ভূগর্ভের মূল্যবান রত্নালঙ্কার
নজরুল ইসলাম টিপু
পৃথিবীতে রত্নসম্ভার বলতে বুঝায় হীরা, মনি, পান্না, সোনা, রূপা ইত্যাদি। মানুষের কাছে এগুলোর প্রতি আকর্ষণ আবহমান কাল থেকেই ছিল; ভবিষ্যতেও থাকবে। এই সম্পদগুলো পৃথিবীতে তিন ভাবে বিন্যস্ত অর্থাৎ তিনটি ভিন্ন প্রক্রিয়ায় এগুলো আহরিত হয়। প্রথমত: সোনা ও রূপা দু’টোই মৌলিক পদার্থ হিসেবে পরিচিত এবং সরাসরি মাটির নীচ থেকে এগুলোকে সংগ্রহ করা হয়। দ্বিতীয়ত: হীরা, মানিক, পান্না, নীলা, ফিরোজা, পোখরাজ জাতীয় মূল্যবান রত্মগুলো মাটির নিচে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রকৃতির বিভিন্ন চাপ, তাপ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দামী রত্নে পরিণত হয়। কখনও খনন করে, কখনও ভূমিকম্পে, কখনও সমুদ্র তলদেশে এগুলো উঠে আসে। তৃতীয়ত: প্রবাল ও মুক্তা জাতীয় রত্মগুলো; প্রাণী সৃষ্ট এবং সমুদ্র থেকেই আহরিত হয়। তবে উল্লেখিত প্রত্যেকটি পদার্থকে রত্নে হিসেবে রূপ দিতে অনেক কষ্ট ও ব্যয় সাধ্য ব্যাপার। ভূপৃষ্ঠে কেউ এগুলো ভাগ্যগুণে পেয়ে গেলেও; প্রযুক্তিগত জ্ঞান না থাকার কারনে সে চিনবেনা, তাই উপকার হবেনা। পৃথিবীতে মূল্যবান রত্ন ব্যবসা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতেই সীমাবদ্ধ।
রত্নের দাম ও মান নির্ধারণ হয় মূলত চারটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যথা: রং, কীভাবে কাটা হয়েছে, কতটা স্বচ্ছ এবং কত ক্যারেট মান সম্পন্ন। স্বর্ণ ও পাথরের মান নির্ধারণ হয় ক্যারেটের মাধ্যমে, তবে দুই প্রকার ক্যারেটের মধ্যে পার্থক্য আছে। বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে স্বর্ণের একক হল ক্যারেট। কোন স্বর্ণ টুকরায় ২৪ ভাগের কত ভাগ স্বর্ণ তা বোঝাতেই ক্যারেট ব্যবহৃত হয়। সে হিসেবে ২৪ ক্যারেট বলতে বুঝায়; টুকরার মাঝে ২৪ ভাগের ২৪ ভাগই হল স্বর্ণ। আরো বিস্তারিত ভাবে, কোন স্বর্ণ টুকরায় ৯৯.৯ শতাংশ যদি স্বর্ণ হয়, তাকে ২৪ ক্যারেটের স্বর্ণ বলা হবে। রত্নের ভর হচ্ছে রত্ন-পাথরের ক্ষেত্রে ক্যারেটর একক। ১ ক্যারেট রত্ন বলতে, ১ ক্যারেট = ০.২ গ্রাম বা ২০০ মিলি গ্রাম ওজনের রত্ম।
রত্নের আভ্যন্তরীণ আকার, আকৃতি, গঠন ও রাসায়নিক বস্তুর সংমিশ্রণ বিবেচনা করে কৃত্রিম রত্নও তৈরি করা যায়। রত্ম তৈরি যেহেতু ব্যয় বহুল প্রক্রিয়া তাই সকল রত্ন কেউ তৈরি করেনা। যে রত্নের বাজার মূল্য অনেক বেশী চড়া মূলত সে সব রত্মই কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা হয়। কৃত্রিম রত্ন তৈরির পদ্ধতি তিনটি। যথা: ১. ইমিটেশন অর্থাৎ নকল রত্ন। ২. সিনথেটিক অর্থাৎ সংশ্লেষিত রত্ন। ৩. কৃত্রিম ভাবে তৈরি ডাবলেট রত্ন। পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে এই ধাপগুলোর একটু সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। ইমিটেশন রত্ন মূলত চোখে দেখা সাদৃশ্য ছাড়া আর কিছুর মিল নেই। অর্থাৎ দেখতে আসলটার মত হবে তবে