ওয়ায়েজিনদের বয়স কেমন হওয়া উচিত, এ ব্যাপারে কোন সুনিদ্দিষ্ট নিতীমালা নেই। তবে আমরা ইতিহাস থেকে ধারণা নিতে পারি। বাংলাদেশের সকল মানুষ ওয়াজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছেন। ওয়াজ আরবি শব্দ যার অর্থ প্রচার করা। ওয়াজ করার জন্য বয়সের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে নসিহত তথা উপদেশ দেবার জন্য কখনও বয়সের ওজন দরকার আছে।
এক ভিডিওতে দেখলাম, শিশু বাচ্চা ওয়াজ করছে, পৌঢ়দের লক্ষ্য করে। সে এমন কিছু বিষয় ওয়াজে বলে চলছে, যথাযথ বয়স না হবার কারণে, সে ওটার মর্মই বুঝবে না কিন্তু সে ওয়াজ করেই যাচ্ছে। আঠার বছরের অবিবাহিত যুবক যদি পৌঢ় ও বৃদ্ধদের সামনে বসিয়ে দাম্পত্য ও সংসার জীবন সম্পর্কে নসিহত করতে থাকে। তাহলে উপস্থিতি ভাবতেই পারে; বৎস এসব বই পড়ে শিখেছে নাকি অভিজ্ঞতার আলোকে বলছে। অর্থাৎ জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও নসিহত করার ক্ষেত্রে বয়সের একটি ব্যাপার থাকেই।
ওয়ায়েজিনদের বয়স কেমন হওয়া উচিত, ব্যাপারটি আরো পরিষ্কার বুঝার জন্য আমরা চারজন ইমামের জীবনীটা সামনে আনতে পারি। সাধারণ মানুষ রাসুল (সাঃ) এর সাহাবীদের ভাল করে না জানলেও, মাজহাবের আলেমকে চিনে থাকে। সারা বিশ্বের মুসলমানদের বিরাট একটি অংশ তাদের অনুসরণ করে। তাই তাদের জীবনটাকেই উপমা হিসেবে বাছাই করা হল।
আরো পড়ুন…
- ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ)
- উম্মুল মোমেনীন মাইমুনা (রাঃ)
- উম্মুল মোমেনীন উম্মে সালমা (রাঃ)
১. ইমাম আবু হানিফা (রহ) জন্ম ৮০ হিজরি। তিনি জীবনের শুরুতেই একজন শ্রেষ্ঠ তার্কিক হিসেবে প্রসিদ্ধি পেয়ে যান। কোরআন-হাদিসের জ্ঞান, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, উপস্থাপনার দক্ষতা ও নাস্তিকদের বিরুদ্ধে বিতর্কে জিতে আসার কারণে তিনি বাগদাদ-কুফা নগরী সহ সর্বত্র ব্যাপক পরিচিত ছিলেন।
অতঃপর তিনি যুবা বয়সে, উপরের ওসব ছেড়ে দিয়ে তদানীন্তন সময়ের একজন বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইমাম শাবী (রহঃ) এর একনিষ্ঠ ছাত্র হিসেবে অধ্যয়নে লেগে যান। ১২০ হিজরিতে ইমাম শাবীর (রহঃ) মৃত্যুবধি তিনি তাঁর ছাত্র হিসেবে রয়ে যান। তাঁর মৃত্যুর কিছুকাল পরেই তিনি শিক্ষা মজলিস গঠন করেন এবং ছাত্রদের ইলমে ফিকাহ শিক্ষা দিতে থাকেন। এই হিসেবে বুঝা যায়, ইমাম আবু হানিফা ৪০ বছর বয়সের পরেই এই কাজে নেমে পড়েন।
২. ইমাম মালেক (রহঃ) জন্ম ৯৩ হিজরি। তাঁর শিশুকালে তিনি বহু তাবেয়ীর দেখা পেয়েছিলেন। সে হিসেবে তিনি চরম ভাগ্যবান। তখনকার দিনে মদিনা ছিল সবচেয়ে বেশী আলেমের মিলনস্থল। ইমাম মালেক এসব আলেমদের সবাইকে চোখ বন্ধ করে শিক্ষক হিসেবে বাছাই করেন নি। তিনি তাদের প্রজ্ঞা, যোগ্যতা, সততা, বুদ্ধিমত্তা এবং খোদা-ভীতির প্রতি গুরুত্ব দিতেন। এসব ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন,
