অকমর্ণ্য ব্যক্তি উচ্চ শিক্ষিত হলেও অপমান তার পিছু ছাড়ে না। একটি ঘটনা বলি। দেখতে স্মার্ট ও উচ্চশিক্ষিত হলেও কাজে একেবারেই আনকোরা। ফলে পরজীবী উদ্ভিদের মত একই বাসার সহপাঠীদের কাঁধে চড়ে কোনমতে দিন কাটাচ্ছিলেন তিনি।
বিরাট ভবনের উপরে নীচের তলায় প্রতি কক্ষেই পাঁচ-ছয় জন করে ব্যাচেলর থাকে। অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষের আবাস এটি। সাধারণ ব্যবহারের সুবিধার্থে সবার দরজার সামনেই স্পঞ্জের হালকা-পাতলা স্যান্ডেল দেখা যাবে।
ছুটির দিনে বন্ধুরা বলল, তুমি তো একটা অকর্মা, অকমর্ণ্য, নিজের প্রয়োজনীয়ও কাজও বাবা-মা শেখায় নি। আজ ছুটির দিতে অন্তত চুলায় রক্ষিত দুধের গরম ডেকচিটি নিয়ে আস।
একথা শুনে মহানায়কের মত তড়াৎ করে লাফ দিয়ে উঠে ফিরোজ। ছাই ঝাড়া মুরগীর মত, হাত পা চারিদিকে ছুড়ে আলসেমি ভাবটাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে, হন হন করে রান্না ঘরের দিকে ছুটে।
বাইরে কারো হাত থেকে ধাতব কিছু পতনের শব্দ ভেসে আসে। অমনি মাগো, মামাগো, ভাইগো, আমারে বাচাও! আমিতো পুড়ে গেলাম রে বলে চিৎকার শোনা গেল! সাহায্যের আশায় যেন তেন আবেদন নয়, যেন কেউ কারো গলায় ছুড়ি চালিয়েছে! কর্তিত মাথাটি যেন, একটুর জন্য রগের আগায় লটকে আছে।
ফিরোজেরই কান্নার শব্দ! কেঁদে কেটে কারো সুদৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা অকর্মা মানুষের চিরাচরিত অভ্যাস। কিন্তু এ চিৎকার সে ধরনের নয়, এটা শুনলে পুরো ভবনের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে সাহায্য করার জন্য ধেয়ে আসবে। নিশ্চয়ই বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দরজার বাহিরেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত! ঘটিয়েছে ফিরোজ নিজেই। জীবনে কোনদিন প্রয়োজনীয় কাজ করেনি কিংবা পরিবারে এ ধরনের কাজ করার সুযোগ পায়নি, তাই কাজের ধাঁচ বুঝে নি। দুধের গরম ডেকচি হাতে লটকানো অবস্থাতেই, হাতের কুনুই ব্যবহার করে দরজার হাতলে চাপ দিয়ে দরজা খুলতে চেষ্টা করেছিল। দরজা তো খুলেই নি উপরন্তু উত্তপ্ত দুধের ডেকচি মুহূর্তে হাত ফসকে নিচে পড়ে যায়।
ধপাস করে পড়ার মাধ্যমে প্রায় অর্ধেক দুধ নিচে পড়ে, তার কিছুটা ছিটকে ফিরোজের গায়ের পোশাকে পড়ে। যে মাত্রার চিল্লানো বের হয়েছিল, ঘটনার মাত্রা অত মারাত্মক ছিলনা। জীবনে প্রথম শরীর পোড়ার অনুভূতি ও উদ্ভূত কাণ্ডে হতভম্ব হয়ে, সে এমন জোড়ে চিৎকার শুরু করে, যার ফলে সবার কান অবধি তার মরণ চিৎকার পৌঁছে যায়। ঘটনাটি এখানে শেষ হলে তো ভাল হত কিন্তু তা হয়নি বরং আরো লম্বা ঘটনার জন্ম দিয়েছিল।
ফিরোজ দরজা থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে কাপড় ধরে লাফাচ্ছিল, যেন তার গায়ে আগুন লেগেছে! এমতাবস্থায় তার করুণ আর্তনাদ শুনে পাশের কক্ষ থেকে একজন ধড়-ফড় করে ছুটে এসেছিল।
