গান মানুষের চিত্তের খোরাক দেয়। একটা বয়সে গানের সুর খুব ভাল লাগে। গান মানুষকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। কখনও গান মানুষের বোধশক্তিকে দুর্বল করে। গান মানুষকে অলস করে তুলে। অযাচিত কাল্পনিকতায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। তারপরও মানুষ গান গায় এই কারণে যে, উপস্থিত প্রশংসা ও মুহুর্মুহু করতালি সংগ্রহ করার সেরা মাধ্যম গানের উপরে কোনটাই নাই। কথা হল যারা গান গায় তারা কি খাবে?
পৃথিবীতে যতদিন কথা বলা নিষেধ না হবে, ততদিন গান গাওয়াও নিষেধ হবে না। কোরআন হাদিসের পাতা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও গানের উপর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত কোন আয়াত পাওয়া যাবে না। মানুষ সৃষ্টির সেরা, তার সময়ের মূল্য অনেক অনেক বেশী। সে কারণে মানুষকে ফালতু সময় নষ্ট করা, হাসিঠাট্টা-গল্পগুজব করে সময়ের অপচয়, রঙ্গমঞ্চ বসিয়ে আনন্দ বিনোদন করা, ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আর এসকল অনুষ্ঠাননের অন্যতম একটি ইভেন্ট হল গান করা।
যারা গান করে জীবন চালায়, তারা সময়ে খুব আলোচিত হলেও জীবনের একটা সময়ে ব্যক্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হয়। এটা পেশা হতে পারে না, বড়জোর আনন্দ বিনোদনের কারণ হতে পারে। সে কারণে দেখা যায় ইসলামী মাহফিল গুলোতে গানের উৎসব থাকে। অনেক গায়কের গান তুমুল আলোচিত হয়, সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। কিন্তু গান গাওয়াটাকে যারা পেশা হিসেবে নিয়েছে, তাদের শেষ জীবন খুব সুখকর হয়েছে, এমন নজীর খুব কম। তাদের বেশীর ভাগই অন্যের কাছে সাহায্যের জন্যে হাত পাততে বাধ্য হতে হয়েছে। ইসলাম মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গিটাকে অপছন্দ করে। চলুন দেখে নেই গানকে পেশা হিসেবে নিলে সমস্যা কোথায়?
গানের পেশায় আর্থিক অনিশ্চয়তা:
গান গাওয়া থেকে আয় প্রায়শই অনিয়মিত হয়। কোনো মাসে অনেকগুলো শো বা চুক্তি থাকে, আবার পরের কয়েক মাসে কোনো কাজ নাই। ফলে, একটি নির্দিষ্ট বেতন, পেনশন বা স্বাস্থ্য সুবিধার মতো আর্থিক নিরাপত্তা থাকে না, যা অন্য কোনো পেশায় সাধারণত পাওয়া যায়।
গানের পেশায় অত্যধিক প্রতিযোগিতা:
সঙ্গীতের জগতে প্রতিযোগিতা খুবই তীব্র। হাজার হাজার মানুষ পেশাদার শিল্পী হতে চায়, কিন্তু সফলতার শীর্ষে পৌঁছাতে পারে খুব অল্প সংখ্যক। এখানে কেবল ভালো গায়ক হলেই চলে না, নিজের প্রতিভাকে আলাদাভাবে তুলে ধরা এবং নেটওয়ার্কিং-এর দক্ষতারও দরকার হয়।
গানের পেশায় মানসিক চাপ ও হতাশা:
সফলতার জন্য অবিরাম চেষ্টা এবং জনগণের সমালোচনা একজন শিল্পীর উপর বিরাট চাপ তৈরি করে। একটি গান হিট না হলে বা প্রত্যাশিত সাড়া না পেলে হতাশা আসে। খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলার ভয় সবসময় কাজ করে।
গানের পেশায় ক্যারিয়ারের স্থায়িত্বের অভাব:
অন্য পেশায় সাধারণত অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে আয় ও সম্মান বাড়ে, কিন্তু গানের জগতে জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। নতুন ট্রেন্ট বা নতুন শিল্পীর আগমনে একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীও দ্রুত প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে।
গানের পেশায় শারীরিক ধকল:
পেশাদার শিল্পীদের প্রায়ই অনিয়মিত জীবনযাপন করে। রাত জেগে রেকর্ডিং, কনসার্টের জন্য দূর-দূরান্তে ভ্রমণ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, কণ্ঠস্বরের স্থায়িত্ব রক্ষায় অব্যাহত প্রচেষ্টা ধরে রাখতে গিয়ে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
গানের পেশায় পারিবারিক বন্ধনে ফাটল:
পরিবারকে সময় দিতে পারে না। স্ত্রী-সন্তান মমত্ব থেকে বঞ্চিত হয়। কৃত্রিম প্রশংসাকারী বাড়ে, সুনামের ফলে, নতুন নায়ক-নায়িকা জুটে। পরিবারের বদলে তাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। সংসারের সুখ-শান্তি নষ্ট হয়।
সুতরাং গান কখনও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষের পেশা হতে পারে না। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিতার চেয়ে গান লিখেছেন অনেক অনেক বেশী। কিন্তু তাকে গায়ক নজরুল বলা হয়না বলা হয়, কবি নজরুল, সাহিত্যিক নজরুল। একই বিষয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা এটি এমন এক ঠুনকো ও অনির্ভরযোগ্য পেশা যার প্রতি পদক্ষেপে থাকে অনিশ্চয়তা। জাগো নিউজের একটি আর্টিক্যাল এসেছে, “জামায়াত ক্ষমতায় এলে গানের মানুষ কী করে খাবে, প্রশ্ন রাজীবের” এই প্রশ্নের আলোকে আজকের এই প্রবন্ধের অবতারণা।