উম্মুল মোমেনীন উম্মে সালমা (রাঃ) হলেন, মক্কার কুরাইশদের বিখ্যাত ব্যবসায়ী আবু উমাইয়া ইবনে মুগীরার কন্যা। তাঁর মূল নাম ‘হিন্দ’। তাঁর মায়ের নাম ছিল ‘আতিবাহ বিনতে আমির’। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) এর দুধভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আসাদের সাথে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল। ইসলামের প্রাথমিক যুগেই স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কার মানুষদের অত্যাচারে থাকতে না পেরে তারা উভয়েই সপরিবারে আবিসিনিয়ায় বর্তমানের ইথিওপিয়ায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে তাঁদের একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তার নাম রাখা হয়েছিল সালমা। এ কারণেই তিনি উম্মে সালমা তথা সালামের মা নামে পরিচিত ছিলেন। আরবীতে উম্মু শব্দের অর্থ ‘মা’।
আবিসিনিয়ার পরিবেশ তাঁদের অনুকূলে না হওয়ায় তাঁরা মক্কায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। যখন তাঁরা মক্কায় ফিরে আসেন, তখন তথায় রাসুল (সা) এর সাথীদের কেউ নেই। মক্কার মানুষদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে, তার আগেই রাসুল (সাঃ) সহ সঙ্গী-সাথীদের সবাই মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। এই কঠিন অবস্থায় তাঁরা আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় ফিরেন এবং যখনই মদিনায় হিজরত করতে প্রস্তুত হন, তখনই নির্মম নির্যাতন তাঁদের উপর চেপে বসে।
আবু সালামা (রাঃ) [সালামার বাবা] তাঁর জীবন সঙ্গিনী উম্মে সালমা (রাঃ) ও তাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে মদীনার পথ ধরেছিলেন। তাঁকে বাধা দেয়া হলো, তিনি শুনতে বাধ্য ছিলেন না, তাই মক্কার মানুষেরা তার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। তার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা ইসলামের শত্রু ছিল, তারা এসে তাঁর শিশু পুত্রকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। স্ত্রীর পক্ষের আত্মীয়-স্বজন এসে স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। মানসিক ও শারীরিক শাস্তি দেবার জন্য তিন জনকে তিন ভাবে আলাদা করে ফেলা হল। পুরো মক্কায় তাদের প্রতি ন্যুনতম সহমর্মীতা দেখানোর মত মানুষ ছিলনা। আত্মীয় অনাত্মীয় সবাই সর্বোচ্চ মাত্রার শাস্তির মজা পীড়ণ করাতে সচেষ্ট হয়ে উঠল।
শত্রুদের এই ধরনের ব্যবহার আবু সালামার (রাঃ) [সালামার বাবা] মন টলাতে পারেনি। তিনি স্ত্রী-পুত্রের ভাগ্য ও জিল্লতিকে আল্লাহর উপর সঁপে দিয়ে গোপনে মদিনার পথ ধরেছিলেন। ওদিকে সন্তান ছিনিয়ে নিয়ে, স্বামীকে নিরুদ্দেশ করিয়ে দিয়েও উম্মে সালামা (রাঃ) কে টলানো যাচ্ছিল না। অতঃপর এক বছর পরে তার শিশু সন্তানকে তার কোলে ফেরত দেয়। এবার শুরু হয় মা- সন্তানের কান্না আর যাতনার দিন। কোন সাহায্য-সহযোগীতা, নিরাপত্তার বালাই বিহীন সমাজে অশ্রুভেজানো ছাড়া আর কোন পথই তাদের জন্য রইল না। এত কিছুর পরেও উম্মে সালামা (রাঃ) তার বিশ্বাস থেকে সড়ে পড়েন নি। অতঃপর কোনভাবে তিনি সন্তান সমেত মদিনায় স্বামীর সাথে মিলিত হতে পেরেছিলেন।
কিন্তু উম্মে সালমা (রাঃ) এর জীবনে এই সুখ বেশী দিন স্থায়ী হয়নি! মক্কার মানুষেরা রাসুল (সা) কে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে, চুড়ান্ত যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে মক্কা থেকে মদিনার উপকন্ঠে ওহুদের প্রান্তরে হাজির হন। ওহুদের ময়দানে বাতিল শক্তির আঘাতে আবু সালমা (রাঃ) মারাত্মকভাবে আহত হলেন। দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁকে চিকিৎসা করানো কিন্তু আরোগ্য লাভ করেননি, শাহাদাত ছিল তার ফয়সালা।
এ অবস্থায় স্বামী হারিয়ে, শিশু সন্তানদের নিয়ে বিধবা উম্মে সালামা (রাঃ) বড় অসহায় হয়ে পড়লেন! তাঁকে আশ্রয় দেবার মত আর কাউকে পাওয়া গেল না। অধিকন্তু মদীনায় এমন কোন আত্মীয়-স্বজনও ছিল না, যারা তাঁকে আশ্রয় দান করবে। কেউ যখন কোথাও তাঁকে আশ্রয় দিল না, তখন নিরাশ্রয়দের আশ্রয় স্থল হিসেবে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) স্বয়ং এগিয়ে এলেন। উম্মে সালামা (রাঃ) দুটো ছেলে ও দুটো মেয়ে নিয়ে রাসুল (সাঃ) সংসারে প্রবেশ করেছিলেন। তবে এই তথ্যে মতভেদ আছে।
রাসুল (সাঃ) এর স্ত্রী দের মধ্যে আয়েশা (রাঃ) রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর পরে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) ছিলেন অধিক জ্ঞান সম্পন্না মহিলা। নবী (সাঃ) রাজনৈতিক জটিল বিষয়েও কখনও তাঁর সাথে আলোচনা করতেন। হোদায়বিয়ার সন্ধির সময় এক মহা সঙ্কটকালে নবী (সাঃ) তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেই সফল হয়েছিলেন।
রাসুল (সাঃ) এর সহধর্মীনিদের মাঝে তিনিই সবার শেষে দুনিয়া ত্যাগ করেন। ৮৪ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর নামাজে জানাযা আদায় করান আবু হুরাইরা (রাঃ)। তবে এ তথ্য সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তাঁকে মসজিদে নববীর অদূরে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে দাফন করা হয়।


Discussion about this post