আফিমের নাম শুনেনি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম; সেভাবে আফিম যে গাছ থেকে সৃষ্টি হয় এটাও হয়ত অনেকে বিশ্বাস করেনা। আফিমের ইংরেজি নাম Opium poppy, আরবিতে বলে লাবানুন। আফিমের গাছ যেমনি সুন্দর তার ফুল ততোধিক বেশী সুন্দর। ফুলের সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে অনেকে তাদের প্রিয় কন্যার নাম রাখে ‘পপি’ রাখে। এই পপি ফুলের পাপড়ি খুবই মোলায়েম, নরম ও পাতলা। রেশমি কাপড়ের পরশ পাওয়া যায়। রৌদ্রতাপ মোটেও সহ্য করতে পারে না, ফলে সকাল হবার পরই পাপড়ি ঝরে যায়। মানুষের চরিত্র যদি পপি ফুলের পাপড়ির মত মোলায়েম হত, তাহলে সমাজের চিত্র বদলে যেত।
আফিম গাছ ৩ থেকে ৪ ফুট লম্বা হয়। অঞ্চল ও জলবায়ু ভেদে নানা বর্ণের ফুল ফুটে। বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এই গাছের উপস্থিতি পুরো বাগানকে আলাদা আকর্ষণের বস্তুতে পরিণত করতে পারে। কিন্তু এত সৌন্দর্য থাকার পরে, আফিম গাছ সখের বসে কেউ বাগানে রাখতে পারে না। কেননা এটার জন্য অনুমতি লাগে। এই একটি গাছ, সারা দুনিয়ার মানুষকে প্রতারিত করতে পারে। এমন গুন ও শক্তি তার রয়েছে। মানুষ অফিসের রূপ, যৌবন, সৌন্দর্যের কাছে সদা অসহায়।
আফিমের বিচিও অন্য গাছের বিচির চেয়ে দেখতে আলাদা। সেটাও খুব সুন্দর, বিচির মাথায় মুকুটের মত পল্লব রয়েছে, সকালের কুয়াসা যখন ওটার উপরে পড়ে মনে হবে সারা ক্ষেতে মুক্তো ছড়িয়ে আছে। এটা যখন পরিপক্ব হয়, তখন সূর্য উঠার আগেই তার গাছে ব্লেডের আচর বসিয়ে দিতে হয়।
সকালের তাপে সে ক্ষত স্থান থেকে বের হয় সোনালী বর্ণের কষ। এই কষকে আফিম গাছের পাতার মাধ্যমে সিদ্ধ করে বানাতে হয় সেই আফিম।
আফিম বড় উপকারী জিনিষ। শত শত বছর ধরে আফিম গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আফিম বোধশক্তি হ্রাস করে সে জন্য বাত-ব্যথায় উপকারী। বয়স্ক মানুষের ব্যথা-বেদনা বেড়ে যাওয়ার কারণে অতীতে এটা তাদের কে সেবন করানো হত।
আগের যুগে মাথা ব্যথা, পিত্ত-শূল, দাঁত-ব্যথা ও দেহের বাহ্যিক ব্যথা নির্মূলে বিশেষ ভাবে ব্যবহার করা হত। ছাগলের দুধে জাফরান ও আফিম মিশিয়ে এক প্রকার শরবত বানানো হত। হেকিমেরা এই ঔষধ বহুবিধ কাজে ব্যবহার করত।
আফিম গাছ থেকে সৃষ্টি। কিন্তু এই আফিম অন্য গাছের বংশ বৃদ্ধিতে ব্যবহার হয়। নারিকেল, তাল গাছ সহ বিভিন্ন গাছে ছিদ্র করে আফিম ঢুকিয়ে দেবার গ্রামীণ পদ্ধতি বহু সমাজে দেখা গেছে।
আমার হাই স্কুল জীবনের একটি সুন্দর স্মৃতির কথা মনে আছে। হেড মাস্টার মহোদয় স্কুলের ছাদে একটি লাউয়ের লতা তুলে দিয়েছিলেন। লতাটি যখন লাউ দেওয়া শুরু করে, তখন তিনি লাউয়ের লতার গোরার দিকে একটু কেটে সেখানে মসুর ডাল পরিমাণ আফিম ঢুকিয়ে লতাটিকে বেধে দেয়। বহু দিন বেচেছিল এই লাউয়ের লতা; আর কত হাজার লাউ দিয়েছিল তার হিসেব কোনদিন পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে আফিমকে অন্যায় অন্যায্য কাজে ব্যবহার করা হয়। যুব সমাজ আফিম খেয়ে নেশা করে। একবার আফিমের নেশা পেয়ে বসলে সে আর কোনদিন সভ্য সমাজের জীবনে ফিরে আসেতে পারেনা।
মানব সভ্যতাকে আফিমের নেশা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, সেটাকে আর পূর্বের অবস্থায় ফিরে আনা সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ আছে। এই আফিম নিয়ে ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত চীন ও ব্রিটেনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
ইতিহাসে সেটাকে Opium war তথা আফিম যুদ্ধ বলা হয়। একটি গাছ কিভাবে মানব সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এটা তার অন্যতম উদাহরণ।
পৃথিবীর জীবনে মানব সভ্যতাকে সঠিক ও সুস্থ রাখতে হলে ধর্মীয় জীবনের বিধি নিষেধ অনুসরণের কোন বিকল্প নেই।
ইসলাম এই কাজটিকে হারাম করা হয়েছে। নেশায় অভ্যস্ত মানুষ যতই উচ্চশিক্ষিত ও সম্মানিত পদবীর অধিকারী হউক, তাদের ন্যুনতম কোন ব্যক্তিত্ব-বোধ থাকেনা।



Discussion about this post