময়িকী থেকে সংগৃহিত উপাত্ত ও আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। সে জন্য অবশ্যই এই লিখাটি তাত্ত্বিক লিখার মত হবেনা একটু ভিন্ন আঙ্গিকের হবে আশা করা যায় উৎসাহীরা আকর্ষণ পাবেন এবং উপকৃত হবেন।
পরবর্তী পর্বে সমাপ্য


Discussion about this post