আসন্ন শীতকালকে সামনে রেখেই ডিগ্রী পরীক্ষা শেষ! রেজাল্ট দেওয়া পর্যন্ত লম্বা সময় হাতে আছে। সময়টা কি কাজে লাগানো যায় ভাবছিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের বাড়ীতে লম্বা সময় কাটানো হয়না, এই সময়টা বাবা-মায়ের কাছেই কাটাব। তবে একটু ব্যতিক্রম ভাবে। যেমন, সময়টা গ্রামেই কাটানো হবে আবার অর্থনৈতিক ভাবেও উপকৃত হওয়া যাবে কিছুটা এমনভাবেই সাজাব।
আমি কৃষকের সন্তান। বাংলার ভিজা মাটিতে খালি পায়ে দৌড়াদৌড়ি করেই আমি হাটতে শিখেছি। সবুজ- সোনালী ধানের সোঁদা কাঁচা গন্ধ নিয়েই বড় হয়েছি। বাংলার জলবায়ু ও প্রকৃতি সম্পর্কে আমার জানা আছে। সাথে সাথে মৌসুমি ফসল সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আছে। সিদ্ধান্ত পাক্কা করে নিলাম এই বারের ছুটিতে গ্রামের বাড়ীতে আলুর চাষ করব!
টেলিফোন নাই, মোবাইল আসে নি! তাই বাবাকে পরিকল্পনা জানানোর সুযোগ ছিলনা। শহরে বসে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিলেও, পিতা-মাতা সম্পর্কে আমার ভাল ধারণা ছিল। তারা আমার সব কাজেই উৎসাহ দেখায়। তাছাড়া ঘরে চাকর-চাকরানী আছে, গোয়ালে হাল চালানোর মত গরু আছে। চাষ করার মত জমি আছে, আর আমার কাছে আছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি। হঠাৎ করে বাড়ীতে পৌঁছে, আলু চাষের জন্য কোনটা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তবে একটি ছোট্ট সমস্যা আছে। গ্রামের পাশের জমি গুলোতে চাকর-বাকর কাজে লাগিয়ে, আমার আম্মা মরিচ, মসুরি, মুগ ডাল সহ নানাবিধ চাষ করেন। যদি জায়গাগুলো বে-দখল হয়ে যায়, তাহলে দূরে বনের পাশে একটি খামার বাড়ী রয়েছে। সেখানেই আলুর চাষ করব। যদিও সেখানে বন্য শুকরের উৎপাত আছে, জংলী সজারু ও বানর ফসলের ক্ষতি করে। ফলে, আমাকে এই সময়ের পুরোটাই জঙ্গলি জীবনের সাথে মিলিয়ে বসবাস করতে হবে। সেখানে রান্না, সেখানেই থাকা, সেখানেই খাওয়া। সিদ্ধান্ত যখন পাকা হল, তখন শহর থেকে দুটো জিনিষ সংগ্রহ করেই গ্রামে ছুটতে হবে।
বাজারে যত পুথি আছে সম্ভব মত প্রায় সংগ্রহ করা হল। পদ্মাবতী, জঙ্গনামা, ছয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামাল, সোনাভান, কাঞ্চনমালা, মহুয়া, মলুয়া, ভেলুয়া সুন্দরী সহ আরো অনেক। হয়ত নাক সিটকাবেন! শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে বাংলার বেশীর ভাগ মানুষই সাহিত্য প্রেমী। ওখানের ওরা অশিক্ষিত। হয়ত নজরুল, রবীন্দ্র, বঙ্কিমের সাহিত্য ওরা বুঝবেনা। কিন্তু পুথির টানা শুনলেই বুঝতে পারে সেখানে কি তন্ময়তা লুকিয়ে আছে। এসব শোনার জন্য আমাদের জঙ্গল বাড়ীতে উৎসাহীরা আসবে। তাতে আমার সঙ্গ জুটবে। অশিক্ষিত মানুষের মন মেজাজের ধরন ও রুচি, তাদের জীবন বৈচিত্র্য থেকেই শিখেছিলাম।
