লাল-চন্দনকে, রক্ত চন্দনও বলা হয়। উইকিপিডিয়াতে এটাকে রঞ্জনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই গাছটিও সাদা চন্দনের মত ভেষজ গুণে বহুবিধ উপকারী। পৃথিবীর অন্য কোন গাছ এই গাছের মত নয়। রক্তের মত লাল হবার কারণে এটাকে ইংরেজিতে Coral-wood বা ‘প্রবাল কাষ্ঠ’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। রক্ত-চন্দনের গায়ে, সাদা-চন্দনের মত মোহনীয় ঘ্রাণ নেই কিন্তু তার দেহ বৈশিষ্ট্য সাদা-চন্দনের চেয়েও সুন্দর।
রক্ত-চন্দন কাঠ কোন পোকায় খায়না, পানিতে পচে না, কৃত্রিম রঙ লাগানোর দরকার পড়েনা। তাই শত শত বছর অবিকল রঙ ও বর্ণ ঠিক থাকে।
বিউটি পার্লারে চামড়ার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে মহিলারা যে প্যাক মাখে, এটার যাত্রা শুরু হয়েছিল রক্ত-চন্দনের হাত ধরেই। ক্রিম বর্ণের আপেলের গায়ে, রক্তিম লালিমা মাখা আপেল যেভাবে সুন্দর দেখায়; রক্ত- চন্দনের প্যাক মুখমণ্ডলে সে ধরণের বর্ণচ্ছটা ফুটিয়ে তোলে। তাই এই রক্ত-চন্দন শত শত বছর ধরে ধনী ঘরের দুলালীদের মুখমণ্ডল সুন্দর করতে ব্যবহার হয়ে আসছে। আজকের বাজারে মহিলাদের প্রসাধনীর কাজে যে ফেস পাউডার পাওয়া যায়, সে সব ফেস পাউডারের রঙের ধারণা রক্ত-চন্দনের প্রলেপ থেকেই মাথায় এসেছে।
যদিও সাদা-চন্দনের বর্ণের ন্যায় ফেস পাউডারও পাওয়া যায়। বর্তমানের ফেস পাউডারে চন্দনের কিছুই থাকেনা। কিন্তু শুরুতে তার যাত্রা চালু হয়েছিল, চন্দনের ঢাল-পালা ঘষা-মাঝার কাজ থেকে রেহাই পেতে।
যাই হোক, রক্ত-চন্দনে রয়েছে বহুবিধ ভেষজ গুন। মূত্র নালীর প্রদাহ, ডায়রিয়া, কাশি ও চামড়ার যাবতীয় সমস্যার কাজে রক্ত চন্দনের ব্যবহার উল্লেখ যোগ্য।
হিং সম্পর্কে লিখতে গিয়ে, আমার দাদীর স্বপ্নে পাওয়া এক বড়ির কথা তুলেছিলাম। সেই বড়িতে রক্ত-চন্দন ও সাদা চন্দনের কাই ব্যবহার হত। তাই ছোটকাল থেকেই আমি উভয় চন্দনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছিলাম।
আমাদের ঘরে এসব চন্দন অগ্রিম সংগ্রহ করা হত। একদা আমাদের খামার বাড়ীতে একটি রক্ত-চন্দনের চারা লাগিয়েছিলাম। ভারত-বাংলাদেশের বিভিন্ন দরগাহ-মাজারে ঘুরে বেড়ায় এমন এক বৃদ্ধ ব্যক্তি চারাটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন।
তখন আমিও গাছের প্রতি দুর্বল ছিলাম, এই ব্যক্তি কেন জানি আমাকে পছন্দ করতেন। এই চারাটি অল্পদিনেই বেড়ে উঠেছিল। সে থেকে বুঝা যায় রক্ত- চন্দনের চাষ বাংলাদেশে হবে।
লোকমুখে কিভাবে আমাদের খামারে লাল-চন্দনের উপস্থিতির কথা রটে যায়। ফলে বাগানে সর্বদা চোরের উপদ্রব বাড়তে থাকে।
চন্দনের লোভে এসে বাগানের অন্যান্য ফলও চুরি করতে থাকে। চোরেরা পালা করেই চুরি অব্যাহত রাখে ও অন্য গাছের ক্ষতি করে। ১৯৯১ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘৃর্ণীঝড়ে মাটি সমেত গাছের বংশ ধ্বংস হয়ে যায়। এর পরে আর কখনও চেষ্টা করা হয়নি।
ঔষধিগুণ ছাড়াও রক্ত-চন্দনের গাছটির ব্যবহারিক মূল্য অনেক। দুনিয়ার বহু সম্পদশালী ব্যক্তি রক্ত- চন্দনের কাঠ দিয়ে ফার্নিচার বানিয়ে একটু ঘুমানোর জন্য বহু টাকা ব্যয় করে।
দুর্লভ রক্ত-চন্দন কাঠ সংগ্রহে সারা বিশ্বের বিত্তশালীরা সন্ত্রাসীদের পোষে থাকেন। তাদের একজন ছিলেন ভারতের ইতিহাস বিখ্যাত কিংবদন্তির ডাকাত “চন্দন দস্যু বীরাপ্পন”। ভারতের কর্ণাটক, কেরালা ও তামিলনাড়ুর ছয় হাজার বর্গ কিলোমিটার বনের রাজত্ব ছিল তার হাতে।
দশ হাজার মেট্রিকটনেরও বেশী চন্দন কাঠ বিদেশে পাচার করেছিল এই দস্যু! কত সরকারী কর্মকর্তা, কত সাধারণ মানুষ হত্যা করেছে এই ডাকাত, তার ইয়ত্বা নেই।
দেশের হাই প্রোফাইল ব্যক্তিদের অপহরণ করেছে বারে বারে। ভারত সরকার তাকে দমনে পাঁচ কোটি রূপীর উচ্চ মূল্যের পুরষ্কার ঘোষণা করেও, রীতিমত হিমসিম খেতে থাকে।
২০০৪ সালে স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের হাতে যখন বীরাপ্পন নিহত হয়, ততদিনে ভারত সরকারের ৭৩৪ কোটি রূপীর সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়ে যায়! বীরাপ্পনের জয় গাথা উল্লেখ করার জন্য তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়নি।
বললাম এজন্য যে, বীরাপ্পনকে সহযোগিতা করার জন্য সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তার সহযোগী ধনী বন্ধু ছিল। এমনকি ভারত সরকারের ভিতরেও। লক্ষ্য একটাই নির্বিঘ্নে চন্দন কাঠ লুট করা।
একই সাথে বীরাপ্পন হাতি নিধনেও জড়িত ছিল। এই তথ্য থেকে অন্তত পরিষ্কার বুঝা যায় যে, চন্দন কাঠের মূল্য ও চাহিদা বহির্বিশ্বের কেমন!



Discussion about this post