হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ) দেওবন্দি (কওমি) ও বেরলভী (সুন্নি) দের পীর-মুরুব্বী! কিন্তু উভয় পক্ষ তাঁর পরামর্শে একমত হতে না পেরে দেওবন্ধি ও বেরেলভী নামে দুটো আকিদার সৃষ্টি হয়ে পড়ে। কৌতূহলী বিষয়টি বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবার জানা উচিত…
হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ) ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক সাধক, আলেমে দ্বীন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর। তিনি ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ বিরোধী সিপাহী বিপ্লবে সরাসরি আলেমদের নেতৃত্ব দেন। কিন্তু বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়! হাজার হাজার আলেমদের হত্যা করা হয়। ব্রিটিশ সরকার তাকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় ধরতে সারাদেশে হুলিয়া জারি করে। তিনি একজন শ্রমিক হিসেবে দীর্ঘদিন ভারতের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকেন। পরে পানির জাহাজে করে গোপনে মক্কায় হিজরত করতে সক্ষম হন। সে থেকে তাকে ‘মুহাজিরে মক্কী’ হিসেবে উপাধি দেওয়া হয়। বাকি জীবন তিনি মক্কাতেই কাটিয়ে দেন এবং ১৮৯৯ সালে সেখানেই মারা যান। মক্কার প্রসিদ্ধ মুয়াল্লা কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
মাওলানা কাশেম নানুতুবি ও মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী ছিলেন মুহাজিরে মক্কী (রহঃ) এর অন্যতম খলিফা। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে তারা তাঁকে আমিরুল মুমিনীন উপাধিতে ভূষিত করেন। তারাও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে থানা ভবনের লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ভবিষ্যতে ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষিত মুসলিম আলেম ও যুদ্ধের সৈনিক তৈরির লক্ষ্যে দেওবন্দে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করেন। তারই আলোকে দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। যে মাদ্রাসার আলেমদেরকে বর্তমান ভারতে দেওবন্ধি আকিদার আলেম বা কওমি আকিদার আলেম বলা হয়। যদিও দেওবন্দ মাদ্রাসা যে লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে লক্ষ্য থেকে ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ) ও মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্ধি উভয়েই মুহাজিরে মক্কী (রহ) খলিফা ছিলেন। উপরোক্ত এই চার জনই দেওবন্ধি আকিদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য আলিম হিসেব স্বীকৃত। তাদের প্রভাব এখনও কার্যকর। এদের চিন্তা বিশ্বাসের উপরই দেওবন্ধি আকিদার ভিত্তি গড়ে উঠে।
ইমাম আহমেদ রেজা খান (রহ) সিপাহী বিপ্লবের এক বছর আগে ১৮৫৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের বেরেলি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে ফকীহ, মুহাদ্দিস, দার্শনিক ও সাহিত্যিক। তিনি ছিলেন শত শত গ্রন্থের রচয়িতা। তাকে বলা হয়, রাসুল (সা) এর প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসার প্রদর্শনের অন্যতম প্রতীক। সিপাহী বিপ্লব ব্যর্থ হলে যে পরিমাণ আলেম নিহত হয়েছিল, সেটা তিনি তদানীন্তন সমাজে দেখতে পান। শক্তিশালী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করার