আসল নয়। সংশ্লেষিত রত্ন হল, প্রকৃতিতে এই রত্ন বহু বছরে যেভাবে তৈরি হয়েছে; সে পদ্ধতি অনুসরণে নতুন রত্নের সৃষ্টি করা। সকল উপাদানের সংশ্লেষণের মাধ্যমে, যন্ত্রপাতির দ্বারা, স্বল্প সময়ে জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় এই রত্ন। ডাবলেট রত্ন হল, উপরের আবরণটি আসল রত্নের হবে, নীচের আবরণটি কৃত্রিম রত্নের হবে। অদৃশ্য আঠা ও কাঁচের আস্তরণের সংমিশ্রণে তৈরি এই রত্ম।
এবার আসুন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে দামী কয়েকটি রত্নের সাথে পরিচিত হই।
হীরা (Diamond):
হীরক বা হীরা সর্বাপেক্ষা মূল্যবান একটি ধাতু। হীরা ক্ষয় হয়না এবং অসম্ভব শক্তিশালী! তাই এটাকে ভারী ধাতু কাটার কাজে ব্যবহার করা হয়। কাঁচ কাটতে এবং মানুষেরে অপারেশনে কাটা-ছেড়ায় হীরার ছুরি খুবই কার্যকর। এটি সহজে ভোঁতা হয়না বলে দীর্ঘকাল এর সমান ব্যবহার কার্যকর থাকে। তাছাড়া ধারালো করার কোন ঝামেলাতেও যেতে হয়না। হাজারো কৌণিক হীরার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে একটি ছোট্ট হীরক টুকরা তৈরি হয়। ফলে সূর্যের আলোতে, সাতটি রংয়ের প্রতিটি রং এটা থেকে বিচ্ছুরিত হতে থাকে। যার কারণে এটি রত্ম হিসেবে খুবই সমাদৃত এবং গহনা তৈরিতে বেশী ব্যবহৃত হয়। বর্ণহীন এ রত্নটি প্রকৃতির একটি মাত্র বিশুদ্ধ উপাদান তথা কার্বন থেকেই তৈরি হয়। মানুষের পরিচিত সকল প্রাকৃতিক পদার্থের মধ্যে হীরা সবচেয়ে বেশি শক্ত। হীরা দিয়ে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রায় কাজ করা যায়, কেননা এর তাপধারণ ক্ষমতা অনেক বেশী। ভূগর্ভের অভ্যন্তরে প্রায় ১৪০ থেকে ১৯০ কিমি নিচে পৃথিবীর কেন্দ্র ও আবরণে মাঝে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের কারণে হীরা তৈরি হয়। কার্বন রূপান্তরিত হয়ে হীরায় পরিণত হতে সময় লাগে, প্রায় ১ থেকে ৩.৩ বিলিয়ন বছর। পৃথিবীতে প্রাপ্ত সকল হীরাই পৃথিবীতে তৈরি হয়নি; পৃথিবীতে অনেক হীরা পাওয়া গেছে যেগুলো পৃথিবীর বাইরে থেকে আসা। বাহির থেকে কিভাবে এসেছে গবেষণার বিষয় হলেও, উল্কার মাধ্যমে অনেক হীরা পৃথিবীতে পতিত হয়েছে, এমন ধারনা সবাই করে। কঠিনতার দিক থেকে হীরাকে আদর্শ একক ধরা হয়। Mohs Scale of Mineral Hardness সূত্রানুযায়ী পদার্থের সর্বোচ্চ কাঠিন্য হল ১০ এবং সর্বনিম্ন কাঠিন্য হল ১। সে হিসেবে হীরার কাঠিন্যের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০। অর্থাৎ হীরার চেয়ে কঠিন কিছু নেই। কোহ্-ই-নূর, আলোর পাহাড় তথা কোহিনূর নামক হীরাটি পৃথিবীর ইতিহাসে বেশী মাত্রায় আলোচিত একটি হীরার নাম। পৃথিবীর বহু সম্রাটের হাত ঘুরে ১০৮.৯৩ ক্যারেটের কুহিনূর এখন ব্রিটিশ রাণীর মাথায় স্থান করে নিয়েছে।
মানিক (Ruby):
