আমাদের দেশের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের খামে, ডাক বাহকের থলেতে কিংবা সরকারী গুরুত্বপূর্ণ নথিতে সিলগালার প্রচলন দেখতে পাই। ডাক হরকরার থলে শক্ত সুতার মাধ্যমে বাঁধা থাকে। সেই সুতার গিরা যেখানে ঠিক তার উপরে লাল গালা দিয়ে আটকানো হয় এবং তাতে পরিষ্কার একটি সিল দেখতে পাই। এটার অর্থ প্রাপক ব্যতীত অন্য কেউ এটা খুলতে পারব নে। আর খুললেও প্রাপক বুঝে ফেলবে যে, নির্ঘাত পথিমধ্যে এটা কেউ খুলে ফেলেছিল। আদালত কর্তৃক নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে প্রসাশন কখনও কারো প্রতিষ্ঠানের তালার গায়েও অনুরূপ চিহ্ন যোগ করে। এটার নাম সিল গালা। এই সিল গালা পদ্ধতি এখনও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বহু কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
যে সিল দিয়ে সিলগালা করা হয় সেটি প্রশাসনের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ। শুরুতে এটা সরকারী মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকত। বিশেষায়িত এই সিলকে কেন্দ্র করেই আলাদা একটি বিভাগ পরিচালিত হত। চিঠির ভাষা লম্বা হলে কাপড়ে কিংবা কাগজে বক্তব্য লিখে সেটাকে গোল পাকিয়ে বাহিরে সিলগালা করে দেওয়া হত। সেক্ষেত্রে বাহিরের এই সিলটিই প্রধান নমুনা হিসেবে স্বীকৃত পেত। বর্তমানে সিল সহজ লভ্য হওয়াতে অতীতে সরকারী কাজে সিলের গুরুত্ব কত ছিল; তা আমরা চিন্তা করতে পারব না। একটি ঘটনার উল্লেখ করলে হয়ত বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
আরো পড়ুন…
- রাষ্ট্রীয় সম্পদ মেরে ধনী হবার পরিণতি
- ভারতের ওয়াহাবী মতবাদ ও আজাদী আন্দোলন
- ইউক্যালিপটাস : পরিবেশ বিপর্যয়ের যত কারণ
ঈমাম আবু হানিফা (রহ) কে গভর্নর ইবনে হুবাইবা তার শাসন ব্যবস্থার অধীনে বিচারক হবার প্রস্তাব করে। ইমাম আবু হানিফা তাতে রাজি হয় নি। সর্বশেষে তাকে প্রধান বিচারপতি পদে বসানোর জন্য প্রস্তাব করে। যথারীতি তিনি সেটাও প্রত্যাখ্যান করেন। এতে করে বিষয়টি গভর্নরের আত্মমর্যাদায় ঘা লাগে। ঈমাম আবু হানিফার মত জ্ঞানী ব্যক্তিকে, যে কোন মূল্যে তার রাষ্ট্রীয় কাজে চাইই। কিন্তু তিনি কোন প্রলোভনে সায় দিতে রাজি নয়। তাছাড়া প্রধান বিচারপতির চেয়ে আর বড় কি পদ বাকী থাকে। কিন্তু হুবাইবা দমার পাত্র নন! অবশেষে তার সর্বশেষ চালে সর্বোত্তম বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় সিল ঈমাম আবু হানিফার কাছে সংরক্ষণের প্রস্তাব দেয়! (তথ্যসূত্র: চার ইমামের জীবনী) অর্থাৎ এই সিল যার হাতে থাকে, সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজের সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেন। ঈমাম আবু হানিফা (রহ) এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন। মূলত এ সিদ্ধান্তের কারণেই তার উপর নির্মম নির্যাতন শুরু হয় এবং পনের দিনের নির্যাতনের মুখে তিনি দুনিয়া থেকেও বিদায় নেন।
সিলগালার পিছনে ইসলামী ইতিহাসের অবদান আছে। আমিরে মুয়াবিয়া (রাঃ) প্রথম সিলগালা সিস্টেম চালু করেন। এর পিছনে একটি ঘটনা জরিয়ে আছে। কুফার শাসক জিয়াদের নিকট আমর ইবনে যুবাইরকে একলক্ষ দেবার নির্দেশ দিয়ে একটি পত্র লিখেন। পথিমধ্যে পত্রটি খুলে এক লক্ষকে দুই লক্ষে পরিবর্তন করা হয়। পরে জিয়াদ হিসাব জমা দিলে মুয়াবিয়া (রা) এটা অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে তিনি অতিরিক্ত এক লক্ষের জন্য আমরকে বন্ধী করে রাখেন। পরে তার ভাই আবদুল্লাহ উক্ত এক লক্ষ পরিশোধ করে মুক্ত করে আনেন। অতঃপর এসব অনিয়ম রোধকল্পে সিল মোহর সংক্রান্ত একটি সরকারী দপ্তর স্থাপন করা হয় এবং সুতো দিয়ে পেঁচিয়ে সিলগালার প্রচলন করা হয়। (তথ্য সূত্র তাবারী, আল মোকাদ্দিমা)


Discussion about this post