জন্মের সময় শিশুরা সুস্থ দেহের অধিকারী হয়, তাহলে তার দেহে কৃমি ঢুকে কিভাবে এবং কিভাবেই বা রোগের শুরু হয়! ছোটকালে এই প্রশ্নটি আমার মাথায় ঘুরত কিন্তু কারো কাছে সদুত্তর পেতাম না। বিজ্ঞ মনে করে কাউকে প্রশ্ন করলে, উত্তর আসত, ছেলেটির মাথা খারাপ নাকি? কৃমি মানব দেহে এমনিতে ঢুকে পড়ে। বড় হয়ে বুঝেছি বিজ্ঞ হওয়া আর অভিজ্ঞ হওয়ার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। হয়ত, আমার মত অনেকেরই এই প্রশ্ন মনের অলিন্দে ঘুরতে পারে। প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে দেখে নেই মূল ঘটনা কি?
কৃমি কি শুধু পেটে হয়?
না কৃমি শুধু পেটে হয়না, দেহের নরম মাংসপেশি যেখানে আছে, সেখানেই হতে পারে। যেমন নাড়ী-ভূরি, ফুসফুস, কলিজা, চোখ, মগজ ও মাংসপেশিতে হতে পারে। পেটের কৃমি সহজে বের করা গেলেও মগজ, ফুসফুস, কলিজা এবং চোখের কৃমি সহজে ধরা পড়েনা এবং রুগীকে দীর্ঘ-বছর নানা ধরনের রোগে ভুগতে হয়। ডাক্তার কোন মতেই এসব রোগের কারণ নির্ণয় করতে পারে না। কেননা কৃমি, X-Ray, MIR, CT-Scan কোথাও ধরা পড়েনা। ওগুলোকে মাংসের অংশ বলেই মনে হয়।
কৃমি কিভাবে বংশ বিস্তার করে?
মানুষের পেটে বসবাস করেই একটি গোলাকার স্ত্রী কৃমি এক দিনে ২ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। এসব ডিম মানুষ কিংবা প্রাণীদের মলের সাথে বের হয়ে মাটি, গাছ, নালা, ক্ষেত, খামারে ছড়িয়ে পড়ে। কখনও হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল, ইঁদুর, ছুঁচো কিংবা মশা, মাছি, তেলাপোকার পায়ে ভর করে মানুষের ঘর বাড়ীতে চলে আসে। এসব ডিম ও লার্ভা আঠালো আকারে দীর্ঘদিন জীবিত থাকে। ফলে একবার প্রাণীদেহে লটকে পড়লে সহজে ছুটানো যায় না।
কৃমি মানুষের দেহে আসে কিভাবে?
মলের মধ্যেই কৃমির ডিম থাকে। ব্যক্তি মলত্যাগ করে যদি ভাল করে হাত ধৌত না করে এবং তিনি যদি কাঁচা ফলমূল ধরে, তরকারী-সবজি কাটাকুটি করে, তাহলে তার মাধ্যমে নিজ শিশুদের দেহে সংক্রমিত হয়। মানুষ যখন খালি পায়ে নোংরা মিশ্রিত মাটিতে হাটে। তখনই কৃমির লার্ভা হাতে পায়ে লেগে যায়। এগুলো চামড়া ফুটো করে রক্তের সাথে মিশে পেটে পৌঁছে যায়। আবার পরিষ্কার না করে ফল-মুখ খেলে, যখন-তখন আঙ্গুল মুখে দিলে তো সরাসরি কৃমি পেটে চলে যাবার সুযোগ ঘটে।
রান্না করা খাদ্যেও কি কৃমি থাকতে পারে?
সেটা খাদ্যের তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে। আধা সিদ্ধ, কম সিদ্ধ মাংসে কৃমির ডিম-লার্ভা মরে না। ৬০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সাধারণত লার্ভা মরে যায়। তবে নিরাপদ খাদ্যের জন্যে ৭১ ডিগ্রি তাপমাত্রা পর্যন্ত পৌঁছানো উচিত। নচেৎ মাংসে লুকানো ফিতা কৃমির লার্ভা মরবে না। ফিতা কৃমির জীবন যাত্রা একটু ভিন্ন প্রকৃতির। এগুলো একবার দেহে ঢুকলে, আর বের করা সম্ভব হয়না। এগুলো যতবার কাটা পড়ে ততগুলো কৃমির সৃষ্টি হয়। একটি ফিতা কৃমি ফুসফুস, কলিজা, তিল্লী ভেদ করে সারা দেহ প্যাঁচাতে পারে। একটি ফিতা কৃমি ১৩ থেতে ৪০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
তাহলে কৃমি থেকে বাচার উপায়?
তাহলে কৃমি থেকে বাঁচার উপায় কি?
কৃমি থেকে বাচার একমাত্র উপায় হল পবিত্রতা, পরিষ্কার, পরি-ছন্নতা। হাদিস শরীফে আছে,
الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ (আত-ত্বহূরু শাতরুল ঈমান) তথা “পবিত্রতা হলো ঈমানের অর্ধেক”
ইসলাম ধর্মে ওজু করা ফরজ। সার্বক্ষণিক ওজুতে থাকা উত্তম কর্ম হিসেব বিবেচিত। এতে করে হাত, মুখ, নখ, পা, মাথা সহ দিনে কমপক্ষে পাঁচ বার ধুতে হয়। ফলে রোগ জীবাণু নষ্ট হয়। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সালাতের পাঁচটি সময় গুলো কিন্তু খাদ্য গ্রহণের পূর্বেই অনুষ্ঠিত হয়। ফলে প্রকৃত মুসলিম এমনিতেই এসব বাজে রোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারে।
আর স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্যে তো, দুনিয়ার সকল দেশেই মানুষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সতর্ক করা হয়। এজন্য প্রচুর অর্থ খরচ করা হয়। সুতরাং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ইসলামে যেমন ইমানের অঙ্গ বেঁচে থাকার জন্যেও এটা মানব জীবনের জন্যে জরুরী।
ঔষধ খাওয়ার পরে কি কৃমি ধ্বংস হয়?
বহু জাতের কৃমি আছে এক ঔষধে সকল কৃমি মরে না। ঔষধ খেলে পেটে অবস্থিত কৃমি নষ্ট হতে পারে, তাও শতভাগ নয়। মূলকথা কিন্তু সেটা নয়, পেটের কৃমি একবার মরে গেলেও ব্যক্তি যদি অপবিত্রতার নীতি গ্রহণ করে, তাহলে নতুন করে কৃমি বিস্তারের সুযোগ তো রয়ে যাবে। যেটা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভোগাবে। সে কারণে ইসলামে পবিত্রতার বিধানটি সর্বক্ষণ এবং সারা জীবনের জন্যে ফরজ করা হয়েছে। সুতরাং এমন বিশ্রী সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে, আজীবন পরিষ্কার পরিছন্ন থাকার কোন বিকল্প নাই।


Discussion about this post