“মদিনাতে এমনও অনেক লোক রয়েছেন যারা বৃষ্টির জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করলে সে দোয়া কবুল হবে। তারা অনেক মাসয়ালা মাসায়েল এবং হাদিছ সম্বন্ধেও অবগত আছেন। কিন্তু আমি কখনো তাদের থেকে কোন জ্ঞান গ্রহণ করিনি। কারণ তারা শুধুমাত্র ব্যক্তি জীবনে মুত্তাকী এবং বুজুর্গ ছিলেন। কিন্তু রেওয়ায়াত এবং ফতোয়ার কাজ শুধুমাত্র বুজুর্গি এবং তাকওয়ার দ্বারা চলে না। তার সাথে সাথে জ্ঞান বুদ্ধিরও বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। (সূত্র চার ইমামের জীবনী) ওয়ায়েজিনদের বয়স কেমন হওয়া উচিত
তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের গোলাম নাফে (রহ)। তিনি অধিক জ্ঞানী ও বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। জ্ঞানের কারণে তাকে আজাদ করে মিশরের সরকারী কর্তা বানিয়েছিলেন। ইমাম জাফর সাদিক (রহঃ)। তিনি ফাতিমা ও আলী (রাঃ) নাতি। তদানীন্তন জমানার শ্রেষ্ঠতম বুজুর্গ ব্যক্তিদের অন্যতম। ইবনে শিহাব জুহুরী (রহ) এঁদেরকে উলুমে নবুয়াতের স্তম্ভস্বরূপ বিবেচনা করা হত। এধরণের অগণিত আলেমগন তার শিক্ষক ছিলেন।
তিনি কত বছর বয়স থেকে শিক্ষা মজলিস চালু করেছিলেন, সেটা পরিষ্কার জানা না গেলেও, এটা জানা যায় তিনি মসজিদে নবুবীতে বসেই মানুষকে ইলম শিক্ষা দিতেন। এবং তখনকার দিনে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক বুজুর্গ মদিনায় অবস্থান করতেন। তাদের সবার জ্ঞান, বয়স, গ্রহণযোগ্যতা উৎরিয়ে ইমাম মালেক সবার মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন। এতে বুঝা যায় তাঁর বয়স একেবারে কম ছিল না।
৩. ইমাম শাফেয়ী (রহ) জন্ম ১৫০ হিজরি। তিনি সরাসরি ইমাম মালেকের (রহঃ) ছাত্র। তিনি দীর্ঘ-বছর ইমাম মালেকের নিকট থেকে জ্ঞান আহরণ করে মক্কায় চলে যান। মক্কায় থাকাবস্থায় তিনি ইয়েমেনের শাসক নিযুক্ত হন। কিছু বছর দক্ষতার সাথে শাসক হিসেবে কর্ম-পরিচালনা করার পরে আবার মক্কায় ফিরে আসেন।
পরবর্তীতে আরো বেশী ইলমে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করার নিমিত্ত তিনি ইমাম আবু হানিফার (রহঃ) বিশিষ্ট ছাত্র বিখ্যাত ফিকাহ-বিদ বাগদাদে অবস্থিত ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) শিক্ষা মজলিসে যোগ দেন। সেখানে অবস্থানের পর থেকেই ইমাম শাফেয়ীর জ্ঞান-গরিমার সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯৫ হিজরিতে বাগদাদে তাঁর শিক্ষা মজলিসের ব্যাপ্তি বেড়ে যায়। তার কাছে দলে দলে ছাত্ররা আসতে থাকে।
এ থেকে বুঝা যায়, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ইয়েমেনের শাসক হিসেবে দক্ষতা থাকা ও প্রসিদ্ধি পাওয়ার পরও শিক্ষা মজলিসের পরিপূর্নতা দেয় চল্লিশ বছর বয়সের পরে।
