
“জালিমের নেতৃত্ব কেবল বাতিলই নয় বরং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও করা যাবে। অবশ্য এই জন্য শর্ত হলো এই যে, সফল সার্থক বিপ্লবের সম্ভাবনা থাকতে হবে। জালিম-ফাসেকের বিরুদ্ধে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে ক্ষমতাসীন করতে হবে; বিদ্রোহের ফলে কেবল প্রাণ হানি এবং শক্তি ক্ষয় হবে না” (কিছু সম্মানিত আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি)
রাজতন্ত্র আর গণতন্ত্র যাই বলি না কেন, সবই শাসক আর রাষ্ট্র পরিচালকদের মর্জির উপর নির্ভর করে। অতীতের অনেক রাজতন্ত্র জন কল্যাণে এসেছে। আবার বর্তমানের যে গণতন্ত্র, সেই পদ্ধতিতেও জনগণের কল্যাণ/অকল্যাণ দুটোই হয়েছে। জনগণ একটি দলকে ভোট দেয়। আর সে দলের এমপি’রা যদি একজন সুশাসককে দায়িত্ব দেয় তাহলে তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে আর কুশাসক কে তাদের দায়িত্ব দিলে, তার মাধ্যমে কুশাসন আসবে। এই পদ্ধতির সফল বাজে প্রয়োগের দৃষ্টান্ত দেখি আমরা সিকিমের ইতিহাসে। জনগণ একটি দলকে ভোট দিল, আর সে দলের এমপি’রা লেন্দুপ দর্জিকে প্রধান মন্ত্রী বানায়; লেন্দুপ কোন রক্তপাত ব্যতিরেকে পুরো দেশটাই একরাতে ভারতের হাতে তুলে দেয়! হিটলার, কামাল পাশা সহ বিশ্বের বহু দেখে এই পদ্ধতিতেই ক্ষমতায় এসেছিল। আমি ধর্মীয় মাসয়ালার কথা বলছিনা, এভাবে সরকার পরিবর্তন সম্ভব সেটাই বলছি। তবে, ভাল-মন্দ উভয় দিকই এই পদ্ধতিতে লুকিয়ে আছে। অনেক সময় সরকার বেপরোয়া হয়ে যায়। যার তাজা ফলাফল আমরা ভারতে বিজেপি সরকারের ক্ষেত্রে দেখছি। সে হিসেবে গণতন্ত্রের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে রাজতন্ত্রের বেজায় তফাৎ কোথায়? যে শাসন ব্যবস্থায় মানুষ সাহস করে তাদের শাসকের সমালোচনা করতে পারে কিংবা দিক নির্দেশনা দিতে পারে কিংবা মনের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে কিংবা তাদের দাবী জানাতে পারে বিপরীতে শাসকও সেটার বিপরীতে প্রতিশোধ না নিয়ে জনগণের ব্যথাকে গুরুত্ব দেয়। সেটা অধিকতর উত্তম শাসন পদ্ধতি হয়। সে শাসন যে নামেই আসুক না কেন, হউক সেটা গণতন্ত্র কিংবা রাজতন্ত্র।
কোন জমানায়, কোন দেশেই অগ্রিম ধারণায় শতভাগ নিশ্চিত হয়ে একটি সফল বিপ্লব ঘটাতে পারে নি। কেননা যারা বিপ্লবের প্রস্তুতি নেয় তারা সরকারের চেয়ে দুর্বল থাকে, কার্যক্রম গোপনেই করতে হয়। তাদের থাকেনা অস্ত্র, অর্থ ও শক্ত জন সমর্থন। ওদের সামান্য প্রস্তুতিতেই সরকার তাদেরকে ম্যাসাকার করে দিতে পারে এবং দুনিয়াতে এমনটিই হয়ে এসেছে। এধরনের ক্ষুদ্র বিপ্লবী কিংবা ধীরে চাঙ্গা হচ্ছে এমন বিপ্লবীদের সন্ত্রাসী বানিয়ে নির্মূল করতে রাষ্ট্রীয় আইন সর্বদা সরকারের পক্ষে থাকে। মূলত এই বিষয়টা নিয়েই তো পৃথিবীর ইতিহাস সাজানো হয়েছে।
