সময় এখন রাত ১১টা, ২৯ শে এপ্রিল ১৯৯১। বাহিরে প্রবল বাতাস বয়ে চলছে। পুরো দিন গুমোট বাধা পরিবেশ এবং সন্ধ্যার দিকে দমকা হাওয়ার প্রবাহ চলছিল। সন্ধ্যার দিকেই পুরো শহর ফাঁকা হয়ে পড়েছে। রাস্তায় যান বাহন, রিক্সা-টেক্সি নাই্ বললেই চলে। ১০ নম্বর মহা-বিপদ সংকেত ঘোষনা হয়েছে সকাল থেকেই। এখন তার চুড়ান্ত সন্ধিক্ষণ উপস্থিত! ক্ষণে ক্ষণে বাতাস ও পরিবেশের চিত্র পাল্টাচ্ছে। বিদ্যুৎ তারের একে-অপরের সংঘর্ষে বিকট ধ্বনির মাঝে শহরের এক একটি এলাকা অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে! ইতিমধ্যে বেশ কয়েটি ট্রান্সফরমার ফেটে যাবার শব্দ শুনা গিয়েছে। জানালার কিয়দংশ খুলে বাহিরে তাকিয়ে আছি। এ জায়গা থেকে শহরের বহু দূর পর্যন্ত পর্যন্ত দেখা যায়।
শহরের সর্ববৃহৎ কবর স্থানের কোল ঘেঁষেই আমার বাসস্থান। জানালা খুললেই বিশাল কবরস্থানের সুমসাম নীরবতা উপভোগ করেছি অনেক দিন ধরে। সারা শহরের লাশ এখানে আসতে থাকে। ফলে সারা রাত, সারা দিন লাশ দাফনের কসরত চলে। প্রতি ঘণ্টায়, প্রতি দিন, প্রতি মাসে এবং বছরে কত লাশের শেষ যাত্রা দেখেছি তা শুমার করা সম্ভব নয়। এখনও একটি লাশ দাফনের অপেক্ষায় আছে। স্বজনদের তাড়া হুড়োর মাঝে লাশটি দাফনের চেষ্টা চলছে।
বাতাসের গতি এতই প্রবল যে, কারো পক্ষে কবরের কিনারে সোজা হয়ে দাঁড়ানোটাই কষ্টকর হচ্ছিল; ফলে লাশ দাফন সম্ভব হল না! কবরের দেওয়াল ঘেঁষে অগণিত বাস্তুহারার বসবাস। তাদের বাসস্থান নিমিষেই হাওয়ার মিলিয়ে গেল। নিরাপত্তার আশায় এসব মানুষ গুলোকে খোলা কবরস্থানের দিতে ধেয়ে আসতে দেখলাম! তাদের কাউকে পুরানো কবরের গর্তে আশ্রয় নিতে দেখলাম! পুলিশের তাড়া খেয়ে কদাচিৎ ছিঁচকে চোরদের এভাবে লুকাতে দেখেছি! সেটা চোখ সওয়া ব্যাপার ছিল কিন্তু আজকের পরিবেশ ভিন্ন! ওদিকে লাশ দাফনের কাজ বন্ধ রেখে মৃতের স্বজনেরা কবরের গর্তে লাশের পাশেই উপুড় হয়ে লুকিয়ে পড়ল! এটি এক বিরল দৃশ্য! এসব মানুষ ভদ্র প্রকৃতির। শহুরে জীবনে কখনও বাহিরে থাকার দরকার পড়েনি। আজ আপন জনের লাশের পাশে লুকিয়ে, নিজেরা লাশ না হবার কসরতে ব্যস্ত! আমি যদিও নিজের কক্ষে বহু কষ্ট করে পৌছাতে পেরেছিলাম তবে, আজকের ১০ নম্বর মহা-বিপদ সঙ্কেতের মধ্যে এই ধরনের পরিস্থিতি মোটেই সু-লক্ষণ বলে মনে হল না। বিশাল কবরস্থান খোলা হবার সুবাদে, বাতাসের গতি আমার জানালার বিপরীত দিকে থাকায়, জানালার ফাঁক দিয়ে শহরের একটি বিরাট অংশ দেখার সুযোগ থাকল। আল্লাহ যেন আজকে লিখার জন্যই সে সুযোগ বানিয়ে দিয়েছিল!
