আমার বিয়েতে কাবিনের টাকার পরিমাণ ছিল নগদ-বাকি মিলিয়ে সর্মাবমোট পঞ্চাশ হাজার টাকা মাত্র। যখন এলাকায় সাধারণ একটি বিয়ের কাবিনের বাজার দর চলছিল তিন লাখ টাকার উপরে! পাত্রী পক্ষের জেঠা সহ দু’একজন এত কম মূল্যের কাবিনে আপত্তি তুললেন। কাবিনের টাকা ও একটি দামী লেন্স
এক্ষেত্রে আমার সোজা জওয়াব ছিল, কাবিনের এই শর্তে রাজি হলে আমি আছি নতুবা আমি ভিন্ন রাস্তার পথিক হব। এই শর্তটির ব্যাপারে আমি দৃঢ় ছিলাম। শাশুড়িই সমাধান করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন, মেয়ের কপালের সুখ কাবিনের টাকা দিয়ে হয়না; তিনি কোন বাক্য ব্যয় না করে, তাতেই রাজী হয়েছিলেন।
এটা ভাবার সুযোগ ছিলনা যে, তখনকার সময়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা খুব কম ছিল। তখন স্বর্ণের ভরি ছিল পাঁচ হাজার পাঁচ শত টাকা করে। সে হিসেবে নয় ভরি স্বর্ণের মূল্যমান ছিল কাবিনের পরিমাণ। আমার কাছে টাকার এই পরিমাণ টা বহন করাও কষ্টসাধ্য ছিল। বিয়ের আগেই আমি নিয়ত করেছিলাম শরীয়ত মোতাবেক কাবিনের টাকাটা পরিশোধ করব। সে কারণে টাকার বেলায় আমি শক্ত অবস্থান নিয়েছিলাম। প্রবাসে ছিলাম বলে কিছুটা আয়ত্তে ছিল দেশের চাকুরীর টাকা দিয়ে এটা বিরাট কষ্টসাধ্য হত। বর্তমান বাজারের হিসেবে দেখুন, সাড়ে নয় ভরি স্বর্ণের মূল্য পরিশোধ করাটা একজন চাকুরীজীবী ব্যক্তির জন্য কতটা কষ্টসাধ্য হতে পারে।
আমার গৃহীণি গৃহিণী অনেকটা বাস্তববাদী, তিনি ফ্যাশনে এক্সপার্ট। শপিং মলে হাটার সময় দেখতাম কোন পোশাক নজরে পড়লে তিনি সেটা খুঁটিয়ে দেখতেন এবং মনের আয়নায় স্ক্যান করে নিতেন। তারপর হুবহু সেই পোশাক তৈরি করতে পারতেন। হউক সেটা পুরুষের কিংবা নারীর। এই বিষয়ে তার উপমা বিরল।
বিয়ের পরে তাকে ভাবতে দেখতাম, ঘরে বসে কিছু একটা করবে। কি করবে সেটা নিশ্চিত করতে না পারলেও কিছু একটা করার বাসনা তাকে ঘিরে ধরল। কিছু করার জন্য তো নগদ টাকা চাই। আমার অবস্থা কিছুটা সঙ্গিন ছিল, তাই টাকা হাওলাত নিয়ে কিছু একটা করার জন্য প্র্যাকটিস করবে, সে সাহসও তার হচ্ছিল না। সেই মুহূর্তে আমার মাথায় একটি কথা আসে, যে কথাটি তাকে খুবই অনুপ্রাণিত করেছিল।
তাকে বললাম, তুমি তো আমার কাছে অনেক টাকা পাবে। এটা তোমারই টাকা যা আমার কাছে বাকী রয়েছে। যদি সে টাকাটা এখন তোমাকে দিয়ে দিই, তাহলে সেটা তুমি নিজের ইচ্ছামত খরচ করার স্বাধীনতা পাবে।
সে কৌতূহলী হল এই কারণে যে, আমাকে কোন টাকা কখনও হাওলাত দেয়নি। তখন তাকে বললাম, এই টাকা হল সেই কাবিনের টাকা এবং এটি স্ত্রীর জীবদ্দশায় অতি সহসা পরিশোধ করতে হয়। এটা শুনে সে যেন আসমান থেকে পড়ল! এই ধরনের আজীব কথা সে কোনদিন কারো কাছে শুনেনি। শুধু শুনেছে কাবিন নামক একটা কথা আছে, সেখানে টাকা সম্পর্কিত কিছু কথা থাকে। স্বামী আনুষ্ঠানিক ভাবে সে টাকাটা মাফ চাইলে, তাকে মাফ করে দিতে হয়। নতুবা স্ত্রীর অকল্যাণ হয় এবং পরিণামে জাহান্নামে যাবে।