বাংলায় মানিক বা লালমণি বলা হলেও এটি রুবি হিসেব সর্বমহলে বেশী পরিচিত। প্রাচীন কালের লোককথায় শোনা যেত, মানিক একপ্রকার সাপের মাথায় পাওয়া যায়! বহু মানুষ সেই সাপকে খুঁজে বেড়াত। মানুষ বিবেচনা করত, একটি মানিকের মূল্য সাত রাজার ধনের চেয়েও বেশী। তবে মহা মূল্যবান এই মানিক এক প্রকার পাথর ব্যতীত আর কিছুই নয়। রত্ম হিসেবে হীরার পরেই মানিকের স্থান। হীরা যেভাবে একক বস্তু কার্বন থেকে তৈরি; রুবির জন্ম সেভাবে নয়, রুবি নামের এই মানিক তৈরি হয় কয়েকটি যৌগের সংমিশ্রণে। এলুমিনিয়াম অক্সাইডের বিভিন্ন বর্ণের শক্ত স্ফটিকীকৃত খনিজ যৌগের সংমিশ্রণে তৈরি হয় এই রত্ন। রুবি নামটি ল্যাটিন শব্দ থেকে এসেছে; রুবি অর্থ লাল। গাঢ় রক্ত বর্ণের এই পাথরটি দেখতে ঠিক কবুতরের তাজা রক্তের ন্যায়। মূল পাথরে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতির কারণে লাল রং তৈরি হয়। রুবি সূর্যের আলোতে বিভিন্ন ধরনের বিচ্ছুরণ ঘটায়। সূর্য থেকে প্রাপ্ত রঙ বিভিন্ন কৌণিকে, ভিন্ন ভিন্ন নতুন রংয়ে প্রতিফলিত করে। বহুদূর থেকে আগন্তুকের হাতের আংটিতে পরিহিত রুবির উজ্জ্বল বর্ণচ্ছটা চোখে পড়ে। রুবি পাথর যেই আকৃতির হোক না কেন, হীরার মত তার অভ্যন্তর ভাগ অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সহজে নজরে আসে। Mohs Scale of Mineral Hardness সূত্রানুযায়ী রুবির কাঠিন্য হল ৯। বর্তমান বিশ্বে দামী গহনা তৈরিতে রুবির ব্যবহার দিন দিন ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে। স্বর্ণের হাঁরে রুবির নান্দনিক ব্যবহার, সকল ধনীদের হৃদয়ে কাড়া নাড়ে। রুবির সৌন্দর্য, মূল্য ও মানের দিকে নজর রেখে অনেক পিতা মাতা তার সন্তানকে মানিক বলে অভিহিত করেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ বার্মাতে প্রচুর পরিমাণ রুবি পাওয়া যায়। তাছাড়া এই অঞ্চল তথা বার্মা, থাইল্যান্ড, ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশে রুপি পাওয়ার মত খনিজ উপাদান ও উপকরণ আছে।
নীলমণি (Sapphire)
নীলমণি রত্নটিকে নীলাও বলা হয়। সাফায়ার শব্দটি ল্যাটিন থেকে গৃহীত, এর অর্থ নীল। নীলা পাথরটির ভৌত গঠন প্রণালী অবিকল রুবির মত। তবে রুবিতে এলুমিনিয়াম অক্সাইডে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতির জন্য লাল বর্ণ ধারণ করে। নীলা পাথরে এলুমিনিয়াম অক্সাইডে টিটেনিয়াম যৌগের সংমিশ্রণের কারণে এটাকে নীল বর্ণের দেখায়। বর্ণচ্ছটা খুবই সুন্দর এবং বিচ্ছুরিত আলো বিভিন্ন ভাবে প্রতিফলিত হয়। টিটোনিয়ামের পরিমাণের কারণে কখনও নীলাকে হালকা কিংবা স্বচ্ছ অবস্থায় পাওয়া যায়। হালকা কিংবা গাঢ়, সকল নীলা দেখতে খুবই দারুণ এবং উজ্জ্বল। আরো উল্লেখ্য কিছু নীলায় স্বল্প পরিমাণ ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি দেখা যায়। তখন এটা হয়ে যায় আরো আকর্ষণীয়, মনোরম ও চিত্তাকর্ষক! বিভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন রঙ্গের আলোকচ্ছটা বের হয়, এই একটি মাত্র রত্ন থেকে। এই প্রকারের নীলা’কে বাহিরের আলোতে নীল দেখা গেলেও, ভিতরের আলোতে হালকা বেগুনী দেখাবে। টিউব লাইটের আলোতে পিঙ্ক বর্ণের এবং সূর্যালোকে সবুজাভ অথবা হলুদাভ দেখায়! এটা প্রকৃতি, এলাকা, সূর্য রশ্মির ধরনের উপর নির্ভর করেই এমন হয়। ব্যবহার কারীর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত নয়। নীলা সাধারণত অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, উত্তর আমেরিকায় পাওয়া যায়। Mohs Scale of Mineral Hardness সূত্রানুযায়ী নীলমণি বা নীলার কাঠিন্য ৯।
পান্না (Emerald)
দামী ও মূল্যবান পাথরের মাঝে অন্যতম আরেকটি পাথর হল পান্না। হীরা, মানিক ও নীলার পরেই এর অবস্থান। পৃথিবীতে যত পান্না পাওয়া যায় তা বেশীর ভাগই খুঁতযুক্ত। তাই নিখুঁত, মসৃণ পান্নার বাজার মূল্য অনেক বেশী। পান্না দেখতে গাঢ় সবুজ বর্ণের এবং সূর্যের আলোতে বিচ্ছুরণ হয়। চুনা পাথর থেকে তৈরি এই রত্নে মূল্যবান ক্রোমিয়াম ও ভ্যানাডিয়াম ধাতুর সংমিশ্রণ থাকে। যার কারণে তার আলোর বিচ্ছুরণে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। ফলে পান্না গাঢ় সবুজ বর্ণের হলেও, এটা থেকে সবুজের সাথে সাথে নীল ও হলুদ বর্ণের বর্ণচ্ছটা বের হয়। এই বর্ণচ্ছটা যে কোন রত্ম প্রেমিক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গলার হাঁর কিংবা আংটিতে পরা থাকলে বহু দূর থেকেই এর উপস্থিতি বিভিন্ন ঝিলিকের মাধ্যমে নজরে আসে। বর্তমানে পান্না গহনার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ব্যাপক হারে ব্যবহার শুরু হয়েছে। কলম্বিয়ার মুজো এবং এল সালভেদরে প্রচুর পরিমাণে উন্নত মানের পান্না পাওয়া যায়। উরাল পর্বতমালার টাকোভোয়া অঞ্চলে বেরিলিয়াম মিশ্রিত পান্না এবং অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, কাজাকিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের কালিগুমানে ভিন্ন প্রকৃতির পান্না পাওয়া যায়। Mohs Scale of Mineral Hardness সূত্রানুযায়ী স্থরভেদে পান্নার কাঠিন্য ৭.৫ থেকে ৮।
প্রবাল (Coral)
প্রবাল একপ্রকার সামুদ্রিক প্রাণী। প্রবাল সাধারণত কলোনি তৈরি করে একত্রে বসবাস করে। দেখতে এরা ডিমের কুসুমের একটি ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন অংশের ন্যায়। কলোনির সকল প্রবালের ধরন, বর্ণ, আকৃতি একই রকমের হয়। এরা প্রাণী হলেও, পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় সাগরতলে কোন দৃঢ় তলের উপর শক্ত করে গেঁড়ে বসে এবং নিশ্চলভাবে বাকি জীবনটা সেখানেই পার করে দেয়। ক্ষুদ্র প্রবাল যেখানে গেড়ে বসে, সেখানে বসেই শরীর থেকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসরণ করে। ক্যালসিয়াম কার্বনেটের এই নিঃসরণ তার শরীরের বাহিরে একটি অসম্ভব শক্ত পাথুরে খোলস তৈরি করে। প্রবাল সেখানে বসা অবস্থায় মারা যায়। প্রবাল সেস্থানে মারা গেলেও, মৃত্যুর পরে খোলসটি সেখানেই রয়ে যায় এবং তা একটি শক্ত গাঁথুনির আকার ধারন করে। এভাবে সেই গাঁথুনিকে শক্ত তল ভেবে নতুন প্রবাল