ইতিবাচক প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে অখ্যাত ব্যক্তি জগত আলোড়ন করেছে, এমন অগণিত উদাহরণে বিশ্ব ইতিহাস ঠাসা। হয়ত ভাবছেন, নিজের সন্তান অবহেলিত, কালো, বোকা কিংবা চঞ্চল! শ্রেণী কক্ষের সিরিয়ালে পিছনের দিক থেকে প্রথম! এই অকর্মা দিয়ে কি হবে? না ব্যাপারটা মোটেও সে ধরনের নয়। এই পৃথিবীতে যত মানব সন্তান আছে তারা কেউ কারো মত নয়। শত চেষ্টা করলেও একজন অন্য জনের মত হুবহু গুনাগুণ অর্জন করতে পারে না; এমনকি যমজ হলেও! দুনিয়ায় যত শিশু আছে তাদের প্রত্যেকের একটি জগত সেরা ভাল গুন আছে, তদ্রূপ বিশ্বসেরা একটি কদর্য গুন আছে। তার পরিবেশ, সঙ্গ, শিক্ষা, অধ্যবসায় কখনও তাকে সুখ্যাত করে, কখনও করে বিখ্যাত। পৃথিবীর বৃহৎ সংখ্যার জনগোষ্ঠী এর মাঝামাঝি কোথাও না কোথাও গিয়ে আটকে পড়ে। আটকে পড়ার সেই স্থানটিকে বিবেচনায় নিয়ে মানুষের কর্মের ধাপ বিন্যাস করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, কেউ জীবনে কৃতকার্য, কেউ অকৃতকার্য, কেউ অকর্মা, কেউ সর্বস্বান্ত ইত্যাদি।
ইতিবাচক ভাবনায় কি অভুত-পূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র বিপ্লব সাধিত করা যায়, তা আমাদের নবী মোহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনের একটি ক্ষুদ্র দিকের দিকে তাকালেই জলজ্যান্ত উত্তর পাওয়া যায়। তিনি যে সমাজে জন্মেছিলেন, সেটা ছিল মানব ইতিহাসের নৃশংস, জঘন্য, বর্বর, মনুষ্যত্ব ও বিবেক-বোধহীন মূর্খদের এক সমাজ। যারা সামাজিক চাহিদায় স্বীয় কন্যাকে মাটিতে জীবিত পুঁতে ফেলত! আবার টাকার লোভে পিতার রেখে যাওয়া স্ত্রী-কন্যাদের দাশ হিসেবে বাজারে বিক্রি করে দিত! একজন রাস্তায় চলার পথে পা মেলে বসেছিল, আরেকজন তার পায়ের উপর দিয়ে পার হয়ে যায়। এ ধরনের ঠুনকো স্বার্থের কারণে, অবিরাম চল্লিশ বছর ধরে ভয়াবহ যুদ্ধে মেতেছিল, আপন দুই ‘কবিলা‘! অসম্ভব স্বার্থ-কানা, অন্ধ-গোত্রপ্রীতি, সদা রক্ত-নেশায় মত্ত অশিক্ষিত-মূর্খ এসব মানুষের হৃদয়ে ন্যুনতম মানবতা-বোধ জাগ্রত হত না! সেই পঙ্কিল সমাজে মোহাম্মদ (সাঃ) ছাড়া দ্বিতীয় কোন ভাল মানুষ ছিলনা।
সেই সমাজে রাসুল (সাঃ) প্রত্যেকটি মানুষকে আলাদা ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের শতাধিক খারাপ গুনের মধ্য থেকে একটি মাত্র ভাল গুনকে বের করে; সেই গুনের মহিমা বর্ণনা করে, সে সব মানুষকে সম্বোধন করেছেন। তাদের একটি মাত্র গুনকে প্রচার করে অন্ধকার যুগের সকল মানুষের বিবেক ও মনুষ্যত্ব-বোধকে জাগিয়ে তুলেছেন। তাদের হৃদয়কে করিয়েছেন পবিত্র, গড়ে তুলেছেন শিক্ষিত করে, যুদ্ধে করেছেন দক্ষ, আর নেতৃত্বে করেছেন অসাধারণ। এই সমস্ত মূর্খ মানুষগুলো তদানীন্তন জমানার দুই পরাশক্তি রোম ও পারস্যকে জয় করে; ততোধিক উত্তম শাসন পদ্ধতি দিয়ে আনুগত্য-শীল সম্প্রদায়ে পরিণত করেছেন। এই ঘটনায় ইতিবাচক দিকের বহু উপমা আছে। মানুষের মূর্খতা পরিহার, অন্ধত্ব দুর, পাশবিকতা রোধ, পশুত্ব বিতাড়ন, জ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব দান, ক্ষমতায় কর্তৃত্ব অর্জন, দক্ষতায় পরাশক্তিকে হারিয়ে দেওয়া, মনুষ্যত্বে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন, বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতা সহ কোন উপাদানটি মানুষ অর্জন করতে পারে নাই! ইতিবাচক চিন্তায় অগ্রসরমান মানুষ, যে কোন পরিস্থিতিতে নতুন সভ্যতার গোড়াপত্তন করতে পারে।