যাই হোক, তাকে এ সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেছি এবং টাকাটা তার হাতে তুলে দিয়ে বলেছি, এই টাকা তোমার, এটা পুরো খরচ করার অধিকারও তোমার। তুমি যা ইচ্ছে তা করতে পার। ইহ-জনমে আমি তোমাকে কোনদিন প্রশ্ন করব না যে, এই টাকাটা দিয়ে তুমি করেছ? কাকে দিয়েছ? কি কিনেছ? কোনটাই না।
এতে সে যথেষ্ট পুলকিত হল। মনে হল প্রবল আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা তাকে মজবুত করেছে। কিছু একটা করতে হবে, এই চিন্তায় তার আমূল পরিবর্তন আসে। এখন তো তার হাতে টাকা এসেছে, স্বাধীনভাবে ব্যবহার করার সুযোগ এসেছে। তাছাড়া এই সুযোগ জীবনে একবারই পাওয়া যায়। সুতরাং ভুল করলে পস্তানোর সুযোগ নাই বরং আছে ব্যর্থতা। তাই টাকাটা কিভাবে সদ্ব্যবহার করা যায়, সেটা নিয়ে দীর্ঘদিনের ছুলছেরা বিশ্লেষণের পরে কম ভাড়ায়, শহরে একটি লেডিস টেইলারিং ও প্রশিক্ষণ সেন্টার খুলে।
শুধুমাত্র মহিলারাই এখানে আসত। অধিকন্তু আগ্রহী মহিলাদের নাম মাত্র ফি’তে হাতে-কলমে কাটিং প্রশিক্ষণ দিত। পরে সেই প্রতিষ্ঠানকে আরেকটু কলেরব বাড়িয়ে প্রফেশনাল সেলাই মেশিন ও এমব্রয়ডারি মেশিন চালানোর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গরীব মহিলারা কাজের আশায় শহরে আসত। তারা এই প্রতিষ্ঠান থেকে মেশিন চালনা শিখেই ই,পি,জেড গার্মেন্টস ফ্যক্টরীগুলোতে দক্ষ কর্মী হিসেবে ভাল বেতনের চাকুরী জুটিয়ে নিত। তাদের কেউ চাকুরী হবার পর প্রশিক্ষণের টাকাটা পরিশোধ করত। যদিও এই কাজকে বাঁকা চোখে দেখার মত মানুষের অভাবও ছিলনা। আবার এনজিও কর্মীরাও বারে বারে হানা দিয়ে প্রলোভন দেখাত এই বলে যে, “আপনার এই প্রতিষ্ঠান আমাদের সাহায্য সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় হয়েছে এ ধরণের একটি স্বীকৃতি দিলে, আমরা মোটা দাগে আপনাকে অনুদান দিব।”
আমার শাশুড়ি ছিল উদ্যমী, কর্মঠ ও কৌতূহলী মানুষ। কাজের প্রতি তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান ও আগ্রহী। ফলে তিনি নিজ প্রচেষ্টায় সেলাই, এমব্রয়ডারি এবং নিটিং মেশিন চালনা শিখেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করতেন। পরবর্তীতে তাঁর হাতেই এই প্রতিষ্ঠানটি তুলে দেওয়া হয়। তিনিও বয়সের ভারে ন্যূজ, তাই সেটি আর বেশীদিন করতে পারেন নি। ম্যাডাম হিসেব করে দেখেছেন যে, ততদিনে সাত শতাধিক অদক্ষ মহিলাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতকে কাজের উপযোগী বানিয়েছেন। সাথে সাথে তার কাবিনের টাকার বরকত ও বৃদ্ধি করতেও সক্ষম হয়েছেন। মহিলা হিসেবে সাহস ও অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন সমুদয় অর্থ তারই ছিল, টাকা ব্যবহারের এই স্বাধীনতার কারণেই। বাস্তববাদী কিছু মহিলারা টাকা ব্যবহারের স্বাধীনতা পেলে সংসারের কত উপকার করতে পারে, সেটা আমি আমার মা, চাচী-জেঠিদের দেখেছি। নিজ নিজ ক্ষেত্র ও পরিসরে তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক আয় করতে পারেন।
যাক, দোকানের কাহিনী বলা উদ্দেশ্য নয়। তিনি ভাবতেন, তার অর্জিত টাকা দিয়ে আমাকে এমন একটি উপহার দিবেন। যেটা পেলে সত্যিই আমি খুশী হব এবং চিরদিন মনে রাখার মত হবে। একবার ভাবেন ঘড়ি দিবেন, আরেকবার ভাবেন মোবাইল দিবেন, পরের বারে ভাবে কোর্ট-প্যান্ট বানিয়ে দিবেন। শেষ-মেষ ভাবলেন, কাবিনের টাকাটা লাভ-শুদ্ধ আমার হাতে তুলে দিবেন। ওনার দীর্ঘদিনের এই ভাবা-ভাবিকে আমি খুবই গুরুত্বের সহিত উপভোগ করতে থাকি এবং কৌশলে পাশ কাটাতে থাকি।
অতঃপর আমার জন্মদিনে একটি অপ্রত্যাশিত উপহার পাই। যেটার কথা একটু আগেও ভাবতে পারিনি। যে জিনিষটা আমার খুবই প্রয়োজন আবার একেবারেই প্রয়োজন নয়। কেননা সেটার সাথে জড়িয়ে ছিল, শখের একটা বিষয়। অপ্রত্যাশিত ভাবে উপহারটা পেয়ে আমি যথেষ্ট আবেগ-ঘন হয়েছিলাম, এই কারণে যে, সে দীর্ঘদিন আমার রুচি-আগ্রহকে পর্যবেক্ষণ করেছে। আন্তরিকতার সহিত সেটার গভীরতা মাপার চেষ্টা করেছে এবং সে ব্যাপারে কিছুটা লেখাপড়াও করেছে। অবশেষে গোপনেই উপহারটি সংগ্রহ করে আমার হাতে তুলে দিয়েছে। উপহারটি গ্রহণ করাতে না বলতে পারিনি; কেননা মনে মনে এ ধরনের একটি জিনিষের কথা চিন্তা করতাম। কাবিনের টাকায় ব্যবসা করা লাভের অর্থ দিয়ে সে জিনিষটি আমাকে উপহার দিয়েছিল সেটি ছিল একটি ক্যামরার লেন্স!
ফটো তোলা আমার পেশা নয়, শখ! মানুষের ছবি নয়, প্রকৃতির ছবি তুলি। ছবি কোথাও প্রকাশ করিনা, নিজের তোলা ছবি নিজে দেখি, এটাতে আমি আনন্দ পাই। ছবি নিয়ে যত পড়েছি সম্ভবত ফটোগ্রাফির ছাত্ররা এত পড়েনা। এ জাতীয় অনুৎপাদনশীল ও অ-লাভ যোগ্য কাজের জন্য একটি জুম লেন্সের অভাব দীর্ঘদিন ধরেই অনুভব করছিলাম। কিনতে গেলে মনে হয় অপচয় করছি, না কিনলে শপিং মলের ক্যামরা সেকশনে ল্যান্স দেখার বাসনাটি থেমেও থাকেনা। বাজারে বহু ধরনের ল্যান্স আছে, কোনটা কি কাজের, কোন কোম্পানির প্রডাক্টের সাথে কোনটা খাপ খাবে, সেটা একমাত্র প্রফেশনাল ব্যক্তিরাই জানেন। আমি কোন ল্যান্স ঘুরিয়ে দেখি, কোনটা বেশী দেখি আমার এসব খাসিয়ত অবলোকন করেই ম্যাডাম আমার জন্য একটি দামী ল্যান্সের অর্ডার দিয়েছিলেন। সে জন্যই আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম। অন্যদিকে গিন্নীও খুশী হয়েছিলেন, উপহারটি আমার ভাল লাগার কারণে। তার সবচেয়ে বড় খুশীটি ছিল তার অর্জন করা টাকা দিয়ে স্বামীর মনের মত একটি উপহার দিতে পেরেছে।
