অন্তর্দৃষ্টি কথাটি পুরোপুরি অন্তঃকরণের সাথেই সম্পৃক্ত। আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে অন্তর্দৃষ্টি জ্ঞান তাই, যার দ্বারা অন্যের অন্তরের সংঘটিত আভ্যন্তরীণ দৃশ্য অবলোকন করতে পারে। এক্ষেত্রে অন্তঃকরণ কথাটি ইতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ গোয়েন্দা বৃত্তিয় চরিত্র নয় বরং কারো চেহারা দেখে তার মনের ভিতরে লুকায়িত দুঃখগুলো উৎঘাটন করতে পারার জ্ঞান। আবার নিজের দোষ-ত্রুটি, দুর্বলতা গুলোকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ ও আত্মগঠন করার নামও অন্তর্দৃষ্টি। তাই কদাচিৎ একজন জন্মান্ধ ব্যক্তিও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন হতে পারে। তিনি ভূমিকা রাখতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজে। অন্তর্দৃষ্টি Insight অর্জনের প্রয়োজনীয়তা
দুনিয়াতে কোটি মানুষের বাস, সবাই অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন নয়। অন্তর্দৃষ্টির গুণ জন্ম হয় অন্তরের উৎসস্থল থেকেই। এসব মানুষকে কল্পনা শক্তিতে প্রবল ও দর্শনে উপলব্ধি-বোধ সম্পন্ন হতে হয়। একজন অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি; আত্ম-পীড়িত, যাতনায় কাতর মানুষের করুণ অনুভূতি উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে, নিজেকে তার স্থানেই রেখেই বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করে। অর্থাৎ মানুষের দুর্ভোগ, মর্ম-যাতনা, দুর্ভিক্ষ আর অভাবকে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে তিনি ভাবেন, যদি আমার এই করুণ পরিস্থিতি আমার হত, তাহলে আমি কি করতাম! অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আমি কিভাবে করুণ অনুভূতি সৃষ্টি করতাম! মূলত যার জীবন-দর্শন এভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত ও নিজ অনুভূতির উপর প্রভাব বিস্তার করাতে পারে, তিনিই মূলত অন্তর্দৃষ্টি অর্জনের পথে সফল হন।
অন্তর্দৃষ্টির প্রভাব ও মর্যাদা কত ব্যাপক হতে পারে, সেটা আমরা রাসুলুল্লাহ (সা) এর জীবনে দেখতে পাই। জন্মান্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাখতুমকে তিনি মক্কা থেকে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন কুরআনের শিক্ষা দেবার জন্য। রাসুলুল্লাহ (সা) সবাইকে নিয়ে ওহুদের প্রান্তরে জিহাদে গেলে পর, মদিনার মসজিদে নবুবীর দায়িত্বে তাঁকে রেখে যান। মক্কায় যাকে অবজ্ঞা করা হত, মদিনায় তাঁকে অনন্য সম্মানে ভূষিত করা হল। বেলাল (রা) পাশাপাশি তিনিও মসজিদে নবুবীর মুয়াজ্জিন ছিলেন। দুই চোখে কোনদিন দুনিয়া দেখেন নাই! সেই তিনি ওমর (রা) জমানায় পারস্যের বিরুদ্ধে পতাকা হাতেই যুদ্ধের ময়দানে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাসুল (সা) স্বীয় অন্তদৃষ্টির মাধ্যমে একজন জন্মান্ধ ব্যক্তির জীবনেও বহুবিধ যোগ্যতা দেখেছিলেন এবং সে সব যোগ্যতাকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। অন্তদৃষ্টি এমনই এক গুণ, যার প্রভাবে অন্ধ, পঙ্গু ব্যক্তি পর্যন্ত যোগ্য হয়ে উঠে। সোনার মানুষে পরিণত হয়। অন্তর্দৃষ্টি Insight অর্জনের প্রয়োজনীয়তা
বেশী বলতে পারাটা জ্ঞানীর আচরণ নয় বরং বেশী জানতে পারাটাই জ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য। ফল পাকলে যেমন গাছের ডাল ভারী হয়ে নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তেমনি মানুষের অন্তর্দৃষ্টি বাড়লে, তারাও ভারী হয়ে উঠে তথা আচরণে সংযত হয়। অপ্রয়োজনে কথা বলে না, যা বলে চিন্তা করে মেপে-ঝুঁকে বলে। কথা দিয়ে কাউকে আঘাত দেয় না। টিপ্পনী মারা, ক্ষিপ্ত করে তোলা, পশ্চাতে নিন্দা জ্ঞাপন করা অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের চরিত্র নয়। তারা যেহেতু অন্যের অন্তরের ব্যথা-বেদনার কারণগুলো বুঝে থাকেন, তাই তাদের চরিত্রে এমন আচরণ থাকেনা, যা দ্বারা অন্যের ক্ষতি হয়। সমাজের সবাই যদি তাদের অপছন্দ করে অন্তর্দৃষ্টির মানুষের হাত-মুখ দ্বারা তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেনা।
আমাদের সমাজে আমরা দেখতে পাই, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক, টিউশনির যুবক, শেলাই-কাজের তরুণীদের বাহ্যিক-ভাবে যাচ্ঞা না করা, দুর্ভোগ পেশ না করা, সৌম্য-ভদ্র মানুষের চেহারার অভাব-হীন মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু তাদের অন্তরে কত জ্বালা, কত দুঃখ, অভাব আর বঞ্চনায় পিষ্ট তা বাহ্যিক-ভাবে কেউ দেখতে পায় না। তবে তাদের এমন কঠিন অন্তরজ্বালার দহন অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের চোখ এড়ায় না। এ সকল মানুষের চেহারা দেখলেই তারা তাদের অন্তরের অবস্থা অনুমান করে ফেলেন। পবিত্র কোরআনেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সে ব্যাপারে বলা হয়েছে,
“তাদের আত্ম-মর্যাদাবোধ দেখে অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদেরকে ধনী মনে করে, (অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা) তাদের মুখ দেখেই তাদেরকে চিনতে পারবে”! বাকারা-২৭৩
কোরআনের আয়াত দ্বারাই বুঝা যায়, অন্তর্দৃষ্টি একটি আল্লাহ প্রদত্ত গুন। যা মানুষকে অন্য বৈশিষ্ট্যে আলোকিত করে। পবিত্র কোরআন হাদিসে তার বহু উদ্ধৃতি রয়েছে। অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের প্রশংসা করে পবিত্র কোরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে যে,
“নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন লোকদের জন্য”! হিজর-৭৫।
অন্তর্দৃষ্টি গুন সকল মানুষের এক সমান থাকেনা তবে যারা নিজের বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান ও মানবতা-বোধ জাগ্রত করে, মানুষ হিসেবে নিজেদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন হয় তারা আস্তে আস্তে এইগুণ অর্জন করতে থাকে। এই গুন মানুষের কথায়, বলায়, চলায়, জীবনযাত্রায় বিরাট পরিবর্তন সাধন করে। অধিকন্তু মানুষ হিসেবে নিজের মনে আত্মতৃপ্তি জাগ্রত হয়।


Discussion about this post