এরা কেউ অন্য গ্রহের বাসিন্দা নয়, তাদের কেউ আমাদের থেকে দূরেও নয়। তারা আমাদের মতই মানব সন্তান। যারা হালকা খড়ের বেড়ার আড়ালে নিরাপত্তা নিয়েছে, যারা বাস করছে পৃথিবীর দেশে দেশে, প্রতিটি শহরে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে…..!
জীবন ধারণের তাগিদে, যাদের প্রতিটি দিনের সকাল শুরু হয়, নোংরা আবর্জনা থেকে জিনিস পত্র সংগ্রহ করে! সন্তানের মায়া, মাতা-পিতার প্রতি দয়া, সর্বোপরি সংসারের দায়বদ্ধতা, পেট ও পিঠের জ্বালা তাদেরকে এক মুহূর্ত ফুসরত দেয়না; নিরন্তর ও আশাহীন জীবনে।
প্লে-ষ্টেশন, ফুটবল কিংবা ক্রিকেট ধরে দেখার সৌভাগ্য তাদের কখনও হয়েছে? যারা প্রতিনিয়ত পাথরের টুকরা, ভাঙ্গা কাঁচের বোতল নিয়ে খেলেছে কঠিন ইস্পাতের পাটাতনে! কেউ কি ভাবে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে! যখন তারা শিশুমনে, অবুঝ প্রাণীর মত খেলায় মত্ত হয়? কোন পরিসংখ্যানে কি উঠে আসে, দিন-রাত যন্ত্র দানবের চাকায় কতজন অবিরত পিষ্ট হয়?
যাদের জীবনে শীত আসে ভীমরুলের হুল ফুটানো ব্যথা-বেদনা নিয়ে। যারা শুধু বর্ষার পানিতে গোসল করার অধিকার পায়। তপ্ত গরমের রাতে শীতল হতে, প্রকৃতির বাতাসই যাদের একমাত্র উপায়!
যে আশ্রয় গ্রহণ করে আরেক অবুঝ, অসহায়, আশ্রয়হীন, নিরন্নের কোলে! অথচ এরা সবাই অসহায়, কাঙ্গাল। যারা আকাশের পানে তাকিয়ে থাকে এই প্রত্যাশায় যে, আচানক যদি রুটির একখানা টুকরা এসে যায়!
ইস্ যদি গাছের পাতার একটি বল পাওয়া যেত! যদি একটি প্লাস্টিকের বোতল পেতাম, তাহলে শূন্যের উপরে ছুঁড়ে মারতাম! মজা করতাম…….
পায়ের আঙ্গুলগুলো যাদের খেলার একমাত্র মাধ্যম। স্বপ্নের জগতে আনমনে একটু খেলতে পারাটাও তাদের জন্য ভাগ্যের বিষয়। সুখকর নিদ্রা যেখানে স্বপ্ন তৈরি করে; সে ধরনের নিদ্রা-তো তাদের জন্য বহু দূরের কথা। উত্তপ্ত মরুতে এক পায়ে দাঁড়ানোর জন্য যাদের এত প্রচেষ্টা; তাদের কাছে একজোড়া ছেঁড়া স্যান্ডেল বিরাট স্বপ্নের বস্তুর মত।
ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ মার্কস অল রাউন্ডার, ভিটামিন ‘ই’ সমৃদ্ধ নিডো! সব কিছুই মিছে যাদের জীবনে। কাঁচের গ্লাসে পানি পান বাহুল্য মাত্র। কাঁচের গ্লাসে চুমো খাওয়ার তৌফিক টুকুই তাদের নেই। পচা লাউয়ের দুর্গন্ধযুক্ত খোলেই তো তাদের কলিজার পিপাসা মিটানো হয়। এতেই তাদের ভিটামিনের অভাব ঘোচে!
সবার জন্য শিক্ষা!