আজ পূর্ণিমার রাত। আকাশ আগুন রঙা। তপ্ত বাতাস। বহু দূর অবধি সবই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। আকাশে বহুবিধ জিনিষ উড়ছে আর মহা সড়কে আছড়ে পড়ছে। প্রকৃতি যেন ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে খ্যাতিমান ও সদা ব্যস্ত জনবহুল স্থান বটতলী রেলওয়ে ষ্টেশনের ঠিক সামনের মসজিদের উপরের তলায় অতিরিক্ত অংশে বানানো একটি হোস্টেলে আমাদের অবস্থান। আজকের বাতাসের গতি বর্ণনা, কল্পনা শক্তি দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন। মসজিদের উপরে বানানো ভবনটি যখন নড়াচড়া শুরু করল মনে হচ্ছিল ভূ-কম্পন শুরু হয়েছে! যে কোন মুহূর্তে পুরো ভবনটি ভেঙ্গে পড়তে পারে। জানালার ফাঁক দিয়ে অন্যের পরিণতি দেখতে গিয়ে নিজেরাই করুন পরিণতির শিকার হচ্ছি কিনা সেটা চিন্তা করে, হোস্টেলের সবাই প্রাণ বাঁচাতে মসজিদের নিচের তলায় আশ্রয় নিলাম!
মসজিদের দরজার গ্রিল ধরে ঠিক বাদুরের মত করে কিছু মানুষ লটকে আছে; সাহায্যের আশায় চিল্লাচ্ছে। বিক্ষিপ্ত উড়ন্ত জিনিষ তাদের শরীরে আঘাত করে চলছে। এসব মানুষ মসজিদে ঢুকে যাতে প্রাণ বাঁচাতে পারে, সে লক্ষ্যে গ্রিল খুলে দিতে দৌড়লাম। গ্রিল খুলতে চেষ্টা করলাম। পারলাম না! কয়েক জন মিলে গ্রিল খুলতে গিয়ে, হেঁচকা টান মারলাম! বাদুরের মত লটকানো মানুষদের মরণ চিৎকার শুনতে পেলাম। দেখলাম গ্রিল খুলতে গেলেও মানুষ মারা পাড়বে।
বাতাসের প্রচণ্ড গতির কারণে মানুষের শরীর লেপ্টে গিয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়েছে। অবস্থা দেখে মনে হল, বাতাস রাগ করেই এসব মানুষকে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে, চিবিয়ে মারতে চায়। বাতাসের বিপরীতে তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে গ্রিল থেকে বের করারও উপায় ছিলনা! আবার গ্রিল ভেদ করে ভিতরে আনারও জো ছিল না। গ্রিল মেলতে গেলে ফাঁক ছোট হবে এতে তাদের শরীরে আরো চাপ পড়বে, মাংস থেঁতলে যাবার ভয় ছিল। মসজিদের ভিতরে দাঁড়িয়ে, অসহায়ত্বকে বুকে ধারণ করে এভাবে প্রকৃতির তাণ্ডব দেখা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর রইল না!
চট্টগ্রামের বুকে গৌরবের সহিত দাড়িয়ে থাকা, বহু দূর থেকে নজরে আসা, বিশাল টেলি যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম বিশাল টাওয়ারটি মুহূর্তে ধ্বসে পড়ে! সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হবার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম এই ঘূর্ণিবায়ু। কর্ণফুলী নদীতে অবস্থান করা প্রায় সকল নৌযান চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। নদীতে অপেক্ষমাণ ‘বাজরা’ প্রবল বাতাসের দোলায়, নোঙ্গর ছিঁড়ে প্রচণ্ড গতি-প্রাপ্ত হয়ে, মাত্র কিছুদিন আগে উদ্বোধন করা চট্টগ্রাম বাসীর বহুকালের অন্যতম স্বপ্ন ‘কর্ণফুলী সেতুর’ মাঝ বরাবর আছড়ে পড়ে। চট্টগ্রামের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের বহুদিনের লালিত স্বপ্নে গড়া এই সেতুটি ক্ষণিকের মাঝেই ভেঙ্গে কর্ণফুলী নদীতে আছড়ে পড়ে। পুরো সেতু দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে পরবর্তীতে বহুদিন কর্ণফুলী নদীতে নৌযান চালানো ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী, বিমান বাহিনীর বহু সামরিক যান ভয়ানক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বিমান বাহিনীর সকল বিমানগুলোই ধ্বংস হয়ে যায়।
টাইগার পাসের দৃষ্টিনন্দন বিশালকায় শিশুগাছ গুলো কাণ্ড শূন্য হয়ে পড়ে! শহরের চারিপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সমুদয় গাছগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়। শহরের যত্রতত্র আবর্জনা, বিক্ষিপ্ত মালামালের কারণে চারিদিকে লণ্ডভণ্ড পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কমবেশি সকল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো শহরকে বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ শূন্য এক ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত করে। পুরো দুনিয়ার সাথে টেলিযোগাযোগ ঠিক করতে বহু দিন লেগে যায় ফলে সঠিক খবর ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা আজো সম্ভব হয়নি।
