ভদ্রলোক তার ইংরেজিতে উচ্চ শিক্ষিত ছেলেকে কিছু নৈতিক কথাবার্তা শুনাতে নিয়ে এসেছেন সময়ের সবচেয়ে বেশী আলোচিত ট্রান্সলেশন সেন্টারে। হাজারো সমস্যার ট্রান্সলেট হয় এখানে। সেন্টারের মালিক উচ্চ শিক্ষিত বাংলাদেশী। বহু ভাষার পারদর্শিতা নিয়ে সুনাম আছে। তিনি যেমন মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়েরও সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি বাংলা, আরবি ও ইংরেজিতে সমান পারদর্শী, তার উপরে আবার একজন ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও বটে।
ভদ্রলোকের ছেলে অমায়িক, মিশুক এবং উচ্চ শিক্ষিত। সারা জীবন তিনি সন্তানদের নিয়ে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ধারণা দিয়ে বড় করেছেন। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে কি কি করা লাগবে সে সব যোগ্যতা পাইয়ে দিতে কার্পণ্য করেন নি। কিন্তু জীবনে কোনদিন ছেলে মেয়েদের নিয়ে ওয়াজ মাহফিলে যান নি। যদিও প্রবাসে আমাদের দেশের মত আড়ম্বরপূর্ণ ওয়াজ-মাহফিল নেই, তদুপরি তিনি এটার প্রয়োজনীয়তাও তেমন একটা উপলব্ধি করেন নি। যার ফলে ইসলামের কোন প্রভাব সন্তানের জীবনে পড়ে নি। তিনি চিন্তা করলেন, দিনে দিনে যেভাবে ছেলের যাচ্ছেতাই বন্ধু সংখ্যা বাড়ছে এবং তাদের যে স্ট্যাটাস! এদের সাথে চলতে গেলে সাক্ষাৎ নরকে যাওয়া ব্যতীত গত্যন্তর নেই।
সুন্দর হেদায়াতি বক্তব্য দিয়ে সন্তানের মনে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, এমন আলেমের অভাব নেই। কিন্তু সে সব আলেমেরা ইংরেজি জানেন না, আবার তার সন্তান পাসপোর্টের সূত্রে বাংলাদেশী হলেও না পারে বাংলা বলতে, না বোধগম্য হয় পিতা- মাতার ভাষা! বাংলা তার কাছে এক জটিল অবোধ্য ভাষা। তাই ব্যক্তিক্রম হিসেবে ট্রান্সলেশন সেন্টারে নিয়ে আসা। সেন্টারের মালিক তো রাত দিন আরবি থেকে ইংরেজি, ইংরেজি থেকে বাংলা এসব করেই দিন চালান। একজন বিশিষ্ট আলেম হিসেবে, তার সন্তানকে প্রভাব সৃষ্টিকারী দুটো উপদেশ শোনাবার জন্য, তার দৃষ্টিতে তিনিই হবেন উপযুক্ত ব্যক্তি।
ভদ্রলোকের হাই স্ট্যান্ডার্ড ছেলের জন্য কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে এবং কোন বিষয়টি সামনে এনে উপদেশ শুরু করবেন, সেটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে ট্রান্সলেটর সাহেব তিনি কিছুটা বিব্রত-বোধ করলেন! প্যান্ট, শার্ট, চুলকাটা সহ অনেক বিষয় নিয়ে ঠিক এই মুহূর্তেই বহু উপদেশ দেওয়া যায়। কিন্তু এতে করে পিতা-পুত্র দু’জনই বিব্রত হতে পারেন। অগত্যা অপ্রস্তুত অবস্থায় তিনি আমল আর নিয়ত নিয়েই কথা শুরু করলেন। অন্যদিকে ছেলেটির ইতিবাচক কিছু দিকও আছে, চরিত্রে বেশ কিছু মৌলিক গুণাবলী রয়েছে। ছেলের ভদ্রতা, শান্ত-শিষ্টতা ও আনুগত্য পরায়নতা দৃষ্টিতে পরার মত। সেন্টারের মালিক যথারীতি কিছু ইসলামী কথাবার্তা ইংরেজিতেই শুরু করলেন।
ছেলেটি কিছু উপদেশ শোনার পর ফিস করে হেসে ফেলল। কাশি আসার মত ভঙ্গি করে হাসির উপস্থিতি রুখতে ব্যর্থ চেষ্টা করল। চেহারা থেকে হাসির রেখা লুকাতে চেষ্টিত হল। ছেলেটি বুঝে, এই পরিবেশে হাসাটা মানানসই নয়, তাছাড়া পিতা আছেন সেখানে। যিনি পরামর্শ দিচ্ছেন তিনিও অপমানিত বোধ করতে পারেন। কিন্তু হাসিটা কেন জানি তাকে পাইয়ে বসেছে।
একদা এক পিকনিকে তাকে প্রশ্ন করলাম, সেদিনের আচরণ কেন তার এমন হয়েছিল? সে বলল, টান্সলেশন সেন্টারের আঙ্কলের ইংরেজি শুনে। তার কথাগুলো কেন জানি Funny ধরনের। ইংরেজিতে দুর্বলতা তো আছেই তাছাড়া তার ইংরেজি শুনতে কার্টুনের মত শোনায়! আমাদের স্কুলের কেরালার দপ্তরি ঠিক এই ধরনের ইংরেজিতে কথা বলে। মনে হচ্ছিল সেই দপ্তরিই আমাকে উপদেশ দিচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তার সাথে একদিন ঘটে যাওয়া একটি Funny moment এর কথা মনে পড়ায় সেখানে হাসি চলে আসে।
চলছিল ইসলামী কথা কিন্তু ছেলের মনে ঢুকে পড়েছে Funny ঘটনার চিত্র! এটা সন্তানের দোষ নয়। সুন্দর ভাষার প্রয়োগ মানুষকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করে। শ্রোতার চেয়ে বক্তার ভাষার উৎকর্ষতা সেরা না হলে কোন শ্রোতাই কথা মনি দিয়ে শুনবেনা। শুনলেও হালকা ভাবে মনোযোগী হবে। যে সমস্ত পিতামাতা সন্তানদের ইংরেজিতে উচ্চ শিক্ষা পাইয়ে দিয়েছেন। যেখানে তাদের সন্তানেরা সেইক্স-পিয়র, আর্থার কোনান ডয়েল, জে কে রাউলিং এর বই নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকে; সে মগজে ইসলামী ভাবধারা ঢুকানোর জন্য উপরোক্ত সাহিত্যিকদের চেয়ে সেরা কিংবা কাছাকাছি মানের ইংরেজি জানা মানুষের সাহচর্য লাগবে এটা অনেকেই বুঝে না। এবং সে ধরনের মানুষ আমাদের দেশে অপ্রতুল। তাই সন্তানকে অন্যের ভাষায় পারদর্শী করার পাশাপাশি নিজের মায়ের ভাষাতেও পারদর্শী করানো দরকার। তাহলে অন্তত পিতা-মাতা তাদের মনের কথাগুলো গুছিয়ে, ভাষা-শৈলী ব্যবহার করে সন্তানকে বুঝাতে পারবে। নচেৎ এই ধরনের সন্তানদের চোখে অশিক্ষিত মানুষের তালিকায় প্রথমেই তার পিতা-মাতার নাম সবার আগে উঠে আসবে।


Discussion about this post