মত সক্ষমতা মুসলিম মিল্লাত হারিয়ে ফেলে। সেই সমাজে রাসুলের (সাঃ) এর প্রতি ভালবাসার মাধম্যে ইসলামকে তাজা করা ও মুসলিম মিল্লাতকে ঐক্যবদ্ধ করার নতুন এক বানী নিয়ে হাজির হন; ইমাম আহমেদ রেজা খান বেরেলভী। তিনি আশেকে রাসুল (সা) হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ‘মুস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম’ নামে বিখ্যাত নাত সহ আরো বহু নাতের তিনিই লেখক। এক শ্রেণীর ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে, এসব নাতের মাধ্যমে তিনি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেন। যার অনুসারীদেরকেই বর্তমানে সুন্নি আকিদার ধারক বাহক হিসেবে চিত্রিত করা হয়। চট্টগ্রামে “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত” বলে যে মতাবলম্বীরা আছে তাদের মূল আকিদার সৃষ্টি এখান থেকেই হয়েছিল। বেরেলি শহর থেকে উদ্ভব বলে তাদেরকে ‘বেরেলভী’ আর রেজা খানের সৃষ্টি বলে তাদেরকে ‘রেজভী’ হিসেবেও চিত্রিত করা হয়।
মুহাজিরে মক্কী (রহ) এর সাথে ইমাম রেজা খানের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল মক্কায়। ইমাম আহমদ রেজা খান, মুহাজিরে মক্কী (রহ) আন্তরিকতা, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিকতায় মুগ্ধ হন। ফল হয়েছিল এমন, আহমদ রেজা খানের ফতোয়ায়, মুহাজিরে মক্কীর ছায়া ও প্রভাব পরিলক্ষিত হতো। তিনি বহু রেফারেন্স, উৎস ও গবেষণার উপাত্ত মুহাজিরে মক্কী (রহ) থেকে নিয়েছেন। মুহাজিরে মক্কী (রহ) একজন বিপ্লবী যোদ্ধা, সমাজ চিন্তক, সমাজ সংস্কারক ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সদা সকল ইসলাম প্রিয় মানুষদের, আল্লাহ-রাসুলের ভালবাসার মাধ্যমে এক ছাতার নিচে কিভাবে একত্রিত করা যায় সেটা নিয়ে ভাবতেন আর কাজ করতেন। ইমাম রেজা খান, মুহাজিরে মক্কী (রহ) এসব গুণাবলীর প্রতি দুর্বল ছিলেন।
মুহাজিরে মক্কী (রহ) সরাসরি প্রভাব থাকার পরও, উভয়কুল এক হতে না পারা কারণে, উপমহাদেশে দুটো আকিদার সৃষ্টি হয়। একটি দেওবন্ধি আকিদা, অন্যটি বেরেলভী বা রেজভী বা সুন্নি আকিদা। মুহাজিরে মক্কী (রহ) মক্কায় বেঁচে থাকতেই ভারতে উক্ত দুটি আকিদায় মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ে। তিনি মক্কায় বসে বহু চেষ্টা করেছিলেন সবাইকে একত্রিত করতে। কিন্তু তার উপরে হুলিয়া, যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল, চিঠির মাধ্যমে তথ্য চালাচালি ভালবাসে কাজ দেয়নি। তবুও তিনি উভয় মতামতের মধ্যে আকিদার প্রশ্নে দ্বিধা-বিভক্তি দূর করতে সাত দফার মাসয়ালা দিয়ে একটি সমাধান দিয়েছিলেন। যা আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক।
১. মিলাদ শরীফ (রাসূলের জন্ম আলোচনা) বিতর্ক:
– বেরেলভীগণ এটাকে সওয়াবের কাজ বলতেন,
– দেওবন্দিরা এটাকে বিদআত বলতেন।
.
মুহাজিরে মক্কী সাহেবের ফয়সালা: রাসূল (সা.)-এর জন্মের আলোচনা করা অত্যন্ত বরকতময় কাজ। তবে এতে কোনো মনগড়া গল্প বা শরীয়ত বিরোধী প্রথা যোগ করা যাবে না। তিনি নিজে প্রতি বছর মিলাদ মাহফিল করতেন এবং একে সওয়াবের কাজ মনে করতেন।
২. কিয়াম (মিলাদে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো) বিতর্ক:
দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়া কি বাধ্যতামূলক নাকি নাজায়েজ?
.