এর বিপরীতে আরেকটি বিপ্লব আছে, যার নাম সশস্ত্র বিপ্লব। এই ধরনের বিপ্লবে অন্য দেশের সহযোগিতা লাগে। তবে এধরনের যত বিপ্লব হয়েছে সকল বিপ্লবেই অকাতরে মানুষ মরেছে। একজন মুসলমানও এটা সমর্থন করতে পারে না। এটা সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থী। ব্যতিক্রম আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে। বাংলার মানুষ অনর্থক লড়তে চায় নি, পাকিস্তানীদের ভুল সিদ্ধান্তে তাদের বিরুদ্ধে লড়তে বাধ্য করেছে। আফগানের উদাহরণও কিছুটা এমন, এতে লোকক্ষয় তো কম হয়নি।
আরেকটি সহজ ও আইন সঙ্গত বিপ্লবের পথ খোলা থাকে। সেটা হল, যে দেশের যে আইন বলবত আছে, সে আইনকে মেনে মানুষের মধ্যে প্রচারণা চালিয়ে আইন সঙ্গত উপায়ে যথাসম্ভব গোলযোগ এড়িয়ে সরকার পরিবর্তন করানো। এটাতে জনমত গঠন করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায় কিন্তু শক্ত ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হয়। কথাটিকে আমাদের দেশের বেলায় বলতে গেলে, সোজাসুজি সেটার নাম হল নির্বাচনী পন্থা। মরহুম আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেব এই পদ্ধতিকে ন্যুনতম ভাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এক কথায় মন্দের ভাল। অন্তরে অপছন্দ রেখে, এই কাজ করতে গেলে অনেক না জায়েজ কথায়ও মৌন স্বীকৃতি দিতে হয়, নতুবা বৈধ পন্থায় ন্যুনতম এই কাজ করারও সুবিধা হারাতে হয়। এই নীতিতেই বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী সহ সকল ইসলামী দল কাজ করে থাকে, নির্বাচনেও অংশ নেয়। শুধু ইসলামী দল কেন! বাংলাদেশর কমিউনিস্ট পার্টিও বলে থাকে, ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করবে। অর্থাৎ অন্তরে এক কথা আর আইন অমান্যের মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখতে মুখে ভিন্ন কথার স্বীকৃতি দেওয়া। এগুলো কোন লুকোচুরি নয়, একদম প্রকাশ্য ব্যাপার। যাদের ইচ্ছে ভোট দিবে, না হয় দিবে না। তাই আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ) এটাকে মন্দের ভাল বলেছেন। ভুল না বুঝার জন্য আবারো বলছি এটাকে আমি জায়েজ বলছি না, পয়েন্টগুলো তুলে ধরছি পর্যালোচনার জন্য।
কিন্তু এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে কথা আছে, অনেকে এটাকে এবাদত ও আকিদার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি মুখে গণতন্ত্রের নামে ইসলাম বিরোধী কথা হজম করে এবাদত করে, তার এবাদতই কবুল হবেনা। অর্থাৎ তিনি মুসলমানই নন। এটার পিছনে তাদের একটি সুন্দর শ্লোগান আছে, “সিস্টেমের ভিতরে ঢুকে সিস্টেম পরিবর্তন করা যায় না”। তাঁদের দৃষ্টিতে এই পদ্ধতি একেবারেই বাতিল যোগ্য। উপরে আমরা দেখেছি, এই সিস্টেমের মাধ্যমে সিকিম নামক দেশ ও জাতি বিক্রি হয়ে গেছে, হিটলার বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়েছে, বলশেভিক বিপ্লবের পরে শক্তিশালী রুশ জাতি খান খান হয়েছে। ভারতে মুসলমানদের পিট দেওয়ালে ঠেকে গেছে! আমেরিকান জনগণ এক উন্মাদের খপ্পরে পড়েছে। নেতা ও জনগণ যদি সুনির্দিষ্ট ভাবে মিলিত হয়ে ঐক্যজোট হতে পারে, এই পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তন হতে পারে ন্যায় সঙ্গত উপায়ে। যেটাকে বর্তমানে গণতান্ত্রিক উপায় বলা হচ্ছে। যদিও এই গণতান্ত্রিক পন্থায় বহু ত্রুটি বিচ্যুতি আছে।