যার কাছে অর্থ নেই, যে এতিম, অসহায়, অনাথ; এ যুগে শিক্ষার ইচ্ছা প্রকাশ করাই তার বড় অপরাধ।
শ্রম হয়েছে যে শিশুর নিয়তি, শিক্ষা হয়েছে কল্পনার আখাঙ্খিত বস্তু। কেননা সেও স্কুলে যেতে চায়, ডানা মেরে উড়তে চায়, তবে সেটা তাদের জন্য অন্যায় আবদার।
কাশ্মীরের শাল কিংবা সিল্কের চাদর! এদের জন্য স্বপ্নের বিষয়বস্তু। অথচ শীত-বসন্তের সারা দিনমান তাদের ভাগ্যে রেশমের একটি সুতলিও মেলানো বড় দায়!
যাদের পিতা-মাতা নেই তারাই তো প্রকৃত অসহায়! ওরা আশ্রয়হীন! উলঙ্গ বদনে! সকরুণ দৃষ্টিতে বিত্তশালীদের দিকে তাকায়; একটি রুটি কিংবা একটি জামার আশায়!
এদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু জানা যায়? কতটুকু আশা তারা অন্তরে পোষণ করে, তা কখনও মাপা যায়? এই কন্যার চোখের ভাষা কি বুঝতে পারা যায়? কি তার ইচ্ছা? অভিলাষ? কি তার আবেদন?
নিজের মেয়েটি ডিম, দুধ, ফল খায়না বলে ডাক্তারের কাছে শরণাপন্ন হতে হলে!
কুকুর বিড়ালের উচ্ছিষ্টের ভাগীদার এই এতিম শিশুটিকে নিয়ে কি মন্তব্য করা হবে?
প্রতি বেলায় দই, দুধ, ছানাযুক্ত খানা দিতে পারেনা বলে যে পিতা সন্তানের জন্য অন্যায় উপার্জন করেন। সন্তানের স্বাস্থ্যহানির ভয়ে যারা সর্বদা জুস, ড্রিঙ্কের উপর ভরসা করেন। তারা কঙ্কালসার, পুষ্টি-হীন, খাদ্যহীন এই মা ও সন্তানের জন্য কি মন্তব্য করবেন?
যারা পূঁতি-গন্ধময় দুর্গন্ধের দিঘিতে বসবাস করে। পচা-গলার উৎকট নরকে খাদ্যের সন্ধান করে। লাইফবয়, ডেটল সাবান নিজেই ভীত বিহ্বল হয়ে চিৎকার করে বলে, প্লিজ আমাকে দিয়ে এই নোংরার ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করোনা।
তাদের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে এই জমিনে কে ভাবার আছে?
কিংবা যারা এভাবেই নর্দমার কিটের মত কিলবিল করে, নিজেদের কর্ম-ক্লান্তির রাত টুকু কাটায়! একটি ঘরের একই ফ্লোরে! ঠিক মরা ইঁদুরের পালের মত!
যখন এর চেয়েও বড় ঘর নিজের পালা কুকুরের জন্য বানানো হয়।
কিংবা টয়লেটের নোংরা ফ্লোরে, যখন টয়লেটের পায়খানা যাওয়ার ছিদ্রে কাপড় গুঁজিয়ে বালিশের ব্যবস্থা করা হয়।
আপনি কি এখনও সুখী নন দুই কক্ষের একটি ঘরে??!!
অথচ এদের জন্য এটাই জীবন, এটাই দুনিয়া, এখানেই বিশ্বজগৎ। এখানেই তারা সুখের তালাশে ভাগ্যতে হাতড়ে বেড়ায়!
আলী-শান বাংলো, বারান্দায় লটকানো মেম সাহেবের দোলনা, এসি কক্ষের ডাইনিং টেবিলে চায়ের সাথে চিনির পরিমাণ নিয়ে স্বামীর সাথে ঝগড়া তাদের কল্পনায় ছিল।
যিনি জীবনের নব্বইটি বছর পার করেছেন এই কবরে!
