দেশে বর্তমানে প্রচলিত ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (First-Past-the-Post – FPTP) বা ‘উইনার টেকস অল’ (Winner Takes All) পদ্ধতিতে বিএনপি নির্বাচন করে এসেছে। কম ভোটে সরকার গঠন করে, অধিক ভোটের জনগণকে শাসন করার নির্বাচনী এই পদ্ধতিতে তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা সবই আছে। অধিকন্তু এমন নির্বাচনে পেশী শক্তির ব্যবহার কিংবা টাকার খেলার সুযোগও থাকে। প্রার্থীরাও ব্যাপক অর্থ উড়ায়, যা দলের পক্ষে প্রচার হয়।
আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এত বছর এই পদ্ধতিতেই সরকার গঠন করে এসেছে। কিন্তু সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পিআর (Proportional Representation – PR) পদ্ধতি উপরের পদ্ধতির ভিন্নরূপ এবং বিএনপি অতীতে যেভাবে সহজে ক্ষমতায় এসেছিল, পিআর পদ্ধতিতে সেটা অনেকটা কঠিন হয়ে যাবে। এ কারণেই তাদের আপত্তি। চলুন দেখে নেই পিআর পদ্ধতির নির্বাচন হলে, বিএনপির কি সমস্যা-সম্ভাবনা হতে পারে।
১. একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবেনা।
বর্তমান পদ্ধতিতে ৪০% শতাংশ ভোট পেলেও বিএনপির সিট সংখ্যা ১৬০ থেকে ২০০ এর মধ্যে চলে যাবে। এবং কোন অন্য কোন দলকে তোয়াজ কিংবা পাত্তা না দিয়েও সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোড়ে এককভাবে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারবে। আর পিআর পদ্ধতিতে হলে, বিএনপি হয়ত ১২০ থেকে ১৩০ টি সিট পাবে। সরকার গঠন করার জন্যে ১৫১ সিটের ভোটের দরকার হয়, সেটার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেত বিএনপিকে নিকটবর্তী অন্য কোন দলের সাথে জোট করে সংসদে যেতে হবে। এমন সমস্যা বিএনপি উপেক্ষা করতে চাইবে।
২. ক্ষুদ্র দলের প্রভাব বৃদ্ধি পায়:
পিআর পদ্ধতিতে ছোট দলগুলোও ভাল করে, তাদেরও সিট থাকে। তখন বিএনপি সরকার গঠন করতে চাইলে, হয় জামায়াত, নয় শাসনতন্ত্র আন্দোলন, নয় আওয়ামীলীগ কিংবা জাতীয় পার্টির সাথে মন্ত্রিত্ব ভাগাভাগি করে সরকার গঠন করতে হবে। বিএনপির সাথে বামপন্থীদের সাথে সহজে জোট হবে, কিন্তু ঐ দলগুলো এক নেতা, এক পার্টির মত। ফলে দুটি আসনের ভোটের জন্যে বিএনপিকে ১টি করে মন্ত্রিত্ব দিতে হবে। বড় দল হয়ে, ছোট দলের কাছে অসহায় দ্বারস্থ হতে হবে। এমন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে বিএনপি আগ্রহী হবেনা।
৩. ক্ষমতা ভাগাভাগির বাধ্যবাধকতা:
যদি জোট সরকার হয়, তাহলে জোটের অন্য শরীকদের অনুপাত অনুযায়ী বিএনপিকে মোটা-দাগে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হবে। মন্ত্রণালয় ভাগ হবে, সংসদীয় আসনগুলো ভাগ হবে, জোটের একটি নীতিমালা তৈরি হবে। সবাইকে সেই নীতিমালা ধরে এগুতে হবে। ইচ্ছায় হউক অনিচ্ছায় হউক জোটের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতেই হবে। শুধুমাত্র সরকার গঠনের খাতিরে বড়-দল হিসেবে বিএনপিকে ছোট দলের নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হবে। এটা তাদের অতীত রাজনৈতিক শিষ্টাচারের খাপ খায়না। সুতরাং তারা অনাগ্রহী হবে।
৪. ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ:
বিএনপিকে জোট সরকার চালানোর পাশাপাশি, জোটের মধ্যে সমন্বয় ও নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্যে সদা সচেষ্ট থাকতে হবে। কেননা মূল সরকার তাদের। সদা স্বচ্ছতার গ্যারান্টি দিতে হবে এবং নিজেরা দুর্নীতি করছে না সেটা জানান দিতে হবে। কোন এক নেতা কিংবা মন্ত্রী দুর্নীতি করে বসল। সেটা নিয়ে জোটের এক অংশ নীরব থাকলে, অন্য অংশ সরব নীতি গ্রহণ করবে। ফলে জোটের মধ্যে বিভিন্ন মতাদর্শ ও স্বার্থ-গত কারণ প্রকট হবে, সরকারে অস্থিরতা দেখা দিবে। বিএনপি রাজী না হবার জন্যে এটাও একটা কারণ হবে।
৫. ভোট কমে যাওয়ার প্রবণতা:
বড়-দল হিসেবে বেশী সংখ্যক মন্ত্রী নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় থাকবে। ফলে সরকার কিংবা জোটের কোন শরীকের দুর্বলতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ঘটলে আগে বিএনপিকে এর উত্তর দিতে হবে। তাকেই প্রশ্ন বানে জর্জরিত করা হবে। বিষয়টি জন-সমাজে চাউর হতে থাকবে। ছোট ছোট বিরোধী দলগুলো সংসদে এবং সংসদের বাইরে এগুলো নিয়ে চিল্লায়ে থাকবে। এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় ও জাতীয় ইলেকশনে। জোটের সঙ্গী হয়েও এসব দলে ভোটের মাঠে জঙ্গি হয়ে উঠবে। এমন ঝামেলা বিএনপি নিতে চাইবে না।
৬. স্থানীয় নেতৃত্বের গুরুত্ব হ্রাস:
বর্তমান পদ্ধতিতে প্রতিটি আসনে একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য স্থানীয় জনগণের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকেন। তার অধীনে আরো অনেক নেতা-কর্মী কাজ করে। ভাল কিংবা মন্দ তারা সরাসরি এলাকার মানুষের সাথে মিশে থাকে। হাট-বাজার ডাক, গরুর বাজার, হাট নিলাম, নদীর ঘাট, বালু মহাল, পাহাড়ের মাটি কাটা, বনের কুব ডাক, কন্ট্রাক্টরি ইত্যাদি উৎস থেকে টাকা আসে। স্থানীয় দল এগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারালে, নেতা-কর্মীরা কাজ করতে উৎসাহ পাবে না। মূলত এসব উৎসের লোভেই স্থানীয় পর্যায়ে নেতা-কর্মীর সৃষ্টি হয়। এটা বন্ধ হলে, নেতা-কর্মীর অভাব হেতু দলীয় কাজে স্থবিরতা নেমে আসবে। অশুভ ফলাফল ঘটবে নির্বাচনে। ইস্যু ভিত্তিক দলগুলোর জন্যে পিআর পদ্ধতিতে এই জায়গায় মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করে। ফলে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে, বিএনপি পিআর পদ্ধতি মানতে চাইবে না।
৭. রাজনৈতিক মেরুকরণ কমানোয় ভূমিকা রাখতে হবে
পিআর পদ্ধতির নির্বাচনে যে দলের রাজনৈতিক মেরুকরণ কম, তার সাথেই অন্য দলের সখ্যতা বেশী হবে। তার পক্ষেই সর্বদা সরকার গঠন করা সহজতর হবে। যে দল অন্য দলকে সুবিধা দিবে, গুরুত্ব দিবে, সুযোগ দিবে, তাদের কথার মূল্যায়ন করবে, সংসদীয় আসন সমূহে জায়গা করে দিবে। যোগ্য নেতা বিরোধী পক্ষের হওয়া সত্ত্বেও তাকে জোটের চুক্তির বাইরে গিয়েও মূল্য দিবে। সেই দলই বেশিবার সরকার গঠন করার সুযোগ পাবে। বিএনপি একটি বড় দল, প্রচুর নেতা। তাদেরকেই জায়গা দেওয়া যায়না। সেখানে অন্য দলকে এত সুযোগ দেওয়ার চর্চা, মানসিকতা আমাদের দেশের রাজনীতিতে গড়ে উঠেনি। বিরাট ধাক্কা খেয়ে উঠা বিএনপি হঠাৎ করে এমন উদার রাজনীতি করলে, নিজেরাই হারিয়ে যায় কিনা, সেই ভয়েও বিএনপি পিআর পদ্ধতির দিকে আগ্রহী হবে না।
মূলত, পিআর প্রথা শুধু নির্বাচন পদ্ধতির ভিন্নতা নয়, দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ব্যক্তি চরিত্র পরিবর্তনের উপরেও দমকা হাওয়া বয়ে যাবে। যারা মানতে পারবে না, তারা সহজে ঝড়ে পড়বে। এই কারণে বিএনপি’ই শুধু পিআর পদ্ধতির বিরোধীতা করবে এমন নয়। এখন যদি বিএনপির জায়গায় আওয়ামীলীগ কিংবা জাতীয় পার্টিও এসে যায়, তারাও এটা না করার জন্যে বেঁকে বসবে। তবে কয়েকটা টার্ম যদি পিআর পদ্ধতির নির্বাচন দেশে হয়। তাহলে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে চরিত্রের বিরাট পরিবর্তন আসবে। নতুন ধরনের নিয়ম মোকাবেলা করতে গিয়ে, নেতারাও নিজেদের চরিত্র, ধ্যান-ধারণা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। অন্যকে মূল্যায়ন করা ও ছোট দলগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার তাকিদ বোধ করবে। সর্বোপরি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রটি যেভাবে একটি সরকারকে ভোট ডাকাতি করিয়ে জিতিয়ে, নিজ দেশের মানুষদের উৎপীড়ন করিয়েছে, তেমন সুবিধাদি বন্ধ হয়ে যাবে।


Discussion about this post