পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। কথাটি সর্বাংশে সত্য হলেও কদাচিৎ পরিশ্রম পণ্ডশ্রমে পরিণত হয়। পরিশ্রম যখন পণ্ডশ্রমে পরিণত হয় তখন মানবজীবনে আসে রাজ্যের হতাশা। তৈরি হয় জীবনের প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা। সে ধরনের একটি উদাহরণ হল এই জা’লান বনী বু-আলীর অভিজ্ঞতা। এটা ওমানের একটি প্রত্যন্ত এলাকার নাম, আমাদের দেশের উপজেলা সদরের মানের কাজ কর্ম জা’লানে। রাজধানী মাসকট থেকে প্রায় ৫ শত মাইল দূরে এর অবস্থান। আড়াই শত মাইল মরুভূমি পাড়ি দিয়ে জা’লান পৌঁছতে হয়। যখনকার কথা বলছি (১৯৯৩ সাল) তখন পথে কোন দোকান পাঠ গড়ে উঠেনি। কিছু বাংলাদেশী নিজেরা দোকান দিয়ে, নিজেদের কেনা জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করে কয়েকটি মুদির দোকান ও রেস্টুরেন্ট চালায়। পথে পথে উট ও গাধা ব্যতীত আর কিছু চোখে পড়েনা। বাংলাদেশ থেকে যুবকেরা নিজের পিতার গাঁটের টাকা খরচ করে, ভাগ্যকে জয় করার জন্য ওমানে কাজের সন্ধানে হাজির হয়। দেশে থাকতে যে সমস্ত যুবক কায়িক পরিশ্রম করতে অভ্যস্ত ছিল, তারা যে কোন পরিবেশে কষ্ট করে মানিয়ে নিতে পারত। যারা বাপের ঘরে খেয়েছে, জীবনে কখনও কাঁথা-বালিশ পর্যন্ত উল্টায় নাই, তাদের হয় যত দুর্দশা! তারা দেশে থাকতে পারত পক্ষে কিছু করতে ইচ্ছুক না হলেও, বিদেশের কঠিন জীবনকে ঠিকই আলিঙ্গন করতে বাধ্য হয়। আর আফসোস করে হায়! দেশে থাকতে যদি বর্তমানের শ্রমের সামান্য একটা অংশ পরিশ্রম করতাম তাহলে বিদেশের চেয়ে দেশেই প্রচুর অর্থকড়ি কামাতে পারতাম! বাড়ী ঘর বন্ধক রেখে, ব্যাংকের টাকা কর্জ করে, ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করার জন্য বিদেশে আসার পর, ফিরে যাবার পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ হয়ে যায়।
কোম্পানির কাজে আমাকে কখনও দেশটির খুবই প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে হয়েছে। কোথায় থাকব, কোথায় রাত হবে, থাকার আদৌ কোন সুবিধা আছে কিনা এসব ভাবনার সুযোগ ছিল না। কাজ এসেছে, সেখানে পৌঁছে যেতে হবে। সেখানকার পরিবেশ, পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাত্রে কোথায় থাকতে হবে কিংবা কিভাবে রাত কাটাতে হবে। দেশটির যেখানেই গিয়েছি সেখানে বাংলাদেশীদের অবস্থান লক্ষ্য করেছি। অজানা, অচেনা মরু প্রান্তরের কিনারায় রাত হয়েছে তো কি হয়েছে? কাউকে প্রশ্ন করলে এখানে কোন বাংলাদেশী আছে? উত্তর আসত হ্যাঁ আছে, ওই জঙ্গলের পাশে ঘুপড়ি বানিয়ে কয়েকজন বাংলাদেশী থাকে; গিয়ে দেখতে পারেন। সোজা সেখানে গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে বললে, ভাই আজকের রাতে আপনাদের মেহমান হতে চাই, আমার এই সমস্যা। সাথে সাথেই সবাই হুড়মুড় করে পড়বে মেহমান বানানোর জন্য। তারাই বলতে থাকবে অবশ্যই আমাদের সাথে থাকবেন। বহুদিন পরে দেশী ভাই পেয়েছি, পুরো রাত গল্প করব, দেশের কথা জানব, প্রয়োজনে কালকে কাজেই যাবনা। তারা তাদের সাধ্য মত আপ্যায়ন করবেই অধিকন্তু বিদায় বেলায় আবদার জানাত, আবার যদি আসেন তাহলে যেন তাদের কাছেই থাকি। এই আতিথেয়তা আমি সব জায়গায় সমান ভাবে পেয়েছি। এখানে কোন চট্টগ্রাম-নোয়াখালী-সিলেটি কিংবা আওয়ামীলীগ-বি,এন,পি নাই। দেশী হলেই তাকে সঙ্গ দিতে মানুষ দৌড়ে আসত।
১৯ই রমজান বেলা ১১ টার দিকে মসজিদের সামনে মুয়াজ্জিনের অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছি। এই মুয়াজ্জিনের কাছে ইতিপূর্বে আমি দুবার মেহমান হয়েছিলাম। আমার পড়া পত্রিকাগুলোর পুরনো সংখ্যা গুলো যাতে, দ্বিতীয়বার আসার সময় যাতে নিয়ে আসি, সেজন্য তিনি আবদার করেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য আমার পঠিত দৈনিক পত্রিকাগুলো এভাবে বিভিন্ন প্রদেশে, নানাভাবে পাঠাতাম, ফলে একবছর আগের পত্রিকার পাঠক দ্বিতীয় বছরও পাওয়া যেত। কেননা সেসময় দেশের সংবাদ সর্বদা পাওয়া যেত না। এমন সময় এক যুবককে দেখলাম উৎসুক দৃষ্টিতে আমার বরাবর আসতে। সেই জিজ্ঞাসা করল আপনাকে চিনি মনে হয়? আমি পরিচয় দিতেই সে সালাম করল। স্যার, আমি আপনার ছাত্র মামুনের চাচাত ভাই ‘জাহেদ’। নামটি সহসা মনে পড়লেও তার চেহারা মিলাতে পারলাম না, বহু বছর আগে দেখেছি, যখন সে মাত্র হাই স্কুলে উঠেছে। এখন এই ব্যক্তির মুখে দাঁড়ি, মোচগুলো বাঁকা হয়ে মুখের ভিতরে ঢুকতে চায়, মাথায় পাগড়ি, বিদঘুটে চেহারা! সে খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরল। তার শরীরের ভয়ঙ্কর এক বিদঘুটে দুর্গন্ধ আমার সমুদয় লোমকূপ রি রি করে খাড়া হয়ে গেল। মনে হল এখুনি এক বালতি বমি হবে। পায়ের মোজার বিশ্রী গন্ধের মত কটু গন্ধ তার সারা শরীর থেকেই বের হচ্ছে। ভাবলাম পাগল নাকি? যাক, কোনমতে আর দুর্গন্ধময় আন্তরিক আলিঙ্গন থেকে নিজেকে উদ্ধার করলাম। অতঃপর খোলা বাতাসে একটি ফ্রেশ নিঃশ্বাস নেবার সুযোগ নিলাম।
জাহেদ প্রশ্ন করল স্যার! এখানে কি একটু গোসল করার যায়গা হবে? আমি বিগত ২০ দিন ধরে গোসল করতে পারিনি, কাপড় চোপড় ময়লায় একাকার! এমনকি ভাল করে কুলিও সাড়তে পারিনি, এখন আমার নিজের মুখের বিশ্রী গন্ধে আমিই যেন বেহুশ হয়ে পড়ব। কাপড় ধোয়া, গোসল করা ও আনুষঙ্গিক কিছু কাজের জন্য আমার হাতে সর্বোচ্চ দু’ঘণ্টা সময় আছে; এই বিপদে আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করবেন, স্যার? চিন্তা করলাম আমি নিজেও এ এলাকায় আগন্তুক, তাছাড়া সে আমার ব্যাপারে কোন প্রশ্ন না করে, তার কথাই বলে চলেছে; হয়ত ভেবেছে আমি এখানেই থাকি। চিন্তা করলাম তাকে কিভাবে সুযোগ করে দেয়া যায়। মাথায় আসল মুয়াজ্জিন সাহেবকে ধরি, তিনি হয়ত কিছু একটা করতে পারবেন। মুয়াজ্জিন সাহেবকে পেয়েও গেলাম তবে তার কাছে গোসল করার সুযোগ হলনা। কেননা ইতিমধ্যে মসজিদে মুসল্লি আসা শুরু হয়েছে। মুয়াজ্জিন সাহেবকে জোরাজুরি করাতে তিনি কিভাবে একটি বন্ধ বাসার চাবি এনে আমাকে দিয়ে বললেন, ২০ মিনিটের মধ্যেই কাজ শেষ করে বের হতে হবে। বাড়ীর মালিক আসবেন তিনিও গোসল করবেন, জোহরের নামাজ পড়বেন। যাক জাহেদ খুব খুশী হল এবং সে তার কথা রাখল। ২০ মিনিটের মধ্যে গোসল করল, কাপড়গুলো পানিতে ভিজিয়ে নিল।
প্রশ্ন করলাম জাহেদ তোমার এ অবস্থা কেন? সে বলা শুরু করল, তার মুখেই শুনুন সে ব্যাখা। স্যার, আল্লার প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা জানাই নি বলেই আমার এই পরিণাম। আমি মাদ্রাসায় সামান্য পড়েছিলাম, পরে লেখাপড়া বন্ধ করে ওমানে চলে আসি। রাজধানীতে দর্জি হিসেবে এতদিন কাজ করছিলাম। টাকার অভাবে বোনের বিয়েটি বারবার পিছনে যাচ্ছিল। কারো কাছে কর্জ পাইনি, তাছাড়া আমার সামান্য বেতন দিয়ে বোনের বিয়ে দেওয়া দুঃসাধ্য ছিল। বারবার বিয়ে পিছানোর কারণে বোনের হবু বরকে হারিয়ে ফেলার উপক্রম হচ্ছিল। ভাবছিলাম কিভাবে সামান্য আয় বাড়ানো যায়। একদিন দোকানে এক অদ্ভুত চেহারার বেদুইন এসে হাজির, সারা শরীরে দুর্গন্ধ। আমরা জানি বেদুইনেরা গোসল করার সুযোগ পায়না তাই শরীরে দুর্গন্ধ থাকে, তাই বলে কাষ্টমারকে আমরা ফেরত দেই না। বেদুইন বলল, তোমাদের কাছে রমজান মাসের তারাবীহ পড়ানোর মত কোন হুজুর থাকলে আমাকে বল; আমি ভাল পয়সা দেব। কৌতূহল হয়ে প্রশ্ন করলাম কত দিবেন? সে আমার বেতন জানতে চাইল, আমি বেতনের পরিমাণ বললাম। তিনি বললেন তোমাকে তোমার বেতনের ছয়গুণ বেশী দেওয়া হবে। আমি সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম, ভাবলাম এবার বোনটি শ্বশুর বাড়ীতে যেতে পারবে। সামনে রমজান মাস, দিন দিন দর্জিদের কাজ বাড়ছে, আমার কথায় মালিকের মাথায় যেন আসমান ভেঙ্গে পড়ল। আমিও অগ্র পশ্চাৎ না ভেবে আমার কথার উপর দৃঢ় রইলাম এবং দোকানদারের অনুরোধ রাখলাম না। বোন আমার, তাই তার বিয়ের জন্য দুঃচিন্তা ও আমার, আমার সিদ্ধান্তই সঠিক ভাবলাম।
রোজার আগের দিন আমাকে নেওয়ার জন্য বেদুইন গাড়ী নিয়ে আসল। সকাল থেকে দুপুর অবধি ৫০০ মাইল গাড়ি চালিয়ে বেদুইন ও আমি এই মসজিদে এসে জোহরের নামাজ পড়ি। দুপুরের খানা খেয়ে আবারো গাড়ী চালানো শুরু হলো। আগের ৫০০ শত মাইল ছিল পাকা রাস্তা, এখান থেকে যাত্রাটি পরিপূর্ণ কাঁচা ও বালি। গাড়ীর ভয়ঙ্কর ঝাঁকুনি খেতে খেতে প্রায় ২০০ শত মাইল মরুভূমির উপর দিয়ে পাড়ি দিলাম। কোন রাস্তা নাই, উত্তর দক্ষিণের হদিস নাই, জোহর-আছর সময় বুঝা যায় না। সূর্যটা আকাশে দেখা যাচ্ছিল বটে, বুঝতে পারছিনা এটার অবস্থান কোন আকাশে? অসম্ভব খিদে, তার উপর আছে ভয়ঙ্কর গরম। এভাবে আমাকে একপ্রকারের আলু ভর্তা বানিয়ে সন্ধ্যার কিছু আগে একটি ঝুপড়ির পাশে এসে গাড়ী দাঁড়াল। বেদুইন বলল এবার নামতে পার, এটাই আমার ঘর। আশা করলাম ভিতর থেকে কেউ হয়ত পানি নিয়ে বের হবে, কিন্তু কারো সাড়া শব্দ নাই। ঘর বলতে খেজুর গাছের ডাল খাড়া করে চারদিকে চারটি বেড়া বানানো, উপরেও এভাবে দুটি বেড়া দিয়ে ছাদ দেওয়া হয়েছে। বেড়ার ফাঁক এত বড় যে, হাত ঢুকানো কোন ব্যাপার তো নয়ই বরং অনায়াসে পুরো মাথাটি ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। ঘরের ভিতরের সমুদয় সম্পদ বাহির থেকেই দেখা যাচ্ছে। ভিতরে কাঁথার মত কিছু একটার বান্ডিল, তেলের ড্রাম, খড়, খেজুরের বস্তা, পানির মটকা ইত্যাদি। চারিদিকে যতটুকু চোখ যায় কোন জনবসতি কিংবা এর মত আরেকটি ঝুপড়ি ঘর চোখে পড়ল না।
তাকে প্রশ্ন করলাম মসজিদ কই? উত্তর দিল, ঐ দিকে সামান্য গেলেই খোলা মরুভূমিতে নামাজ হবে, পানি আছে, সেখানে সবাই আসবে। তোমার পরিবার কই? উত্তর দিল তারা ছাগল চড়াতে গেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে, ইচ্ছা করলে তুমিও কাল থেকে আমার পরিবারের সাথে ছাগল চড়াতে যেতে পারবে। ভাবলাম ব্যাটা বলে কি! সিন্দাবাদের দৈত্যের কবলে পড়লাম নাকি? তারাবীহ নামাজের কথা বলে ছাগল চড়াতে লাগিয়ে দিলে করব কি, তাছাড়া এখান থেকে কখনও-কোনদিন পালানোও সম্ভব নয়। তখন মনে খটকা লাগল কোথায় যেন ভুল করেছি? ভাবলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখি নামাজ পড়ায় কিনা? আর আল্লাহর সাহায্য চাইতে থাকলাম।
কিছুক্ষণ পরে দেখি প্রচুর ছাগলের এক পাল নিয়ে এক বুড়ি এদিকে আসছে। বুড়ি আগে আগে হাঁটছে, তার পিছু পিছু ছাগলগুলো হাঁটছে। কোন বেত্রাঘাত নাই, ধমক নাই, সকল ছাগল বুড়িকে একটি বাহিনী প্রধানের মতো বানিয়ে পিছু চলছে! আমি কিছু বুঝার আগেই ছাগলের দল আমার পলিথিনের প্যাকেট খাওয়া শুরু করল, একটা ছাগল আমার স্যান্ডেল খাওয়া শুরু করল! স্যান্ডেল খানা উদ্ধার করতে গিয়ে মাথার টুপি পড়ে গেল, সাথে সাথেই অন্য ছাগল টুপিটি ছোঁ-মেরে নিয়ে নিল! বুড়ো-বুড়ি উল্টো আমার বে-আকলির জন্য তিরস্কার করল। মরুভূমিতে থাকতে হবে বলে বেশ কিছু বন, কেক, বিস্কুট, চিড়া, মিঠা, কোক নিয়েছিলাম; ভাগ্যিস সেগুলো রক্ষা পায়। মরুভূমির ছাগল প্ল্যাস্টিক, পাতলা টিন, কার্টুন, গাছের ছাল, পচা কাপড় সবই খেতে চেষ্টা করে। ছাগলগুলোকে খেজুর গাছের খুঁটি দিয়ে ঘেরা একটি জায়গায় আবদ্ধ করা হলো। দু-একটি ছাগল থেকে বুড়ি দুধ সংগ্রহ করল, মাঝারী আকৃতির একটি ছাগল আমার সহযোগিতায় জবাই করা হলো। আমাকে বলা হলো পরিষ্কার করতে। ইতিমধ্যে বুড়ি পানি আনলেন চামড়ার মশকে ভরে। বহু কষ্টে কোন মতে এক ঢোক পানি পান করলাম। বিস্বাদ, প্রায় লবণাক্ত, কষা আকৃতির এই পানি খাওয়ার উপযোগী তো নয়ই; একদিন মাথায় দিয়েছিলাম, ফলে চুলে এমন জট লাগে যা আজো খুলে নাই, মনে হয় মাথায় সুইংগাম মাখিয়েছি!
পরিষ্কার আকাশে রমজানের চাঁদ দেখা গেল। পানিতে না ধুয়েই ছাগলের গোশত আগুনে পোড়ানো হল। ভয়ঙ্কর খিদে পাওয়ার পরও বুঝতে পারছিনা কিভাবে এ গোশত খাব, তবে দারুণ একটা সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। বুড়ির গায়ের চামড়া কিসমিসের মত হলেও অসম্ভব শক্তিশালী দেহ; সব কাজ সে একাই করল। আমাকে উৎসাহ দিল, রোগা-কঙ্কালসার বলে দুঃখ প্রকাশ করল। প্রশ্ন করলাম কোথায় থাকব? বুড়ি বলল আমার ঘরের বাহিরে, মেহমান খানায় তোমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। তার ঝুপড়ির ঠিক উল্টো দিকে খেজুরের কিছু শুকনো ডাল-পালা ঝুপড়ির সাথে হেলান দেওয়া; নিচে দুহাতের মত একটি জায়গা তৈরি হয়েছে, সেখানের মাটিতেই আমাকে মেহমান হয়ে থাকতে হবে! হুশিয়ার করে বলল রাত্রে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইবে, ফলে মুখ-হাত-শরীর যেন ঠাণ্ডা থেকে বাঁচিয়ে রাখি! সকালে বালি ঝড় শুরু হয়, অনেকক্ষণ চলতে থাকে, যাতে খানা, কাপড় চোপর সামলে রাখি! নতুবা বাতাসে নিয়ে যাবে অথবা বালির নিচে গায়েব হয়ে যাবে! বেলা বাড়লে লূ-হাওয়া বইতে শুরু করবে, তখন চোখ-মুখ যেন সামলে রাখি! নতুবা চামড়া পুড়ে যাবে এবং গায়ে ফোস্কা পড়বে! ফলে মরুভূমির কাঁটা মাছির আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে কষ্ট হবে! আমি আর ধৈর্য রাখতে পারলাম না, নিজেই চিৎকার দিয়ে বুড়িকে বকবক করতে নিষেধ করলাম। কারণ তার উপদেশ ও হুশিয়ারি বানীর প্রথমটি থেকে দ্বিতীয়টি কঠিন, তৃতীয়টি আরো জটিল, চতুর্থটি তারচেয়েও ভয়াবহ; আরো শুনতে গেলে আমি মারাই পড়ব! প্রশ্ন করলাম তোমরা আমাকে নামাজ পড়ানোর জন্য এনেছ, নামাজ কোথায় পড়া হবে? কাদের পড়াব? এখানে তোমরা দুজন বুড়ো-বুড়ি আর কিছু ছাগল ছাড়া কাউকে তো দেখছিনা!
বুড়ো আমার দুঃচিন্তার কথা মনে করে বললেন চল তারাবীর নামাজের সময় হয়েছে। আজকে তোমাকে একটু হেটে যেতে হবে, কালকে তোমার জন্য গাধার ব্যবস্থা হবে, তুমি গাধায় চড়ে বেড়াতে পারবে। আবছা অন্ধকারে ঢালু রাস্তায় প্রায় এক কিলোমিটার পথ চলার পর একটু আলোর দেখা পেলাম। সেখানে তিনটি গাড়ী ও পাঁচটি গাধা দাঁড়ানো আছে। গাড়ীর ব্যাটারি থেকে ভাল্ব জ্বালিয়ে আলোর ব্যবস্থা হয়েছে। মনে হল জায়গাটিতে ঘাস জন্মায়। বেদুইন বলল এখানেই বালির খোলা মাঠের উপরে আমরা প্রতিদিন তারাবীর নামাজ পড়ব। ওখানে একটি কুপ আছে, ওজু করে আস। পানি মুখে দিয়ে বুঝলাম এই কুপের পানিই সন্ধ্যাবেলায় মুখে দিয়েছিলাম। সবাই আমাকে সালাম জানাল, ‘মতোয়া’ (হুজুর) বলে সম্মান দেখাল। রাত্রির গাঢ় আঁধার ভেদ করে, বিজন, বিরান মরুভূমি থেকে জনা বিশেক মুসল্লি হাজির হল! ওজু শেষে দেখলাম তারা কোন একটা বিষয় নিয়ে যেন বলাবলি করছিল! আমার কেন জানি সন্দেহ লাগল! পরে আমার বেদুইন পেরেশান মুখে বলল, আরো একজন হুজুর পাওয়া গেছে। সে ভারতের কেরালার, আজ তোমাদের দুজনের মধ্যে ইন্টারভিয়্যূ হবে! তুমি অর্ধেক নামাজ পড়াবে সে অর্ধেক পড়াবে, যার পড়া ভাল হবে তাকেই রাখা হবে! কথাটা শুনে মাথায় যেন পাথর পড়ল। হায় কপাল! মরুভূমির জন মানবহীন এলাকাতেও কাজের জন্য ইন্টাভিয়্যূ দিতে হবে? তাও আবার চোখের শত্রু কেরালার মানুষের সাথে? যাক, বুদ্ধি করে সেই হুজুরকে আগে নামাজ পড়তে পাঠালাম, কেননা যে শেষে নামাজ পড়াবে, বেদুইনের কানে শুধু তার পড়াই বাজতে থাকবে। বুদ্ধিতে কাজ হল শেষ পর্যন্ত আমিই হুজুর হিসেবে বাছাই হলাম। নামাজ শেষে বেদুইনের সাথে আমিও তার ঝুপড়ি ঘরে ফিরে গেলাম।
বেদুইনের পূর্বের পরামর্শ মোতাবেক কম্বল, বালিশ সহ যথাসাধ্য গরম কাপড় ও দিনের জন্য আলাদা কাপড় এনেছিলাম। সবগুলো গায়ে চড়ানোর পরও ঠাণ্ডায় কাহিল হবার যোগাড়! ফজরের নামাজ নিজেই পড়লাম, পাউরুটি, কলা, কোক দিয়ে সেহেরী শেষ করলাম। বুড়ির দেওয়া পোড়া গোশত ছিল, ঘেন্নায় খেতে পারিনি। ফজরের নামাজ আমি একাই পড়লাম, তাছাড়া আমাকে আনা হয়েছে শুধু তারাবীহ পড়ানোর জন্য, অন্য নামাজের জন্য নয়। নামাজের পর তাপ একটু বাড়তে থাকায় আরাম বোধ হল, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নাই। কারো লাঠির মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে গেল; দেখি বুড়ি চিল্লাচ্ছে। ভয় পেয়ে উঠাতে বেঁচে গেছি, নতুবা অন্য ইতিহাস হত। হাওয়ায় বালি এসে আমার চোখের কুঠরি দুটো ভরে গেছে, নাক মুখ বাঁধা ছিল বলে নাকে ঢুকেনি, যদি সহসা চোখ মেলতাম সব বালিই চোখের ভিতর ঢুকে যেত। বুড়ি বলল এসময় টাতে এভাবে দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো বিপদজনক!
বুড়িকে প্রশ্ন করলাম টয়লেট কোথায়? সে উত্তর দিল ‘কুল্লু দুনিয়া হাম্মাম’ অর্থাৎ পুরো দুনিয়াটাই তো পায়খানার জায়গা! কোথাও গিয়ে বসে পড়, তবে বাড়ীর আশে পাশে নয়। নতুবা মলের গন্ধ এবং কাঁটা মাছি দুটোই বাড়িতে হাজির হবে! জীবনে খোলা জায়গায় পায়খানা করার অভ্যাস ছিলনা। তাই বুড়ির সরাসরি উত্তরে বিব্রত-বোধ করলাম। তাছাড়া এক কিলোমিটারের মধ্যে যেখানেই বসি না কেন বুড়ি আমাকে দেখবেই। হঠাৎ বুড়ি আমাকে দেখিয়ে বলল ঐ দেখ তোমার বাবা, (বেদুইন) পায়খানা করতে বসেছে, তুমিও গিয়ে তার সাথে বসে পড়! আশ্চর্য হলাম বেদুইনের লাজ-শরমের বালাই নাই! সেই পায়খানা করতে বসে উল্টো আমায় ডাকছে এক সাথে বসতে। বোনের বিয়ের জন্য টাকা কামাতে এসে অশিক্ষিত, মূর্খ বেদুইনের খপ্পরে পড়ে মনে হল একদিনের জীবন যেন এক বছরের সমান!
মাকে (বুড়ো-বুড়িকে মা-বাবা বলতে হয়) প্রশ্ন করলাম, তোমার ছেলে-মেয়ে নাই? বলল সব আছে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, বড় ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, চাকুরী করে, বিয়ে করেছে, নাতী-নাতনী আছে; বাকী দুটি স্কুলে পড়ে! ওমানের সুলতান ‘কাবুজ’ ছেলেমেয়েদের স্কুলে না পাঠালে শাস্তি দেয়, গাড়ীর তেল দেয়না, রাষ্ট্রের প্রাপ্ত সুবিধাদি দেয়না, উট-ছাগল বিক্রি করতে দেয়না। মরুভূমিতে পুলিশ এসে তাড়া করে। তাছাড়া ছেলেদের স্কুলে পাঠালে সরকার নগদ টাকা দেয়; সবজি ও ফল-মূল সস্তায় পাওয়া যায়। তাই মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়েছি, বুড়ির ভাষায় বড় ছেলেকে আগেই হুকুমাত (রাষ্ট্র) নিয়ে গেছে। ছোট গুলিকেও ধরে নিয়ে মাদ্রাসায় (স্কুলে) দিয়েছে। বড় ছেলেই এসব করেছে, হুকুমাত টাকা দেয়। আমাদেরকে শহরে চলে যেতে বলেছে, গেলে টাকা পয়সা দেবে। বলেই বুড়ি সরকারের এ অন্যায় বাড়াবাড়ির জন্য কান্না করল। সুলতানের এ জাতীয় অর্থহীন কাজের জন্য অভিশাপ দিল। আমি বললাম সুলতান এটাতো ভাল করেছে? বুড়ি প্রতিবাদ করল, ছেলেরা লেখাপড়া করলে তাতে আমার কি? আমার উট-ছাগল-গাধা, কে দেখবে? কাকে দিয়ে যাবো এই সম্পদ? ছেলেরা একবার শহরে গেলে এখানে থাকতে চায়না বলে আবারো কান্না জুড়ে দিল। ছেলের কারণে বেদুইন শহর চিনেছে, দুই-তিন সপ্তাহ পর পর ছেলেদের গিয়ে দেখে আসে। বেদুইন পত্নী নগর জীবনকে ঘৃণা করে বলে, কখনও শহর তো দূরের কথা, বাজারেও যায়নি; নাতীদেরও দেখতে যায়নি। এখানেই তার ভাল লাগে, শিক্ষিত ছেলের চাইতে অশিক্ষিত ছাগল তার কাছে অনেক প্রিয় ও বিশ্বস্ত বলে মনে হয়। আজ ১৯ শে রমজান, বেদুইন এখানে ছেলেদের দেখতে এসেছে, আমিও তার সাথে বাজার করতে এসেছি, কিছুক্ষণ পরেই সে রওয়ানা হবে, যার কারণে আমার কাছে সময় নাই। গত ২০ দিনের ঘাম পোশাকে শুকিয়েছে, আবার ঘেমেছি, আবার শুকিয়েছে, তাই আজ আমার এই দশা।
জাহেদ কে প্রশ্ন করলাম আবারো সেখানে ফিরে যাবে? তাছাড়া তারা তোমার টাকা না দিলে কি করবে? জাহেদ বলল, এই মানুষগুলো মিথ্যা বলেনা, ধোঁকা দেয়না, আধুনিক জীবন থেকে দূরে থাকলেও প্রতারক-প্রবঞ্চক নয়। আমার সাথে যে ওয়াদা করেছে তাতো দেবেই তাছাড়া আরো দ্বিগুণ বকশিশ দিবে বলেছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের খবর নাই, অথচ তারাবীহ না পড়লে তাদের নাকি রোজাই হবেনা! বেদুইনেরা আরব দেশের মানুষ হলেও, ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে এদের ন্যুনতম জ্ঞান নাই। তাই সরকার তাদের লোভ-লালসা দিয়ে হলেও শিক্ষিত করাতে চায়। তারপরও মরুচারীরা শিক্ষিত হতে চায় না। সরকারও নাছোড়বান্দা, তাই তাদের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করাতে পুলিশি অভিযান চলে। আগামী বছর সরকার মরুভূমিতেই স্কুল দেবে; ঘোষণার ফলে বেদুইনদের দুঃচিন্তার শেষ নাই। আমি এ কয়দিনে তাদের সাথে খাপ খাইয়েছি, এখন পোড়া গোশত খেতে পারি। এত কষ্টের মধ্যে থেকেও যদি বোনটিকে ভাল পাত্রে বিয়ে দিতে পারি; তাহলে বোনের সুখী পরিবার হবে; আমার কষ্টও সার্থক হবে। দোয়া করবেন স্যার, আসসালামু আলাইকুম। নিজে নিজে ভাবলাম, দেশে ভাই-বোন, পিতা-মাতা কোনদিন জানবে না অসহায় ভাইটি কত অসহ্য জ্বালাতন ভোগ করে, পরিবারের সুখের জন্য, তিল তিল করে; একটি একটি টাকা অর্জন করেছে!? বিদায় বৎস! ওয়ালাইকুম ছালাম।

Discussion about this post