অদৃশ্য করণ টুপির সন্ধানে : ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত! পর্ব-১৩ (ধারাবাহিক রোমাঞ্চকর কাহিনী – এক পিকুলিয়ার মানুষ)

টিপুভাই ডট কম ব্লগের ছবি, নজরুল ইসলা টিপু - tipuvai.com
অদৃশ্য করণ টুপির সন্ধানে : ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত! পর্ব-১৩ 
(ধারাবাহিক রোমাঞ্চকর কাহিনী – এক পিকুলিয়ার মানুষ)
নজরুল ইসলাম টিপু

টম এন্ড জেরি কার্টুন ছবিটি কম বেশী সবার প্রিয়। ১৯৫০ এর দশকে যখন উইলিয়াম হানা ও জোসেফ বারবারা টম এন্ড জেরির ‘দ্যা ভ্যানিসিং ডাক বা অদৃশ্য-কারী হাঁস’ নামের সাদা কালো কার্টুন ছবিটি বাজারে ছাড়ে, তখন তার মেলা কদর বেড়েছিল। পরবর্তীতে নতুন শতাব্দীর শুরুতে রঙ্গিন টম এন্ড জেরি ছবিতে ভ্যানিস বা অদৃশ্য জেরি এবং হাঁস মিলে টমকে কিভাবে হেস্তনেস্ত করে, তার একটি মজাদার সুন্দর চিত্র আঁকা হয়েছে। 

আমিও একদা যাদুর টুপির সাহায্যে অদৃশ্য হবার সুযোগ খুঁজতে গিয়ে এক ভয়ানক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে হাত লাগিয়েছিলাম! বুঝতে পেরেছিলাম যুগ এবং সময় বদলালেও মানুষের মনোবৃত্তির কোন পরিবর্তন হয়না। আমাদের ছোটকালে ইউনিয়ন পরিষদে একটি টিভি ছিল, তিন মাইল হেটে গিয়ে তা দেখে আসতে হত। তাই ছোটকালে টম এন্ড জেরির আবিষ্কৃত অদৃশ্য হবার ক্রিমের কথা শুনিনি। তবে মানবের ইচ্ছা যেমনি অদৃশ্য হবার চেষ্টা থাকে, দানবের ইচ্ছা তেমনি প্রকাশিত হবার চেষ্টা করে, আর এতেই যত সমস্যা ও জটিলতা। 

পাঠকেরা নিশ্চয়ই ‘ঐন্দ্রজালিক যাদু বা সুলেমানী তেলেসমাতি’ নামক বইয়ের কথা ভুলে যান নাই। ভাবীর জন্য তাবিজের বই জোগাড় করতে গিয়ে, সেই বইটি চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা থেকে কিনেছিলাম। আকর্ষণ সৃষ্টিকারী শিরোনামের, সেই বইটি দীর্ঘদিন বাজারে পাওয়া যেত। এই বইয়ে বর্ণিত অনেকগুলো যাদুর মাঝে, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য যাদুর নাম ছিল, অদৃশ্য হবার টুপি লাভ! যা কোন মানুষ মাথায় দিলে নিমিষেই অদৃশ্য হতে পারে। এই টুপি অর্জন করতে গিয়ে রীতিমত ভয়ঙ্কর ও রোমহর্ষক এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম। এখনও মনে পড়লে শিউরে উঠি, আসলে টিন এজ বয়সটাই এডভেন্সারে পূর্ণ থাকে, তার মধ্যে আমার ছিল অতি উৎসাহ, তাই ষোল কলা পূর্ণ হবার বাকী ছিল। সেই যাদুর বইয়ে প্রথম যে যাদুটির কথা বলা আছে, তা হল ভুত থেকে অদৃশ্য হবার টুপি অর্জন করার পদ্ধতি। এই টুপি ভুত গায়ে পড়ে যেচে কিংবা খুশী-চিত্তে দিয়ে দিবে না! ভুত কে কাবু করে, তার নিকট থেকে এটা ছিনিয়ে নিতে হবে। মানুষের পক্ষে সবই সম্ভব, এই বইয়ের ঘটনাটি আমাকে প্রায় ধরে বসেছিল, আমার আস্তা শতগুন বেড়ে গিয়েছিল যে, এই দূরহ কাজ আমি করতে পারব। যদি কোন একদিন সুযোগ পেয়ে যাই, ভূত থেকে সে টুপি ছিনিয়ে নিয়েই ছাড়ব। এই আকাঙ্ক্ষা আমার মত ব্যক্তির থাকতে পারে, তাই বলে এই ধরনের ভয়ানক ইচ্ছে যাদুকরদের থাকতে হবে কিনা জানা ছিলনা! যিনি বইটি লিখেছেন, নিশ্চয়ই তিনিও এই ধরনের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকবেন! নতুবা এত টাকা খরচ করে বই প্রকাশ করার কি লক্ষ্য থাকতে পারে! আমি যদি গ্রামের বাড়ীতে থাকতাম তাহলে বইটির ছবি ও ঘটনার উদ্ধৃতি বই থেকেই সরাসরি উল্লেখ করতে পারতাম। হতেও পারে সেই বইটি পড়েছে, এমন কোন পাঠক এই ব্লগে জুঠেও যেতে পারে! তারপরও ভুতের নিকট থেকে সেই টুপি কিভাবে অর্জন করতে হবে, তার বর্ণনা যদি সেই বই থেকে উল্লেখ করি, তাহলে পাঠকদের বুঝতে সুবিধা হবে এবং কাজটির ধরন কেমন হবে তা অনুধাবন করতে পারবেন। 