আমাদের দেশে কাবিনের টাকার পরিমাণ বাড়ানো হয় সামাজিক স্ট্যাটাস হিসেবে। ইসলাম ধর্মের এই মহৎ উপকারী সুযোগটাকে হেয় ও হাস্য-পদ করে ছেড়েছে সমাজের দোহাই দিয়ে। অধিকন্তু এটা ফরজ কাজ, এখানে হীনমন্যতা, লোভ, চালাকি কিংবা বাহাদূরী দেখাবার সুযোগ নেই। আদুরে, অকর্মা, অলস কন্যাকে বেশী কাবিনের টাকার যাঁতাকলে বরকে পিষ্ট করা হয়। স্বামীকে কাবু করা কিংবা ভবকালে কন্যাকে তালাক দেবার সাহস যাতে স্বামী দেখাতে না পারে সে লক্ষ্যেই কাবিনের টাকার পরিমাণ টা বাড়ানো হয়। স্ত্রীর কুমারীত্ব ও যৌবন উপভোগ করার জন্য কাবিন, এই টাকাটা সহনীয় মাত্রায় বিবাহের কালে নগদ পরিশোধ করতে হয়। বাকী রাখারও সুযোগ আছে কিন্তু এই বাকির হিসেব বৃদ্ধা বয়সে মাপ চাওয়ার জন্য নয়। বরপক্ষকে মুসিবতে ফেলে, অতিমাত্রার কাবিন ধরে পরিণতিতে টাকা আদায় না করে, তলে তলে স্ত্রীকে কাতুকুতু দিয়ে মাপ চেয়ে নেবার নিয়ত মোটেও ইমানদারের কাজ হতে পারে না।
অন্যদিকে বহু স্বামীর ইচ্ছা কাবীনের টাকাটা স্ত্রীকে দিয়ে দিবেন কিন্তু পরিমাণ অসাধ্য হবার কারণে আগ বাড়াতে পারেনা। সে যখন দেখতে পায় কিস্তিতে পরিশোধ করতে গেলেও আটার বছর লাগবে, তখন সে আস্তা হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে দেশে এটাই ঘটছে। না স্বামী টাকাটা দিতে পারছে, না স্ত্রী টাকাটা ব্যবহার করতে পারছে। যদি টাকার পরিমাণ কম হত, মোটামুটি সহনীয় ও সহজসাধ্য হত, তাহলে স্বামীরা টাকাটা পরিশোধ করতে পারত এবং স্ত্রীও সন্তোষ মনে তা ব্যবহার করার সুযোগ পেত। ফাইনালি এই টাকাটা সংসারের সুখের কারণ হত, স্ত্রীও নিজের ইচ্ছেমত তার চাহিদা পূরণ করতে পারত। চৌকশ মহিলারা এক টাকাকে দু’টাকা করার চেষ্টা করত। কিন্তু কাবিনের এই পরিমাণকে বাড়িয়ে, ফুলিয়ে, ফাঁপিয়ে এত মোটা করা হয় পরিণতিতে কারো পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। সংসারও উপকৃত হয়না। ধর্মের এই নিয়মের মধ্য নিজেদের ব্যক্তি ইজ্জত ঢুকিয়ে ব্যাপারটিকে কদাচিৎ হালকা করা হয়। এই বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করার অপরাধে হাশরের ময়দানে বর-কনে, তাদের পিতা-মাতা, উকিল-অভিভাবক, সাক্ষী সবাই ফেঁসে যাবে। তাই ধর্মীয় বিধান ধর্মের নির্দেশনার আলোকেই চলতে দেয়া উচিত। সেটাতে সামাজিক স্ট্যাটাস ঢুকালে বিপর্যয় অনিবার্য।


Discussion about this post