দশ কেজি আলুর চাষ হবে, এর জন্যও বিরাট জায়গার দরকার। কৃষি অফিসে গিয়ে দেখি খুচরা আলু দেওয়ার কোন সুযোগ সেখানেই নেই। পুরো পঞ্চাশ কেজির বিরাট কার্টুন নিতে হবে! এ পরিমাণ আলু দিয়ে বিঘার চেয়েও বেশী চাষ করা যাবে। অগত্যা তাই নিতে বাধ্য হলাম। ভাবলাম গ্রামে গিয়ে কিছু স্থানীয় মানুষের কাছে বিক্রি করে দিব। কিন্তু হলনা! স্থানীয় কেউ বিদেশী আলু নিয়ে আগ্রহী হল না। তাদের ভাবনা এসব আলুতে রোগ বালাই বাড়তে পারে! তাছাড়া সময়টি আলু করার জন্য উপযুক্ত সময় থেকে তিন সপ্তাহ বেশী হয়ে গিয়েছে। তাদের বুঝালাম এসব স্কটল্যান্ডের আলু, দুনিয়ার সেরাগুলোর একটা, এগুলো সহসা ফলন দেয়। পেশাদারী এক কৃপণ চাষাকে বাকীকে দুই কেজি আলুর চাষ করতে অনুরোধ করলাম। তিনি আলু ক্রয় করলেন না বরং আমার ফেলে দেওয়া আলুর কর্তিত বিচ্ছিন্ন অংশ সংগ্রহ করে, তার দুই কিশোরী মেয়ের সাহায্যে স্বীয় জমির কিছুতে বুনে দিলেন। অগত্যা বাধ্য হয়েই পুরো আলুর সবটুকুই চাষ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমার উৎসাহ তুঙ্গে মনে হচ্ছিল, গায়ে হাতির বল এসেছে। পরিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পন্থায় বিরাট এলাকা জুড়ে জমি তৈরি করে, লাগিয়ে দিলাম আলু! অবিশ্বাস্য জনক ভাবে, বিশ দিনের মাথায় পুরো ক্ষেত যেন আলু বনে পরিণত হল! এক মাসের সময়ে চারা গাছ বাড়তে রইল, সাথে সাথে আলুও গজাতে লাগল। পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ তম দিনে নতুন আলুর ঠেলায় পুরো ক্ষেতখানাই যেন পপ-কর্ণের মত ফুলে ফেঁপে উঠল। ক্ষেত রক্ষার্থে শিশু আলু গুলো তুলে ফেলা হল। চারা গাছের অল্প বয়সে এত পরিমাণ আলু হলে করণীয় কি, জানা ছিলনা। চারিদিক থেকে দলে দলে মানুষ দেখতে এলো। খামারে এত পরিমাণ শিশু আলুর রাখার জায়গা নাই। অপরিপক্ব এসব আলু অল্পদিনেই পচে যাবে। তাই আগতদের মাঝে বণ্টন করতে রইলাম। আর ওদিকে আলুর ক্ষেত যেন গোস্বায় মেতে উঠেছে। আলুর আকৃতি আর পরিমাণের কারণে ক্ষেতের আল আর খালি জায়গা সবই একাকার হয়ে গেল। দেখলে রইলাম এভাবে চলতে থাকলে তো অকল্পনীয় স্বপ্নও বাস্তবায়ন হতে সময় লাগবে না।
খনার বচনে আছে, “যদি বর্ষে অগ্রহায়ণে, রাজা যায় মাগনে, যদি বর্ষে শীতের শেষ, ধন্যি রাজা পুণ্যি দেশ!” অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাষে বৃষ্টি হলে ব্যাপক ফসল-হানি হয়ে, দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ফলে রাজাকে ভিক্ষা করতে বের হতে হয়। আবার শীতের শেষে বৃষ্টি হলে, রাজার দেশ ধনের ভরে উঠবে। এটা অগ্রহায়ণ মাস ছিল কিনা জানা