একদিন দোকানে এক অদ্ভুত চেহারার বেদুইন এসে হাজির হল। তার সারা শরীর থেকে ঘামের দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। আমরা জানি বেদুইনেরা গোসল করার সুযোগ পায়না তাই শরীরে দুর্গন্ধ থাকে। তাই বলে কাস্টমারকে আমরা ফেরত দেই না। সে আমাদের ক্রেতা ছিলনা, একটি চাহিদার কথা জানাতেই দোকানে ঢুকেছিল। সেই দুর্ভাগা মরুচারী
সে বলল,
সামনের রমজানে তারাবীহ পড়ানোর মত কোন হুজুর পাওয়া যাবে কিনা? আমরা ভাল পয়সা দেব। তার কথায় আমার কৌতূহল বাড়ল। তাই তাকে প্রশ্ন করলাম, আমি নিজেই হুজুর, নামাজ পড়াতে পারি, তা কত দিবেন? বেদুইন আমার বর্তমান বেতনের পরিমাণ জানতে চাইল। কৌতূহলের ছলে বেতনের পরিমাণটা একটু বাড়িয়ে বললাম। আমার বেতন শুনে তার চেহারায় কোন রেখাপাত করল না। বরং সে দৃঢ়তার সাথে জানাল, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে, তুমি যদি আমার সাথে যাও, তাহলে বর্তমানে তুমি যা পাচ্ছ তার ছয়গুণ বেশী দেওয়া হবে!
আরো পড়ুন…
- বিবর্ণ ভাগ্য ও মরুচারী জায়েদ
- ছাগলের আক্রমণে মরুর পাগল
- যে মুল্লুকে মানুষ খুন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিলনা
আমি চেয়েছিলাম বেদুইনের সাথে দুষ্টামি করব কিন্তু তিনি আমাকে উল্টো তার চেয়েও বেশী হতবাক করে দিলেন। উল্টো আমিই তার টাকার প্রলোভনে খেই হারিয়ে ফেললাম। মুহূর্তে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল অবিবাহিত ছোট বোনের চেহারা। সামান্য টাকার অভাবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা করতে পারছিনা। এই মুহূর্তে পাওয়া কাজের অর্থের মাধ্যমে, রোজার মাসের তারাবির ইমামতির বদৌলতে বিয়ের কাজ তো সমাধা হবেই, আরো টাকা আমার পকেটে জমা হবে। বেদুইনকে আর কি প্রশ্ন করব মাথায় ঢুকছিল না। উল্টো আমি খুশীর তোড়েই ভিতরে ভিতরে লাফাচ্ছিলাম। সেই দুর্ভাগা মরুচারী
সামনে রমজান মাস, দিন দিন দর্জিদের কাজ বাড়ছে। আমি ভিন্ন ভিসার, ভিন্ন পেশার মানুষ। বিপদে পড়ে দর্জির কাজের কিছুটা রপ্ত করেছিলাম তাই দোকানদার রমজান উপলক্ষে আমাকে তার দোকানে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। কিন্তু যখন আমি বেদুইনের প্রস্তাবে সায় দিলাম, মালিকের মাথায় যেন আসমান ভেঙ্গে পড়ল। আমিও অগ্র পশ্চাৎ কিছু না ভেবে আমার কথার উপর দৃঢ় রইলাম এবং দোকানদারের অনুরোধ রাখলাম না। অবিবাহিত বোনের বোঝা আমার কাঁধে, তাই বিপদ আমার, দুঃচিন্তা ও আমার, ফলে নিজের সিদ্ধান্তেই অটল রইলাম। তাছাড়া সুযোগ হঠাৎ করেই আসে, কোন সুযোগ মাত্র একবার দরজায় কড়া নাড়ে। যে কাজে লাগাতে পারে তারই কপাল খুলে, যে পারে না সে হতভাগা। তাই ভাবলাম এটিও সে ধরনেরই একটি সুযোগ এবং গ্রহণ না করাটাই হবে বোকামি।
