বর্তমান ব্যস্ততার যুগে সন্তানদের সময় দেয়া এখন অভিভাবকদের জন্য কঠিন। অনেক অভিভাবক টিভি, মিডিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময় পায় কিন্তু সন্তানের সাথে স্মৃতিময় হয়ে থাকতে চান না। বা প্রয়োজন মনে করেন না। ছোটকালে সন্তানেরা পিতা-মাতার সান্নিধ্য আশা করে; আর বৃদ্ধ হলে উল্টো পিতা-মাতা সন্তানের সান্নিধ্য আশা করে। তখন বৃদ্ধ বাবা-মা চায় ছেলেটি তাদের কাছে এসে কিছু পরামর্শ চেয়ে নিক কিংবা তাদের খবর নিক! এই আশায় বেশীর ভাগ সন্তানের সাড়া থাকে না। ধর্মজ্ঞান নিয়ে বড় হওয়া সন্তানেরাও কদাচিৎ এই অবহেলায় মত্ত থাকে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রতিটি অভিভাবকের উচিত সন্তানের সাথে নিজের জীবনের কিছু ঘটনাকে স্মৃতিময় করে রাখা।
নিজেকে প্রশ্ন করুন তো, কোন এক চাঁদনি রাতে আপনার কিশোর ছেলেকে নিয়ে পূর্ণিমা উপভোগ করতে একাকী বেরিয়েছিলেন কিনা? বেশীর ভাগ উত্তর আসবে, ছেলেদের সাথে বাবারা কি এটা করে! ভুল ধারনাটা এখানেই! আজ যদি চাঁদনি রাত হয়, তাহলে আজ রাতেই পিতা-পুত্র দু‘জন বেরিয়ে যান। পুকুর পাড়ে কিংবা নির্জন মাঠে বসে পড়ুন। ছেলেকে প্রশ্ন করুন আজকের পূর্ণিমা রাতের অনুভূতি কেমন? সে চাঁদকে নিয়ে কি ভাবে। তার কথায় বুঝবেন, আজকের রাতেই মনে হয় সে প্রথম চাঁদ দেখছে। বাবার সাথে চাঁদ নিয়ে যে কথা বলা যায় এ ধারনাই তার নাই! এবার আপনিই তার সাথে অংশ গ্রহণ করুন, আপনি যখন ছেলের বয়সী ছিলেন তখন চাঁদকে নিয়ে কি ভাবতেন, এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা বলুন। আপনি বেরসিক মানুষ হলে কারো ঘটনাকে নিজের নামে চালিয়ে দিন। উঠার আগেই নীরবে নিভৃতে ছেলেকে কাছে টেনে জিজ্ঞাসা করুন। আপনি বৃদ্ধ হলে সে আপনাকে ভুলে যাবে কিনা? এই ধরনের পরিবেশে ছেলে যে ওয়াদা করবে, সেটা সে পালন করবেই। নিশ্চিত থাকুন, সন্তান যদি পঞ্চাশ বছর বেঁচে থাকে, তাহলে সে ছয়শ বার পূর্ণিমা পাবে, আটার হাজার রাতে চাঁদের আলো দেখবে। এ ধরনের প্রতিটি আলোকিত রাত, সন্তানকে তার পিতার ঐকান্তিক ভালবাসার কথা মনে করিয়ে দিতে থাকবে।
ঘুরার জন্য একটি অন্ধকার রাতকে বাছাই করুন। নিকষ কালো অন্ধকারে তার অনুভূতি কেমন প্রশ্ন করুন। জানতে চান, এই ঘন অন্ধকারে একে অপরকে দেখছে কিনা? কোন এক অন্ধকার রাতের হুতুম পেঁচার ভীতিকর আত্ম-চিৎকারের কথা বলুন। কোন এক গাছে আছড়ে পড়া বাদুরের অস্তিত্বের ধারণা দিন। সন্তান ভয় পাক কিংবা উল্লসিত হউক তার মাথা বুকে চেপে ধরুন। দেখবেন, এই ধরনের সঙ্গ জীবনে কোন কালে পেয়েছিলেন কিনা, এই প্রশ্নে আপনার স্মৃতি হাতড়ে বেড়াবে। সন্তান পিতার ভালবাসায় অনেক আত্মবিশ্বাসী হবে। বাবার এ ধরনের দারুণ সান্নিধ্যকে উপভোগ করবে। বাবাকে বন্ধু হিসেবে ভাবতে থাকবে। সকল সন্তান এই ধরনের ভালবাসা চায়। এ ধরণের অন্তরঙ্গ মুহূর্তটা পেতেই তারা উদগ্রীব। আবারো তার নিকট থেকে ভালবাসার ওয়াদা নিন। নীরবে নিভৃতের এই ওয়াদা সন্তান আজীবন মনে রাখবে। পৃথিবীতে হাজারো রাতে নিকষ কালো অন্ধকারের ছায়া নামবে কিন্তু প্রতিটি রাত আপনার সন্তানের স্মৃতিতে পিতার আবদারের কথা বারে বারে হানা দিবে।
