✌️আমাদের দেশে দু’ধরনের শিক্ষাদান পদ্ধতি বিদ্যমান। একটি গ্রন্থ-ভিত্তিক অন্যটি সিলেবাস ভিত্তিক। এই দুটো শিক্ষা পদ্ধতি মৌলিকভাবেই একে অপর থেকে আলাদা এবং এগুলোর সৃষ্টি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। মুসলিম দেশ সমূহে এখনও এই দুই ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। এ সম্পর্কে অনেকের ভাসা ভাসা ধারণা আছে; অথচ জানাটা সবার জরুরী। আজকের এই পোষ্টে সে সব পাঠকের চিন্তার জট খোলা হবে এবং নিজেরাই বুঝতে পারবেন কোনটি কার উপরে সেরা!
📚গ্রন্থ-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা: সাধারণত কওমি মাদরাসা বা প্রাচীন ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হল এই শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখানে একটি নির্দিষ্ট গ্রন্থকে কেন্দ্র করে জ্ঞান অর্জন করা হয়। এখানে একটি গ্রন্থ পড়ানো ও বিশ্লেষণ শেষ হবার পর আরেকটি গ্রন্থ পড়ানো হবে। একই দিনে একাধিক গ্রন্থও পড়ানো হতে পারে। এটা আইন, দর্শন, বিজ্ঞান, গণিত, সাহিত্য, যুক্তিবিদ্যা যে কোনটাই হতে পারে। যে প্রতিষ্ঠানে যত গ্রন্থ পড়ানো হবে, সে প্রতিষ্ঠানে তত শিক্ষকের দরকার হয়। সেই প্রতিষ্ঠান ততোধিক সেরা বিবেচিত হবে। প্রাচীন কালে কাগজের মূল্য বেশী ছিল বিধায় কিতাব খুব দুষ্প্রাপ্য ও দামী বস্তু ছিল। ফলে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে, সেগুলো পড়ার সুযোগ মাদ্রাসাতেই বেশী অবারিত ছিল।
যেহেতু একটা গ্রন্থ একজন লেখক কর্তৃক প্রণীত সেহেতু সেই লেখকের প্রতি শিক্ষার্থীদের একমুখী দুর্বলতার সুযোগ ঘটে। আবার এই শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা যত বেশী থাকে; তার ছাত্রদের মাঝেও এর প্রভাব সেই মানের ক্ষুরধার হতে থাকে।
এই পদ্ধতিতে একটি বিশ্বসেরা গ্রন্থ পড়ানো হলেও, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে, যেহেতু ওস্তাদের চিন্তা-দর্শনের একটি প্রচ্ছন্ন প্রভাব থাকে, সেহেতু ছাত্ররাও সেই শিক্ষকের দর্শনে প্রভাবিত হয়। মূল কথা, এই শিক্ষা একটি প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া হলেও, তার প্রভাব অনেকটা ওস্তাদ কেন্দ্রিক হয়ে উঠে এবং সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও একটি ছায়াও শিক্ষার্থীর উপরে প্রভাব সৃষ্টি করে। যা আজীবন শিক্ষার্থীকে সেই প্রতিষ্ঠান এবং সেই ওস্তাদের প্রতি দুর্বল করে রাখে। এক কেন্দ্রিক ও একক চিন্তার শিক্ষার্থী তৈরি করার জন্যে এই শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবিকই সেরা।
📋সিলেবাস ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা: এই ব্যবস্থার মূল উত্থান ইউরোপের রেনেসাঁস পরবর্তী আধুনিক শিক্ষা-বিষয়ক চিন্তা থেকে উদ্ভব হয়েছে। যাতে করে একদল মানুষকে, একই বিষয়ে, একই মানের এবং একই উপাদানের ভিত্তিতে তৈরি করা যায়। যাদের ডিগ্রী, পদবী, শুনলে স্রোতা তার কাজের গণ্ডি ও স্পেশাল যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে পারে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই সিলেবাস ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয় উপমহাদেশে যাত্রা শুরু হয়।
