আমি সে সময়ের দুর্ভিক্ষের কথা আজো ভুলি নি। মা সকালে একটি মাত্র আটার রুটি দিতেন! তাতে বিশ্রী গন্ধ, খেতে চাইলেও খেতে পারতাম না। মুরুব্বীরা বলত, আটায় গাছের গুড়ি মেশানো। পানিতে পচা পাতার ন্যায় দুর্গন্ধ যুক্ত রুটি খেতে না চাইলে, অভুক্ত পেটের শীর্ণ শরীরে কিল ঝুটত! পাঁজরের হাড় গুলো গোনা যেত, কোন মনে এক টুকরো চামড়া তাতে সেটে বসে আছে। রুটির বদলে ভাতের জন্য কান্না করতাম। কিসের ভাত! বহু পরিবারের চুলায় ভাত বসেনি কতদিন। মিতব্যয়ী ও উদার হউন সে দুর্ভিক্ষ যেন না আসে
এক চাচি মা আমাকে খুব আদর করতেন, আমার শরীরের দশা দেখে তিনি ঘরে থেকে বাটিতে করে কিছু বাসি ভাত নিয়ে আসলেন। খুবই লজ্জিত স্বরে বললেন, এই এক মুঠো ভাত কিভাবে দেই! এই ভাত টুকু ঘরের ওনার জন্য রেখেছিলাম, গতকল্য ওনি কাজের সন্ধানে বেরিয়েছেন আজো ফিরে নি। দুই ওয়াক্ত বাসী হয়েছে কিন্তু পঁচে নি। মাকে না বলার সুযোগ দেই নি, আমিই নিয়ে ফেলেছিলাম। কি তরকারী যোগে খেয়েছিলাম মনে নেই, তবে এতটুকু মনে আছে এই ভাতে আমার খিদের ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পাকিস্তান আমলের বহু নগদ টাকা অযত্নে ঘরে পড়ে ছিল। ও গুলো নাকি অকেজো টাকা এখন এগুলোতে কাম নেই। বাবা জায়গা বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করবেন এমন ওয়াদা করে এলাকার চরম অসাধু ব্যক্তি থেকে কয়েক সের চাউল এনেছিলেন। বাবার হাতে চাউল দেখে আমার মনে ঈদের আনন্দ ঘিরে ধরেছিল। রাত হয়ে গিয়েছিল। উপস্থিত মানুষের সামনে বাবা লজ্জায় বাকি চাইতে পারবেন না বলে মানুষের আনাগোনা কমার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। ফলে রাত নেমেছিল।
আরো দেখুন…
উৎপীড়ন : সমাজ ও রাষ্ট্রের মরণ ব্যাধি
আমার আজো মনে আছে। পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ। মা চাউল ধুয়ে সেটা উনুনে বসালেন। আমি তা পাহারা দিচ্ছি। অপেক্ষায় আছি, কখন চাউল গুলো ভাত হবে! চাউলের ভাত হতে, অনেক সময় লাগে। তখন শিখলাম চাউলকে ভাত বানানো টাও অনেক কষ্টের এবং খিদে নিয়ে এভাবে অপেক্ষা আরো কঠিন।
অবশেষে সেই গরম ভাত প্রথমেই আমার পাতে আসে। সে অনুভূতি আজো মনে আছে, সুন্দর ছোট চাউলের স্বচ্ছ ভাতের এক নলা মুখে দিয়েছিলাম! সারা ভাতেই পানি পচা কটু গন্ধ। ভয়ঙ্কর খিদের মধ্যেও এটা মুখে নিতে কষ্ট হল। মাকে বললাম, এই ভাত খাব না, পচা গন্ধ! খাদ্যের মধ্যে দোষ খোঁজা, খাদ্য নষ্ট করা মা একদম বরদাশত করতেন না। অভুক্ত পেটে শীর্ণ শরীরে সেদিন এমন মার খেয়েছিলাম সারা জীবনে কোনোদিন ভুলি নি! মিতব্যয়ী ও উদার হউন সে দুর্ভিক্ষ যেন না আসে
পরে ক্ষুধা সহ্য করার অভ্যাস করেছি। কম খেয়ে পরিতৃপ্ত হবার চেষ্টা করেছি। থালা বাটি চেটে খাওয়ার জন্য মা প্রায় বাধ্য করতেন। বারে বারে মনে করিয়ে দিতেন সেই সময়ের দুঃসহ পরিণতির কথা। তাই আমি আজো চেটে খাই। পরে জানতে পেরেছি এটা রাসুল (সা) নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত এবং এটাতে বরকত হয়। হ্যাঁ, আমি আজীবন বরকত পেয়েছি, এখনও পাই। আমার এই অভ্যাস জারি রাখতে আমার সহধর্মীনিও আমাকে সাহায্য করেন কেননা তিনিও একই অভিরুচির। সেই রাতের ভাত, পরবর্তীতে আর কেউ খেতে পারেনি! এর পর থেকে মা আমাকে বেশী বেশী আদর করতেন এমনকি বৃদ্ধাবস্থায়ও! আমি পরিবার নিয়ে বাড়িতে গেলে, মা আমার স্ত্রী থেকে অনুমতি নিয়ে নিতেন, যাতে একটি রাত একাকী তাঁর সাথে থাকি। আমি তাঁর সাথে থাকতাম, আমাকে সারা রাত শিশুর মত যত্ন করতেন আর সেই রাতের মারের জন্য আফসোস করতেন। তিনি আমার জন্য যতগুলো দোয়া করেছেন সব দোয়াই আল্লাহ কবুল করেছেন!