মুহাজিরে মক্কী সাহেবের ফয়সালা: কিয়াম বা দাঁড়ানোটা কোনো ‘ফরজ’ ইবাদত নয়। যদি কেউ রাসূল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার আতিশয্যে দাঁড়িয়ে যায়, তবে তাকে নিষেধ করা উচিত নয়। আবার কেউ যদি না দাঁড়ায়, তাকে ‘বেয়াদব’ বলাও ঠিক নয়। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয়।
৩. ফাতেহা ও ইসালে সওয়াব (মৃতের জন্য দোয়া) বিতর্ক:
– নির্দিষ্ট দিনে (যেমন চল্লিশা) খাবার খাওয়ানো যাবে কি না?
.
মুহাজিরে মক্কী সাহেবের ফয়সালা: মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তির জন্য দান-খয়রাত বা খাবার খাওয়ানো জায়েজ। তবে দিন তারিখ নির্দিষ্ট করাকে (যেমন ৩ দিন বা ৪০ দিন) জরুরি বা দ্বীনের অংশ মনে করা যাবে না। এটা স্রেফ একটা প্রথা হিসেবে পালন করা যেতে পারে।
৪. ওরস (বুজুর্গদের মৃত্যুবার্ষিকী) বিতর্ক:
– মাজারে মেলা বা ওরস করা কি জায়েজ?
.
মুহাজিরে মক্কী সাহেবের ফয়সালা: আল্লাহর ওলিদের কবরের পাশে গিয়ে কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করা ভালো। কিন্তু সেখানে নাচ-গান, সিজদা করা বা মেলা বসানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তিনি সঠিক পন্থায় ওরস পালনকে সমর্থন করতেন।
৫. আজানে ‘সায়্যিদিনা’ বলা ও আঙুলে চুমা বিতর্ক:
– আজানে নবীর নাম শুনে আঙুলে চুমু খেয়ে চোখে লাগানো।
.
মুহাজিরে মক্কী সাহেবের ফয়সালা: এটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তাই একে সুন্নাত মনে করা যাবে না। তবে কেউ যদি স্রেফ মহব্বতে করে, তবে তাকে কাফির-ফাসিক বলাও ঠিক নয়।
৬. ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলে ডাকা বিতর্ক:
– দূর থেকে নবীকে সম্বোধন করা কি শিরক?
.
মুহাজিরে মক্কী সাহেবের ফয়সালা: যদি কেউ বিশ্বাস করে যে নবী (সা.) আল্লাহর মতো সব শোনেন (আল্লাহর গুণের সাথে তুলনা), তবে তা শিরক। কিন্তু যদি কেউ স্রেফ ইশকে পড়ে বা কবরের পাশে গিয়ে সালাম দেয়, তবে তা জায়েজ।
৭. ইমদাদুল্লাহর আধ্যাত্মিক নসিহত
– বইটির শেষে তিনি একটি আবেদনময় কথা বলেছিলেন:
.
