শৃগাল আমাদের পরিচিত শব্দ। বাস্তবে অনেকেই শৃগাল দেখেনি, তবে অচেনা কেউ তার চেহারাটি দেখা মাত্রই, বুঝে ফেলবে যে, এটা শঠ ও প্রবঞ্চক শ্রেণীর প্রাণীই হবে। শৃগাল তার চরিত্রের কারণেই মানুষের কাছে বেশী পরিচিত। শৃগালের সাথে মানুষের মিল যেখানে
তার নামটি যদি বাংলায় ‘শৃগাল’ না হয়ে ‘শ্রীগাল’ তথা ‘সুন্দর মুখ’ হত; তাহলেও তার খাসিয়তের পরিবর্তন হতো না। কেননা সুশ্রী ও সৌন্দর্যের মাধ্যমে কারো চরিত্রের বিকাশ হয়না।
আরো পড়তে পারেন…
- বড়দের গরু রচনা (সকলের জানা উচিত)
- জাতীয় পাখি দোয়েল ও আমাদের প্রকৃতি
- বাঁশ ফলে ইঁদুরের যৌবন
শৃগাল শব্দটি সংস্কৃত এবং ফার্সিতে তাকে ‘শাগাল’ ও তুর্কি ভাষায় ‘চাকাল’ বলা হয়। ইংরেজিতে Jackal বলা হয়। Fox নামে বাংলায় খেঁকশিয়াল বলে আরেকটি ছোট শিয়াল আছে।
এগুলো কয়েক প্রকার, তবে তাদের সবার খাসিয়তও একই। এগুলো কখনও গর্তে থাকে, কবর থেকে মানুষের লাশ চুরি ও পচা মৃত দেহ খায়। বাংলাদেশে শৃগালের সব জাতকেই ‘শিয়াল’ বলে। যদিও শিয়াল নিয়ে আরো ভিন্ন কথা আছে। তবে সকল শৃগালই তঞ্চক প্রকৃতির।
মূলতই শৃগাল একটি ধূর্ত তথা চিটার প্রকৃতির প্রাণী। তার আক্রমণ করার ফন্দি-ফিকির অন্য প্রাণীদের চেয়ে একটু ভিন্ন। ছাগল-ভেড়ার পালে, বন্ধুর বেশে প্রবেশ করে। ছাগ বাচ্চাদের সাথে খেলার অভিনয় করে। নিরাপদ দূরত্ব সৃষ্টি হলে, এক শৃগাল কান ধরে টানে, আরেকটি পিছনে থেকে ধাক্কায়ে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যায়।
শৃগাল ছাগলের পালে বাঘ-সিংহের মত ভীতির সৃষ্টি করেনা! যাতে করে আরেকদিন আসলে সবাই চিল্লাচিল্লি না করে! ছাগল তো আর নামতা-ধারাপাত জানেনা! সকালে কতজন এসেছিল আর বিকালে কতজন ফিরে গেল। একা একা সন্তান হারা ছাগী কয়েকদিন চিল্লায়। বাকীরা খাদ্যে ব্যস্ত থাকে। ঠিক আমাদের দেশে মাঝে মধ্যে মানুষ গুম হয়ে গেলে পর, যেভাবে স্ত্রী-মা শাড়ীর আচলে মুখ গুঁজে কাঁদে। শৃগালের আক্রমণে ছাগলের পালেও সে ধরনের প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি হয়!