সিলেবাস ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সময়কে পূর্বেই নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীকে জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গির সামগ্রিক পরিকল্পনা শুরু থেকেই করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার ধারাবাহিকতা রাখতে হয়। এখানে পড়ার জন্যে নির্দিষ্ট গ্রন্থকে মূল্য দেওয়া হয় না বটে কিন্তু নির্দিষ্ট বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়! ফলে নির্দিষ্ট গ্রন্থের, কোন একটি বিষয় মূল্যায়িত হয়। ফলে সেই গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশে তুলে আনা হয়। এভাবে বহু গ্রন্থ থেকে চয়ন-কৃত অংশগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই, সিলেবাসের আওতায় আত্মস্থ করাতে হয়।
এই শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতার প্রভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম প্রভাবিত হয়। যেহেতু একজন শিক্ষককে বহু জ্ঞানীর ব্যক্তির গ্রন্থের চয়ন-কৃত অংশ-বিশেষকে বিশ্লেষণ করতে হয়। ফলে সকল জ্ঞানীকে সমানভাবে পরিপূর্ণ মূল্যায়ন করা শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব হয় না। কখনও লেখকের মূল্যায়নের চেয়ে, বিষয়টি মূল্যায়িত হয়। এখানে শিক্ষক যত সহজে, যত কম সময়ে সেই বিষয়টি ছাত্রদের মধ্যে পরিষ্কার করতে পারে; সেই শিক্ষকের মেধা ও উপস্থাপনা শক্তির প্রভাব পড়ে বেশী। যেটা তারা বাস্তব দুনিয়ায় কাজে লাগাতে পারে।
সিলেবাস ভিত্তিক শিক্ষায়, মূল্যায়ন করা সহজ হয়। সৃজনশীল প্রশ্ন, ব্যবহারিক ও অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে বহু ছাত্রের মধ্য থেকে সেরা ছাত্রের দক্ষতা যাচাই ও বিচার করা অনেক সহজ।
যেহেতু মাদ্রাসা গুলো দ্বীনি শিক্ষার জন্যে সৃষ্ট, সেহেতু তাদের জন্যে গ্রন্থ-গত বিদ্যার পদ্ধতি ভালই কার্যকর। যেমন কোরআন, হাদিস, ফিকাহ ইত্যাদি। এই গ্রন্থগুলোর নড়চড় নেই, ফলে এগুলোর উপরে আরো প্রাজ্ঞ ব্যক্তি তৈরিতে সৌদি আরব ও মিশরে বিশেষায়িত উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়েছে। তবে দিন দিন এই পদ্ধতির হ্রাস ঘটছে। বই পত্র এখন শিক্ষার্থীর হাতের নাগালে আসার কারণে, পড়ালেখাকে শিক্ষার্থীর আগ্রহের উপরে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আগ্রহী শিক্ষার্থী নিজস্ব অধ্যয়নের মাধ্যমে নিজের জ্ঞান ও যোগ্যতাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং তার বিশেষ জ্ঞানের স্ফুরণ ঘটানোর জন্যে ওয়াজ মাহফিল গুলো বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
আবার অতীতে সেরা গ্রন্থ বিবেচিত ছিল কিন্তু বর্তমানে অনেকগুলোর বিশেষত্ব ও গুরুত্বের প্রাসঙ্গিকতা কমে গেছে। সেগুলো পড়িয়ে বর্তমানকে মোকাবেলা করা কঠিন। যদিও কওমি শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে অতীতে স্পেশাল বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তি তৈরি হত। যেমন বিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, চিকিৎসা, হিসাবরক্ষণ, ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান সহ নানা বিষয়ে পড়ানো হত, সেখান থেকে বিজ্ঞানী তৈরি হত। বর্তমানে বিজ্ঞানী তৈরির ধারণাটাই পাল্টে গেছে। আগে কঠিন ছিল এখন অনেক সহজ ও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে এই শিক্ষা ব্যবস্থাটি সারা দুনিয়ায় বেশীর ভাগ দেশেই সমাদৃত হয়েছে এবং ব্যাপকভাবে এই পদ্ধতির বিস্তার ঘটছে।


Discussion about this post