সুদের কারণে যে ক্ষতি হয়। ভদ্রলোক অবশেষে বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাপের কারণেই তার এই রোগের সৃষ্টি। মসজিদের ঈমাম, এলাকার মুরুব্বী, পণ্ডিত, পিতা-মাতা সবাই বোঝালেন এই রাস্তা ছাড় আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি তোমায় মাফ করতে পারেন।
এক সময় এটি চরম পাপের কাজ হলেও, বর্তমানে সুদ খাওয়া গ্রুপ নামে ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অনেকের কাছে সুদখোর অনেকটা সম্মানিত পেশা বটে! উল্লেখিত ব্যক্তিটিও সুদি কারবার করতেন! পরবর্তীতে বেশী লাভ দেখে সপ্তাহ সুদের কারবারে জড়িয়ে পড়েন।
একদিন প্রত্যুষে তিনি উপলব্ধি করেন যে, তার মুখ খানি কেন জানি বাঁকা হয়ে গেছে! পুরো মুখমণ্ডল কেমন জানি হয়ে গেছে। কথা বলতে পারেন না, খেতে পারেন না। গালের এক পার্শ্ব নড়াচড়া করে তো অন্য পার্শ্ব থমকে দাড়িয়ে থাকে। চেহারার এই বিশ্রী দৃশ্য কোনমতেই লুকাতে পারে না। অন্যদিকে মানুষ তাকে দেখলে মন্তব্য করে বসে, ‘এটা সুদ খাওয়ার কুফল ও মানুষের বদদোয়ার ফল’।
জটিল রোগ! বহু চিকিৎসা হল, উপকারের বালাই নেই! ডাক্তারেরাও জানেনা এটা কি রোগ! বর্তমানে অবশ্য রোগটির নাম বলা হয় ‘বেলস্ পালসি’ কেউ বলেন মাউথ ক্যানসার। দীর্ঘ দিনের চিকিৎসা শেষে ভাল হওয়া যায়। তবে সময় সাপেক্ষ।
কোন প্রকার চিকিৎসা না থাকায় সুদখোর বুঝতে পারলেন, এটা খোদায়ী গজবেরই লক্ষণ। তাই তিনি সুদ খাওয়া বন্ধ করলেন। যে সব মানুষ থেকে সুদ খেয়েছেন, তাদের কাছে মাফ চাইতে লাগলেন। তিনি এতই হতাশ হয়ে উঠেছিলেন যে, রাস্তা ঘাটে যাকে পেত তার কাছেই কান্না করে মাফ চাইত।
মানুষ আন্তরিকতার সাথে মাফ করেছিলেন এবং বছরান্তে তিনি চিকিৎসা ছাড়াই ভাল হয়ে যান! তার এই ঘটনা সমগ্র এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। মানুষ বুঝতে শিখে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে জটিল দুরারোগ্য ব্যাধিও ভাল হয়ে যায়।
পরবর্তীতে সুদের কারবার ছেড়ে বহু ধরনের ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করে। কিন্তু কোন ব্যবসাতেই আশানুরূপ সুবিধা করতে পারে নি। তিনি দেখতে পেলেন, কম সময়ে, কম কষ্টে, কম পূঁজিতে, সুদি ব্যবসায়ে যে ধরনের লাভ আসে, অন্য কোন ব্যবসাতেই কম সময়ে, এত লাভ হাতে আসেনা।
বেশি লাভের আশায় তিনি বিদেশেও গেলেন। কঠোর পরিশ্রম, ভয়ানক গরমে সিদ্ধ হয়ে যে আয় মাসে আসে; তার চেয়ে অনেক কম কষ্টে সুদের কারবারে বেশী অর্জন হয়।
ইতিমধ্যে তার মুখ তো ভাল হয়ে গেছে। আগের সেই পরিণতি, ব্যথা-বেদনা, অপমান-অসম্মানের কথা ভুলতে চেষ্টা করে। কয়েক জন সাহস দেয়, আমরাও তো সুদি ব্যবসা করি, আমাদের কারো মুখ তো বাঁকা হয়নি! তোমার সেটা ভিন্ন কারণ, বরং তুমি আবারো সুদি কাজে নেমে পড়।