বইয়ের হুবহু ভাষা শতভাগ মনে নেই, তবে বইয়ের ঘটনার সারমর্ম করলে যা দাঁড়ায়, সেই ভাষায় জানুন, ভুত থেকে অদৃশ্য হবার টুপি অর্জনের নিয়মাবলী: 

খবর রাখতে হবে, অমাবস্যার কালে শনি কিংবা মঙ্গল বারে কোন হিন্দু মারা গিয়েছে কিনা! সেই হিন্দুকে যদি কোন নদীর ধারে শ্মশানে পোড়ানো হয়, সেই শ্মশান থেকেই অদৃশ্য টুপি অর্জনের মুল সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে হবে। অমাবস্যার ঘন কালো রাত্রির তৃতীয় প্রহর যখন শুরু হবে। (প্রতি আড়াই ঘণ্টায় এক প্রহর, আট প্রহরে এক রাত বা দিন) শরীরে কোন কাপড় এমন কি সুতার কোন নিদর্শন থাকতে পারবে না, উদোম নাঙ্গা শরীরে নদী সাঁতরিয়ে শ্মশানে পৌঁছতে হবে। অমাবস্যার গভীর কৃষ্ণকায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে, নির্ভয়ে চিতার সন্নিকটে পৌঁছতে হবে! কোন অবস্থাতেই ভয় পাওয়া চলবে না। আতঙ্কে চিল্লানো যাবেনা, ভয় দূর করতে গান গাওয়া যাবেনা। বুকে প্রচণ্ড সাহস ও হিম্মত রাখতে হবে কেননা ভুত মানুষের এই ধরনের ভয়ঙ্কর সাহস দেখেই হার মানে ও বশ্যতা স্বীকার করে। অন্ধকারে চিতার উদ্দেশ্যে চলার পথে আশ পাশ থেকে নানাবিধ আওয়াজ আসতে পারে! কোন অবস্থাতেই সেদিকে তাকানো যাবেনা। কেউ কান্না করে সাহায্য চাইলেও থামা যাবেনা, কেউ অপূর্ব হাসি দিয়ে আকর্ষণীয় সুরে আহবান করলেও শোনা নিষেধ। পিছন থেকে নানাবিধ ভীতিকর ডাক ও মরণ চিৎকার শোনা গেলেও পিছনে তাকানো নিষেধ, থেমে যাওয়া নিষেধ। কেননা সাহসী মানবকে, দানবেরা ভয় লাগিয়েই কাজ সারে, তারা কখনও শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। সামনের দিকে নানা বিধ অন্তরায় দাঁড়াতে পারে। প্রতিবন্ধক হিসেবে যত বড় বাধা, ভয়, মুসিবত আসুক না কেন নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বাধা দেখে থামা যাবেনা, বাধার নিকটে পৌছলে এমনিতেই তা পিছনে সড়ে যাবে। এসব বাধার মূল উদ্দেশ্য হবে, ভয় লাগানে! যদি ভয় একবার পেয়েই যায়, তাহলে মৃত্যু শতভাগ নিশ্চিত। আর যাদুর টুপি অর্জন তো সাধারণ জিনিষ নয় যে, ভীতু কোন কাপুরুষের গলে তা শোভা পাবে। সুতরাং অভিযানে যাবার আগে বহুবার ভেবেই এই পথে যেতে হবে। 

যখন চিতার কাছে পৌঁছানো যাবে তখন চিতায় দগ্ধ সেই মানুষটি ভুত হয়ে নানাবিধ কথা বলতে চাইবে। সে মনুষ্য আকৃতিতেই দেখা দিবে। তবে সে তো ভুত সুতরাং তার কোন কথা শুনা যাবেনা। চিতার পাশেই থাকবে একটি মাটির কলসি! কলসিটি ভাঙ্গা অবস্থায় হলে তার অর্ধেক মাটিতে পোঁতা থাকবে। কলসি ভাল থাকলে তাতে পানি থাকবে, তখন সেটি ভাঙ্গতে হবে এবং কলসির কাঁখ তথা গলাটি সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে হবে! ভুলেও যেন কলসির পানি গায়ে না লাগে। কলসির গায়ে হাত দিলে মৃত মানুষের ভুত বহু অনুনয় বিনয় করবে, যেন তা নিয়ে আসা হয়। তার কোন কথা শুনা যাবেনা। যেহেতু তার কথা মানা যাবেনা, তাই এক পর্যায়ে সে ক্ষিপ্ত আচরণ করবে! ভয় পাবার কোন কারণ নাই, সে ভয় দেখানো ব্যতীত অন্য কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যখন কলসির কাঁখ নিয়ে ফিরে যাবার চেষ্টা করবে, তখন সে পুরো শ্মশান কে লন্ড ভণ্ড করতে চাইবে। দানবীয় ভাবে তার পক্ষে সম্ভব সবকিছু করার চেষ্টা করবে। ভূমিতে, পানিতে, আকাশে সবদিক দিয়ে সে তোমাকে ভীত সন্ত্রস্ত করতে চাইবে। যেভাবে আসা হয়েছে সেভাবে ফিরে যেতে হবে। 