শৃগাল আবার উঁচু-নিচু সব কিছু মানিয়ে চলতে পারে। সিংহের সাথে হায়েনার ধন্ধ আজীবন। কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। কিন্তু শৃগাল তাদের উভয়ের সাথে মিলে মিশে চলতে পারে। সিংহ কে যদি মাদক সম্রাট মনে করা হয়, তাহলে শৃগাল হল মাদক কারবারির মত। ওখানে হায়েনা হল ছিনতাই কারী। দৃশ্যত ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারি একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। শৃগাল উভয়ের উচ্ছিষ্টের লোভে মোসাহেবি করে মানিয়ে চলে।
সিংহ বড় প্রাণী শিকার করে বটে কিন্তু সে বড় জোড় এক থেকে দেড় কেজি মাংস খায়। সিংহ বিড়াল শ্রেণির প্রাণী, একটু অলস। এক বেলা খেয়ে দীর্ঘ ঘুম দেয়। পরিত্যক্ত মাংসের পরের টুকু খায় হায়েনা। হায়েনার মাথা গোল, হাড্ডির সর্বস্তরে মাথা ঢুকাতে পারে না। তার মুখ চুঙার মত। হাড্ডির দূরহ জায়গায় মুখ ঢুকাতে পারে, সেগুলো চেটে পুটে খায়।
প্রয়োজনে উপোষ থেকেও শৃগাল কোন অবস্থাতেই সিংহ-হায়েনার সাথে বিরোধে যায় না। বড় সন্ত্রাস ওরাই করুক শৃগাল পাতি মাস্তান হিসেবে নিজেকে ধরে রাখে।
শৃগালের পেট ছোট কিন্তু সিংহের মত অবাধ স্বাধীনতা না থাকায় খাদ্য সংগ্রহে সারাদিন পরিশ্রান্ত হতে হয়। ফলে খাদ্য তাড়াতাড়ি হজম হয় তাই সে পরিমাণে সিংহের চেয়ে বেশী খায়। হরদম চুরি-চামারীতে ব্যস্ত থাকতে হয়। যেমন দেশের বড় চোরদের কারণে দেশের ক্ষতি কম দেখা গেলেও, ক্ষুদ্র চোরদের উৎপাতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে।
সেভাবে জঙ্গলের ছিঁচকে চোর হল এই শৃগাল। তার জ্বালায় ছোট প্রকৃতির প্রাণী, পাখি কেউ নিশ্চিন্তে বাসায় ঘুমানো কিংবা ডালে বসে ঝিমানো সম্ভব হয় না। সে সবাইকে তাড়িয়ে সমাজে সর্বদা হুলুস্থুল লাগিয়ে থাকে।
শৃগালের অন্যতম আরেকটি খাসিয়ত হল। শক্তিশালী পক্ষকে দুর্বলের বিরুদ্ধে ক্ষেপীয়ে তোলা। শৃগালের পক্ষে হরিণ, মহিষ, জেব্রা ধরা সম্ভব হয় না। কিন্তু তাদের মাংসেই মজা বেশী। তখন তারা ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করে। চুপি চুপি ঘুমন্ত অলস সিংহের কাছে যায় এবং আস্তে করে ঘুমন্ত সিংহের পিছনে গিয়ে কিংবা লেজের উপরে কামড় বসিয়ে দ্রুত পালায়! নাহ, এটা সিংহের গোশতের লোভে কর না। বিরক্ত করে সিংহের ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য করে।
সিংহ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালে খিদের অনুভূতি প্রকাশ পায় এবং নিকটেই মহিষ, গরু, জেব্রা চড়ে বেড়াচ্ছে দেখতে পায়। হ্যাঁ, শৃগালের এটাই লক্ষ্য। সিংহ ঝুঁকি নিয়ে মহিষের পালে হানা দেয়। মারামারি ধস্তাধস্তি করে অবশেষে একটি প্রাণী মারে। আর শৃগাল তক্কে তক্কে থাকে এবং সুযোগ বুঝে নিজের সুবিধাও হাতিয়ে নেয়।
আমাদের সমাজেও এমন চিত্র দেখা যায়। অনেকেই তক্কে তক্কে থাকে সমাজে সমস্যা গণ্ডগোল লেগে থাকুক। গণ্ডগোল পাকানো, মারামারি, ধরাধরির কাজটা ওরাই করুক। শেষ দাওয়ের কোপটি আমিই মেরে সুবিধা ভোগীদের মধ্যে সেরা হয়ে যাব।
মানুষের এই চরিত্রের নাম ‘প্রবঞ্চনা’। আর প্রবঞ্চক কোনদিনই ভাল কাজের জোগান দাতা হয়না। তাছাড়া ভাল কাজ সে করতেই জানেনা, আনন্দও পাবেনা কেননা ওটা তার চরিত্রে অংশ হয়ে যায়। ওই কাজেই সে তৃপ্ত হয়। শৃগালের সাথে মানুষের মিল যেখানে


Discussion about this post