যার নাতি-নাতনীরা এভাবে খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ জোগাড়ে ব্যস্ত থাকে ডাস্টবিনের আশে পাশে।
অথচ বিত্তশালীরা প্রতিদিন প্রচুর খাদ্য দ্রব্য অবহেলায় অযত্নে, অবজ্ঞায় নষ্ট করছে!
নষ্ট করছে সুপেয় পানি! যার অপর নাম জীবন।
আমি কিংবা আপনি এই পথিকের মতো চলার পথে হয়তো কোনদিন রাস্তায় প্রাপ্ত পানির উপর উপুড় হতে হবে। কেননা মানুষ বড় অপচয়-কারী।
একটু ভাবুন, বার বার ভাবুন, নিজের তৃতীয় চোখটি মেলে ধরতে চেষ্টা করুন। গভীর অন্ধকারেও অবলীলায় দেখতে পাবেন তৃতীয় চোখের কল্যাণে হৃদয়ের অনুভূতির দ্বারা। আর ভাবুন আমাদের অনেক কিছুই আছে তাদের তুলনায় যাদের, একেবারে কিছুই নাই।
আল্লাহ বলেছেন, মানুষ বড় অকৃতজ্ঞ বান্দা। যদি তারা নিজেদের কৃতজ্ঞ শীল বান্দা বানা তো, তাহলে তাদের জন্য আসমান হতে সদা বরকত অবতীর্ণ হতো। আল্লাহ আরো বলেছেন
‘লাইন শাকারতুম, লা আজিদান্নাকুম; ওয়া লাইন কাফারতুম ইন্না আজাবী লা’শাদীদ’।
অর্থাৎ: যদি তোমরা আমার দেওয়া নেয়ামতে কৃতজ্ঞ শীল হও, তাহলে আরো বাড়িয়ে দেয়া হবে; যদি অকৃতজ্ঞ হও, তাহলে কেড়ে নেয়া হবে এবং চরম শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। ইব্রাহীম-৭।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘তুমি যদি পৃথিবীতে নিজেকে অসুখী কিংবা অতৃপ্ত মনে করো, তাহলে তুমি তোমার নিচের দিকে তাকাও। দেখবে তুমি তাদের চেয়ে কত ভাল আছ’। ছবিগুলো রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর কথার প্রতিচ্ছবি। তাদের চেয়ে আমরা অনেকেই কত ভাল আছি, কত নিরাপদ ও কত সুখে! আসুন আমরা সবাই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি শয়নে, স্বপনে, জাগরণে। আর তাদের প্রতি হাত বাড়িয়ে দিই, নিজেদের সাধ্যের যতটুকু সম্ভব তা দিয়ে। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের এটিই প্রথম শর্ত।
যারা রাষ্ট্রীয় সুযোগ ব্যবহার করে অনৈতিক ভাবে সুবিধা নিচ্ছি। রাজনৈতিক সুযোগ নিয়ে অন্যের সম্পদ কুক্ষিগত করছি। নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে সম্পদ লুটে নিচ্ছি। শরীরের শক্তি ও দলের দাপট দেখিয়ে অসহায় বনী আদমকে তটস্থ করে তুলছি। নিজের শরীরের অসুরের মত শক্তি নিয়ে, অসহায়, দুর্বল বালিকার উপর ধর্ষণের নিমিত্তে হামলে পড়ছি। আসুন আমরা ফিরে আসি সে পথে, যে পথে মানুষকে মানুষ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়, তাকে কর্তব্য ও দায়িত্ববোধ শিক্ষা দেয়। আর সে পথ হল স্রষ্টার পথ তথা আল্লাহর দেখানো পথ। এখানে আছে শান্তি, নিরাপত্তা ও মুক্তির পথ-নির্দেশিকা; প্রতিটি বনী আদমের জন্য। অন্যতায় সবার জন্য অপেক্ষা করছে, উপরে দেখানো মুসিবতের প্রতিটি ধাপ ও অধ্যায়।
Discussion about this post