পরবর্তী অমাবস্যার কাছাকাছি শনি কিংবা মঙ্গলবার সন্ধ্যায়, নির্জন-নিভৃত তিন রাস্তার মোহনায় সেই কলসি কাঁখ নিয়ে হাজির হতে হবে। সূর্য ডুবে যাবার সময়ে কলসির কাঁখ দিয়ে সূর্যের অস্তগমন পথে খোলা ময়দান বা বিল পানে তাকাতে হবে। দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হবে, কোন অবস্থাতেই অন্যদিকে মনোনিবেশ করা যাবেনা। এভাবে পর্যবেক্ষণের এক পর্যায়ে টুপি মাথায় মানবাকৃতির অদ্ভুত কিছু দেখতে পাওয়া যাবে। তার কাছে যেতে হবে। সে দুরে থাকতে চাইবে কিন্তু সে বেশী দূরে যেতে পারবে না। তার পিছু নিলে এক পর্যায়ে সে পরাস্ত হবেই এবং নিজেই ধরা দিবে। সে স্ব-ইচ্ছায় নিজের অদৃশ্য হবার টুপিটি দিয়ে দিবে এবং নিজেকে অনুগত হিসেবে ঘোষণা করবে। সে কিছু শর্ত দিবে, এসব শর্ত মানলে সেই ভূত এই মানুষের সাহাযার্থে যখন চাইবে, তখনই হাজির হবে এবং একজন ভৃত্যের মত সাথে থাকবে। তার সাথে অদৃশ্য হবার টুপি-তো আছেই যখন ইচ্ছা তখনই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারবে। 

বন্ধুদের বলে রেখেছিলাম শনি-মঙ্গলবারে হিন্দু মরলে যাতে আমাকে খবর দেওয়া হয়। শনি-মঙ্গলবারে হিন্দু মরলেও অমাবস্যায় কারো মৃত্যু হলনা। মানুষের ঝামেলা এড়াতে বাবা আমাকে কিছু দিনের জন্য শহরে রাখলেন! একদা দিনের দ্বিপ্রহরে বাড়ী ফিরেছিলাম। দেখলাম স্কুল বন্ধ কিছু ছেলেরা মাঠে খেলছে। প্রশ্ন করলাম কি ব্যাপার! একজন বলল আজ সকালে আমার ক্লাস মেট সমরের মা মারা গিয়েছে। তাকে পোড়ানে হয়েছে হালদা নদীর তীরে অবস্থিত চিতায়! মৌসুমি বায়ু পরিবর্তন হয়ে, মানুষ পোড়া গন্ধে স্কুলে অবস্থান করা দায় হয়েছিল, তাই স্কুল ছুটি দিয়েছে। হালদা নদীর ওপাড়ে তাকিয়ে দেখলাম মানুষ পোড়া ধুয়োর কুন্ডুলী আকাশ ছুঁয়েছে! হরিবল বলে বাহ্মন চিৎকার করছে এবং কিছু ছেলেরা মাঠে খেলায় মত্ত থাকলেও, চামড়া পোড়া কটু গন্ধে সেখানে দাঁড়ানো দায় ঠেকাচ্ছে! জিজ্ঞাসা করলাম আজকে কি বার? জানতে পারলাম মঙ্গলবার! মাথায় নতুন সম্ভাবনা ঝিলিক মেরে উঠল! এক মুরুব্বীকে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম, আজই তো অমাবস্যা! অংক কোথাও থেকে শুরু হয়ে পুরোপুরি কোথায় যেন মিলে যাচ্ছে। শনি-মঙ্গল বারের মৃত্যু, অমবস্যার রাত, নদীর পাড়ের শ্মশান! পুরো শরীরে শিহরণ বেয়ে গেল, এ ধরনের একটি রাতের জন্য কত অপেক্ষা করতে হয়েছে। আজ এমনিতেই এসে ধরা দিবে কল্পনাও করিনি! নতুন এই ভয়ঙ্কর অভিযানে নামতে হলে অনেক প্রস্তুতির দরকার! হাতে অনেক কাজ বাকি কিন্তু সময় একেবারেই কম। দ্রুত বাড়ী চললাম, কেননা আজ রাত্রেই কাঙ্ক্ষিত সেই কলসের কাঁখ, যেভাবেই হোক ভুত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে। 

আগের পর্ব: এক জ্বিনের সাক্ষাৎকার! এক পিকুলিয়ার মানুষ, পর্ব-১২ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *