দিল্লী পৃথিবীর অন্যতম শহরগুলোর মাঝে একটি। নতুন দিল্লী ভারতের রাজধানী। আয়তনের দিক দিয়ে দিল্লী ভারতের বৃহত্তম শহর, জন সংখ্যার দিক থেকে মোম্বাইয়ের পরের স্থান দিল্লী। বহু মুসলিম শাসকেরা দীর্ঘ বছর দিল্লীকে শাসন করেছেন। দিল্লীর যেখানেই যাওয়া হোক না কেন, অতীত কালের কোন ঐতিহ্য চোখে পড়বেই। ১২০৬ সালে দাশ বংশ দিয়ে দিল্লী শাসিত হয়ে পরবর্তীতে খিলজী রাজবংশ, তুঘলূগ রাজবংশ, মামলূক রাজবংশ, লোধী রাজবংশ সর্বশেষে মোগল রাজবংশ দিল্লী শাসন করেন। মাঝে মধ্যে কিছু দিনের জন্য অন্যরাও দিল্লী শাসনের সুযোগ পেয়েছে। মোগল সম্রাট শাহজাহান দিল্লীকে শাহজাহানাবাদ নাম দিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৬৪৯ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুইশত বছরের বেশী সময় মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল দিল্লী। ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুসলমানদের হাত থেকে ভারতের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন ফলে, মুসলমানদের কৃষ্টি ঐতিহ্য যেখানে ছিল, সেখান থেকে তারা দূরে থাকতে চেষ্টা করেছেন। তারা প্রথমে কলিকাতাকে রাজধানী করেন। পরে নিজেদের মত সাজিয়ে এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা বাদ দিয়ে ব্রিটিশ রাজ শাসক ১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ সালে নয়া দিল্লীকে রাজধানী ঘোষণা করেন। এখনও নয়া দিল্লী ভারতে রাজধানী।
ভারতে ভ্রমণের জন্য প্রথমে অবশ্য দিল্লীকে বাছাই করা হয়। ভারত প্রতি বছর কোটি কোটি রুপী পর্যটক থেকে আয় করে। দিল্লীর বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও অবস্থান সম্পর্কে আমি আগেই বিস্তারিত লিখা পড়া করে নিয়েছিলাম। তাই এসব স্থান ভাল করে দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখেছিলাম। সেজন্য বাংলাদেশ থেকে কোন ট্যুরের সাথে যোগ না দিয়ে একাকী দিল্লী গমন করি। দিল্লীর শহরের স্থায়ী অধিবাসী সুন্দর নগরের বাসিন্দা আমার কলিগ ও বন্ধু ‘মনিন্দর সিং’ বলে দিয়েছিলেন দিল্লী এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়া মাত্রই, লাগেজ থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কিত সকল ট্যাগ খুলে ফেলি। আমি এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেক ফায়দা পেয়েছিলাম। ২৫০ রুপীর হোটেল সিট ৬০ রুপী দিয়ে পাওয়া সহ প্রতি ক্ষেত্রে উপকারে এসেছিল। যথারীতি দিল্লী জামে মসজিদের ঠিক পিছনের একটি হোটেলে গিয়ে উঠে পড়ি। এলাকাটি পুরানা ঢাকার মত অথবা চট্টগ্রামে আন্দরকিল্লা, আছদ গঞ্জের মত। সেখান থেকেই আমি আমার মত করে দিল্লী ভ্রমণ শুরু করি, যার কয়েকটি স্মৃতি আজ শেয়ার করব।
লাল কেল্লা দর্শন:
দিল্লীর প্রধানতম আকর্ষণ লাল কেল্লা। লাল কেল্লা বা লাল দুর্গ সাম্রাট শাহজাহান ১৬৩৮ খৃ. শুরু করে দশ বছরে শেষ করেন। অপূর্ব সুন্দর, নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধরন দেখে যে কোন মানুষ তাজ্জব হয়ে চোখ কপালে তুলবে। লাল কেল্লার ভিতরে যেন আলাদা আরেকটি শহর। লাল কেল্লার তিনটি বিশাল ফটক রয়েছে, দেওয়াল গুলো খুবই উঁচু, দেওয়ালের শীর্ষ প্রশস্ত। চার জন মানুষ অনায়াসে দৌড়াতে পারবে। কেল্লার সীমানা প্রাচীরের বাহিরে রয়েছে বিশাল গর্ত বা পরিখা। তা যেমনি প্রশস্ত তেমনি গভীর। শত্রু লাফিয়ে পার হতে পারবে, নীচে নামলে আবার উপরে উঠতে পারবে না। কোন মাধ্যম নিয়ে একবার উপরে উঠলেও কারো পক্ষে সম্ভব হবেনা সেই প্রাচীর ডিঙ্গানো। গেইটের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই নিখুঁত। যতজন মানুষ দরজা ভাঙ্গতে আসুক না কেন তাদের মোকাবেলার জন্য দশ জন মানুষ যথেষ্ট! ভিতরে রয়েছে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যালয়, যেমন দিওয়ানী আম অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য দর্শন স্থল, দিওয়ানী খাস অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের নিয়ে বসার স্থান। দিওয়ানী আমে অনেক দুরে একজন ছোট্ট করে শব্দ করলেও শব্দটি স্পষ্ট সবাই শুনতে পায়। সম্রাট শাহজাহান লাল কেল্লার জন্য পৃথিবীরা বহু দেশ থেকে বিভিন্ন গাছ ও মাটি সংগ্রহ করেছিলেন। এখন ও প্রচুর বিরল প্রজাতির গাছে ভরপুর লাল কেল্লা। ঢুকার পথেই গাইড আছে, তাদের স্থানীয় মুদ্রা রুপি দিয়েই সাথে নিতে হয়, তারা প্রতিটি স্থান সুন্দর বিবরণে পর্যটক দের বুঝিয়ে দেন। আমি একাই দেখছি কেননা আমার সম্যক ধারণা আগে থেকেই ছিল, তাছাড়া ইংরেজিতে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানেই দেওয়া আছে।
কৌতূহল বশতঃ আমার পাশেই একদল পর্যটককে বুঝাচ্ছেন এমন একজন গাইডের বক্তব্য শোনার আগ্রহ হল। তিনি বুঝাচ্ছেন, লাল কেল্লা প্রতিষ্ঠা করতে পেরে সম্রাট শাহজাহান অনেক বেশী খুশী ছিলেন। তিনি প্রায়ই মদ খেয়ে বলতেন, “পৃথিবীতে যদি কোন বেহেশত থেকে থাকে, তাহলে লাল কেল্লাই একমাত্র বেহেশত, শুধুমাত্র বেহেশত, কেবল মাত্র এটিই সেই বেহেশত”! আমি যারপরনাই তাজ্জব হলাম এভাবে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে পর্যটকদের বিভ্রান্ত করার জন্য। লাল কেল্লা আসলেই দেখবার মত এক নান্দনিক স্থান। সেখানে রং মহল, খাস মহল, মমতাজ মহল, মোতি মহল সহ অনেকগুলো মহল আছে। মার্বেল পাথরে নির্মিত গোসল খানা দেখলে, তার শিল্পের প্রশংসা না করে পারা যায়না। গোসল খানার তলদেশে দিয়ে সদা পানি প্রবাহিত হবার জন্য সুন্দর প্রস্রবণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে লাল কেল্লার বৃহৎ অংশ জুড়ে সেনা ক্যাম্প রয়েছে। লাল কেল্লার প্রধান গেইটের উপরে দাড়িয়ে সামনের বিরাট মাঠে আগত মানুষদের উদ্দেশ্যে সম্রাট ভাষণ দিতেন। বর্তমানেও ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে একই স্থানে দাড়িয়ে প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। লাল কেল্লা চিরদিন মনে রাখার মত একটি স্থান।
দিল্লী জামে মসজিদ:
দিল্লী জামে মসজিদ পুরো দুনিয়ায় ইতিহাস বিখ্যাত একটি মসজিদ। লাল পাথরের গাঁথুনি আর সাদা পাথরের কারুকার্য খচিত এই মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৫০ সালে। সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ দিন রাত পরিশ্রম করে এই মসজিদ প্রায় ৭ বছরে তৈরি করে এবং পঁচিশ হাজারের বেশী মানুষ এই মসজিদে এক সাথে নামাজ পড়তে পারে। বিশাল আকারের স্থান নিয়ে, মাটি থেকে বেশ উপরে নতুন করে ফ্লোর নির্মাণ করে সেখানেই বানানো হয়েছে মসজিদের আঙ্গিনা। মসজিদের আঙ্গিনার উচ্চতা আর লাল কেল্লার প্রেসিডেন্টের ভাষণ দেবার স্থানের উচ্চতা একই। ডানে বামে এবং সামনের সিঁড়ি ব্যতীত এই মসজিদে কেউ ঢুকতে পারবেনা। মসজিদের সামনে পাথর নির্মিত বিশাল মাঠে দাঁড়ালে আশে পাশের নিচু ভবন গুলোর ছাদ দেখা যায়। মসজিদের চারিদিকে অনেক উঁচু প্রাচীর, সেখানেও নামাজ পড়া যায়, যার উপরে দুই জন মানুষ দৌড়াতে পারবে। এখানে দাঁড়ালে পাশের সাত তলা ভবনগুলোর ছাদ নজরে আসে। মসজিদের মিনারগুলো আরো অনেক উঁচু। এই মিনারের একটির তলদেশ দিয়ে লাল কেল্লার সংযোগ ছিল। সম্রাট মাটির নীচের এই পথেই নিয়মিত নামাজ পড়তে আসতেন। অথচ গাইড বলেছিলেন তিনি নিয়মিত মদ পান করে, লাল কেল্লাকে বেহেশত বলতেন! মসজিদের সামনে থেকে লাল কেল্লার দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। মসজিদের সামনে রয়েছে বিশাল বাজার, মোগল আমল থেকে আজও সেখানে সকাল সন্ধ্যায় বাজার বসে। এখনও বাজারের মোগল আমলের সেই অবকাঠামো রয়েছে। হাজার হাজার কবুতর এই মসজিদের মুসল্লিদের দেওয়া খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে। কোন লোহা, সিমেন্ট ছাড়া বিরাট আয়তনের পাথরকে যেভাবে বসিয়ে শক্ত গাঁথুনির সৃষ্টি করা হয়েছে তা সত্যিই এক আশ্চর্য!
দিল্লীর পুরান কেল্লা ভ্রমণ:
দিল্লীর লাল কেল্লার দুই মাইলের মধ্যেই রয়েছে পুরান কেল্লা। এই কেল্লার প্রায় ভগ্নাবশেষ রয়েছে। মোগল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট, হুমায়ুন ১৫৩৩ সালে এই কেল্লা তৈরি শুরু করে ৫ বছরে শেষ করেন। ১৫৪০ সালে পাঠান সম্রাট শের শাহ সুরী হুমায়ুনকে পরাজিত করে এই দুর্গ দখল করেন। তিনি কেল্লায় নূতন ভবন যোগ করেন এবং এখান থেকেই রাজ্য শাসন করতেন। শের শাহ পুরানা কেল্লাতে বসে ৪ হাজার মাইলের বেশী লম্বা দিল্লি থেকে বাংলাদেশের সোনার গাঁ পর্যন্ত দীর্ঘ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড তৈরি করেন। তিনি দীর্ঘ এই রোডে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন, সরাইখানা প্রতিষ্টা এবং ডাক ব্যবস্থা প্রচলন করেন। পৃথিবীতে তিনিই ডাক ব্যবস্থা প্রচলনের প্রধান ব্যক্তি। পুরানা কেল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় লাল কেল্লার মত। তবে ভিন্নতর হল কেল্লার একদিকে ঘন জঙ্গলে ভরা পাহাড়, যা দিয়ে কেল্লা থেকে পালানো যাবে, প্রবেশ করা যাবেনা! বাকি তিন দিকে বিরাটকায় পানির লেক। সেই লেকে পানকৌড়ি, হাঁস এখনও খেলা করে। কেল্লা আক্রমণ করতে গেলে সাথে নৌকা নিয়ে আসতে হবে, তারপর উঁচু দেওয়াল পার হয়ে কেল্লায় যেতে হবে। পুরানা কেল্লার বাহিরের বিশাল এক জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে দিল্লী চিড়িয়া খানা। দিল্লী চিড়িয়াখানা হাজার হাজার প্রাণী দ্বারা যথেষ্ট সমৃদ্ধ, কেল্লার লেকের কারণে সেখানে সদা প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরাজ করে। দিল্লির চিড়িয়া খানা এবং তার আশে পাশের নৈসর্গিক পরিবেশ দারুণ, সুন্দর. মনোহর ও মনে রাখার মত।
প্রাচীন রাজধানী মেহেরউলীর কুতুব মিনার:
দিল্লীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল মেহেরউলীতে অবস্থিত কুতুব মিনার। কুতুব মিনার পোড়া মাটি তথা ইট নির্মিত বিশ্ব সেরা মিনার। ১১৯৩ সালে কুতুব উদ্দিন আইবেক, এই মিনার বানানো শুরু করেন। ১৩৮৬ সালে ফিরোজ শাহ তুঘলুগ মিনারের মাথার অংশ শেষ করেন। হযরত শাহ জালাল (রহ) কুতুব মিনার বানানো শেষ হচ্ছে তা দেখে এসেছিলেন। মেহেরুলীতে অনেক গুলো রাজবংশের উত্থান পতন হয়েছে। মোগল আমলের আগে দিল্লীতে যতগুলো শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার সবগুলো এই মেহেরুলীকে ঘিরেই। খিলজি বংশ, তুঘলুগ বংশ, মামলুক বংশ, লোধী বংশ এখানে বসেই দিল্লী শাসন করেছিলেন। এখানে রাজ বংশের কবরস্থান আছে, অনেক কবরের গায়ে ফার্সি ও আরবি ভাষায় পরিচিতি লিখা আছে। দিল্লী রাজধানীর গোড়াপত্তন হয়েছিল মেহেরুলীকে ঘিরেই। চারিদিকে লোহার পাত দিয়ে ঘেরা মাঝখানে চলাচলের পথ আছে এমন একটি বন্ধ মসজিদ পাশে দেখতে পেয়ে জানতে গিয়েছিলাম। মসজিদের উঠানে সবার মত আমিও হালকা ঊষ্ঠা খেয়েছিলাম। মসজিদের গায়ে পাথরে লিখা আছে এটি ঈমাম মহীউদ্দীনের মসজিদ। তিনি একজন বড় ওলীয়ে কামেল ছিলেন, সুলতানি আমলে দিল্লীর বাদশাহর আমন্ত্রণে তিনি দিল্লীতে আসেন। পরে তাঁর অনুরোধে এই মসজিদ তৈরি করা হয়। তার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী মসজিদের সামনে তাঁকে কবরস্থ করা হয়। আতঙ্কে পিছনে ফিরে তাকালাম! হ্যাঁ যেখানে ঊষ্ঠা খেয়েছিলাম, সেটাই সেই মহান মনীষীর কবর। এক ইঞ্চি পরিমাণ উঁচু বানিয়ে, সরকারের নিখুঁত পরিকল্পনার মাঝেই এই কৌশল সাজানো হয়েছে। যাতে সবাই এই কবর পদদলিয়ে যায়। লোহার গেরেঞ্জা সুলতানি আমলে সৃষ্টি হয়নি, সুতরাং তা ইচ্ছাকৃত করা হয়েছে, সেখানে গেলে সহজে বুঝা যাবে। এই ঐতিহাসিক স্থান দিল্লীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর (রহ) মাজার দর্শন:
ভারতে যে কয়জন আল্লার ওলী ছিলেন তার মাঝে কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ) ১১৭৩-১২৩৫ খৃ. একজন। তিনি হজরত খাজা মইনউদ্দীন চিশতী (রহ) এর উত্তরসূরি ছিলেন। সেজন্য তাঁকেও চিশতী তরিকার ওলী বলা হয়। কাক অর্থ রুটি, তিনি সংসার বিরাগী মানুষ ছিলেন, ফলে তাঁর স্ত্রী রুটি কিনতে গিয়ে কয়টি মুদ্রা কর্জ হয়ে যায়। পাওনাদার তাঁকে কটু কথা বলেন এতে তিনি মনে কষ্ট পান। তিনি স্ত্রীকে শুধালেন এখন থেকে রুটি ওয়ালার কাছে যেতে হবেনা, যখনই রুটির প্রয়োজন হবে তখনই ঐ বাক্সে হাত দিবে, সেখানে গরম রুটি পেয়ে যাবে। যতবার হাত দিবে ততবার গরম রুটি পেতে থাকবে, কখনও বাক্স খুলে দেখবে না।। সে থেকে বখতিয়ারের নামের সাথে কাকী শব্দ যোগ হয়ে যায়। তিনি দিল্লীর সুলতানদের কাছে একটি বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত ছিলেন। কুতুব উদ্দিন আইবেক, ইলতুতমিশ, শের শাহ, বাহাদুর শাহ জাফর থেকে শুরু করে অনেক রাষ্ট্রনায়ক গনের কাছে বখতিয়ার কাকীর আদর্শ ছিল তুঙ্গে। তিনি দিল্লীতে সুফি বাদ প্রসারের ক্ষেতে অন্যতম ভূমিকা রাখেন। জীবনে সুযোগ পেয়েই তাঁর মাজার জেয়ারত করার সুযোগ হাত ছাড়া করিনি। মাজারে মানুষ তাদের মানত পুরো হবার জন্য দুই হাতে দান করে। কেউবা তাদের আশা পুরণার্থে বখতিয়ার কাকীর কাছে প্রার্থনা করে। সারাদিন সারাক্ষণ মানুষ এই এলাকাতে গিজ গিজ করে। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল ধরনের মানুষ এই দরগাহে বন্যার স্রোতের মত আসে আর যায়।
নিযামুদ্দিন আউলিয়ার (রহ) মাযার দর্শন:
দিল্লীতে আরেক অন্যতম ওলী নিযামুদ্দিন আউলিয়া (রহ) ১২৩৮-১৩২৫ খৃ। কুতুবউদ্দিন, নিযামুদ্দিন ও ফখরুদ্দীন গঞ্জেশকর (রহ) ও ছিলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রহ) শিষ্য। তাঁর মাজার যে এলাকায় রয়েছে সে জায়গার নাম নিযামুদ্দিন, পুরানা দিল্লীর সেরা প্রসিদ্ধ স্থান। এই স্থানেই তাবলীগি জামায়াতের প্রধান কেন্দ্র অবস্থিত। নিযামুদ্দিন আউলিয়া (রহ) এর খ্যাতি সারা বাংলাদেশ জুড়ে আছে। আবুল ফজল ইবনে মুবারক কর্তৃক লিখিত, সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রচারিত দ্বীনি এলাহি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ও তার পরিণতি নিযামুদ্দিন আউলিয়া (রহ) শিশুকালে কাছে থেকেই অবলোকন করেন। পরে তিনি দিল্লীর মানুষদের সুফিবাদের প্রতি উৎসাহ দিয়ে, চিশতী তরিকার নামে ইসলাম ধর্মে নতুন একটি পথ রচনা করেন। তিনি সমসাময়িক কালে যথেষ্ট সম্মানী ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ছিলেন। সম্রাট শাহজাহানের বড় কন্যা জাহানারা সহ অনেক সেরা ব্যক্তির কবর এই নিযামুদ্দীনে আছে।
নিযামুদ্দিন আউলিয়া (রহ) মাজারে পৌছার প্রায় আধা মাইল আগেই আমাকে জোতা খুলে ফেলার অনুরোধ করা হয়। মুদ্রার বিনিময়ে জোতা জমা রাখার জন্য, রাস্তার পাশেই অনেক দোকান আছে। তারা সবাই জোতা জমা রাখা জন্য টানাটানি শুরু করল। কেননা এই পবিত্র মাজারে জুতা নিয়ে গেলে আমার উপর গজব পড়বে। বললাম খোদার ঘর কাবা শরীফের চারিদিকে জুতা নিয়ে ঘুরলে বিপদ নাই, এখানে কেন এত বিপদ? তাছাড়া গজব আমার মাথায় পড়বে, তাতে তোমাদের ক্ষতি কি? আমার মত অবুঝ এক ব্যক্তির জন্য এই পবিত্র স্থানে আল্লাহর গজব পড়ুক, তা তারা কামনা করে না। তাই জোতা কোন অবস্থাতেই ভিতরে নেওয়া যাবেনা। কয়েকটি দোকান জরিপ করে দেখলাম দোকানের সবগুলো জোতার দামের চেয়ে আমার এক জোড়া জোতার দাম অনেক বেশী। অস্থায়ী দোকান বন্ধ করে চলে গেলে ফিরে পাবার নিশ্চয়তা কি? ইতালির এই দামী জুতো আমি উপহার পেয়েছিলাম, তাই খুব পছন্দ করতাম। তাদেরকে জমা না দিয়ে আমি তা ব্যাগে ভরে নিলাম। কিছুদূর সামনে যেতেই ব্যাগে জুতা আছে কিনা তল্লাশি শুরু হল। সেদিন সফর বাদ দিলাম, পরের দিন যথারীতি স্যান্ডেল নিয়ে জেয়ারতে আসলাম। মাজারে প্রচুর নারী-পুরুষ গিজ গিজ করছে। সকল ধর্মের নারী-পুরুষ এখানে আছে। এখানেও মানত করা হয়, বিভিন্ন আশায় প্রার্থনা করা হয়। আমার নিজের মত করে দোয়া করতে গিয়েও অসুবিধার সম্মুখীন হলাম। খাদেমের বর্ণনায় নির্দিষ্ট ছকে দোয়া, কালাম, তসবিহ পড়তে হবে! আমার জেয়ারত আমি করব বলে স্থান ত্যাগ করে দূরে দাঁড়িয়ে কাজ সারলাম।
বাহাই টেম্পল পরিদর্শন:
বাহাউল্লাহ উনবিংশ শতাব্দীতে ইরানে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিজেকে নতুন নবী দাবী করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন তিনিই প্রত্যাশিত ইমাম মেহেদী। তিনি খৃষ্টানদের বলেছিলেন আমিই সেই প্রত্যাশিত মসীহ। তিনি ইহুদীদের বলেছিলেন তোমরা যে প্রত্যাশিত স্বর্গীয় মসীহের জন্য অপেক্ষা করছ আমি সেই ব্যক্তি। তিনি ইরানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেন। অতঃপর ইরান সরকার তাকে ও তার সকল শিষ্য সহ সবাইকে বহিষ্কার করেন। বাহাউল্লাহ তার দল-বলকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন এবং ব্রিটিশ সরকার দিল্লীতে জায়গা করে দেন। এখানে এসে তিনি হিন্দুদের বলতে থাকেন যুগে যুগে ভগবান বিভিন্ন রূপে পৃথিবীতে অভিভূত হন। ভগবান একদা রাম, একদা কৃষ্ণ, একদা বাহাই হিসেবে তোমাদের কাছে আসেন। অবশেষে তিনি হিন্দুদের কাছে সমাদৃত হন। বর্তমানে বাহাই ধর্মের প্রধান কেন্দ্রস্থল দিল্লীতে। তারা এই ধর্মীয় উপসনালয় খুলেন, যার নাম লোটাস টেম্পল তথা পদ্ম মন্দির। সেখানে সকল ধর্মের মানুষ ঢুকতে পারে। মন্দিরে প্রত্যেক ধর্মের মানুষদের জন্য আলাদা আলাদা দরজা আছে। যার যেভাবে ইচ্ছা সেখানে প্রার্থনা করতে পারে, কোন বাধা ধরা নিয়ম নেই। বাংলাদেশ উল্লেখ যোগ্য সংখ্যক বাহাই আছে, তারাও নিজেদের বাহাই মুসলিম অথবা মুসলিম বলে দাবী করেন। এই মন্দিরে প্রচুর দর্শনার্থীর ভিড় লেগে থাকে।
পৃথিবীর বুকে দিল্লী এমন একটি শহর যার বাঁকে বাঁকে আছে বিভিন্ন জাতির ছাপ। পুরানা দিল্লী গেলে বুঝা যাবেনা এটি একটি হিন্দু প্রভাবাধীন দেশ। মোগল স্থাপত্য থেকে সুলতানি স্থাপত্য পর্যন্ত সকল কিছু দেখলেই বুঝা যাবে, সবাই দিল্লীকে ভাল বেসেছিল আপন মহিমায়। দিল্লীকে রূপ মনোহর করতে কেউ কার্পণ্য করেনি। যারা ভ্রমণ পিয়াসী তারা জীবনে একবার দিল্লী আসবেই। দিল্লীর ভৌগলিক অবস্থান, জলবায়ু সবকিছুই দারুণ ও উৎকৃষ্ট। যার কারণে বারে বারে দিল্লী ভারতীয় উপমহাদেশের রাজধানী হবার জন্য উত্তম স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দিল্লীর পুরানা স্থাপত্য প্রদর্শন করে ভারত প্রতি বছর কোটি কোটি রূপি আয় করে। এসবে বর্তমান ভারত সরকারের কোন অনুদান, অবদান নেই। তারা শুধু এসব দেখিয়ে আয় করে। তবে এসব রক্ষায় সরকারের অবহেলা যে কারো চোখে পড়বেই। যারা বাংলাদেশ থেকে দিল্লী ভ্রমণে আসতে চায় তারা যেন আমার মত একাকী না আসে। অবশ্যই কোন গ্রুফের সাথে আসা উত্তম। আসার আগে অবশ্যই লেখা পড়া করে নেওয়া উত্তম, তাহলে ভ্রমণের আনন্দ কড়ায় গণ্ডায় উপভোগ করা যায়।


Discussion about this post