শহরের বাহিরের জনপদের অবস্থা ছিল আরো করুন। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সবাই চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ফসলী জমি, ক্ষেত-খামার, ফলের গাছ, বাড়ী-ঘর, রাস্তা-ঘাট সবই ধ্বংস হয়েছে। বেশীর ভাগ গাছ কাণ্ড বিহীন দাড়িয়ে! যেগুলো লড়াই করে কিছুটা দাঁড়িয়েছিল, কয়েকদিন পড়ে সেগুলোর চেহারা দেখে মনে হয়েছে এই অঞ্চলের উপর দিয়ে যেন দাবানল বয়ে গেছে! কেননা ততদিনে আর কোন গাছের গায়ে পাতা ছিলনা! ফলে পরবর্তী কয়েক বছর এ অঞ্চলে খাদ্য ও শস্য সংকট লেগেই ছিল।
২৯শে এপ্রিল ১৯৯১ সালের এই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ মরেছে, মরেছে অগণিত প্রাণী। গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগী আর মানুষের লাশে বিধ্বস্ত জনপদ একাকার। পরবর্তীতে বহুদিন পর্যন্ত এই অঞ্চলে পাখির দেখা মেলেনি। স্বাধীনতার পরে স্মরণাতীত কালের মাঝে বাংলাদেশে এটিই ছিল ভয়াবহ দুর্বিপাকের অন্যতম। সারা দুনিয়ায় এ খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশ-বিদেশ থেকে সাহায্য আসতে শুরু করে। লক্ষণীয় ছিল, বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নামকরা সকল কলেজের ছাত্রদেরকে সাহায্য সামগ্রী নিয়ে অবিরত চট্টগ্রামে আসতে দেখেছি। আমার অবস্থান রেলওয়ে স্টেশনের মুখে হবার কারণে দিন-রাত ট্রেন ভরে এসব সাহায্য কর্মীদের চট্টগ্রামে ভিড় করতে দেখেছি। মানুষের সে ধরনের অনুভূতি বর্তমানে খুব কমই দেখা যায়। বিপদে যাদের হাত পাতার অভ্যাস আছে এমন দুর্যোগে তারা আগে সহযোগিতা পায়। সামান্য সম্মানী মানুষদেরও হাতা পাতার অভ্যাস না থাকার কারণে তারা এই পর্যায়েও হতভাগ্য হিসেবেই বঞ্চিত থাকে।
ও হ্যাঁ! আমার সচ্ছল, সমৃদ্ধ পিতাও এই দুর্যোগে পড়েছিলেন। বিরাটকায় বিবিধ ফলের বাগান, রাবার প্লান্টেশন, খামার বাড়ী, বসত বাড়ী সহ প্রায় সকল কিছুই এই ঘূর্ণি তাণ্ডবে হারিয়ে যায়। গতকাল এখানে ফলের শত শত গাছ ছিল; এটা বুঝার কোন লক্ষণ অবশিষ্ট রইল না। ভাগ্যক্রমে উপরে ছন যুক্ত মাটির একটি ঘর অক্ষত ছিল! এটিই ছিল অনেকের মাথা গোঁজার একমাত্র স্থান। গ্রামের খুবই অবস্থা সম্পন্ন ব্যক্তিটির কয়েক টন ওজনের বিরাট টিনের ছাউনিটি, তুলার মত তুলে নিয়ে বহু দূরে নিক্ষিপ্ত হয়।
১৯৯১ সালের ৩০ এপ্রিল সকাল থেকে চিরতরে নিঃস্ব হয়ে যান আমার বাবা! আর আমরা সে দিন থেকে গবীর মানুষের কাতারে স্থান করে নিই। জীবনে বিরাট ছন্দ পতন ঘটে। বাবার মুখে হাসি ফুটাতে মনে হাতির মত শক্তি অর্জন, আর প্রতিকূলতাকে জয় করতে মোষের মত লড়তে শিখেছিলাম। সেই বিপদ আমাদের ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তুলে। এত কিছুর পরেও আল্লাহর করুণা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হই নি, তিনি কৃতজ্ঞ মানুষকে খুবই ভালবাসেন।
আজ বাবা নেই কিন্তু এপ্রিল প্রতি বছর আসে। এদিনে সেই ভাগ্য হারানো মর্ম বেদনার কথা বারে বারে মনে পড়ে। স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠে সে সব অবস্থা সম্পন্ন সম্মানিত মানুষের মুখচ্ছবি, যারা লজ্জায় সাহায্য চাইতে পারত না, হাত পাততে জানত না। আর অসহায় নেত্রে আসমানের দিকে তাকিয়ে গায়েবী সাহায্যের আশায় প্রত্যাশার প্রহর গুনত! মনে পড়ে তখনকার দিনে দেখা পত্র-পত্রিকার পরতে পরতে হাজারো মানুষের কান্নার ছবি ও বিরান জনপদের সুমসাম নীরব দৃশ্য। দেখতে পাই গাছের ডালে আটকে পড়ে বেঁচে যাওয়া সেই শিশুর করুন চোখ! সে শিশু কান্না করে হাজারো লাশের মাঝে আপন জনদের সন্ধান করে ফিরছে কিন্তু সে জানেনা তার জনপদের একজন মানুষও জীবিত নেই…..

Discussion about this post