ভারতীয় গুজরাটের বর্তমান রাজধানীর নাম ‘আহমেদাবাদ’। এই নগরীর গোড়াপত্তন করেছিলেন তদানীন্তন ভারতের অন্যতম মুসলিম শাসক “সুলতান আহমেদ শাহ” (১৩৮৯-১৪৪২)। সুলতান আহমেদ শাহ নিজে ও তাঁর ধর্মীয় ওস্তাদ শেখ আহমেদ কাত্তু গঞ্জে বক্সের নামে মিলিয়ে সাবরমতি নদীর তীরে আহমেদাবাদ নামে এই নতুন নগরী সৃষ্টি করেন। মানুষ খুন
একদিন নদীর পানিতে ভেসে যাওয়া এক বিরাটকায় মটকার ভিতরে একটা মৃত দেহ পাওয়া যায়। এই মৃত ব্যক্তির পরিচয় ও খুনিকে বের করার দায়িত্ব পড়ে নগর কোতোয়ালের উপরে। কোতোয়ালের তিন মাসের কার্যক্রম পণ্ডশ্রম হলে, নতুন করে দায়িত্ব পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর ঘাড়ে। তিনিও খুনি উদ্ধারে যথারীতি ব্যর্থ হলে পরে। সুলতান আহমেদ শাহ খুবই দুঃচিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। যদিও তখনও কেউ নিহত ব্যক্তির পরিচয় দাবী করেনি কিন্তু তার মুল্লুকেই খুনের ঘটনা ঘটেছে। সুতরাং তারই রাজত্বে সংঘটিত এই খুনের দায়ভার তার উপরে বর্তায়। পবিত্র কোরআনের সেই আয়াত তাকে বারে বারে পীড়িত করতে থাকে। “অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল”। আল মায়েদা-৩২।
নিজ মুল্লুকে সংঘটিত মানুষ খুন এর ঘটনার দায় থেকে নগরপতি মুক্ত নন, হৃদয়ের এই যাতনা তাকে কষ্ট দিতে থাকে। তাই খুনের ঘটনা উদ্ধারে সুলতান নিজেই ছপ্দবেশে বের হয়ে পড়লেন। বৃহদাকার মটকার ব্যবসায়ী সেজে তিনি নদীর উজানে একের পর এক পল্লী ও গঞ্জ পাড়ি দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি এমন একজন মানুষকে পেয়ে যান, যিনি বড় মটকা বানানোতে দক্ষ। তাছাড়া তিনি কারো দেওয়া অগ্রিম টাকার বিনিময়ে দুটো মটকা বানিয়েছিলেন কিন্তু ক্রেতা মাত্র একটি মটকা নিয়ে যান। বাকিটা এখনও তার বাড়ীর সামনে পড়ে আছে। সুলতান স্বচক্ষে পরীক্ষা করে দেখলেন যে, এই মটকা আর মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া মটকা দুটো দেখতে একই এবং সমান আকৃতির। সুলতান এই ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে বহু দিনের প্রচেষ্টায় একদিন মটকার ক্রেতা তথা সেই খুনিকে বের করে ফেলেন এবং খুনের বিনিময়ে যথোপযুক্ত শাস্তির বিধান করেন।
দেশে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষাকল্পে সুলতানের নেওয়া দৃঢ় ও কঠোর পদক্ষেপের কথা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৪১১-১৪৪২ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩২ বছরের শাসনামলে তার দেশে মাত্র দুটো খুনের ঘটনা ঘটেছিল। দুটো খুনের বিচারই তিনি করেছিলেন। তার মুল্লুকে খুন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিলনা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষই ন্যায় বিচার পেয়েছে। মানুষের মনে খুনের নেশা জাগবে দূরের কথা, সামান্যতম অপরাধ করার কথাও মাথা থেকে তিরোহিত হয়ে যায়।
তার একমাত্র মেয়ের স্বামী ঘোড় সওয়ার নিয়ে যাবার সময়, পথিমধ্যে দুধ বহনকারী গরীব বিক্রেতা রাস্তা ছাড়তে দেরী করে ফেলেছিল। তিনি লাটি দিয়ে আঘাত করেছিলেন এতে দুধ বিক্রেতা ঘটনাস্থলে মারা যায়। বিচারক রক্ত-পণের মাধ্যমে দুধ বিক্রেতার স্ত্রীর সাথে ব্যাপারটি মিটিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু সুলতান ভাবলেন এটা অন্যায়। ধনী কিংবা ক্ষমতাধর রাজশক্তি, নিরীহ কাউকে এভাবে হত্যা করে, প্রচুর অর্থ দিয়ে বেচে যাবার বিশ্রী দৃষ্টান্ত বাড়াতে থাকবে। এতে রাষ্ট্রীয় জীবন ভঙ্গুর ও নাগরিক জীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
একমাত্র কন্যার স্বামী হওয়া স্বত্বেও প্রচুর মানুষের উপস্থিতিতে নগরীর উন্মুক্ত ফটকের সামনে নিরাপত্তা দেওয়ালের পিটে নিজের কন্যার স্বামীকে খুনের অপরাধে লটকিয়ে দিয়েছিলেন! চিরতরে সে সমাজ থেকে শুধু অপরাধী নয় ন্যুনতম অপরাধ করার মানুষটিও হারিয়ে গিয়েছিল।
আজকে রাস্তা-ঘাটে, ঘরে-বাহিরে অগণিত মানুষ খুন হচ্ছে। কেউ কোথাও নিরাপদ নেই। নৌকা ঢুবিতে অনেক ছাত্র-শিক্ষক মারা গেল, কেউ দায় নেবার নেই। হিউমেন হলারের আঘাতে প্রতিবছর কত মানুষ মরে, কারো দায় নেবার গরজ নেই। বিদ্যুতের তারে পেঁচিয়ে মানুষ মরে কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের কাউকে দায়িত্ব নিতে হয়না। সাকো, ব্রিজ, ভবনে লোহার বদলে বাঁশ দেওয়া হচ্ছে আরো মানুষ মরবে। তখনও মানুষ মরবে কিন্তু কারো উপর দায় বর্তাবে না। মানুষের জীবন নিয়ে কত অবহেলা প্রতিনিয়ত হয় এদেশে। আবার শুনি কিছু মৃত্যু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বৈকি অন্য কিছু নয়। অথচ এই ব্যাপারটিকে হাদিস শরীফে কত কঠোরতা দিয়ে বলা হয়েছে, “দুনিয়া ধ্বংস করে দেওয়ার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণিত কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।” (তিরমিজি)
ধর্মীয় ও নৈতিক জ্ঞান না থাকার কারণে মানুষ এমন খুনো প্রকৃতির ও অবিবেচক স্বভাবের হয়ে উঠেছে। তারা তাদের পরিণতি নিয়ে ভাবছে না। দুনিয়ার জীবনে সামান্য কয়টা টাকা অতিরিক্ত পাবার জন্য নিজেদের হৃদয় মনকে এমন নিষ্ঠুর বানিয়েছে। হাশরের ময়দানে প্রথম যে বিচারকার্য শুরু হবে তা হল খুনের বিচার। তামার ন্যায় উত্তপ্ত ময়দানে দাড়িয়ে, মাথার ঠিক উপরে সূর্যের গনগনে তাপের মধ্যে সিদ্ধ হয়ে, মানুষ ভয়ে-আতঙ্কে আড়চোখে তাকাবে জাহান্নামের ভয়াবহ দৃশ্যের দিকে। ভয়ানক তাপের ময়দানে দাড়িয়ে থাকতে চাইবে কিন্তু জাহান্নামে যেতে চাইবে না। এই পরিণতি দুনিয়ার জীবনের বেজায় লোভ ও তুচ্ছ স্বার্থের কারণেই জুটবে। শুধুমাত্র কি খুনির জন্য এই দশা হবে? মোটেও না! যারা খুনের দৃশ্য উপভোগ করেছে। ক্ষমতা থাকা স্বত্বেও বিহিত পদক্ষেপ নেয়নি। খুনিদের ঘৃণা করেনি অধিকন্তু তাদের সাথে বন্ধুর মত হয়ে নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনকে একাকার করে ফেলেছে! কোন কথাবার্তা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ব্যতিরেকেই সবার পরিণতিই এমনই হবে।

Discussion about this post