রোজার দুই দিন আগে আমাকে নেবার জন্য বেদুইন গাড়ী নিয়ে আসল। চার হুইলের টয়োটা ডবল কেবিন ভ্যান। গাড়ীর পিছনে মালামাল রেখে পাঁচজন মানুষ এসব গাড়ীতে চড়তে পারে। সকাল থেকে দুপুর অবধি ৫০০ মাইল গাড়ি চালিয়ে ঠিক বাইশ-দিন আগে বেদুইন ও আমি এই মসজিদে এসে জোহরের নামাজ পড়ি। দুপুরের খানা খেয়ে আবারো গাড়ী চালানো শুরু হলো। ফেলে আসা ৫০০ মাইল রাস্তার পুরোটাই ছিল পাকা রাস্তা। এখান থেকে পরবর্তী যাত্রাটি পরিপূর্ণই কাঁচা। কোথাও বালি, কোথাও নুড়ি পাথর। গাড়ীর ভয়ঙ্কর ঝাঁকুনি খেতে খেতে এভাবে প্রায় আরো ১০০ শত মাইল মরুভূমির উপর দিয়ে পাড়ি দিলাম। কোন রাস্তা নেই, উত্তর দক্ষিণের নিশানা নেই, বেলা বুঝার সুযোগ নেই। জোহর-আছর সময় বুঝা যায় না। বেদুইন জানাল, রোদে দাড়িয়ে নিজেদের ছায়া দেখেই তারা দিনের প্রহর ও বেলা বুঝে থাকে। আমার জন্য এটা কঠিন হলেও তাদের জন্য এটা সহজ। তারা এভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। সেই দুর্ভাগা মরুচারী
বুঝতে পারছিলামনা সূর্যের অবস্থান কোন আকাশে? অসম্ভব খিদে, তার উপর আছে ভয়ঙ্কর গরম। পানীয় হিসেবে আনা পানির বোতলগুলো অনেক আগেই গরম হয়ে গেছে। উষ্ণ পানি পেটে গেলে সাথে সাথেই ঘামের পরিমাণ বেড়ে যায়। বেদুইনেরা এভাবে অভ্যস্ত হলেও আমার জন্য এটা নতুন অভিজ্ঞতা। এভাবে একপ্রকারের আলু ভর্তা বানিয়ে সন্ধ্যার কিছু আগে খেজুর পাতার ঢাল দ্বারা নির্মিত একটি ঝুপড়ি মার্কা বাড়ীর পাশে গাড়ী এসে থামল। বেদুইন বলল, এবার নামতে পার, এটাই আমার ঘর।
আমি আশা করলাম ঝুপড়ির ভেতর থেকে কেউ অন্তত পানি নিয়ে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরেও কারো কোন সাড়া শব্দ নেই। ঘর বলতে আহামরি কিছু নয়। খেজুরের ডাল খাড়া করে চারদিকে চারটি শক্ত বেড়ার মত বানানো। এদিক থেকে ভিতরটা দেখা যায়না, তবে কেউ শুকনো খেজুর ঢালের মাঝদিয়ে, হাতের পাঞ্জা ঢুকিয়ে ফাঁক করে ঘরের ভিতর দেখতে পারবে। ভিন্ন-দিকের দুটো দেয়ালের ফাঁক বড়, উকি দিলেই ঘরের ভিতরে রক্ষিত মালামাল সহজে নজরে আসে। বেদুইন গাড়ী রেখে কোথায় জানি গেল আবার ঘর থেকে কোন সাড়া-শব্দ না আসাতে আমি একটু উকি দিয়ে দেখলাম। কাঁথার মত কিছু একটার বান্ডিল, তেলের ড্রাম, খড়, খেজুরের বস্তা, পানির মটকা ইত্যাদি। এ ধরণের আরো কয়েকটি ঘর আছে সম্ভবত ওসব ছাগল-ভেড়ার জন্য বানানো। দিগন্তের চারিদিকে যতটুকু চোখ যায় কোন জনবসতি নজরে আসেনা কিংবা এই ঝুপড়ি বাড়ির মত আরেকটি বাড়ি। সেই দুর্ভাগা মরুচারী
তাকে প্রশ্ন করলাম মসজিদ কই?
হাত উঁচিয়ে একটা দিকের প্রতি ইঙ্গিত করে বলল, ঐ দিকে সামান্য গেলেই নামাজের স্থান পাওয়া যাবে! সেখানে একটি কুয়া আছে, কুয়ার পানি সবাই পান করে আর তাতেই ওজু করতে পারে। সেখানেই নামাজ হয়।
কিন্তু তোমার বাড়ীতে কাউকে তো দেখত পাচ্ছি না। তোমার কি পরিবার নেই?
উত্তর দিল তোমার মামা (বেদুইন পত্নী) ছাগল চড়াতে গেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে। ইচ্ছা করলে তুমিও কাল থেকে আমার পরিবারের সাথে ছাগল চড়াতে যেতে পারবে!