ইতিবাচক প্রেরণায় একটি শিশুকে অনেক উচ্চ স্তরে পৌঁছানো যায়। সে জন্য দরকার অভিভাবকদের বিশ্লেষণ করার দক্ষতা। জগত বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনকে স্কুলের লেখাপড়ায় অমনোযোগিতার জন্য স্কুল থেকে একটি চিঠি সমেত বের করে দিয়েছিল সে কথা আমরা সবাই জানি। শিশু এডিসন মাকে প্রশ্ন করেছিল কি আছে চিঠিতে? এডিসনের শিক্ষিত মা বললেন, স্কুল থেকে চিঠিতে লিখেছে, “আপনার ছেলে এডিসনের অনেক জ্ঞান, তাই তাকে আর এই স্কুলে না পড়ালেও চলবে সুতরাং সে যেন কাল থেকে স্কুলে না আসে”। এডিসন মায়ের চোখের জল দেখেনি কিন্তু মায়ের চিঠির কথায় প্রবল আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। উচ্চ শিক্ষা ভাগ্যে না জোটার পরও, এডিসনের হাতে একে একে সৃষ্টি হতে থাকে জগৎ আলোড়ন করা সব অবিশ্বাস্য আবিষ্কার। ইঁদুরের কল থেকে বৈদ্যুতিক বাতি, টেলিফোন, শব্দ যন্ত্র থেকে গাড়ী চালাবার ব্যাটারি সহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মানব জীবনকে করে দিয়েছে সাবলীল।
মানুষের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং আল্লাহ ইতিবাচক ধারণায় জীবন চালনার জন্য বলেছেন। ইতিবাচক কথা দিয়ে মানুষকে আহবান করার পদ্ধতি শিখিয়েছেন। তিনি মোহাম্মদ (সাঃ) এই নির্দেশ দিয়েছেন যে, “মানুষদের জাহান্নামের ভয় লাগিয়ে ভয়ার্ত ও দূরে ঠেলে দিও না বরং জান্নাতের প্রতি প্রলুব্ধ ও লোভ লাগিয়ে মানুষকে কাছাকাছি করো”। তিনি তাঁর মূর্খ জাতিকে সর্বদা এই বলে জাগানোর চেষ্টা করেছেন যে, “তোমরা আমার সাথে থাক, তাহলে তোমরা বিজয়ী হবে। পৃথিবী তোমাদের করতলগত হবে, তোমরাই তাকে শাসন করতে পারবে”। ইতিহাস বলে তা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।
ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মানুষের উপর আস্তা-বিশ্বাস প্রবল থাকে। এ সমস্ত মানুষের কথা ও বক্তব্য মানুষ মন দিয়ে শুনে। তাদের কথায় প্রভাবিত হয়, কথার জাদুতে ছাত্ররা সম্মোহিত হয়। এদের অনুপ্রেরণায় ঘুমন্ত জাতি পর্যন্ত সিংহের মত জেগে উঠে। তাদের প্রতিটি কথাকে মানুষ প্রবাদ তুল্য মনে করে। আমেরিকার জাতির পিতা আব্রাহাম লিঙ্কন শুধুমাত্র ইতিবাচক কথার যাদু দিয়ে দীর্ঘ-বছর গৃহযুদ্ধে লিপ্ত একটি জাতিকে সংঘটিত করে শক্তিশালী আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মার্টিন লুথার কিং এর ইতিবাচক বক্তব্যে মানুষ খুশীতে দিশাহারা হয়ে যেত। মানব-ইতিহাসে এ ধরনের বহু উদাহরণ রয়েছে।
ইতিবাচক ধারনা অসম্ভব আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। তুমিই পারবে, তুমি অনেক দিক দিয়ে সেরা, তোমার তুলনা তুমি নিজেই, তোমার পরাস্ত হবার সুযোগ নেই। অভিভাবকদের এই জাতীয় প্রেরণা সন্তানকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যায়। একজন নারী অনেক দুর্বল কিন্তু একজন মা যদি তার সন্তানকে এই বলে সাহস যোগায় যে, তুমি এগিয়ে চল আমি আছি তোমার সাথে। সেই সন্তান পৃথিবীর আর কারো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে না। মায়ের অনুপ্রেরণায় মহাবীর সাইরাসের উত্থান হয়েছিল আধুনিক যুগের এই সন্তান সাইরাসের কীর্তিকেও হার মানাতে পারে। সুতরাং শিশুকে বিশ্বনেতার মত গড়ে তুলতে চাইলে, আগে নিজেদের ইতিবাচক হতে হবে। ইতিবাচক হবার জন্য চরিত্র বানাতে হবে। তবেই সাফল্য অনিবার্য।

Discussion about this post