উম্মুল মোমেনীন মারিয়া কিবতিয়া (রাঃ) ইসলামী ইতিহাসের বিরাট একটা অংশ জুড়ে অবস্থান করছেন তিনি। হোদায়বিয়ার সন্ধির পরে, রাসুল (সা) এর কাছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর সুযোগ ঘটে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আন্তর্জাতিক পরিসরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শাসকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র প্রেরণ করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি মিশরের শাসকের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তদানীন্তন মিশরের শাসক ‘মুকাউকিস’ বিশ্বনবী (সাঃ) এর দূতকে অত্যন্ত সম্মান মর্যাদা দান করেছিলেন।
বিশ্বনবী (সাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র পত্র বাহক ‘হাতিব’ (রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) এর মাধ্যমে নবী সাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর জন্য প্রচুর উপঢৌকনসহ সম্মানজনক ভাবে মিশরের রাজ দরবার থেকে বিদায় করেছিলেন। মিশরের শাসক ‘মুকাউকিস’ উপঢৌকনের সাথে ‘মারিয়া কিবতিয়া’ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা কেও নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে রাজকীয় উপহার হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। সুদূর মিশর থেকে প্রেরিত এই নারীকে খাদেমা হিসেবে না রেখে, নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী হিসেবে মর্যাদা দিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি রাসুল (সা) এর সর্বশেষ সন্তান ইবরাহীম রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর মাতা হবার দুর্লভ সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। খাদিজা (রা) ব্যতীত আর কোন স্ত্রী নবী (সা) এর সন্তানের মা হবার সৌভাগ্য পান নি! ব্যতিক্রম ছিলেন ‘মারিয়া কিবতীয়া’ (রা)। যদিও সে পুত্র শিশু বেশীদিন বাঁচেন নি।
আরও পড়ুন
- উম্মুল মোমেনীন উম্মে সালমা (রাঃ)
- উম্মুল মোমেনীন জোয়াইরিয়া (রাঃ)
- উম্মুল মোমেনীন উম্মে হাবিবা (রা)
মিশরের শাসক মুকাউকিস নবী সাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর দূত ও পত্রের প্রতি যে সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করেছিলেন, সে কারণেই বোধহয় তার সম্মান মহান আল্লাহ বৃদ্ধি করেছিলেন। বিশ্বনবীর জীবনী যারাই পাঠ করে, তারাই তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে বাধা হয়।
রোম সম্রাট ‘হিরাক্লিয়াস’ প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করার ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন! কিন্তু উজির-আমলাদের তুমুল প্রতিবাদের ফলে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করে সিংহাসন ও জীবন হারানোর ঝুঁকি নিতে চায় নি! ধারণা করা হয়, সেই একই কারণে মিশরের শাসক মূকাউকিসও ইসলাম গ্রহণ করতে পারেন নি। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি তাঁর অসীম শ্রদ্ধা ছিল। ইসলামের সাথে তিনি বন্ধুর মতই আচরণ করেছেন।
আল্লাহর নবীর প্রতিটি স্ত্রীই ছিলেন ইসলামের বাস্তব নমুনা। রাসুলের অবর্তমানে মানুষ কোন সমস্যায় নিপতিত হলে তার স্ত্রীদের নিকট থেকেই মানুষ সমাধান গ্রহণ করছেন। ইসলামী জ্ঞানের জগতে তারা সবাই ছিলেন, এক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সদৃশ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাদের সবাইকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন। তাদের হক আদায় করেছেন। বিরাট ধনীর মেয়ে ছিলেন অনেকেই কিন্তু নবীর ঘরে এসে বহু কষ্টে দিনাতিপাত করেছেন! তবুও তারা সামান্যতম অভিযোগ তুলেন নি। এতগুলো স্ত্রী থেকে লাখো লাখো মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, তাদের একজনও তাদের জীবন নিয়ে পরিতাপ-আফসোস করেন নি!
তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে গিয়েছিল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। ওমর (রা) খেলাফত কালে তাদের জন্য অনেক অর্থ ভাতা হিসেবে দেওয়া হত। তারপরও তাদের কেউ কোন সম্পদ জমা করেননি। যখন যা হাতে এসেছে তাই আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিয়েছেন। হযরত মারিয়া কিবতিয়াকে বিয়ে করার পরে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর কোন স্ত্রী গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। সে হিসেবে তিনিই সর্বশেষ স্ত্রী। হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর খেলাফতের সময় তিনি মদিনাতেই ইন্তেকাল করেন। তার জানাযার নামাজ আদায় করিয়েছিলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু স্বয়ং নিজেই। মিশেরর মেয়ে রাজকীয় দাসী হিসেবে এসেছিলেন মদিনায়, তিনি আবার রাসুল (সা) স্ত্রী হয়ে মদিনাকেই ভালবেসে, সেখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন। আত্মীয় বিহীন জনপদে স্বামীর ইন্তেকালের কারণে তিনি নিজ দেশে ফিরে যান নি। মসজিদে নববীর অদূরে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে তাকে চির নিদ্রায় শয়ন করিয়ে দেওয়া হয়।
মিশরীয় লেখক মাহবুব মুজাচ্ছাম আল হোদয়াবী কর্তৃক রচিত বিশ্বনবী থেকে সংকলিত…


Discussion about this post