তার উপর আসন গেড়ে বসে। ধীরে ধীরে প্রবাল বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে এটি কঠিন শিলায় পরিণত হয়। এগুলো এত শক্ত ও মজবুত হয়, দৈবক্রমে ঘষা খেলে জাহাজের তলা পর্যন্ত কেটে যায় কিন্তু প্রবাল ঠিকই অক্ষত থাকে! প্রবাল বিভিন্ন রংয়ের হয়ে থাকে এবং এগুলোকে মসৃণ করলে, উজ্জ্বলতা বাড়ে; পাথর আর প্রবালের মধ্যে তখন খালি চোখে পার্থক্য বুঝা যায় না। সমুদ্র তলদেশে হাজারো রং বেরংয়ের প্রবাল দেখে বুঝা যায়, কি অদ্ভুত রং দিয়ে আল্লাহ সমুদ্রকে সাজিয়েছেন। এই প্রবাল অলঙ্কার তৈরিতে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। লাল রঙ্গের লোহিত প্রবালের কদর সারা দুনিয়াময়। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন নামের পুরো দ্বীপটাই একটি প্রবাল দ্বীপ। কোরআন মজিদে সূরা আর রহমানে ‘মারজান’ তথা প্রবালের প্রশংসা পাওয়া যায়। Mohs Scale of Mineral Hardness সূত্রানুযায়ী প্রবালের কাঠিন্য ৩.৫।
মুক্তা (Pearl)
মুক্তা হল পৃথিবীর দামী রত্ন গুলোর মাঝে আরেকটি রত্ন। এটি উপরে বর্ণিত হীরা ও মানিকের মত তৈরি হয়না। উপরেই বলা হয়েছে এটি একটি প্রাণী প্রদত্ত রত্ম; মুক্তার আরেক নাম মোতি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাদা, ধূসর, উজ্জ্বল গোলাপি, হালকা পিঙ্ক কালারের মুক্তার জন্ম হয়। অসতর্কতা বশত: কোন শক্ত বালি কণা ঝিনুকের দেহাভ্যন্তরে ঢুকে গেলে; ঝিনুক বেজায় অস্বস্থি বোধ করে। ঝিনুকের বহু প্রচেষ্টার পর যখন বালি কণা দেহ থেকে বের করতে না পারে, তখন ঝিনুক তার অস্বস্থি দূর করতে, তার দেহ নিঃসৃত এক প্রকার লালা দিয়ে সেটাকে পেঁচাতে থাকে। ফলে বালি কণাটি ঝিনুকের লালার কল্যাণে বড় হতে থাকে এবং কণাটি পিচ্ছিল হয়ে এক পর্যায়ে নিজের রং হারিয়ে ঝিনুকের খোলসের ভিতরের রং ধারণ করে। পরিশেষে এটিই মুক্তা হিসেবে মানুষের হাতে আসে এবং রমণীর গলায় ঝুলে। ঝিনুকের আকৃতি ও বয়সের উপর নির্ভর করে মুক্তার আকার আকৃতি নির্ভর করে। মুক্তা এক সময় শুধুমাত্র রাজা-রানীর গলায় শোভা পেলেও, বর্তমানে মুক্তা চাষের কল্যাণে, মুক্তাকে গহনা বানিয়ে গলায় ঝুলানো অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে। সকল প্রকার মুক্তা দেখতে এক ধরনের হলেও মিঠা পানির মুক্তা আর লোনা পানির মুক্তার মধ্যে আভ্যন্তরীণ গঠনে ভিন্নতা আছে। মুক্তা গঠিত হয় ক্যালসিয়াম কার্বনেট যৌগ দ্বারা। কোরআন মজিদে সূরা আর রহমানে ‘লুলু’ তথা মোতির প্রশংসা পাওয়া যায়। বেহেশতি মানুষের পোশাকে স্বর্ণ-রৌপ্যের সাথে মুক্তার ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে। Mohs Scale of Mineral Hardness সূত্রানুযায়ী মুক্তার কাঠিন্য হল ২.৫।
