আল্লামা মওদূদী : দুই ধারী তলোয়ার দ্বারা পিষ্ট দার্শনিক! ১৯৪১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর আল্লামা মওদূদী আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রাচী হলে আয়োজিত একটি বক্তব্য থেকে ঘটনার সূত্রপাত। দেওবন্ধিরা বলেন তিনি একজাতি তত্ত্বের বিরোধীতা করেছেন! আবার পাকিস্তান পন্থিরা বলেন তিনি দুই জাতি তত্ত্বের বিরোধিতা করেছেন! কি অভিনব দোষ! এক ব্যক্তির দুই কিসসা! তাহলে তিনি প্রকৃতই কি করেছিলেন, সেটাই ইতিহাসের বড় কৌতুক হয়ে রইল।
মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রঃ) ১৯৩৮ সালে “মুত্তাহিদা কৌমিয়াত আওর ইসলাম” তথা “একীভূত জাতীয়তাবাদ ও ইসলাম” নামে একটি গ্রন্থ লিখেন। যার সারমর্ম হল, ভারতে হিন্দু-মুসলমান এক জাতি হিসেবে নিজেদের সাতন্ত্রতা ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে টিকে থাকতে পারবে। এতে মুসলমানদের স্বার্থের ক্ষতি হবে না।
আল্লামা মওদূদী (রঃ) উপরোক্ত ধারণার বিরোধিতা করে ১৯৩৮ সালে “ইসলাম আওর কৌমিয়াত” তথা “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” নামে আরেকটি গ্রন্থ লিখেন। তিনি তুলে ধরেন ইসলামের বিপরীত হল পৌত্তলীকতা। মুসলমান ও হিন্দু দুটো বিপরীতধর্মী জাতি এবং হিন্দুরা সংখ্যায় বেশী। এমন পরিবেশে একজাতি তত্ত্বের ধারনা শুধু বাতিল যোগ্যই নয়, মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্যেও হুমকি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই, মুলত দেওবন্ধী আকিদার আলেমগন আল্লামা মওদূদীর উপর ক্ষিপ্ত হন এবং তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, কোথায় পড়েছেন, কোন ওস্তাদের কাছে পড়েছেন, আদৌ পড়েছেন কিনা, পড়লেও কেমন গোমরাহ ওস্তাদের সাগরেদ ছিলেন এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকে। তিনি স্রেফ একজন লেখক, সম্পাদক, রাজনীতিবিধ, বিশ্লেষক বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ও অপবাদ দিতে থাকে। সেই যে শুরু হল, তার ডাল, পালা, শাখা, প্রশাখা বিস্তার করে আজ অবধি চলমান।
অন্যদিকে ব্রিটিশের মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ট অঞ্চলে, মুসলমানদের নিয়ে পাকিস্তান নামক একটি মুসলিম রাষ্ট্র (ইসলামীক রাষ্ট্র নয়) প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়। মুসলানদের অধিকার, স্বকিয়তা রক্ষায় মুসলিম রাষ্ট্রের প্রস্তাব তো সুন্দর। কিন্তু এমন একটি রাষ্ট্রে আদৌ প্রকৃত মুসলমানদের ধর্মীয় স্বার্থ হবে কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। আল্লামা মওদূদী আশঙ্কা ব্যক্ত করেন যে, পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র হলেও, সেই রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ বা অ-ইসলামী কাঠামোতে পরিচালিত হবে, যেখানে মুসলিম শাসকগণই বরং মুসলিমদের উপর নিপীড়ন চালাবে। [তার এই উক্তি অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছে]
সেটা বাস্তবায়িত হবে কিভাবে এবং এসব নেতা দ্বারা সেটা আদৌ বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা সেটা নিয়ে মাওলানা মওদূদী কথা বলেন,
তার ধারণা ছিল, মুসলিম লীগের নেতাদের (বিশেষত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তাঁর সহকর্মীগন) ‘নামেমাত্র মুসলিম’ এবং পশ্চিমা আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি যুক্তি দেন যে, এই নেতারা কেবল একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চান, কিন্তু সেখানে আল্লাহর আইন বা শরীয়াহ প্রতিষ্ঠা করতে চান না। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এই রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ বা অ-ইসলামী কাঠামোতে পরিচালিত হবে, যেখানে মুসলিম শাসকগণই বরং মুসলিমদের উপর নিপীড়ন চালাবে। [তার এই ধারণা মিথ্যা হল কোথায়]
১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর, ১৯৪১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তারিখে মাওলানা মওদূদী আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রাচী হলে (Strachey Hall) এই বক্তৃতাটি দেন। সেটার আয়োজক ছিলেন, ‘আনজুমানে ইসলামী তারীখ ও তামাদ্দুন’ বক্তৃতাটির মূল উর্দু শিরোনাম ছিল “ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হুতি হ্যায়?” (ইসলামী রাষ্ট্র কিরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়?) সেদিনের সেই বক্তব্যের উপর কেন্দ্র করে মাওলানা মওদূদীর একটি বই প্রকাশ হয়, তার নাম “ইসলামী বিপ্লবের পথ” পুরো বক্তব্যের সারমর্ম হল,
পাকিস্তান একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হচ্ছে, ইসলামী রাষ্ট্র নয়:
মুসলিম লীগ যে রাষ্ট্র চায়, তা হবে কেবল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র, যেখানে শাসন ক্ষমতা থাকবে মুসলিমদের হাতে। কিন্তু এই রাষ্ট্র ‘ইসলামী হুকুমাত’ বা আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করবে না।
শাসকের নৈতিকতা ও চরিত্র:
তিনি প্রশ্ন তোলেন, মুসলিম লীগের নেতারা অধিকাংশই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ইসলামি জীবনধারা থেকে দূরে। তাদের দ্বারা গঠিত রাষ্ট্রটি কেবল ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার হবে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার নয়।
নিপীড়নের আশঙ্কা:
মওদূদীর আশঙ্কা ছিল, ইসলামের আদর্শ বাদ দিয়ে কেবল মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে মুসলিম শাসকরাই স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী হয়ে উঠবে এবং ইসলামের নামে মুসলিম জনগণকে নিপীড়ন করবে। তিনি বলেছিলেন, “তোমাদের পাকিস্তান যদি জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেটা হবে ‘না পাকিস্তান, না ইসলামী রাষ্ট্র” [তার ধারণা তো সত্যই হল]
মাওলানা মওদূদীর এই বক্তব্যের বিপরীতে পাল্টা যুক্তি দেওয়ার কারো জো ছিল না। ফলে পাকিস্তান আন্দোলন পন্থি নেতারা ক্ষিপ্ত হয়ে বলতে থাকেন, মওদুদী দ্বী-জাতিতত্ত্ব তথা পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। না তিনি পাকিস্তানের বিরোধীতা করেন নাই এতে করে এটা ষ্টাবলিশ হয়
মাওলানা মওদূদী দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধীতা করেন নাই, পাকিস্তানেরও বিরোধীতা করেন নাই। সেই শক্তিও ছিল না। ১৯৪১ সালের ২৬শে আগষ্ট জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্টিত হয়। সে হিসেবে ১৯৪৭ সালে জামায়াতে ইসলামীর বয়স মাত্র ৬ বছর। আল্লামা মওদূদী মুসলিম লীগ কর্তৃক প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী মডেলের বিরোধীতা করেছেন। বর্তমান কালেও যেমন আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয়পার্ট মুসলমানের বিরোধিতা করে না কিন্তু ইসলাম প্রতিষ্টার বিরোধীতা করেন। তাছাড়া এসব দল তো মুসলীমলিগেরই নাতি-পুতি।


Discussion about this post