৪. ইমাম আহমেদ ইবনে হাম্বল (রহ) জন্ম ১৬৪ হিজরি। যুগ-শ্রেষ্ঠ অনেক ঈমামদের মৃত্যুর পরেই ইমাম হাম্বলের দ্বীনি শিক্ষা জীবন শুরু হয়। তাই তিনি অন্যান্য ফিকাহের ইমামদের সিল-সিলা দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর বিশ্লেষণ ক্ষমতা, খোদা-ভীতি, সত্যপ্রিয়তা, নির্ভীকতা সহ সকল দিকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইসলামের এক জীবন্ত প্রতীকের মত। শুরুতেই তিনি হানাফি মাজহাবের অন্যতম প্রসিদ্ধ ইমাম আবু ইউসুফকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন। তিনি ইমাম শাফেয়ীর দেখা পেয়েছিলেন। ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন দিক ও বিভাগে তার যথেষ্ট পাণ্ডিত্য ছিল।
চল্লিশ বছর না হওয়া অবধি শিক্ষা মজলিস খুলবেন না বলে তিনি নিজ থেকেই অগ্রিম ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ছিল, একজন ব্যক্তির জ্ঞান-বিজ্ঞতা পরিপূর্ণতা পাবার জন্য কমপক্ষে চল্লিশ বছর হায়াতে জীবন দরকার। এটা আল্লাহ প্রদত্ত একটি বিবেচনা। তাইতো আল্লাহ চল্লিশ বছর বয়সেই রাসুল (সা) কে নবুয়ত দিয়েছিলেন। খাদিজা (রা) চল্লিশ বছর বয়সে একজন নবীর গুরুত্ব বুঝার মত স্ত্রী হয়েছিলেন। ইসলাম প্রচার ও বিকাশে খাদিজা (রাঃ) ও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল ছায়েগ বলেন, “একবার আমি বাগদাদে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) দেখলাম, তিনি জুতা হাতে নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন। আমার পিতা আগে বেড়ে তার কাপড় আঁকড়ে ধরে বললেন, আবু আব্দুল্লাহ! কতদিন পর্যন্ত আর পড়ালেখা করবেন? এ বালকদের সাথে দৌড়াতে কি আপনার লজ্জা লাগে না।” তিনি দৌড়ের উপরেই উত্তর দিয়েছিলেন ‘ইলাল মাউত’ তথা মৃত্যু অবধি পড়ব।
৭৮ বছর বয়সে ইমাম হাম্বলকে জেলখানায় পুরে নির্মমভাবে বেত-মারা হল। খাদ্য-পানি বন্ধ করা হল! একটি মাত্র অপরাধ। বিচারপতি হও অথবা ক্ষমতাসীনের পক্ষে ফতোয়া তথা রায় দেও। কিন্তু তিনি ভাবতেন, তাঁর দেওয়া একটি ফতোয়া মাধ্যমে, পরবর্তী সময়ে হাজার বছর ধরে মানুষ সিদ্ধান্ত নিবে। তাই নির্যাতনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন কিন্তু সরকারী সুযোগের পাশে থাকেন নি।
বয়স ও জ্ঞান মানুষকে প্রজ্ঞাবান করে। কথা বলার ক্ষেত্রে তারা দূরদর্শী হয়।একটি কথার মারপ্যাঁচ ও গোলযোগ কোথা থেকে কোথায় পৌছতে পারে, সেটার গভীরতা একজন কমবয়সী আলেমের চেয়ে অধিক বয়সী আলেমের বেশী বুঝার কথা। আমাদের দেশে এখন আলেম হওয়া অনেক সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের কণ্ঠ সুন্দর, গুছিয়ে কথা বলতে পারে কিংবা উপস্থিতিকে বিভিন্ন কথাবার্তায় বসিয়ে রাখতে পারে, ওয়ায়েজিন হিসেবে তাদের কদর অনেক বেশী। একজন বয়স্ক, জ্ঞানী, মুত্তাকী ওয়ায়েজিনের দূরদর্শীতা ও একজন সুদক্ষ অল্পবয়স্ক বক্তা ওয়ায়েজিনের পার্থক্য সকল মানুষ করতে পারে না। কদাচিৎ তাদের ভুল মন্তব্যে সামাজিক প্রতিক্রিয়া বাড়ে। আলেমদের মাঝেও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তাই মাহফিলে আলেম হিসেবে দাওয়াত দেবার ক্ষেত্রে বিজ্ঞতা, দূরদর্শীতার সাথে বয়সটা বিবেচনায় নিলে অনেক সমস্যা কমে যাবে।


Discussion about this post