প্রবাসর পাঠ চুকিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং পুনরায় সেই সুদি ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করে। এবারে তিনি আরো বেশী বেপরোয়া হয়ে পড়েন। যারা নিন্দা করে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠেন। পরিস্থিতি এমন হয়, মানুষের ক্ষেপানো বৃত্তি, তাকে আহত করে। সেও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে, শোধ নিতে মরিয়া হয়। কারো ক্ষতি করাটা তার প্রিয় কাজ হয়ে উঠে। শেষ জীবনে বিকলাঙ্গ হয়ে করুন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
এত লম্বা কথা এ কারণেই বলা। সুদ হল এক জঘন্যতম পাপ। মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত আইন সঙ্গত অপরাধের মত।
হাদিস শরীফের ব্যাখায় এসেছে, যে সুদ খায়, যে সুদ দেয়, যে সুদের কারবার করে, যে সুদের প্রচারণা চালায়, যে সুদি ব্যবসার কাগজ-পত্র লিখে, যে সুদি কারবারের দলীল-পত্র পাহারা দেয়, তা সংরক্ষণ করে, বিজ্ঞাপন দেয়, উৎসাহ দেয়, সাক্ষী থাকে সবাই জাহান্নামী।
সুদের সাথে জড়িত থেকে যত কল্যাণকর কাজই করুক না কেন, তা গ্রহণ করা হবেনা। সুদের বিরুদ্ধে ইসলাম বেজায় কঠোর।
বাহ্যিক ভাবে সুদি মানুষদের সুখী মানুষ বলে মনে হয়। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারা অনেক বিপর্যয়ের মোকাবেলা করে। তারা জীবনে কৃতজ্ঞতা, উদারতা, বদান্যতা দেখাতে পারেনা। তাদের আয়ের উৎসের ধরনটাই এমন যে, সামান্য টাকার বিপরীতেও তারা দুনিয়ার লাভ খুঁজতে থাকে।
প্রতি পদে লাভের সন্ধানে ব্যস্ত মানুষ, কাউকে টাকা হাওলাত, যাকাত দিয়ে উপকার, সদকা দিয়ে সহযোগিতা করাকে নিরেট বেকুবি মনে করে থাকে। এক পর্যায়ে এদের হৃদয় এত হিসেবী হয়ে যায় যে, সামান্য দান-খয়রাত করতেও এরা উৎসাহ পায় না কিংবা করেনা।
সে কারণে তাদের হৃদয়ে যে উদারতা, বদান্যতার মৌলিক গুন ছিল, সেটা অনুশীলনের অভাবে মরে যায়। অবশেষে সুদি মানুষের হৃদয়, প্রাণহীন, রস-কষ বিহীন শুকনো কাঠের বাকলের মত হয়ে পড়ে।
সুদী মানুষের জীবন চরিত কেমন, তা উপলব্ধি করার জন্য প্রবাদের সেই ব্যক্তির উদাহরণ টানা যায়, যার বাড়ীতে বেয়াই বেয়াইন আসবে। আটশত টাকা হাতে নিয়ে বের হল, মাছ গোশত কিনবে বলে।
বাজারে গেলে পর, আগের সপ্তাহে সুদে লাগানো দেনার চারশত টাকা সুদ হিসেবে যোগ হয়ে তার পকেটকে বারশ’তে উন্নীত করে। তিনি ভাবলেন, বেয়াই-বেয়াইনের দুশ্চিন্তার চেয়ে, এখান থেকে একহাজার টাকা যদি আবারো সুদের কারবারে লাগানো যায়, তবেই কল্যাণ। কাউকে খাইয়ে ফেললে তো পুরাটাই লোকসানি। বাকী দুইশত টাকায় না গোশত, না মাছ পাওয়া যায়! অবশেষে কিছু পচা তরকারী সাথে করে তিনি গভীর রাত্রে বাড়ীতে পৌঁছেন।
সুদখোর কোন অবস্থাতেই আত্মতৃপ্তি পায়না। জীবনকে উপভোগ করতে পারেনা। সন্ধ্যায় হিসেব করে দেখে সে অনেক টাকার মালিক! আর সকালে ঘর থেকে রিক্ত হয়ে বের হয়ে সুদ গ্রহীতার সন্ধান নেমে পরে। কোথায় কোন স্থানে, কোন সুদ গ্রহীতাকে পাওয়া যাবে; কারো নিকট থেকে সুদের কিস্তি পাওয়া গেলে, সকালের নাস্তাটা করা যাবে, এই ভাবনায় দিন কাটে।
