একদিন রাসুল (সা) উম্মু আয়মানের বাড়িতে গেলে পর তিনি পান করার জন্য শরবত পেশ করেন। কিন্তু সে শরবত পান করতে রাসুল (সা) ইতস্তত বোধ করতে থাকেন। এতে উম্মু আয়মান খুব অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। [মুসলিম-২/৩৪১] এবাদতে প্রদর্শনেচ্ছা ও শয়তানের প্ররোচনা
মূলত রাসুল (সা) সেদিন নফল রোজা রেখেছিলেন, সে কথা উম্মে আয়মন জানতেন না। আর রাসুল (সা) নফল রোজা রেখেছেন, সে কথাটা নিজের মুখে প্রকাশ করাটাকে জরুরী মনে করেন নি। অর্থাৎ তিনি চাচ্ছিলেন উম্মে আয়মন বিষয়টি দূরদর্শিতা বুঝে নিক।
আরো পড়তে পারেন….
- উম্মুল মোমেনীন উম্মে সালমা (রাঃ)
- উম্মুল মোমেনীন উম্মে হাবিবা (রা)
- নামের মাহাত্ম্য ও আরবের বিশ্বাস
প্রকৃতপক্ষে নফল এবাদত হলো এমন আমল, যার খবর জানবেন শুধুমাত্র আল্লাহ। কেননা এই এবাদত একান্ত তাঁর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত হয়। নিজের মুখে বলে বেড়ানো, কিংবা কেউ জানুক এমন আচরণ করা, কিংবা কৌশলে বিষয়টি সাধারণের সামনে উপস্থাপন করার নামই প্রদর্শনেচ্ছা।
আমাদের সময়ে দেখতে পাই, মানুষ নফল এবাদত করার খবর জনসম্মুখের প্রচার করে আনন্দ পায়। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে উঠলে এমনভাবে কাশা-কাশি শুরু কর দেয় যে, যাতে পাড়া-প্রতিবেশী বুঝতে পারে যে, তিনি উঠেছেন। অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে যদিও বিষয়টি ভিন্ন। প্রদর্শনেচ্ছায় অভ্যস্ত ব্যক্তির আমল খুবই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তা তিনি যতই আমলদার ব্যক্তি হউক না কেন। রাসুল (সা) একটি আচরণ থেকেই বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করতে পারি।
একজন ব্যক্তিকে চিনি, তিনি প্রতিরাতে তাহাজ্জুদ পড়েন এবং ফজরের আজান দেবার আগেই মসজিদে গিয়ে হাজির হন। প্রতি ওয়াক্ত সালাতের সকল রাকায়াত গুলোই আন্তরিকতার সাথে পড়েন। নরম স্বভাবের এই মানুষটি খুবই বন্ধু বৎসল এবং যথেষ্ট মেহমান-প্রিয়। কিন্তু তিনি তার বাসার অন্যান্য সাথীদেরকে অনুত্তম গুণাবলীর অধিকারী বলে মনে করে মানসিক দূরত্ব বজায় রাখে। সেই বাসায় থাকেন মাদ্রাসা পড়ুয়া এক ব্যক্তি। তার কাজের পরিধি বড়, বেশী পরিশ্রম করতে হয়। তিনি কখনও কাউকে নসিহত করলে, তাহাজ্জুদ গুজার ব্যক্তি মুচকি হাসেন। এই ভেবে যে, নিজের আমলের পরিপূর্ণতা নেই, অথচ অন্যকে নসিহত করে।
সন্দেহ নেই, তিনি খুবই উত্তম আমল করেন কিন্তু এমন ব্যক্তিরাই শয়তানের অন্যতম টার্গেটে পরিণত হয়। শয়তান এমন ব্যক্তির মনের মধ্যে প্ররোচনা দিতে থাকে, “আহা তুমি কত বড় এবাদত গুজার মানুষ কিন্তু লোকে তোমারে চিনল না”! এই কু-মন্ত্রণা যখন মাথায় ঢুকে তখন উত্তম আমল কারী ব্যক্তিরা উপরোক্ত ব্যক্তির মত হয়ে যায়।
তাই অবশ্যই সাধ্যমত উত্তম কাজ করতে হবে, এই কাজগুলো মহান আল্লার উদ্দেশ্যে সোপর্দ করতে হবে এবং নিজের দায়িত্ব হল তা লোক সমাজে প্রচারের সুযোগ বন্ধ রাখা। খুশীর খবর হল এটা যে, যারা শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্যই, লোকচক্ষুর অন্তরালে কাজ করে, তাদের কাজ কখনও গোপন থাকেনা। স্বয়ং আল্লাহই তার কাজের প্রচারকারী হয়ে যায়।
উম্মে আয়মনের (রা) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
তিনি রাসুল (সা) মায়ের দাসী ছিলেন। তিনিই রাসুল (সা) এর ধাত্রী। রাসুল (সা) এর পাঁচ বছর বয়সে, মায়ের সাথে মদিনা থেকে ফেরার পথে তার ইন্তেকাল হয়, সাথে ছিলেন উম্মে আয়মন (রা)। মায়ের মৃত্যুর ফলে পৈত্রিক সূত্রে উম্মে আয়মন রাসুল (সা) দাসী হিসেবে পরিগণিত হন। মাতার সূত্রে রাসুল (সা) এর সাতটি ছাগী ছিল, ওগুলো তিনি চড়াতেন। পরবর্তীতে রাসুল (সা) তাঁকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। শিশুকালে রাসুল (সা) উম্মে আয়মনের কাঁধে-পিটে চরেছেন। মক্কায় থাকাবস্থায় রাসুল (সা) বিধবা ধাইমা উম্মু আয়মন কে আবারো বিয়ে দিয়েছিলেন, পালক পুত্র যায়েদ বিন হারেসার সাথে। মদিনায় গেলে তাদের ভরন পোষণের জন্য মদিনার উপকণ্ঠে তাঁকে একটি বাগান দিয়েছিলেন। সে ঘরে একজন বিখ্যাত সন্তানের জন্ম হয়েছিল, তার নাম উসামা বিন যায়দে (রা)। রাসুল (সা) ওসামাকে (রা) কে বহুবার নিজের সাথে ঘোড়ার পিটে বসিয়ে সওয়ার হয়েছিলেন। রাসুলের (সা) মৃত্যুর কয়েকদিন পূর্বে দাসীর সন্তান ওসামা (রা) কে অল্প বয়সেই যুদ্ধের সেনাপতি করেছিলেন। আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলীর (রা) মত ব্যক্তিরা তা হুবহু মেনেছিলেন। ওসমান (রা) যুগে উম্মে আয়মন (রা) ইন্তেকাল করেন।
[তথ্য সূত্র আসহাবে রাসুলের জীবনকথা]


Discussion about this post