একজন সু-প্রতিবেশী একটি সমাজ একটি রাষ্ট্র পরিবর্তন করতে পারে। একজন সু-প্রতিবেশী পেতে হলে আগে নিজেকেই একজন আদর্শ প্রতিবেশী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
একজন সু-প্রতিবেশী হিসেবে গড়ে উঠার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে গিয়ে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আঃ) আমাকে সর্বদা প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসিয়ত করতে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হয় যে, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ তথা সম্পদের উত্তরাধিকারী করে দিবেন’। প্রতিবেশীর প্রতি অধিক মনোযোগী ও দায়িত্ববোধের ধারণা দিতে গিয়ে রাসুল (সাঃ) যখন কথা বলছিলেন, এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ প্রতিবেশী কারা? রাসুল (সাঃ) উত্তর দিলেন, ‘ডানে-বামের চল্লিশ পরিবার তোমাদের প্রতিবেশী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত’।
প্রতিবেশীর সুখে-দুঃখে, জীবনাচরণে নিজেদের অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত রাখা ইমানের দাবী। প্রতিবেশীকে উপেক্ষা করার ন্যুনতম সুযোগ নেই বরং তাদের খবর না নিয়ে জীবন উপভোগ করার কোন সুযোগ আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য রাখেন নি। এই দায়িত্বের কথা বলতে গিয়ে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে, নিজে পেটপুরে খায়, সে মুমিন নয়!’
আমাদের ব্যক্তি জীবনে প্রথমে যার সাথে সম্পর্ক শীতল থেকে খারাপের দিকে যায় তিনি হলেন প্রতিবেশী। সুখে-দুঃখে, বিপদে যিনি সবচেয়ে বেশী কাছাকাছি থাকতে পারবেন তিনি হলেন নিকট প্রতিবেশী। নিকট প্রতিবেশী কে হবেন, এর উত্তর বাছাইয়ে, এক ব্যক্তি রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আমার দুজন প্রতিবেশী আছে, আমি তাদের কার কাছে উপহার পাঠাব? রাসুল (সাঃ) বললেন, ‘যে প্রতিবেশীর ঘরের দরজা তোমার বেশী কাছে’।
প্রতিবেশীকে আন্তরিক সৌহাদ্য পূর্ণ অবস্থায় ধরে রাখা নিজদের দায়িত্ব। কে আমার জন্য কি করল এই প্রশ্ন এখানে বড় নয় বরং মূল্যহীন। তারচেয়ে বড় কথা আমি আমার প্রতিবেশীর জন্য আন্তরিক ভাবে কতটুকু করতে পারলাম, সেটাই বড় বিবেচ্য! প্রতিবেশীকে আন্তরিক রাখতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘তোমাদের তরকারী রান্নায় একটু ঝোল বাড়িয়ে দিবে এবং তা দ্বারা প্রতিবেশীর প্রতি নজর রেখ’। প্রতিবেশীর মন দখলে লক্ষ্যে আরেকজন প্রতিবেশীকে হরদম চিন্তা করা লাগে। তার মন মগজ, পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হবার প্রয়োজন থাকে। এতে মানুষ বিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
এক প্রতিবেশীর তুচ্ছ-মূল্যহীন উপহার পেয়ে যাতে অবস্থা সম্পন্ন অন্য প্রতিবেশী নাক না সিটকায় সে ব্যাপারে রাসুল (সাঃ) কঠোরভাবে বারণ করেছেন। নবী (সাঃ) বলতেনঃ ‘হে মুসলিম মহিলাগণ! কোন প্রতিবেশী মহিলা যেন তার অপর প্রতিবেশী মহিলার উপহার ফেরত দিয়ে তাকে হেয় প্রতিপন্ন না করে। সেটি ছাগলের পায়ের ক্ষুরই হোক না কেন’। প্রতিবেশীর মমত্ব ধনী-দরিদ্রের মাপকাঠিতে হয়না। গল্পের সিংহের বিপদে যেভাবে ইঁদুর ভূমিকা রেখেছিল; সেভাবে গরীব প্রতিবেশীও কখনও ধনী প্রতিবেশীর বিরাট কাজে লেগে যেতে পারে। এটা জীবনের বাস্তবতা এবং আখিরাতের সফলতার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া কঠিন গুনাহের কাজ। দুষ্ট প্রতিবেশী দুনিয়াতে যেমন ঘৃণিত, আখিরাতে থাকবে বঞ্চিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্তে ও আখিরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে জ্বালাতন না করে’। অন্যত্র বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও শেষ দিনের উপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও শেষ দিনের উপর বিশ্বাস করে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান দেখায়। সে যেন ভাল কথা বলে অথবা চুপ থাকে’।
প্রতিবেশীর সাথে ভাল ব্যবহার, সদ্ভাব, সদাচরণ না রেখে যত এবাদতই করা হউক না কেন তার কোন এবাদত কবুল হয়না। এক লোক নবী করীম (সাঃ) বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ), অমুক মহিলা বেশি বেশি নফল নামায পড়ে, নফল রোযা রাখে, দান-খয়রাত করে; এসব বিষয়ে সে বেশ খ্যাত কিন্তু সে প্রতিবেশীকে মুখের কথা দ্বারা কষ্ট দেয়! রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সে জাহান্নামী’। একই ব্যক্তি আরেকজন মহিলার সম্পর্কে বললেন, ‘তিনি নফল নামাজ-রোজা কম করেন, যৎসামান্য পনির দান করেন কিন্তু তিনি কথা দিয়ে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেন না; রাসুল (সাঃ) বললেন, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।
উপরোক্ত হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি, প্রতিবেশীর সাথে সদ্ভাব রাখাটা, মুমিনের জন্য কত বড় দায়িত্ব। অ-প্রতিবেশী সুলভ আচরণ আল্লাহ সহ্য করেন না। দুনিয়ার তিনজন শ্রেষ্ঠ খারাপ মানুষের তালিকা দিয়ে গিয়ে বলেছেন, একজন হল সেই, যে প্রতিবেশীর স্ত্রী’র সাথে খারাপ কাজে লিপ্ত হয়।
আবু লাহাব রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট প্রতিবেশী ছিলেন। নবুয়তের আগে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর দুইটি মেয়েকে নিজের ছেলেদের জন্য বাছাই করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম পরবর্তী যুগে তিনি রাসুল (সাঃ) এর জন্য একজন খারাপ প্রতিবেশী হিসেবে আবির্ভূত হন। রাসুল (সাঃ) কোন দিন সু-প্রতিবেশী সুলভ আচরণ তার থেকে পান নাই। আবু লাহাব মুসলমানদের বিরুদ্ধে বদরের যুদ্ধে অংশ নেয়নি, সে কোন মুসলমানের হাতে মারাও যায়নি, রোগে-শোকে মরেছেন। রাসুল (সাঃ) তার প্রতি বরাবরই আন্তরিক ছিলেন কিন্তু আল্লাহ এই প্রতিবেশীর খারাপ আচরণকে বরদাশত করেন নি। তিনি সুরা লাহাব নাজিল করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণের চিরস্থায়ী ব্যবস্থা করেন।
তাই আসুন সকল এবাদতের অন্যতম এবাদত হল প্রতিবেশীর প্রতি যত্নশীল হওয়া। আমরা প্রত্যেকেই যেন একজন সৎ প্রতিবেশী হতে পারি সে জন্য ঐকান্তিক প্রচেষ্টা করা ও আল্লাহর সহযোগিতা কামনা করা।

Discussion about this post