আরেকটি ফর্মুলার কথা চালু আছে শুধুমাত্র মানুষকে দাওয়াত দিলেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। এই কথাটির সাথে ইতিহাসের কিছুটা বৈপরীত্য আছে। কেননা শুধুমাত্র হকের দাওয়াত দিয়ে গোলযোগ এড়িয়ে সফলভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন ইতিহাস মানুষের জীবনে দূরের কথা, কোন নবীও এভাবে মনোরম সুযোগ পান নি। দুনিয়ার ইতিহাসে এমন ঘটনা কয়টি আছে যে নবীরা দাওয়াত দিতে গিয়েছেন, আর হামলা কারীরা আসার পরে, গোলযোগ এড়ানোর জন্য তাঁরা নিজেদের মাথা পেতে দিয়েছেন! কয়েকজন নবীকে এ ধরণের গোলযোগের মুখে পড়তে হয়নি। এটা ব্যতিক্রম কিন্তু ব্যতিক্রম কোনদিন উদাহরণ হতে পারেনা। ইসলামী ইতিহাসে দাওয়াতি কাজে নিজের উপর আক্রমণ আসলে, প্রথমে উপেক্ষা করা হয়েছে, অতঃপর এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়েছে, তারপরও গায়ে পড়ে আক্রমণ বাধানো হয়েছে। ফলে নিজেদের রক্ষায় প্রতিহত করতে হয়েছে। আর প্রতিহত করতে গেলেই রক্তারক্তি ঘটনা ঘটে। এ ধরনের কাণ্ডে, রাষ্ট্র শক্তি কোন এক পক্ষ নিতে বাধ্য হয়। ফলে খুবই শান্ত প্রকৃতিতেও ইসলাম প্রচার করতে গেলে, গোলযোগ এড়ানো সম্ভব হয় না। সেখানে কিভাবে এমনিতেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। মানব ইতিহাসে এমন কোন উদাহরণ আছে কিনা আমার কাছে তথ্য নেই। কারো কাছে থাকলে উপস্থাপন করুন, হতে পারে এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের জন্য পথের সন্ধান দিবেন।
বাংলাদেশর অতীত ইতিহাসের দিকেও যদি আমরা তাকাই, আমরা দেখতে পাব শাহজালাল, বাবা আদম শহীদ, মাহি সাওয়ার বলখী, খাজা আজমিরী (রহ) সহ অনেক সুফি দরবেশেরা এদেশে ইসলামের তাবলীগ করেছেন। কিন্তু নিজেদের পরিচ্ছন্ন থাকা সত্ত্বেও তাদের জীবনও গোলযোগের গ্লানি থেকে মুক্ত থাকেনি। তাঁরাও জীবন বাজী রেখে লড়তে বাধ্য হয়েছেন।
এসব বিচার বিশ্লেষণে কি করণীয়, এটা নিয়ে আমাদের আলেম সমাজ দ্বিধা বিভক্ত। খোলা ময়দানের তাঁদের প্রকাশ্যে কথাবার্তায় বিভক্তি বেড়ে যাচ্ছে বটে কিন্তু দিক নির্দেশনা খুব কমই থাকছে। সাধারণ মানুষ দিক ভ্রান্ত হচ্ছে। যদিও এই কাজে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিলে ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ)। আলেমেরা দীর্ঘ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব নিয়ে বিতর্ক করত তাহলে আরো বেশী উত্তম ও উপকারী হত।
পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, আমি এ ধরনের পোষ্ট লেখা থেকে সতর্কতার সাথে এড়িয়ে চলি, দুর্বলতার কারণে তারপরও লিখে ফেলেছি। আশা করি কেউ আক্রমণাত্মক ও বাজে মন্তব্য করবেন না। প্রয়োজন আসুন উত্তম পন্থায় বিতর্ক করি, যা আল্লাহ পছন্দ করেন। নিজেদের চিন্তাধারাকে মন্তব্যের মাধ্যমে তুলে ধরি। হয়ত কোন জ্ঞানী ব্যক্তির মাথা থেকে আল্লাহ আরো সুন্দর পন্থা বের করে দিবেন। আল্লাহ আমাদের অন্তঃকরণ কে পবিত্রতা দিয়ে সাফ করে দিন। আমিন।


Discussion about this post