আপনার আদরণীয় কন্যাকে আলো-আঁধারী রাতে জোনাকি দেখানোর লোভ লাগান। ঘরের ছাদে কিংবা উঠানে একাকী কথা বলুন। আপনার মা-দাদীর কোন এক ইতিবাচক কথা বলে তার চিন্তাকে একমুখো করুন। তার ধ্যানকে আপনার প্রতি নিবদ্ধ করুন। মহাকাশের বিস্তৃতির কথা তার কাছে তুলে ধরুন। এই পৃথিবীতে লক্ষ বছর ধরে এভাবে রাত এসেছে এবং ভবিষ্যতেও চলে যাবে। দুনিয়া শুধু ভাল মানুষ গুলোর কথাই মনে রেখেছে। এর পরেই মেয়েকে বলুন সে যাতে এমন কাণ্ড না ঘটায় যাতে করে মাতা-পিতার বদনাম হবে। পিতা ও মেয়ের একাকীত্বের এই ওয়াদা মেয়ে আজীবন রক্ষা করবে। যতবার কোন ভবনের ছাদে উঠবে, বাবার কথা মনে করবে। যতবার জোনাকি কিংবা প্রজাপতি দেখবে ততবার বাবার কথা মনে পড়বে। এভাবে আপনার বাড়ীর চৌহদ্দির মধ্যে অনেক স্মৃতির জন্ম দিন। পরবর্তীতে যেসব আপনার হয়ে কথা বলবে এবং তাদের অন্তরের ছোট্ট-কোণে স্ব-যতনে আপনাকে লুকিয়ে রাখবে।
ছোট্ট শিশুদের নিকট থেকে ওয়াদা নেবার উত্তম সময় হল, যখন তারা শুতে যায়। মা, কোন এক ভাল ছেলের আকর্ষণীয় ঘটনা শুনাবে, প্রয়োজনে গল্প বানাতে হবে। মায়ের মুখের গল্প শিশু খুব মনোযোগ সহকারে শুনে। তার নিকট থেকে ওয়াদা নিতে হয়না! গল্পে এতটুকু প্রভাবিত হয় যে, এক পর্যায়ে সে মাকে জড়িয়ে ধরে নিজে থেকেই বলে দিবে আমিও ওর মত হব কিংবা আরো বেশী কিছু করব। বুদ্ধিমতী মাকে সেই সময়টাই কাজে লাগাতে হয়। সন্তানের বিশ্রী কোন আচরণ পরিবর্তন দরকার হলে তখনই সেই কথাটা তুলে, আদর করে ওয়াদা নিয়ে নিতে হবে। সামান্য খাসিয়ত পরিবর্তন করে যদি মাকে এত বেশী খুশী করা যায়, তাহলে সেটা তার পর দিনই বাস্তবায়ন করবে। প্রয়োজনে মাকে কয়েকদিন পর পর কথাটা মনে করিয়ে দিতে হবে। শিশুরা সহজে খাসিয়ত পরিবর্তন করতে পারে, বড় হলে পারে না; বরং এটা ভয়ানক কঠিন। আরবী প্রবাদে আছে, “একটি পাহাড় সরানো যতোধিক সহজ, মানুষের অভ্যাস বদলানো ততোধিক কঠিন”। এই ধরনের মারাত্মক ত্রুটিও একটি সচেতন, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মা শিশুর ছোটকালেই চরিত্র শুধরিয়ে নিতে পারেন। মূলত এটার নামই প্রকৃত শিক্ষা, পারিবারিক শিক্ষা, এটাই বাল্য শিক্ষা! বাকী জীবনে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানেই যাক, শিশুর ছোটকালের এই চরিত্রই তার ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধিত্ব করবে।
কিশোর অবস্থায় সন্তানের মন মেজাজ বুঝে নেওয়া প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব। উপরের ঘটনা মত কিশোর বালককে নিয়ে বাহিরে যাবার কথা বলুন। সে যদি তার পিতার কোন কথায় উৎসাহ না দেখায় কিংবা তার নিজস্ব খেলায় বুঁদ হয়ে থাকতে চায়। তাহলে সে সন্তান যতই লেখা পড়া করুক না কেন পিতার কোন উপকারে আসবে না। শুধু পিতা কেন সে ব্যক্তি তার পরিবার কিংবা নিজেরও কোন উপকার করতে পারবে না। তাই সময় থাকতে এসব সন্তানকে কর্মমুখী শিক্ষায় জড়িয়ে ব্যস্ত করে দেওয়া উচিত। সে যদি অনেক অর্থকড়ি কামায় তখন সে পিতা-মাতাকে কিছুটা হলেও দেখবে। শিক্ষিত হওয়া স্বত্বেও তার অর্থকড়ি কামানোতে যদি ঘাটতি থাকে কোন অবস্থাতেই পিতা-মাতাকে দেখবে না। যাই হউক সকল শিক্ষার মূল শিক্ষা হল এটাই, যেটা সন্তান দশ বছরের মধ্যে অর্জন করে। যদিও এই শিক্ষার কোন স্বীকৃতি নাই, সার্টিফিকেট থাকেনা। এই শিক্ষাটাই তাকে মানুষ হবার ভিত্তি সৃষ্টি করবে এবং পৃথিবীতে তার পথ-পরিক্রমা কোন দিকে, কেমন হবে সেটা নির্ধারণ করবে। এত কিছুর পরও এসব শিশুরা পিতা-মাতার স্মৃতি-মাখা সেই চাঁদনি রাত,জোনাকির আলো ভরা সন্ধ্যা, কুয়াশা ভরা স্নিগ্ধ সকালের কচু পাতার টলটলে দোলায়মান পানির কথা কখনও কোনদিন ভুলবে না। তাই উপভোগ্য জীবন পেতে হলে সন্তানের সাথে জীবনকে স্মৃতিময় করার কোনই বিকল্প নাই।কোটিপতি হবার চেয়েও একটি সন্তানকে মধুময় সময় দিয়ে বড় করানো অনেক উত্তম।

Discussion about this post