সেই দুর্ভীক্ষের বেদনা
এটি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা বলছি। তখন আমার বয়স আট বছর। পরিপক্ব বালক অবস্থা। নিজের চোখে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখেছি, মানুষের চরম অভাব দেখেছি, নিজেও ভয়ঙ্কর খিদের যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছি। ও হ্যাঁ! এটা কোন এক জনপদের অভাবী পরিবারের কাহিনী বলছি না! এটা আমি তদানীন্তন কালের একটি সচ্ছল পরিবারের কথা বলেছি। যার বাবার কাছে বিল ভরা জমি ছিল। ঘরে নগদ টাকা ছিল। সম্মান মর্যাদায় একাকার ছিল। যার মা ছিল ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে ধনীর ব্যক্তির আদরের বড় কন্যা।
আরো পরে বুঝতে পেরেছিলাম আমরা অনেক ভাল ছিলাম। পরিচিত অনেকে, রাস্তার পাশের কচু-ঘেচু, অচেনা, অজানা লতা পাতা সেদ্ধ করে খেত। এসব খেতে কিছু না হলেও অন্তত কিছুটা লবণ তো চাই? তাই এক চামচ লবণের জন্য কারো বাড়িতে হাত পাতত! লবণ খুবই দামী জিনিষ। সের মাত্র ত্রিশ টাকা! হয়ত ভাবছেন অনেক সস্তাই তো ছিল! না! মোটেও না! তখন আমেরিকান ডলারের বাজার দর তিন টাকা। তার মানে দশ ডলার! বর্তমান বাজারে দশ ডলারে কত টাকা জানি? মিতব্যয়ী ও উদার হউন সে দুর্ভিক্ষ যেন না আসে
করোনা মহামারি পরবর্তী করনীয়
করোনা মহামারির পরে ধেয়ে আসতে পারে সে ধরনের আরকটি দুর্ভিক্ষ! সারাবিশ্বের জ্ঞানীরা এমনই আভাস দিচ্ছেন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, সে ধরনের দিন যাতে বাংলাদেশের মানুষ আবার না দেখে। তাই সময়কে কাজে লাগান। কম খাওয়ার অভ্যাস করুন এবং অন্যের দিকে সহমর্মিতার হাত প্রসারিত করুন। যাদের ঘরে একমাসের খাদ্য মজুদ আছে, তারা এসব খাদ্যে দেড় থেকে দুমাস চলার জন্য পরিকল্পনা করুন। এটাতে বরকত আসবে, ধৈর্য বাড়বে। একে অন্যকে সহযোগিতা করলে, সমাজে আন্তরিকতা বাড়বে, যা নিজের নিরাপত্তার জন্য খুবই জরুরী। তাছাড়া আল্লাহও এতে খুশী হয়। বিপদ আসলে ব্যাংকের টাকা ব্যাংকেই পড়ে থাকবে, জিনিষ পত্রের অভাবে না খেয়ে মরতে হবে। অসৎ বৃত্তির মানুষকে সুযোগ দেওয়া যাবে না এমন কি কথা দিয়েও নয়। এদেরকে এখন থেকেই ঘৃণা করতে থাকুন। অভাবের দিনে ভয়ানক শত্রু। এরা প্রয়োজনে কৃপণ হয় কিন্তু কখনও উদার হয়না। দুর্ভিক্ষের দিনে এরাই অভাবকে বেশী মাত্রায় বাড়িয়ে তুলে।


Discussion about this post