উপমহাদেশে প্রাপ্ত গায়ে দুর্গন্ধযুক্ত পোকার মধ্যে গান্ধি পোকার মান-মর্যাদা সর্বোচ্চ। মামাত, খালাত ভাই মিলে এরা কয়েক আকারের হলেও তারা সবাই গান্ধী হিসেবে বিবেচিত।
তাদের নাম কেন গান্ধী! কৃষি বিজ্ঞানীরা ব্যাপক গবেষণা করেও ফাইনাল সিদ্ধান্তে পৌছতে ব্যর্থ হয়েছে! না, না, তাদের সাথে ভারতের জাতির জনক মোহন দাস করমচাঁদ তথা মহাত্মা গান্ধীর কোনই সম্পর্ক নেই! কিন্তু কোন্ দুরাত্মা মহান ব্যক্তিদের সুমহান উপাধি এ ধরনের একটি বিশ্রী কিটের পিছনে লাগিয়ে দিয়েছে, তা আজো উৎঘাটিত হয়নি!
স্বাধীনতার এত বছর পরও এই পোকাদের গোষ্ঠীর নাম বদলানোর গরজও কেউ বোধ করেনি। যা’হোক আমি আমার সামান্য জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে, সেই ঐতিহাসিক গান্ধি পোকার কিছুটা ব্যবচ্ছেদ করতে পেরেছি বলে মনে হয়, আজ সে কথাই বলতে বসেছি।
এটি একটি বেজায় দুর্গন্ধযুক্ত পতঙ্গ! সে কি যেমন-তেমন দুর্গন্ধ! বিয়ে বাড়ীর গায়ে হলুদের একটি অনুষ্ঠান পণ্ড করার জন্য তিন-তিনটে স্বাস্থ্যবান গান্ধী পোকাই যথেষ্ট। শহরের মানুষ এই পোকার সাথে তেমন একটা পরিচিত নয়।
গ্রামীণ জীবনের সাথেই এই পতঙ্গের সখ্যতা বেশী। তবে বর্তমানের গ্রামের ফেসবুক তরুণেরাও ছবি দেখা ব্যতীত এই পতঙ্গ চিনবে কিনা সন্দেহ আছে! গ্রামেই কাছাকাছি একটি সুন্দর ঘটনার সাথে পরিচিত হলাম।
ভদ্রলোক, তার নাতীকে বললেন, পাক ঘরের কোনায় রক্ষিত গৃহস্থালি সামগ্রীর অন্যতম উপাদানের মধ্যে খুন্তি, কোদাল খানা আছে। সেখান থেকে খুন্তিটি যেন নিয়ে আসে।
টগবগে তরুণ কানে মোবাইল লাগিয়ে খুন্তি, কোদাল এবং কুড়াল নিয়ে হাজির হল! বলল, এই তিনটি থেকে কোনটি খুন্তি তা আপনিই নিজেই বাছাই করে নিন! অর্থাৎ গ্রামে বড় হলেও, গৃহস্থালি জীবন চালানোর অন্যতম উপাদান খুন্তি কি জিনিষ, সেটা সে চিনেনা।
এই দৃশ্যে আমি ‘থ’ বনে গেলাম! তাকে বললাম, তুমি তো অনলাইনে ব্যস্ত! এক কাজ কর। গুগলে টাইপ করে দেখ ‘খুন্তি’র চেহারাটা কেমন? সে যথারীতি টাইপ করে বলল, আপনি তো ভুল বলেছেন! ‘খুন্তি’ তো ভারতের ঝাড়খণ্ডের একটি শহরের নাম!
এই যে উইকিপিডিয়ায় আছে! আমাকে আটকানোর একটি বিরাট সুযোগ পেয়ে গেল। আমিও সন্দেহ নিয়ে ভাবলাম, খুন্তি তো পুরানা জমানার নাম। আধুনিক নাম কি হতে পারে! আদৌ এই নাম গুগলে আছে কিনা! তারপরও বললাম, তোমাকে তো স্থানের নাম দেখতে বলিনি, খুন্তি নামক ধাতব বস্তু দেখ।
যা’হোক অনেক ঠেলাঠেলির পর, অবশেষে বেচারা খুন্তির চেহারা উদ্ধার করতে সক্ষম হল। এই হল চলমান প্রজন্ম। পাঠক দুঃখিত! অন্যদিকে চলে গেলাম; আমি কিন্তু গান্ধী পোকার পরিচিতি তুলে ধরতে বসেছিলাম।
রাতের বিয়ে বাড়ীর উজ্জ্বল আলোকছটায় গান্ধী পোকা কদাচিৎ উপস্থিত হয়। তার উপস্থিতির কারণে ক্রন্দনরত কনে নিজের চোখের পানি মোছার কাজ ছেড়ে দিয়ে, উল্টো নাক চিপে ধরতে বাধ্য হবে।
বাবুর্চি পড়ি-মরি করে ভাত-তরকারীর ডেকচি ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। এক ডেক বিরানির সমুদয় সুঘ্রাণ নিমিষেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, একটি ক্ষুদ্র গান্ধী পোকা! কোন সভা-সমিতি বা পরিবেশের উপর দিয়ে উড়ে গেলেই চলে!
বেকুবও বুঝতে পারে স্বয়ং গান্ধীজী এখনই আমাদের আশীর্বাদ করে গেছেন। তার ডানা ঝাপটানোর মাঝেও কটু গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
এই পোকার গায়ের দুর্গন্ধ কেমন, ভুক্তভোগী ব্যতীত কেউ বর্ণনা করতে পারবে না। আধুনিক তরুণদের মধ্যে কেউ কৌতূহলী হলে, তাকে বোঝাবার জন্য একটি ছোট্ট এক্সপেরিমেন্ট করার কথা বলা যেতে পারে। নাপিতের দোকান থেকে মানুষের ফেলে দেওয়া, এক কেজি ছাঁটা চুল আনুন।
সে চুলের বান্ডিল ধুপ দানির উপর রাখুন। এরপর তাতে আগুন ধরিয়ে দিন এবং উত্তম ভাবে ধুয়া সৃষ্টি করুন। ঘরের প্রতিটি কক্ষে এই ধুঁয়া বিলিয়ে দিন। অতঃপর সবাইকে প্রশ্ন করুন, খুশবুটা কেমন লাগছে? প্রত্যেকের উত্তরই হবে এই গন্ধটা মহান গান্ধী পোকার শরীরের মতই লাগছে!
না, গান্ধী পোকার সাথে আমার দুষমনি নেই। তবে সকল গান্ধী পোকাই নিরীহ কৃষকদের আজীবনের শত্রু। একদল গান্ধী পোকা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জমির ফসল নষ্ট করে দিতে পারে।
আমাদের দেশে ফসলের মধ্যে ধান হল অন্যতম। ধানের পোকার মধ্যে মাজরা পোকা, চুঙা পোকা, পামরি পোকা, ঘাস ফড়িং এবং গান্ধী পোকাই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকারক। তার মধ্যে গান্ধী পোকার ক্ষতির মাত্রাটা একটু ভিন্ন প্রকৃতির।
ধানের শীষ ফেটে যখন শিশু ধান মায়ের গর্ভ থেকে বের হয়। তখন সে শিশু ধান চিনির মত মিষ্টি, দুধের মত নরম ও ধবধবে সাদা থাকে। ফলে বিভিন্ন পোকা-মাকড় সেই সুস্বাদু দুধ খাবার জন্য নরম গোশতের শিশু ধানে দাঁত বসিয়ে দেয়।
পরবর্তীতে এই আহত ধান কখনও পরিপূর্ণ ধান হবার সুযোগ পায় না। পোকা যদি শিশু ধানের সম্পূর্ণ দুধ খেয়ে ফেলে, সে ধান হবে চিটা। অর্থাৎ বাহিরে ধানের বাক্স থাকবে বটে কিন্তু ভিতরে চাউল থাকবে না!
পোকা শিশু ধানের সম্পূর্ণ দুধ না খেলেও, পরিণত বয়সে সে ধান থেকে চাউল হবে বটে, তবে তা হবে চিকন, কাল বর্ণের, ওজনে হালকা, মাড়াই করতে গেলে ভেঙ্গে টুকরা হয়ে যাবে।
চেনা-জানা চতুর মানুষেরা বাজার থেকে এই চাল কিনে না। বীজ হিসেবও এই ধান ব্যবহার করা যায়না। যারা এই চাউল চিনেনা, তারা হয়ত খেয়ে নিবে। কোন সমস্যা হয়না তবে যথাযথ শর্করা এই চাউলে অনুপস্থিত থাকে।
কিন্তু মুসিবত হল গান্ধী পোকা শিশু ধানে যদি একবার চুমো দেবার সুযোগ পায়। তাহলে আর সেই চাউলের ভাত খাবার জোগাড় নাই। এই ধানের ভাত রান্না করলেন তো কথাই নেই।
ভাত খাচ্ছেন? মাছ, গোশত, বিরানি, জর্দা, কিংবা কোরমা? কোনটাই বুঝতে পারবেন না। মনে হবে, ধনে পাতা, পিঁয়াজ মিশ্রিত তাজা গান্ধী পোকার সুস্বাদু ভর্তা খাওয়া হচ্ছে! কি বিতিকিচ্ছিরি দশা! কল্পনা করুন একবার!
মূলত গান্ধী পোকা একবার শিশু ধানে দাঁত বসালে, গান্ধীর পোকার দুর্গন্ধ সেই ধানের জীনের মধ্যেও প্রবেশ করে। ভাত রান্না করলে সেই ভাত থেকেই হালকা ভাবে গান্ধীর ঘ্রাণ বেরুতে থাকে।
শুধু কি ধান! কিছু গান্ধী পোকা পেঁপে, পেয়ারা সহ নানাবিধ ফল ও সবজিতেও একই দুষমনি করে থাকে। সেই গাছের পাকা ফলের ঘ্রাণের মধ্যেও, মহান গান্ধীর কিছুটা খুশবো যোগ হয়ে যায়।
গান্ধীর পোকার কাহিনী শুনে আপনারা হয়ত এতক্ষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। দুশ্চিন্তার কোন কারণ দেখিনা। দিন দিন দেশে ধানের চাষ কমছে, চাষা উপযুক্ত ধানের দাম পাচ্ছেনা বলে ভবিষ্যতে আর চাষাবাদ হবেনা।
আমি একজন পেশাদারী কৃষকের সন্তান বলে হয়ত খুব কাছে থেকেই প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছি। ফলে আজ লিখে যাচ্ছি। লবণ, কেরোসিন, কাপড় আর ঔষধ ব্যতীত বাকী সকল জিনিষই গ্রামে উৎপাদিত হত। ফলে কাউকে শহরের প্রতি তাকিয়ে থাকতে হত না।
ভবিষ্যতে এসব কথা ইতিহাস হয়ে যাবে, নতুন করে আর কিছু লিখতে হবেনা। তাই গান্ধী পোকার উপর ক্ষিপ্ত না হলেও জীবন চলে যাবে। চর্চার অভাবে আমাদের নিকট থেকে প্রাচীন কৃষি বিদ্যা হারিয়ে যাবে।
তাই আমরা অতি নিকট ভবিষ্যতে একটি আমদানি নির্ভর তথা পর নির্ভর জাতি হয়ে যাব। ইতিমধ্যে প্রায় বার আনা পরিপূর্ণ করেছি। তারপরও ভাবতে আশ্চর্য লাগে, ভারত আমাদের পাশের দেশ, আর মরু-আরব অনেক দূরের দেশ!
তারপরও দুবাই-আবুধাবিতে পিঁয়াজ, রসুন, আদা, মসল্লা, ঘি, তৈল সহ নিত্য ব্যবহার্য জিনিষের দাম আমাদের দেশের চেয়েও কম। কিন্তু আমাদের এদেশে চড়া দাম! এদেশে যার নিকট অনেক টাকা থাকবে, সে জীবন উপভোগ করতে পারবে।
যার আয় সীমাবদ্ধ তার জীবনও হাজারো প্যাচে আবদ্ধ হবে। তার জন্য গান্ধী পোকার দুর্গন্ধযুক্ত চাউল পাওয়াও ভাগ্যের বিষয় বলে গণ্য হবে।



Discussion about this post