“ভাইসব! মিলাদ বা কিয়াম নিয়ে ঝগড়া করে নিজেদের ঈমান নষ্ট করো না। যারা করছে তাদের করতে দাও, আর যারা করছে না তাদের ওপর জোর করো না।”
ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ) আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন উভয় শ্রেণীর একটি ‘মধ্যপন্থা’ সৃষ্টি করে উম্মাহকে সংগঠিত রাখতে। সেটা তো হলই না। বরং সাত দফার বইটি পাবার পরে তাদের মধ্যে মতভেদ না কমে বরং আরো বেড়ে যায়। যা আর নিয়ন্ত্রণে থাকেনি। তার কারণ,
– দেওবন্দিগণ বললেন, মুহাজিরে মক্কী সাহেব তো শিরক-বিদআত থেকেই বাঁচতে বলেছেন, তাই আমরা এগুলো কঠিন ভাবে বর্জন করব।
– বেরেলভীগণ বললেন, পীর সাহেব তো মিলাদ-কিয়ামকে জায়েজ বলেছেন। ওনি তো হারাম বলেন নাই, তাই আমরা এগুলো চালিয়ে যাব।
– ফাইনালি বিষয়টি “পীরের উদারতা বনাম মুরিদদের কঠোরতার মধ্য দিয়ে” শেষ হয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে দুটোর আকিদার ভিত্তি লাভ করে।
– লক্ষণীয় বিষয় হল, দেওবন্ধি ও বেরেলভী তারা উভয় পক্ষের কেউ হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ) এর পরামর্শ মত কাজ করতে পারে নি! কিংবা তার উদ্দেশ্যকে মূল্য দিতে পারে নি। ফলে তারা বহু দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল।
– তিনি ছিলেন একজন জাত যোদ্ধা, প্রজ্ঞাবান ও আধ্যাত্মিক পুরুষ। ফলে তিনি ভালই বুঝতেন, ধর্মীয় চিন্তার মধ্যে খুঁত ধরার চেয়ে, তাদের মধ্যে অনৈক্য-বিভেদের চেয়ে, কিছু সহনীয় বেদয়াতকে মেনে নিয়ে হলেও, একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করা অনেক অনেক বড় কাজ। এতে অন্তত উভয়কুল এক কথায় থাকত কিন্তু হয়নি।
লক্ষণীয় বিষয়, পরবর্তীতে মুহাজিরে মক্কী (রহ) এর কিছু নীতি দর্শন জামায়াতে ইসলামীর নীতি আদর্শে কার্যকর হতে দেখা যায়। জামায়াত উভয় ধারার কঠোর অবস্থানের বিপরীতে একটি মধ্য পন্থা গ্রহণের পক্ষে কাজ করে। জামায়াতের বৈশিষ্ট্য কোন কাজের নির্দেশ কোরআন-হাদিসে বর্ণিত থাকলে, সেটা তারা মানবেই! আবার এমন কর্মকাণ্ড যা কোরআন হাদিসে নাই, কিন্তু ইসলামের সাথে সাংঘার্ষিকও নয়, অথচ ধর্মের নামে সমাজে চালু আছে। সেটা বেদায়াত হওয়া স্বত্বেও জামায়াত পন্থিরা এটাকে উপেক্ষা চলে এবং গায়ে পড়ে বিবাদ-বিরোধ সৃষ্টি কিংবা বিরোধিতাও করে না।
তারা সেটাকে ওয়াজ-নসীহত, প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম, মুক্ত আলোচনা, জুময়ার খোতবা, আলোচনা চক্র কিংবা কিতাব পড়িয়ে মানুষের মন-মগজ থেকে ধীরে ধীরে দূর করার চেষ্টা করে। মানুষ নিজের উপলব্ধি বোধ দিয়েই সিদ্ধান্ত নেয় যে, ধর্মের নামে যে বেদায়াতি কাজ তারা এতদিন করে আসছিল, সেটার কোন গুরুত্ব ও অস্তিত্ব ইসলামে নেই। বেরেলভী দর্শনের সাথে বিরোধ কিংবা বেদায়াত মোকাবেলায় জামায়াতে ইসলামী কখনও কঠোরতা দেখায় না কিংবা কঠোরতম পন্থা গ্রহণ করে না। আবার দেওবন্ধিদের সাথেও বিতর্ক-বিবাদে জড়ায় না। জামায়াতে ইসলামী দেওবন্ধিদেরকে আরো কাছের হিসেবে পায়। কেননা তাদেরকে সাথে পেতে অত কষ্ট করতে হয়না। দেওবন্ধিদের পড়ার অভ্যাস আছে। সেই অভ্যাসের সুযোগে, জামায়াতের বই, সাহিত্য একবার পড়াতে পারলেই হয়। অন্তত জামায়াতের সহযোগী না হলেও, বিরোধিতার তীব্রতা কমিয়ে দেয়।


Discussion about this post