চট্টগ্রামে ওয়াহাবী ও সুন্নি দ্বন্দ্ব সেই বহুকাল ধরেই। এখানে ইসলাম ধর্ম পালনকারী মানুষকে আলাদা করা হয় একটি নিদ্দিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে। চট্টগ্রামের বাহিরের মানুষ সমস্যায় পড়ে যায় এসব বিষয়ের গভীরে পৌছতে। অবশ্য যারা ওয়াহাবী হিসেবে চিত্রিত তারা নিজেরা দাবী করে না যে, তারা ওয়াহাবী। কাজটি সুন্নিরাই ঠিক করে দেয়, কারা ওয়াহাবীর কাতারে থাকবে, কারা সুন্নি হিসেবে চিত্রিত হবে। এখানে সুন্নি মুসলিম বাছাই করা হয় মুসলমানদের কিছু বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। যার কাছে এই বৈশিষ্ট্য থাকবে তিনি সুন্নি হিসেবে পরিগণিত হবেন। নুতবা তিনি যতই চেষ্টা করুন সুন্নির মর্যাদা পাবেন না। চলুন প্রথমে কিছু বৈশিষ্ট্যের সাথে পরিচিত হই।
– বরাত-কদরের রাত্রে স্পেশাল এবাদত করা
– ওরশ ও মাজার জেয়ারতে পৃষ্ঠপোষক হওয়া
– নামাজের শেষে দরুদ ও দাড়িয়ে সালাম পড়া
– হুজুরকে ঘরে দাওয়াত দিয়ে ফাতেহা পড়ানো
– পীর-আউলিয়ার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা রাখা
– প্রতি রাকাতে মুনাজাত করা অথবা সম্মিলিত মোনাজাত
– সে হিসেবে তাদের মাজার-দরগাহের প্রতি অনুরক্ত থাকা
– ধুমধামের সাথে ঈদে মীলাদুন্নবী (সা) পালন করা এবং কিছু ক্ষেত্রে
– আজানের আগে রাসুল (সা) এর লক্ষ্য সালাত-সালাম পেশ করা
এখানে কেউ নিজেকে সুন্নি দাবী করলে সে সুন্নি হয়ে যায় না! উপরের কাজগুলো যার চরিত্রে থাকবে তিনি সুন্নি হিসেবে গ্রহণ যোগ্য হবেন। এবাদতের নামে উপরে বর্ণিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে যদি কারো একটি আইটেমের সাথে দ্বন্দ্ব কিংবা বৈপরীত্য দেখা দেয় তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি ‘ওয়াহাবী’ হিসেবে চিত্রিত হবেন! এই শব্দটিকে আরেকটু তির্যক ধারালো করে ওয়াহাবী শব্দটিকে ‘ওয়াবী’ বলা হয়। (যদিও ওয়াহাবী একটি ভিন্ন দর্শন অন্য সময়ে লিখব)
কওমি মাদ্রাসায় যারা পড়ে এবং পড়ায় তারা সুন্নিদের উপরের আইটেম গুলোর একটির সাথেও ঐকমত্য হয় না বা পারেনা। ফলে সুন্নিরা তাদের সবাইকে ‘ওয়াবী’ হিসেবে চিত্রিত করে থাকে। এখানে সমাজ ব্যবস্থা এমন হয়েছে যে, ওয়াহাবী ও সুন্নি একে অপরের সাথে উঠা-বসা, দাওয়াত, জানাজা এমনকি বিয়ে শাদী পর্যন্ত করেনা। চট্টগ্রামের সুন্নিদের অন্যতম সিপাহসালার মাওলানা শেরে বাংলা (রহ)। হাট হাজারি চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশেই তাঁর শান বাধানো কবর রয়েছে। তিনি সুন্নিদের কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন।
একদা ওয়াহাবী-সুন্নির সংঘাতে তিনি তার মতাদর্শের পক্ষে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে পড়েছিলেন। ওয়াহাবীদের একজন সে সংঘাতে মারাও গিয়েছিলেন। সে হিসেবে তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে গাজী হিসেবে চিত্রিক করে থাকেন। শেরে বাংলা (রহ), তাঁর রক্তমাখা জামা কবরে তার লাশের সাথে দাফন করার জন্য অনুসারীদের অসিয়ত করে যান! যেন হাশরের ময়দানে তিনি এই রক্তমাখা জামা আল্লাহকে দেখাতে পারেন ও দুনিয়াবি জীবনে সুন্নিয়ত প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তাঁরা কিভাবে রক্ত ঝরিয়েছেন তার বাস্তব প্রমাণ পেশ করতে পারেন।