গরম দুধ ছড়িয়ে ছিল স্যান্ডেলের তলে, তিনি ফিরোজের কাছে ছুটতে গিয়ে, সেই পিচ্ছিল স্যান্ডেলের উপরে পা দিয়ে বসে। দৌড়ের উপর থাকায় তিনি এমন জোড়ে আছড়ে পড়ে পড়েন, নৌকার মত ছেঁচড়ায়ে কয়েক ফুট দূরে গিয়ে তার শরীর থামে। ফলে তার কোমরে পিটে মারাত্মক ব্যথা পান।
দরজার সামনে মহা-রণ হট্টগোলের কারণ উৎঘাটনে প্রথম যে বন্ধুটি ঘর থেকে বের হন, তার উপরে আসে আরো বড় বিপদ। মুহূর্তে দরজা খুলে বাহিরে পা রাখতেই পা খানি আগে থেকেই পড়ে থাকা গরম দুধের ডেকচির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়! সমস্যা হয়ত অত মাত্রার হত না, যদি ডেকচির আকৃতি পায়ের চেয়ে কিছুটা বড় হত।
পুরো গরম দুধের ডেকচিটাই পায়ের সাথে আঁট-সাট হয়ে লেগে যায়! গরম ডেকচি পা থেকে খুলতে গিয়ে বাকি দুধ তার পায়ের সাথে একাকার হয়ে যায়। ডেকচি খুলতে গিয়ে ঝলসানো চামড়াও ছিঁড়ে যায়। ফলে উদ্ধারকারী দু’জন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ভোগান্তিতে পড়ে। চাকুরীর বারোটা বাজে।
স্মার্ট ফিরোজ, অকমর্ণ্য হিসেবে সবার হাসি ঠাট্টার পাত্র হয়ে যায়। এই ঘটনায় তার তেমন ক্ষতিই হয়নি কিন্তু অন্যদের পরিবারের জীবন যাত্রায় বিরাট ছন্দপতন ঘটে। পরবর্তীতে ফিরোজকে রাস্তাঘাটে যেখানেই দেখা যেত মানুষেরা অকমর্ণ্য. আবাল, আলাল কিংবা দুলাল বলে মশকরা করত।
এক পর্যায়ে সে প্রতিবাদ করা শুরু করত! মানুষেরা উল্লসিত হয়ে, উত্তেজনার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিত। এভাবে অতিষ্ঠ হয়েই সে তার ভাল চাকুরীর কর্মস্থল ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
উদাহরণের জন্য ঘটনাটি উপস্থাপন করা হল। বস্তুত প্রতিটি পিতা মাতার উচিত, সন্তানকে বিদ্যা শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষাও পাইয়ে দেওয়া। ছেলেদেরকে পিতার কাজের পাশাপাশি মেয়েদেরকে রান্না-বান্না সহ মায়ের কাজের সাহায্যকারী হিসেবে গড়ে তোলা জরুরী।
সবার জীবনে হয়ত উপরের মত ঘটনা হবেনা কিন্তু পথে চলতে ফিরতে কাজ না জানার কারণে ঠুনকো-মামুলী কাজেও হাসির পাত্র হতে পারে। যেটা একজন সম্মানী মানুষের জন্য খুবই অপমান জনক হতে বাধ্য।
মূলত, যে যত বড় জ্ঞানী ও দামী ব্যক্তি হউক না কেন, সকালে টয়লেটে গিয়ে, কারো সাহায্য ব্যতীত নিজের মল নিজের হাতে যেভাবে পরিষ্কার করতে হয়। সেভাবে নিজের জীবন রক্ষার্থে সবাইকে ব্যবহারিক শিক্ষাও অর্জন করতে হয়। ব্যবহারিক শিক্ষা হচ্ছে জীবনের প্রথম মৌল শিক্ষা, এটা না জানলে অন্যান্য সকল বিদ্যা পঙ্গুত্ব বরণ করে।
মানুষের যে উপনাম যোগ হয়ে থাকে তা, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অকমর্ণ্যতা, বেকুবি ও বে-আকলীর কারণে হয়। উচ্চশিক্ষিত মানুষও বে-আকল, বেকুব ও অকর্মণ্য হতে পারে। অধিকন্তু শিক্ষিত মানুষের মাঝে যদি বে-আকলির লক্ষণ দেখা যায়, তখন তাকে নতুন করে সম্মান সুখ্যাতি অর্জনের চেষ্টা বাদ দিয়ে, কিভাবে গোত্রীয় সম্মান রক্ষা করা যায়, সে চিন্তায় সদা বিচলিত থাকতে হয়।


Discussion about this post