তার এই কথায় দুঃচিন্তা গ্রস্থ হলাম, ভাবলাম ব্যাটা বলে কি, সিন্দাবাদের দৈত্যের কবলে পড়লাম নাতো? তারাবীহ নামাজের কথা বলে ছাগল চড়াতে লাগিয়ে দিবে নাকি? যে জায়গায় এসে উপস্থিত হয়েছি সেখান থেকে কারো সহযোগিতা ছাড়া পালানোর কোন উপায় নেই। তাছাড়া আমি কোথায় আছি সেটাও তো কাউকে জানাতে পারব না। একরাশ দুঃচিন্তা মাথায় চেপে বসেছে। আবার ভাবছি কারো সাথে পরামর্শ ব্যতীত এভাবে, একক সিদ্ধান্ত নেয়ায় চরম ভুল করলাম না তো? এই খটকার প্রভাবে পেটের খিদের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছি। আবার মনকে সান্ত্বনা দিতে থাকলাম, অনর্থক বাজে কথা ভাবছি কেন? সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখি। যেখানে নামাজ পড়ানো হবে সেখানে তো আরো মানুষের সমাগম হবে। তাই ধৈর্য ধরে আল্লাহর সাহায্য চাইতে থাকলাম।
কিছুক্ষণ পরে নজর পড়ল এক ছাগলের পালের প্রতি। ওদিকে কতবার তাকিয়েছি কোন জনপ্রাণীর লক্ষণ দেখিনি কিন্তু হঠাৎ করে যেন উদয় হল এই ছাগল বাহিনী। সামনে একটি চলায়মান সরু গাছের মত মনে হল। আরো কাছাকাছি হবার বুঝতে পারি সেটা একটা বৃদ্ধা মহিলার অবয়ব। ছাগল বাহিনী তাকেই অনুসরণ করছে। ধারণা ঠিকই, ছাগলের পাল নিয়ে বুড়ি আমাদের অবস্থানের দিকেই আসছে। ছাগল পালন করতে গেলে ছাগলের ইচ্ছে অনিচ্ছা সম্পর্ককে ধারণা থাকতে হয়। সাধারণত অনিচ্ছুক ছাগলকে কান ধরে টেনে সামনে নেওয়া যায়না আবার পিছন থেকে ধাক্কা দিয়েও সামনে আগ বাড়ানো যায় না। এখানে বিরাট ভিন্নতা দেখতে পেলাম। বুড়ি আগে আগে হাঁটছে, তার পিছু পিছু ছাগলগুলো চলছে। কোন বেত্রাঘাত নাই, ধমক নাই, ছাগলের পাল বুড়িকে একটি বাহিনী প্রধানের মতো বানিয়ে পিছু চলছে!
আমি কোনদিন ছাগল দেখিনি ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু সেদিন আমি কেন জানি ছাগল দেখায় তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম! আসলে বেদুইনের সেই কথার পর থেকে, ভিতরে ভিতরে অজানা শঙ্কায় আমি কিছুটা পেরেশান হয়েছিলাম। ইত্যবসরে ছাগলের পাল আমার মত এক নতুন আগন্তুককে গোবেচারার মত দাড়িয়ে থাকতে দেখে, তারাও উৎসুক হয়ে আমার বরাবর আসতে থাকে। ছাগল নিরীহ প্রাণী, তাই বলে মরুভূমির ছাগল নয়। এদের রুচি, আগ্রহ, কৌতূহল নিয়ে আমার অগ্রিম ধারনা রাখা দরকার ছিল। কিন্তু আমি যথেষ্ট দেরী করে ফেলেছিলাম। যে ভুলের কারণে আমাকে বিশটা দিন চরম কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। সেই অবস্থার একটি নমুনা আপনি আমাকে গোসল করার আগ মুহূর্তেই কিছুটা দেখেছেন!
প্রশ্ন করি তারপর কি হল? সে বলতে থাকে,
বেদুইনের সাথে যাবার সময় আমি একমাসের জন্য সম্ভাব্য জিনিষপত্র নিয়ে যাই। সাবান, চিনি, চা-পাতা সমেত প্যাকেটে ভরা বন, কেক, বিস্কুট, চিড়া, মিঠা, কোক নিয়েছিলাম। বিস্কুট, মুড়ি, চনাচুর, শুকনো কিসমিস সহ নানাবিধ সামগ্রীও সাথে নিয়ে এসেছিলাম। কেননা আমি জানতাম তারা বেদুইন। তাদের রুচির সাথে যদি আমার না মিলে তাহলে যাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি, সে প্রস্তুতি আমার ছিল। আমি ভেবেছিলাম নিরীহ ছাগল আমাকে মেহমান মনে করে, কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তাছাড়া মাত্র তিনটি ছাগলের অনুভূত এমন ছিল কিন্তু আমি বুঝতে বিরাট ভুল করেছিলাম।
কিছু বুঝে উঠার আগেই ছাগল তিনটি আমার আনিত পলিথিনের প্যাকেটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মালামাল কেড়ে নেবার লক্ষ্যে সেদিকে ধাওয়া করলাম। কিন্তু ব্যর্থ হলাম। ওদিকে মুহূর্তের সিদ্ধান্তে বাকি ছাগলগুলো এক সাথে আমার আনিত প্যাকেটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এসব জিনিষ এক মুহূর্তে কোথায় হারিয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু মুড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। মুরগীর মত করে ছাগলের দল সেগুলো মাটি থেকে বেছে বেছে খেতে থাকল। ছাগলের এই চরিত্রের সাথে আমার আগে পরিচয় ছিলনা।


Discussion about this post