তবে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, উভয়ের কারো সাথে ইসলামের ফরজ-ওয়াজিব বিষয় গুলো নিয়ে কোন মত পার্থক্য তেমন একটা নেই। বাংলার ভূখণ্ডে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, এক ভিন্ন পন্থায়। যার সাথে ভারতের অন্যান্য অংশের ইসলাম আগমনের সাথে সম্পর্ক নেই। এ দেশে ক্ষমতায় থেকেও হিন্দু রাজা ইসলাম গ্রহণ করে রাজ্য শাসনের নজীর আছে। আবার বৌদ্ধ ধর্মীয় পাল রাজাদের সময়েও ইসলাম বিস্তৃত হয়েছে। অনেক সুফি, দরবেশ, পীরের দ্বারা ইসলাম প্রচার হয়েছে এবং মানুষ এ ধরনের চরিত্রকে খুবই শ্রদ্ধা করে। ফলে প্রচুর দরগাহ আর মাজারে ভরপুর আমাদের ভূখণ্ড। সঙ্গত কারণে এ অঞ্চলের বেশীর ভাগ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে এসব পীর-দরবেশ। সুন্নিরা দাবী করে যে, এরাই তাদের পথপ্রদর্শক এবং আলোকবর্তিকা। তারা তাদের অনুসরণের মাধ্যমেই ইসলামকে তাজা রাখতে চায়।
সুন্নিদের পক্ষে আগে থেকেই তৈরি হয়ে থাকা, এ ধরনের এক ব্যতিক্রমি পরিবেশে, ব্রিটিশ আমল থেকে ধীরে ধীরে কওমি মাদ্রাসাগুলো গোড়াপত্তন করতে থাকে কিন্তু তাঁদেরকে আজীবনই স্থানীয় সুন্নিদের সৃষ্ট প্রতিকুল পরিবেশ মোকাবেলা করেই দাঁড়াতে হয়েছে! ফলে ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও তারা সাধারণ মানুষের কাছে তাদের মত করে দাওয়াত পৌছাতে পারত না। সে সমাজ কেমন? একটি ঘটনার তুলে ধরলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে।
বিকাল বেলায় মাইকে একটি ঘোষণা “ছড়িয়ে পড়ে যে, ওয়াবীর ছেলে সুন্নি লোকের মেয়ের ছবি তুলেছে। সুন্নিরা যে যেখানে আছে তারা যেন অতি সত্ত্বর স্থানীয় বাজারে চলে আসে, কেননা এই অপমানের বিচার হবে”। দিন দশেক পরে খবর নিয়ে জানা গেল, ওয়াবীর ছেলে, নিজের মোবাইল দিয়ে তার সুন্নি জেঠাত বোনের ছবি তুলেছে। মোবাইলে ছবি তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, এমন মোবাইল দিয়ে প্রথম সুযোগেই সে কাজটি করে ফেলে। না, কোন জোড় জবরদস্তির মাধ্যমে নয়। তলে তলে তাদের উভয়ের প্রেম ছিল। এলাকায় একটি ওয়াবী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ছোট ভাইটি তাদের প্রতি অনুরক্ত হয়ে উঠেছে। তাই সুন্নিদের দৃষ্টিতে তিনি ওয়াবী হয়ে গিয়েছেন। কেউ একজন তার ছেলের মোবাইলে তারই প্রেমিকা জেঠাত বোনের ছবিটি দেখে ফেলে! সেখান থেকেই মূল ঘটনার উৎপত্তি। কোথায় ধর্ম-কর্ম? কোথায় ইসলাম পালন! সেটার কোন খবর নেই! কার ছেলে কোন মেয়ের সাথে প্রেম করে সুন্নিয়ত কে অপমানিত করেছে, এটাই সিরিয়াস বিষয় হয়ে গেছে। আপন দুই ভাইয়ের ছেলে-মেয়ে বলে ভয়ানক কিছু হয়ে যায়নি। কিন্তু তাদের উভয়ের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাপার একটিই তাদের একজন সুন্নি অন্যজন ওয়াহাবী।

Discussion about this post