এ কারণে সমাজে তাদেরকে কদাচিৎ কৃপণ মানুষের চরিত্রে দেখা যায়। এভাবে তারা নিজের জীবনকে সাজায় বলে, নিজের টাকা নিজের কাজেও লাগেনা।
প্রতিটি সুদি মানুষের সন্তানেরা পিতার প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত স্বভাবের হয়। তারা কখনও পিতার সংসারে ভূমিকা রাখতে চায়না। কিংবা রাখতে চাইলেও, পিতার কৃপণতা-পূর্ণ দর্শনের সাথে সন্তানেরা খাপ খাইয়ে উঠতে পারেনা। হয় তারা পিতার সঙ্গ ত্যাগ করে নয় সময়ের অপেক্ষায় থাকে কখন পিতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে।
বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পিতা মারা গেলেও সন্তানেরা পিতার রেখে যাওয়া সম্পদে ভূমিকা রাখতে পারে না। অচিরেই তা হাওয়া হয়ে যায়। সুদি পিতার চরিত্রের কারণেই সন্তানেরা হেয়, তুচ্ছ, তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না। আর অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা যতই শিক্ষিত হউক, কোন কাজে সফলতা পায় না।
এসবের মুল কারণ মূলত, সুদের মাধ্যমে আয়ের কুফল! সুদি মানুষদের বিরুদ্ধে আল্লাহর গোস্বা খুবই প্রবল। আখিরাতের বিচারে সুদি কারবারিদের প্রতি ন্যূনতম কোন অনুকম্পাই দেখানো হবেনা।
মৃত্যুর মুহূর্ত থেকে হাশর পর্যন্ত তাদের অভিনন্দন জানানো হবে আগুনে। কেয়ামত আসতে যত-লক্ষ বছরই লাগুক, তারা আগুনেরই বাসিন্দা হবে। দুনিয়াতে অনবরত তাদেরকে অসম্মানিত, অপদস্থ, পর্যদুস্ত করবেন।
তাদের হৃদয়কে অতৃপ্ততা দিয়ে ভরে দেওয়া হবে, ফলে না পাওয়ার বাসনা ঘন হবে। আরো পাওয়ার ইচ্ছা ভারী হবে। দুনিয়াতে কি পায়নি, কি পাবার দরকার ছিল, তার ফিরিস্তি লম্বা হবে।
সর্বোপরি তাদের মন ও আত্মাকে অভাব দিয়ে ভরিয়ে তোলা হবে। সুদি মানুষের এ কষ্ট আজীবন বলবৎ থাকবে। যতক্ষণ না তারা তওবা করে ফিরে আসবে।
সুদি কারবারি মানুষদের উপরে আল্লাহর ক্রোধ কেমন তা হাদিস শরীফের একটি ঘটনা থেকে অনুমান করা যাবে।
রাসুল (সা) বললেন, আমি দেখেছি জাহান্নামের আগুনের ভিতরে একটি রাস্তার উপরে বিরাট পেট ওয়ালা মানুষেরা গড়াগড়ি খাচ্ছে। পেটের আকৃতির কারণে তারা হাঁটতে পারছিল না। তাদের বিপর্যস্ত দেহ ও শরীরের উপর দিয়ে একটি বাহিনীকে শিকল পড়িয়ে হাঁটিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। আর বিরাট পেট ওয়ালা মানুষদের আত্ম চিৎকারে পরিবেশ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করছিল। রাসুল (সা) প্রশ্ন করলেন, ওরা কারা? জিব্রাইল (আ) বললেন, পেট ওয়ালা মানুষগুলো দুনিয়ার জীবনের সুদ-খোর। আর সেই বাহিনীর মানুষেরা হল ফেরাউনের অনুসারী সেনাদল।
পবিত্র কোরআনে ফেরআউনের পাপের কথা বহু বার বলা হয়েছে। কিন্তু জাহান্নামে তাদের মর্যাদা সুদখোরের চেয়েও উত্তম হবে। এই দৃষ্টান্ত থেকে বুঝতে পারি, সুদি মানুষের পরিণাম উভয় জগতেই নিন্দনীয় ও ভয়ানক কষ্টের হবে।


Discussion about this post