বর্তমানের আমরা যে সৌদি আরবকে দেখে থাকি। সপ্তদশ শতকে এটার আকৃতি এমন ছিলনা। একসময় সমগ্র আরব ভূখণ্ড তুর্কিদের অধীনে ছিল। পৃথিবীতে কোন সাম্রাজ্য আজীবন স্থায়ী হয়নি, তাই তুর্কিদেরও হবার ছিল না। চারিদিক থেকে তাদের উপর অনাস্থা, অসহযোগিতার আগুন বাড়তে থাকে। এই আগুনের উত্তাপ শুরু হয় আরব ভূখণ্ড থেকেই। মোহাম্মদ বিন সৌদ (মৃত্যু ১৭৬৫) ছিলেন বর্তমান সৌদি আরবের রাজধানীর কাছাকাছি “দিরিয়া” নামক এক অঞ্চলের আমির। ওনার মূল নাম ‘মোহাম্মদ’ এবং তার বাবার নাম ‘সৌদ’। “মোহাম্মদ বিন সৌদ” তথা “সৌদের পুত্র মোহাম্মদ”। বাংলায় সাজিয়ে লিখতে গেলে বাক্যটি আরবির উল্টো হয়ে যায়। বর্তমানে সৌদিআরব নামে যে বৃহত্তর রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে, তা এই সৌদের নামেই। এখান থেকেই সৌদির আরবের উৎপত্তি। তুর্কির পেটে যেভাবে আধুনিক সৌদি আরবের গোড়াপত্তন নামে আমরা দেখতে পাব কিভাবে এই পরিবর্তনটি সম্ভব হয়েছিল।
দিরিয়া মক্কা থেকে অনেক দূরে। বর্তমান সময়েও সৌদি আরবের রাজধানী থেকে মক্কার দূরত্ব প্রায় ৮০০ কিমি। ওদিকে মক্কা-মদিনার উপর সর্বময় কর্তৃত্ব ছিল তুর্কিদের হাতে। ইসলাম পরবর্তী সময়ের মক্কা-মদিনার ইতিহাস লিখতে গেলে তুর্কিদের বাদ দিয়ে লেখা সম্ভব নয়। ইসলাম পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের বেশীরভাগ ক্রুসেডের মোকাবেলা করেছিলেন, “নূর উদ্দিন জঙ্কি” রহ. (১১১৮-১১৭৪)। তিনি সিরিয়া থেকে আরব, সকল মুসলমানদের রক্ষা করতে নিজের পিট বিছিয়ে দিয়েছিলেন। রাসুল (সা) এর দেহ, তাঁর কবর থেকে চুরি হয়ে যাচ্ছে! দেহ রক্ষায় ভূমিকার রাখার জন্য যাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন, তিনি ইতিহাসের এই নূর উদ্দিন! তিনি ছিলেন তুর্কির মানুষ। জেরুজালেম ব্যতীত তিনি সমগ্র মুসলিম এলাকা খৃষ্টানদের হাত থেকে মুক্ত করছিলেন। এসব কারণে মক্কা-মদিনা তো বটেই সারা বিশ্বের মুসলমানদের হৃদয়ে তুর্কিরা একটি ভিন্ন আস্তা গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। পরে তিকরিতের সন্তান সুলতান সালাউদ্দিন আইয়্যুবি রহ. (১১৩৭ – ১১৯৩) নূর উদ্দিন জঙ্কির ফেলে যাওয়া স্বপ্ন জেরুজালেম মুক্ত করেন।
শুরুতে মক্কা-মদিনার উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কল্পে তুর্কিদের বহু ভূমিকা ছিল। ধীরে ধীরে বিশ্ব ইতিহাসে নানা সুফিবাদ ও তরিকার প্রভাব বাড়তে থাকে। তাদের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের কৃষ্টির মধ্যে নানা উপাদান যোগ হতে থাকে এবং তা শাখা প্রশাখায় বিস্তার লাভ করতে থাকে। তুর্কিরা এসবকে বিনা বাধায় প্রশ্রয় দিতে থাকে। এর প্রভাব গিয়ে খোদ মক্কা-মদিনাকেও ভরিয়ে তুলে। এর সাথে যোগ হয় পারস্যের শিয়াদের নিত্য-নতুন ধর্মীয় উপাদানের সংমিশ্রণ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যারা হজ্জ করতে আসে, তাদের অনেকেই এবাদতের এসব এসব ধরণ দেখে নিজেরা শিখে এবং নিজ দেশেও প্রচার করে। ফলে দিকে দিকে ইসলামের মৌলিক আবরণের উপর এক বিরাট পরিবর্তন দেখা দিতে থাকে।
মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব (১৭০৩ – ১৭৯২) আরব যুবক। কোরআন হাফেজ ও ইসলামী জ্ঞানে প্রাজ্ঞ। ঈমাম ইবনে তাইমিয়ার (১২৬৩ – ১৩২৮) লিখনি দ্বারা তিনি যথেষ্ট প্রভাবিত ছিলেন। ইতিহাস বিখ্যাত এই দার্শনিক সমকালীন সময়ে নিজ জনপদের মানুষের কাছেও শতভাগ গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। তার মৃত্যুর পরে তার লিখা কিতাবগুলো যেন জ্ঞানী মানুষদের সাথে কথা বলতে শুরু করে! বহু জনপদে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থের প্রণেতা ইবনে কাসির (১৩০১-১৩৭৩) নিজেও ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার শিক্ষা দ্বারা খুবই প্রভাবিত ছিলেন। একই কারণে ইবনে তাইমিয়ার জ্ঞান-দর্শনের প্রভাব আরবের মোহাম্মদ ইবনে ওয়াহাবের জীবনেও রেখাপাত করে। যা আজো সৌদি আরব সহ সারা বিশ্বের জ্ঞান পিয়াসু মানুষের ক্ষুধা মিটিয়ে যাচ্ছে। ‘সালাফি’ নামে যে মতবাদের কথা আমরা শুনি তার মূল দর্শন ইমাম ইবনে তাইয়িমার নিকট থেকেই এসেছে।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াহাব বুঝতে পারেন মক্কা-মদিনায় যেভাবে ইসলাম বহির্ভূত কর্ম-কাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা থেকে মুসলমানদের আশু মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন কিন্তু ব্যাপারটি মোটেও সহজসাধ্য ছিল না। তিনি নিজেও আশে পাশের অঞ্চলে মানুষদেরকে ইসলামের প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে, বুঝাতে থাকে যে, ইসলামের নামে মক্কা-মদিনা ও জজিরাতুল আরবে যে সব সংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে, এটার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই বরং কোরআন-হাদিস বিরোধী। মানুষেরা তার এসব উপদেশ মানবে তো দূরের কথা, শুনতেও রাজি নয়। বহু স্থানে তিনি স্থানীয় আরবিদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন। মৃত্যু দশা থেকেও ফিরে এসেছেন। এমনতর অবস্থায় মক্কা-মদিনা থেকে কিভাবে কুসংস্কার উৎখাত করবে! যে এলাকার দণ্ড-মুণ্ডের কর্তাই হল শক্তিশালী তুর্কি শাসকদের হাতে। তিনি ভাবতে থাকেন এটা জন্য শক্তি-সামর্থ্যের দরকার!
Discussion about this post