নেই। হঠাৎ চার দিনের ব্যাপক বৃষ্টিতে বন্যা সৃষ্টি হয় এবং পুরো আলুর খামার পানিতে তলিয়ে যায়। এই মৌসুমে এই অদ্ভুত বৃষ্টির ইতিহাসে শত বছরে কখনও এসেছিল কিনা কেউ মনে করতে পারছিল না। এটা প্রকৃতির একটি ব্যতিক্রম ঘটনা। তবে যে ব্যক্তি তার কিশোরী কন্যাদের নিয়ে আলুর আবাদ করেছিল, তার হয়েছিল সোনায় সোহাগা। ঢালু জমি হওয়াতে তার ক্ষেতের তেমন ক্ষতি হয়নি। উপরন্তু তার অকল্পনীয় ফলনের ভারে সে সমৃদ্ধ হয়েছিল। তার কর্জ শোধ হয় এবং স্ত্রী ও মেয়েদের কানের ফুল ও নাকের নথ কিনে দেয়। খুশীতে আত্মহারা হয়েই সে এসব বলত। তার স্ত্রীর ভূমিকা ছিল খুবই প্রশংসনীয়। সে আলু ক্ষেতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল। আসলে কর্মঠ স্ত্রী-দের কল্যাণে অনেক পুরুষেরাই ভাগ্যবান হয়।
আমি দমে যাবার পাত্র ছিলাম না। এ ধরনের ফসল হানিতে হতাশ হই নি। কিছুটা সময় নষ্ট হয়েছে বটে! আর টিউশনির টাকায় কেনা আলুতে লাভ না হলেও, ক্ষতিও বেশী হয়নি। বিরাট কিছু শিখতে পেরেছিলাম। আমি শিখেছিলাম কাজটি যথা সময়ে শুরু করতে হবে। আর এই মাটি, এই জলবায়ু আলু চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। আগামী বারে আরেক বার হাত দিলে হয়ত আমার সুদিন ফিরে আসবে এবং লোকসানি টা সমন্বয় করা যাবে। আমার হৃদয়-মন চাষাবাদের জন্য উৎসাহী হলেও আল্লাহ চাননি যে, আমি আর সে কাজে মন দেই। কখনও একটি মুহূর্তের জন্যও বেকার থাকতে হয়নি। দেশের চাকুরী আর প্রবাস জীবনের কারণে আর কখনও আলুর চাষ করা হয়নি। তবে ওই জমি আমার বাবা থেকে হাওলাত নিয়ে, অনেকে আলু চাষ করে উপকৃত হয়েছে।
বাংলার ভাটি অঞ্চল নদী বাহিত পলিমাটি দ্বারা সৃষ্ট। হাজার বছর ধরে পলি জমে এই উর্বর মাটির জন্ম হয়েছে। পৃথিবীতে এমন ভূ-খণ্ডের নমুনা খুব কমই। এ মাটির অনেক গভীরে গেলেও নতুন ধরনের মাটির সন্ধান মিলে। এ মাটিতে যা রোপণ করা হয়, বিনা সেবায় তাই গজিয়ে উঠে। দুনিয়ার সকল দেশের মাটির গভিরস্থ পানি, পান করার উপযোগী না হলেও, বাংলার মাটি ভেদ করা পানি সুপেয়, সুমিষ্ট ও চাষের উপযোগী! এটা আল্লাহর মহান দান! এখানে কষ্ট ও রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই উদ্ভিদের বিস্তার ঘটে। এতে করে এ অঞ্চলের মানুষ শুয়ে-বসে খাবার সুযোগ পায়। বিনা কষ্টে প্রাকৃতিকে কাছে পায় বলে এর গুরুত্বও ওরা বুঝে না। তাই তারা আলসে প্রকৃতির হয়ে যায়। যা পায় তা সহজে এবং বিনা কষ্টে পেতে চায়, দ্রুত পেতে চায় এবং মুফত পেতে চায়। মানুষের এই চরিত্র গোলামির চরিত্রকেই প্রতিনিধিত্ব করে। এ ধরনের মানুষের জীবনে চরম দুঃখ-কষ্ট না আসা পর্যন্ত কোনকালেই স্বাবলম্বী হয়না।

Discussion about this post