জাতীয়তাবাদ (Nationalism) হলো একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ বা আদর্শ। যেখানে একটি জাতি নিজেদেরকে অন্য জাতি থেকে স্বতন্ত্র এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপায় মনে করে। পৃথিবীতে যত জাতীয়তাবাদ গঠিত হয়েছে, তাদের সবার মূল ভিত্তি ও বৈশিষ্ট্য এক ও অভিন্ন। পরিবেশ ও ভূখণ্ডের কারণে জাতীয়তাবাদের ধারনার মধ্যে ভিন্নতা আছে।
জাতীয়তাবাদ একটি জাতির মধ্যে একতা, গৌরব ও দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে এবং এর মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। সে জন্যে একটি জাতীকে ঐক্যবদ্ধ করতে যে সব সাধারণ বৈশিষ্ট্যে দরকার, সেগুলো হল ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস, এবং ভৌগলিক অবস্থান।
জাতীয়তাবাদ সর্ম্পকে জানতে হলে, তার মূল উপাদান নিয়ে জানা আবশ্যক তাই নিচে কিছু আলোকপাত করা হল,
১. ভৌগলিক ঐক্যে জাতীয়তাবাদ
ভৌগলিক ঐক্যর মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছে পৃথিবীর বহু দেশে। একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমানার মধ্যে বসবাস করা জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যেমন সুইস জাতীয়তাবাদ। সুইজারল্যান্ড দেশটি আল্পস পর্বতমালা দ্বারা পরিবেষ্টিত। এবং সে দেশের জনগণ জার্মান, ফরাসি, ইতালীয় ও রোমান ভাষায় কথা বলে। আবার তারা ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান। বহু বৈপরীত্ব্যের মানুষ আছে ও জাতি আছে সেখানে। ফলে আল্পস পর্বতমালার বেষ্টনীকে তারা ঐক্যের জন্যে বাছাই করেছে।
২. বংশগত ঐক্যে জাতীয়তাবাদ
জার্মান জাতীয়তাবাদ, ইহুদী জাতীয়তাবাদ এগুলোই বংশীয় ধারায় পরিচালিত জাতীয়তাবাদ। এগুলোকে জাতিগত জাতীয়তাবাদ বা এথনিক জাতীয়তাবাদও বলা হয়। আমাদের বাংলাদেশ মিশ্র রক্তের মাধ্যমে সৃষ্ট জাতি। পৃথিবীর বহু জাতির শাসনের কারণে আমাদের রক্তে সুনির্দিষ্ট কারো বংশের অস্তিত্ব নেই। সে কারণে বংশগত জাতীয়তাবাদের দানা আমাদের দেশে হবেনা, হয়নি।
৩. ভাষা ও সাহিত্যে জাতীয়তাবাদ
ভাষা ও সাহিত্য জাতীয়তাবাদের উপলক্ষ হয়েছে পৃথিবীর বহু দেশে। ১৯শ শতাব্দীর শেষ দিকের আইরিশ জাতীয়তাবাদ তাদের মধ্যে অন্যতম। জার্মান, গ্রীক, রোমান, আইরিশ, এসব জাতীগুলো ভাষার ক্ষেত্রে কোন আপস করেনা। ভাষা দিয়েই তারা তাদের জাতীকে আবদ্ধ করতে চায়। কিন্তু হায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মত একটি উপলক্ষ পেয়েও আমরা ভাষা মাধ্যমে হলেও ঐক্য থাকতে পারিনি। পশ্চিম বঙ্গের ভাষা আমাদের উপর প্রভাব সৃষ্টি করিয়ে, আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল্য ভিত্তিটাকেই হালকা করে দিয়েছি। উল্টো আমাদের মন্ত্রীরা ভা’রতে গিয়ে বহু কষ্টে, লালা ফেলিয়ে হিন্দিতে সাক্ষাৎকার দেয়।
৪. ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে জাতীয়তাবাদ
ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে জাতী গঠন করার ইতিহাস আমরা ইতালীয় জাতীয়তাবাদে পাই। ১৮৬০-এর দশকের আগে এটি বহু ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। রাজ-নৈতিকভাবে কোনো ঐক্য না থাকলেও, ইতালীয়দের মধ্যে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাস এবং রেনেসাঁর সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বর্তমান ছিল। সেটাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান ইতালির যাত্রা শুরু। আমাদের পাশের দেশ ভারতীয়রা সেই একই চিন্তার সূত্র ধরেই, ভারতের প্রাচীন ঘটনাগুলোকে প্রচার করে ঐতিহ্য দিয়েই গান্ধী ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি করে। সেটা আরো প্রসারিত হয়ে বর্তমানে হিন্দুত্ববাদ তথা হিন্দু জাতীয়তাবাদে রূপ দিয়েছে। মুসলিম নিধন, অন্য জাতি নিপীড়নের মূল মন্ত্র এখান থেকেই উদগত। সে হিসেবে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বলতে কিছু নেই। তবে আমরা যদি শামশুদ্দিন ইলিয়াস শাহের পদ্ধতি গ্রহণ করে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বানাতে পারতাম, তাহলে কাজে আসত। কিন্তু আমাদের ইতিহাস থেকে সেই প্রেরণাই মুছে দেওয়া হয়েছে।
৫. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্যে জাতীয়তাবাদ
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ হলো আধুনিক জমানার নতুন ধারণা। একটি জাতিসত্তা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে একত্রিত হয়। যারা জাতিগত বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের চেয়েও, দেশীয় ভূখণ্ডের সীমানা, সাধারণ আইন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দেয়। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দুই জার্মান একত্রিত হয়েছে এই মতবাদের ভিত্তিতে।
৬. ভূখণ্ড-গত ঐক্যে জাতীয়তাবাদ – (বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ)
এটিও প্রায় ভৌগলিক ঐক্যের মত তবে আরেকটু ছোট্ট পরিসরের জাতীয়তাবাদ। জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বা বিএনপি এটার উদাহরণ হতে পারে। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ হলে বিষয়টি আরো বড় হত কিন্তু জিয়াউর রহমান আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারনা সামনে আনেন। যার লক্ষ্য হল, বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের মধ্যে যারা বাস করে, তারা সবাই “বাংলাদেশী” জাতিসত্তার অংশ। তাদের ভাষা, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী চাকমা, মারমা, গারো যাই হোক না কেন। আমরা সবাই বাংলাদেশী। কিন্তু জাতীয়তাবাদের এই ধারণা বাংলাদেশী মানুষের মনন মানসে স্থায়ীভাবে আসন গাড়তে পারে নি। পাহাড়িরা এক হয়নি, উল্টো দেশটাকে পূর্ব-পশ্চিম থেকে ভাগ করে আলাদা দেশ গড়ার চেষ্টা আমরা দেখতে পাই। তাছাড়া এই দলের নেতাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও বুঝা যায় না যে, ভিন দেশের সম্ভাব্য চক্রান্ত থেকে কিভাবে দেশটাকে রক্ষা করবে। জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা তো বহু দূরের কথা।
বাঙ্গালী জাতি কোন ঘটনা-দুর্ঘটনায় বহুবার একত্রিত হয়েছে কিন্তু এটাকে ধরে রাখতে পারেনি এই কারণেই যে, দেশের সকল মানুষকে এক-সেতুতে ধরে রাখার জন্যে জাতীয়তাবাদের সেই বয়ান আমাদের দেশে অনুপস্থিত। বাইরের নানা শক্তিগুলো জাতীয় ঐক্যটাকে ভয় পায়, তাই এটাকে নষ্ট করতে নানা উপায়ে চেষ্টা করে।
“২০২৪ এর বিপ্লব বেহাত হয়েছে এই কারণে যে, জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠার জন্যে আমাদের নিজের মত করে, নিজেদের কোন এজেন্ডা নাই”
জাতীয়তাবাদের ধরন বুঝার জন্যে উপরে ৫টি বৈশিষ্ট্যের কথা আলোচিত হয়েছে, আরো আছে। তবুও আমাদের এমন উপাদান নাই যাকে কেন্দ্র করে আমরা দাড়িয়ে যেতে পারে। শুধু একটিই উপলক্ষ আছে. সেটা হল ১৯৪৭ সালে যে লক্ষ্যে ভারত ভাগ হল, সে টাকেই যদি আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল পয়েন্ট ধরি। তাহলে বাঙ্গালী জাতীর মধ্যে প্রবল ঐক্য সৃষ্টি করা সম্ভব এবং দেশটাকে সবাই মিলে নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব।


Discussion about this post