উপরে বর্ণিত রত্নগুলো প্রতিটি মানুষের কাছে লোভনীয়। দামী কন্যার জন্য যেভাবে দামী পাত্রের প্রয়োজন, সেভাবে এই রত্নগুলো ব্যবহার করার জন্য দরকার সোনা-রুপা নির্মিত পাত্র। সোনা-রুপার নান্দনিক কারুকাজ সজ্জিত গহনায় রত্নগুলো বসিয়ে খুশিমতো ব্যবহার করা যায়। সে জন্য সোনা-রুপাকে নিজের ইচ্ছেমত গলাতে, বাঁকাতে ও ব্যবহার করতে আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন বুদ্ধি ও ক্ষমতা। সোনা-রুপার মত পাথর জাতীয় রত্নগুলো উত্তোলন, আহরণ, সংরক্ষণ এবং পক্রিয়াজাত করণের সব পদ্ধতিই কঠিন ও দূরহ। সে সব রত্ন পাথরগুলো দামী হলেও ইসলাম আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় ও আয়-ব্যয়ের মানদণ্ড সোনা-রুপার মাধ্যমে করেছেন। মুসলমানেরা বিগত দেড় হাজার বছর ধরে সোনা-রুপার মূল্যমান ঠিক করে জাকাত দিয়ে আসছে। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বিচারে ইসলাম যেভাবে সোনা ও রুপাকে আদর্শ মানদণ্ড বানিয়েছেন; সেভাবে বর্তমান দুনিয়াতেও সোনা-রুপাই হল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মানদণ্ডের একমাত্র মাপকাঠি। ইসলামের দেওয়া এ বিধান পুরো দুনিয়ায় কার্যকর রয়েছে শত শত বছর ধরে। ইসলাম অন্য কোন রত্নকে এ কাজের মাফকাঠি বানায়নি, বর্তমান পৃথিবীতেও রত্ন পাথর কোন মাপকাটি হয়নি।
সৌখিনতা বশতঃ অনেকে এসব পাথরকে রত্ন হিসেবে ব্যবহার করলেও, যারা জ্যোতিষ শাস্ত্রে বিশ্বাসী তারা বিপদগ্রস্থদের ভাগ্য উন্নয়ন কিংবা বিপদ মুক্তির জন্য এসব রত্ন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ব্যবহার কারীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, পাথরের কল্যাণেই তার শুভ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে অথবা পাথরের কারণে নিশ্চিত ঐ বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছে! সে জন্য ভাগ্যকে জয় করতে, অনেকে বহুদাম দিয়ে এসব রত্ন পাথর ব্যবহার করেন। জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে অর্থকড়ি থাকলেই, যে কোন রত্ন কিনে ব্যবহার করা বিপদজনক হতে পারে। এতে ব্যক্তি ভাগ্যগুণে যে সম্পদ অর্জন করেছেন, রত্নের উল্টো প্রতিক্রিয়ায় ভাগ্যদোষে তা হারিয়েও ফেলতে পারেন! ব্যক্তির জন্য সঠিক রত্ন হলেও চলবেনা, ঠিক রত্ম ব্যবহার করেও মহা মুসিবতে পড়তে পারে! কুলগ্নে জম্ম গ্রহণকারী রত্নের ব্যবহারে নিশ্চিত বিপদ হবে। এক্ষেত্রে সুলগ্নে জন্মগ্রহণকারী রত্নই একজন মানুষের ভাগ্যকে রত্নের মত ঝলমলিয়ে দেবে! সুলগ্ন, কুলগ্ন, জন্ম সময় নির্ধারণ, পাথরের উপাদান সব কিছু বিশ্লেষণ করে একজন জ্যোতিষী তার মক্কেলের সু-ভাগ্যের জন্য পাথর নির্বাচন করে থাকেন। জ্যোতিষীদের সোজা ও কড়া দাবী হল, পাথরে ভাগ্য ফিরাতে পারে, আবার ভাগ্য বিপর্যয়ও ঘটাতে পারে, কুলগ্নে জন্ম নেয়া সঠিক পাথর ব্যবহারে রাজা তার রাজ্যও হারাতে পারেন। তাই এত বিপদজনক মুসিবত থেকে বাঁচতে সরাসরি জ্যোতিষী থেকে পরামর্শ নিয়ে জ্যোতিষির মাধ্যমে রত্ন কেনাই উত্তম। সাধারণত ভারতের প্রায় সকলেই এমনকি সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা উপরোক্ত কথা চোখ বন্ধকরে বিশ্বাস করে।
ইসলামে রত্ম নিয়ে অনেক কথা আছে; তবে সব কথাগুলো রত্নের ব্যবহারের বিষয়ে জড়িত। যেমন সমুদ্রের পরিচয় দিতে বলা হয়েছে, “তিনিই কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন সমুদ্রকে, যাতে তা থেকে তোমরা তাজা মাংস খেতে পার এবং তা থেকে বের করতে পার পরিধেয় অলঙ্কার”। নাহল-১৪। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘উভয় দরিয়া থেকে উৎপন্ন হয় মোতি ও প্রবাল’। আর-রাহমান-২২। ইসলামে এসব ব্যবহার করতে কোন বাধা ধরা নিয়ম–নীতি নেই। বরং পাথরে ভাগ্য ফেরে একথা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে চরম কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। যেমন; রত্নে ভাগ্য ফিরাবে এ কথা বিশ্বাস করে, জ্যোতিষীর পরামর্শ চাইলে ৪০ দিনের এবাদত বরবাদ হবে। জ্যোতিষীর কাছে হাত দেখিয়ে, জ্যোতিষীর চেয়ারে বসলেই ৪০ দিনের দোয়া কবুল হবেনা। ইসলামের দাবী হল, আল্লাহর কাছে পুরো পৃথিবীর মূল্য, মশার একটি ডানার মতোও নয়। আল্লাহর কাছে এসবের মূল্য না থাকলেও মানুষের কাছে এর মূল্য অনেক। তাই আল্লাহ মানুষের এই প্রবণতার প্রতি খেয়াল রেখে বলেছেন, জান্নাতকে এসব রত্মরাজি দিয়ে সাজানো হবে। কোরআনে বলা হয়েছে: ‘নিশ্চয় যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে প্রবেশ করাবেন উদ্যান সমূহে, যার তলদেশে ঝরনাসমূহ প্রবাহিত হবে। তাদেরকে স্বর্ণ-কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করানো হবে এবং রেশমি পোশাকে তাদের আবৃত করা হবে’। আল-হাজ্ব-২৩। বহু হাদিসে জান্নাতের অধিবাসীদের এসব রত্নরাজি দিয়ে অলঙ্কৃত করার কথা বলা হয়েছে। দুনিয়ার বিচারে এই রত্মরাজি খুবই সেরা কিছু হলেও, জান্নাতের জন্য হবে খুবই নগন্য উপাদান। বলা হয়েছে, সেরা উপহারের ধরণ ও প্রকৃতি কি হবে, মানুষ তার সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে কখনও হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেনা।
রত্মকে ঘিরে যত কথা, যত কাহিনী! ব্যক্তি জীবন যদি সুখের না হয় তাহলে এর সবই অর্থহীন! আত্মহত্যায় উদ্যত ব্যক্তির কাছে রত্ম খুবই অর্থহীন সামগ্রী! পৃথিবীর ভোগ বিলাসে আখাঙ্খিত মানুষের কাছে এসব বহু বড় মূল্যবান বস্তু। তবে তার চেয়েও বড় মূল্যবান নিজের জীবন, যদি এটি সঠিক পথে পরিচালিত করানো যায়। জন্ম কুলগ্নে হয়েছে কি সুলগ্নে হয়েছে এর পিছনে না ঘুরে; সব কিছুর মালিক আল্লাহকে যদি রাজি করা যায়, তাহলে সবকিছুই নিজের করায়ত্তে থাকবে। তখন মাংসে পিণ্ডে গড়া এই জীবনখানি রত্নের চেয়েও দামী হবে। ফলে পৃথিবীর মাটি দিয়ে তৈরি এসব রত্ম নিজের পদতলে লুটিয়ে পড়বে। জ্যোতিষীর ধারনায় ভাগ্য ফিরানোর জন্য রত্নের ব্যবহার দরকার; তবে সৌভাগ্যবান না হলে যে কেউ একটি মামুলী রত্নই কিনতে পারবে না, এটা প্রতিটি মানুষকে বিবেকের চোখ দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।








Discussion about this post