হালকায়ে জিকির ও প্রকৃত জিকির। মূলত জিকির সম্পর্কে কমবেশি সবার ধারণা আছে। হালকায়ে জিকিরের নামও অনেকেই শুনে থাকবেন কিন্তু উভয়ের তফাত কি তা বুঝতে পারে না।
আমাদের দেশে বহুকাল ধরেই, শবে-বরাত আর শবে-কদরের রাতে জিকিরের জন্য একটি বিরাট সময় নির্দিষ্ট করা থাকে। কোনমতে নামাজ শেষ করে, কখন শুরু হবে জিকির, সে জন্য অপেক্ষা করা হত। এই পবিত্র রাতের ইবাদতে ইল্লাল্লাহ স্বরে পুরো পরিবেশ এক ভিন্নতায় রূপ নিত।
কিছু সংখ্যক পীরেরা তাদের মুরিদদের জন্য জিকির করাটাকে অত্যাবশ্যকীয় করে দেয়। কোন পীরের তরিকায় (নিয়মনীতি) সপ্তাহে একদিন, কোথাও মাসে একদিন পীরের খানকায় এসে জিকির করার, বাধ্য বাদকতা দিয়ে থাকে।
দরগাহ গুলোতেও ঘটা করে জিকিরের আয়োজন হয়। ওরসের সময় তো জজবা তুলে জিকির হয়! তাদের মুরিদেরাও আবার নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার কিংবা কোন এক মহান দিনে এই জিকিরের আয়োজন করে।
এসব জিকির পরিচালনা করার জন্য, মৌলভী নাম ধারী কিছু ব্যক্তি গান, কাওয়ালী, কবিতা গেয়ে ইল্লাল্লাহ জিকিরে পুরো মাহফিল কে মতোয়ারা করে তুলে। অনেক ধনীরা অর্থব্যয়ে এ ধরনের জিকির মাহফিলের আয়োজন করে থাকে।
মূলত দলবদ্ধ হয়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সম্মিলিত ভাবে জিকির করাটাকেই হালকায়ে জিকির বলে। ‘হালকা’ শব্দের অর্থ ছোট দল কিংবা নির্দিষ্ট গ্রুপ।
মূলত এসব জিকিরের সাথে ইসলামের কোন দূরতম সম্পর্ক নেই। সাহাবী, তাবেয়ী সহ ইতিহাসের কোন মশহুর আলেম এ লজ্জাজনক কাজ করে নি। মহাগ্রন্থ আল কোরআনের নাম একটি নয়, আরো কিছু নাম আছে।
যেমন আল-ফোরকান, আত-তানজিল, আল-কিতাব, আন-নুর, আজ-জিকর। সে হিসেবে পবিত্র কোরআনেরই সকল কথাগুলো মানা, শোনার আরেক নাম হল জিকর।
অন্যত্র জিকির শব্দের অর্থ বলা হয়েছে বাণী। যেমন, “নিশ্চয়ই আমি অবতীর্ণ করেছি জিকর (বাণী) এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক” (আল হিজর-৯)। পবিত্র কোরআনের অন্যত্র জিকর কে উপদেশ বাণী বলা হয়েছে যেমন,
“তুমি (ফাজাক্কির) উপদেশ দিতে থাক কুরআনের সাহায্যে, যে তাকে ভয় করে” (ক্বাফ-৫০)
সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করার অর্থেও জিকির বলা হয়েছে, যেমন, “হে ঈমানদার গন তোমরা আল্লাহকে বেশী বেশী পরিমাণ স্মরণ করো” (আহযাব-৩৩)।
এভাবে পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় জিকির সম্পর্কে নির্দেশনা আছে। সুতরাং জিকির হল ফরজ এবং জিকিরের পরিপূর্ণ করতে হবে কোরআনকে হুবহু অনুসরণের মাধ্যমে।
আমাদের দেশে যে সব জিকির কিংবা হালকায়ে জিকির চালু আছে, এগুলোর কোনটাই ইসলাম সম্মত নয় এবং কোরআনের কোন অনুমোদন নেই। এগুলো সবই বেদায়াত তাই এগুলো আল্লাহর দরবারে পৌছবে না।
মূলত এসব বেদায়াত, এবাদত হয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়েছে তুর্কি-ইরানী প্রভাবের মাধ্যমে। নামাজের পরে আল্লাহকে কিভাবে স্মরণ করা লাগে কিংবা জিকির করা হবে, তা হাদিস শরীফের বহু জায়গায় বলা আছে। সে জন্য রাসুল (সা) দোয়া পড়তেন এবং উম্মতকে এসব দোয়া পড়তে শিখিয়ে গিয়েছেন।
আমরা প্রতি রাকাত নামাজে একটি কথার ঘোষণা দেই, “ইয়্যাকা না বুদু, ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাইন” বলে। যার অর্থ ‘আমরা শুধু তোমারই কথামত চলি (এবাদত) এবং (লোভ-লালসা পরিহার করে) শুধুমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য চাই’।
ব্যবসায়ী, দোকানদার, মজুতদার, কর্মজীবী, শ্রমজীবী সবাই প্রতিদিন বহুবার আল্লাহর কাছে এ কথার স্বীকৃতি দিয়ে আসি যে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এভাবেই কাটিয়েছি, আবার দুপুর থেকে বিকাল অবধি এ কথার উপরেই ছিলাম।
হাজারো রাকায়াত নামাজ পড়ে বহুবার হজ্জ করে এসে যদি ওজনে এক মুষ্টি চাউল ক্রেতাকে কম দেয়। তাহলে তার সারা জীবনের জিকির পরিত্যক্ত।
যারা বুঝে চিন্তে তার জীবনকে এই ধাঁচে বানিয়ে নিয়েছে, সেই আল্লাহর প্রকৃত জিকির করেছে। এ ধরনের জিকির করে একটি দিন পার করা, আর ইল্লাল্লাহ বলে সারা জীবন পার করে দিয়েও তার সমান হবেনা।



Discussion about this post